কেন নিকটাত্মীয়ের পরিচয় জানা আমাদের জন্য অপরিহার্য?
আল কুরআন মাজীদের বিধানে ‘নিকটাত্মীয়’ বা ‘জিল কুরবা’-র পরিচয় নিছক কোনো পারিবারিক পরিচিতি নয়, বরং এটি একটি রূহানি ও তাত্ত্বিক অগ্রাধিকারের মানদণ্ড। কেন একজন মুমিনের জন্য এই পরিচয়টি বিশুদ্ধভাবে জানা জরুরি, তার কারণগুলো কুরআনিক বিন্যাস থেকেই স্পষ্ট হয়:➤ দান-সাদাকার প্রথম খাত: ইসলামের অর্থনৈতিক বন্টন ব্যবস্থায় নিকটাত্মীয়দের স্থান সবার উপরে। আল-বির্র বা প্রকৃত পুণ্যের বর্ণনায় আল্লাহ সু.তা. সম্পদের ব্যয়ের ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়কে (জিল কুরবা) তালিকার শীর্ষে রেখেছেন (২:১৭৭)।
➤ সদাচরণ ও ইহসানের ক্ষেত্র: আল্লাহর ইবাদতের পর যে ‘ইহসান’ বা সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে পিতা-মাতার ঠিক পরেই নিকটাত্মীয়ের অবস্থান (৪:৩৬, ২:৮৩)।
➤ কেবলমাত্র নাযিলকৃত অহীর বার্তা বা আয়াত (দিশারী বার্তা-উপদেশ) পৌঁছানোর কেন্দ্রবিন্দু: সত্যের বার্তা প্রচারের ক্ষেত্রেও নিকটাত্মীয়রাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন মুহাম্মাদ (সালামুন আলাইহে)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন— “আর আপনি আপনার নিকটতম আত্মীয়দের (আশিরাতিকাল আকরাবীন) সতর্ক করুন” (২৬:২১৪)।
সুতারং, কার কাছে নাযিলকৃত কুরআনের আয়াত সবার আগে পৌঁছাতে হবে, কার সাথে সদাচরণ বাধ্যতামূলক এবং সম্পদের প্রথম অংশ কার প্রাপ্য—এই বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে পালনের জন্য আল কুরআনের আলোকে নিকটাত্মীয়ের তালিকা ও সংজ্ঞা জানা অত্যন্ত জরুরি।
আল কুরআন মাজীদের আলোকে ‘নিকটাত্মীয়’ বা ‘জিল কুরবা’-কে বা কারা?
—মুমিন জীবনের উপরোক্ত মৌলিক ইবাদতগুলো পালনে নিকটাত্মীয়ের নির্ভুল পরিচয় জানা অপরিহার্য।নিচে আল কুরআন মাজীদের আয়াতসমূহের (বিশেষ করে ২:৮৩, ৪:১১-১২, ৪:২৩, ৪:৩৬, ২৪:৬১, ২৫:৫৪, ৩৩:৫০) শব্দগত সামঞ্জস্য ও অভ্যন্তরীণ সংযোগ বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিকটাত্মীয়ের একটি সুসংগত ও চূড়ান্ত তালিকা উপস্থাপন করা হলো।
১. নিকটাত্মীয়ের ভিত্তি:
নাসাব (বংশ সম্পর্কিত)
ও
সিহর (বৈবাহিক বন্ধন সম্পর্কিত)
“আর তিনিই পানি থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি তাকে বংশগত (নাসাবান) ও বৈবাহিক (সিহরান) আত্মীয়তায় স্থাপন করেছেন...” (২৫:৫৪)
এই আয়াতটি হলো নিকটাত্মীয়ের সংজ্ঞার ‘মাদার আয়াত’। অর্থাৎ সম্পর্কের সকল শাখা এই দুটি মূল উৎস থেকেই নির্গত হয়।
২. আল কুরআনের আলোকে নিকটাত্মীয়ের সুসংগত তালিকা:
কুরআনের বিভিন্ন আয়াত সমন্বয় করলে নিকটাত্মীয়ের যে পূর্ণাঙ্গ কাঠামো পাওয়া যায়, তা নিম্নরূপ:ক) উর্ধ্বতন ও নিম্নতন বংশধারা (অস্তিত্বের শিকড়):
১. পিতা ও মাতা (আল-ওয়ালিদাইন): সম্পর্কের মূল কেন্দ্র। কুরআন মাজীদে নিকটাত্মীয়ের সকল তালিকায় তাদের নাম শীর্ষে (৪:৩৬, ২:৮৩)।
৩. পিতৃপুরুষ (আবাবিকুম): দাদা-দাদি, নানা-নানি প্রমুখ উর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ (১২:৩৮)।
খ) রক্তের পার্শ্ববর্তী বংশধারা (Collateral Blood Relatives):
