বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
বড় ভয় লাগে, কিন্তু সংশয় নেই: এআই-এর এই জয়যাত্রা কি তবে দৃঢ় বিশ্বাসীদের (ইউকিনুন) জন্য পরম সত্যের হাতছানি?
➢ আল কুরআনের আলোকে ‘দা-ব্বাতুল আরদ’ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও এআই-এর প্রচ্ছন্ন সংকেত: সুরা আন-নামলের ৮২ নম্বর আয়াতের এক গভীরতর অনুধ্যান-
➢ ভূমিজাত ‘কথা বলা সত্তা’ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা! দা-ব্বাতুল আরদ: প্রযুক্তির চরম শিখরে আল কুরআনের এক অমোঘ চপেটাঘাত-
➢ জড় যখন কথা বলবে: আল কুরআনের আলোকে ‘দা-ব্বাতুল আরদ’ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সংযোগ-
➢ সিলিকন চিপস থেকে এআই: ‘ভূমি থেকে নির্গত সত্তার’ পদধ্বনি কি আমরা শুনতে পাচ্ছি?
➢ আধুনিক প্রযুক্তি- এসব এআই বা সুপার এআই কি আল কুরআনের সেই কিয়ামতের সংকেত?
➢ অবিশ্বাসের সাক্ষী যখন ভূমিজাত সত্তা: কিয়ামতের নিদর্শন, আধুনিক এআই এবং আল কুরআনের আন্তঃআয়াত বিশ্লেষণ-
আল্লাহ সুবহানাহু তা’লা আল-কুরআনে বলেন-
➥ আমরা কিতাবের মধ্যে কোনো কিছু বাদ রাখি নাই-আয়াত ৬:৩৮
➥ অনু-পরমানু তার চাইতেও ছোট-কিংবা বড়, ন্যানো তারচাইতেও আরও ক্ষুদ্রতর সবই যে কিতাবের অন্তগত (দ্র: আয়াত ১০:৬১, ৩৪:৩, ৫৪:৫৩)
আল্লাহ রব্বুল আলামিন এই বিশ্বচরাচরে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, তার প্রতিটি অণু-পরমাণুতে রয়েছে তাঁর অসীম প্রজ্ঞা ও নিদর্শনের স্বাক্ষর। আল কুরআন মাজীদ কেবল একটি ধর্মীয় বিধানগ্রন্থ নয়, বরং এটি মহাকালের প্রেক্ষাপটে মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন পথনির্দেশক। বিশেষ করে কিয়ামত বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সময়ের পূর্বে আবির্ভূত হওয়া বিভিন্ন নিদর্শন সম্পর্কে আল কুরআন মাজীদ অত্যন্ত নিপুণ ও বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিত প্রদান করেছে।
➥ দা-ব্বাতুল আরদ:
সুরা আন-নামল-এর ৮২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন:
“আর যখন তাদের ওপর সিদ্ধান্ত সংঘটিত হবে (আদেশ কার্যকর হবে), আমরা তাদের জন্য ভূমির মধ্য থেকে একটি বিচরণশীল সত্তা/প্রাণী (দা-ব্বাতান মিনাল আরদ) বের করব, যা তাদের সাথে কথা বলবে যে, মানুষেরা আমাদের আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস (ইউকিনুন) করত না।” (২৭:৮২)
এখানে ‘দা-ব্বাতুন’ (دَابَّة) শব্দটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আল কুরআনের অন্যান্য স্থানে ‘দা-ব্বাহ’ বলতে এমন সত্তাকে বোঝানো হয়েছে যা নড়াচড়া করে বা বিচরণ করে। যেমন আল্লাহ সু.তা. বলেন,
