ফেইজবুক: একটি ডিজিটাল কিতাব —কী বলে আল-কোরআন? (Facebook!)

 বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

আপনার ফেইজবুক প্রোফাইল কি পরকালীন ‘কিতাব’-সাক্ষ্য? ওহীর আলোয় এক বিস্ময়কর অনুধাবন!

আল কোরআন মাজীদের চিরন্তন মোজেজা বা অলৌকিকত্ব এটাই যে, এটি সময়ের সাথে সাথে নতুন নতুন দিক-দিগন্ত উন্মোচন করে (আয়াত ২৭:৯৩, ৪১:৫৩, ১৬:৮)। ‘ফেইজবুক’ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যে প্রযুক্তিগত কাঠামো আমরা আজ দেখছি, তার পেছনে থাকা মানবীয় মনস্তত্ত্ব এবং কর্মের রেকর্ডিং পদ্ধতি নিয়ে আল কোরআনে সূক্ষ্ম ও গভীর ‘ইমপ্লাইড এভিডেন্স’ (অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত) রয়েছে।

কুরআনিল হাকীম কেবল একটি ধর্মীয় নির্দেশিকা নয়, বরং এটি একটি চিরন্তন মোজেজা—যা কাল ও সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানবীয় উদ্ভাবন ও আচরণের মূলনীতি ধারণ করে। আধুনিক বিশ্বের অন্যতম যোগাযোগ মাধ্যম ‘ফেইজবুক’ (Facebook) বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যে ধারণা—যেখানে মানুষের একটি ‘চেহারা’ (Profile/Face) থাকে এবং তার কর্মকাণ্ডের একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘রেকর্ড’ বা ‘বই’ (Timeline/Book) সংরক্ষিত হয়—তার একটি সূক্ষ্ম অথচ গভীর আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক প্রতিফলন আল কোরআনের আয়াতসমূহে বিদ্যমান।

■ FaceBook: চেহারা (Face) ও কিতাব (Book):

‘Facebook’ শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে দুটি মূল উপাদান পাওয়া যায়: Face (মুখ/চেহারা) এবং Book (বই/রেকর্ড)। 

আল কোরআন এই দুটি বিষয়কে মানুষের পরকালীন মুক্তি ও আত্মপরিচয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে দিয়েছে।

১. চেহারা বা প্রোফাইল (আল-ওয়াজহ):

আল কোরআনে মানুষের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বা আমলের প্রতিফলন তার চেহারায় প্রকাশ পাওয়ার বিষয়টি বারবার এসেছে। এটিই হলো মানুষের প্রকৃত ‘ডিজিটাল প্রোফাইল’। আল্লাহ সু.তা. ইরশাদ করেন:

“সেদিন কিছু মুখমণ্ডল (উজুহ - وُجُوْهٌ) উজ্জ্বল হবে এবং কিছু মুখমণ্ডল হবে কালো।” (৩:১০৬)

অর্থাৎ, মানুষের কর্মই তার স্থায়ী চেহারা বা প্রোফাইল নির্ধারণ করবে। এই ‘মুখমণ্ডল’ মূলত মানুষের সামগ্রিক সত্তার বহিঃপ্রকাশ।

২. রেকর্ড বা টাইমলাইন (আল-কিতাব):

ফেইজবুকে যেমন আমাদের প্রতিটি কাজ একটি ‘টাইমলাইন’ হিসেবে সংরক্ষিত হয়, আল কোরআন আমাদের জানায় যে, মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত একটি সুনির্দিষ্ট ‘কিতাব’-এ রেকর্ড হচ্ছে।

“আর কিতাব (কর্মলিপি) সামনে রাখা হবে... তারা বলবে, হায় আফসোস! এটি কেমন কিতাব! যা ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি, বরং সব কিছুই গণনা করে রেখেছে।” (১৮:৪৯)

এই ‘কিতাব’ হলো আমাদের জীবনের সেই টাইমলাইন, যা কিয়ামতের দিন সবার সামনে ‘পাবলিক’ বা উন্মুক্ত করা হবে।

 ফেইজবুকে পরিচয় যখন-যেমন: 

