বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আল-কুরআন মাজীদ একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যেখানে ‘পবিত্রতা’ কেবল শরীরের উপরিভাগ ধোয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বহুস্তরীয় ধারণা যা মানুষের স্থান, সম্পদ, চরিত্র এবং আত্মাকে স্পর্শ করে। আল-কুরআনের আয়াতসমূহের পারস্পরিক বিন্যাস (নজম) ও শব্দগত গাঁথুনি বিশ্লেষণ করলে পবিত্রতার এক অনন্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামো পরিলক্ষিত হয়।
নিম্নে আল-কুরআনের আলোকে ‘জুনব’ (যৌন অপবিত্রতা) অবস্থার সীমা এবং পবিত্রতা-পরিশুদ্ধির বিভিন্ন স্তর ও উপায়সমূহ ‘আহসানাল তাফসির’ (৩৯:২৩) এর আলোকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি-বিঈযনিল্লাহ!
[এছাড়াও আরও থাকছে (নিচের দিকে)-এসংক্রান্ত আরও কিছু প্রশ্ন ও উত্তর]
যেটাকে বলা হয় ফরজ গোসল: সেটা কখন-কোন পর্যায়ে প্রযোজ্য হয়?
শারীরিক অবস্থা ও অপবিত্রতা (আযান):
১. ‘জুনব’ (جُنُبًا) অবস্থার সীমা ও অনুধাবন:
সূরা আন-নিসা (৪:৪৩) এবং সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৬)-এ সালাতের পূর্বে ‘জুনব’ অবস্থায় গোসলের বিধান দেওয়া হয়েছে। কুরআন ভিত্তিক গভীর অনুধাবনে দেখা যায়, কেবলমাত্র যৌন কামনায় স্পর্শ ‘জুনব’ অবস্থা সৃষ্টি করে না।
শারীরিক মিলনের ইঙ্গিত: সূরা আন-নিসার ৪৩ নম্বর আয়াতে ‘লামাস্তুমুন নিসা’ (নারীদের স্পর্শ করা) বলতে পূর্ণাঙ্গ শারীরিক মিলনকে বোঝানো হয়েছে। এর প্রমাণ সূরা আল-ইমরানের ৪৭ নম্বর আয়াত, যেখানে মারইয়াম (সালামুন আলাইহা) বলেছিলেন, “কীভাবে আমার পুত্র হবে যখন কোনো পুরুষ আমাকে স্পর্শ (লাম ইয়ামসাসনি) করেনি?” এখানে স্পর্শ বলতে কেবল ছোঁয়া নয়, বরং সন্তান উৎপাদনের শারীরিক প্রক্রিয়াকে বোঝানো হয়েছে।
ত্বকের সাথে ত্বকের মিলন: সূরা আল-বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সু.তা. ‘মুবাসারাহ’ (مباشرة) বা ত্বকের সাথে ত্বকের গভীর সংস্পর্শকে সহবাসের রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সুতরাং, আল-কুরআনের অভ্যন্তরীণ যুক্তি অনুযায়ী, যতক্ষণ না শরীর থেকে জীবনীশক্তি (বীর্য) নির্গত হচ্ছে অথবা পূর্ণাঙ্গ মিলন ঘটছে, ততক্ষণ গোসলের বিধান কার্যকর হয় না। সাধারণ স্পর্শ আল্লাহর দেওয়া ‘সহজসাধ্যতা’ (২:১৮৫) নীতির অন্তর্ভুক্ত।
'স্পর্শ' বনাম 'শারীরিক মিলন': কুরআনিক পরিভাষার পার্থক্য:
অনেকে মনে করেন নারীর সাথে সামান্য শারীরিক স্পর্শ বা কামনার সাথে ছোঁয়া লাগলেই গোসল ফরজ হয়। কিন্তু আল-কুরআনের শব্দবিন্যাস এই ধারণাকে সমর্থন করে না। সূরা আন-নিসার ৪৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
“...আও লামাস্তুমুন নিসা...” (...অথবা যদি তোমরা নারীদের স্পর্শ করো...)।
এখানে ‘লামাস’ (لامس) শব্দটি গভীর অনুধাবনের দাবি রাখে। আল-কুরআনের অন্যান্য স্থানে ‘স্পর্শ’ বা ‘মাসা’ (مس) শব্দটিকে যৌন মিলনের রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মারইয়াম (সালামুন আলাইহা) যখন বলেছিলেন:
“কীভাবে আমার পুত্র হবে যখন কোনো পুরুষ আমাকে স্পর্শ করেনি (লাম ইয়ামসাসনি)?” (৩:৪৭)
এখানে ‘স্পর্শ না করা’ মানে কেবল হাত দিয়ে ছোঁয়া নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ যৌন মিলনকে বোঝানো হয়েছে। সুতরাং, ৪:৪৩ আয়াতে ‘নারীদের স্পর্শ করা’ বলতে সেই শারীরিক সম্পর্ককে বোঝানো হয়েছে যা বংশগতি বা প্রজননের সাথে সম্পৃক্ত এবং যা শরীরের প্রধান অঙ্গসমূহের সংস্পর্শে ঘটে। সাধারণ স্পর্শ বা কামনাবশত ছোঁয়া যদি ‘জুনব’ হওয়ার কারণ হতো, তবে সালাত ও দৈনন্দিন জীবনের পবিত্রতা রক্ষা করা মানুষের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ত, যা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের দ্বীনের সহজসাধ্য নীতির (২:১৮৫) পরিপন্থী।