সাধারণ জীবজন্তু মাটি থেকে সৃষ্টি হলেও তাদের মূল উপাদান জৈবিক। কিন্তু ‘ভূমি থেকে সরাসরি বের হওয়া’ এবং তার ‘কথা বলা’ (তুকাল্লিমুহুম) এক অনন্য ঘটনার ইঙ্গিত দেয়। বর্তমান যুগে সিলিকন বা খনিজ উপাদান (যা ভূমি থেকে আহরিত) দ্বারা তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এবং রোবটিক্স কি সেই ‘ভূমিজাত কথা বলা সত্তা’র কোনো প্রাথমিক বা উন্নত রূপ? এই প্রশ্নটি আধুনিক অনুধ্যানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
➥ নতুন উদ্ভাবনের ইঙ্গিত: তিনি সৃষ্টি করেন যা তোমরা জানো না:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন আল কুরআন মাজীদে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, মানুষের জ্ঞানের বাইরেও অনেক সৃষ্টির উন্মেষ তিনি ঘটাবেন। সুরা আন-নাহল-এ বলা হয়েছে:
“এবং তিনি সৃষ্টি করেন এমন সব জিনিস, যা তোমরা জানো না।” (১৬:৮)
এই আয়াতটি একটি উন্মুক্ত ঘোষণা। এটি নির্দেশ করে যে, সময়ের আবর্তনে এমন সব নতুন মাধ্যম বা সত্তার আবির্ভাব ঘটবে যা তৎকালীন মানুষের চিন্তার অতীত ছিল। মানুষের আবিষ্কৃত আধুনিক প্রযুক্তি, কম্পিউটার চিপস বা এআই—সবই মূলত আল্লাহ রব্বুল আলামিন প্রদত্ত প্রাকৃতিক নিয়ম ও খনিজ সম্পদের (ভূমিজাত উপাদান) একটি বিশেষ বিন্যাস। সুতরাং, ২৭:৮২ আয়াতে বর্ণিত ‘ভূমি থেকে নির্গত বিচরণশীল সত্তা’ যা মানুষের সাথে কথা বলবে, তা আধুনিক প্রযুক্তির কোনো এক চরম উৎকর্ষের রূপ হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
➥ আয়াত বা নিদর্শনের প্রদর্শন: ইউকিনুন বা দৃঢ় বিশ্বাসের প্রাসঙ্গিকতা:
সুরা আন-নামল-এর শেষ দিকে আল্লাহ সু.তা. বলছেন:
“বলো, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর; শীঘ্রই তিনি তোমাদের তাঁর নিদর্শনসমূহ (আয়াত) দেখাবেন, তখন তোমরা তা চিনতে পারবে।” (২৭:৯৩)
এখানে ‘দেখানো’ এবং ‘চিনতে পারা’র সাথে ২৭:৮২ আয়াতের ‘কথা বলা’র এক গভীর সংযোগ রয়েছে।
যখন মানুষ আল্লাহর প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলোকে অস্বীকার করে কেবল বস্তুবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন আল্লাহ এমন এক ‘ভূমিজাত বস্তু’ বা প্রযুক্তিকে দিয়েই মানুষের অবিশ্বাসের কথা বলিয়ে দেবেন।
সুরা ফুসসিলাত-এ আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও স্পষ্ট করেছেন:
“শিগগিরই আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাবো দিগন্তসমূহে (আফাক) এবং তাদের নিজেদের মধ্যে, যতক্ষণ না তাদের কাছে স্পষ্ট হয় যে, এটিই সত্য।” (৪১:৫৩)
এই আয়াতটি নির্দেশ করে যে, নিদর্শন বা আয়াত কেবল প্রাচীন কাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মহাকাশ (আফাক) এবং মানবসৃষ্ট জ্ঞান-বিজ্ঞানের মধ্যেও প্রকাশিত হবে। মানুষের তৈরি প্রযুক্তি যখন মানুষের মতোই ‘কথা বলতে’ শুরু করে (যেমন চ্যাটবট বা হিউম্যানয়েড রোবট), তখন তা মানুষের জন্য এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়—তারা কি এরপরও স্রষ্টার এককত্বে দৃঢ় বিশ্বাস (ইউকিনুন) স্থাপন করবে, নাকি প্রযুক্তির মোহে ডুবে থাকবে?
