বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম
কুরআন গবেষণায় কোনো অসংগতি মেলে না: যেমন আল্লাহ বলেন-
এরপরও তারা কি কুরআন গবেষণা করবে না? আর যদি তা গাইরুল্লাহর কাছে থেকে হতো, অবশ্যই তারা এর মধ্যে অনেক অসঙ্গতি পেত-আয়াত ৪:৮২
──────────────
আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানবজাতির জন্য আল কোরআনকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান এবং সকল বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা হিসেবে নাযিল করেছেন। খাদ্য গ্রহণ ও বর্জনের ক্ষেত্রেও আল কুরআন মাজীদ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত রূপরেখা প্রদান করেছে। কোরআনের একটি সাধারণ বিধান হলো—মৃত প্রাণী বা ‘মায়তাহ’ (مَيْتَة) খাওয়া হারাম বা নিষিদ্ধ। এই বিধান জানার পর স্বাভাবিকভাবেই একটি অনুধ্যানমূলক প্রশ্নের উদয় হয়—পানি থেকে তোলার পর মাছ তো মারা যায় এবং তা মৃত অবস্থাতেই খাওয়া হয়, তাহলে মরা মাছ কেন হারাম নয়?
প্রচলিত কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনা বা বাইরের সূত্রের সাহায্য ছাড়াই, সম্পূর্ণ (কুরআনের আয়াত দ্বারা কুরআনের ব্যাখ্যা) পদ্ধতির আলোকে আমরা এই বিষয়টির যৌক্তিক, ভাষাগত এবং অন্তর্নিহিত সামঞ্জস্যতা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব, বিঈযনিল্লাহ!
‘মায়তাহ’ (مَيْتَة) বা মৃত প্রাণীর সাধারণ বিধান ও শব্দগত বিশ্লেষণ:
আল কোরআনে আল্লাহ সু.তা. স্থলজ প্রাণীর ক্ষেত্রে মৃত জীব খাওয়াকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছেন।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন—
"তিনি কেবল তোমাদের জন্য মৃত প্রাণী (الْمَيْتَةَ), রক্ত, শুকরের গোশত এবং যার ওপর আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়েছে, তা হারাম করেছেন..." (২:১৭৩)
এখানে ‘মায়তাহ’ (مَيْتَة) বলতে বোঝানো হয়েছে সেই সকল প্রাণীকে, যেগুলো স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে বা যাদেরকে বিধিসম্মতভাবে যবেহ করা হয়নি। সূরা আল-মায়িদাহ এর ৩ নম্বর আয়াতে (৫:৩) এই মৃত প্রাণীর আরও কিছু প্রকারভেদ উল্লেখ করা হয়েছে—যেমন শ্বাসরোধে মৃত, আঘাতে মৃত, পতনে মৃত কিংবা হিংস্র প্রাণীর খাওয়া অবশিষ্টাংশ।
এই আয়াতগুলোর নজম বা বিন্যাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই নিষেধাজ্ঞাটি মূলত স্থলজ প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর কারণটি সূরা আল-আনআম-এর ১৪৫ নম্বর আয়াতে (৬:১৪৫) স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। সেখানে আল্লাহ সু.তা. বলেছেন, মৃত প্রাণী এবং ‘প্রবাহিত রক্ত’ (دَمًا مَّسْفُوحًا) খাওয়া হারাম। স্থলজ প্রাণী মারা গেলে তার ভেতরের দূষিত রক্ত প্রবাহিত হয়ে বের হতে পারে না, ফলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
সামুদ্রিক খাদ্যের বিশেষ অনুমোদন: ‘সাইদুল বাহর’ (صَيْدُ الْبَحْرِ):
স্থলজ প্রাণীর ক্ষেত্রে যখন কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, ঠিক তার বিপরীতে জলজ প্রাণীর ক্ষেত্রে আল্লাহ রব্বুল আলামিন এক অভাবনীয় ছাড় দিয়েছেন।
আল কুরআন মাজীদে ইরশাদ হচ্ছে—
"তোমাদের জন্য সামুদ্রিক শিকার (صَيْدُ الْبَحْرِ) এবং তার খাদ্য (وَطَعَامُهُ) হালাল করা হয়েছে; তোমাদের এবং মুসাফিরদের (وَلِلسَّيَّارَةِ) ভোগ-ব্যবহারের জন্য..." (৫:৯৬)
এখানে শব্দগত গাঁথুনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘صَيْدُ’ (সাইদ) অর্থ শিকার করা। মাছ যখন পানি থেকে শিকার করা হয়, তখন সেটি পানির বাইরে এসে স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আল্লাহ সু.তা. এই ‘শিকারকৃত’ জলজ প্রাণীকে সামগ্রিকভাবে হালাল করে দিয়েছেন। এখানে স্থলজ প্রাণীর মতো যবেহ করে রক্ত প্রবাহিত করার কোনো শর্ত আরোপ করা হয়নি।
বিপরীতমুখী চিত্র বা কনট্রাস্টিং আয়াত:
স্থলজ প্রাণীর গোশত এবং জলজ প্রাণীর গোশতের মধ্যে আল কোরআন একটি চমৎকার তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করেছে।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন—