৪. সহোদর ও সৎ ভাই-বোন (আল-ইখওয়ান ও আল-আখওয়াত): আল কুরআনের উত্তরাধিকার (৪:১২, ৪:১৭৬) এবং বিয়ের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত আয়াতে (৪:২৩) সহোদর এবং সৎ (একই পিতা বা একই মাতার সন্তান) ভাই-বোনদের সরাসরি ‘নিকটাত্মীয়’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।গ) বৈবাহিক সম্পর্কজাত আত্মীয় (সিহর):
৭. স্বামী বা স্ত্রী (আযওয়াজ): বৈবাহিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি, যাদের মাধ্যমে দুটি ভিন্ন ‘নাসাব’ (বংশ) প্রশান্তি ও করুণার (রহমাত) বন্ধনে আবদ্ধ হয় (৩০:২১)।৮. বৈবাহিক বন্ধনজনিত পবিত্র আত্মীয়গণ (in-laws): সূরা আন-নিসার ২৩ নম্বর আয়াতের আলোকে যারা চিরস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ (মুহাররাম), যেমন-
✓ শ্বশুর ও শাশুড়ি (উম্মাহাতু নিসায়িকুম)।
✓ পুত্রবধূ (হালায়িলু আবনায়িকুম)।
✓ সৎ মেয়ে (রাবায়িবুকুম—যারা স্ত্রীর পূর্বতন ঘরের সন্তান)।
৯. বৈবাহিক সূত্রের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় (Brother/Sister-in-law):
ঘ) রূহানি বা বিশেষ বন্ধন (দুধ-সম্পর্ক):
১০. দুধ-মা ও দুধ-বোন: আল কুরআন মাজীদ রক্তের সম্পর্কের বাইরে কেবল এই একটি শ্রেণীকে রক্তের আত্মীয়ের মতো মর্যাদা দিয়েছে (৪:২৩)। এটি নির্দেশ করে যে, সম্পর্কের ভিত্তি কেবল জন্ম নয়, বরং পুষ্টি ও লালন-পালনও নিকটাত্মীয়তার একটি সূক্ষ্ম কারণ।অনুধ্যানমূলক বিশ্লেষণ: ‘জিল কুরবা’ (নৈকট্যসম্পন্ন) এবং ‘উলুল আরহাম’ (রক্তের সম্পর্কের অধিকারী):
আল কুরআনের দর্পণে ‘রহম’ (জরায়ু) ও ‘আয়াত’: একটি গভীর অনুধ্যানমূলক বিশ্লেষণ:
১. ‘রহম’ (জরায়ু) ও ‘রহমত’: সম্পর্কের ঐশী উৎস
রক্তের সম্পর্কের নাম ‘আরহাম’:
ভাই-বোনের শেকড়:
“...আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও এবং
২. ‘আয়াত’ হিসেবে মানুষ ও কিতাব:
সৃষ্টিজগতের নিদর্শন, এমনকি খোদ মানুষকেও ‘আয়াত’ বলা হয় (৫১:২০-২১)।
আল কুরআন মাজীদে ‘রহম’ (জরায়ু) শব্দটি কেবল একটি অঙ্গের নাম নয়, বরং এটি স্রষ্টার দয়া ও মানুষের সম্পর্কের সেতুবন্ধন। ভাই-বোনের রক্তের সম্পর্ক এই ‘রহম’-এর কারণেই এতো পবিত্র। অন্যদিকে, আল কিতাবের আয়াতসমূহ ‘উম্মুল কিতাব’ (জননী কিতাব) থেকে উৎসারিত হয়ে আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, যেভাবে একজন সন্তান তার মায়ের জরায়ু থেকে জীবন লাভ করে।
আহলে পরিবার/ আহলে বাইত/ আহলে কিতাব : ‘আহল’ পরিভাষার তিন স্তর:
আল কুরআনের আলোকে ‘আহল’ বা অন্তর্ভুক্তির তিনটি প্রধান স্তর নিম্নরূপ:
১. আহলে পরিবার (আহলিহি/আহলিকুম): যারা একই ছাদের নিচে বসবাস করে এবং যাদের জাগতিক ও পরকালীন সুরক্ষার দায়িত্ব অভিভাবকের ওপর থাকে (৬৬:৬, ২৮:২৯)।
২. আহলে বাইত (ঘরের সদস্য): বিশেষ করে নবী (সালামুন আলাইহে)-এর পরিবার, যাদের আল্লাহ বিশেষভাবে পবিত্র করেছেন (৩৩:৩৩)।
৩. আহলে কিতাব (কিতাবপ্রাপ্ত জাতি): যারা আসমানী কিতাবের অনুসারী হিসেবে মুমিনদের সাথে একটি রূহানি ও ঐতিহাসিকভাবে সম্পৃক্ত (৩:৬৪, ৫:৫)।
‘আহলে পরিবার’ (Ahl): সদস্য ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ:
১. ‘আহল’ বা পরিবারের সদস্যদের তালিকা (কুরআনিক কাঠামোর ভিত্তিতে):
ক) জীবনসঙ্গিনী (আযওয়াজ/স্ত্রী):
“যখন মুসা আগুন দেখলেন, তখন তিনি তাঁর