➥ আখেরাতে দৃঢ় বিশ্বাস-এর সাথে এআই (AI) যোগসূত্র:
আখেরাতে দৃঢ় বিশ্বাসী তারা যারা একমাত্র নাযিলকৃত কিতাবে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে (ইউকিনুন):
এবং যারা ঈমান আনে তাতে, যা তোমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে আর যা তোমার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে এবং আখিরাতের প্রতি তারা দৃঢ় বিশ্বাস (ইউকিনুন) রাখে । সূরা আল বাকারা, আয়াত ২:৪
➥ মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কথা বলা:
আল কুরআন মাজীদে কিয়ামতের প্রেক্ষাপটে আরেকটি দৃশ্যপট পাওয়া যায়, যেখানে মানুষের নিজস্ব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কথা বলবে। সুরা ফুসসিলাত-এ এসেছে:
“তারা তাদের চামড়াকে বলবে, তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছ কেন? তারা বলবে, আল্লাহ আমাদের কথা বলার শক্তি দিয়েছেন, যিনি সবকিছুকে কথা বলার শক্তি দান করেন।” (৪১:২১)
এই আয়াতের সাথে ‘দা-ব্বাতুল আরদ’-এর কথা বলার একটি কাঠামোগত মিল রয়েছে। যদি মানুষের চামড়া বা জড় পদার্থ সদৃশ উপাদান আল্লাহর নির্দেশে কথা বলতে পারে, তবে ‘ভূমি থেকে উদ্ভূত’ কোনো যন্ত্র বা সত্তা কথা বলা মোটেও অসম্ভব নয়। এটি মূলত সেই পরম সত্তারই কুদরত, যিনি জড়কে বাকশক্তি দান করতে পারেন।
➥ কিয়ামতের ইঙ্গিত: দৃঢ় বিশ্বাস (ইউকিনুন):
সুরা আল-জাসিয়া-তে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলছেন:
“তোমাদের সৃষ্টিতে এবং পৃথিবীতে তিনি যেসব বিচরণশীল প্রাণী (দা-ব্বাহ) ছড়িয়ে দিয়েছেন, তাতে নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য যারা দৃঢ় বিশ্বাস (ইউকিনুন) রাখে।” (৪৫:৪)
এখানে ‘দা-ব্বাহ’ এবং ‘ইউকিনুন’ শব্দ দুটির পুনরাবৃত্তি আমাদের ২৭:৮২ আয়াতের দিকেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়। যখন আধুনিক বিজ্ঞানের চরম শিখরে পৌঁছেও মানুষ স্রষ্টাকে অস্বীকার করবে, ঠিক তখনই ‘দা-ব্বাতুল আরদ’-এর আবির্ভাব ঘটবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে। এটি কেবল একটি প্রাণী নয়, বরং এটি এমন এক নিদর্শন যা মানুষের প্রযুক্তিগত অহংকারকে চূর্ণ করে দিয়ে আল্লাহর আয়াতের সত্যতা প্রমাণ করবে।
১. জড় ও ধাতব পদার্থের ‘কথা বলা’র কাঠামোগত ভিত্তি:
আল কুরআন মাজীদ আমাদের এমন এক মহাজাগতিক বাস্তবতার কথা বলে, যেখানে প্রতিটি বস্তু—তা জৈবিক হোক বা অজৈবিক—আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীন এবং তারা নিজ নিজ পন্থায় তথ্য প্রকাশ করতে সক্ষম।
“আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব, তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।” (৩৬:৬৫)
