বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
সমাজে কেউ সুস্থ, কেউ প্রতিবন্ধী; কেউ সচ্ছল, কেউ রিক্ত; কারো পিতা-মাতা আছে, কেউ এতিম। কারও আছে চমৎকার ক্যারিয়ার, ভালো চাকরী, কারও নাই, আছে সাঁজানো সংসার, স্বামী-স্ত্রী সন্তান কারো কিছুই নাই কিংবা প্রিয়জনকে হারিয়ে তিনি আজ রিক্ত।
এমতাবস্থায় আমাদের দামী খাবার, বিলাসবহুল জীবন বা শারীরিক সৌন্দর্যের সামাজিক প্রদর্শনী, নিজের রূপ, সম্পদ, সন্তান বা ক্ষমতার প্রদর্শনী থেকে — যদি অভাবী বা অসুন্দর বোধ করা মানুষের মনে দীর্ঘশ্বাস তৈরি করে, যাতে অন্যের মনে হীনম্মন্যতা বা আফসোস তৈরি হয় তবে তা কী ‘পর্দা’র খেলাপ?
আল কুরআন মাজীদের গভীর অনুধাবনে ‘পর্দা’ কেবল একটি শব্দ নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক ‘হিজাব’ বা সুরক্ষা ব্যবস্থা। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষের শরীর, দৃষ্টি, কথা, আচরণ এবং অন্তরের পবিত্রতা রক্ষার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পর্দার রূপরেখা প্রদান করেছেন।
নিচে আল কুরআন মাজীদের আলোকে পর্দার বিভিন্ন ধরন ও তার বিশ্লেষণমূলক উপস্থাপনা তুলে ধরার চেষ্টা করছি: (ওয়ামা তাওফিকি ইল্লাবিল্লাহ):
১. লিবাছ বা শারীরিক আবরণের পর্দা:
এটি পর্দার প্রাথমিক ও বাহ্যিক রূপ। আল্লাহ রব্বুল আলামিন পোশাককে মানুষের জন্য সৌন্দর্য ও লজ্জাস্থান ঢাকার মাধ্যম হিসেবে দান করেছেন।
“হে বনী আদম! আমি তোমাদের জন্য পোশাক (লিবাছ) নাযিল করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকবে এবং তা সৌন্দর্যের বস্তুও...” (৭:২৬)।
নারীদের ক্ষেত্রে এই আবরণের পরিধি আরও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে সূরা আল-আহযাবে:
“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের (জিলবাব) একাংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়...” (৩৩:৫৯)।
এই বাহ্যিক পর্দার উদ্দেশ্য হলো মুমিনদের অনন্যতা বজায় রাখা এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হেনস্তা থেকে সুরক্ষা প্রদান করা।
২. দৃষ্টির পর্দা (গাদদুল বাসার):
পোশাকের পর্দার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দৃষ্টির সংযম। আল কুরআন মাজীদ পুরুষ ও নারী উভয়কেই তাদের দৃষ্টি অবনত রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
“মুমিন পুরুষদের বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে (ইয়াগুদ্দু মিন আবসারিহিম) এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে...” (২৪:৩০)।
একইভাবে মুমিন নারীদের জন্যও একই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে (২৪:৩১)। দৃষ্টির এই পর্দা হলো অন্তরের পবিত্রতা রক্ষার প্রথম ধাপ। দৃষ্টি যদি অবারিত হয়, তবে অন্তরের পর্দা ভেঙে যায়।
৩. বাচনিক বা কণ্ঠস্বরের পর্দা:
কথা বলার ধরণ এবং শব্দের ব্যবহারের মধ্যেও একটি পর্দার আবশ্যকতা আল কুরআন নির্দেশ করেছে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে:
“...তোমরা পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়; বরং তোমরা ন্যায়সংগত (মারুফ) কথা বল।” (৩৩:৩২)।
এটি বাক-সংযমের পর্দা, যা সামাজিক যোগাযোগে এক ধরণের গাম্ভীর্য ও পবিত্রতা বজায় রাখে।
৪. পারিবারিক ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার পর্দা (ইস্তি’যান):
কারো ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা আল কুরআনের এক অনন্য পর্দার বিধান।
“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারো ঘরে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নেবে (তাসতা’নিসু) এবং ঘরবাসীদের সালাম দেবে...” (২৪:২৭)।
এমনকি ঘরের ভেতর দাস-দাসী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্যও তিনটি নির্দিষ্ট সময়ে (ফজর, যোহর ও এশা) অনুমতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (২৪:৫৮)। এটি পারিবারিক জীবনের পবিত্রতা ও গোপনীয়তা রক্ষার পর্দা।
৫. আচরণের পর্দা: প্রাপ্তির জৌলুস বনাম বিনয়:
এটি হলো উচ্চতর নৈতিক পর্দা, যা আমাদের সম্পদ, রূপ ও সফলতাকে বিনয়ের আবরণে ঢেকে রাখতে শেখায়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন কারুনের দম্ভোক্তি ও তার প্রদর্শনীকে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন (২৮:৭৬-৭৯)। আল কুরআন মাজীদের নির্দেশ হলো:
“আর মানুষের দিক থেকে তোমার গাল ফিরিয়ে নিও না এবং যমীনে দম্ভভরে চলাফেরা করো না...” (৩১:১৮)।
নিজের সুখ, বাড়ী-গাড়ী বা রূপের এমন প্রদর্শনী যা অন্যের মনে ‘আফসোস’ বা হীনম্মন্যতা তৈরি করে, তা এই আচরণিক পর্দার খেলাপ। বঞ্চিতদের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে নিজেকে সংবরণ করাই হলো এই পর্দার মূল শিক্ষা।
৬. অন্তরের পর্দা (হিজাবুল ক্বালব):
সর্বোপরি হলো অন্তরের পর্দা বা তাকওয়ার পোশাক। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বাহ্যিক পোশাকের কথা বলার পরপরই বলেছেন:
“...আর তাকওয়ার পোশাকই (লিবাছুত তাক্বওয়া) হলো সর্বোত্তম।” (৭:২৬)।
অহংকার, রিয়া (লোকদেখানো মানসিকতা) এবং অন্যের প্রতি বিদ্বেষ থেকে অন্তরকে আড়ালে রাখাই হলো অন্তরের পর্দা। অন্তর যদি কলুষমুক্ত না থাকে, তবে বাহ্যিক কোনো পর্দাই কার্যকর হয় না।
৭. অদৃশ্য হিজাব বা ঐশী সুরক্ষা:
আল কুরআন মাজীদের গভীর বিশ্লেষণে এমন এক পর্দার কথা পাওয়া যায়, যা আল্লাহ তাঁর অনুগত বান্দা ও অবিশ্বাসী দাম্ভিকদের মাঝে স্থাপন করেন।
“যখন তুমি কুরআন পাঠ কর, তখন আমি তোমার ও যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য পর্দা (হিজাবাম মাসতুরা) টেনে দেই।” (১৭:৪৫)।
এটি মূলত সত্য ও মিথ্যার মধ্যবর্তী এক আধ্যাত্মিক বিভাজন, যা মুমিনকে অপশক্তির প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখে।
আল কুরআন মাজীদের আলোকে পর্দা কেবল একটি কাপড়ের টুকরো নয়; বরং এটি দৃষ্টি, কথা, ঘরোয়া জীবন এবং সামাজিক আচরণের এক সামগ্রিক শৃঙ্খলা। নিজের প্রাপ্তিকে বিনয় দিয়ে ঢেকে রাখা এবং অন্যের অপ্রাপ্তিকে সম্মান প্রদর্শন করা—এই উচ্চতর নৈতিক পর্দা রক্ষা করাই হলো একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। যিনি সত্যিই সবার রব, তিনি আমাদের প্রতিটি আচরণ এবং অন্তরের স্পন্দন সম্পর্কে পূর্ণ অবগত (৬:৩৮)।
এইপ্রকার পর্দার বিষয়টি একটু বিস্তারিত জানতে-বুঝতে চাই:
আচরণের পর্দা: কেন এটি প্রকৃত হৃদয়ের হিজাব- পর্দা?
গভীর অনুধ্যানে দেখি- ‘পর্দা’ কেবল একটি বাহ্যিক পোশাকী আবরণ নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক জীবনবোধ যা বিনয়, সংযম এবং অন্যের প্রতি সহমর্মিতার এক সুদৃঢ় কাঠামো তৈরি করে। আমাদের সমাজিক জীবনে প্রাপ্ত নেয়ামত—ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, পদমর্যাদা বা সৌন্দর্য—যাদের নেই তাদের সামনে প্রদর্শন না করা এবং নিজেদের সংবরণ করাও আল কুরআনের নির্দেশিত এক গভীরতর ‘পর্দা’।
যিনি সত্যিই সবার রব, তিনি প্রতিটি বঞ্চিত আত্মার হাহাকার শোনেন। তাই প্রাপ্তির কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনীতে নয়, বরং বিনয় এবং গোপনীয়তার ‘পর্দা’ রক্ষার মধ্যেই নিহিত। বঞ্চিতদের অনুভূতির প্রতি এই যে সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা—এটুকুই হলো প্রকৃত মুমিনের আত্মিক হিজাব।
“...আমি কিতাবে কোনো কিছুই বাদ রাখিনি (মা ফাররাতনা ফিল কিতাবি মিন শাই); তারপর তাদের রবের কাছেই তাদের একত্রিত করা হবে।” -আয়াত ৬:৩৮
১. আভিজাত্যের প্রতিযোগিতার পর্দা:
মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে নারী ও সন্তান-সন্ততি আর স্বর্ণ ও রৌপ্য-এর রাশিরাশি সঞ্চয় এবং চিহ্নিত ঘোড়া আর গবাদিপশু ও ফসলাদি-এর উপভোগের আসক্তিকে। সেটা দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী। আর আল্লাহ, তাঁর কাছেই উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।
বলো! আমি কি তোমাদেরকে সেগুলোর চেয়ে উৎকৃষ্টতর কিছুর সংবাদ দিব? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে এমন জান্নাতসমূহ, সেগুলোর নিচ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত হয়, তারা স্থায়ীভাবে সেখানে থাকবে আর পবিত্র দাম্পত্যসাথীরা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি। আর আল্লাহ বান্দাদের ব্যাপারে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন-আয়াত ৩:১৪-১৫
“তোমরা জেনে রাখ যে, পার্থিব জীবন তো কেবল খেলাধুলা, কৌতুক, জাঁকজমক (যিনাত), তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহংকার (তাফাখুর) এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র...” (৫৭:২০)।
২. প্রাপ্তির অহংকার বনাম বঞ্চিতের অনুভূতি: বঞ্চিতদের অন্তরের আঘাত! -কারুনের দৃষ্টান্ত:
“কারুন তার সম্প্রদায়ের সামনে জাঁকজমক (যিনাত) সহকারে বের হলো; যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল, ‘হায়, কারুনকে যেরূপ দেয়া হয়েছে আমাদেরকেও যদি সেরূপ দেয়া হতো! সে তো বড় ভাগ্যবান’।” (২৮:৭৯)।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, কারুনের ‘প্রদর্শনী’ বা পর্দার অভাব সাধারণ মানুষের মনে ‘আফসোস’ তৈরি করেছিল। আল কুরআন এই প্রদর্শনীকে সমর্থন করেনি। আল্লাহ রব্বুল আলামিন কারুনকে এই উপদেশ দিয়েছিলেন:
“অহংকার করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারীদের পছন্দ করেন না।” (২৮:৭৬)।
৩. নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা বনাম প্রদর্শনেচ্ছা (রিয়া):
“ধ্বংস ঐসব সালাত আদায়কারীদের জন্য... যারা লোকদেখানোর (ইউরাউন) জন্য তা করে।” (১০৭:৪-৬)।
এখানে ‘ইউরাউন’ (يُرَاءُونَ) শব্দটি প্রদর্শনেচ্ছার নেতিবাচকতাকে তুলে ধরে। অর্থাৎ এমন কাজ করা যা কেবল অন্যের চোখে নিজেকে বড় করে তোলার জন্য। নিজের সুখ-শান্তি, উন্নত খাদ্য-রিজিক বা বাগ-বাগিচার গল্প যখন আমরা অভাবীদের সামনে শোনাই, তখন তাতে শুকরিয়ার চেয়ে প্রদর্শনের ইচ্ছা প্রবল হয়ে ওঠে। এই প্রদর্শনেচ্ছা থেকে নিজেকে হিজাব বা আড়ালে রাখাই হলো প্রকৃত পর্দা।
“আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা থেকে উত্তম।” (২৭:৩৬)। (সুলাইমান সালামুন আলাইহে-এর উক্তি)।
ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের সাদাকাসমূহ তার মতো নষ্ট কোরো না, যে তার সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে আর সে আল্লাহ্ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে না। ফলে তার দৃষ্টান্ত এমন মসৃণ পাথরের দৃষ্টান্তের মতো যার উপর রয়েছে ধুলা, এরপর প্রবল বৃষ্টি তাকে আঘাত করল, ফলে সেটাকে পরিষ্কার অবস্থায় রেখে গেল। তারা যা অর্জন করেছে তা থেকে কোনোকিছুই তারা কাজে লাগাতে পারবে না। আর আল্লাহ কাফির জনগোষ্ঠীকে হিদায়েত করেন না-আয়াত ২:২৬৪ (২:২৬২)।
৪. সৌন্দর্য ও মেধা সম্পদের ‘হিফাযত’ : এক অদৃশ্য আবরণ:
রূপ-গুণ, মেধা বা সুস্থতা—এসবই আল্লাহর দান। কিন্তু যার মেধা কম বা যে অসুস্থ, তার সামনে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করাকে আল কুরআন ‘উদ্ধত আচরণ’ হিসেবে গণ্য করে। সূরা আল-কাহফে দুই বাগানওয়ালার সংলাপে একজন তার প্রাচুর্য নিয়ে অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করেছিল:
“সম্পদে আমি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং জনবলে তোমার চেয়ে শক্তিশালী।” (১৮:৩৪)।
এই মানসিকতা হলো পর্দার অভাব। নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে গোপন রেখে বা বিনয়ের আবরণে ঢেকে রাখাই হলো ‘আচরণের পর্দা’, যাতে অন্য কেউ নিজেকে তুচ্ছ মনে না করে।
তার এই প্রদর্শন ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ জীবন তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। বিপরীতে, অপর ব্যক্তি তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল যে, যা কিছু প্রাপ্তি তা কেবল আল্লাহর ইচ্ছায় (মাশাআল্লাহ!)। সুতরাং, নিজের রূপ-যৌবন বা বিত্তের প্রদর্শনী না করে তা গোপন রাখাই হলো বিনয়ের পর্দা। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:
“তোমরা নিজেদের পবিত্রতা ঘোষণা করো না (নিজের গুণগান করো না); তিনিই ভালো জানেন কে মুত্তাকী।” -আয়াত ৫৩:৩২।
৫. বঞ্চিতের হক ও মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা: বৈষম্যের বিপরীতে আচরণের সংযম:
আমাদের সমাজে কেউ হয়তো গৌরবর্ণের অধিকারী, কেউ শ্যামলা; কেউ সুস্থ, কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার; কারো বাবা-মা আছে, কেউ এতিম। আল কুরআন মাজীদ এই বৈচিত্র্যকে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করলেও এর মাধ্যমে দম্ভ করাকে নিষিদ্ধ করেছে।
যাদেরকে রব কম দিয়েছেন বা এখনও দেননি, তাদের সামনে নিজের আধিক্য নিয়ে নীরব থাকাই হলো তাদের প্রতি সবচেয়ে বড় সহমর্মিতা। আল কুরআন মাজীদের নির্দেশ:
“আর তাদের সম্পদে বঞ্চিত ও সাহায্যপ্রার্থীদের অধিকার রয়েছে।” -আয়াত ৫১:১৯।
৩. সংবেদনশীলতার ‘হিজাব’:
সমাজে কেউ সুস্থ, কেউ প্রতিবন্ধী; কেউ সচ্ছল, কেউ রিক্ত; কারো পিতা-মাতা আছে, কেউ এতিম। আল কুরআন মাজীদের নীতি হলো, সামর্থ্যবানরা যেন তাদের আচরণের মাধ্যমে বঞ্চিতদের অন্তরকে বিদীর্ণ না করে।
“আর মানুষের দিক থেকে তোমার গাল ফিরিয়ে নিও না এবং যমীনে দম্ভভরে চলাফেরা করো না...” (৩১:১৮)।
এখানে ‘দম্ভভরে না চলা’র অর্থ হলো এমন কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ না করা যা অন্যকে ছোট করে। যখন একজন মেধাবী ব্যক্তি একজন স্বল্প-মেধাবীর সামনে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক জৌলুস দেখায়, অথবা একজন সুস্থ ব্যক্তি অসুস্থের সামনে নিজের সক্ষমতার বড়াই করে, তখন সে মূলত ‘আচরণের পর্দা’ লঙ্ঘন করে।
এই আয়াতে ‘গাল ফিরিয়ে না নেওয়া’ বা দম্ভ না করার আদেশটি কেবল হাঁটার ক্ষেত্রে নয়, বরং আচরণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একজন সামর্থ্যবান ব্যক্তি যখন তার ‘উন্নত রিজিক’ বা ‘ক্ষমতা’ নিয়ে একজন বেকার বা দরিদ্রের সামনে গর্ব করে, তখন সে মূলত এই ঐশী সীমানা লঙ্ঘন করে। গাল ফিরিয়ে না নেওয়া বা দম্ভ না করার এই নির্দেশ মূলত সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পর্দারই অংশ। এটি নিশ্চিত করে যে, উচ্চবিত্ত বা সুখী মানুষের আচার-আচরণ যেন নিম্নবিত্ত বা দুঃখী মানুষের কষ্টের কারণ না হয়।
আল কুরআন মাজীদ মুমিনদের নির্দেশ দেয়:
“তোমরা নিজেদের পবিত্রতা (বা শ্রেষ্ঠত্ব) ঘোষণা করো না; তিনিই ভালো জানেন কে মুত্তাকী।” (৫৩:৩২)।
৫. বঞ্চিত ও এতিমদের প্রতি মনস্তাত্ত্বিক পর্দা:
যাদের বাবা-মা নেই বা যারা সম্পদহীন, তাদের সামনে নিজের পারিবারিক জৌলুস বা প্রাচুর্য প্রকাশ করা এক প্রকার মানসিক নিপীড়ন। সূরা আদ-দুহায় আল্লাহ রব্বুল আলামিন নির্দেশ দিয়েছেন:
“সুতরাং তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না। আর সাহায্যপ্রার্থীকে ধমক দিও না।” (৯৩:৯-১০)।
এখানে ‘কঠোর না হওয়া’র একটি সূক্ষ্ম অর্থ হলো, তাদের সামনে নিজের প্রাপ্তিগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন না করা যা তাদের বঞ্চনাকে আরও প্রকট করে তোলে। এটিই হলো সহমর্মিতার পর্দা।
উপসংহার: একটি জীবনমুখী সংশ্লেষণ:
পরিশেষে বলা যায়, আল কুরআন মাজীদের নির্দেশিত জীবনব্যবস্থায় বিনয় হলো মুমিনের অলঙ্কার। আমার বাড়ী-গাড়ী, সুন্দর জীবনসঙ্গী, মেধা বা জৌলুস—এসব কিছুই আল্লাহর দেওয়া আমানত। এই আমানতগুলো যাদের নেই, তাদের সামনে এগুলোর অযাচিত প্রদর্শনী বা বক্তব্য থেকে বিরত থাকাই হলো ‘আচরণের পর্দা’। এই পর্দা রক্ষার মাধ্যমেই সমাজে হিংসা ও হীনম্মন্যতা দূর হয়ে শান্তি ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
তারপর সেদিন তোমরা নিয়ামত সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে-আয়াত ১০২:৮
প্রাসঙ্গিক কুরআনি দুআ-তাসবিহ:
১. অহংকার থেকে বাঁচতে ও শুকরিয়া আদায়ের দুআ:অহংকার থেকে মুক্তি ও বিনয় অর্জনের দুআ:
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ
উচ্চারণ: রব্বি আওযি‘নী আন আশকুরা নি‘মাতাকাল্লাতী আনআমতা ‘আলাইয়্যা ওয়া ‘আলা- ওয়া-লিদাইয়্যা ওয়া আন আ‘মালা স-লিহান তারদ-হু।
অর্থ: হে আমার রব! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন যাতে আমি আপনার সেই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারি, যা আপনি আমাকে ও আমার পিতামাতাকে দান করেছেন এবং যাতে আমি এমন সৎকাজ করতে পারি যা আপনি পছন্দ করেন। (সূরা আন-নামল ২৭:১৯)
إِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُم مِّن كُلِّ مُتَكَبِّرٍ لَّا يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ
ইন্নি উযতু বিরাব্বী ওয়া রাব্বিকুম মিন কুল্লি মুতাকাব্বিরিন লা ইউ’মিনু বিইয়াওমিল হিসাব
অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি আমার রব এবং তোমাদের রবের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি প্রত্যেক অহংকারী ব্যক্তির থেকে, যে হিসাবের দিনের প্রতি ঈমান রাখে না” -আয়াত ৪০:২৭
فَعَسٰی رَبِّیۡۤ اَنۡ یُّؤۡتِیَنِ خَیۡرًا مِّنۡ جَنَّتِکَ
তবে আশা করা যায় যে, আমার রব আমাকে তোমার বাগানের চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন -18:40
سُبْحَانَ رَبِّكَ
رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ
لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
সুবহা-না রব্বিকা রব্বিল ‘ইযযাতি ‘আম্মা- ইয়াসিফূন। অসালা-মুন ‘আলাল মুরসালীন। অলহামদু লিল্লা-হি রব্বিল ‘আ-লামীন!
অর্থ: আপনার রব, যিনি সকল সম্মানের অধিকারী, তিনি তারা যা আরোপ করে তা থেকে পবিত্র। এবং রাসুলগণের প্রতি শান্তি (সালাম)। আর সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আয়াত ৩৭:১৮০-১৮২
░ ▓▒░ভিডিও░▒▓ ░
ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন এখানে:
https://www.facebook.com/share/r/17C3UMmumV/