গ্লোবাল নেটওয়ার্কিং: ‘লিতাআরাফু’ বা পারস্পরিক পরিচিতি (৪৯:১৩)

সোশ্যাল মিডিয়া বা ফেইজবুকের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো ভৌগোলিক ও জাতিগত সীমানা পেরিয়ে একে অপরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা। আল্লাহ রব্বুল আলামিন সূরা আল-হুজুরাত-এ সামাজিক সম্পর্কের এই গ্লোবাল মডেলটি বর্ণনা করেছেন:

“হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো (লিতাআরাফু - لِتَعَارَفُوْا)।” (৪৯:১৩)

অনুধাবন ও বিশ্লেষণ:

এখানে ‘লিতাআরাফু’ (لِتَعَارَفُوْا) শব্দটি ‘ফেইস টু ফেইস’ বা পারস্পরিক পরিচিতি লাভের এক বৈশ্বিক আহ্বান। আধুনিক ‘ফেইজবুক’ মূলত এই ‘তায়ারুফ’ বা পরিচিতি লাভের একটি যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত রূপ। আল্লাহ সু.তা. মানুষকে বৈচিত্র্যময় করেছেন যেন তারা একে অপরের মুখোমুখি হয় এবং জ্ঞান ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান করে। ওহীর দৃষ্টিতে এই যোগাযোগের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতি বা সচেতনতা অর্জন করা, যা এই আয়াতের শেষাংশে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।

 ফিঙ্গার প্রিন্ট:

বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি ও ডিজিটাল অ্যাক্সেস: আঙ্গুলের ডগার অলৌকিকত্ব (৭৫:৩-৪)

আধুনিক যুগে আমাদের স্মার্টফোন আনলক করা থেকে শুরু করে সিম কার্ডের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন—সবই নিয়ন্ত্রিত হয় ‘ফিঙ্গার প্রিন্ট’ বা আঙ্গুলের ছাপের মাধ্যমে। আঙ্গুলের এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রেখা যে মানুষের অদ্বিতীয় পরিচয় (Unique Identity), তা আল কোরআন মাজীদ সূরা আল-কিয়ামাহ-তে চ্যালেঞ্জ স্বরূপ পেশ করেছে:

“মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার হাড়গুলো একত্রিত করতে পারব না? অবশ্যই! আমি তার আঙ্গুলের ডগাগুলো পর্যন্ত (বানানাহু - بَنَانَهٗ) সঠিকভাবে বিন্যস্ত করতে সক্ষম।” (৭৫:৩-৪)

গভীর পর্যবেক্ষণ:

১. আইডেন্টিটি ও প্রেস (Press): যখন আমরা স্ক্রিনে আঙ্গুল দিয়ে ‘প্রেস’ করি বা বায়োমেট্রিক দেই, তখন আমরা আমাদের সেই একক পরিচয়কে ব্যবহার করি যা আল্লাহ রব্বুল আলামিন সুনিপুণভাবে নকশা করেছেন। ‘বানানাহু’ (আঙ্গুলের ডগা) শব্দের ব্যবহার এটিই প্রমাণ করে যে, মানুষের পরিচয় তার আঙ্গুলের অগ্রভাগে সংরক্ষিত।

২. হাতের সাক্ষ্য: আমরা আঙ্গুল ব্যবহার করে যা কিছু ‘লাইক’, ‘টাইপ’ বা ‘শেয়ার’ করছি, সেই হাত ও আঙ্গুলগুলোই কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে কথা বলবে।

“আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব, তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা সাক্ষ্য দেবে যা তারা অর্জন করত।” (৩৬:৬৫)

অর্থাৎ, ডিজিটাল জগতের প্রতিটি ‘মুভমেন্ট’ আমাদের আঙ্গুলের ছাপের সাথে মিলিয়ে রেকর্ড হচ্ছে।

 পাবলিক প্রোফাইল ও উন্মুক্ত রেকর্ড: গোপনীয়তা বনাম প্রকাশ

ফেইজবুকে যেমন মানুষের একটি পাবলিক প্রোফাইল থাকে, আল কোরআন আমাদের জানায় যে মানুষের প্রকৃত ‘প্রোফাইল’ পরকালে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করা হবে। সূরা আল-ইসরা-তে আল্লাহ সু.তা. বলছেন:

“আমি প্রত্যেক মানুষের কর্ম তার ঘাড়ের সাথে লেপ্টে দিয়েছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব একটি কিতাব (একটি উন্মুক্ত রেকর্ড), যা সে খোলা অবস্থায় পাবে (ইয়ালক্বাহু মানশুরা - یَّلْقٰىهُ مَنْشُوْرًا)।” (১৭:১৩)

এটিই হলো মানুষের আসল সামাজিক পরিচয় বা ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’-এর আধ্যাত্মিক রূপ। এখানে ‘মানশুরা’ শব্দটি নির্দেশ করে যে, সেদিন কোনো ‘প্রাইভেসি সেটিংস’ কাজ করবে না; রেকর্ডটি হবে সম্পূর্ণ ‘পাবলিক’।

 সোশ্যাল মিডিয়া এথিক্স: তথ্য যাচাই ও আচরণবিধি:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বর্তমান সময়ের প্রধান সংকট হলো গুজব ও সাইবার বুলিং। আল কোরআন এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’ বা আচরণবিধি দিয়েছে:

১. ফ্যাক্ট চেকিং (Tabayyun):

“হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করো (ফাতাবাইয়্যানু - فَتَبَیَّনُوْا)।” (৪৯:৬)

২. সাইবার বুলিং ও গোপনীয়তা লঙ্ঘন:

“তোমরা একে অপরের উপহাস করো না... এবং তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না (ওয়ালা তাজাস্সাসু - وَلَا تَجَسَّسُوْا)।” (৪৯:১১-১২)

অন্যের প্রোফাইল বা ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি দেওয়া (Stalking) এবং উপহাস করাকে আল কোরআন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

 ভাইরাল হওয়ার দায়বদ্ধতা ও ‘লাহওয়াল হাদীস’:

১. পদাঙ্ক বা ডিজিটাল ট্রেইল (Aasaar):

আমরা যা কিছু ‘শেয়ার’ করি, তার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব থাকে। আল্লাহ সু.তা. বলেন:

“আমি লিখে রাখি যা তারা অগ্রে পাঠিয়েছে এবং তাদের পদাঙ্কসমূহ বা কাজের প্রভাব (আসারাহুম - اٰثَارَهُمْ)।” (৩৬:১২)

আপনার একটি পোস্ট যদি ভাইরাল হয়, তবে তার প্রভাব কিয়ামত পর্যন্ত আপনার কিতাবে রেকর্ড হতে থাকবে।

২. আসক্তি (addiction):

অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং বা বিনোদনে মত্ত থাকাকে আল কোরআন ‘লাহওয়াল হাদীস’ বা অবান্তর কথা হিসেবে চিহ্নিত করেছে:

“আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে যারা অবান্তর কথাবার্তা (লাহওয়াল হাদীস - لَهْوَ الْحَدِیْثِ) খরিদ করে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য।” (৩১:৬)

 সারসংগত  অনুধাবন:

আল কোরআন মাজীদের আয়াতসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রতিটি অনুষঙ্গ—তা পরিচয় (আইডেন্টিটি) হোক কিংবা রেকর্ড (টাইমলাইন)—সবই ওহীর নিগূঢ় জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। ৪:১৭৫ এবং ৭:১৭০ আয়াতের আলোকে আমরা বুঝেছি যে, কিতাবকে আঁকড়ে ধরাই হলো সঠিক পথ। একইভাবে, আমাদের সামাজিক ও ডিজিটাল জীবনেও যদি আমরা আল কোরআনের এই ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’ মেনে না চলি, তবে আমাদের এই ‘ডিজিটাল রেকর্ড’ পরকালে লজ্জিত হওয়ার কারণ হবে। ফেইজবুকের ‘চেহারা’ সাময়িক, কিন্তু ওহীর আলোকে গড়া ‘মুখমণ্ডল’ চিরস্থায়ী।

 ডিজিটাল ‘রান’ (Raan) বা আধ্যাত্মিক অ্যালগরিদম:

সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যা দেখি বা যার সাথে মিথস্ক্রিয়া (interact) করি, অ্যালগরিদম আমাদের সামনে বারবার সেগুলোই নিয়ে আসে। আল কোরআন মানুষের অন্তরের জন্য একটি ‘স্পিরিচুয়াল অ্যালগরিদম’-এর কথা বলেছে।

“কখনও না! বরং তারা যা অর্জন করে, তা-ই তাদের অন্তরে মরিচা (রান - رَانَ) ধরিয়ে দিয়েছে।” (৮৩:১৪)

বিশ্লেষণ:

এখানে ‘রান’ (Rust) শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি গভীর সত্য প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা যখন ডিজিটাল স্ক্রিনে বারবার কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি ঝুঁকে পড়ি (ক্লিক বা লাইক করি), তখন আমাদের অন্তরের পছন্দ বা ‘ফিড’ (Feed) সেদিকেই মোড় নেয়। এটি একটি আধ্যাত্মিক প্রতিফলন যে, আমাদের প্রতিটি কাজ আমাদের পরবর্তী কাজের মানসিক পথ তৈরি করে দেয়।

 ‘শেয়ার’ করার দায়বদ্ধতা: অন্যের বোঝা বহন:

ফেইজবুকে আমরা যখন কোনো ভুল তথ্য বা অনৈতিক বিষয় ‘শেয়ার’ করি, তখন সেটি যতজন মানুষ দেখে বা বিভ্রান্ত হয়, তার একটি দায়ভার শেয়ারকারীর ওপর বর্তায়। আল কোরআন এই ‘শেয়ারিং’ বা প্রচারের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে:

“যাতে কিয়ামতের দিন তারা বহন করে তাদের নিজেদের বোঝা পূর্ণরূপে এবং তাদের বোঝারও একাংশ যাদেরকে তারা জ্ঞান ছাড়াই বিভ্রান্ত করেছিল।” (১৬:২৫)

এই আয়াতে ‘বিভ্রান্ত করা’ (ইউদিল্লুনাহুম - يُضِلُّونَهُمْ) এবং সেই বিভ্রান্তির ‘বোঝা’ (আওযার - أَوْزَار) বহন করার যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তা আজকের ‘ভাইরাল’ কন্টেন্টের নেতিবাচক প্রভাবের সাথে হুবহু মিলে যায়। এটি একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত যে, ডিজিটাল প্রচার কেবল একটি বাটন ক্লিক নয়, বরং পরকালীন আমলনামায় একটি বড় দায়বদ্ধতা।

 ইন্দ্রিয়ের জাবাবদিহি: ‘ভিউ’ ও ‘স্ক্রলিং’-এর বিচার:

আমরা সামাজিক মাধ্যমে কী দেখছি বা শুনছি, তার কোনো কিছুই তুচ্ছ নয়। আল কোরআন মানুষের জ্ঞান ও ইন্দ্রিয় ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি চূড়ান্ত মূলনীতি দিয়েছে:

“আর যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পোড়ো না; নিশ্চয়ই শ্রবণ, দৃষ্টি এবং অন্তর—এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কেই জিজ্ঞাসা করা হবে।” (১৭:৩৬)

অনুধাবন:

এই আয়াতে ‘তাক্ফু’ (تَقْفُ) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ কোনো কিছুর পেছনে লাগা বা অনুসরণ করা। আধুনিক ‘স্ক্রলিং’ বা না বুঝে কোনো ট্রেন্ডের পেছনে ছোটার যে প্রবণতা, এই আয়াতটি তার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী নৈতিক প্রাচীর। চোখের প্রতিটি ‘ভিউ’ এবং অন্তরের প্রতিটি ‘রিয়েকশন’ কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হবে।

 গোপন চ্যাট ও ডিজিটাল নিভৃতচারিতা:

অনেকে মনে করেন সামাজিক মাধ্যমের ইনবক্স বা গোপন চ্যাটগুলো কেবল দুজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আল কোরআন এই ‘সিক্রেট চ্যাট’-এর ধারণাকে ভেঙে দিয়ে এক মহাশাশ্বত নজরদারির কথা বলেছে:

“তিনজনের মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ (নাজওয়া - نَجْوٰى) হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে তিনি (আল্লাহ) না থাকেন... তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তিনি তাদের সাথেই আছেন।” (৫৮:৭)

মেটাফিজিক্যাল সামঞ্জস্য:

এখানে ‘নাজওয়া’ (গোপন কথা) শব্দটি ডিজিটাল যুগের ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন’-এর ধারণাকেও হার মানায়। মানুষের তৈরি প্রযুক্তি হয়তো মানুষের কাছে তথ্য গোপন রাখতে পারে, কিন্তু আল্লাহর ‘সার্ভেিল্যান্স’ বা নজরদারি ব্যবস্থা থেকে কোনো ‘প্রাইভেট চ্যাট’ বাদ পড়ার সুযোগ নেই।

 চরিত্র হনন ও ‘ডিজিটাল গীবত’:

সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমানে ‘রোস্টিং’ বা অন্যের ত্রুটি খুঁজে বের করে বিদ্রূপ করার প্রবণতা খুব বেশি। সূরা আল-হুমাযাহ-তে আল্লাহ সু.তা. এই ডিজিটাল আচরণের কঠোর নিন্দা করেছেন:

“ধ্বংস তাদের জন্য, যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে (হুমাযাহ ও লুমাযাহ - هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ)।” (১০৪:১)

এই আয়াতে ‘হুমাযাহ’ (ইশারায় নিন্দা) এবং ‘লুমাযাহ’ (সরাসরি দোষারোপ) শব্দ দুটি আজকের অনলাইন ট্রোলিং, বুলিং এবং ভিডিওর মাধ্যমে অন্যের চরিত্র হননের সাথে সরাসরি সাদৃশ্যপূর্ণ।

■ সামগ্রিক:

১. প্রারম্ভিক: ফেইজবুক একটি ডিজিটাল কিতাব ও চেহারা  (৩:১০৬, ১৮:৪৯)।

২. বায়োমেট্রিক ও তায়ারুফ: আঙ্গুলের ডগার সাক্ষ্য (৭৫:৩-৪) (৭৫:৪) ও পরিচিতি (৪৯:১৩)।

৩. ডিজিটাল ইথিক্স: তথ্য যাচাই (৪৯:৬) ও ইনবক্সের গোপনীয়তা (৫৮:৭)।

৪. ডিজিটাল অ্যালগরিদম: অন্তরের ‘রান’ বা আসক্তি (৮৩:১৪)।

৫. ভাইরাল প্রভাব: অন্যের পাপের বোঝা বহন (১৬:২৫)।

6. ‘পাবলিক প্রোফাইল’ ও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট (১৭:১৩-১৪)

7. গ্লোবাল নেটওয়ার্কিং ও ‘তায়ারুফ’ (৪৯:১৩)

8. উপসংহার: ডিজিটাল রেকর্ড ও পরকালীন কিতাবের সমন্বয়।


প্রাসঙ্গিক দুআ-তাসবিহ:

১. নূর ও ক্ষমা প্রাপ্তির দুআ:

رَبَّنَآ أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَٱغْفِرْ لَنَآ ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍۢ قَدِيرٌ
উচ্চারণ: রব্বানা আতমিম লানা নূরানা ওয়াগফির লানা, ইন্নাকা আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বদীর।
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের নূরকে (আলো) পূর্ণতা দান করুন এবং আমাদের ক্ষমা করুন; নিশ্চয়ই আপনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।”

২. ওহী ও রাসূলের (সালামুন আলাইহে) অনুসরণের দুআ (৩:৫৩):

رَبَّنَآ ءَامَنَّا بِمَآ أَنزَلْتَ وَٱتَّبَعْنَا ٱلرَّسُولَ فَٱكْتُبْنَا مَعَ ٱلشَّـٰهِدِينَ
উচ্চারণ: রব্বানা আমান্না বিমা আনযালতা ওয়াত্তাবা'নার রসূলা ফাকতুবনা মা'আশ শাহিদীন।
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি আপনার নাযিলকৃত কিতাবের প্রতি এবং অনুসরণ করেছি আপনার রাসূলের (সালামুন আলাইহে); সুতরাং আমাদের সত্যের সাক্ষীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।”

৩. সত্য পথে প্রবেশ ও প্রস্থানের দুআ (১৭:৮০):

 رَّبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَٱجْعَل لِّي مِن لَّدُنكَ سُلْطَـٰنًا نَّصِيرًا
উচ্চারণ: রব্বি আদখিলনী মুদখালা সিদক্বিওঁ ওয়া আখরিজনী মুখরাজা সিদক্বিওঁ ওয়াজ'আল লী মিল্লাদুনকা সুলতানান নাছীরা।
অর্থ: “হে আমার রব! আমাকে এমনভাবে প্রবেশ করান যা হবে সত্যের সাথে প্রবেশ এবং এমনভাবে বের করুন যা হবে সত্যের সাথে বের হওয়া; আর আপনার পক্ষ থেকে আমাকে দান করুন এক সাহায্যকারী শক্তি।”

৪. প্রজ্ঞা ও সুখ্যাতি লাভের দুআ (২৬:৮৩-৮৪):

 رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِٱلصَّـٰلِحِينَ . وَٱجْعَل لِّي لِسَانَ صِدْقٍ فِي ٱلْءَاخِرِينَ
উচ্চারণ: রব্বি হাবলী হুকমাওঁ ওয়া আলহিক্বনী বিস-সলিহীন। ওয়াজ'আল লী লিসানা সিদক্বিন ফিল আখিরীন।
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে দান করুন প্রজ্ঞা এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আর পরবর্তীদের মধ্যে আমার জন্য সত্য ভাষণ বা সুখ্যাতি জারি রাখুন।

৫. শয়তানের প্ররোচনা থেকে আশ্রয়ের দুআ (২৩:৯৭-৯৮):

رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَٰتِ ٱلشَّيَـٰطِينِ . وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونِ
উচ্চারণ: রব্বি আ'উযু বিকা মিন হামাযাতিশ শায়াতীন। ওয়া আ'উযু বিকা রব্বি আইঁ ইয়াহদুরুউন।
অর্থ: “হে আমার রব! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই শয়তানের প্ররোচনা থেকে। হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় চাই আমার কাছে তাদের উপস্থিতি থেকে।”

৬. রহমত ও সঠিক সিদ্ধান্তের দুআ (১৮:১০):

 رَبَّنَآ ءَاتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا
উচ্চারণ: রব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রহমাতাওঁ ওয়া হাইয়্যি’ লানা মিন আমরিনা রশাদা।
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের কার্যাবলিকে সঠিক পথে সুবিন্যস্ত করুন।”

তাসবিহসমূহ:

তাসবিহ ১ (৬:১১৫) ও সংশ্লিষ্ট ভাব:

سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ . وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি আম্মা ইয়াসিফুন। ওয়া তাম্মাত কালিমাতু রব্বিকা সিদক্বাওঁ ওয়া আদলা।
অর্থ: পবিত্রতা ঘোষণা করছি আল্লাহ যা তারা বর্ণনা করে তা থেকে। আর আপনার রবের বাণী সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে পূর্ণ হয়েছে।”

তাসবিহ ২ (৩৭:১৮০-১৮২ ও আল-আলা):

 سُبْحَـٰنَ رَبِّكَ رَبِّ ٱلْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ . وَسَلَـٰمٌ عَلَى ٱلْمُرْسَلِينَ . وَٱلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلْعَـٰلَمِينَ
উচ্চারণ: সুবহানা রব্বিকা রব্বিল ইযযাতি আম্মা ইয়াসিফুন। ওয়া সালামুন আলাল মুরসালীন। ওয়াল হামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামীন।

অর্থ: পবিত্র আপনার রব! যিনি সম্মানের অধিকারী, তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে তিনি পবিত্র। এবং সালাম বর্ষিত হোক রাসূলগণের ওপর। আর সকল প্রশংসা জগতসমূহের রব আল্লাহর জন্য।”
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post