এখানে ‘আহল’ দ্বারা সরাসরি তাঁর স্ত্রীকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং আহলে পরিবারের প্রধানতম সদস্য হলেন স্ত্রী।
খ) সন্তান-সন্ততি (আউলাদ):
“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেকে এবং তোমাদের
এখানে সন্তানদের রক্ষা ও সুশিক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা তাদের ‘আহল’-এর অন্তর্ভুক্ত করে।
গ) ভাই ও বোন (ইখওয়ান/আখাওয়াত):
“আর আমার
এখানে রক্তের সম্পর্কের বাইরেও কর্মক্ষেত্রে বা মিশনে সহযোগিতার ভিত্তিতে ভাইকে ‘আহলে পরিবার’-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ঘ) পিতা-মাতা (ওয়ালিদাইন):
“...এবং তোমাদের
এখানে তাঁর পিতা-মাতাসহ পুরো গোষ্ঠীকেই ‘আহলে পরিবার’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
২. আহল হওয়ার আবশ্যিক শর্ত: ঈমান ও সৎকর্ম:
“তিনি (আল্লাহ) বললেন: হে নূহ! সে তোমার
৩. আহলে পরিবারের স্বরূপ: পারস্পরিক নিরাপত্তা ও পবিত্রতা:
“হে আহলে বাইত (পরিবারের সদস্যগণ)! আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পবিত্র করতে” (৩৩:৩৩)।
৪. বিশ্বাসী বনাম অবিশ্বাসী আহল: বিপরীতমুখী চিত্র-
৫. একটি যৌক্তিক পূর্ণতা: আল কুরআনের বিশ্লেষণে ‘আহলে পরিবার’ হলো এমন একটি দল যারা:
আহলে কিতাব:
আল কুরআন মাজীদের আলোকে ‘আহল’ (Ahl) পরিভাষার বিস্তার: ‘আহলে পরিবার’ থেকে ‘আহলে কিতাব’
১. ‘আহলে কিতাব’: আসমানী উত্তরাধিকারের বন্ধন:
“আর তোমরা আহলে কিতাবদের সাথে উত্তম পন্থা ব্যতীত বিতর্ক করো না... এবং বলো: আমরা ঈমান এনেছি আমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তার ওপর। আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ তো একই...” (২৯:৪৬)।
২. ‘আহল’ পরিভাষার রূহানি ও তাত্ত্বিক ঐক্য:
“যাদের আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে (ইয়াতলুনাহু হাক্কা তিলাওয়াতিহি); তারাই এর ওপর ঈমান রাখে।”
৩. ‘আহলে কিতাব’ ও মুমিনদের মধ্যকার ‘সাওয়া’ (সাধারণ ঐক্য):
“বলুন! হে আহলে কিতাব! এসো সেই কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান (কালিমাতিন সাওয়া’ইন)—যেন আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত না করি...” (৩:৬৪)।
আল কুরআনের প্রজ্ঞায় ‘আহল’ হলো একটি
ঈমানী ভ্রাতৃত্ব: আধ্যাত্মিক ও বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ব: ঈমানী সম্পর্ক:
আল কুরআন মাজীদ কেবল রক্ত বা বৈবাহিক বন্ধনকেই আত্মীয়তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেনি, বরং এটি ‘ঈমান’ বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে এক সুমহান বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের (Universal brotherhood) কাঠামো প্রদান করেছে। এই সম্পর্কটি ‘জিল কুরবা’-র শারীরিক সীমানা ছাড়িয়ে একটি রূহানি বা আধ্যাত্মিক উচ্চতায় উন্নীত হয়। কুরআন মাজীদের ভাষায়, পৃথিবীর সমস্ত মুমিন নারী ও পুরুষ একে অপরের পরম আত্মীয় ও বন্ধু।নিচে আল কুরআনের আয়াতের আলোকে এই আধ্যাত্মিক সম্পর্কের বিশ্লেষণমূলক উপস্থাপনা করা হলো:
১. ঈমানী ভ্রাতৃত্ব: একটি ঘোষণা (The declaration of Brotherhood):