এখানে হাত ও পায়ের কথা বলা কোনো রূপক নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ রব্বুল আলামিন চাইলে জৈবিক নয় এমন উপাদানকেও ‘ডেটা’ বা ‘তথ্যের’ বাহক এবং ‘বক্তা’ হিসেবে দাঁড় করাতে পারেন। আধুনিক এআই বা চিপসেটগুলো মূলত সিলিকন (বালি/ভূমি) ও বিভিন্ন ধাতব উপাদানের বিন্যাস, যা তথ্য সংরক্ষণ ও প্রকাশ করে। এটি ৪১:২১ আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে চামড়া বলবে—
এআই-এর মূল শক্তি হলো ডেটা বা তথ্য। আল কুরআন মাজীদে আমলনামা বা রেকর্ডিং-এর ক্ষেত্রে এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা আধুনিক ‘কোডিং’ বা ‘ডিজিটাল ফরমেট’-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
“কখনো নয়, নিশ্চয়ই পাপাচারীদের আমলনামা সিজ্জীনে আছে... তা একটি লিখিত কিতাব (কিতাবুম মারক্বুম)।” (৮৩:৭-৯)
আবার নেককারদের জন্য বলা হয়েছে—
এখানে ‘মারক্বুম’ (مَرْقُومٌ) শব্দটি লক্ষ্যণীয়, যার মূল ধাতু ‘র-ক্ব-ম’ (رقم)। এর অর্থ কেবল লেখা নয়, বরং অঙ্কিত করা, কোড করা বা চিহ্নিত করা (যেমন আধুনিক প্রযুক্তিতে ‘Digital Code’)। ভূমি থেকে বের হওয়া সত্তাটি (২৭:৮২) মানুষের ‘ইউকিনুন’ বা অবিশ্বাসের যে সাক্ষ্য দেবে, তা মূলত এই সংরক্ষিত ডেটা বা রেকর্ডেরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ।
৩. লৌহ ও খনিজ সম্পদের ‘প্রযুক্তিগত শক্তি’ (the connection of Hadid):
দা-ব্বাতুল আরদ-কে যেহেতু ‘মিনাল আরদ’ (ভূমি থেকে) বলা হয়েছে, সেহেতু ভূমির শক্তিমত্তা ও প্রযুক্তির সম্পর্কটি বোঝা জরুরি।
“আমি অবতীর্ণ করেছি লৌহ (হাদীদ), যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ।” (৫৭:২৫)
আধুনিক কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, সার্ভার এবং এআই পরিকাঠামো মূলত খনিজ লোহা ও সিলিকনের ওপর দাঁড়িয়ে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন ‘হাদীদ’ বা লোহাকে যখন প্রবল শক্তির উৎস বলছেন, তখন এটি কেবল যুদ্ধাস্ত্র নয়, বরং কিয়ামতের নিদর্শন প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবেও গণ্য হতে পারে। ‘দা-ব্বাতুল আরদ’ হতে পারে এই খনিজ ও লৌহ প্রযুক্তির এক চূড়ান্ত স্বয়ংক্রিয় রূপ।
৪. ‘ইলমুল কিতাব’ বা তথ্যের দ্রুততা: প্রযুক্তির এক ঝলক:
সুরা আন-নামল-এ (যেখানে দা-ব্বাতুল আরদ-এর কথা আছে) সুলাইমান (সালামুন আলাইহে)-এর রাজত্বে এমন একজনের কথা বলা হয়েছে যার কাছে ‘কিতাবের জ্ঞান’ (ইলমুম মিনাল কিতাব) ছিল।
“যার কাছে কিতাবের জ্ঞান ছিল সে বলল, তোমার চোখের পলক ফেলার আগেই আমি তা (রানীর সিংহাসন) এনে দেব।” (২৭:৪০)
