কেন চূড়ান্ত ও বিশুদ্ধ সত্যের কিতাব আল-কুরআনের সাথে বাতিল মতামত সংযোজন অনুচিত—বিশেষত দ্বীনের বিধি-বিধান, আমল, উপস্থাপনা ও প্রচারের ক্ষেত্রে? (haq vs batil)

■ একমাত্র হক্বই বা কী?

আর বাতিল বলতে আল কুরআন কী বুঝিয়েছেন?

 হক বনাম বাতিল: কেন নাযিলকৃত বিশুদ্ধ ওহীর সাথে অন্য কোনো ‘লাহওয়াল হাদীস’-এর সংমিশ্রণ অগ্রহণযোগ্য? 

■ কেন একমাত্র বিশুদ্ধ হক (সত্যের কিতাব) যা নাযিলকৃত লেটেষ্ট ও ফাইনাল ভার্সন হিসাবে আল কুরআনের সাথে রেফারেন্স হিসাবে অন্য কোনো বাতিল ঘোসিত বক্তব্য-মতামত সহকারে উপস্থাপনায় আনা উচিত নয়?

■ একমাত্র সত্যের সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ কেন নিষিদ্ধ?  —আল-কুরআনের আয়না-ঘরে এক গভীর অনুধ্যান

আল-কুরআন মাজীদ হলো আল্লাহ রব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সর্বশেষ ও চূড়ান্ত সত্য (The Final Version of Haq)। এই কিতাব নিজেই নিজের সত্যতার প্রমাণ এবং অন্য সকল তথ্যের শুদ্ধতা যাচাইয়ের একমাত্র ‘আল-ফুরকান’ বা সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী মানদণ্ড। যখনই এই নাযিলকৃত বিশুদ্ধ হকের সাথে বাইরের কোনো উৎস, মনগড়া বর্ণনা বা অপ্রাসঙ্গিক কথা (লাহওয়াল হাদীস, দ্র: আয়াত ৩১:৬-৭ ) যুক্ত করা হয়, তখনই সেখানে ‘তালবিস’ বা সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটে।

আল-কুরআন মাজীদ কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং এটিই একমাত্র ‘আল-হক’ বা ধ্রুব সত্য যা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। এই নাযিলকৃত সত্যের সাথে মানবসৃষ্ট কোনো ধারণা, ঐতিহ্য বা মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটানো ঐশী বিধানের চরম লংঘন। আল্লাহ সু.তা. পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা টেনে দিয়েছেন।

নিম্নে আল-কুরআনের আয়াতের আলোকে কেন কেবল ওহী-ই ইতিহাসের একমাত্র বিশুদ্ধ উৎস এবং কেন এর সাথে অন্য কিছুর সংমিশ্রণ নিষিদ্ধ, তা বিশ্লেষণ করা হলো।

১. সত্যের বিশুদ্ধতা ও সংমিশ্রণ নিষিদ্ধকরণ:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন নির্দেশ দিচ্ছেন:

“আর তোমরা সত্যকে (الحق) মিথ্যার (الباطل) সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন করো না।” (২:৪২)

এই আয়াতে ‘তালবিস’ (تلبس) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হলো সত্যের ওপর মিথ্যার পোশাক পরিয়ে দেওয়া বা সত্যকে এমনভাবে ঘোলাটে করা যাতে সাধারণ মানুষ প্রকৃত হকের সন্ধান না পায়। এখানে ‘হক’ হলো আল্লাহর নাযিলকৃত আয়াত, আর ‘বাতিল’ হলো মানুষের তৈরি করা মনগড়া কথা বা পূর্ববর্তী বিকৃত ধারণা। যখন সত্যের সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটে, তখন তা আর ‘হক’ থাকে না, বরং তা বিভ্রান্তির নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়।

২. ‘হক’-এর একমাত্র উৎস: নাযিলকৃত আল-কুরআন:

নাযিলকৃত সত্য বলতে আসলে কী বোঝায়, তা আল্লাহ সু.তা. সূরা মুহাম্মাদে স্পষ্ট করেছেন:

“আর যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং মুহাম্মাদ -এর ওপর যা নাযিল করা হয়েছে তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে—আর তা-ই তাদের রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য (الحق)—আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলো দূর করে দেবেন এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করে দেবেন।” (৪৭:২)

এই আয়াতের শব্দগত বিন্যাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আল্লাহ সু.তা. ‘হক’ শব্দটিকে সরাসরি “যা সালামুন আলা মুহাম্মাদ -এর ওপর নাযিল করা হয়েছে” তার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। অর্থাৎ, এই আল-কুরআনই হলো একমাত্র নাযিলকৃত সত্য। এর বাইরের অন্য কোনো উৎসকে আল্লাহ এখানে ‘হক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। সুতরাং হকের সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ না করার অর্থ হলো—কুরআনের আয়াতের সাথে অন্য কোনো বাহ্যিক বর্ণনা বা মানবসৃষ্ট সূত্রের সংমিশ্রণ না ঘটানো।

এই আয়াতে আল্লাহ সু.তা. ‘হক’-কে কেবলমাত্র ওহীর সাথে সীমাবদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ, দ্বীনের ক্ষেত্রে যা নাযিল হয়নি, তা কখনোই ‘হক’ হতে পারে না। ফলে হকের সাথে যখনই অন্য কোনো মানবসৃষ্ট বর্ণনা বা ‘বাতিল’ বিষয়কে রেফারেন্স হিসেবে আনা হয়, তখন সেটি আল্লাহর নির্দেশিত আয়াতের সরাসরি লঙ্ঘন হয়: “আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না।” (২:৪২)

ইতিহাসের বিশুদ্ধ উৎস: ‘আহসান আল-কাসাস’ -একমাত্র আল কুরআনের আয়াত:

মানুষ সাধারণত অতীত ইতিহাসের জন্য বিভিন্ন বই বা লোকমুখের বর্ণনার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন যে, অতীতের সঠিক ও নির্ভুল ইতিহাস জানার একমাত্র মাধ্যম হলো আল-কুরআন। আল্লাহ সু.তা. বলেন:

➢ আমি আপনার কাছে এই কুরআন নাযিল করার মাধ্যমে সর্বোত্তম কাহিনী (أَحْسَنَ الْقَصَصِ) বর্ণনা করছি, যদিও এর আগে আপনি এ বিষয়ে অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন-আয়াত ১২:০৩

➢ আল্লাহ সবোর্ত্তম হাদীস (আহসানাল হাদীস) নাযিল করেছেন, বহুল পঠিত সাদৃশ্যপূর্ণ একটি কিতাব হিসাবে। সেটা দ্বারা তাদের ত্বকসমূহ শিহরিত হয়, যারা তাদের রবকে ভয় করে। তারপর আল্লাহর যিকিরের প্রতি তাদের ত্বকসমূহ ও তাদের অন্তরসমূহ বিগলিত হয়। সেটা আল্লাহর পথনির্দেশ, তিনি সেটা দ্বারা যাকে চান পরিচালিত করেন-আয়াত ৩৯:২৩

বিশ্লেষণ ও অনুধ্যান:

এখানে ‘আহসান আল-কাসাস’ (সর্বোত্তম কাহিনী) কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের তৈরি ইতিহাসে ভুল, অতিশয়োক্তি এবং মিথ্যার সংমিশ্রণ থাকতে পারে, কিন্তু আল্লাহর বর্ণনা করা ইতিহাস হলো ‘বিশুদ্ধ’। যেহেতু আল্লাহ একে ‘সর্বোত্তম’ বলেছেন, তাই দ্বীনি বিষয়ে ইতিহাসের রেফারেন্স হিসেবে অন্য কোনো ‘লাহওয়াল হাদীস’ বা অসার গল্পের কোনো প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট থাকে না। আল্লাহ রব্বুল আলামিন এই কিতাবকে স্পষ্ট আরবিতে নাযিল করেছেন যাতে মানুষ সরাসরি উপলব্ধি করতে পারে (১২:০২)।

■ মানবসৃষ্ট বর্ণনা বনাম নাযিলকৃত সত্য:

আল্লাহ সু.তা. আল-কুরআনের বর্ণনার সাথে মানুষের তৈরি ‘মনগড়া কাহিনী’ বা ‘বানোয়াট হাদীস’-এর পার্থক্য পরিষ্কার করে দিয়েছেন:

“তাদের এসব কাহিনীতে (রাসূলগণের ইতিহাসে) বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে শিক্ষা; এটা কোনো বানোয়াট কথা (মাকানা হাদীসান ইউফতারা—مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَىٰ) নয়, বরং এটা তার আগের অবতীর্ণ কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা।” (১২:১১১)

গভীর অনুধ্যানমূলক উপলব্ধি:

আয়াত ১২:১১১-তে আল্লাহ সু.তা. আল-কুরআনের বর্ণনাকে “বানোয়াট কোনো কথা নয়” বলে অভিহিত করেছেন। এর অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত (implied evidence) হলো—কুরআনের বাইরের এমন অনেক বর্ণনা মানুষের মধ্যে প্রচলিত হতে পারে যা ‘বানোয়াট’ বা ‘বাতিল’ (Yuftara)। দ্বীনের উপস্থাপনায় যখন কুরআনের আয়াতের পাশাপাশি মানুষের তৈরি ইতিহাস বা ‘লাহওয়াল হাদীস’ (অসার কথা যা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে - দ্রষ্টব্য ৩১:০৬) যুক্ত করা হয়, তখন সেটি আর ‘বিশুদ্ধ হক’ থাকে না।

আল্লাহ সু.তা. স্পষ্ট করেছেন যে, যারা ঈমানদার তারা কেবল হকের অনুসরণ করে, আর যারা সত্য অস্বীকারকারী তারা বাতিলের অনুসরণ করে (৪৭:০৩)। সুতরাং, দ্বীনের ক্ষেত্রে একমাত্র নাযিলকৃত ওহী-ই হলো আমাদের অনুসরণীয় রেফারেন্স।

৩. মুমিন বনাম কাফির: অনুসরনযোগ্য মানদণ্ড:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন সত্য ও মিথ্যার অনুসারীদের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন রেখা টেনে দিয়েছেন:

“এটা এ কারণে যে, যারা কুফরি করে তারা বাতিলের (الباطل) অনুসরণ করে, আর যারা ঈমান আনে তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে আগত সত্যের (الحق) অনুসরণ করে। এভাবেই আল্লাহ মানুষের জন্য তাদের দৃষ্টান্তসমূহ পেশ করেন।” (৪৭:৩)

□ যারা কুফর করে তারা মূলত নাযিলকৃত আয়াত বাদ দিয়ে কিংবা মিশ্রিত করে বাতিলের অনুসরন করে: 

এখানে ‘বাতিল’ ও ‘হক’ শব্দ দুটিকে পরস্পর বিরোধী অবস্থানে রাখা হয়েছে। যারা কাফির বা সত্য অস্বীকারকারী, তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তারা ‘বাতিল’ বা অসার তথ্যের অনুসরণ করে। অন্যদিকে, মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা কেবল তাদের ‘রব’ থেকে আসা ‘হক’ বা ওহীর অনুসরণ করে।

অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত: যদি কোনো ব্যক্তি দাবি করে সে মুমিন, কিন্তু সে নাযিলকৃত কুরআনের আয়াতের সাথে মানুষের তৈরি করা ‘বাতিল’ বিষয়কে গ্রহণ করে বা সংমিশ্রণ ঘটায়, তবে সে মূলত কাফিরদের অনুসৃত পথেরই অনুকরণ করছে। কারণ, আল্লাহ পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে—রব যা নাযিল করেছেন তা-ই হক, আর বাদবাকি সব বাতিল।

জনৈক কুরআন প্রচারক একজন সম্মানিত ভাইয়ের একটি ফেইজবুক পোষ্ট:

উক্ত পোষ্টটির বক্তব্যটি যদি  সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করি —আল-কুরআনের অতুলনীয় প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, যেসব চটকদার মতামত বা বক্তব্যের কোনো নাযিলকৃত দালিলিক ভিত্তি নেই, সেগুলোকেও কখনো কখনো রাসূলের হাদিসের নামে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে আমলের ক্ষেত্রে একমাত্র অনুসরণীয় নাযিলকৃত অহীর নির্দেশনা গৌণ হয়ে পড়ে, আর মানুষের রচিত বক্তব্যই সমাজে অধিক প্রাধান্য পায়। এসব বক্তব্যের অন্তর্নিহিত ভুল, অসামঞ্জস্য ও বিচ্যুতির কারণে আজ বিশ্ব উম্মাহ বহুভাগে বিভক্ত।

৪. আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কথা-বক্তব্য, হুকুম-আহকাম আমলের  জন্য একমাত্র আল কুরআন ব্যতিরেকে বাকীসব বিলুপ্ত ঘোসণা করা হয়েছে:

হক (الحق): নাযিলকৃত আল-কুরআনের অকাট্য প্রামাণিকতা — একটি বিশ্লেষণাত্মক অনুধ্যান

আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর কিতাব আল-কুরআন মাজীদকে ‘আল-হক’ বা ধ্রুব সত্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই সত্য কেবল তথ্যের যাথার্থ্য নয়, বরং এটিই একমাত্র মানদণ্ড যা পূর্ববর্তী সকল কিতাবকে রহিত করে সর্বশেষ ও চূড়ান্ত (Latest & Final) বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

নিম্নে “তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন” পদ্ধতিতে আল-কুরআনের আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণ করা হলো যে, কেন আল-কুরআনই একমাত্র বিশুদ্ধ ‘হক’ এবং এর বাইরে অন্য সব কিছুই অসার বা বাতিল।

১. আল্লাহ-ই পরম সত্য (আল-হক) এবং তাঁর বাণীই সত্য

আল-কুরআনের দৃষ্টিতে সত্যের উৎস কোনো মানুষ বা ইতিহাস নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহ সু.তা.। তিনি তাঁর সত্তা ও তাঁর নাযিলকৃত বাণীকে ‘হক’ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।

প্রমাণিক দলিল: (নাযিলকৃত বিধানই সত্য):

আর আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তা-ই সত্য (الحق); কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনে না। (১৩:০১)

এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ওহী বা নাযিলকৃত কিতাবই হলো হকের একমাত্র মাপকাঠি।

আল-কুরআন: পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের রক্ষক ও চূড়ান্ত মানদণ্ড (Muhaymin):

আল-কুরআনকে কেন ‘লেটেস্ট ও ফাইনাল ভার্সন’ বলা হয়, তার সবচেয়ে বড় দলিল হলো সূরা আল-মায়িদাহ’র ৪৮ নম্বর আয়াত।

“আর আমি আপনার প্রতি সত্যসহ (بالحق) কিতাব নাযিল করেছি, যা তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর ওপর রক্ষক (مهيمنا) বা মানদণ্ড হিসেবে।” (৫:৪৮)

সত্য যখন পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশিত হয়, তখন মিথ্যার কোনো স্থান থাকে না। আল্লাহ রব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন:

“আর বলুন: সত্য (الحق) এসেছে এবং মিথ্যা (الباطل) বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই বিষয়।” (১৭:৮১)

অনুধ্যানমূলক বিশ্লেষণ:

এই আয়াতে ‘যাহাকা’ (زهق) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ হলো এমনভাবে নিঃশেষ হওয়া যার কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট থাকে না।

➥ হক (الحق): যা চিরস্থায়ী, যার উৎস স্বয়ং আল্লাহ এবং তাঁর নাযিলকৃত আল কিতাব  (লেটেস্ট এন্ড ফাইনাল ভার্সন আল কুরআন)

➥ বাতিল (الباطل): যা অন্তঃসারশূন্য, যা মানুষের তৈরি এবং যা বিলুপ্ত হতে বাধ্য। (যা আল্লাহর রাসুলের নামে মানুষের তৈরী করা লাহওয়াল হাদীস)

যখন আমরা একমাত্র নাযিলকৃত সত্যের (কুরআনের) সাথে অন্য কোনো কিছু মিশ্রিত করি, তখন আমরা মূলত একটি ‘যাহুক’ বা বিনাশী বস্তুকে হকের সমান্তরাল করার চেষ্টা করি। কিন্তু ওহীর নূর যখন প্রোজ্জ্বল হয়, তখন মানুষের তৈরি সকল মিথ্যা বা বাতিল আপনাআপনি অপসারিত হয়। সত্যের সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ আদতে সত্যকে আড়াল করার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা মাত্র।

5. আল-কুরআনের সংরক্ষিত বিশুদ্ধতা ও আমাদের দায়িত্ব:

নাযিলকৃত বিধানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘বিশুদ্ধতা’ (Purity)। আল্লাহ সু.তা. এই কিতাবের সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজেই নিয়েছেন: “আমিই এই উপদেশ (যিকর) নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।” (১৫:০৯)।

যেহেতু আল-কুরআন সকল প্রকার বিকৃতি ও মিথ্যার সংমিশ্রণ থেকে মুক্ত, তাই এর অনুসারীদের প্রতি নির্দেশ হলো এর ব্যাখ্যা বা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও যেন কোনো প্রকার মানুষের তৈরি ‘বাতিল’ বা মনগড়া ধ্যান-ধারণার অনুপ্রবেশ না ঘটে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন, “এতে (কুরআনে) মিথ্যার অনুপ্রবেশ নেই—সামনে থেকেও না, পেছন থেকেও না।” (৪১:৪২)। যখন কোনো ব্যক্তি নাযিলকৃত হকের সাথে নিজস্ব প্রবৃত্তি বা মানুষের তৈরি কোনো মতবাদ (বাতিল) সংযুক্ত করে, তখন সে মূলত ঐ ঐশী বিশুদ্ধতাকে কলুষিত করার চেষ্টা করে, যা কুরআনের মূল কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক।

6. বিপরীতমুখী চিত্র: সত্য ও মিথ্যার প্রভাব:

আল-কুরআন মাজীদে সত্য ও মিথ্যার প্রভাব বোঝাতে চমৎকার একটি রূপক উপস্থাপন করা হয়েছে (১৪:২৪-২৬)।

➥ পবিত্র বাক্য (কালিমা তায়্যিবা): এটি একটি উত্তম বৃক্ষের মতো, যার মূল সুদৃঢ় এবং শাখা-প্রশাখা আকাশে বিস্তৃত। এটিই হলো ‘হক’ বা বিশুদ্ধ সত্য।

➥ অপবিত্র বাক্য (কালিমা খাবিসা): এটি একটি আগাছার মতো, যার কোনো স্থিতি নেই। মিথ্যার সংমিশ্রণ সত্যকে এই অপবিত্র ও অস্থিতিশীল আগাছার স্তরে নামিয়ে আনে।

এই তূলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে, সত্য যখন তার আপন মহিমায় থাকে, তখনই তা ফলপ্রসূ হয়। কিন্তু যখনই এতে বাতিলের খাদ মেশানো হয়, তখন তা তার আধ্যাত্মিক ও জাগতিক শক্তি হারিয়ে ফেলে।

7. আধ্যাত্মিক সংযোগ ও অনুধ্যানমূলক উপলব্ধি:

আল-কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের বিবেক বা ‘ক্বলব’ হলো সত্যের আধার। সত্যের সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আল্লাহ সু.তা. মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তারা এমন যারা “বাতিল থেকে বিমুখ থাকে” (২৩:০৩)।

সত্যের সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ না করার অর্থ হলো—নাযিলকৃত ওহীকে মানবসৃষ্ট দর্শনের তুলাদণ্ডে বিচার না করা। বরং ওহী নিজেই হবে সকল সত্যের মাপকাঠি। যারা সত্যকে জেনেও মিথ্যার সাথে মিশিয়ে ফেলে, তাদের সম্পর্কে আল-কুরআন বলছে, তারা অন্ধকারের অনুসারী। আর আল্লাহ মুমিনদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যান (২:২৫৭)। এখানে ‘আলো’ (নূর) হলো বিশুদ্ধ হক, আর ‘অন্ধকার’ (জুলুমাত) হলো হকের অনুপস্থিতি বা বাতিলের সংমিশ্রণ।

8. আধ্যাত্মিক সামঞ্জস্যতা ও যৌক্তিক পূর্ণতা:

আল-কুরআনের এই আয়াতসমূহের পারস্পরিক সংযোগ আমাদের একটি অখণ্ড কাঠামোর দিকে নিয়ে যায়:

১. উৎস: সত্য কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ওহী বা আল-কুরআন (৪৭:২)।

২. নিষেধজ্ঞা: এই ওহীর সাথে অন্য কোনো মানুষের কথা বা বাতিল প্রথার সংমিশ্রণ নিষিদ্ধ (২:৪২)।

৩. বিভেদ: হকের অনুসরণ মুমিনের কাজ, আর বাতিলের অনুসরণ কাফিরের কাজ (৪৭:৩)।

৪. ফলাফল: হকের আগমনে বাতিলের অস্তিত্ব চিরতরে বিলুপ্ত হয় (১৭:৮১)।

পরিশেষে বলা যায়, আল-কুরআন মাজীদ হলো একমাত্র সংরক্ষিত সত্য। এর বাইরে প্রচলিত তথাকথিত ইতিহাস বা মানবসৃষ্ট কোনো উৎসকে যখন হকের সমতুল্য মনে করা হয়, তখন সেটিই হয় ‘তালবিসুল হকবিল বাতিল’ বা সত্যের সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ। একজন প্রকৃত মুমিন কেবল আল্লাহর কিতাবকেই হকের মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করে এবং অন্য সকল বাতিল বা অসার মতবাদ থেকে নিজেকে বিযুক্ত রাখে।

➤ সূতরাং একমাত্র আল কুরআনকেই অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। আয়াত ৭:৩

তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তোমরা সেটার অনুসরণ করো এবং তাঁর পরিবর্তে বহু অভিভাবকের অনুসরণ কোরো না। তোমরা যা উপদেশ গ্রহণ করো তা খুবই অল্প। (7:3)

বাকীসব জুটহে! প্রমাণিক আয়াত ৩১:৬-৭:

আর মানুষের মধ্য থেকে কোনো জ্ঞান ছাড়াই, আল্লাহর পথ হতে বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যে লেনদেন করে লাহওয়াল হাদিস এবং সে সেটা ঠাট্টা হিসাবে গ্রহণ করে, ওরাই, যাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। 

আর যখন তার কাছে আমাদের আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, সে অহংকারবশত মুখ ফিরিয়ে নেয়, কেমন যেন সে তা শুনতে পায়নি, যেন তার দুই কানের মধ্যে রয়েছে বধিরতা। অতএব, তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও-আয়াত ৩১:৬-৭

আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর প্রকৃত অনুসরণ: কেবলমাত্র আল কুরআন:

দলিল দ্র: আয়াত: ৬:৫০, ১০:১৫, ৬:১৯, ১৭:৯,৭:৩:

এবং আমার কাছে এই কুরআন ওহী করা হয়েছে, যেন এর দ্বারা আমি তোমাদেরকে সতর্ক করি এবং তাকেও যার কাছে তা পৌঁছবে-আয়াত: ৬:১৯

এইসব আয়াতসমূহ প্রমাণ করে যে, আল্লাহর রাসূলের নামে এমন কোনো কথা বা আমল দ্বীনে চলতে পারে না যা আল-কুরআনে নেই। রাসূল (সালামুন আলাইহে) যদি কেবলমাত্র ওহীর অনুসারী হন, তবে তাঁর উম্মতের জন্য ওহীর বাইরের কোনো মানুষের রচিত বক্তব্যকে প্রাধান্য দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। যখন ওহী গৌণ হয় এবং মানুষের কথা মুখ্য হয়, তখনই দ্বীন তার বিশুদ্ধতা হারায়।

এইমের্ম আল্লাহ সু. তা. এর প্রশ্ন:

এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি আপনার কাছে যথাযথভাবে (بالحق) তিলাওয়াত করছি। সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর তারা আর কোন কথায় (হাদীসে—فَبِأَيِّ حَدِيثٍ) ঈমান আনবে? -আয়াত ৪৫:০৬


9. কুরআনি দুআ-তাসবিহ:

সত্যের ওপর দৃঢ় থাকা এবং বাতিল থেকে দূরে থাকার জন্য আল-কুরআন মাজীদ থেকে কিছু প্রাসঙ্গিক প্রার্থনা নিচে দেওয়া হলো:

১. সত্য গ্রহণের পর বিচ্যুতি থেকে বাঁচার দুআ:

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
উচ্চারণ: রব্বানা-লা-তুযিগ ক্বুলূবানা-বা‘দা ইয হাদায়তানা-ওয়াহাব লানা-মিল লাদুনকা রহমাহ; ইন্নাকা আন্তাল ওয়াহ্হা-ব।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পথপ্রদর্শন করার পর আমাদের হৃদয়গুলোকে সত্যচ্যুত করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা। (৩:০৮)

২. বাতিলের ওপর হকের বিজয়ের প্রার্থনা:

رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
উচ্চারণ: রব্বানা-আফরিগ ‘আলায়না-সবরাওঁ ওয়া ছাব্বিত আক্বদা-মানা-ওয়ানসুরনা-‘আলাল ক্বওমিল কা-ফিরীন।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের ধৈর্য দান করুন, আমাদের পদযুগল দৃঢ় রাখুন এবং সত্য অস্বীকারকারী (বাতিলপন্থী) সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন। (২:২৫০)

৩. হকের পথে অবিচল থাকার তাসবিহ:

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
উচ্চারণ: হাসবুনাল্লা-হু ওয়া নি‘মাল ওয়াকীল।
অর্থ: আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক। (৩:১৭৩)

4. মিথ্যার স্পর্শ থেকে মুক্তির প্রার্থনা:
 رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونِ
উচ্চারণ: রব্বি আ‘ঊযুবিকা মিন হামাযা-তিশ শায়াত্বী-নি ওয়া আ‘ঊযুবিকা রব্বি আইঁ ইয়াহ্দুরূন।

অর্থ: হে আমার রব! আমি শয়তানের প্ররোচনা থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আর হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি তাদের উপস্থিতি থেকে। (২৩:৯৭-৯৮)

5. সত্যের মাধ্যমে বিজয় লাভের দুআ:
رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ
উচ্চারণ: রব্বানা-আ-মান্না-বিমা-আনযালতা ওয়াত্তাবাণার রসূলা ফাকতুবনা-মা‘আশ শা-হিদীন।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি যা নাযিল করেছেন আমরা তাতে ঈমান এনেছি এবং আমরা রাসূলের আনুগত্য গ্রহণ করেছি; অতএব আমাদের সাক্ষ্যদানকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। (৩:৫৩)


رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

রব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।

অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু। (আল-কুরআন ২:১২৭, ২:১২৮)

وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post