আমরা কি রাসুলের ‘কওম’ নাকি ‘উম্মত’? উম্মতে মুহাম্মদী? তাহলে কোনটি অধিক সঠিক? —আল-কুরআন অনুধাবনে Qawm vs. Ummah

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

কওম বনাম উম্মত: আমরা কি রাসুলের ‘কওম’, নাকি ‘উম্মত’? 

আল-কুরআনে কি ‘উম্মতে মুহাম্মদী’ শব্দবন্ধটি নেই? তাহলে কোনটি অধিক সঠিক? —আল-কুরআন অনুধাবনে-

আল-কুরআন মাজীদ কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং এটি মহাবিশ্বের গাণিতিক ও ভাষাগত সুষমার এক অপূর্ব নিদর্শন। এখানে প্রতিটি শব্দের প্রয়োগ সুনির্দিষ্ট অর্থ ও প্রেক্ষাপট বহন করে। ‘উম্মত’ এবং ‘কওম’ শব্দ দুটিকে আমরা সচরাচর একইভাবে ব্যবহার করলেও, আল-কুরআনের আয়াতসমূহ এদের মাঝে এক সুক্ষ্ম ও মৌলিক পার্থক্য রেখা টেনে দিয়েছে। বিশেষ করে সূরা আল-আনআমে পশুপাখিদের জন্য ‘উম্মত’ শব্দের ব্যবহার এই আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

নিচে আল-কুরআনের আয়াত দ্বারা আয়াতের ব্যাখ্যা পদ্ধতিতে এর একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরার চেষ্টা করছি, বিঈযনিল্লাহ!

‘উম্মত’ (أمة): সৃষ্টির সাধারণ ও পদ্ধতিগত বিন্যাস:

আল-কুরআনে ‘উম্মত’ শব্দটি কেবল মানুষের কোনো বিশ্বাসী গোষ্ঠীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি, বরং এটি সৃষ্টির প্রতিটি প্রজাতির এক একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি বা ব্যবস্থা (System) হিসেবেও এসেছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেন:

আর পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণী আছে এবং নিজ দুই ডানায় ভর করে ওড়ে এমন যত পাখি আছে, তারা সবাই তোমাদের মতোই এক একটি উম্মত (Umamun/أُمَمٌ)।” (৬:৩৮)

তদাব্বুর বা অনুধাবন: এখানে পশুপাখিদের ‘উম্মত’ বলার মাধ্যমে আল্লাহ সু.তা. স্পষ্ট করেছেন যে, ‘উম্মত’ হলো এমন একটি গোষ্ঠী যারা একটি নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক নিয়ম, জীবনধারা বা ব্যবস্থার অধীনে ঐক্যবদ্ধ। অর্থাৎ ‘উম্মত’ একটি সিস্টেম বা প্রজাতি। মানুষের ক্ষেত্রেও ‘উম্মত’ মূলত সেই আদর্শিক দল যারা একটি নির্দিষ্ট বিধান বা জীবনব্যবস্থার (সিস্টেম) অধীনে একত্রিত হয়েছে।

‘কওম’ (Qawm): সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নবুওয়াতের লক্ষ্যস্থল:

বিপরীতভাবে, আল-কুরআনে ‘কওম’ শব্দটি মূলত একটি বংশীয়, ভৌগোলিক ও ভাষাগত পরিচয়কে নির্দেশ করে। নবী ও রাসূলগণ কোনো প্রজাতির কাছে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে প্রেরিত হন।

 - লক্ষ্যস্থল: আল্লাহ সু.তা. বলেন- 

“আমি প্রত্যেক রাসূলকে তাঁর কওমের Qawmihi)  ভাষা ছাড়া পাঠাইনি...” (১৪:৪)। 

এখানে পশুপাখিদের মতো কেবল প্রজাতিগত মিল যথেষ্ট নয়, বরং ভাষা ও সামাজিক বন্ধন গুরুত্বপূর্ণ।

  - রাসূলের সম্বোধন: মুহাম্মদ (সা.) যখন তাঁর সমসাময়িকদের সতর্ক করতেন, তখন তিনি ‘কওম’ শব্দটিই ব্যবহার করতেন। কিয়ামতের দিন তাঁর  অভিযোগটিও হবে এই শব্দে: 

হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমার কওম (Qawmi/قَوْمِي) এই কুরআনকে বর্জনীয় হিসেবে গ্রহণ করেছিল।” (২৫:৩০)

কেন ‘উম্মতে মুহাম্মদী’ পরিভাষাটি কুরআনে নেই?

আল-কুরআন মাজীদের শব্দগত গাঁথুনি অনুযায়ী, বিশ্বাসীদের পরিচয় কোনো নির্দিষ্ট নবীর নামে সীমাবদ্ধ না করে এক সর্বজনীন রূপ দান করা হয়েছে।

১. আল্লাহ-প্রদত্ত নাম: আল্লাহ সু.তা. আমাদের কোনো নবীর নামে নয়, বরং সরাসরি আমাদের কাজের ভিত্তিতে নাম দিয়েছেন:

“তিনি (আল্লাহ) তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম’ (Muslimin/الْمُسْلِمِينَ)—পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে এবং এতেও (কুরআনে)।” (২২:৭৮)

২. আদর্শিক গুণাবলী: মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর অনুসারীদের যখন ‘উম্মত’ বলা হয়েছে, তখন সেখানে একটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে:

তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত (খাইরা উম্মাতিন), যাদের মানবজাতির কল্যাণের জন্য বের করা হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎকাজে বাধা দাও...” (৩:১১০)

এখানে ‘উম্মত’ হওয়া কোনো বংশগত অধিকার নয়, বরং দায়িত্বপালন সাপেক্ষে একটি বিশেষ সম্মান।

গভীর অনুধ্যান: ‘উম্মত’ বনাম ‘কওম’:

আল-কুরআনের নজম বা বিন্যাস অনুযায়ী, নবীগণ কোনো ধর্মীয় উপদল (Cult) তৈরি করতে আসেননি। তারা পুরো ‘কওম’কে আল্লাহর দিকে ডাকতে এসেছেন। ‘উম্মতে মুহাম্মদী’ বা ‘উম্মতে মূসা’—এভাবে নবীদের নামে যদি উম্মতের নামকরণ করা হতো, তবে তা ‘মিল্লাতে ইব্রাহিম’ বা একত্ববাদী আদর্শের সার্বজনীনতাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সংকুচিত করে ফেলত। সম্ভবত একারণেই আল্লাহ সু.তা. সরাসরি নবীর নামে উম্মতের নামকরণ না করে গুণবাচক ‘উম্মত’ এবং সামষ্টিক নাম ‘মুসলিম’ ব্যবহার করেছেন।

সারসংক্ষেপ:

আল-কুরআনের আয়াতসমূহ এবং তাদের পারস্পরিক সামঞ্জস্যতা থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে:

কওম (Qawm): এটি হলো নবুওয়াত বা রিসালাতের মূল লক্ষ্যস্থল। এটি একটি নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত পরিচয় (৬:৬৬, ১৪:৪)। 

উম্মত (Ummat): এটি একটি পদ্ধতিগত, আদর্শিক বা প্রজাতিগত পরিচয়। যে কোনো গোষ্ঠী যারা একই নিয়মের অধীনে চলে, তারাই উম্মত—হোক তারা পাখি (৬:৩৮) কিংবা সত্যনিষ্ঠ কোনো দল (৭:১৫৯)। 

মুসলিম (Muslim): এটি হলো মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর অনুসারীদের একমাত্র আল্লাহ-প্রদত্ত নাম (২২:৭৮)।

সুতরাং, ‘উম্মতে মুহাম্মদী’ শব্দটি কুরআনের সরাসরি পরিভাষা নয়, বরং এটি একটি পরবর্তীকালে উদ্ভূত পারিভাষিক নাম। কুরআনে ৬:৩৮ আয়াতে পশু-পাখিদের উম্মত বলার মাধ্যমে আমাদের এটিই বোঝানো হয়েছে যে, উম্মত হওয়া মানে একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার অধীনে সুশৃঙ্খল হওয়া। আমরা তখনই ‘খাইরা উম্মত’ বা শ্রেষ্ঠ দল হতে পারব, যখন আমরা কুরআনের দেওয়া বিধান বা ব্যবস্থার অধীনে নিজেদের জীবনকে সুবিন্যস্ত করব।

আমরা রাসুলের কওমা না উম্মত?

আল-কুরআন মাজীদের সুক্ষ্ম শব্দবিন্যাস ও আয়াতের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমরা তাঁর ‘কওম’ এবং ‘উম্মত’ উভয়ই, তবে তা ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। আল-কুরআনের মানদণ্ডে এর ব্যাখ্যা নিচে সহজভাবে উপস্থাপন করা হলো:

১. আমরা রাসুলের ‘কওম’ (সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট):

কুরআনিক পরিভাষায় একজন নবী বা রাসুল যে মানবগোষ্ঠীর মাঝে প্রেরিত হন, তারা তাঁর ‘কওম’। এটি একটি রক্তজ, ভাষাগত বা সামাজিক পরিচয়।

  - আয়াত প্রমাণ: আল্লাহ সু.তা. বলেন, “আমি প্রত্যেক রাসূলকে তাঁর কওমের (Qawmihi) ভাষা ছাড়া পাঠাইনি...” (১৪:৪)।

  - রাসুলের অভিযোগ: কিয়ামতের দিন রাসুল (সালামুন আলাইহে) তাঁর চারপাশের মানুষদের বিরুদ্ধে যে আরজি জানাবেন, সেখানে তিনি ‘কওম’ শব্দটিই ব্যবহার করবেন: “হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমার কওম (Qawmi/قَوْمِي) এই কুরআনকে বর্জনীয় হিসেবে গ্রহণ করেছিল।” (২৫:৩০)

  - অনুধাবন: সুতরাং, সামাজিক বা বংশীয় পরিচয়ে যারা রাসুলের দাওয়াতের সরাসরি সম্বোধনকারী, তারা রাসুলের কওম। এই অর্থে আরবের তৎকালীন মানুষ এবং কিয়ামত পর্যন্ত আসা সকল মানুষ যারা তাঁর দাওয়াতের আওতাভুক্ত, তারা  তাঁর কওম।

২. আমরা রাসুলের ‘উম্মত’ (আদর্শিক ও পদ্ধতিগত প্রেক্ষাপট):

কুরআনের দৃষ্টিতে ‘উম্মত’ কোনো বংশীয় নাম নয়, বরং একটি আদর্শিক বা সিস্টেম্যাটিক পরিচয়। যারা একটি সুনির্দিষ্ট জীবনবিধান বা ‘দ্বীন’ মেনে সুশৃঙ্খল হয়, তারা ‘উম্মত’।

  - আয়াত প্রমাণ: “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত (Khayra Ummatin), যাদের মানবজাতির কল্যাণের জন্য বের করা হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং     অসৎকাজে বাধা দাও...” (৩:১১০)।

  - সাদৃশ্য: যেমন পাখি বা অন্যান্য প্রাণীরা তাদের নিজস্ব জীবন-পদ্ধতি বা সিস্টেমের কারণে এক একটি উম্মত (৬:৩৮), তেমনি যারা রাসুল (সালামুন আলাইহে)-এর আনীত ‘সিস্টেম’ বা বিধানের অনুসারী, তারা একটি     উম্মত।

  - অনুধাবন: আমরা তাঁর উম্মত তখনই, যখন আমরা তাঁর আনীত আদর্শের ওপর আমল করি এবং সেই সুশৃঙ্খল ‘সিস্টেম’-এর অন্তর্ভুক্ত হই।

৩. আমাদের চূড়ান্ত পরিচয়: ‘মুসলিম’

যদিও আমরা তাঁর উম্মত (আদর্শিক গোষ্ঠী) এবং কওম (যাদের কাছে তিনি প্রেরিত), কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট নাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন:

“তিনি (আল্লাহ) তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম’ (Muslimin/ الْمُسْلِمِينَ)—পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে এবং এতেও (কুরআনে)।” (২২:৭৮)

সহজ উত্তর: আল-কুরআনের আলোকে আমরা রাসুলের প্রেরিত ‘কওম’ (যাদের কাছে তিনি কিতাব নিয়ে এসেছেন) এবং আমরা সেই শ্রেষ্ঠ ‘উম্মত’ (যদি আমরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করি)। তবে আমাদের আসল নাম ও পরিচয় হলো ‘মুসলিম’।

প্রাসঙ্গিক দুআ-তাসবিহ:

আল্লাহ রব্বুল আলামিনের দরবারে সঠিক বোধ ও ঈমানের জন্য প্রার্থনা:

رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَالشَّاهِدِينَ 

হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি যা নাযিল করেছেন তার ওপর আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা রাসূলের অনুসরণ করেছি। অতএব আমাদের সাক্ষ্যদাতাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। (৩:৫৩)

رَبَّنَا اجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةًلَّكَ 

হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের উভয়কে আপনার অনুগত (মুসলিম) করুন এবং আমাদের বংশধরদের মধ্য থেকে আপনার অনুগত একটি উম্মত গড়ে দিন। (২:১২৮)

সালামুন আলা মুরসালিন। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post