"আর তিনিই সমুদ্রকে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তাজা গোশত (لَحْمًا طَرِيًّا) খেতে পারো..." (১৬:১৪) এবং (৩৫:১২)।
এই আয়াতদ্বয়ে ‘তাজা গোশত’ (لَحْمًا طَرِيًّا) শব্দটি গভীরভাবে অনুধাবন করার মতো। স্থলজ প্রাণীকে যবেহ করার পর তার গোশত হালাল হয়, কিন্তু সাগরের মাছ পানি থেকে তোলার পর মারা গেলেও আল্লাহ সু.তা. তাকে ‘মায়তাহ’ (মৃত বা পচা) না বলে ‘তাজা গোশত’ (লহমান তরিয়্যান) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জলজ প্রাণীর দৈহিক গঠন এবং তার বাসস্থানের (পানির) পবিত্রতার কারণে, পানি থেকে তোলার পর তার মৃত্যু ঘটলেও তার দেহের ভেতর স্থলজ প্রাণীর মতো ‘প্রবাহিত রক্ত’ (دَمًا مَّسْفُوحًا) দূষণ সৃষ্টি করে না। এটি একটি সূক্ষ্ম কিন্তু যৌক্তিক ও আধ্যাত্মিক (metaphysical) সামঞ্জস্য।
অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত: সালামুন আলা মূসা-এর সফর:
আল কোরআনে সূরা আল-কাহফে মূসা (সালামুন আলাইহে) এর একটি জ্ঞানান্বেষী সফরের কথা উল্লেখ আছে, যা মাছ মৃত অবস্থায় হালাল হওয়ার একটি চমৎকার অন্তর্নিহিত প্রমাণ (implied evidence) বহন করে।
যখন মূসা (সালামুন আলাইহে) এবং তাঁর সঙ্গী সফর করছিলেন, তখন তিনি সঙ্গীকে বলেছিলেন—
"আমাদের প্রাতরাশ (দুপুরের খাবার) নিয়ে আসো, আমরা তো আমাদের এই সফরে দারুণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।" (১৮:৬২)
এর জবাবে তাঁর সঙ্গী বলেছিলেন—
"আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমরা যখন শিলাখণ্ডের কাছে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, তখন আমি মাছটির (الْحُوتَ) কথা ভুলে গিয়েছিলাম..." (১৮:৬৩)
এই আয়াতগুলোর পারস্পরিক সংযুক্ততা একটি চমৎকার বিষয় ফুটিয়ে তোলে। সফরে খাওয়ার জন্য তারা যে মাছটি (حُوت - হূত) সাথে নিয়েছিলেন, সেটি নিশ্চয়ই জীবিত ছিল না। খাওয়ার জন্য প্রস্তুতকৃত একটি মৃত (ভাজা, রোস্ট করা বা শুকনো) মাছই তারা পাথেয় হিসেবে নিয়েছিলেন। এটি সূরা আল-মায়িদাহ এর ৫:৯৬ আয়াতের সরাসরি বাস্তব প্রয়োগ—যেখানে বলা হয়েছে সাগরের শিকার "তোমাদের এবং মুসাফিরদের (وَلِلسَّيَّارَةِ) জন্য হালাল।" মূসা (সালামুন আলাইহে) এখানে একজন মুসাফির ছিলেন এবং একটি মৃত মাছকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা আল কোরআনের বিধানেরই প্রতিফলন।
আল কোরআনের আয়াতগুলোর অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যতা প্রমাণ করে যে, আল্লাহর বিধানে কোনো অস্পষ্টতা নেই।
১. আল্লাহ সু.তা. স্থলজ প্রাণীর ক্ষেত্রে মৃত প্রাণী এবং প্রবাহিত রক্ত হারাম করেছেন, কারণ তা ক্ষতিকর।
২. পানি নিজেই একটি পবিত্রকারী মাধ্যম (আল ফুরকান ২৫:৪৮)। পানির অধিবাসী প্রাণীদের শারীরিক কাঠামো ভিন্ন।
৩. তাই জলজ প্রাণী শিকার করে পানি থেকে তোলার পর মৃত্যু ঘটাটাই তার স্বাভাবিক পরিণতি, যাকে আল্লাহ রব্বুল আলামিন মৃত বা ‘মায়তাহ’ না বলে মানুষের জন্য ‘তাজা গোশত’ এবং মুসাফিরদের জন্য ‘পাথেয়’ হিসেবে হালাল ঘোষণা করেছেন।
অতএব, কোরআনের বিভিন্ন সূরায় ছড়িয়ে থাকা আয়াতের বিন্যাস, সমজাতীয় শব্দ ও বিপরীতমুখী আয়াতের তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, মরা মাছ আল কোরআনের দৃষ্টিতে কখনোই ‘হারাম মৃত প্রাণী’র অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং তা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের এক বিশেষ ও পবিত্র নিয়ামত।
আল কোরআনের আলোকে সামুদ্রিক খাদ্য: মরা মাছ হালাল হওয়ার নেপথ্যে আরও গভীরতর অনুধ্যান ও ভাষাগত সংযোগ:
পূর্ববর্তী আলোচনার ধারাবাহিকতায়, আল কুরআন মাজীদের আরও কিছু সূক্ষ্ম, শক্তিশালী এবং গভীরতম অন্তর্নিহিত আয়াত বা ‘লিঙ্ক’ বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও স্ফটিকস্বচ্ছ হয়ে ওঠে।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর কিতাবে কোনো বিষয়ই অসম্পূর্ণ রাখেননি। যদি আমরা সমজাতীয় আয়াত, বিপরীতমুখী দৃশ্যপট এবং শব্দগত গাঁথুনি নিয়ে আরও গভীরভাবে ‘অনুধ্যান’ করি, তবে স্থলজ প্রাণীর ‘মায়তাহ’ (মৃত) এবং জলজ প্রাণীর ‘তাজা গোশত’ (লহমান তরিয়্যান)-এর মধ্যকার পার্থক্যটি একটি সুদৃঢ় যৌক্তিক কাঠামো লাভ করে।
