আল্লাহর কিতাবের সাথে অন্যকোনো অনাযিলকৃত কিতাব সংযুক্ত করা রবের সঙ্গে শিরকের শামিল। #Shirk with the Quran

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

দ্বীনের ক্ষেত্রে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের নাযিলকৃত একমাত্র কিতাব তথা আল-কুরআন মাজীদের সাথে অন্য কোনো অনাযিলকৃত কিতাব বা মানব-রচিত বর্ণনাকে অনুসরণীয় বিধান হিসেবে সংযুক্ত করা এবং সেগুলোকে ওহীর সমকক্ষ মনে করা—আল-কুরআনের দৃষ্টিতে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের সাথে শিরক করার নামান্তর। মানে- একমাত্র আল-কুরআনের (latest version) সাথে অনুসরণীয় অন্য কোনো অনাযিলকৃত কিতাব সংযুক্ত করা রবের সঙ্গে শিরকের শামিল। 

1. কুরআনি দলিলসমূহ:

আল-কুরআন মাজীদের কেন্দ্রীয় শিক্ষা হলো আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহীদ। এই তাওহীদ কেবল তাঁর অস্তিত্বে নয়, বরং তাঁর ‘হুকুম’ (বিচার), ‘আমর’ (আদেশ) এবং ‘হাকাম’ (বিধানদাতা) হওয়ার ক্ষেত্রেও একক। যখনই কোনো মানুষ আল্লাহর নাযিলকৃত ওহীর সমান্তরালে অন্য কোনো অনাযিলকৃত কিতাব বা মানুষের রচিত বর্ণনাকে দ্বীনের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সে মূলত আল্লাহর সার্বভৌমত্বে অংশীদার সাব্যস্ত করে। আল-কুরআনের অকাট্য আয়াতসমূহ প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কিতাবের সাথে অন্য কোনো উৎসকে বিধান হিসেবে সংযুক্ত করা শিরকের একটি নামান্তর। দ্র: আয়াতসমূহ: ৭:৫৪, ৩:১৫৪, ১৮:২৬-১৮:২৭

➥ একটি কিতাব বা একখানা কিতাব নাযিল করা হয়েছে: দ্র: আয়াতসমূহ:

৩৯:২৩, ১১:১, ৩৮:২৯, ২:২, ৩:৭, ৫:১৫, ৬:১১৪, ১৪:১, ১০:৩৭, ৪১:৩, ১৮:১, ৬:১৫৫, ১৫:৯, ২৫:১, ৪১:৪১-৪২, ২১:১০  (আল-কোরআন" (القرآن) বা একটি কোরআন-১৭:৯, ২০:২, ৫৬:৭৭), ২১:৫০

বাকীসব ঝুটহে (বাতিল)! আয়াত ১৭:৮১, ৪৭:২-৩

2. কুরআনি দ্বীনই পূর্নাঙ্গ (৫:৩) : দ্বাীনের ক্ষেত্রে আল কুরআনের সাথে অন্য কোন অনাযিলকৃত কিতাব সংযুক্ত করা শিরক:

আল-কুরআন মাজীদের সার্বভৌমত্ব ও একক কর্তৃত্ব নিয়ে কোনো আপস নেই। দ্বীনের ক্ষেত্রে আল্লাহ রব্বুল আলামিন যে সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন, তা এতটাই কঠোর যে স্বয়ং নবী ও রাসূলগণকেও এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে। যদি আল্লাহর নাযিলকৃত ওহীর সাথে অন্য কোনো উৎস, মতবাদ বা অনাযিলকৃত কিতাবকে বিধান হিসেবে সংযুক্ত করা হয়, তবে তা কেবল শিরক নয় বরং তা জীবনের সকল আমল ও অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার কারণ। আল-কুরআনের আয়াতসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘শিরক’ বা ‘সংযুক্তি’ এমন এক অপরাধ যা আল্লাহর নিকট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, এমনকি তা যদি সর্বোচ্চ মর্যাদাবান ব্যক্তিদের পক্ষ থেকেও কল্পনা করা হয়।

দ্র: আয়াতসমূহ: ৩৯:৬৫, ৬:৮৮, ৬৯:৪৪-৪৬, ৩:১৫১

3. একমাত্র আল কুরআনি বিধানের সাথে কোনোকিছু যুক্ত করা মানে রবের সাথে শিরককরা:

আয়াত: ৬:১১৪-৬:১১৫, ১৬:৮৯, ১৮:২৭ : 

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আল-কুরআনকে ‘মুফাসসাল’ বা বিশদভাবে নাযিল করেছেন  ও পূনাঙ্গ এবং অন্য কোনো বিচারক বা ‘হাকাম’ (حَكَمًا) অনুসন্ধান করতে নিষেধ করেছেন (৬:১১৪)। কারণ এই কিতাব সবকিছুর স্পষ্ট  ব্যাখ্যা বা ‘তিব্ইয়ানান লি-কুল্লি শাই’ (১৬:৮৯)।

গভীর অনুধাবন: এই আয়াতে (৬:১১৪-৬:১১) ‘হাকাম’ এবং ‘কিতাবুন মুফাসসাল’ (বিশদ কিতাব) শব্দ দুটি অবিচ্ছেদ্য। যদি আল-কুরআন বিশদ না হতো, তবে মানুষের অন্য কোনো কিতাবের প্রয়োজন হতো। কিন্তু আল্লাহ যেহেতু একে বিশদ বলেছেন, তাই অন্য কোনো কিতাবকে বিধানদাতা (হাকাম) হিসেবে গ্রহণ করা মানেই হলো আল্লাহর কিতাবের পূর্ণাঙ্গতাকে অস্বীকার করা এবং অন্যকে আল্লাহর আসনে বসানো।

একমাত্র হুকুমদাতা ও ইবাদতে বিশুদ্ধতা (৬:৬২, ৪০:১২, ১৮:১১০)

4. আল্লাহর আয়াতের সাথে শিরক:

যারা আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে অন্য কোনো কিতাব বা মতবাদকে দ্বীনের বিধান (শরীয়ত) হিসেবে দাঁড় করায়, আল্লাহ তাদের ‘শুরাকা’ (شُرَكَاءُ) বা অংশীদার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (৪২:২১)। আল্লাহর আয়াতের পর অন্য কোনো ‘হাদীস’ বা বর্ণনার ওপর ঈমান আনা আল্লাহর আয়াতেরই অবমাননা (৪৫:৬)।

5. নাযিলকৃত দলিল ’সুলতান’ ছাড়া কোনো কিছুই দ্বীন নয়: মানুষের হস্তলিখিত কিতাবের ভয়াবহতা (২:৭৯, ৭:৩৩): 

ধ্বংস তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে এবং তাকে ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে’ (হাযা মিন ইনদিল্লাহ) বলে প্রচার করে (২:৭৯)। এটি আল্লাহর নামে এমন কথা বলা যার পক্ষে তিনি কোনো দলিল বা ‘সুলতান’ নাযিল করেননি (৭:৩৩)।

6. আল্লাহর একক কিতাব ছেড়ে অন্য কিছু গ্রহন করা শিরক: 

আল্লাহর একক কিতাব ছেড়ে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ ও কিতাবের অনুসরণ মানুষকে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত করে, যারা নিজেদের দ্বীনকে খণ্ডবিখণ্ড করে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে (৩০:৩১-৩২)। প্রকৃত মুমিন তারাই যারা কেবল তাদের রবের আয়াতের ওপর ঈমান রাখে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে না (২৩:৫৭-৫৯)।

আল্লাহ তাঁর কিতাব নাযিল করেছেন যেখানে সকল বিধান সংরক্ষিত এবং এর বাইরে অন্য কিছু অনুসরণীয় নয় (১৩:৩৬-৩৯)।

7. অনুসরনে একমাত্র কুরআন নেয়া মানে শিরকমুক্ততা:

জিনেরাও যখন আল-কুরআন শুনেছিল, তখন তাদের উপলব্ধি ছিল: আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, যা সঠিক পথ দেখায়। সুতরাং আমরা এতে ঈমান এনেছি এবং আমরা আমাদের রবের সাথে কাউকেই শরীক করব না (وَلَن نُّشْرِكَ بِرَبِّنَا أَحَدًا - ওয়া লান নুশরিকা বি-রাব্বিনা আহাদা)।” (৭২:১-২)

এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, আল-কুরআনের প্রতি পূর্ণ ঈমান আনার প্রধান শর্তই হলো এর বিধানের সাথে অন্য কাউকে বা অন্য কোনো কিতাবকে শরীক না করা।

8. আল-কুরআনের পূর্ণাঙ্গতা ও অন্য ‘হাদীসের’ অসারতা:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আল-কুরআনকে ‘তিব্ইয়ানান লি-কুল্লি শাই’ (সব কিছুর স্পষ্ট ব্যাখ্যা) হিসেবে নাযিল করেছেন (১৬:৮৯)। কিতাবের এই পূর্ণাঙ্গতা অন্য যেকোনো কিতাবের প্রয়োজনীয়তাকে নাকচ করে দেয়। আল্লাহ বলেন:

“এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি আপনার কাছে যথাযথভাবে তিলাওয়াত করছি। সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর তারা আর কোন কথায় (بِأَيِّ حَدِيثٍ - আইয়্যে হাদীসিন) ঈমান আনবে?” (৪৫:৬)

যৌক্তিক সংযোগ: এখানে ‘হাদীস’ শব্দটির দ্বারা আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর নিজের কালামের বিপরীতে মানুষের প্রচলিত বা অনাযিলকৃত যেকোনো বক্তব্য বা কিতাবকে বুঝিয়েছেন। যখন আল্লাহ নিজেই প্রশ্ন করছেন যে, তাঁর আয়াতের পর অন্য কোন কথায় (হাদীসে) তারা বিশ্বাস আনবে, তখন অন্য কোনো কিতাবকে অনুসরণীয় মনে করা সরাসরি এই আয়াতের অবাধ্যতা।

তাইতো আল্লাহ বলেন-

তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তোমরা সেটার অনুসরণ করো এবং তাঁর পরিবর্তে বহু অভিভাবকের অনুসরণ কোরো না। তোমরা যা উপদেশ গ্রহণ করো তা খুবই অল্প। আয়াত ৭:৩

▓▒░দুআ-তাসবিহ░▒▓

সংশ্লিষ্ট কুরআনি দুআ-তাসবিহ:

আল্লাহর একত্ববাদ ও শিরকমুক্ত জীবনের জন্য নিম্নোক্ত দুআগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:

 رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ

(রাব্বানা আমান্না বিমা আনযালতা ওয়াত্তাবায়নাল রাসূল ফাকতুবনা মা’আশ শাহীদিন)

অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি যা নাযিল করেছেন তার ওপর আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা রাসূলের অনুসরণ করেছি; অতএব আমাদের সাক্ষ্যদাতাদের তালিকাভুক্ত করুন। (সূরা আল ইমরান ৩:৫৩)

 إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا ۖ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ

(ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযি ফাত্বারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা হানীফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকীন)

অর্থ: আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফেরাচ্ছি যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। (সূরা আল-আন’আম ৬:৭৯)

 رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ

(রাব্বানা লা তুযিগ ক্বুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাতান, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব)

অর্থ: হে আমাদের রব! হিদায়াত দান করার পর আমাদের অন্তরকে সত্যলঙ্ঘনকারী করবেন না এবং আপনার নিকট থেকে আমাদের রহমত দান করুন; নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা। (সূরা আল ইমরান ৩:৮)

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post