পবিত্রতার সীমা নির্ধারণে সূরা আল-বাকারার ইঙ্গিত:
যৌন সম্পর্কের সীমা কতটুকু হলে তা পূর্ণাঙ্গ অপবিত্রতা হিসেবে গণ্য হবে, তা বুঝতে সূরা আল-বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আল্লাহ সু.তা. সিয়ামের রাতে স্ত্রী সহবাস বৈধ করে বলছেন:
“ফাল আনা বাশিরুহিন্না...” (এখন তোমরা তাদের সাথে সংগত হও/ত্বক স্পর্শ করো...)।
এখানে ‘মুবাসারাহ’ (مباشرة) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা ‘বাশার’ (ত্বক) থেকে এসেছে। অর্থাৎ যখন স্বামী-স্ত্রীর শরীরের ত্বক একে অপরের সাথে পূর্ণাঙ্গভাবে মিলিত হয় (intercourse), তখনই কেবল তা ‘জুনব’ অবস্থার সৃষ্টি করে। কেবলমাত্র কামনার উদ্রেক হওয়া বা অঙ্গ প্রবেশ না করিয়ে বাহ্যিক সংস্পর্শকে আল-কুরআন কোথাও ‘জুনব’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেনি।
জুনব ও ঋতুস্রাব: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ:
আল-কুরআনে শারীরিক অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য দুটি স্তর দেখা যায়। সূরা আল-বাকারার ২২২ নম্বর আয়াতে ঋতুস্রাব সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“হাত্তা ইয়াতহুরনা... ফাইযা তাতাহহারনা...” (যতক্ষণ না তারা পবিত্র হয়... অতঃপর যখন তারা ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করে...)।
এখানে ‘তাতাহহারনা’ শব্দটি গোসলের মাধ্যমে পূর্ণ পবিত্রতাকে নির্দেশ করে। ঠিক একইভাবে ৫:৬ আয়াতে জুনব অবস্থার জন্য বলা হয়েছে ‘ফাত্তাহহারু’ (فَاطَّهَّرُوا) অর্থাৎ ‘ভালোভাবে পবিত্র হও’। এই একই শব্দের ব্যবহার প্রমাণ করে যে, ঋতুস্রাব যেমন একটি শরীরবৃত্তীয় নির্গমন যা পূর্ণ ধৌতকরণ দাবি করে, তেমনি ‘জুনব’ অবস্থাও একটি পূর্ণাঙ্গ শারীরিক নির্গমনের (বীর্যপাত বা পূর্ণ সহবাস) সাথে সম্পৃক্ত। সামান্য স্পর্শ বা অনুভূতির জন্য যেখানে অজুর বিধানই যথেষ্ট হতে পারত, সেখানে পূর্ণ গোসলের নির্দেশ নির্দেশ করে যে অপবিত্রতার কারণটি হতে হবে অত্যন্ত জোরালো ও শারীরিক গভীরতাসম্পন্ন।
‘মাউন দাফিকা’ (উছলে পড়া পানি) এবং জুনব-এর জৈবিক সীমা:
আল-কুরআনের আয়াত (৮৬:৬-৭)-এ মানুষের সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে:
“খুলিকা মিম মায়িন দাফিকা। ইয়াখরুজু মিম বাইনিস সুলবি ওয়াত্তারায়িব।”
(সে সৃজিত হয়েছে সবেগে নির্গত পানি হতে, যা নির্গত হয় মেরুদণ্ড ও পঞ্জরাস্থির মধ্যস্থল থেকে)।
সালাতের নিকটবর্তী না হওয়ার যৌক্তিকতা:
আল-কুরআনের বিধানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রয়েছে। ৪:৪৩ আয়াতে সালাতের নিকটবর্তী না হওয়ার জন্য দুটি শর্ত দেওয়া হয়েছে:
১. মোহগ্রস্থ/অন্যমনস্ক বা সাইক্লোজিক্যালি ডিজঅর্ডার অবস্থা (মানসিক অসচেতনতা)।
২. জুনুব অবস্থা (শারীরিক বিশেষ অবস্থা)।
মোহগ্রস্থ ব্যক্তি যেমন তার বোধশক্তি হারিয়ে ফেলে, জুনুব অবস্থাও মানুষের শরীরে একটি বিশেষ শিথিলতা ও পরিবর্তন আনে যা থেকে উত্তরণের জন্য পানির দ্বারা পুরো শরীরকে উদ্দীপিত ও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। যদি কেবল কামনার স্পর্শেই গোসল ফরজ হতো, তবে তা মানুষের জন্য একটি ‘হারাজ’ বা সংকীর্ণতার কারণ হতো। অথচ আল্লাহ রব্বুল আলামিন ৫:৬ আয়াতের শেষে স্পষ্ট করে দিয়েছেন:
“মা ইউরিদুল্লাহু লি-ইজআলা আলাইকুম মিন হারাজ...” (আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা সৃষ্টি করতে চান না, বরং তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান...)।
এই ‘সংকীর্ণতা না রাখা’র ঘোষণাটিই প্রমাণ করে যে, 'জুনব' বা অপবিত্রতার সীমা হলো পূর্ণাঙ্গ যৌন মিলন বা বীর্যপাত। এর নিচে কোনো সাধারণ ছোঁয়া বা অপূর্ণাঙ্গ শারীরিক সংস্পর্শ গোসলের বিধানকে কার্যকর করে না।
পানির দ্বারা ‘তাতহীর’ (পবিত্রতা):
শয়তানের ‘রিজজ’ (মলিনতা) ও পানির দ্বারা ‘তাতহীর’ (পবিত্রতা)
সূরা আল-আনফালের ১১ নম্বর আয়াতে একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক ও শারীরিক সংযোগের কথা বলা হয়েছে:
“...ওয়া ইউনায্যিলু আলাইকুম মিনাস সামায়ি মাআন লি-ইউতাহহিরাকুম বিহি ওয়া ইউযহিবা আনকুম রিজযাশ শায়তানি...”
(...এবং তিনি আকাশ হতে তোমাদের ওপর পানি বর্ষণ করেন তোমাদেরকে তদ্বারা পবিত্র করার জন্য এবং তোমাদের থেকে শয়তানের অপবিত্রতা/মলিনতা দূর করার জন্য...)। (৮:১১)
যৌক্তিক সংযোগ:
এখানে ‘রিজযাশ শায়তান’ (رِجْزَ الشَّيْطَانِ) শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যৌন উত্তেজনার চরম মুহূর্তে মানুষের ওপর এক ধরণের জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক আচ্ছন্নতা তৈরি হয়, যাকে আল-কুরআন ‘শয়তানের মলিনতা’ বা অস্থিরতার সাথে তুলনা করেছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে কেবল হাত-মুখ ধোয়া (অজু) যথেষ্ট নয়, বরং ‘মা’ বা পানি দ্বারা পুরো শরীরকে ধৌত করা প্রয়োজন। এটি কেবল ময়লা পরিষ্কার নয়, বরং একটি ‘মেটাফিজিক্যাল রিসেট’ বা আধ্যাত্মিক পুনঃস্থাপন। মিলন বা বীর্যপাত ছাড়া সাধারণ স্পর্শে এই ‘রিজজ’ বা চরম অস্থিরতা তৈরি হয় না, তাই সেখানে পূর্ণ গোসলের আবশ্যকতা নেই।
‘তাতহীর’ (পুরো শরীর) বনাম ‘অজু’ (অঙ্গপ্রত্যঙ্গ):
সূরা আল-মায়িদার ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সু.তা. সালাতের প্রস্তুতির দুটি ভিন্ন পদ্ধতি একই সাথে উল্লেখ করেছেন:
অজুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট চারটি অঙ্গের কথা বলা হয়েছে।
জুনব-এর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে “ফাত্তাহহারু” (فَاطَّهَّرُوا) অর্থাৎ— ‘অতএব তোমরা (পুরো শরীর) পবিত্র করো’।
এখানে আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘ইফতিআল’ (Ifte’aal) বাব-এর ব্যবহার আধিক্য বা পূর্ণতা বোঝায়। যদি সাধারণ স্পর্শ বা উত্তেজনাই জুনব-এর কারণ হতো, তবে আল্লাহ রব্বুল আলামিন অজুর মতোই কোনো সংক্ষিপ্ত ধৌতকরণের নির্দেশ দিতেন। কিন্তু যেহেতু তিনি ‘পুরো শরীরের পূর্ণ পবিত্রতা’র নির্দেশ দিয়েছেন, এর মানে হলো এর পেছনের কারণটিও হতে হবে ‘পুরো শরীরকে প্রভাবিত করার মতো’ কোনো ঘটনা (যেমন—যৌন মিলন বা বীর্যপাত)। ক্ষুদ্র কারণে বৃহৎ বিধান আল-কুরআনের ভারসাম্যপূর্ণ ইনসাফের পরিপন্থী।
আধ্যাত্মিক সংযোগ: ‘তাদাব্বুর’ ও সারসংক্ষেপ:
স্বামী-স্ত্রীর একান্ত মুহূর্তের পর যখন ‘জুনব’ অবস্থা তৈরি হয়, তখন মানুষ তার রবের সাথে সালাতে দাঁড়ানোর যোগ্যতা সাময়িকভাবে হারায় (৪:৪৩)। এই ‘দূরত্ব’ বা ‘বিচ্ছিন্নতা’ ঘোচানোর একমাত্র উপায় হলো পানি। পানি এখানে কেবল পরিষ্কারক নয়, বরং এটি জীবনের উৎস (২১:৩০)। জীবনের উৎস দিয়ে শরীরকে ধুয়ে মানুষ পুনরায় তার ‘রব’ বা জীবনের উৎসের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
মানুষ আর কী কী কারণে অপবিত্র হতে পারে?
আল্লাহ রব্বুল আলামিন পবিত্রতাকে কেবল একটি শারীরিক ক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং তাঁর ভালোবাসা ও নেয়ামত লাভের মাধ্যম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
1. পোশাক ও বাহ্যিক আবরণের পবিত্রতা:
সূরা আল-মুদ্দাসসির (৭৪:৪): (রাসূল সালামুন আলাইহে-কে দেওয়া প্রাথমিক নির্দেশনাবলির একটি)
"এবং আপনার পোশাক পরিচ্ছদ পবিত্র রাখুন। এবং যাবতীয় অপবিত্রতা/আবর্জনা (Rujz) বর্জন করুন/আপত্তিকর কাজ থেকে দূরে থাক। (সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৪-৫)
কুরআনে সরাসরি 'নখ কাটুন' বাক্যটি না থাকলেও, অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক অর্থবোধক একটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের শরীরের সকল অপ্রয়োজনীয় ও বর্জ্য অংশ দূর করাকে নিশ্চিত করে। সূরা হজ্জের ২৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন:
"ثُمَّ لْيَقْضُوا تَفَثَهُمْ..." (ছূম্মাল্ ইয়াক্বদূ- তাফাছাহুম...)
"অতঃপর তারা যেন তাদের শরীরের ময়লা/অপ্রয়োজনীয় অংশ (Tafath) দূর করে..." (সূরা হজ্জ ২২:২৯)
অনুধাবন:
এই আয়াতটি সরাসরি সূরা হজ্জের ২২:২৯ আয়াতের ‘তাফাছ’ (তৈরি হওয়া ময়লা) দূর করার নির্দেশের সাথে একটি পারফেক্ট কুরআনি পাজল তৈরি করে। অর্থাৎ, ‘রুজয’ (আবর্জনা) বর্জন করা = ‘তাফাছ’ (শারীরিক ময়লা/বাড়তি নখ-চুল) দূর করা।
‘তাদাব্বুর’ এর আলোকে আরবি "থিয়াব" (ثِيَاب) বা পোশাক বলতে কেবল পরিধেয় বস্ত্রকেই বোঝায় না, বরং মানুষের ‘শরীর’ হলো আত্মার সবচেয়ে নিকটের ‘পোশাক’। আর "রুজয" (رُجْز) মানে হলো যাবতীয় বাহ্যিক ও আত্মিক অপবিত্রতা ও ময়লা। বর্ধিত নখ বা অপ্রয়োজনীয় চুলে যে জীবাণু ও ময়লা (Filth) জমে, তা আক্ষরিক অর্থেই ‘রুজয’। সুতরাং, এই আয়াতের ‘ইমপ্লাইড এভিডেন্স’ হলো— শরীরের বাড়তি নখ ও চুল কেটে নিজের দৈহিক পোশাককে (Body-garment) পবিত্র ও পরিপাটি রাখা।
➥ চুল কাটা ও ছাঁটার কুরআনি সামঞ্জস্যতা: দ্র: আয়াত ২:১৯৮, ৪৮:২৭,৩০:৩০
2. আল্লাহর নেয়ামত পূর্ণ করার মাধ্যম হিসেবে পবিত্রতা:
সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৬)-এর শেষাংশ: (সালাত, অজু ও গোসলের বিধান দেওয়ার পর আল্লাহ এই ঘোষণা দিয়েছেন)
আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা (কষ্ট) সৃষ্টি করতে চান না; বরং তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের প্রতি তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করতে চান, যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।
3. ওহী বা আসমানী কিতাবের পবিত্রতা (Purity of Revelation):
সূরা আল-বাইয়্যিনাহ (৯৮:২): আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রাসূল (সালামুন আলাইহে), যিনি পাঠ করেন পবিত্র সহীফাসমূহ (সুহুফাম মুতাহহারাহ)।
4. গৃহ ও উপাসনালয়ের পবিত্রতা (Spatial Purity):
সূরা আল-বাকারাহ (২:১২৫): আর আমি ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে) ও ইসমাইল (সালামুন আলাইহে)-কে আদেশ দিয়েছিলাম যে, তোমরা আমার ঘরকে (কাবা) তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।
5. সম্পদ ও নফসের পবিত্রতা (জাকাত ও সাদাকাহ):
সূরা আত-তাওবাহ (৯:১০৩): আপনি তাদের সম্পদ থেকে সাদাকাহ গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র (তুতাহহিরুহুম) করবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ (তুযাক্কীহিম) করবেন।”
6. চারিত্রিক ও সম্পর্কের পবিত্রতা (Purity of Character & Relations):
সূরা আন-নূর (২৪:২৬): পবিত্র নারীগণ পবিত্র পুরুষদের জন্য এবং পবিত্র পুরুষগণ পবিত্র নারীদের জন্য।”
7. পাপাচার ও শিরক থেকে পবিত্রতা (Moral & Spiritual Purity):
সূরা আল-মুদ্দাসসির (৭৪:৫) ও সূরা আল-হাজ্জ (২২:৩০): “আর সকল প্রকার অপবিত্রতা/মূর্তি থেকে দূরে থাকুন।” “সুতরাং তোমরা পরিহার করো মূর্তিদের অপবিত্রতা (রিজস) এবং পরিহার করো মিথ্যা কথা।” (২২:৩০)
8. জান্নাতীদের জন্য চূড়ান্ত পবিত্রতা (Ultimate Eternal Purity):
সূরা আল-বাকারাহ (২:২৫): “এবং সেখানে (জান্নাতে) তাদের জন্য থাকবে পরম পবিত্র জীবনসঙ্গী (আযওয়াজুম মুতাহহারাতু।”
9. খাদ্যের অপবিত্রতা (রিজস):
বলুন! আমার কাছে যা ওহী পাঠানো হয়েছে তাতে আমি মানুষের জন্য হারাম কিছু পাই না— মৃত জন্তু, প্রবাহিত রক্ত ও শুকরের মাংস ছাড়া; কারণ নিশ্চয়ই এগুলো অপবিত্র (রিজস)। (সূরা আল-আন’আম ৬:১৪৫)
তদাব্বুর: এখানে বাহ্যিক ও বস্তুগত অপবিত্রতাকে ‘রিজস’ বলা হয়েছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
10. আচরণগত ও বস্তুগত অপবিত্রতা (রিজস):
ওহে যারা ঈমান এনেছ! প্রকৃতপক্ষে মদ ও জুয়া ও পূজার বেদী এবং ভাগ্য নির্ধারক তীর শয়তানের কাজের অন্তর্ভুক্ত এক ঘৃণ্য বিষয় (রিজস)। সুতরাং সেসব থেকে দূরে থাক, যেন তোমরা সফল হও। -সূরা আল-মায়েদাহ ৫:৯০
11. মুশরিকদের সামগ্রিক সত্ত্বাকে ‘অপবিত্র’ ঘোষণা:
আল্লাহ সু.তা. সূরা আত-তাওবাহ-তে স্পষ্টভাবে মুশরিকদের অপবিত্র বা নাপাক বলেছেন- “নিশ্চয়ই মুশরিকরা (আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপনকারীরা) তো কেবলই অপবিত্র (নাজাস')”-৯:২৮ (৯:১৭)
অনুধাবন: এখানে 'নাজাস' (نَجَس) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হলো এমন অপবিত্রতা যা সত্ত্বাগত। অর্থাৎ শিরক মানুষের মন, চিন্তা এবং আত্মাকে এমনভাবে কলুষিত করে দেয় যে, বাহ্যিক পানি দিয়ে ধুয়ে এই অপবিত্রতা দূর করা যায় না। শিরক হলো সবচেয়ে বড় ‘অশুদ্ধতা’।
12. ওহীর বাইরে মনগড়া বিধান রচনা করাও শিরক এবং ‘রিজস’ (অপবিত্রতা):
আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বাইরে নিজেদের পক্ষ থেকে হালাল-হারামের নিয়ম তৈরি করা বা অন্য কারো বিধানকে ঐশী বিধানের সমতুল্য করাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত। সূরা আশ-শূরা এবং সূরা আল-আ’রাফে এর প্রমাণ মেলে:
তবে কি তাদের এমন কিছু শরীক (উপাস্য/নেতা) আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান দিয়েছে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?” (৪২:২১)
যৌক্তিক সংযোগ: এই আয়াতে আল্লাহর ওহীর বাইরে মনগড়া দ্বীনের বিধান দেওয়া বা গ্রহণ করাকে সরাসরি 'শিরক' (شُرَكَاء) বা অংশীদারিত্ব বলা হয়েছে। আর এই ধরণের মনগড়া রীতিনীতিকে আল-কুরআন সূরা আল-আ’রাফে 'রিজস' (رِجْس) বা অপবিত্রতা এবং ক্রোধের কারণ বলে উল্লেখ করেছে:
(হূদ সালামুন আলাইহে বলেছিলেন) “তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর অপবিত্রতা/শাস্তি (রিজস) ও ক্রোধ আপতিত হওয়া তো নির্ধারিতই হয়ে গেছে।” (৭:৭১)
13. একমাত্র সত্যের সাথে (আল কুরআনের সাথে) অসত্যের মিশ্রণ করাও এক ধরণের অপবিত্রতা:
আল্লাহর বিশুদ্ধ বিধান বা ওহীর সাথে যখন মানুষের মনগড়া কথা মিশ্রিত করা হয়, তখন বিধানের সেই বিশুদ্ধতা বা ‘তাতহীর’ নষ্ট হয়ে যায়। সূরা আল-বাকারায় আল্লাহ বলেন:
এবং তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনেশুনে সত্যকে গোপন করো না-২:৪২
আধ্যাত্মিক অনুধ্যান: আল-কুরআন হচ্ছে ‘সুহুফাম মুতাহহারাহ’ (পবিত্র সহীফাসমূহ—৯৮:২)। যখনই এর সাথে মানুষের ওহী-বহির্ভূত কোনো উক্তি বা বিধানকে যুক্ত করা হয়, তখনই সেই পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হয়। এটি মানসিক ও আদর্শিক অপবিত্রতা।
14. ওহী বিমুখদের ওপর আল্লাহ ‘অপবিত্রতা’ চাপিয়ে দেন:
যারা আল্লাহর একমাত্র নাযিলকৃত ওহীকে বাদ দিয়ে নিজেদের খেয়াল-খুশি বা বাপ-দাদার প্রাচীন প্রথাকে আঁকড়ে ধরে জ্ঞান খাটাতে চায় না, আল্লাহ তাদের ওপর অপবিত্রতা লেপে দেন।
এবং যারা জ্ঞান প্রয়োগ করে না, আল্লাহ তাদের ওপর অপবিত্রতা/কলঙ্ক (রিজস) চাপিয়ে দেন।” (১০:১০০)
সিদ্ধান্ত ও সারসংক্ষেপ:
আল-কুরআনের দৃষ্টিতে অপবিত্রতা মূলত দুই প্রকার:
১. বাহ্যিক অপবিত্রতা (Physical Impurity): যা পানি বা মাটি দিয়ে ধুয়ে পবিত্র করা যায় (যেমন—জুনব অবস্থা বা সাধারণ ময়লা)।
২. অভ্যন্তরীণ বা আদর্শিক অপবিত্রতা (Spiritual & intellectual impurity): যা শিরক এবং আল্লাহর ওহীর সাথে মানুষের তৈরি আইনের সংমিশ্রণের ফলে তৈরি হয়। একে কুরআন 'নাজাস' বা 'রিজস' বলেছে।
অতএব, শুধুমাত্র আল্লাহর বিধানকে মেনে নেওয়া এবং ওহীর বাইরে মানুষের মনগড়া মনস্তত্ত্বকে ধর্মের অংশ না করাই হলো আত্মার চূড়ান্ত পবিত্রতা।
সফলতার চাবিকাঠি হিসেবে আত্মশুদ্ধি:
সূরা আল-আ’লা (৮৭:১৪) ও সূরা আশ-শামস (৯১:৯): “নিশ্চয়ই সফলকাম হয়েছে সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে (আফলাহা মান তাযাক্কা
“অবশ্যই সে সফল হয়েছে, যে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে।”
অনুধাবন ও সমন্বয়:
আল-কুরআন মাজীদের এই আয়াতসমূহ বিশ্লেষণ করলে পবিত্রতার একটি সমন্বিত চিত্র ফুটে ওঠে:
১. তাতহীর (طهارة): বাহ্যিক ধৌতকরণ ও পরিচ্ছন্নতা (২:১২৫, ৫:৬)।
২. তাজকিয়াহ (تزكية): সম্পদ ও মনের কালিমা দূর করে উৎকর্ষ সাধন (৯:১০৩, ৯১:৯)।
৩. ত্বায়্যিব (طيب): পবিত্রতার চূড়ান্ত নির্যাস, যা একজন মানুষকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র করে তোলে (২৪:২৬)।
উপসংহার:
আল-কুরআনের দৃষ্টিতে পবিত্রতা কেবল একটি যান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। ৫:৬ আয়াতে বর্ণিত গোসল বা অজুর বিধান আসলে মানুষের জন্য আল্লাহর নেয়ামত পূর্ণ করার একটি মাধ্যম। যখন কোনো মানুষ ‘জুনব’ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্রতা অর্জন করে, সে আসলে তার নফসকে আল্লাহর সান্নিধ্যে দাঁড়ানোর যোগ্য করে তোলে। এটিই হলো স্রষ্টার সান্নিধ্যে যাওয়ার একমাত্র প্রশস্ত পথ।
‘FAQ’ বা ‘সচরাচর জিজ্ঞাসিত
প্রশ্ন’: আল-কুরআনের আলোকে 'জুনব' ও পবিত্রতা: সাধারণ জিজ্ঞাসা ও উত্তরমালা:
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে
সাধারণ পাঠকদের মনে যেসব কৌতূহল বা প্রশ্নের উদয় হতে পারে, তার ভিত্তিতে একটি সুশৃঙ্খল
প্রশ্নমালা নিচে তুলে ধরা হলো। এই প্রশ্নগুলো যেমন মানুষের সংশয় দূর করতে সাহায্য করবে,
তেমনি আল-কুরআনের গভীরতর জ্ঞান অন্বেষণে তাদের আগ্রহী করে তুলবে।
প্রশ্ন ১: 'জুনব' বা
নাপাকি অবস্থা বলতে আল-কুরআন আসলে কী বোঝাতে চায়?
উত্তর: 'জুনব' শব্দটি 'পার্শ্ব' বা 'বিচ্ছিন্নতা' থেকে এসেছে। এটি এমন
একটি শারীরিক ও মানসিক অবস্থা যা মানুষকে তার স্বাভাবিক পবিত্র অবস্থা থেকে সাময়িকভাবে
বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আল-কুরআনের ৪:৪৩ এবং ৫:৬ আয়াত অনুযায়ী, এটি একটি বিশেষ অবস্থা
যার পর সালাতে দাঁড়ানোর আগে পূর্ণ শরীর ধৌত করা (গোসল) আবশ্যক।
প্রশ্ন ২: কেবল কামনার
সাথে স্ত্রীকে স্পর্শ করলে বা চুম্বন করলে কি গোসল ফরজ হয়?
উত্তর: আল-কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ স্পর্শে গোসল ফরজ হয় না। সূরা
আল-বাকারার ১৮৭ আয়াতে 'লিবাস' (পোশাক) এবং 'মুবাসারাহ' (ত্বকের গভীর মিলন)-এর
মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। 'জুনব' অবস্থা কেবল তখনই তৈরি হয় যখন শারীরিক সম্পর্ক
পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয় (Intercourse) অথবা বীর্যপাত ঘটে। সাধারণ ভালোবাসা বা কামনাময়
স্পর্শে গোসলের বিধান কার্যকর হওয়ার কোনো প্রত্যক্ষ দলিল আল-কুরআনে নেই।
প্রশ্ন ৩: ৪:৪৩ আয়াতে
‘নারীদের স্পর্শ করা’ (লামাস্তুমুন নিসা) বলতে কি হাতের স্পর্শ বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: না। আল-কুরআনের অন্য আয়াতে (যেমন—৩:৪৭) ‘স্পর্শ’ (মাসা) শব্দটিকে
যৌন মিলনের রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং, এখানে ‘স্পর্শ’ বলতে সেই শারীরিক
সম্পর্ককে বোঝানো হয়েছে যা বংশগতি বা প্রজননের সাথে সম্পৃক্ত। কেবল হাতের স্পর্শ
বুঝালে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে পবিত্রতা রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন ও সংকীর্ণ হয়ে
পড়ত, যা আল্লাহর দেওয়া ‘দ্বীনের সহজসাধ্যতা’ (৫:৬) নীতির বিরোধী।
প্রশ্ন ৪: স্বামী-স্ত্রীর
সম্পর্কের ক্ষেত্রে গোসলের ‘সীমানা’ বা ‘লিমিট’ কতটুকু?
উত্তর: আল-কুরআনের সৃষ্টিতাত্ত্বিক বর্ণনা (৮৬:৬-৭) এবং ‘মুবাসারাহ’
শব্দের প্রয়োগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যখন বীর্য নির্গত হয় (মাউন দাফিকা) অথবা
যখন স্বামী-স্ত্রীর ত্বক একে অপরের সাথে পূর্ণাঙ্গভাবে মিলিত হয়ে যৌন উত্তেজনাকে
চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়, তখনই কেবল গোসলের বিধান কার্যকর হয়। এর নিচে যে কোনো
অবস্থান ‘জুনব’ হিসেবে গণ্য হওয়ার মতো জোরালো নয়।
প্রশ্ন ৫: কেন জুনব
অবস্থায় অজুর পরিবর্তে পুরো শরীর ধোয়ার (গোসল) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?
উত্তর: আল-কুরআন বলছে, যৌন মিলনের চরম উত্তেজনার সময় শরীরে এক ধরণের
‘রিজজ’ বা অস্থিরতা/মলিনতা (৮:১১) তৈরি হয়। এই অবস্থা শরীরের প্রতিটি অংশকে প্রভাবিত
করে। তাই কেবল অজুর নির্দিষ্ট চারটি অঙ্গ ধোয়া যথেষ্ট নয়; বরং পুরো শরীরের স্নায়বিক
ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও পবিত্রতা অর্জনের জন্য ‘ফাত্তাহহারু’ বা পূর্ণ ধৌতকরণের
নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন ৬: যদি পানি
পাওয়া না যায় বা শারীরিক অসুস্থতার কারণে গোসল করা সম্ভব না হয়, তবে জুনব অবস্থায় করণীয়
কী?
উত্তর: আল্লাহ সু.তা. অত্যন্ত দয়ালু। আল-কুরআনের ৪:৪৩ আয়াতে স্পষ্ট বলা
হয়েছে, যদি তোমরা অসুস্থ হও বা পানি না পাও, তবে ‘তায়াম্মুম’ করো (পবিত্র মাটি
দিয়ে মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করো)। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ আমাদের জন্য দ্বীনকে
সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।
প্রশ্ন ৭: কামনাবশত
স্পর্শ করার পর যদি বীর্যপাত না হয়, তবে কি কেবল অজু করলেই সালাত পড়া যাবে?
উত্তর: যদি কোনো তরল নির্গত না হয় এবং পূর্ণাঙ্গ মিলন না ঘটে, তবে ব্যক্তি
‘জুনব’ হয়নি। এমতাবস্থায় সালাতের জন্য আল-কুরআনের নির্ধারিত নিয়মে (মুখ, হাত ও
পা ধোয়া এবং মাথা মাসেহ করা) অজু করাই যথেষ্ট। তবে বীর্যপাত ঘটলে অবশ্যই গোসল
করতে হবে।
প্রশ্ন ৮: এই বিধানগুলো
কি কেবল পুরুষদের জন্য নাকি নারীদের জন্যও সমান?
উত্তর: আল-কুরআনের এই পবিত্রতার বিধানসমূহ নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমানভাবে
প্রযোজ্য। সূরা আল-বাকারার ২২২ ও ৫:৬ আয়াতে পবিত্রতা অর্জনের যে মূলনীতি দেওয়া
হয়েছে, তা লিঙ্গভেদে আলাদা নয়; বরং উভয়ের জন্যই ‘তাতহীর’ বা পূর্ণ পবিত্রতা অর্জনের
নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পবিত্রতা কি শুধুই বাহ্যিক বা শাররীক? জীবদ্দশায় কুরআন স্টাডিতে অনুসরন অনুকরন হিসাবে না নেওয়া কী অপবিত্রতা নয়?
উত্তর খুজঁন এখানেও পাবেন।
অনুধ্যানমূলক সমাপ্তি:
এই প্রশ্নমালার উদ্দেশ্য
হলো মানুষকে প্রথাগত অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে আল-কুরআনের যৌক্তিক ও সহজ বিধানের দিকে
আহ্বান করা। আল্লাহ রব্বুল আলামিন চান মানুষ যেন পবিত্র হয়, কিন্তু সেই পবিত্রতার পদ্ধতি
যেন মানুষের জন্য ‘হারাজ’ বা অসহনীয় কষ্টের কারণ না হয়। (দ্র: আয়াত ৫:৬ শেষাংশ)
“আল্লাহ তোমাদের জন্য
সহজ করতে চান, তোমাদের জন্য কঠিন করতে চান না।” (২:১৮৫)
পবিত্রতা-পরিশুদ্ধতায় কুরআনি যিকির ও তাসবিহ:
অনুধাবনের সাথে এই আয়াতসমূহ পাঠ করলে আত্মিক প্রশান্তি অর্জিত হয়:
৯:১০৮ শেষাংশ: وَٱللَّهُ يُحِبُّ ٱلْمُطَّهِّرِينَ
(বাংলা উচ্চারণ: ওয়াল্লাহু ইউহিব্বুল মুত্তাহহিরীন)
অর্থ: আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।
২:২২২ শেষাংশ: إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلتَّوَّٰبِينَ وَيُحِبُّ ٱلْمُتَطَهِّرِينَ
(বাংলা উচ্চারণ: ইন্নাল্লাহা ইউহিব্বুত তাওয়াবিনা ওয়া ইউহিব্বুল মুতাতাহহিরীন)
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং তিনি পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।
৪:৪৩ শেষাংশ: إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَفُوًّا غَفُورًا
(বাংলা উচ্চারণ: ইন্নাল্লাহা কানা ‘আফুউওয়ান গাফূরা)
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম মার্জনাকারী ও অতিশয় ক্ষমাশীল।
“সুবহানাল্লাহি আম্মা ইউশরিকূন” (তারা আল্লাহর সাথে যা শিরক করে, তা থেকে আল্লাহ কতই না পবিত্র!) (৫২:৪৩)
৩৭:১৮০-১৮২:
سُبْحَٰنَ رَبِّكَ رَبِّ ٱلْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ، وَسَلَٰمٌ عَلَى ٱلْمُرْسَلِينَ، وَٱلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ
সুবহানা রাব্বিকা রাব্বিল ইযযাতি আম্মা ইয়াসিফুন, ওয়া সালামুন আলাল মুরসালীন, ওয়াল হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন!
অর্থ: আপনার প্রতিপালক, যিনি সম্মানের অধিকারী, তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে তিনি পবিত্র। আর শান্তি বর্ষিত হোক রাসূলগণের ওপর। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির প্রতিপালক।
সমাপ্তি দুআ:
রাব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাতান, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব।”
(হে আমাদের রব! আমাদের হেদায়েত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরকে সত্যচ্যুত করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন; নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা।) (৩:৮)