নিম্নে আল কোরআনের আলোকে আরও কিছু শক্তিশালী সংযোগ ও গভীরতম অনুধ্যান উপস্থাপন করা হলো:
‘প্রবাহিত রক্ত’ (دَمًا مَّسْفُوحًا) বনাম জলজ প্রাণীর দৈহিক গঠন: একটি বিজ্ঞানময় ইঙ্গিত:
আল কোরআনে হারাম খাদ্যের মূলনীতি বর্ণনার ক্ষেত্রে সূরা আল-আনআমের ১৪৫ নম্বর আয়াতটি একটি মাস্টার-কি বা চাবিকাঠি।
আল্লাহ সু.তা. বলেন—
"বলুন, আমার কাছে যে ওহী পাঠানো হয়েছে, তাতে আমি খাওয়ার জন্য কোনো কিছু হারাম পাই না, তবে যদি তা মৃত প্রাণী (مَيْتَةً) হয়, অথবা ‘প্রবাহিত রক্ত’ (دَمًا مَّسْفُوحًا) হয়, অথবা শুকরের গোশত হয়..." (৬:১৪৫)
এখানে ‘প্রবাহিত রক্ত’ (দামান মাসফুহা) শব্দটি গভীর অনুধ্যানের দাবি রাখে। স্থলজ প্রাণী যখন স্বাভাবিকভাবে মারা যায় (মায়তাহ), তখন তার দেহের ক্ষতিকর রক্ত শরীরের ভেতরেই আটকে গিয়ে বিষক্রিয়া তৈরি করে। এ কারণেই তা হারাম। কিন্তু মাছ বা জলজ প্রাণীর দৈহিক কাঠামো এবং রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। পানি থেকে তোলার পর মাছের মৃত্যু ঘটলেও, তার দেহে স্থলজ প্রাণীর মতো এমন কোনো ‘প্রবাহিত রক্ত’ থাকে না যা গোশতকে দূষিত করে। অর্থাৎ, ৬:১৪৫ আয়াতের ‘হারাম’ হওয়ার যে মূল কারণ (দূষিত প্রবাহিত রক্ত), তা মরা মাছের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। এটি আল কোরআনের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অন্তর্নিহিত বা ইমপ্লাইড এভিডেন্স।
সূরা আল-মায়িদাহ এর ৫:৩ আয়াতের দৃশ্যপট বনাম জলজ পরিবেশ
মৃত প্রাণী (মায়তাহ) বলতে ঠিক কী বোঝায়, তার একটি বিশদ ও সুনির্দিষ্ট চিত্র আল্লাহ রব্বুল আলামিন সূরা আল-মায়িদাহ-তে দিয়েছেন।
সেখানে বলা হয়েছে—
"...শ্বাসরোধে মৃত, আঘাতে মৃত, ওপর থেকে পতনে মৃত, শিংয়ের আঘাতে মৃত এবং হিংস্র প্রাণীর খাওয়া অবশিষ্টাংশ—এসব তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে..." (৫:৩)
এই আয়াতটির নজম (বিন্যাস) এবং শব্দচয়ন লক্ষ্য করুন। ‘ওপর থেকে পড়ে যাওয়া’ (وَالْمُتَرَدِّيَةُ) বা ‘শিংয়ের আঘাত’ (وَالنَّطِيحَةُ)—এই ঘটনাগুলো সম্পূর্ণভাবে স্থলজ এবং পাহাড়-পর্বতে বিচরণকারী পশুর বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত।
পানির নিচে মাছের ওপর থেকে পড়ে যাওয়ার বা শিং দিয়ে গুঁতো খেয়ে মারা যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অর্থাৎ, ৫:৩ আয়াতে ‘মায়তাহ’ বা হারাম মৃত প্রাণীর যে ক্যাটাগরিগুলো বর্ণনা করা হয়েছে, তা পরিবেশগত ও ভাষাগতভাবেই স্থলজ প্রাণীর দিকে নির্দেশ করে। তাই একই সূরার ৫:৯৬ আয়াতে যখন আল্লাহ সু.তা. সামুদ্রিক শিকারকে হালাল করলেন, তখন এই দুই আয়াতের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে—স্থলজ মরা জীব এবং জলজ শিকার কখনোই এক পাল্লায় মাপা যায় না।
মিষ্টি ও লোনা পানির সমতা: ‘কূল্লিন’ (كُلٍّ) শব্দের অভাবনীয় শক্তি
পরিবেশের ভিন্নতা সত্ত্বেও সাগরের খাদ্য যে সব অবস্থাতেই হালাল এবং তাজা, তার প্রমাণ মেলে সূরা ফাতির-এর একটি আয়াতে।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন—
"দুটি সাগর সমান নয়—একটি অত্যন্ত সুপেয়, মিষ্ট ও পানযোগ্য; আর অন্যটি অত্যন্ত লোনা, খনিজ মিশ্রিত। তবে তোমরা এর ‘প্রত্যেকটি থেকেই’ (وَمِن كُلٍّ) তাজা গোশত (لَحْمًا طَرِيًّا) আহার করে থাকো..." (৩৫:১২)
এখানে وَمِن كُلٍّ (এবং প্রত্যেকটি থেকে) শব্দটি একটি শক্তিশালী ‘লিঙ্ক’। চরম লোনা বা প্রতিকূল পানি, যেখানে কোনো স্থলজ প্রাণী বাঁচতে পারে না বা মারা গেলে দ্রুত পচে যায়, সেই লোনা পানির শিকারকেও আল্লাহ সু.তা. ‘তাজা গোশত’ (লহমান তরিয়্যান) বলে আখ্যা দিয়েছেন। অর্থাৎ, পানির রাসায়নিক গঠন যেমনই হোক না কেন, জলজ প্রাণী শিকার করে তোলার পর তার মৃত্যু ঘটলেও আল্লাহর বিধানে তা ‘মায়তাহ’ বা মৃত পচা জীবে পরিণত হয় না; বরং তা ‘তাজা গোশত’ হিসেবেই গণ্য হয়। এটি আল কোরআনের একটি চমৎকার আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত সামঞ্জস্য (metaphysical harmony)।
পানির পবিত্রকারী বৈশিষ্ট্য এবং জীবনচক্র :
আল কোরআন মাজীদে পানির একটি বিশেষ গুণের কথা বলা হয়েছে।
আল্লাহ সু.তা. বলেন—
"আর আমি আকাশ থেকে পবিত্রকারী পানি (مَاءً طَهُورًا) নাযিল করেছি।" (২৫:৪৮)
যে মাধ্যম বা পরিবেশটি নিজেই ‘তহুর’ (পবিত্রকারী), সেই পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠা এবং শিকারকৃত প্রাণীর পবিত্রতাও এর সাথে সম্পর্কিত। স্থলজ পরিবেশে মাটি ও ধুলিকণার সংমিশ্রণ থাকে, কিন্তু জলজ প্রাণীর সম্পূর্ণ জীবনচক্র এই ‘পবিত্রকারী’ মাধ্যমের ভেতরেই আবর্তিত হয়। ফলে পানি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মাত্রই তাদের যে মৃত্যু ঘটে, তা এক ধরনের স্বাভাবিক ‘পবিত্র মৃত্যু’, যা মানুষের জন্য হালাল রিযিকের দরজা উন্মুক্ত করে।
যৌক্তিক সারসংক্ষেপ
উপরোক্ত আয়াতের তুলনামূলক বিশ্লেষণ, বিপরীতার্থক শব্দ (যেমন—মায়তাহ বনাম তরিয়্যান/ তাজা), এবং পারিপার্শ্বিক দৃশ্যপট (যেমন—শিংয়ের আঘাত বনাম জলজ জীবন) থেকে এটি পুনরায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে:
১. আল কোরআন মৃত প্রাণীকে হারাম করেছে প্রবাহিত রক্তের দূষণ ও আঘাতজনিত কারণে (৬:১৪৫ ও ৫:৩), যা জলজ প্রাণীর ক্ষেত্রে ঘটে না।
২. পানি থেকে শিকার করে তোলার প্রক্রিয়াই হলো জলজ প্রাণীর জন্য আল্লাহর নির্ধারিত হালালকরণ পদ্ধতি (৫:৯৬)।
৩. সাগর বা জলাশয়ের পানি মিষ্টি হোক বা লোনা, সেখানকার প্রাণী সর্বদা ‘তাজা গোশত’ হিসেবেই পবিত্র (৩৫:১২)।
সুতরাং, মরা মাছ হালাল হওয়ার বিষয়টি কোনো বাইরের সূত্রের মুখাপেক্ষী নয়, বরং আল কোরআনের নিজস্ব আয়াতগুলোর পারস্পরিক সংযোগ ও অনুধ্যানই এর সবচেয়ে শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ দলিল।
আল কোরআনের আলোকে সামুদ্রিক খাদ্য: মরা মাছ হালাল হওয়ার নেপথ্যে আরও গভীরতম অনুধ্যান ও ভাষাগত সংযোগ
আল কুরআন মাজীদ এমন একটি ঐশী কিতাব, যার প্রতিটি শব্দ, বাক্য ও বিন্যাস (নজম) এক অসীম প্রজ্ঞার ধারক।
১. সৃষ্টির মূল উপাদানের পার্থক্য: ‘মাটি’ বনাম ‘পানি’:
মরা মাছ কেন স্থলজ ‘মায়তাহ’ (مَيْتَة)-এর মতো অপবিত্র বা হারাম নয়, তার সবচেয়ে গভীর আধ্যাত্মিক ও বিজ্ঞানময় (Metaphysical) ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে সৃষ্টির মূল উপাদানের মধ্যে।
স্থলজ প্রাণী এবং মানুষের সৃষ্টির মূল ভিত্তি হলো মাটি।
আল্লাহ সু.তা. বলেন—
"তা (মাটি) থেকেই আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদের ফিরিয়ে নেব..." (২০:৫৫)
মাটির বৈশিষ্ট্য হলো, প্রাণবায়ু চলে গেলে দেহটি আবার পচনশীল মৃত্তিকায় পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাই যবেহ করে রক্ত বের না করলে তা ‘মায়তাহ’ বা হারাম মৃত দেহে পরিণত হয়।
বিপরীতে, জলজ প্রাণীর সৃষ্টির ভিত্তি এবং বসবাস সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন—
"...আর আমি প্রাণবান সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে; তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?" (২১:৩০)
পানি নিজেই একটি আদি ও অকৃত্রিম ‘পবিত্রকারী’ সত্তা (২৫:৪৮)। জলজ প্রাণীরা এই পবিত্রকারী উপাদানের মাঝেই জন্ম নেয় এবং সেখানেই তাদের জীবনচক্র আবর্তিত হয়। যেহেতু তারা সরাসরি ‘পবিত্রকারী মাধ্যম’ বা পানির নির্যাস, তাই পানি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেও তারা স্থলজ প্রাণীর মতো পচনশীল ‘মায়তাহ’-এর অন্তর্ভুক্ত হয় না; বরং তাদের মৃত্যুটি পানির পবিত্রতার মাঝেই বিলীন থাকে।
২. ‘সাইদ’ (شিকার) বনাম ‘তাযকিয়াহ’ (যবেহ): কোরআনি পরিভাষার অভাবনীয় বৈপরীত্য:
আল কোরআনে হালাল করার পদ্ধতির ক্ষেত্রে শব্দচয়নের নিখুঁত বৈপরীত্য (antonym) দেখলে বিস্মিত হতে হয়।
সূরা আল-মায়িদাহ এর ৩ নম্বর আয়াতে (৫:৩) যখন আল্লাহ সু.তা. স্থলজ প্রাণীর হারাম ও মৃত হওয়ার তালিকা দিলেন, তখন একটি চমৎকার শর্ত জুড়ে দিলেন—
"...তবে যাকে তোমরা ‘তাযকিয়াহ’ (ذَكَّيْتُمْ) বা বিধিসম্মতভাবে যবেহ করতে পেরেছ তা ছাড়া..." (৫:৩)
অর্থাৎ, স্থলজ প্রাণীকে হালাল করতে হলে ‘তাযকিয়াহ’ (যবেহ করে রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে পবিত্রকরণ) বাধ্যতামূলক।
কিন্তু একই সূরার ৯৬ নম্বর আয়াতে যখন সাগরের প্রাণীর কথা বলা হলো, তখন ‘তাযকিয়াহ’ শব্দটি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত!