আল্লাহ রব্বুল আলামিন সূরা আল-হুজুরাতে মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্কের যে ভিত্তি ঘোষণা করেছেন, তা পৃথিবীর যেকোনো বংশীয় সম্পর্কের চেয়েও দৃঢ়। ইরশাদ হয়েছে:
“মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই ভাই (ইন্নামাল মু’মিনুনা ইখওয়াতুন); সুতরাং তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করো...” (৪৯:১০)
এখানে ‘ইখওয়াহ’ (إِخْوَةٌ) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে ঈমানের বন্ধন মানুষের মাঝে এমন এক অভিন্ন সত্তা তৈরি করে, যা রক্তের ভাইদের মতোই গভীর। এই সম্পর্কের কারণে একজন মুমিনের দুঃখ বা আনন্দ অন্যজনের কাছে সমানভাবে অনুভূত হয়।
২. পারস্পরিক অভিভাবকত্ব ও সুরক্ষা (Awliya: The protective bond):
“আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু বা অভিভাবক (বা’দুহুম আওলিয়াউ বা’দ); তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে এবং সালাত কায়েম করে...” (৯:৭১)
অনুধ্যানমূলক বিশ্লেষণ:
৩. জান্নাতিদের স্বরূপ: সকল গ্লানিহীন ভ্রাতৃত্ব:
আল কুরআন মাজীদ আমাদের এই ঈমানী সম্পর্কের চূড়ান্ত ও শ্রেষ্ঠ রূপটি দেখিয়েছে জান্নাতের বর্ণনায়। দুনিয়ার সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু হিংসা বা মনোমালিন্য (Ghill) থাকতে পারে, কিন্তু জান্নাতে আল্লাহ সু.তা. মুমিনদের অন্তরকে সম্পূর্ণ পবিত্র করে দেবেন। সূরা আল-হিজরে ইরশাদ হয়েছে:“আর আমি তাদের অন্তর থেকে সব রকমের বিদ্বেষ (গিল্লিন) দূর করে দেব; তারা সেখানে ভাই ভাই হিসেবে (ইখওয়ানান) মুখোমুখি হয়ে আসনে অবস্থান করবে।” (১৫:৪৭)
সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়াত (Cross-reference):
৪. নিরবচ্ছিন্ন রূহানি সংযোগ: পূর্বসূরীদের জন্য দুআ:
“আর যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের সেই ভাইদেরও (লি ইখওয়ানিনা) যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে...” (৫৯:১০)
এটি প্রমাণ করে যে, একজন মুমিন যখন পৃথিবীতে নেই, তখনও অন্য মুমিনের প্রার্থনায় সে ‘ভাই’ হিসেবে উপস্থিত থাকে। এই সংযোগটিই হলো আল কুরআনের সেই ‘হাবলুল্লাহ’ বা আল্লাহর রজ্জু, যা সমগ্র উম্মাহকে ধারণ করে আছে।
আল কুরআনের সামগ্রিক শিক্ষা অনুযায়ী, নিকটাত্মীয় বা ‘জিল কুরবা’ হলো একটি বিস্তৃত ইকোসিস্টেম। যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে পিতা-মাতা ও সন্তান, আর তার চারপাশের বলয়ে রয়েছে ভাই-বোন, চাচা-মামা-ফুপু-খালা, তাদের সন্তানাদি এবং বিবাহের মাধ্যমে যুক্ত হওয়া আত্মীয়গণ।
৫. রক্তের সম্পর্ক বনাম ঈমানী সম্পর্ক:
জিল কুরবা: উত্তরাধিকার, মিরাস ও সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য অপরিহার্য।
ঈমানী ভ্রাতৃত্ব: উম্মাহর ঐক্য, দাওয়াত এবং জান্নাতি সমাজের ভিত্তি হিসেবে অপরিহার্য।
একজন মুমিনের কাছে যেমন তার নিজ রক্তের আত্মীয়ের হক রয়েছে, তেমনি সমগ্র মুমিন উম্মাহর প্রতি তার দায়িত্ব ও দয়া (রাহমাহ) থাকা বাধ্যতামূলক। এই দুই সম্পর্কের ভারসাম্যই একজন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ মুমিন হিসেবে গড়ে তোলে।
সম্পর্কের সীমা:
নিকটাত্মীয়ের প্রতি এই বিশাল অগ্রাধিকার থাকলেও আল কুরআন একটি ভারসাম্যপূর্ণ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। যদি আত্মীয়তার টান সত্য ও ন্যায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেখানে স্রষ্টার নির্দেশই চূড়ান্ত।
স্বজনপ্রীতি-ন্যায়বিচার ও সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে:
বিপরীত চিত্র (Contrast): সত্য বিমুখ নিকটাত্মীয়ের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শনের পরিবর্তে আল কুরআন সালামুন আলা ইব্রাহিম ও সালামুন আলা নূহ-এর জীবনের দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখিয়েছে যে, শিরক ও কুফরের ক্ষেত্রে রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ঈমানী সম্পর্কই বড় হয়ে দাঁড়ায় (৯:১১৩, ১১:৪৬)।
আখিরাতে সম্পর্কের সীমারেখা: আল কুরআনের তাত্ত্বিক ও বৈপ্লবিক বিশ্লেষণ:
১. ‘আনসাব’ বা বংশীয় সম্পর্কের বিলুপ্তি:
২. পলায়নপর সম্পর্কের চিত্র: ‘ইয়াওমা ইয়াফিররুল মারউ’:
এই আয়াতগুলোর ধারাবাহিক বিন্যাস (Sequence) লক্ষ্য করুন—প্রথমে ভাই, তারপর পিতা-মাতা, সবশেষে স্ত্রী ও সন্তান। সাধারণত মানুষ বিপদে পড়লে প্রথমে ভাইয়ের সাহায্য চায়, তারপর পিতা-মাতার আশ্রয় নেয়, আর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে স্ত্রী ও সন্তানদের। কুরআন এই ধারাবাহিকতায় পলায়নের কথা বলে বুঝিয়েছে যে, তীব্রতম ভালোবাসার সম্পর্কগুলোও সেদিন দায়ভার এড়াতে একে অপরের থেকে দূরে সরে যাবে। একে বলা হয় ‘ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার চরম সীমা’।
৩. বিনিময়ে মুক্তিপণের আকাঙ্ক্ষা:
৪. ঈমানী সেতুবন্ধন: সম্পর্কের চিরস্থায়ী পুনর্মিলন:
৫. সম্পর্কের ‘সালাহা’ বা যোগ্যতা:
আল কুরআন মাজীদ থেকে নির্বাচিত প্রাসঙ্গিক দুআ ও তাসবিহ:
১. পিতা-মাতার প্রতি দয়া ও রহমত কামনার দুআ-
২. মুমিন উম্মাহ ও পূর্বসূরী ভাইদের জন্য ক্ষমার দুআ-
৩. সুশৃঙ্খল পরিবার ও চক্ষুশীতলকারী বংশধরের জন্য দুআ-
৪. উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত হওয়া ও সত্যের সাক্ষ্য দেওয়ার প্রার্থনা-
৫. আল্লাহর নূর ও হেদায়েত পূর্ণ করার তাসবিহ/দুআ-
৭. ভাইয়ের জন্য এবং নিজের জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া-
৮. ক্ষমা ও রহমত কামনার চূড়ান্ত তাসবিহ-
9. পরিবারসহ জান্নাতে প্রবেশের প্রার্থনা:
رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدتَّهُمْ وَمَن صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
উচ্চারণ: রব্বানা ওয়া আদখিলহুম জান্নাতি আ’দনিনিল্লাতি ওয়া আ’ত্তাহুম ওয়ামান সালাহা মিন আবায়িহিম ওয়া আযওয়াজিহিম ওয়া যুররিয়্যাতিহিম, ইন্নাকা আন্তাল আযীযুল হাকীম।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তাদের স্থায়ী জান্নাতে দাখিল করুন যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাদের দিয়েছেন; এবং তাদের পিতা-মাতা, জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল (সালাহা) হয়েছে তাদেরও। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। (সূরা গাফির ৪০:৮)
সন্তান ও প্রজন্মের কল্যাণে দুআ:
আহলে পরিবারের কল্যাণ ও তাদের হেদায়েতের জন্য এই দুআগুলো নিয়মিত পাঠ করা আবশ্যক:
