রূহ কী? সার্বক্ষণিক ওহীর সংযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ? ◈ ওহীর সংযোগ চর্চা বজায় রাখার সহজ উপায় কী? (ruh-wahi)

 বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। 

আল-কুরআন মাজীদ মানবসৃষ্টির এক নিগূঢ় রহস্য আমাদের সামনে উন্মোচন করেছে। মানুষ কেবল মাটি ও রক্ত-মাংসের স্তূপ নয়, বরং তার অস্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত রয়েছে আল্লাহ রব্বুল আলামিন কর্তৃক প্রদত্ত সেই ‘রূহ’ বা আত্মার মধ্যে। সৃষ্টির সূচনালগ্নে রূহ ফুঁকে দেওয়ার মাধ্যমে যে ঐশ্বরিক সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল, সেই সংযোগকে সজীব রাখাই হলো ওহীর মূল লক্ষ্য।

রূহ: রব্বুল আলামিনের এক বিশেষ নির্দেশ (আমর) দ্র: আয়াত ১৭:৮৫

রূহের তিনটি ভিন্নতর মাত্রা (আল-কুরআনের আলোকে): 

১. সৃষ্টির রূহ (প্রাণের সঞ্চার): (দ্র: আয়াত ১৫:২৯, ৩৮:৭)

২. ওহীর রূহ (আল-কুরআন): (দ্র: আয়াত ৪২:৫২)

৩. দূত বা ফেরেশতা হিসেবে রূহ: (দ্র: আয়াত ১৬:১০২, ৯৭:৪)

সুক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও অনুধাবন:

আল-কুরআনের আয়াতসমূহ পারস্পরিক সংযুক্ত করলে দেখা যায় যে, রূহ হলো আল্লাহ রব্বুল আলামিন এবং তাঁর সৃষ্টির মধ্যকার সেই ‘সেতুবন্ধন’ বা ‘কানেকশন’। এটি দৃশ্যমান জগতের কোনো বস্তু নয়, বরং অদৃশ্য জগতের (আলমে গায়েব) একটি ঐশ্বরিক শক্তি।

মানুষ কেন রূহ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান পায়নি? ১৭:৮৫ আয়াতে বলা হয়েছে— “তোমাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে সামান্যই”। এর সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হলো, মানুষের জ্ঞান ইন্দ্রিয়নির্ভর (দেখা, শোনা, ছোঁয়া), কিন্তু রূহ হলো ‘আমর’ বা সরাসরি আল্লাহর নির্দেশের বিষয়। তাই এর উৎস ও পরিচালনা পদ্ধতি কেবল রব্বুল আলামিনই জানেন

রূহ ফুঁকে দেওয়া: শ্রেষ্ঠত্বের প্রারম্ভিক বিন্দু:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষ সৃষ্টির প্রক্রিয়া বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁর ফেরেশতাদের উদ্দেশ্য করে বলেন:

“অতঃপর যখন আমি তাকে সুঠাম করবো এবং তাতে আমার ‘রূহ’ থেকে ফুঁকে দেবো (নাফাখতু ফীহি মির রূহী), তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো।” (১৫:২৯, ৩৮:৭২)

এই আয়াতের শব্দগত গাঁথুনি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ‘তাসবিয়া’ বা সুঠাম গঠনের পরই ‘নাফাখ’ বা ফুঁৎকার দেওয়ার বিষয়টি এসেছে। অর্থাৎ মানুষের দৈহিক কাঠামোর পূর্ণতা পায় তখন, যখন তাতে রূহের সঞ্চার ঘটে। এই রূহ সরাসরি আল্লাহ সু.তা. নিজের দিকে নিসবত (সম্পর্কিত) করেছেন, যা মানুষের সুউচ্চ মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।

আল-কুরআন মাজীদ কেবল একটি জীবনবিধান নয়, বরং এটি মানুষের ‘রূহ’ বা আত্মার জন্য অক্সিজেনের মতো অপরিহার্য। আল্লাহ রব্বুল আলামিন ওহীর এই সংযোগকে মানুষের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এই সংযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে এটি বজায় রাখা যায় এবং এর থেকে বিচ্ছিন্ন হলে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে—তা আল-কুরআনের আয়াতসমূহের অভ্যন্তরীণ যোগসূত্র বা ‘নজম’ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

রূহ হিসেবে আল-কুরআন: জীবনের উৎস:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন:

আর ওভাবেই আমরা তোমার প্রতি আমাদের নির্দেশ দ্বারা একটি রূহকে (ওহী/কুরআন) প্রত্যাদেশ করেছি। তুমি জানতে না কিতাব কী আর না ঈমানও। কিন্তু আমরা সেটাকে করেছি একটি ‘নূর’ (আলো) , যার মাধ্যমে আমরা আমাদের বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চাই পথ দেখাই। আর নিশ্চয় তুমি অবশ্যই পথনির্দেশ করছ, সুদৃঢ় পথের দিকে; সেই আল্লাহর পথ, আকাশসমূহের মধ্যে যা রয়েছে এবং পৃথিবীর মধ্যে যা রয়েছে সেটা তাঁর। জেনে রেখ, আল্লাহর দিকেই সকল বিষয় ফিরে যায়-৪২:৫২ (১৭:৯)

এই আয়াতে আল-কুরআনকে ‘রূহ’ হিসেবে অভিহিত করার বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের শারীরিক অস্তিত্বের জন্য যেমন একটি রূহ বা প্রাণের প্রয়োজন, তেমনি তার মানবিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের জন্য ওহীর এই রূহ অপরিহার্য। এখানে ‘রূহ’ এবং ‘নূর’ শব্দ দুটির সহাবস্থান নির্দেশ করে যে, কুরআন কেবল জীবন দান করে না, বরং সেই জীবনকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আলোও প্রদান করে।

সার্বক্ষণিক ওহীর সংযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ? 

জীবন বনাম মৃত্যু: আল-কুরআন মাজীদ মানুষের জন্য কেবল তথ্য নয়, এটি হলো ‘হায়াত’ বা জীবন।

আল্লাহ সু.তা. মুমিনদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন মুমিনদের প্রতি এক বিশেষ আহ্বান জানিয়ে জীবনের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন:

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদের এমন কিছুর দিকে আহ্বান করেন যা তোমাদের জীবন দান করে (লি ইউহয়ি-কুম)।” (৮:২৪)

এই আয়াতের শব্দগত গাঁথুনি অত্যন্ত গভীর। এখানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাক (অর্থাৎ ওহী/আল-কুরআন) অনুসরণ করাকে ‘জীবন লাভ’ বলা হয়েছে। এর যৌক্তিক ও বিপরীতার্থ (antonym) বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে—যিনি এই ডাকে সাড়া দেন না বা ওহীর অনুশীলনীতে নেই, তিনি মূলত ‘জীবিত’ নন, বরং তিনি আধ্যাত্মিকভাবে মৃত। ওহীহীন জীবনকে আল্লাহ রব্বুল আলামিন জীবনের সংজ্ঞাতেই অন্তর্ভুক্ত করেননি।

এখানে ‘জীবন দান করা’ বলতে ওহীর বিধান ও আল-কুরআনের শিক্ষাকে বোঝানো হয়েছে। এর বিপরীত চিত্র হলো—যারা ওহী থেকে বিচ্ছিন্ন, তারা শারীরিকভাবে জীবিত থাকলেও আধ্যাত্মিকভাবে মৃত। আল্লাহ বলেন-

“নিশ্চয় তুমি মৃতদের শোনাতে পারবে না।” (২৭:৮০)। অর্থাৎ, আল-কুরআনের সাথে সংযুক্ত থাকা মানে হলো নিরবচ্ছিন্নভাবে জীবনের খোরাক গ্রহণ করা, আর তা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে হলো আধ্যাত্মিক মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া।

মৃত অবস্থা থেকে জীবনের অভিমুখে: আল-কুরআনের রূপক বিশ্লেষণ:

আল্লাহ সু.তা. সরাসরি মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করার উদাহরণ দিয়ে ওহীর প্রভাব বর্ণনা করেছেন:

“যে ব্যক্তি মৃত ছিল (মাইতান), অতঃপর আমি তাকে জীবিত করলাম এবং তাকে একটি আলো (নূর) দিলাম যা নিয়ে সে মানুষের মধ্যে চলে, সে কি ঐ ব্যক্তির মতো যে অন্ধকারে আছে এবং সেখান থেকে বের হতে পারছে না?” (৬:১২২)

এখানে ‘মাইতান’ (মৃত) বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যে ওহী বা হেদায়েতের আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। আল্লাহ যখন তাকে ওহীর সাথে যুক্ত করেন, তখন তাকে ‘জীবিত’ (আহইয়াইনাহু) বলেন। এই আয়াতটি অকাট্য দলিল যে, আল-কুরআনের চর্চা ও ওহীর সংযোগ ব্যতীত একজন মানুষ আল্লাহর নিকট ‘মৃত’ হিসেবে বিবেচিত।

কুরআন যখন ‘রূহ’: প্রাণহীন দেহের উপমা: অন্ধকার থেকে উত্তরণ: 

আল্লাহ সু.তা. ওহীকে ‘নূর’ বা আলো হিসেবে অভিহিত করেছেন: “আমি একে ‘নূর’ করেছি যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করি।” (৪২:৫২)। এই আলো ছাড়া মানুষের জীবন একটি গহীন অন্ধকার গহ্বর, যেখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা অসম্ভব।

ওহী যখন ‘রূহ’: প্রাণের স্বাভাবিক স্পন্দন

সৃষ্টির শুরুতে আল্লাহ মানুষের দেহে ‘রূহ’ ফুঁকে দিয়েছেন (১৫:২৯)। সেই রূহকে সজীব রাখার জন্য তিনি ওহীকেও ‘রূহ’ হিসেবে নাযিল করেছেন (৪২:৫২)। দেহ যেমন শ্বাস নেওয়ার জন্য পরিশ্রম করে না, এটি একটি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া; তেমনি ওহীর সংযোগকেও আল্লাহ মুমিনের জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় ‘রূহানি শ্বাস-প্রশ্বাসে’ পরিণত করেছেন।

আর আমরা জানি, একটি মানবদেহ ততক্ষণই সজীব যতক্ষণ তাতে রূহ বা আত্মা থাকে। রূহ বেরিয়ে গেলে দেহটি লাশে পরিণত হয়। যেহেতু আল্লাহ ওহীকে ‘রূহ’ বলেছেন, সেহেতু ওহীর চর্চা বা অনুশীলন থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি আসলে একটি ‘আধ্যাত্মিক লাশ’। তার হৃদপিণ্ড সচল থাকলেও ওহীর সংযোগহীনতার কারণে তার অন্তরাত্মা বা রূহ মৃত।

আল কুরআন স্টাডি-অনুশীলণই রূহ-এর খোরাক: 

যেমন দেহকে বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি রূহকে সজীব রাখতে আল-কুরআনের তেলাওয়াত ও অনুশীলনের প্রয়োজন। সালাত, জিকির এবং তেলাওয়াত—এগুলো কোনো যান্ত্রিক কাজ নয়, বরং ওহীর সংযোগের মাধ্যমে রুহানি শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যম।

আল-কুরআনে ‘রূহ’ শব্দটি ফেরেশতা জিবরাইল (সালামুন আলাইহে)-এর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে (১৬:১০২ - রূহুল কুদুস)। এর মাধ্যমে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ওহী হলো একটি উচ্চতর জগত থেকে আসা স্বর্গীয় শক্তি। যখন একজন বান্দা ১০:৬১ আয়াত অনুযায়ী কুরআনের অনুশীলনীতে মগ্ন থাকে, তখন সে মূলত পার্থিব জগতের ঊর্ধ্বে উঠে সেই স্বর্গীয় রূহের সাথে নিজেকে সংযুক্ত করে। এটিই তাকে ‘মা’ঈশাতান ধাংকা’ বা সংকীর্ণ জীবন (২০:১২৪) থেকে মুক্তি দিয়ে এক প্রশস্ত ও প্রশান্ত জীবনের অধিকারী করে।

সর্বাবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন স্মরণ (সার্বক্ষণিক জিকির), নাযিলকৃত অহীর সাথে সংযুক্ত থাকা (কুরআন স্টাডি ও চর্চায়) ও আল্লাহর পর্যবেক্ষণ:  

সংযোগ বজায় রাখার জন্য কোনো বিশেষ স্থান বা সময়ের প্রয়োজন নেই। 

আল-কুরআন মাজীদ মুমিনদের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে যেখানে শারীরিক কোনো সীমাবদ্ধতা স্মরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না:

➢ “যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে (পার্শ্বশায়িত অবস্থায়) আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে।” (৩:১৯১)

এখানে তিনটি মৌলিক শারীরিক অবস্থার (কিয়াম, কুঊদ ও জুনুব) কথা বলা হয়েছে যা মানুষের সকল অবস্থাকেই শামিল করে। 

আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষের বাহ্যিক কাজ এবং অভ্যন্তরীণ ভাবনার মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না। তিনি ঘোষণা করেন:

➢ এবং তুমি যেকোনো অবস্থার মধ্যেই থাক (মা তাকুনু ফী শানিন) আর কুরআনের মধ্য থেকে সেটার যতটুকুই তুমি তিলাওয়াত করো এবং তোমাদের ওপর যদি আমরা সাক্ষী না থাকি তোমরা কোনো কাজই করতে পারো না, যখন তোমরা তাতে নিয়োজিত হও। পৃথিবীর মধ্যে আর না আকাশের মধ্যে ক্ষুদ্রতর পরিমাণের কোনোকিছু আর না সেটার চেয়ে ক্ষুদ্রতর আর না বৃহত্তর, তোমার রব হতে অগোচর হয়, সুস্পষ্ট কিতাবের অন্তর্গত ব্যতীত; -১০:৬১ 

এর সাথে ১০:৬১ আয়াতের ‘যে কোনো অবস্থা’ (মা তাকুনু ফী শানিন)-এর একটি গভীর সংযোগ রয়েছে। জিকির বা স্মরণ কেবল মসজিদে বা জায়নামাজে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে, অবসরে বসে কিংবা বিশ্রামের সময় শুয়েও মানুষের অন্তর রব্বুল আলামিনের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে।

অর্থাৎ কাজের ফাঁকে, বিশ্রামে বা চলাচলের সময় অন্তরে আল্লাহর আয়াতের গুঞ্জন রাখাই হলো সহজতম উপায়।

এই আয়াতে ‘শায়েন’ (অবস্থা) এবং ‘আমাল’ (কাজ)-এর মাঝে ‘কুরআন থেকে তেলাওয়াত’ শব্দটিকে স্থাপন করা হয়েছে। এর একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হলো—মানুষের দৈনন্দিন কর্মতৎপরতা এবং তার মানসিক অবস্থার সেতুবন্ধন হলো আল-কুরআন। আপনি যখন কাজে মগ্ন, তখনো আপনার অন্তরে কুরআনের আয়াতের প্রতিধ্বনি থাকতে হবে, কারণ আল্লাহ আপনাকে প্রত্যক্ষ করছেন। এখানে তেলাওয়াতকে কেবল ওষ্ঠ সঞ্চালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘প্রত্যক্ষদর্শীর’ উপস্থিতিতে একটি জীবন্ত অনুশীলনের রূপ দেওয়া হয়েছে।

রাত-বিরাত কর্মব্যস্ততা, সুস্থ্যতা-অসুস্থ্যতা, কামাই রোজগার, লড়াই-সংগ্রাম, দেশ কিংবা বিদেশ সর্বাবস্থায় কুরআনের সংযোগে থাকার আদেশ:

➢ অতএব, কুরআন হতে যা সহজ হয়, তা তোমরা পাঠ করবে। তিনি জানেন যে, অচিরেই তোমাদের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে এবং অন্য অনেকে পৃথিবীর মধ্যে ভ্রমণ করবে, আল্লাহর কোনো বিশেষ অনুগ্রহ হতে সন্ধান করতে। আর অন্য অনেকে আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করবে। সুতরাং সেটা থেকে তোমরা তা পাঠ করো, যা সহজ হয়-আয়াত ৭৩:২০

সালাতের আনুষ্ঠানিকতার পরও সংযুক্ত থাকার আদেশ -পরবর্তী জিকির ও কর্মচাঞ্চল্য:

সালাত হলো আল্লাহর স্মরণের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি (২০:১৪), কিন্তু সালাত শেষ হওয়া মানে জিকির শেষ হওয়া নয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

“অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো যাতে তোমরা সফলকাম হও।” -আয়াত ৬২:১০

এই আয়াতে ‘পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া’ (কর্মতৎপরতা) এবং ‘আল্লাহকে অধিক স্মরণ করা’ (জিকির)-কে একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ কাজ এবং জিকির পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। অনুরূপভাবে ভয়ের অবস্থায় বা যুদ্ধের ময়দানেও সালাত সংক্ষেপ করার অনুমতি দিয়ে আল্লাহ বলেন:

“অতঃপর যখন তোমরা সালাত সম্পন্ন করবে তখন দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করো।” -আয়াত  ৪:১০৩

অন্তরের প্রশান্তি ও সুরক্ষাকবচ:

আল-কুরআন মাজীদ পাঠ বা তেলাওয়াত কেন জরুরি? এর ব্যাখ্যায় আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

“তোমার প্রতি যে কিতাব ওহী করা হয়েছে তা তেলাওয়াত করো এবং সালাত কায়েম করো... আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ।” (২৯:৪৫)

এখানে ‘তেলাওয়াত’ মানে কেবল পাঠ নয়, বরং এর অনুসরণ ও অনুশীলন। এটিই অন্তরের প্রধান খোরাক।

এখানে ‘তেলাওয়াত’ হলো জিকিরের প্রাণশক্তি। যখন কোনো ব্যক্তি কুরআন থেকে তেলাওয়াত করে (১০:৬১), তখন সে মূলত আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া ভাষাতেই তাঁর সাথে কথোপকথন করে। আল-কুরআনের বিপরীত চিত্র হলো ‘বিস্মৃতি’। আল্লাহ বলেন, “তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহ তাদের নিজেদের সত্তাকেই ভুলিয়ে দিয়েছেন।” (৫৯:১৯)। 

এই ‘ভুলে যাওয়া’ (নিসইয়ান) হলো জিকিরের বিপরীতার্থক শব্দ। জিকির মানুষকে নিজের প্রকৃত পরিচয় ও স্রষ্টার সাথে তার সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়।

কুরআনের সাথে সংযুক্ত থাকা মানে আল্লাহর সাথে কানেকটেড থাকা: প্রমাণ-

➢ নিশ্চয় আমি, আমিই আল্লাহ। আমি ছাড়া ইলাহ নেই। অতএব, আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণের জন্য সলাত প্রতিষ্ঠা করো (ওয়া আকিমুসসালাতি লিযিকরি)-আয়াত ২০:১৪ (আরও দ্র: ৬:১১৪-১১৫)

আল-কুরআনের নজম বা বিন্যাস অনুসারে, ‘জিকির’ শব্দটি কখনো সরাসরি কুরআনের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন: “নিশ্চয় আমিই এই জিকির (কুরআন) নাযিল করেছি এবং আমিই এর রক্ষক।” (১৫:৯)। সুতরাং কুরআন তেলাওয়াত করাই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ জিকির (২৯:৪৫)। যখন বান্দা আল-কুরআন থেকে তেলাওয়াত করে, তখন সে মূলত আল্লাহর ‘রশি’ বা সুতোর সাথে যুক্ত হয়। এই সংযোগই তাকে দুনিয়াবী মোহ ও অশ্লীলতা থেকে সুরক্ষা দেয়।

এভাবে  কতক্ষন সংযুক্ত থাকবো?

➥ ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো, বেশি বেশি স্মরণ (যিকরান কাছিরান)-আয়াত ৩৩:৪১

➥ এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণকারী পুরুষরা ও স্মরণকারী নারীরা-আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন-আয়াত ৩৩:৩৫

■ মনগড়া মতবাদ কিংবা লাহওয়াল হাদিস ভিত্তিক নয় একমাত্র আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে যা আল কুরআনে যেভাবে যা বলা হয়েছে সেভাবেই স্মরণ-অনুসরণ, সংযুক্ত থাকার পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে:

আল্লাহকে কীভাবে স্মরণ করতে হবে, তার জন্য আল্লাহ সু.তা. মানুষকে স্বীয় বুদ্ধিবৃত্তির ওপর ছেড়ে দেননি। তিনি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:

“অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করো যেভাবে তিনি তোমাদের শিখিয়েছেন যা তোমরা জানতে না।” -আয়াত ২:২৩৯

এই আয়াতের ‘কামা আল্লামাকুম’ (যেভাবে তিনি তোমাদের শিখিয়েছেন) কথাটি সরাসরি নির্দেশ করে যে, জিকির বা স্মরণের পদ্ধতি হতে হবে ওহী-নির্ভর। এই ওহীর চূড়ান্ত রূপ হলো আল-কুরআন মাজীদ। আবার সূরা আর-রহমানে আল্লাহ বলেন, “দয়াময় আল্লাহ, তিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন।” (৫৫:১-২)। অর্থাৎ কুরআন শিক্ষা দেওয়া এবং জিকির বা স্মরণের পদ্ধতি শিখিয়ে দেওয়া একই সূত্রের গাঁথুনি। যারা আল্লাহকে স্মরণ করতে চায়, তাদের জন্য আল-কুরআনের আয়াতসমূহ অনুশীলন করাই হলো সেই ‘শেখানো পদ্ধতি’।

আরও দেখুন আয়াত: ২:১৯৮, ৭৫:১৬-১৯, ২৯:৪৫

অহীর চর্চা বা অনুশীলণী তথা আল-কুরআন থেকে বিচ্ছিন্ন হলে একজন বিশ্বাসীর পরিণতি

ওহীর এই ‘রূহ’ বা সংযোগ থেকে বিচ্যুত হওয়া একজন বিশ্বাসীর জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। আল-কুরআনে এর তিনটি ভয়াবহ স্তর বর্ণনা করা হয়েছে:

আল-কুরআন মাজীদ কেবল পাঠের কোনো কিতাব নয়, বরং এটি একটি ‘নূর’ বা আলো (৫:১৫)। যখন কোনো সত্তা এই আলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তার জীবন ও অস্তিত্বে এক চরম বিপর্যয় নেমে আসে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন আল-কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, তাঁর জিকির বা স্মরণ (যা মূলত আল-কুরআন) থেকে বিমুখ হলে মানুষের পার্থিব ও অপার্থিব জীবনে কী ভয়াবহ শূন্যতা তৈরি হয়।

১. সুরক্ষা কবচ হারানো (ইনসালাখা) ও ভ্রষ্টতা :

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আল-কুরআনে একজন জ্ঞানবান ব্যক্তির দৃষ্টান্ত দিয়েছেন, যে আল্লাহর আয়াতসমূহ প্রাপ্ত হওয়ার পরও তা থেকে বিচ্যুত হয়েছে:

“আর তুমি তাদের কাছে সেই ব্যক্তির সংবাদ পাঠ করো, যাকে আমি আমার আয়াতসমূহ দিয়েছিলাম, অতঃপর সে তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল (ফাস্সালাখা মিনহা), ফলে শয়তান তার পিছু নিল এবং সে বিভ্রান্তদের (গাওয়ীন) অন্তর্ভুক্ত হলো।” (৭:১৭৫)

এখানে ‘ইনসালাখা’ (انْسَلَخَ) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর আক্ষরিক অর্থ হলো চামড়া ছিলে ফেলা বা খোলস ত্যাগ করা। যেমন একটি সাপ তার খোলস ত্যাগ করে অরক্ষিত হয়ে পড়ে, তেমনি কোনো ব্যক্তি যখন আল্লাহর আয়াত বা জিকির অনুশীলন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়, তখন সে তার আধ্যাত্মিক সুরক্ষা কবচ হারিয়ে ফেলে। 

যখনই কোনো মানুষ আল্লাহর আয়াতসমূহ (৭:১৭৫) থেকে ‘ইনসালাখা’ বা বিচ্ছিন্ন হয়, তখনই তার ওপর শয়তানের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহ বলছেন, “অতঃপর শয়তান তার পিছু নিল (আত্ববা‘আহুশ শয়তান)।” (৭:১৭৫)।

এই আয়াতের সাথে ১০:৬১ আয়াতের একটি নিবিড় সংযোগ রয়েছে; সেখানে তেলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর পর্যবেক্ষণে থাকার কথা বলা হয়েছে, আর এখানে তেলাওয়াত ও আয়াত থেকে বিচ্যুত হওয়ার ফলে ‘অরক্ষিত’ হওয়ার চিত্র ফুটে উঠেছে।

যখন কোনো ব্যক্তি সচেতনভাবে আল-কুরআনের দিকনির্দেশনা এড়িয়ে চলে, তখন তার আধ্যাত্মিক শূন্যস্থানটি শয়তান দখল করে নেয়। আল্লাহ সু.তা. এই মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক পরণামটি বর্ণনা করেছেন এভাবে:

“যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর জিকির (স্মরণ/কুরআন) থেকে বিমুখ হয় (ইয়া’শু), আমি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করি, অতঃপর সে হয় তার সহচর (কারিন)।” (৪৩:৩৬)

এর ফলশ্রুতিতে যা ঘটে তা অত্যন্ত ভয়ংকর: “অবশ্যই তারা (শয়তানরা) মানুষকে সৎপথ থেকে বাধা দেয়, অথচ মানুষ মনে করে তারা সঠিক পথেই (মুহতাদুন) আছে।” (৪৩:৩৭)। অর্থাৎ, কুরআন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চূড়ান্ত শাস্তি হলো নিজের ভুলকে সঠিক মনে করা, যা তাকে তওবা বা সংশোধনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করে।

পার্থিব জীবনের সংকীর্ণতা ও অন্তরের অশান্তি:

মানুষের সুখ ও শান্তি কেবল বস্তুগত সচ্ছলতার ওপর নির্ভর করে না। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

“আর যে আমার জিকির (স্মরণ/কুরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য অবশ্যই হবে এক সংকীর্ণ জীবন (মা’ঈশাতান ধাংকা)।” (২০:১২৪)

এখানে ‘সংকীর্ণ জীবন’ বলতে কেবল অভাব-অনটন বোঝায় না, বরং এটি অন্তরের এমন এক অস্থিরতা যেখানে প্রাচুর্য থাকলেও শান্তি থাকে না। এর বিপরীতে আল্লাহ বলেন, “জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (১৩:২৮)। অর্থাৎ, আল-কুরআনের সংস্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানেই হলো প্রশান্তি (ইতমিনান) হারিয়ে এক অশান্ত ও সংকীর্ণ গোলকধাঁধায় নিপতিত হওয়া।

আত্ম-পরিচয় বিস্মৃতি ও অবক্ষয়:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের সতর্ক করেছেন যে, তাঁর স্মরণ ছেড়ে দিলে মানুষ আসলে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে:

“তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে; ফলে আল্লাহ তাদের নিজেদের সত্তাকেই ভুলিয়ে দিয়েছেন। তারাই তো ফাসেক বা পাপাচারী।” (৫৯:১৯)

এই আয়াতের অভ্যন্তরীণ ইঙ্গিত হলো—আল-কুরআন মানুষকে তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও প্রকৃত স্বরূপ মনে করিয়ে দেয়। যখন কেউ কুরআনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তখন সে তার মানবিক মূল্যবোধ ও অস্তিত্বের উচ্চতর চেতনা হারিয়ে ফেলে এবং পশুর ন্যায় কেবল জৈবিক তাড়নায় লিপ্ত হয়।

নাযিলকৃত অহী তথা আল কুরআনের সাথে সংযুক্ত না থাকলে কী হয়?:

হৃদয় কঠিন হওয়া ও আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব: অন্ধকার ও কাঠিন্য:

যে ব্যক্তি ওহীর রূহ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখে, তার অন্তরের অবস্থা আল্লাহ বর্ণনা করেছেন এভাবে:

সালামুন আলা মূসা-এর জাতির উদাহরণ দিয়ে আল্লাহ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, জিকির বা কিতাবের সাথে দীর্ঘ দূরত্ব অন্তরকে পাথর সদৃশ করে দেয়:

➥ তবে কি যার বক্ষ আল্লাহ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, ফলে সে তার রবের পক্ষ থেকে আগত আলোর (নূর) ওপর রয়েছে (সে কি তার সমান যে অন্ধকারে আছে)? দুর্ভোগ সেই সব কঠোর হৃদয়ের অধিকারীদের জন্য, যারা আল্লাহর জিকির (কুরআন) থেকে বিমুখ। (৩৯:২২)

➥ যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য কি সময় হয়নি যে, তাদের অন্তরগুলো আল্লাহর স্মরণে ভীত হবে ও সত্য হতে যা নাযিল হয়েছে এবং তারা তাদের মতো হবে না ইতোপূর্বে যাদের কিতাব দেয়া হয়েছিল! এরপর তাদের উপর সময় দীর্ঘায়িত হলো। ফলে তাদের অন্তরগুলো শক্ত হয়ে গিয়েছে এবং তাদের মধ্য হতে অধিকাংশই ফাসিক-57:16

অন্যদিকে, যারা কুরআনের সাথে থাকে তাদের অবস্থা বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন, “যাতে তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর জিকিরে নরম হয়ে যায়।” (৩৯:২৩)। সুতরাং, আল-কুরআন থেকে দূরে থাকা মানেই হলো হৃদয়ের কোমলতা ও সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলা।

এখানে ‘বক্ষ উন্মুক্ত করা’ এবং ‘হৃদয় কঠোর হওয়া’—এই দুটি বিপরীত অবস্থার মূলে রয়েছে ওহীর সাথে সংযোগ। রূহ যেমন দেহকে নমনীয় ও সচল রাখে, কুরআনের রূহও তেমনি মানুষের অন্তরকে ‘নরম’ ও ‘সংবেদনশীল’ রাখে (৩৯:২৩)।

কুরআনহীন জীবন অন্ধকার ও কবরের সাথে তুলনা:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন জীবিত ও মৃতের পার্থক্য করতে গিয়ে ওহী গ্রহণকারী ও বর্জনকারীর তুলনা দিয়েছেন:

“জীবিত ও মৃত সমান হতে পারে না। নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শোনান, আর তুমি তাদের শোনাতে পারবে না যারা কবরে (মা ফিল কুবুর) রয়েছে।” (৩৫:২২)

এই আয়াতে যারা ওহীর আয়াতসমূহ শুনেও অনুধাবন করে না বা অনুশীলন করে না, তাদের ‘কবরস্থ’ ব্যক্তিদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ওহীর সংযোগহীন ব্যক্তি আল্লাহর দৃষ্টিতে কবরে শায়িত লাশের মতো, যার কাছে সত্যের বাণী পৌঁছালেও কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। অনুরূপভাবে বলা হয়েছে, “নিশ্চয় তুমি মৃতদের (মাউতা) শোনাতে পারবে না।” (২৭:৮০)। এখানে মৃত বলতে সেই সব ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যারা ওহীর অনুশীলন ছেড়ে নিজেদের হৃদয়কে সত্যের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে।

বিচ্ছিন্নতা ও পচনের প্রক্রিয়া (ইনসালাখা):

সূরা আল-আ’রাফের ১৭৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন যাকে তাঁর আয়াতসমূহ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সে তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল (ফাস্সালাখা মিনহা)। এই ‘ইনসালাখা’ শব্দটি যেমন মৃত পশুর চামড়া ছিলে ফেলার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, তেমনি ওহী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে হলো নিজের জীবনের আসল আবরণ ও সুরক্ষাকবচ হারিয়ে ফেলা। এর পরিণামে শয়তান তার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং সে রূহানিভাবে ধ্বংস বা মৃত হয়ে যায়।

পরকালের ভয়াবহ বিস্মৃতি ও অন্ধত্ব:

দুনিয়াতে যারা আল-কুরআনের আয়াতসমূহ দেখেও না দেখার ভান করে বা তা অনুশীলন থেকে বিরত থাকে, কিয়ামতের দিন তাদের অবস্থা হবে অত্যন্ত করুণ:

“যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে... আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উঠাবো। সে বলবে—হে আমার রব! কেন আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালে? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। তিনি বলবেন—অনুরূপভাবেই তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে; ঠিক সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হবে (পরিত্যক্ত করা হবে)।” (২০:১২৪-১২৬)

এখানে ‘ভুলে যাওয়া’ (নাসাইতা) শব্দটি জিকিরের বিপরীত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি একটি আধ্যাত্মিক ও যৌক্তিক বিনিময়—দুনিয়াতে আপনি আল্লাহর কিতাবকে ত্যাগ করলে, পরকালে আল্লাহর রহমত আপনাকে ত্যাগ করবে।

ওহীর সংযোগ হলো একটি আধ্যাত্মিক নাড়ীর বন্ধন। আল-কুরআনকে ‘রূহ’ বলার কারণই হলো এটি মানুষের মৃতপ্রায় চেতনাকে সজীব রাখে। যখন কোনো বিশ্বাসী ১০:৬১ আয়াত অনুযায়ী তেলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর পর্যবেক্ষণে থাকে এবং ৩:১৯১ অনুযায়ী সর্বাবস্থায় জিকিরে মগ্ন থাকে, তখন তার অন্তর প্রশান্ত হয় (১৩:২৮)। কিন্তু ৭:১৭৫ অনুযায়ী এই সংযোগ ছিঁড়ে ফেললে সে শয়তানের শিকারে পরিণত হয়। সুতরাং, ওহীর সংযোগ বজায় রাখা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি ঈমানি অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র রক্ষাকবচ।

ওহীর সংযোগ বজায় রাখার সহজ উপায়:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আল-কুরআনকে মানুষের জন্য সহজ করে দিয়েছেন যাতে কেউ একে নিজের জীবনের অংশ করতে গিয়ে ভারাক্রান্ত বোধ না করে। তিনি ঘোষণা করেন:

“নিশ্চয় আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি স্মরণের (জিকির) জন্য; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?” -৫৪:১৭, ৫৪:২২, ৫৪:৩২, ৫৪:৪০ (৭৩:২০)

এই আয়াতসমূহে ‘সহজ’ (ইয়াস্সারনা) এবং ‘জিকির’ (স্মরণ) শব্দ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বুঝিয়েছেন যে, তাঁর আয়াতসমূহ এমনভাবে বিন্যস্ত যা মানুষের চেতনার সাথে সহজেই মিলে যায়। এটি কোনো জটিল দর্শন নয়, বরং জীবনের প্রতিটি বাঁকে রব্বুল আলামিনকে অনুভব করার এক সহজাত ব্যাকরণ।


ওহীর সংযোগ ও রূহের খোরাক, দৃঢ়তা কামনায় আল-কুরআনের প্রাসঙ্গিক দুআসমূহ:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে তাঁর প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করতে হবে:

 আল-কুরআন মাজীদ থেকে সংকলিত এই দুআসমূহ আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সাহায্য, হেদায়েত এবং সুরক্ষা লাভের শক্তিশালী মাধ্যম। 


আল্লাহর পবিত্রতা ও জ্ঞান লাভের দুআ (২:৩২)

سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ

উচ্চারণ: সুবহানাকা লা ‘ইলমা লানা ইল্লা মা ‘আল্লামতানা, ইন্নাকা আনতাল ‘আলীমুল হাকীম।

অর্থ: “পবিত্রতা তোমারই! তুমি আমাদের যা শিখিয়েছ তা ছাড়া আমাদের তো কোনো জ্ঞান নেই। নিশ্চয় তুমি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”

জ্ঞান বৃদ্ধির দুআ (২০:১১৪)

 رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا
উচ্চারণ: রাব্বি জিদনী ‘ইলমা।
অর্থ: “হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও।”

হেদায়েতের ওপর অবিচল থাকার দুআ (৩:৮)

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
উচ্চারণ: রাব্বানা লা তুজিগ কুলুবানা বা‘দা ইজ হাদায়তানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্হাব।

অর্থ: “হে আমাদের রব! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনে প্রবৃত্ত করো না এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করো। নিশ্চয় তুমিই মহাদাতা।”

সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসের ঘোষণা (২৬:৭৮)
(সালামুন আলা ইব্রাহীম-এর উক্তি)

 الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ
উচ্চারণ: আল্লাযী খালাকানী ফাহুয়া ইয়াহদীন।

অর্থ: “যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাকে পথ প্রদর্শন করেন।”

ক্ষমা ও রহমত লাভের দুআ (২৩:১০৯)

 رَبَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ
উচ্চারণ: রাব্বানা আমান্না ফাগফির লানা ওয়ারহামনা ওয়া আন্তা খাইরুর রাহিমীন।

অর্থ: “হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং তুমি আমাদের ক্ষমা করো ও আমাদের ওপর দয়া করো, তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”

সত্যের সাক্ষী হওয়ার দুআ (৩:৫৩)

رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ
উচ্চারণ: রাব্বানা আমান্না বিমা আনজালতা ওয়াত্তাবা‘নার রাসূলা ফাকতুবনা মা‘আশ শাহিদীন।

অর্থ: “হে আমাদের রব! তুমি যা নাযিল করেছ আমরা তাতে ঈমান এনেছি এবং আমরা রাসূলের আনুগত্য করেছি; সুতরাং আমাদের সাক্ষ্যদানকারীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করো।”

বিপদ ও সংকটে সঠিক পথের দুআ (১৮:১০)
(আসহাবে কাহাফের দুআ)

رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রাহমাতান ওয়া হায়্যি’ লানা মিন আমরিনা রাশাদা।

অর্থ: “হে আমাদের রব! তোমার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করো এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করার ব্যবস্থা করে দাও।”

নূর বা আলো পূর্ণতা লাভের দুআ (৬৬:৮)

 رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
উচ্চারণ: রাব্বানা আতমিম লানা নূরানা ওয়াগফির লানা, ইন্নাকা ‘আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর।

অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পূর্ণ করে দাও এবং আমাদের ক্ষমা করো। নিশ্চয় তুমি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।”

আল্লাহর ওপর ভরসার দুআ (৯:১২৯)

حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ ۖ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
উচ্চারণ: হাসবিয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়া, ‘আলাইহি তাওয়াক্কালতু ওয়া হুয়া রাব্বুল ‘আরশিল ‘আযীম।

অর্থ: “আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁরই ওপর ভরসা করেছি এবং তিনি মহা আরশের অধিপতি।”

তওবা ও আত্মশুদ্ধির দুআ (৭:২৩)

 رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

উচ্চারণ: রাব্বানা যালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরীন।

অর্থ: “হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো এবং আমাদের ওপর দয়া না করো, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবো।”

শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয়ের দুআ (২৩:৯৭-৯৮)

 رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ ، وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونِ
উচ্চারণ: রাব্বি আ‘উযুবিকা মিন হামাযাতিশ শায়াতীন, ওয়া আ‘উযুবিকা রাব্বি আই ইয়াহদুরূন।

অর্থ: “হে আমার রব! আমি শয়তানের প্ররোচনা থেকে তোমার আশ্রয় চাচ্ছি। এবং হে আমার রব! তারা আমার কাছে উপস্থিত হওয়া থেকেও তোমার আশ্রয় চাচ্ছি।”

সত্যের সাথে প্রবেশ ও প্রস্থানের দুআ (১৭:৮০)

 رَّبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَاجْعَل لِّي مِن لَّدُنكَ سُلْطَانًا نَّصِيرًا
উচ্চারণ: রাব্বি আদখিলনী মুদখালা সিদকিন ওয়া আখরিজনী মুখরাজা সিদকিন ওয়াজ‘আল লী মিল্লাদুনকা সুলতানান নাসীরা।

অর্থ: হে আমার রব! আমাকে যেখানেই প্রবেশ করাবে কল্যাণের সাথে (সত্যের সাথে) প্রবেশ করাও এবং যেখান থেকেই বের করবে কল্যাণের সাথে (সত্যের সাথে) বের করাও; আর তোমার পক্ষ থেকে আমাকে এক সাহায্যকারী শক্তি দান করো।”


আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে এই পবিত্র আয়াতসমূহের মাধ্যমে তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার এবং ওহীর নূরে জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। রব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দুআ!

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post