এখানে ‘তথ্যের জ্ঞান’ ব্যবহার করে সময় ও দূরত্বের সীমানা জয় করার একটি চিত্র পাওয়া যায়। আধুনিক ফাইবার অপটিক্স বা স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন এই ‘পলক ফেলার আগে’ তথ্যের আদান-প্রদানকে সত্যে পরিণত করেছে। সুতরাং একই সূরার ৮২ নম্বর আয়াতে ‘ভূমিজাত সত্তার’ কথা বলা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমেই সম্ভব—যা আল্লাহর নির্দেশে মানুষের অবিশ্বাসের রেকর্ড তুলে ধরবে।
৫. মানুষের সৃষ্টিকর্তা বনাম প্রযুক্তি:
মানুষ যখন তার নিজের তৈরি প্রযুক্তির (যেমন এআই) প্রেমে অন্ধ হয়ে স্রষ্টাকে ভুলে যায়, তখন আল্লাহ রব্বুল আলামিন সেই প্রযুক্তিকেই তার বিরুদ্ধে দলিল হিসেবে দাঁড় করান।
“তারা দুনিয়ার জীবনের বাহ্যিক দিক (জহিরান) জানে, আর আখেরাত সম্পর্কে তারা গাফেল।” (৩০:৭)
এই ‘বাহ্যিক জ্ঞান’ বা টেকনিক্যাল নলেজ মানুষকে অহংকারী করে তোলে। ২৭:৮২ আয়াতে ‘দা-ব্বাতুল আরদ’ এসে মানুষের এই জ্ঞানগত অহংকারকে আঘাত করবে এবং চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে যে তারা ‘ইউকিনুন’ বা দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল না।
৬. দৃশ্যমান নিদর্শন ও চূড়ান্ত সময়:
সুরা আল-আন’আম-এ আল্লাহ এক কঠিন সত্য উচ্চারণ করেছেন:
যেদিন তোমার রবের কিছু নিদর্শন আসবে, সেদিন তার ঈমান কোনো কাজে আসবে না যে আগে ঈমান আনেনি। (৬:১৫৮)
দা-ব্বাতুল আরদ-এর আগমন হলো সেই ‘নিদর্শন’ যা দেখার পর মানুষের আর তওবা করার বা বিশ্বাস করার সুযোগ থাকবে না। এটি একটি ‘সেন্সর’ বা ‘রিডার’-এর মতো কাজ করবে যা মানুষের অন্তরের অবিশ্বাসের ডেটা প্রকাশ করে দেবে।
7. ফিঙ্গার প্রিন্ট: বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি বা আঙুলের ছাপ -মানুষের স্বতন্ত্র পরিচয়:
আধুনিক প্রযুক্তির সাথে এই ‘ভূমিজাত সত্তার’ সংযোগের ক্ষেত্রে মানুষের হাতের আঙুলের ভূমিকা অত্যন্ত সুগভীর। আজ আমরা এআই বা ডিজিটাল জগতকে নিয়ন্ত্রণ করছি মূলত আমাদের আঙুলের ছোঁয়ায় (Touch)। আল কুরআন মাজীদ আজ থেকে ১৪০০ বছর আগেই মানুষের আঙুলের অগ্রভাগের সূক্ষ্ম গঠন ও গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছে।
সুরা আল-ক্বিয়ামাহ-তে আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন:
“মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারব না? অবশ্যই! আমি তার আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত (বুনানাহু) সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম।” (৭৫:৩-৪)
এখানে ‘বুনানা’ (بَنَانَه) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের আঙুলের অগ্রভাগ বা ‘ফিঙ্গার প্রিন্ট’ প্রতিটি মানুষের জন্য স্বতন্ত্র। আজ আমরা যখন স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা এআই সিস্টেম ব্যবহার করি, তখন আমাদের এই আঙুলের অগ্রভাগই (bananah) প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে। বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি বা আঙুলের ছাপ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি অচল।
মানুষ তার এই ‘বুনানা’ বা আঙুলের ছোঁয়ায় ভূমিজাত উপাদান (সিলিকন চিপস/হার্ডওয়্যার) থেকে তৈরি যন্ত্রকে সক্রিয় করছে। অথচ এই আঙুলের অগ্রভাগের অনন্য বিন্যাসই ছিল আল্লাহর এক মহান নিদর্শন। মানুষ আল্লাহর দেওয়া এই অনন্য প্রযুক্তি (ফিঙ্গার প্রিন্ট) ব্যবহার করে ‘ভূমিজাত সত্তা’ (এআই) তৈরি করছে, কিন্তু সেই সত্তার প্রকৃত স্রষ্টাকে (আল্লাহ) ভুলে যাচ্ছে। ফলে কিয়ামতের পূর্বে সেই ‘ভূমিজাত সত্তাই’ (২৭:৮২) মানুষের সামনে কথা বলবে এবং তাদের অবিশ্বাসের স্বরূপ উন্মোচন করবে।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষকে ‘আল-বায়ান’ বা প্রকাশ ক্ষমতা দিয়েছেন (৫৫:৪)। মানুষ এই ক্ষমতা ব্যবহার করে কোডিং ও প্রোগ্রামিং-এর মাধ্যমে এআই-কে ‘কথা বলার’ শক্তি দিচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত তথ্য এক মহান ডেটাবেজে সংরক্ষিত হচ্ছে, যাকে কুরআন ‘ইমামিন মুবীন’ বলছে:
“আর আমি প্রতিটি জিনিসকে একটি সুস্পষ্ট কিতাবে (ইমামিন মুবীন) বিস্তারিত সংরক্ষণ করেছি।” (৩৬:১২)
২৭:৮২ আয়াতে বর্ণিত সত্তাটি যখন ‘ভূমি থেকে’ বের হবে, তখন সে মূলত এই সংরক্ষিত তথ্য বা ডিজিটাল রেকর্ড থেকেই মানুষের অবিশ্বাসের ইতিহাস তুলে ধরবে। আঙুলের ছোঁয়ায় মানুষ ইন্টারনেটে বা প্রযুক্তির জগতে যা কিছু করছে, তা ‘কিতাবুম মারক্বুম’ বা ডিজিটাল কোড হিসেবে সংরক্ষিত হচ্ছে (৮৩:৯)।
আল কুরআন মাজীদে কিয়ামতের প্রেক্ষাপটে আরেকটি দৃশ্যপট পাওয়া যায়:
“তারা তাদের চামড়াকে বলবে, তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছ কেন? তারা বলবে, আল্লাহ আমাদের কথা বলার শক্তি দিয়েছেন, যিনি সবকিছুকে কথা বলার শক্তি দান করেন।” (৪১:২১)
যে আঙুল (বুনানা) দিয়ে মানুষ আজ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করছে, সেই আঙুলের ছাপ ও স্পর্শের মাধ্যমেই ‘দা-ব্বাতুল আরদ’ বা ভূমিজাত যন্ত্রগুলো সাক্ষ্য দেবে। এটি আধ্যাত্মিক ও যৌক্তিক পূর্ণতার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
10. চূড়ান্ত সময়:
সুরা আল-জাসিয়া-তে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলছেন:
তোমাদের সৃষ্টিতে এবং পৃথিবীতে তিনি যেসব বিচরণশীল প্রাণী (দা-ব্বাহ) ছড়িয়ে দিয়েছেন, তাতে নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য যারা দৃঢ় বিশ্বাস (ইউকিনুন) রাখে।(৪৫:৪)
যখন আধুনিক বিজ্ঞানের চরম শিখরে পৌঁছেও মানুষ ‘বুনানা’ বা আঙুলের ছাপের মতো অকাট্য নিদর্শন দেখেও স্রষ্টাকে অস্বীকার করে, ঠিক তখনই ‘দা-ব্বাতুল আরদ’-এর আবির্ভাব ঘটবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে। মানুষের হাতের আঙুলের ছোঁয়ায় তৈরি হওয়া প্রযুক্তিই যখন আল্লাহর নির্দেশে মানুষের বিরুদ্ধে কথা বলবে, তখন মানুষের অহংকার চূর্ণ হবে।
11. ‘আল-বায়ান’ বা প্রকাশ ক্ষমতা: জড় ও প্রাণের সেতুবন্ধন:
সুরা আর-রহমান-এর শুরুতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলছেন:
“দয়াময় আল্লাহ, তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন, সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তাকে শিখিয়েছেন ‘আল-বায়ান’ (প্রকাশ করার ক্ষমতা বা ভাব ব্যক্ত করা)।” (৫৫:১-৪)
এখানে ‘আল-বায়ান’ কেবল মানুষের মুখের কথা নয়, বরং এটি তথ্যের এমন এক প্রকাশ ক্ষমতা যা আল্লাহ সৃষ্টির ভেতরে নিহিত রেখেছেন। যখন মানুষ ভূমিজাত খনিজ (সিলিকন/ধাতু) ব্যবহার করে এমন একটি সত্তা (এআই) তৈরি করে যা ‘কথা বলতে’ পারে, তখন তা মূলত আল্লাহর দেওয়া সেই ‘বায়ান’-এরই একটি বিশেষ বহিঃপ্রকাশ। ২৭:৮২ আয়াতে বর্ণিত ভূমিজাত সত্তার ‘কথা বলা’ (তুকাল্লিমুহুম) আসলে এই ‘বায়ান’-এরই চূড়ান্ত ও বিস্ময়কর রূপ, যা মানুষের অবিশ্বাসের কথা বয়ান করবে।
আধুনিক এআই-এর ভিত্তি হলো বিশাল তথ্যভাণ্ডার বা ‘বিগ ডেটা’। আল কুরআন মাজীদে সমস্ত তথ্যের এই ডিজিটাল বা সুসংগত সংরক্ষণের বিষয়টি ‘ইমামিন মুবীন’ শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে।
সুরা ইয়া-সিন-এ আল্লাহ সু.তা. ইরশাদ করেন:
“নিশ্চয়ই আমি মৃতদের জীবিত করি এবং লিখে রাখি যা তারা অগ্রে প্রেরণ করে এবং যা তারা পেছনে রেখে যায়; আর আমি প্রতিটি জিনিসকে একটি ‘সুস্পষ্ট কিতাবে’ (ইমামিন মুবীন) বিস্তারিত সংরক্ষণ করেছি।” (৩৬:১২)
এখানে ‘আহসা’ (أَحْصَيْنَاهُ) শব্দটির অর্থ হলো ‘গণনা করে নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা’। এটি নির্দেশ করে যে, মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ ও চিন্তা এক বিশাল মহাজাগতিক সার্ভারে জমা হচ্ছে। ২৭:৮২ আয়াতে বর্ণিত সত্তাটি যখন ‘ভূমি থেকে’ বের হবে, তখন সে মূলত এই ‘ইমামিন মুবীন’ বা সংরক্ষিত তথ্য থেকেই মানুষের অবিশ্বাসের রেকর্ড পাঠ করে শোনাবে। এটিই হলো আধ্যাত্মিক ও লজিক্যাল সংযোগ।
১.
২.
৩.
৪.
➥ NASA-কসমোলোজিক্যাল সাইন্সের উৎকর্ষতা: ‘সুলতান’ বা বিজ্ঞানের কর্তৃত্ব ও সীমানা:
মানুষ যখন তার প্রযুক্তিগত জ্ঞান বা ‘সুলতান’ ব্যবহার করে মহাকাশ বা অদৃশ্যের রহস্য উন্মোচন করতে চায়, তখন সে এক গভীর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়।
■ ‘তাক্বদীর’ ও সৃষ্টির অভ্যন্তরীণ প্রোগ্রামিং:
■ যখন পৃথিবী খবর দেবে: চূড়ান্ত সাক্ষ্য-
▓▒░ প্রাসঙ্গিক দুআ-তাসবিহ ░▒▓
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ