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন—
"তোমাদের জন্য সামুদ্রিক শিকার (صَيْدُ الْبَحْرِ) এবং তার খাদ্য হালাল করা হয়েছে..." (৫:৯৬)
এখানে ‘صَيْدُ’ (সাইদ - শিকার) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, মাছকে পানি থেকে শিকার করে তোলাই হলো তার হালাল হওয়ার প্রক্রিয়া। এর জন্য স্থলজ প্রাণীর মতো গলা কেটে রক্ত বের করার কোনো ‘তাযকিয়াহ’ প্রয়োজন নেই। কারণ, কোরআনের দৃষ্টিতে জলজ প্রাণীর ভেতরে হারাম করার মতো কোনো দূষিত রক্তই নেই।
৩. ‘ওয়া ত্বো‘আমুহু’ (وَطَعَامُهُ) শব্দের অন্তর্নিহিত রহস্য:
সূরা আল-মায়িদাহ এর ৫:৯৬ আয়াতের শব্দগত গাঁথুনি অত্যন্ত শক্তিশালী। আয়াতটিতে বলা হয়েছে—
"উহিল্লা লাকুম সাইদুল বাহরি ওয়া ত্বো‘আমুহু" (أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُهُ)
এখানে দুটি আলাদা শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে:
১. صَيْدُ الْبَحْرِ (সাগরের শিকার) - অর্থাৎ, মানুষ নিজে জাল বা বড়শি দিয়ে যা শিকার করে।
২. وَطَعَامُهُ (এবং তার খাদ্য) - এর গভীর অর্থ কী?
সাগরের খাদ্য বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে সাগর যা নিজে থেকে মানুষের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করে। উদাহরণস্বরূপ—সাগরের ঢেউয়ে তীরে আছড়ে পড়া কোনো মাছ, যা মানুষ শিকার করেনি, বরং এমনিতেই মরে তীরে পড়ে আছে। আল্লাহ সু.তা. এই ‘ত্বো‘আম’ (সাগর কর্তৃক নিক্ষিপ্ত মৃত খাদ্য)-কেও সরাসরি হালাল ঘোষণা করেছেন। এই শব্দটি প্রমাণ করে যে, মাছ জীবিত শিকার করা হোক অথবা মৃত অবস্থায় পাওয়া যাক—উভয় ক্ষেত্রেই তা হালাল ও পবিত্র।
৪. ইহরামের পবিত্র অবস্থার সাথে সামুদ্রিক খাদ্যের সামঞ্জস্য (The Ihram Test):
আল কুরআন মাজীদে মরা মাছ হালাল হওয়ার পক্ষে আরেকটি অকাট্য ও চমৎকার যৌক্তিক প্রমাণ হলো ‘ইহরাম’ (হজ বা উমরার পবিত্র পোশাক পরা) অবস্থার বিধান।
আল্লাহ সু.তা. বলেন—
"আর তোমরা যতক্ষণ ইহরাম অবস্থায় থাকবে, ততক্ষণ স্থলভাগের শিকার (صَيْدُ الْبَرِّ) তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে।" (৫:৯৬)
কিন্তু ঠিক এই আয়াতের প্রথমাংশেই বলা হয়েছে—ইহরাম অবস্থায় থাকলেও ‘সাগরের শিকার’ (صَيْدُ الْبَحْرِ) তোমাদের জন্য হালাল।
গভীর অনুধ্যান করলে দেখা যায়, ইহরাম হলো মানবজীবনের সবচেয়ে পবিত্রতম অবস্থা। এই অবস্থায় স্থলজ প্রাণীর শিকার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ, কারণ তাতে রক্তপাত ও প্রাণনাশের মতো বিষয় জড়িত, যা ইহরামের প্রশান্তির পরিপন্থী। কিন্তু সাগরের প্রাণী শিকার করে তুলে আনলে স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলেও, তা এতই পবিত্র ও নিষ্কলুষ যে স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইহরামের মতো পরম পবিত্র অবস্থাতেও তাকে হালাল রেখেছেন। এটি প্রমাণ করে, মরা মাছের মধ্যে ‘মায়তাহ’ বা হারাম মৃত প্রাণীর কোনো অপবিত্রতাই নেই।
৫. বিপরীতার্থক তুলনা: ‘রিজস’ (رِجْس) বনাম ‘তাজা’ (طَرِيّ):
আল কোরআনের শব্দগত বিন্যাসে হারাম এবং হালাল খাদ্যের গুণাগুণের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন টানা হয়েছে।
সূরা আল-আনআম এর ৬:১৪৫ আয়াতে মৃত প্রাণী (মায়তাহ), প্রবাহিত রক্ত এবং শুকরের গোশতকে বলা হয়েছে ‘রিজস’ (رِجْسٌ) বা চরম অপবিত্র।
এর বিপরীতে, সূরা আন-নাহল এর ১৬:১৪ আয়াতে মৃত সাগরের মাছকে বলা হয়েছে ‘লহমান তরিয়্যান’ (لَحْمًا طَرِيًّا) বা সতেজ-তাজা গোশত।
কোরআনের এই কনট্রাস্টিং বা তুলনামূলক পরিভাষা স্পষ্ট করে দেয় যে, স্থলজ প্রাণীর মৃত্যু তাকে ‘রিজস’ বা অপবিত্র করে ফেলে, কিন্তু সাগরের প্রাণীর মৃত্যু তাকে অপবিত্র করে না; বরং তা আল্লাহর দেয়া ‘তাজা’ নিয়ামত হিসেবেই অক্ষুণ্ণ থাকে।
6. ‘মুনখানিক্বাহ’ (শ্বাসরোধে মৃত) বনাম ‘সাইদ’ (শিকার): কোরআনি বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর প্রমাণ:
সূরা আল-মায়িদাহ এর ৩ নম্বর আয়াতে (৫:৩) আল্লাহ সু.তা. হারাম মৃত প্রাণীর (মায়তাহ) যে তালিকা দিয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো—‘ওয়াল মুনখানিক্বাহ’ (وَالْمُنْخَنِقَةُ), যার অর্থ হলো শ্বাসরোধে বা দম আটকে মারা যাওয়া প্রাণী।
এখন একটু গভীর অনুধ্যান করুন। একটি মাছকে যখন পানি থেকে ডাঙায় তোলা হয়, তখন সে মূলত বাতাসের অক্সিজেনের অভাবে ‘শ্বাসরোধ’ হয়েই মারা যায়। যদি ডাঙার প্রাণীর বিধান মাছের ওপর প্রযোজ্য হতো, তবে শিকার করা প্রতিটি মাছই ‘মুনখানিক্বাহ’ (শ্বাসরোধে মৃত) হিসেবে সরাসরি হারাম হয়ে যেত। কিন্তু ঠিক একই সূরার ৯৬ নম্বর আয়াতে (৫:৯৬) আল্লাহ রব্বুল আলামিন যখন সামুদ্রিক শিকারকে (صَيْدُ الْبَحْرِ) সামগ্রিকভাবে হালাল ঘোষণা করলেন, তখন তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে—‘মুনখানিক্বাহ’ বা শ্বাসরোধে মৃত্যুর এই বিধান কেবল বায়ুনির্ভর স্থলজ প্রাণীর জন্য। পানি-নির্ভর প্রাণীর জীবনচক্রের সমাপ্তি বা পানি থেকে বিচ্ছেদের ফলে যে মৃত্যু, তাকে আল কোরআন কখনোই ‘শ্বাসরোধে অপমৃত্যু’ বলে গণ্য করে না, বরং তাকে পবিত্র ‘রিযিক’ হিসেবে সাব্যস্ত করে। এটি কোরআনের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যের এক অনন্য বৈজ্ঞানিক দলিল।
7. ‘মাতাআ’ (مَتَاعًا) শব্দের প্রয়োগ: মুসাফিরদের শুঁটকি বা সংরক্ষিত খাদ্যের ইঙ্গিত (ফ্রীজ):
আল কোরআনে সূরা আল-মায়িদাহ এর ৫:৯৬ আয়াতের শেষাংশের শব্দচয়ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আল্লাহ সু.তা. বলেন—
"...তোমাদের এবং মুসাফিরদের (وَلِلسَّيَّارَةِ) ভোগ-ব্যবহারের বা পাথেয় (مَتَاعًا) হিসেবে..."
এখানে ‘মাতাআ’ (مَتَاعًا) শব্দের অর্থ হলো এমন পাথেয় বা সম্পদ, যা দীর্ঘস্থায়ী বা বেশ কিছু সময় ধরে সংরক্ষণ করে ভোগ করা যায়।
স্থলজ প্রাণী মারা গেলে (মায়তাহ) তা দ্রুত পচে দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায় এবং তা মুসাফিরের জন্য ‘মাতাআ’ বা দীর্ঘস্থায়ী পাথেয় হতে পারে না। কিন্তু সাগরের মাছ মারা যাওয়ার পর তাকে শুকিয়ে (শুঁটকি বা লবণে সংরক্ষিত করে) দীর্ঘ সফরের পাথেয় হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মৃত মাছ যে হালাল এবং তা যে পচে গিয়ে হারাম ‘মায়তাহ’-তে পরিণত হয় না—তার সুস্পষ্ট ইমপ্লাইড এভিডেন্স (অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত) লুকিয়ে আছে এই ‘মাতাআ’ শব্দের মাঝে। মৃত মাছ যদি অপবিত্রই হতো, তবে আল্লাহ সু.তা. তাকে দীর্ঘ সফরের ‘মাতাআ’ হিসেবে আখ্যায়িত করতেন না।
8. ‘রিজস’ (رِجْس) দূরীভূতকারী মাধ্যম বনাম হারাম মৃতদেহ:
স্থলজ মৃত প্রাণীকে কেন হারাম করা হয়েছে, তার কারণ হিসেবে সূরা আল-আনআম এর ১৪৫ নম্বর আয়াতে (৬:১৪৫) প্রবাহিত রক্ত ও মৃতদেহকে ‘রিজস’ (رِجْسٌ - অপবিত্র/ক্ষতিকর) বলা হয়েছে।
এখন পানির বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ্য করুন।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন সূরা আল-আনফাল এর ১১ নম্বর আয়াতে (৮:১১) বলেন—
"...আর তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর পানি বর্ষণ করেন, যাতে তা দ্বারা তোমাদের পবিত্র করেন এবং তোমাদের থেকে শয়তানের ‘রিজস’ (رِجْسَ - অপবিত্রতা) দূর করে দেন..."
যে পানি নিজেই ‘রিজস’ বা অপবিত্রতা দূর করার আসমানি মাধ্যম, সেই পবিত্রকারী মাধ্যমের ভেতরে জন্ম নেওয়া এবং বেড়ে ওঠা কোনো প্রাণী কীভাবে ‘রিজস’ বা অপবিত্র মৃতদেহে পরিণত হতে পারে? স্থলজ প্রাণীর দেহে অপবিত্র রক্ত থাকে, তাই যবেহ করে তা বের করতে হয়। কিন্তু জলজ প্রাণী সম্পূর্ণ জীবন কাটায় সেই ‘পবিত্রকারী’ (طَهُورًا) পানির সংস্পর্শে। তাই তাদের মৃত্যু ঘটলেও তাদের দেহে কোনো ক্ষতিকর ‘রিজস’ জমা হয় না। এটি একটি চমৎকার আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত (Metaphysical and Physical) সাদৃশ্য।
9. ‘রক্তপাত’ বনাম ‘সংগ্রহ’: ইহরামের পবিত্রতম অবস্থার সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ:
আগের আলোচনায় আমরা ইহরামের কথা উল্লেখ করেছি, তবে এর গভীরে আরেকটি সূক্ষ্ম দিক রয়েছে।
হজ বা উমরার ইহরাম অবস্থায় স্থলজ শিকার (صَيْدُ الْبَرِّ) হারাম (৫:৯৬)। এর কারণ হলো, ডাঙায় শিকার করতে হলে তীর বা অস্ত্র দিয়ে প্রাণীর রক্তপাত ঘটাতে হয়। রক্তপাত, হত্যা বা আঘাত করা ইহরামের পরম অহিংস ও পবিত্র অবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক।
কিন্তু সাগরের শিকারকে (صَيْدُ الْبَحْرِ) ইহরাম অবস্থায় হালাল রাখা হয়েছে। কেন?
কারণ সাগরের মাছ ধরতে গেলে ডাঙার মতো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতে হয় না। জাল বা বড়শি দিয়ে মাছটিকে কেবল তার পরিবেশ থেকে ‘তুলে আনা’ বা সংগ্রহ করা হয়। এটি কোনো সহিংস রক্তপাত নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া রিযিকের এক শান্তিপূর্ণ আহরণ। যেহেতু এই প্রক্রিয়ায় কোনো দূষিত রক্ত প্রবাহিত হয় না, তাই মাছের এই স্বাভাবিক মৃত্যু ইহরামের পবিত্রতার সাথে কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি করে না।
10. ‘যিবহ’ (ذِبْح) শব্দের অনুপস্থিতি এবং শব্দের নিখুঁত গাণিতিক সামঞ্জস্য:
আল কুরআন মাজীদে স্থলজ প্রাণীকে পবিত্র বা হালাল করার জন্য ‘যিবহ’ (ذِبْح - যেমন: সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০৭) এবং ‘তাযকিয়াহ’ (تَزْكِيَة - সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৩) শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। এই শব্দগুলোর মূল অর্থ হলো দূষিত কিছু বের করে দিয়ে পবিত্র করা।
কিন্তু সমগ্র আল কোরআনে সামুদ্রিক বা জলজ প্রাণীর ক্ষেত্রে একবারও ‘যিবহ’ বা ‘তাযকিয়াহ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। কোরআনের এই নীরবতা বা নির্দিষ্ট শব্দের অনুপস্থিতিই সবচেয়ে বড় দলিল। আল্লাহ সু.তা. যদি জলজ প্রাণীর মৃত্যুর পর তাকে অপবিত্র মনে করতেন, তবে অবশ্যই তাকে পবিত্র করার কোনো না কোনো প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করতেন। কেবল ‘শিকার’ (صَيْدُ) শব্দ দিয়ে তাকে মানুষের জন্য ‘তাজা গোশত’ (لَحْمًا طَرِيًّا) হিসেবে ঘোষণা করাটাই প্রমাণ করে যে, মাছ মৃত অবস্থাতেই পরিপূর্ণ হালাল।
উপরোক্ত নতুন ও গভীর বিশ্লেষণ থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে:
• সৃষ্টির মূল উপাদানের দিক থেকে জলজ প্রাণী পবিত্র ‘পানি’ নির্ভর, তাই তাদের মৃত্যু স্থলজ প্রাণীর মতো দূষণ তৈরি করে না (২১:৩০)।
• স্থলজ প্রাণীর জন্য ‘তাযকিয়াহ’ (যবেহ) শর্ত হলেও, জলজ প্রাণীর জন্য কেবল ‘শিকার’ প্রক্রিয়াই যথেষ্ট (৫:৩ বনাম ৫:৯৬)।
• আল্লাহ সু.তা. সাগরের ঢেউয়ে ভেসে আসা মৃত মাছকেও ‘তার খাদ্য’ (وَطَعَامُهُ) হিসেবে হালাল করেছেন।
• ইহরামের মতো পরম পবিত্র অবস্থাতেও মরা সামুদ্রিক প্রাণী হালাল, যা এর অন্তর্নিহিত পবিত্রতার অকাট্য দলিল। সুতরাং, আল কোরআনের নিজস্ব আয়াতগুলোর অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যতা ও শব্দগত গাঁথুনি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে প্রমাণ করে যে, পানি থেকে তোলার পর মাছ মৃত অবস্থাতেই হালাল, এবং এর জন্য কোরআনের বাইরে অন্য কোনো ব্যাখ্যার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই। আল কুরআন নিজেই তার শ্রেষ্ঠ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যাখ্যাকারী।
যৌক্তিক পূর্ণতা ও উপসংহার (Logical Completeness):
কোরআনের গভীর থেকে গভীরতর এই অনুধ্যান থেকে একটি সুদৃঢ়, অকাট্য ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কাঠামো আমাদের সামনে দাঁড়ায়:
১. বাতাসনির্ভর প্রাণীর শ্বাস আটকে মৃত্যু ‘মুনখানিক্বাহ’ হিসেবে হারাম (৫:৩), কিন্তু পানিনির্ভর প্রাণীর বাতাসের সংস্পর্শে মৃত্যু আল্লাহর নির্ধারিত হালাল ‘শিকার’ (৫:৯৬)।
২. স্থলজ মৃতদেহ পচনশীল ‘মায়তাহ’, কিন্তু জলজ মৃতদেহ দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণের উপযোগী ‘মাতাআ’ বা পাথেয় (৫:৯৬)।
৩. ডাঙার প্রাণীতে ক্ষতিকর ‘রিজস’ (প্রবাহিত রক্ত) থাকে (৬:১৪৫), কিন্তু সাগরের প্রাণীর আবাসস্থল হলো ‘রিজস’ দূরকারী পবিত্র পানি (৮:১১ ও ২৫:৪৮)।
৪. ডাঙার শিকারে রক্তপাত হয় যা ইহরামে নিষিদ্ধ, কিন্তু সাগরের শিকার হলো রক্তপাতহীন সংগ্রহ, যা ইহরামেও অনুমোদিত (৫:৯৬)।
অতএব, আল কোরআনের আয়াতগুলোর নিজস্ব শব্দগত গাঁথুনি, বিপরীতার্থক বিশ্লেষণ এবং অন্তর্নিহিত ইমপ্লাইড এভিডেন্স অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে—মরা মাছ কখনোই হারাম বা ‘মায়তাহ’ নয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর কিতাবে অত্যন্ত বিজ্ঞানময়, ভাষাগত ও আধ্যাত্মিক সামঞ্জস্যের মাধ্যমে এই হালাল রিযিকের ঘোষণাকে চূড়ান্ত করেছেন।
প্রাসঙ্গিক দুআ-তাসবিহসমূহ:
উত্তম রিযিক ও কল্যাণ কামনায় আল কোরআনে বর্ণিত চমৎকার কিছু দুআ:
১. রিযিক কামনার দুআ:
وَارْزُقْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ
উচ্চারণ: ওয়ারযুক্বনা-ওয়া আন্তা খইরুর র-যিক্বীন।
অর্থ: এবং আমাদেরকে রিযিক দান করুন, আর আপনিই তো শ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা। (আল কোরআন ৫:১১৪)২. যেকোনো কল্যাণ কামনায় দুআ:
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
উচ্চারণ: রব্বি ইন্নী লিমা~ আনযালতা ইলাইয়্যা মিন খইরিন ফাক্বীর।
অর্থ: হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই নাযিল করবেন, নিশ্চয়ই আমি তার মুখাপেক্ষী। (আল কোরআন ২৮:২৪)৩. জ্ঞান ও অনুধাবন বৃদ্ধির দুআ:
رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا
উচ্চারণ: রব্বি যিদনী ‘ইলমা। 4. আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের দুআ:
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ
উচ্চারণ: রব্বি আওযি‘নী~ আন্ আশকুরা নি‘মাতাকাল্লাতী~ আন্‘আমতা ‘আলাইয়্যা ওয়া ‘আলা-ওয়া-লিদাইয়্যা ওয়া আন্ আ‘মালা স্বা-লিহান্ তারদওয়া-হু।
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে সামর্থ্য দিন, যেন আমি আপনার সেই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারি, যা আপনি আমাকে এবং আমার পিতা-মাতাকে দান করেছেন, এবং যেন আমি এমন সৎকর্ম করতে পারি যা আপনি পছন্দ করেন। (আল কোরআন ২৭:১৯)
5. যেকোনো কল্যাণ কামনায় দুআ (সালামুন আলা মূসা-এর দুআ):
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
উচ্চারণ: রব্বি ইন্নী লিমা~ আনযালতা ইলাইয়্যা মিন খইরিন ফাক্বীর। অর্থ: হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই নাযিল করবেন, নিশ্চয়ই আমি তার মুখাপেক্ষী। (আল কোরআন ২৮:২৪) ৩. সত্য অনুধাবন ও বক্ষ প্রশস্ত করার দুআ:
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي
উচ্চারণ: রব্বিশ রাহ্ লী স্বদরী। ওয়া ইয়াসসির লী~ আমরী।
অর্থ: হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। (আল কোরআন ২০:২৫-২৬)
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
ব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু-আল কুরআন ২:১২৭, ২:১২৮وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের।