আমলে সালেহ কী? আমলে সালেহ (সৎকর্ম) ও অসৎকর্মের তালিকা -আল কুরআনের আলোকে (Amal-e Salih)

 বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।

আল-কুরআনের আলোকে 'আমলে সলেহ' (সৎ কাজ) এবং তার বিপরীত 'অসৎ কাজ' কেবল কোনো আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়, বরং এটি মানুষের সামগ্রিক জীবনের একটি ভারসাম্যপূর্ণ রূপরেখা। নিম্নে 'তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন' পদ্ধতি এবং কুরআনের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে আয়াতসমূহ গভীর অনুধাবনের আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত উপস্থাপিত করার চেষ্টা করছি, বিঈযনিল্লাহ!


১. আমলে সলেহ বা সৎ কাজের সংজ্ঞা ও ভিত্তি:

কুরআনের পরিভাষায় ‘সলেহ’ শব্দের অর্থ হলো সংশোধন করা, যোগ্য হওয়া বা ভারসাম্য রক্ষা করা। অনুধাবনে আমরা দেখি, আল্লাহ যেখানেই ঈমানের কথা বলেছেন, তার পরক্ষণেই ‘আমলে সলেহ’র শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।

আল কুরআনের দৃষ্টিতে আমলে সালেহ-এর সংক্ষিপ্ত ও তাত্ত্বিক সংজ্ঞা -এ রকমটি অনুধাবনে আসে-

“ঈমান ও ইখলাসের (একনিষ্ঠতা) ভিত্তিতে সম্পাদিত এমন প্রতিটি কর্ম, যা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে বিদ্যমান কোনো অসংগতি বা বিশৃঙ্খলাকে মেরামত করে ভারসাম্য (Balance) প্রতিষ্ঠা করে এবং যা বিপর্যয় বা ফাসাদ-এর বিপরীতে স্থিতিশীলতা (Islaah) বয়ে আনে।”

আমলে সলেহ- বিষয়টি কেন এত গুরুত্বপূর্ন?

সুরা আল-আসর (১০৩:২-৩): "নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে ও ‘আমলে সলেহ’ (সৎকাজ) করে..."

সুরা আত-তীন (৯৫:৪-৬): "আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম কাঠামোতে। এরপর আমি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি হীনতরদের হীনতমে। কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান এনেছে ও ‘আমলে সলেহ’ করেছে..."

এখানে ঈমান হলো বীজ, আর আমলে সলেহ হলো তার ফল। একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ।

কল্যাণ বনাম অকল্যাণ: সুরা আজ-জিলজাল-এ আল্লাহ এক নিখুঁত গাণিতিক সামঞ্জস্য দেখিয়েছেন:

কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখতে পাবে। আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকাজ করলে সে তাও দেখতে পাবে। (৯৯:৭-৮)।

পৃথিবীর উত্তরাধিকার ও আমলে সলেহ:

কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, পৃথিবীর প্রকৃত নেতৃত্ব বা উত্তরাধিকার কেবল তাদেরই প্রাপ্য যারা সৎ কর্মশীল।

সুরা আল-আম্বিয়া (২১:১০৫): আমি জাবুরে উপদেশের পর লিখে দিয়েছি যে, আমার ‘সলেহ’ (সৎকর্মপরায়ণ) বান্দারাই পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।

এই আয়াতের সত্যতা আমরা দেখি সালামুন আলা দাউদ এবং সালামুন আলা সুলাইমান-এর জীবনে, যেখানে ক্ষমতা ও আমলে সলেহ-র এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, আমলে সলেহ কেবল ব্যক্তিগত মুক্তি নয়, বরং বিশ্ব পরিচালনার যোগ্যতা।

জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষনেও সলেহীন কর্ম করার আকুতি:

আল্লাহ জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা করার জন্য যে, কে আমলে শ্রেষ্ঠ। (৬৭:২)। এখানে 'আমলে সলেহ' হলো জীবনের উদ্দেশ্য।

সদাকা করা সলেহীন কর্ম: আর আমরা তোমাদের যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে তোমরা ব্যয় করো তোমাদের মৃত্যু আসার আগেই। তখন সে বলবে, হে আমার রব! যদি না আপনি আমাকে নিকটবর্তী সময় এর অবকাশ দিতেন! তাহলে আমি সদাকা করতাম এবং আমি হতাম সলেহীনদের অন্তর্ভুক্ত-৬৩:১০ 

 আর যারা ঈমান আনে এবং আমলে সলেহ করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতুল মাওয়া-৩২:১৯  

➥ আর যে মুমিন অবস্থায় তাঁর কাছে আসবে সে অবশ্যই সংশোধনের কাজ করেছে। তাহলে ওরাই, যাদের জন্য সুউচ্চ মর্যাদাসমূহ। জান্নাতুন আদন ...আর সেটাই তাদের পুরস্কার, যারা পরিশুদ্ধ হয়-২০:৭৫-৭৬,  ৯:৬০, ৯:১০৩, ৯১:৯, ৯২:১৮) (সংশোধনের কাজ ২০:৭০-৭৬) 

 নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে ও যারা ইহুদি হয়েছে আর সাবেয়ীরা ও নাসারারা -যারা আল্লাহর ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ করেছে, তাহলে তাদের জন্য কোন ভয় নাই আর না তারা চিন্তিত হবে-৫:৬৯ (২:৬২)  

আমলে সলেহ ও 'হায়াতুন তায়্যিবাহ' (পবিত্র জীবন):

কুরআনের একটি বিশেষ সামঞ্জস্য হলো, আল্লাহ কেবল পরকালেই পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেননি, বরং সৎ কাজের বিনিময়ে ইহকালেও একটি উন্নত জীবনের কথা বলেছেন।

সুরা আন-নাহল (১৬:৯৭): "যে ব্যক্তি ‘আমলে সলেহ’ (সৎকাজ) করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আর সে যদি মুমিন হয়, তবে আমি অবশ্যই তাকে ‘হায়াতুন তায়্যিবাহ’ (পবিত্র ও সুখময় জীবন) দান করব।"

এখানে ‘আমলে সলেহ’-এর ফল হিসেবে দুনিয়াতে মানসিক শান্তি ও তৃপ্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং লিঙ্গভেদে সবার জন্য সমান পুরস্কারের ঘোষণা।

আমলে সলেহ’র কোনো সংখ্যা গণনা: কর্মের ওজন ও চূড়ান্ত মানদণ্ড (মিজান):

কুরআনের সামঞ্জস্যতা অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন আমলে সলেহ’র কোনো সংখ্যা গণনা করা হবে না, বরং তার ওজন বিচার করা হবে।

সুরা আল-আ'রাফ (৭:৮-৯): "সেদিন ওজন (পরিমাপ) হবে সত্য। যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে।"

তাদাব্বুর: এখানে 'ভারী' হওয়া মানে হলো গুণগত মান (Quality)। অর্থাৎ লোকদেখানো হাজারো কাজের চেয়ে একনিষ্ঠভাবে করা ছোট একটি 'আমলে সলেহ' আল্লাহর কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।


আল-কুরআনে বর্ণিত সৎ কাজের (আমলে সলেহ) তালিকা:

শুধুমাত্র আল-কুরআনের ভাষা ও প্রসঙ্গ থেকে “আমলে সালেহ” (العمل الصالح) বা সৎকর্মের উপাদানসমূহ সংগ্রহ করা, অর্থাৎ পরবর্তী ফিকহ, তাফসীর বা প্রচলিত তালিকার পরিবর্তে কুরআন নিজে যেসব কাজকে নেকী, তাকওয়া, ইহসান, বির্‌র, ফালাহ, বা মুমিনের গুণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে সেগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কুরআন মাজিদের বিভিন্ন আয়াতে সৎ কাজের বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সুরা আল-বাকারার ১৭৭ নম্বর আয়াতটি ‘আমলে সলেহ’-এর একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যানিফেস্টো।

A. ঈমান ও বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা (মৌলিক ভিত্তি): আমলে সলেহ-

আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, পরকাল, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ এবং নবী-রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। যেমনটি আল্লাহ বলেন— "সালামুন আলা নূহ, সালামুন আলা ইবরাহিম, সালামুন আলা মুসা ও হারুন এবং সালামুন আলা মুহাম্মাদ—তাঁরা সকলেই এই সত্যের প্রচারক ছিলেন।"

■ আল্লাহর প্রতি ঈমান (২:১৭৭)
■ আখিরাতে ঈমান (২:১৭৭)
■ ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান (২:১৭৭)
■ কিতাবসমূহে ঈমান (২:১৭৭)
■ নবীদের প্রতি ঈমান (২:১৭৭)
■ আল্লাহর উপর ভরসা করা (৩:১৫৯, ৬৫:৩)
■ আল্লাহকে অধিক স্মরণ করা (৩৩:৪১)
■ আল্লাহর প্রতি আন্তরিক তওবা (৬৬:৮)
■ আল্লাহকে ভয় করা/তাকওয়া অবলম্বন (২:১৭৭, ৩:১০২)
■ আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করা (২:২০৭)

B. ইবাদত: আমলে সলেহ-

■ আল কুরআন আঁকড়ে ধরা ও অনুসরণ করা (৭:১৭০, ৭:৩)
■ সালাত প্রতিষ্ঠা করা (২:১৭৭, ২৩:১-২,৭:১৭০)
■ সালাত-সংযোগে একাগ্র থাকা (২৩:২)
■ যাকাত প্রদান করা (২:১৭৭, ২৩:৪)
■ সিয়াম পালন করা (২:১৮৩)
■ হজ্জ সম্পাদন করা-উমরাহ পূর্ণ করা (২:১৯৬)
■ রাতের কিছু অংশ ইবাদতে কাটানো -২৫:৬৪ (২৫:৬৩-৭৭)
■ দোয়া করা (৪০:৬০, ২৫:৭৭)

C. আর্তমানবতার সেবা ও দানশীলতা: সম্পদ ও অর্থনৈতিক ন্যায় (আমলে সলেহ):

সম্পদের প্রতি মোহ থাকা সত্ত্বেও তা নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন, মুসাফির ও সাহায্যপ্রার্থীদের জন্য ব্যয় করা:

■ আত্মীয়স্বজনকে সম্পদ দান (২:১৭৭, ১৬:৯০ )
■ এতিমদের সাহায্য (২:১৭৭)
■ অভাবগ্রস্তদের সাহায্য (২:১৭৭)
■ পথিককে সাহায্য (২:১৭৭)
■ সাহায্যপ্রার্থীকে দান (২:১৭৭)
■ দাসমুক্তির জন্য ব্যয় (২:১৭৭, ৯০:১৩)
■ গোপনে ও প্রকাশ্যে দান (২:২৭৪)
■ আল্লাহর পথে ব্যয় (২:২৬১)
■ রিবা পরিহার (২:২৭৫-২৭৬)
■ ন্যায়সঙ্গত ব্যবসা (৪:২৯)
■ ওজন ও মাপ ঠিক রাখা (৬:১৫২, ১৭:৩৫)
■ সম্পদ অপচয় না করা (১৭:২৬-২৭)
■ সাদাকা যখন ‘ইসলাহ’ বা সংশোধনের মাধ্যম:
আমরা জানি, ‘সালেহ’ শব্দের অর্থ হলো সংশোধন করা। সাদাকা কীভাবে আমলে সালেহ হয়, তার একটি আধ্যাত্মিক ও যৌক্তিক দলিল সূরা আত-তাওবায় পাওয়া যায়:

তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা গ্রহণ করুন, এর মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র করবেন এবং তাদের পরিশোধিত (সংশোধন) করবেন...” (৯:১০৩)

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, সাদাকা গ্রহণের উদ্দেশ্য হলো মানুষের নফসকে পবিত্র করা এবং তাকে ‘সালেহ’ বা সংশোধন করা। অর্থাৎ, যে কর্ম মানুষের আত্মিক কলুষতা দূর করে তাকে সঠিক অবস্থানে (Salah) ফিরিয়ে আনে, আল কুরআনের সংজ্ঞায় তা-ই আমলে সালেহ।

 ‘সাদাকা’ কেন ‘সাদেকীন’-দের বৈশিষ্ট্য?- (৩৩:২৩)

সাদেকীন’ ও ‘মুতাসাদদ্দিকীন’: পার্থক্য?
আল কুরআন মাজীদে ‘সাদেকীন’ (সত্যবাদী) এবং ‘মুতাসাদদ্দিকীন’ (দানশীল)—উভয় শব্দকে অনেক সময় আলাদাভাবেও উল্লেখ করা হয়েছে তাদের গুণের ব্যাপকতা বোঝাতে। যেমন সূরা আল-আহযাবের ৩৫ নম্বর আয়াতে একটি লম্বা তালিকায় বলা হয়েছে:

“...সত্যবাদী পুরুষ (সাদেকীন) ও সত্যবাদী নারী (সাদেকাত), ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী... দানশীল পুরুষ (মুতালাদ্দিকীন) ও দানশীল নারী (মুতাসাদদ্দিকাত)... আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।” (৩৩:৩৫)

এখানে ‘সাদেকীন’ হলো একটি ব্যাপক গুণ (যিনি কথা, চিন্তা ও কাজে সত্যবাদী), আর ‘মুতাসাদদ্দিকীন’ হলো সেই সত্যবাদী গুণের একটি নির্দিষ্ট আর্থিক বহিঃপ্রকাশ। অর্থাৎ, প্রত্যেক সাদেকীন (সত্যবাদী) ব্যক্তিই একজন মুতাসাদদ্দিক (দানশীল), কিন্তু কেবল মৌখিক সত্য বলা ব্যক্তিকে ততক্ষণ ‘সাদেকীন’ বলা যায় না যতক্ষণ না সে তার সম্পদ ব্যয়ের মাধ্যমে সেই সত্যের প্রমাণ দেয়।]

    D. পরিবার ও আত্মীয়তা (আমলে সলেহ):

    ■ পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ (১৭:২৩)
    ■ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা (৪:১, ১৩:২১)
    ■ স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ (৪:১৯)
    ■ পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করার চেষ্টা (৬৬:৬)
    ■ সন্তানদের হত্যা না করা (১৭:৩১)

    E. সামাজিক ও মানবিক আচরণ  (আমলে সলেহ):

    ■ চারিত্রিক দৃঢ়তা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা: (২:১৭৭, ১৭:৩৪)
    ■ আমানত রক্ষা (২৩:৮, ৪:৫৮)
    ■ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা/ আদল (ন্যায়বিচার): (৪:৫৮, ৫:৮, ৪:১৩৫, ১৬:৯০)
    ■ সত্য সাক্ষ্য প্রদান (৫:৮, ২৫:৭২)
    ■ মানুষের মধ্যে মীমাংসা করা (৪৯:৯-১০)
    ■ সৎকাজের আদেশ (৩:১০৪)
    ■ অসৎকাজ থেকে নিষেধ (৩:১০৪)
    ■ নিপীড়িতদের সাহায্য (৪:৭৫)
    ■ প্রতিবেশী ও সঙ্গীর প্রতি সদ্ব্যবহার (৪:৩৬)
    ■ 
    সালাম প্রদান ও  সালামের জবাব উত্তমভাবে দেওয়া (৬:৫৪, ৪:৮৬)

    F. চরিত্র ও নৈতিকতা (আমলে সলেহ):

    ■ সত্যবাদিতা (৯:১১৯, ৩৩:৩৫)
    ■ ধৈর্য ধারণ (২:১৭৭, ৩:২০০)
    ■ কৃতজ্ঞতা (১৪:৭)
    ■ ক্ষমা করা (২৪:২২, ৪২:৪০)
    ■ রাগ সংবরণ করা এবং মানুষকে ক্ষমা করা (৩:১৩৪)
    ■ বিনয়ী হওয়া (২৫:৬৩)
    ■ ইহসান (উত্তম আচরণ) (১৬:৯০)
    ■ অহংকার না করা (১৭:৩৭, ৩১:১৮)
    ■ নম্রভাবে চলাফেরা (২৫:৬৩)
    ■ উত্তম কথা বলা (২:৮৩, ১৭:৫৩)
    ■ অশ্লীলতা পরিহার (২৩:৫-৭, ২৪:৩০-৩১, ১৬:৯০)
    ■ মন্দকাজ (মুনকার) ও বাড়াবাড়ি না করা- ১৬:৯০
    ■ গীবত না করা (৪৯:১২)
    ■ উপহাস না করা (৪৯:১১)
    ■ অপবাদ না দেওয়া (২৪:২৩)
    ■ কু-ধারণা পরিহার (৪৯:১২)
    ■ হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকা (৫৯:১০)
    ■ ৯:১১৯ আয়াতের প্রেক্ষাপট ও সাদেকীনদের সাহচর্য: (৯:১১৯)

    G. আত্মসংযম ও পবিত্রতা (আমলে সলেহ):

    ■ লজ্জাস্থানের হেফাজত (২৩:৫-৭)
    ■ পবিত্রতা অর্জন (২:২২২)
    ■ দৃষ্টি সংযত রাখা (২৪:৩০-৩১)
    ■ প্রবৃত্তির অনুসরণ না করা (৭৯:৪০-৪১)
    ■ ত্মাকে পরিশুদ্ধ করা (৯১:৯)

    H. কষ্ট ও পরীক্ষার সময় (আমলে সলেহ):

    ■ দারিদ্র্যে ধৈর্য (২:১৭৭)
    ■ রোগে ধৈর্য (২:১৭৭)
    ■ বিপদে ধৈর্য (২:১৭৭)
    ■ সংগ্রামের সময় অবিচল থাকা (৩:২০০)
    ■ আল্লাহর উপর নির্ভর করা (৬৫:৩)

    I. মুমিনদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য- (আমলে সলেহ):

    ■ অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা (২৩:৩)
    ■ আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা (২৩:৮)
    ■ সালাতসমূহ সংরক্ষণ (২৩:৯)
    ■ রাতের বেলা ইবাদত করা (কুরআন স্টাডি) (২৫:৬৪, ৭৩:১-৯)
    ■ অপব্যয় না করা এবং কৃপণতাও না করা (২৫:৬৭)
     মিথ্যা সাক্ষ্যে অংশ না নেওয়া (২৫:৭২)
    ■ জ্ঞানহীনতার মুখোমুখি হলে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ (২৫:৭২-৭৩)
    ■ ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করা (অসৎ কাজের প্রতিরোধ) পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করা মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব: পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের পর সেখানে ‘ফাসাদ’ (বিশৃঙ্খলা/অসৎ কাজ) সৃষ্টি করো না। (৭:৫৬):কুরআনি সামঞ্জস্যতা: আল্লাহ পৃথিবীটাকে সুশৃঙ্খল ও সৎ কাজের উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন। সেখানে জুলুম, রিবা, ব্যভিচার বা পরিবেশ দূষণ করা হলো সেই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাকে নষ্ট করা।

    ২. সার্বজনীন নৈতিক বিধিমালা (সৎ কাজের at a glance তালিকা):

    সুরা আল-আন'আমে আল্লাহ তায়ালা সৎ কাজের এমন একটি তালিকা দিয়েছেন যা মানবজাতির জন্য একটি চিরন্তন নৈতিক সনদ। এখানে সৎ ও অসৎ কাজের সরাসরি তুলনা বিদ্যমান।

    সুরা আল-আন'আম (৬:১৫১-১৫২):

    1. আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করা (সর্বশ্রেষ্ঠ সৎ কাজ)।

    2. পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা।

    3. দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তানদের হত্যা না করা (এটি একটি মহাপাপ বা অসৎ কাজ)।

    4. অশ্লীলতার কাছেও না যাওয়া—তা প্রকাশ্য হোক বা গোপন।

    5. কোনো প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা না করা।

    6. এতিমের সম্পদের কাছেও না যাওয়া, যদি না তা তার কল্যাণের উদ্দেশ্যে হয়।

    7. ওজনে ও মাপে পূর্ণ ইনসাফ বজায় রাখা।

    8. যখন কোনো কথা বলবে, তখন ন্যায়সংগত বলবে, যদিও তা নিজের নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধেও যায়।

    9. আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করা।

    সুরা আল-ইসরা-তে আল্লাহ সৎ কাজের এমন কিছু সূক্ষ্ম দিক বর্ণনা করেছেন যা মানুষের প্রজ্ঞা (Hikmah) বৃদ্ধি করে।

    সুরা আল-ইসরা (১৭:২৬-৩৭):
    1. আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকে তাদের হক প্রদান করা।

    2. অপব্যয় বা অপচয় না করা (অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই)।

    3. নিজের হাতকে গলার সাথে বেঁধে না রাখা (কৃপণতা) এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিতও না করা (অসংগত ব্যয়)।

    4. লজ্জাস্থানের হেফাজত ও অঙ্গীকার পূরণ।

    5. পৃথিবীতে দম্ভভরে বিচরণ না করা; কারণ মানুষ না পারবে জমিনকে বিদীর্ণ করতে, না পারবে পাহাড়ের উচ্চতায় পৌঁছাতে।

    এই আয়াতগুলোতে 'সলেহ' (সংশোধন) এবং 'ফাসাদ' (বিশৃঙ্খলা)-এর একটি সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়েছে। সালামুন আলা নূহ থেকে শুরু করে সালামুন আলা মুহাম্মাদ পর্যন্ত সকল নবী এই একই সত্যের দাওয়াত দিয়েছেন।


    বাক-সংযম ও উত্তম কথা: একটি বিশেষ আমলে সলেহ:

    অনেক সময় আমরা কেবল শারীরিক ইবাদতকে আমলে সলেহ মনে করি, কিন্তু কুরআন মুখের ভাষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।

    ➥ সুরা আল-বাকারাহ (২:৮৩): "...আর মানুষের সাথে উত্তম কথা বলো।"

    ➥ সুরা আল-ইসরা (১৭:৫৩): "আমার বান্দাদের বলো, তারা যেন এমন কথা বলে যা সর্বোত্তম। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করে।"

    অসৎ কাজের একটি বড় অংশ হলো কটু কথা বা মন্দ বাক্য। এর বিপরীতে 'উত্তম কথা' বলাকে আল্লাহ তায়ালা আমলের সৌন্দর্যের মানদণ্ড বানিয়েছেন।

    সামাজিক জীবনের ভারসাম্য ও আদব:

    সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধে এবং ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে কিছু নির্দিষ্ট কাজকে নিষিদ্ধ এবং কিছু কাজকে আবশ্যক করা হয়েছে।

    বর্জনীয় অসৎ কাজ (সুরা আল-হুজুরাত: ১১-১২):

     একে অপরকে উপহাস করা।
     একে অপরকে বিদ্রূপ করা বা মন্দ নামে ডাকা।
     অতিমাত্রায় ধারণা বা সন্দেহ করা (নিশ্চয় কিছু ধারণা গুনাহ)।
     একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান বা গোয়েন্দাগিরি করা।
     গিবত করা (নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমান অপরাধ)।

    করণীয় আমলে সলেহ: মুমিনদের মধ্যে বিবাদ দেখা দিলে তা মীমাংসা করে দেওয়া এবং ন্যায়ের ওপর অটল থাকা (সুরা আল-হুজুরাত: ৯-১০)।

    আমলে সালেহ-এর পরিধি: আল কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী কর্মের প্রকারভেদ:

    আল কুরআন আমলে সালেহ-কে কেবল তসবিহ পাঠ বা নির্জনে ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেনি। এর পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত:

    ক. হক্কুল্লাহ (আল্লাহর অধিকার):

    সালাত কায়েম করা এবং যাকাত প্রদান করা আমলে সালেহ-এর প্রধান স্তম্ভ।

    “নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, আমলে সালেহ করেছে, সালাত কায়েম করেছে এবং যাকাত দিয়েছে—তাদের জন্য তাদের রবের কাছে পুরস্কার রয়েছে।” (২:২৭৭)

    খ. হক্কুল ইবাদ (সৃষ্টির অধিকার ও সামাজিক সংশোধন):

    মানুষের মধ্যে বিবাদ মিটিয়ে দেওয়া এবং ইনসাফ করা অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমলে সালেহ।

    “মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই; সুতরাং তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে ইসলাহ (মীমাংসা/সংশোধন) করে দাও।” (৪৯:১০)

    “...তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক কর (وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ)...” (আয়াত ৮:১)

    নেকীর সারসংক্ষেপ (আমলে সলেহ):

    কুরআনের সামগ্রিক অনুধাবনে, আমলে সালেহ কোনো একক আচার নয়; বরং ঈমান + ইবাদত + ন্যায় + মানবসেবা + উত্তম চরিত্র + আল্লাহ সচেতনতা: -এই সমগ্র জীবনব্যবস্থার বাস্তব রূপ। “যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে” বাক্যাংশটি কুরআনে প্রায় ৫০ বারেরও বেশি এসেছে, যা দেখায় যে আমলে সালেহ হলো কুরআনিক জীবনদর্শনের কার্যকর প্রকাশ।

    আল কুরআনের আয়নায় ‘সালেহীন’-এর পরিচয়: 

    আল কুরআন মাজীদে ‘সালেহীন’ বা সৎকর্মশীল হওয়া কোনো বংশগত বা গোষ্ঠীগত পরিচয় নয়, বরং এটি কতগুলো সুনির্দিষ্ট গুণের সমষ্টি।

     ৩:১১৩-১১৪ আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা সত্যনিষ্ঠ ছিল, তাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে ‘সালেহীন’-এর একটি জীবন্ত সংজ্ঞা দিয়েছেন।

    ১. সালেহীনদের সাতটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য (৩:১১৩-১১৪ এর বিশ্লেষণ):

    আয়াত দুটির শব্দগত বিন্যাস লক্ষ্য করলে আমরা সালেহীনদের নিম্নোক্ত পরিচয় পাই:

    ■ উম্মাতুন কায়িমাহ (أُمَّةٌ قَائِمَةٌ): তারা সত্যের ওপর অবিচল এবং ন্যায়নিষ্ঠ একটি দল। (৩:১১৩)

    ■ য়াতলুনা আয়াতিল্লাহ (يَتْلُونَ آيَاتِ اللَّهِ): তারা নিশিরাতে আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে বা পাঠ করে। (৩:১১৩)

    ■ ওয়াহুম ইয়াসজুদুন (وَهُمْ يَسْجُدُونَ): তারা বিনম্রতায় সেজদাবনত হয় বা সালাত কায়েম করে। (৩:১১৩)

    ■ ইউ’মিনুনা বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখির (يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ): তারা আল্লাহ এবং পরকালের ওপর সুদৃঢ় বিশ্বাস রাখে। (৩:১১৪)

    ■ ইয়ামুরুনা বিল মা’রুফ (يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ): তারা সৎকাজের আদেশ দেয়। (৩:১১৪)

    ■ ইয়ানহাওনা আনিল মুনকার (يَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ): তারা মন্দ ও গর্হিত কাজ থেকে নিষেধ করে। (৩:১১৪)

    ইউসারীউনা ফিল খাইরাত (يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ): তারা কল্যাণকর কাজে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে বা দ্রুত ধাবিত হয়। (৩:১১৪)

    এই সাতটি গুণের বর্ণনা শেষ করার পরপরই আল্লাহ রব্বুল আলামিন চূড়ান্ত সিলমোহর দিয়ে বলছেন:

    “...ওয়া উলাইকা মিনাস সলিহীন” (অর্থাৎ— এরাই হলো তারা, যারা সালেহীন বা সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত)। (৩:১১৪)

    ২. ‘ইউসারীউনা ফিল খাইরাত’ ও ‘আমলে সালেহ’-এর গভীর সংযোগ:

    আয়াতের একটি চমৎকার শব্দ হলো ‘ইউসারীউনা’ (يسارعون)। এর অর্থ কেবল কাজ করা নয়, বরং কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী হওয়া। আল কুরআনের দর্শনে একজন ‘সালেহ’ ব্যক্তি কেবল সুযোগ এলে ভালো কাজ করেন না, বরং তিনি ভালো কাজ করার সুযোগ খুঁজে বেড়ান।

    এই ‘খাইরাত’ বা কল্যাণকর কাজের মধ্যেই ইতিপূর্বে আলোচিত ‘সাদাকা’, ‘আদল’ ও ‘ইহসান’ নিহিত। অর্থাৎ, সালেহীনরা হলেন তাঁরাই যাঁরা অলসভাবে বসে না থেকে সমাজ ও আত্মার সংশোধনে (ইসলাহ) ক্ষিপ্রতার সাথে আত্মনিয়োগ করেন।

    ৩. ‘সালেহীন’ ও ‘মুনকার’-এর বৈপরীত্য:

    এখানে লক্ষ্যণীয় যে, সালেহীন হওয়ার জন্য কেবল নিজে ভালো হওয়া যথেষ্ট নয়, বরং ‘নাহি আনিল মুনকার’ বা মন্দ কাজ থেকে বাধা দেওয়ার সক্রিয় ভূমিকা থাকতে হবে। ৪১:৪৬ আয়াতে আমরা যে ‘আসা-আ’ (মন্দ কাজ) দেখেছিলাম, সেই মন্দকে রুখে দাঁড়ানোই হলো ‘সালেহীন’-দের অন্যতম প্রধান কাজ।

    ৪. অনুধাবন: আহলে কিতাব বনাম সালেহীন:

    আয়াত ১১৩ শুরু হয়েছে এই বলে— “লাইসু সাওয়া-আ” (তারা সবাই সমান নয়)। এর মাধ্যমে আল্লাহ সু.তা. স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মে বা গোষ্ঠীতে জন্ম নিলেই কেউ ‘সালেহীন’ হয় না। বরং যে ব্যক্তি উপরোক্ত গুণাবলি অর্জন করবে, সে যে গোষ্ঠীরই হোক না কেন, আল কুরআনের মানদণ্ডে সে-ই হবে ‘সালেহ’। এটি একটি চিরন্তন এবং সর্বজনীন সংজ্ঞা।

    সালেহীন’ ও ‘মুসলেহীন’: আল কুরআনের রূপরেখা:

    আল কুরআনের পরিভাষায় ‘সালেহ’ হওয়া হলো নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর দেওয়া ছাঁচে যোগ্য করে তোলা, আর ‘মুসলেহ’ হওয়া হলো সেই যোগ্যতার ভিত্তিতে সমাজ ও পরিবেশকে সংশোধন করা।

    মুসলেহীন (সংশোধনকারী)-এর সংজ্ঞা ও মূল ভিত্তি:

    সূরা আল-আ’রাফের ১৭০ নম্বর আয়াতটি ‘মুসলেহীন’ হওয়ার একটি গাণিতিক সূত্র প্রদান করে:

    “আর যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে; নিশ্চয়ই আমি সংস্কারকদের (মুসলেহীন) প্রতিদান নষ্ট করি না।” (৭:১৭০)

    বিশ্লেষণ: এই আয়াতের নজম (বিন্যাস) অনুযায়ী, মুসলেহ বা সংশোধনকারী হওয়ার জন্য দুটি কাজ অনিবার্য:

    তামাস্সুক বিল কিতাব: আল কুরআনের বিধানকে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা।

    ইক্বামাতুস সালাত: আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল সমাজ কাঠামো গঠন করা।

    অর্থাৎ, আল কুরআনের দৃষ্টিতে সংশোধনকারী বা ‘মুসলেহ’ কেবল তিনি নন যিনি মুখে উপদেশের কথা বলেন, বরং তিনি—যিনি কিতাব ও সালাতের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করেন।


    আল কুরআনে উদাহরন হিসেবে ‘সালেহীন’-দের গৌরবোজ্জ্বল তালিকা:

    আল্লাহ সু.তা. বিভিন্ন নবী ও রাসূলের নামের শেষে ‘সালেহীন’ বিশেষণটি যুক্ত করে তাঁদের কর্মতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দিয়েছেন:

    সালামুন আলা ইব্রাহিম: আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি নিজের নফসকে নির্বোধ বানিয়েছে সে ছাড়া ইব্রাহিমের আদর্শ থেকে কে বিমুখ হতে পারে? আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং পরকালেও সে অবশ্যই সালেহীন (সৎকর্মশীলদের) অন্তর্ভুক্ত।” (২:১৩০)

    অনুধাবন: এখানে ‘সালেহ’ হওয়াকে আল্লাহর ‘মনোনীত’ হওয়ার ফল হিসেবে দেখানো হয়েছে।

    যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা ও ইলিয়াস (সালামুন আলাইহিম): “আর যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা এবং ইলিয়াস—তারা প্রত্যেকেই ছিল সালেহীন (সৎকর্মশীলদের) অন্তর্ভুক্ত।” (৬:৮৫)

    বিশেষ উল্লেখ: সালামুন আলা ঈসা সম্পর্কে ৩:৪৬ আয়াতে বলা হয়েছে তিনি শৈশবে ও পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলবেন এবং তিনি হবেন সালেহীন-দের একজন। ইয়াহইয়া (সালামুন আলাইহে) সম্পর্কে ৩:৩৯ আয়াতে বলা হয়েছে তিনি হবেন একজন নবী এবং সালেহীন-দের অন্তর্ভুক্ত।

    ইসহাক ও ইয়াকুব (সালামুন আলাইহিম): “আমি তাকে দান করলাম ইসহাক এবং পুরস্কার স্বরূপ ইয়াকুব; এবং তাদের প্রত্যেককেই আমি সালেহীন (সৎকর্মশীল) বানিয়েছিলাম।” (২১:৭২)

    ইমপ্লাইড এভিডেন্স: বংশপরম্পরায় ‘সালেহ’ হওয়া আল্লাহর একটি বিশেষ রহমত।

    লুত (সালামুন আলাইহে): “আমি তাকে (লুতকে) বিচারবুদ্ধি ও জ্ঞান দান করেছিলাম... এবং তাকে আমার রহমতে দাখিল করেছিলাম; নিশ্চয়ই সে ছিল সালেহীন-দের অন্তর্ভুক্ত।” (২১:৭৪-৭৫)

    সালামুন আলা ইউনুস: “অতঃপর তার রব তাকে মনোনীত করলেন এবং তাকে সালেহীন (সৎকর্মশীলদের) অন্তর্ভুক্ত করলেন।” (৬৮:৫০)

    প্রেক্ষাপট: মাছের পেটে থাকা অবস্থায় তাসবিহ ও তওবার মাধ্যমে তিনি যখন নিজেকে সংশোধন করলেন, আল্লাহ তাঁকে ‘সালেহীন’ উপাধি দিলেন।

    ৩. ‘সালেহীন’ ও ‘মুসলেহীন’-এর পারস্পরিক সংযোগ:

    আল কুরআনের আয়াতসমূহ একত্রিত করলে দেখা যায়, ‘সালেহীন’ হওয়ার পর্যায়টি ব্যক্তির গুণগত পূর্ণতা নির্দেশ করে, আর ‘মুসলেহীন’ হওয়া সেই গুণের সামাজিক বহিঃপ্রকাশ।

    নবীগণ ছিলেন ‘সালেহীন’ (ব্যক্তিগতভাবে যোগ্য ও পবিত্র), তাই তাঁরা হতে পেরেছিলেন ‘মুসলেহীন’ (জাতির সংশোধনকারী)। 

    সালামুন আলা হুদ যেমন বলেছিলেন:

    “আমি আমার সাধ্যমতো কেবল সংশোধন (ইসলাহ) করতে চাই।” (১১:৮৮)

    আল-কুরআনের বর্ণনায় 'আমলে সলেহ' এবং 'অসৎ কাজ' কেবল একটি তালিকা নয়, বরং এটি একটি জীবন দর্শন।

    সালামুন আলা ইবরাহিম যখন অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হচ্ছিলেন, তখন তাঁর 'সবর' ছিল আমলে সলেহ।

    সালামুন আলা ইউসুফ যখন প্রলোভনের মুখে নিজেকে সংবরণ করেছিলেন, তখন তাঁর 'তাকওয়া' ছিল আমলে সলেহ।

    সালামুন আলা মুসা যখন অন্যের জন্য পানি তুলে দিয়েছিলেন প্রতিদান ছাড়া, সেটি ছিল আমলে সলেহ।

    ➢ সালামুন আলা নূহ শত প্রতিকূলতার মাঝেও সমাজ সংশোধনের কাজ করেছেন।

    ➢  সালামুন আলা দাউদ ও সালামুন আলা সুলাইমান ক্ষমতার শিখরে থেকেও ন্যায়বিচার ও শোকর (আমলে সলেহ) বজায় রেখেছেন।

    ➢ সালামুন আলা মুহাম্মদ শিখিয়েছেন যে, একটি হাসিমুখও আমলে সলেহ হতে পারে।

    কুরআনি সামঞ্জস্যতা আমাদের শেখায় যে, সালামুন আলা মুরসালিন (সকল রাসূলগণের ওপর সালাম) যে আদর্শ রেখে গেছেন, তা হলো মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ হবে এমন, যা সমাজকে কলুষতামুক্ত (অসৎ কাজ মুক্ত) করবে এবং কল্যাণের পথে (সৎ কাজ) পরিচালিত করবে। আমলের সৌন্দর্য কেবল তার বাহ্যিক অবয়বে নয়, বরং তার অভ্যন্তরীণ একনিষ্ঠতা ও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়ার মধ্যে নিহিত।

    আল কুরআনের সামগ্রিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী:

    ১. সালেহীন হলেন তারা যাদের নফস বা আত্মা আল্লাহর কিতাবের আলোকে পরিশোধিত এবং যারা আল্লাহর রহমতের যোগ্য হিসেবে প্রমাণিত (যেমনটি নবীগণের তালিকায় দেখা যায়)।

    ২. মুসলেহীন হলেন তারা যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে সমাজের বিশৃঙ্খলা (ফাসাদ) দূর করে শান্তি ও সংশোধন আনয়ন করেন (৭:১৭০)।

    ৩. নবীগণের এই দীর্ঘ তালিকা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ‘সালেহ’ হওয়া কেবল একটি উপাধি নয়, বরং এটি ইলম (জ্ঞান), হিকমাহ (প্রজ্ঞা) এবং ত্যাগের এক সমন্বিত ফলাফল।

    অনর্থক কাজ বর্জন (Laghw বনাম Salehat):

    আমলে সলেহ-র একটি শর্ত হলো তা অর্থবহ হওয়া। মুমিনের জীবনে অনর্থক বা ফালতু কাজের কোনো স্থান নেই।

     সুরা আল-কাসাস (২৮:৫৫): "যখন তারা অনর্থক কথা (লাঘব) শুনতে পায়, তখন তা উপেক্ষা করে এবং বলে—আমাদের জন্য আমাদের আমল, তোমাদের জন্য তোমাদের আমল। তোমাদের প্রতি ‘সালামুন’ (শান্তি), আমরা মূর্খদের সাথে জড়াতে চাই না।"

    শিক্ষা: মূর্খতা ও অনর্থক কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখাও একটি বড় মাপের আমলে সলেহ।

    আমলে সালেহ-এর বিপরীত ব্যঞ্জনা: 

    আল কুরআন মাজীদ একটি সুসংগত জীবনবিধান, যেখানে প্রতিটি শব্দের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ ধারণা বিদ্যমান। আল কুরআনের পরিভাষায় ‘আমলে সালেহ’ (عمل صالح) বা সৎকর্ম কেবল প্রথাগত কোনো ভালো কাজ নয়, বরং এটি এমন এক কর্ম যা সংশোধনমূলক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং যা ফিতরাত বা প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শব্দতান্ত্রিক বিশ্লেষণ এবং আয়াতের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস (নজম) পর্যালোচনা করলে আমলে সালেহ-এর বিপরীত হিসেবে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট শব্দ ও ধারণাকে পাওয়া যায়। নিচে কেবল আল কুরআনের আয়াতের আলোকে এর একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।

    ১. সরাসরি শব্দতান্ত্রিক বিপরীত: ‘আমালুন গাইরু সালেহ’ (عمل غير صالح):

    আল কুরআন মাজীদে ‘সালেহ’ শব্দের সরাসরি নেতিবাচক রূপ হিসেবে ‘গাইরু সালেহ’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি এমন এক কর্ম যা উদ্দেশ্য এবং পদ্ধতিতে ত্রুটিপূর্ণ।

    নূহ (সালামুন আলাইহে)-এর পুত্রের প্রসঙ্গে আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন:

    “তিনি (আল্লাহ) বললেন, হে নূহ! সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়, কারণ সে ‘আমালুন গাইরু সালেহ’ (সৎকর্ম নয় এমন কাজ) বা অসৎকর্মপরায়ণ।” (১১:৪৬)

    এখানে লক্ষ্যণীয় যে, ব্যক্তির পরিচয়কে তার কর্মের সাথে একীভূত করে দেওয়া হয়েছে।  অর্থাৎ, ‘সালেহ’ বা সংশোধনমূলক কর্মের বিপরীত হলো এমন কাজ যা ধ্বংসাত্মক বা যা মূল লক্ষ্যের সাথে অসংগতিপূর্ণ। আমলে সালেহ যেখানে মানুষকে আল্লাহর সান্নিধ্যে উন্নীত করে, ‘আমালুন গাইরু সালেহ’ সেখানে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

    ২. কাঠামোগত বিপরীত শব্দ: ‘আস-সাইয়্যিআহ’ (السَّيِّئَة)

    আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আমলে সালেহ-এর বৈপরীত্য বোঝাতে ‘আস-সাইয়্যিআহ’ বা মন্দ কাজ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দগতভাবে ‘সালেহ’ হলো যা কল্যাণকর ও সুসংগত, আর ‘সাইয়্যিআহ’ হলো যা ক্ষতিকর, কদর্য এবং যা মানুষের মনে ও সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে।

    আল্লাহ সু.তা. ইরশাদ করেন:

    “যে ব্যক্তি মন্দ কাজ (সাইয়্যিআহ) করবে, তাকে তার অনুরূপ প্রতিফলই দেওয়া হবে; আর যে মুমিন হয়ে সৎকর্ম (সালেহ) করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে...” (৪০:৪০)

    এখানে ‘সালেহ’ এবং ‘সাইয়্যিআহ’-কে একে অপরের বিপরীত মেরুতে স্থাপন করা হয়েছে। অনুধাবন করলে দেখা যায়, ‘সালেহ’ কর্মের বিন্যাস হলো গঠনমূলক (Constructive), আর ‘সাইয়্যিআহ’ হলো বিচ্যুতিমূলক (Deviating)। আল কুরআনের অন্য আয়াতে সৎকর্মের মাধ্যমে মন্দ কর্মকে দূরীভূত করার কথা বলা হয়েছে, যা প্রমাণ করে এই দুটি পরস্পরবিরোধী শক্তি:

    “নিশ্চয়ই নেক আমলসমূহ (হাসানাত) মন্দ আমলসমূহকে (সাইয়্যিআত) মিটিয়ে দেয়।” (১১:১১৪)

    ৩. অস্তিত্বগত ও সামাজিক বিপরীত: ‘আল-ফাসাদ’ (الفَسَاد):

    ‘সালেহ’ শব্দের মূল ধাতু (S-L-H) থেকে উদ্ভূত ‘ইসলাহ’ (اصلاح) যার অর্থ সংশোধন করা বা মেরামত করা। আল কুরআনের নাযিলকৃত বিন্যাসে ‘ইসলাহ’ বা ‘সালেহ’ কর্মের সবচেয়ে শক্তিশালী বিপরীত শব্দ হলো ‘ফাসাদ’ (বিপর্যয় বা বিশৃঙ্খলা)।

    আল্লাহ রব্বুল আলামিন নির্দেশ দিচ্ছেন:

    “পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের (ইসলাহ) পর সেখানে বিপর্যয় (ফাসাদ) সৃষ্টি করো না।” (৭:৫৬)

    এই আয়াতের শব্দগত গাঁথুনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এখানে ‘সালেহ’ বা ‘ইসলাহ’-এর বিপরীত হিসেবে ‘ফাসাদ’-কে আনা হয়েছে। অর্থাৎ, যে কর্মটি সমাজ, প্রকৃতি বা আত্মার ভারসাম্য নষ্ট করে, আল কুরআনের দৃষ্টিতে তা-ই আমলে সালেহ-এর বিপরীত। আমলে সালেহ হলো সেই কর্ম যা জগতকে তার আদি ও বিশুদ্ধ অবস্থায় ধরে রাখার চেষ্টা করে, আর ফাসাদ হলো সেই কর্ম যা তাকে কলুষিত করে।

    ৪. গভীর অনুধ্যান: ‘দলিলা’ এবং ‘ইমপ্লাইড এভিডেন্স’:

    আল কুরআনে বহু স্থানে মুমিনদের বর্ণনায় বলা হয়েছে: “আল্লাযিনা আমানু ওয়া আমিলুস সলিহাত” (যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে)। এর ঠিক বিপরীত চিত্র হিসেবে কাফিরদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে:

    “আর যারা কুফরি করে... তাদের কর্মসমূহ (আমালুহুম) মরুভূমির মরীচিকার ন্যায়।” (২৪:৩৯)

    এখানে আমলে সালেহ-এর বিপরীত হিসেবে কেবল ‘অসৎকর্ম’ নয়, বরং ‘নিষ্ফল কর্ম’-কেও ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, ঈমানবিহীন বা সঠিক লক্ষ্যহীন কর্ম যা দৃশ্যত ভালো মনে হলেও তা ‘সালেহ’ নয়, বরং তা ‘হাবাউম মানসূরা’ বা ধূলিকণার মতো উড়ে যাওয়া কর্ম (২৫:২৩)। সুতরাং, আমলে সালেহ-এর বিপরীত হলো এমন কাজ যা চূড়ান্ত বিচারে কোনো স্থায়িত্ব বা ফল দান করে না।

    ৫. বৈপরীত্যের আধ্যাত্মিক সংযোগ:

    আল কুরআন মাজীদে ‘সালেহ’ এবং ‘যুলুম’ (অবিচার/অন্ধকার)-এর মধ্যেও একটি তুলনামূলক সংযোগ দেখানো হয়েছে। ‘সালেহ’ মানে হলো কোনো জিনিসকে তার সঠিক স্থানে স্থাপন করা, আর ‘যুলুম’ হলো কোনো কিছুকে তার ভুল স্থানে রাখা।

    আল্লাহ সু.তা. বলেন:

    “আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম (সলিহাত) করেছে... আর যারা যুলুম করেছে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (১৪:২২-২৩-এর ভাবার্থ ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী)

    এই সূক্ষ্ম বিন্যাস থেকে বোঝা যায় যে, আমলে সালেহ-এর বিপরীত কর্ম ব্যক্তিকে অন্ধকার বা ‘যুলুমাত’-এর দিকে ঠেলে দেয়, যা ঈমানের আলোর বিপরীত।

    ‘সালেহ’ বনাম ‘আসা-আ’: সরাসরি বৈপরীত্যের কাঠামো:

    সূরা ফুসসিলাত-এ আল্লাহ সু.তা. ইরশাদ করেন:

    “ম্মান আমিলা সলিহান ফালিনাফসিহি, ওয়া মান আসা-আ ফাআলাইহা...”

    “যে ব্যক্তি সৎকর্ম (সালেহ) করে, সে তার নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে; আর যে মন্দ কাজ (আসা-আ) করে, তার বোঝা তার ওপরই বর্তাবে।” (৪১:৪৬)

    বিশ্লেষণ:

    এখানে ‘সালেহ’ (صالح) এবং ‘আসা-আ’ (أَسَاءَ) শব্দ দুটিকে একে অপরের বিপরীতে সমান্তরালভাবে রাখা হয়েছে।

    সালেহ (صالح): এর মূল অর্থ হলো সংশোধন করা, যোগ্য হওয়া বা ভারসাম্য রক্ষা করা।

    আসা-আ (أَسَاءَ): এটি ‘সু’ (سُوء) মূলধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ হলো মন্দ করা, ক্ষতি করা বা কোনো কিছুকে কদর্য রূপ দেওয়া।

    এই আয়াতের কাঠামো থেকে স্পষ্ট যে, আমলে সালেহ-এর বিপরীত কাজ হলো এমন কর্ম যা ব্যক্তির নিজের সত্তাকে ‘কলুষিত’ করে এবং ফিতরাত বা প্রকৃতির সৌন্দর্য নষ্ট করে।

    ২. ‘সালেহ’ ও ‘সাইয়্যিআহ’ (সালেহ বনাম মন্দ): অভ্যন্তরীণ সংযোগ:

    আল কুরআন মাজীদ যখন একই বাক্যে ভালো ও মন্দের মিশ্রণ বোঝাতে চায়, তখনও এই বৈপরীত্যটি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সূরা আত-তাওবাহ-তে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

    “তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে; তারা একটি নেক আমল (আমালান সলিহান) এবং অপর একটি মন্দ আমলকে (আখারা সাইয়্যিআন) মিশ্রিত করে ফেলেছে।” (৯:১০২)

    এখানে ‘সালেহ’-এর বিপরীত বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ‘সাইয়্যিআন’ (سَيِّئًا)। অর্থাৎ, যা সালেহ নয়, তা-ই হলো ‘সাইয়্যি’ বা মন্দ। এই আয়াতটি ৪১:৪৬ আয়াতের ব্যাখ্যাকে আরও শক্তিশালী করে। সালেহ হলো যা সংশোধনকারী, আর সাইয়্যি বা আসা-আ হলো যা বিচ্যুতি সৃষ্টিকারী।

    ৩. অনুধাবন: ফিতরাতের ভারসাম্য ও বিকৃতি:

    আল কুরআনের শব্দ বিন্যাস অনুসারে ‘সালেহ’ এবং ‘আসা-আ’ (বা সু) কেবল পুরস্কার বা শাস্তির বিষয় নয়, বরং এটি অস্তিত্বের ভারসাম্য।

    সালেহ হলো এমন কাজ যা মানুষের রুহ বা আত্মাকে তার মূল উৎসের সাথে সংযুক্ত রাখে।

    আসা-আ হলো সেই কাজ যা মানুষের বিবেক ও আত্মাকে সঙ্কুচিত করে।

    সূরা আন-নামল-এ সালেহ এবং আসা-আ-এর এই পরিবর্তনশীলতা বা ট্রান্সফরমেশন তুলে ধরা হয়েছে:

    “তবে যে ব্যক্তি যুলুম করার পর মন্দের (সু) পরিবর্তে ভালো (হুসন) দ্বারা তা পরিবর্তন করে ফেলে (তবে আমি ক্ষমাশীল)।” (২৭:১১)

    এখানে যদিও সরাসরি সালেহ শব্দটি আসেনি, কিন্তু যুলুম এবং মন্দ (সু)-এর বিপরীত হিসেবে ‘হুসন’ বা উত্তমকে আনা হয়েছে, যা আমলে সালেহ-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

    ৪. আল কুরআন মাজীদের ৪১:৪৬ আয়াতের ঠিক অনুরূপ একটি বর্ণনা সূরা আল-জাসিয়াতে এসেছে, যা বিষয়টিকে আরও সুনিশ্চিত করে:

    “যে সৎকর্ম (সালেহ) করে সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং যে মন্দ (আসা-আ) করে তা তার ওপরই বর্তাবে। অতঃপর তোমরা তোমাদের রবের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।” (৪৫:১৫)

    এই আয়াত দুটির (৪১:৪৬ এবং ৪৫:১৫) হুবহু মিল প্রমাণ করে যে, আল কুরআনের ডিকশনারিতে আমলে সালেহ-এর কারিগরি বা টেকনিক্যাল বিপরীত শব্দ হলো ‘আল-ইসা-আহ’ বা মন্দ কাজ।

    ৫. সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক সংযোগ:

    আল কুরআনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মানুষ যখন ‘আসা-আ’ বা মন্দ কাজ করে, তখন সে আসলে নিজের ওপরই যুলুম করে। এর বিপরীতে ‘সালেহ’ কর্ম হলো সেই ‘আদল’ বা ন্যায়বিচার যা সে নিজের আত্মার প্রতি করে। কুরআনী বিন্যাসে ‘সালেহ’ শব্দের শেষে যে শান্তি ও জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার বিপরীতে ‘আসা-আ’ বা মন্দ কাজের জন্য রাখা হয়েছে লাঞ্ছনা।

    সূরা আর-রুম-এ আল্লাহ রব্বুল আলামিন মন্দ কাজের পরিণাম বর্ণনা করেছেন:

    “অতঃপর যারা মন্দ কাজ (আসা-উস সু-আ) করেছিল তাদের পরিণাম হয়েছে মন্দ...” (৩০:১০)

    এখানে ‘আসা-উ’ (মন্দ করা) এবং ‘সু-আ’ (মন্দ পরিণাম) শব্দ দুটির যুগলবন্দি প্রমাণ করে যে, মন্দ কাজ নিজেই নিজের জন্য একটি কারাগার।

    ‘আমলে সালেহ’ ও ‘সাইয়্যিআহ’-এর সুনির্দিষ্ট তালিকা (১৬:৯০):

    আল কুরআন মাজীদে একটি আয়াতে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গভাবে ‘সালেহ’ এবং এর বিপরীত কর্মের তালিকা দেওয়া হয়েছে:

    “নিশ্চয়ই আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন আদল (ন্যায়বিচার), ইহসান (উত্তম আচরণ) ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের; আর তিনি নিষেধ করছেন ফাহশা (অশ্লীলতা), মুনকার (মন্দ কাজ) ও বাগী (সীমালঙ্ঘন/বিদ্রোহ) থেকে।” (১৬:৯০)

    এই আয়াতে ‘সালেহ’ কর্মের কাঠামোর বিপরীতে তিনটি নির্দিষ্ট ‘সাইয়্যি’ বা মন্দ কর্মের কথা বলা হয়েছে:

    ফাহশা (الفحشاء): যৌন অশ্লীলতা বা চারিত্রিক কলুষতা।

    মুনকার (المنكر): যা বিবেক ও বুদ্ধি দ্বারা প্রত্যাখ্যাত, সামাজিক অনাচার।

    বাগী (البغي): অন্যের অধিকার হরণ করা বা সীমার বাইরে গিয়ে বিশৃঙ্খলা করা।

    ‘আসা-আ’ (মন্দ কাজ) এর প্রায়োগিক উদাহরণ:

    সূরা বনী ইসরাঈলে আল্লাহ সু.তা. কর্মের দায়ভার স্পষ্ট করতে গিয়ে ‘সালেহ’ এবং ‘আসা-আ’-এর বিপরীতমুখী ব্যবহার দেখিয়েছেন:

    “যদি তোমরা ভালো করো (আহসানতুম), তবে নিজেদের জন্যই ভালো করবে; আর যদি তোমরা মন্দ করো (আসা-তুম), তবে তাও তোমাদের নিজেদের জন্যই।” (১৭:৭)

    এখানে ‘আসা-তুম’ বা মন্দ কাজের উদাহরণ হিসেবে পরবর্তী আয়াতগুলোতে মা-বাবার অবাধ্যতা (১৭:২৩), অপচয় (১৭:২৬), সন্তান হত্যা (১৭:৩১), যিনা (১৭:৩২) এবং ওজনে কম দেওয়া (১৭:৩৫)-কে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোই হলো আল কুরআনের সংজ্ঞায় ‘ইসা-আহ’ বা মন্দ কর্মের তালিকা।

    উপমার মাধ্যমে বৈপরীত্যের চিত্র (১৪:২৪-২৬)

    আল কুরআন মাজীদ ‘সালেহ’ এবং ‘সাইয়্যি’ কর্মের প্রভাব বোঝাতে দুটি বৃক্ষের উপমা দিয়েছে:

    কালিমাতান তায়্যিবাহ (পবিত্র বাক্য/সৎকর্ম): একটি মজবুত বৃক্ষ, যার মূল গভীরে এবং শাখা আকাশে বিস্তৃত, যা সর্বদা ফল দেয়। (১৪:২৪-২৫)

    কালিমাতান খাবিসাহ (অপবিত্র বাক্য/অসৎকর্ম): এর বিপরীত হলো একটি নিকৃষ্ট গাছ, যা ভূমি থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে এবং যার কোনো স্থায়িত্ব নেই। (১৪:২৬)

    এখানে ‘সালেহ’ মানে হলো স্থায়িত্ব ও উৎপাদনশীলতা, আর এর বিপরীত (খাবিসাহ/সাইয়্যিআহ) মানে হলো অস্থিরতা ও নিষ্ফলতা।

    সামাজিক ও চারিত্রিক মানদণ্ডে বৈপরীত্য (সূরা আল-মাঊন):

    সূরা আল-মাঊন-এ সরাসরি কিছু ‘অসৎ কর্মের’ তালিকা দেওয়া হয়েছে যা ‘সালেহ’ গুণের বিপরীত:

    ■ এতিমকে ধমক দেওয়া (১০৭:২)।

    ■ মিসকিনকে অন্নদানে উৎসাহিত না করা (১০৭:৩)।

    ■ সালাতে উদাসীন থাকা ও লোক দেখানো কাজ করা (১০৭:৫-৬)।

    ■ নিত্যপ্রয়োজনীয় সাহায্য দানে বিরত থাকা (১০৭:৭)।

    এই কর্মগুলোই হলো সেই ‘সাইয়্যিআহ’ বা ‘মন্দ আমল’ যা একজন ব্যক্তির ইবাদতকে ধ্বংস করে দেয়।

    শব্দতান্ত্রিক সংক্ষেপ: একটি তুলনামূলক ছক

    আমলে সালেহ (সৎকর্ম)

    বিপরীত: ইসা-আহ / সাইয়্যিআহ (মন্দ কর্ম)

    কুরআনিক রেফারেন্স

    আদল ইহসান (ন্যায় দয়া)

    যুলুম বাগী (অবিচার বিদ্রোহ)

    ১৬:৯০, ৪২:৪০

    ইসলাহ (সংশোধন)

    ফাসাদ (বিপর্যয়/বিশৃঙ্খলা)

    :৫৬, :১১

    শুকর (কৃতজ্ঞতা)

    কুফর (অকৃতজ্ঞতা/অস্বীকৃতি)

    ৩১:১২

    তাকওয়া (সতর্কতা/খোদাভীতি)

    ফুজুর (পাপাচার/উচ্ছৃঙ্খলতা)

    ৯১:

    সিদক (সত্যবাদিতা)

    কিযব (মিথ্যাচার)

    ৩৯:৩৩

    আল-কুরআনের জ্ঞানসমুদ্র অসীম। 'আমলে সলেহ' (সৎ কাজ) এবং তার বিপরীত 'অসৎ কাজ' সম্পর্কে আরও গভীরতর এবং সূক্ষ্মতর কিছু আয়াত রয়েছে-  'তাদাব্বুর' পদ্ধতির মাধ্যমে বিষয়ের পূর্ণাঙ্গতা দান করে। নিম্নে নতুন তথ্যাদিসহ আলোচনা করা হলো:

    ১. কার্যাবলীর ঊর্ধ্বগমন ও শক্তির উৎস:

    কুরআনের একটি সূক্ষ্মতম আয়াত হলো এটি, যেখানে বলা হয়েছে সৎ কাজ কীভাবে আল্লাহর কাছে পৌঁছায়।

    সুরা ফাতির (৩৫:১০): "পবিত্র বাক্যসমূহ তাঁরই (আল্লাহর) দিকে আরোহণ করে এবং ‘আমলে সলেহ’ (সৎকাজ) সেটিকে উন্নীত করে।"

    তাদাব্বুর: এখানে একটি চমৎকার সামঞ্জস্য আছে। ঈমান বা যিকর হলো 'পবিত্র বাক্য', যা ওপরের দিকে উঠতে চায়, কিন্তু সেই বাক্যকে আল্লাহর দরবার পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে 'লিফট' বা শক্তি প্রয়োজন, সেটিই হলো 'আমলে সলেহ'। অর্থাৎ আমল ছাড়া কেবল মৌখিক দাবি অর্থহীন।


    ২. সৎ ও অসৎ কাজের উপমা: পবিত্র বৃক্ষ বনাম অপবিত্র বৃক্ষ:

    কুরআন মাজিদ অনেক সময় উপমার মাধ্যমে আমলের ফলাফল বুঝিয়ে দেয়, যা 'তাদাব্বুর ফিল কুরআন'-এর অন্যতম সৌন্দর্য।

    সুরা ইবরাহিম (১৪:২৪-২৬):

    সৎ কাজের উপমা (পবিত্র বৃক্ষ): যার মূল অত্যন্ত গভীর এবং শাখা-প্রশাখা আকাশে বিস্তৃত। যা সর্বদা ফল দান করে। সালামুন আলা ইবরাহিম যখন সত্যের দাওয়াত দিয়েছিলেন, তখন সেটি ছিল এই পবিত্র বৃক্ষের মতো যা আজও ফল দিয়ে যাচ্ছে।

    অসৎ কাজের উপমা (অপবিত্র বৃক্ষ): যা ভূপৃষ্ঠ থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে এবং যার কোনো স্থায়িত্ব নেই।


    ৩. 'আল-আকাবাহ' বা শ্রমসাধ্য পথ (সুরা আল-বালাদ):

    আল্লাহ তায়ালা সৎ কাজকে একটি পাহাড়ী খাড়া পথের সাথে তুলনা করেছেন, যা অতিক্রম করা কষ্টসাধ্য কিন্তু মুক্তির একমাত্র উপায়।

    সুরা আল-বালাদ (৯০:১১-১৮): এখানে আমলে সলেহ-র একটি প্রায়োগিক তালিকা দেওয়া হয়েছে:

     দাসমুক্তি বা শৃঙ্খল মোচন করা।

     দুর্ভিক্ষের দিনে অন্নদান করা।

     নিকটাত্মীয় এতিমকে সহায়তা করা।

     ধূলিধূসরিত মিসকিনকে (অসহায়) সাহায্য করা।

     একে অপরকে ধৈর্য (সবর) ও করুণার (মারহামাহ) উপদেশ দেওয়া।


    ৪. মানুষের অবক্ষয় বনাম সৎ কাজের সুরক্ষা (সুরা আত-তীন)

    মানুষের জৈবিক সৃষ্টি অত্যন্ত নিখুঁত হলেও তার চারিত্রিক পতন তাকে পশুর স্তরে নামিয়ে দিতে পারে।

    সুরা আত-তীন (৯৫:৪-৬): "আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম কাঠামোতে। এরপর আমি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি হীনতরদের হীনতমে। কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান এনেছে ও ‘আমলে সলেহ’ করেছে..."

    কুরআনি সামঞ্জস্যতা: অর্থাৎ, মানুষ কেবল তার সৎ কাজের মাধ্যমেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব (আহসানি তাকউইম) ধরে রাখতে পারে। অন্যথায় সে নিকৃষ্টতর জীবে পরিণত হয়।


    ৫. লোকদেখানো ইবাদত ও ক্ষুদ্র সাহায্য (সুরা আল-মাউন):

    এই সুরাটি সৎ ও অসৎ কাজের মধ্যকার চারিত্রিক বৈপরীত্য স্পষ্ট করে দেয়।

    সুরা আল-মাউন (১০৭:১-৭):

    অসৎ চরিত্রের লক্ষণ: পরকালকে অস্বীকার করা, এতিমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেওয়া এবং মিসকিনকে খাবার দিতে উৎসাহিত না করা।

    সতর্কবাণী: ঐসব মুসল্লিদের জন্য ধ্বংস, যারা সালাতে অমনোযোগী এবং তা কেবল লোকদেখানোর জন্য করে এবং প্রয়োজনীয় ছোটখাটো সাহায্য (মাউন) করতেও বিরত থাকে।

     শিক্ষা: আমলে সলেহ কেবল বড় বড় কাজের নাম নয়, বরং ছোটখাটো সাহায্য ও আন্তরিকতাও এর অংশ।


    ৬. মন্দকে ভালো দ্বারা প্রতিহত করার কৌশল:

    কুরআন কেবল কাজের তালিকা দেয় না, বরং নেতিবাচক পরিস্থিতির বিপরীতে ইতিবাচক আচরণের শিক্ষা দেয়।

    সুরা ফুসসিলাত (৪১:৩৪): "সৎ কাজ ও অসৎ কাজ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত করো এমন কিছু দ্বারা যা উৎকৃষ্ট (সৎকাজ)। ফলে তোমার ও যার মধ্যে শত্রুতা ছিল, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে।

    তাদাব্বুর: এটি একটি সামাজিক কৌশল। শত্রুর মন্দের বিপরীতে ভালো আচরণ করা একটি মহান 'আমলে সলেহ'।


    ৭. তাওবার মাধ্যমে অসৎ কাজকে সৎ কাজে রূপান্তর:

    আল্লাহর অসীম দয়া যে, তিনি কেবল মন্দ কাজ ক্ষমা করেন না, বরং তাকে বদলে দেন।

    সুরা আল-ফুরকান (২৫:৭০): "কিন্তু যারা তাওবা করে, ঈমান আনে এবং ‘আমলে সলেহ’ করে, আল্লাহ তাদের গুনাহগুলোকে নেকিতে (সৎকাজে) পরিবর্তিত করে দেবেন।

    ➢ এটি কুরআনের একটি অভূতপূর্ব ভারসাম্য যেখানে অন্ধকারকে আলোতে রূপান্তরের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

    আল-কুরআনের জ্ঞানভাণ্ডার মুমিনের জন্য এক অন্তহীন ঝরনাধারা। ‘আমলে সলেহ’ বা সৎ কাজ এবং তার বিপরীত ‘ফাসাদ’ বা অসৎ কাজ সম্পর্কে আরও কিছু গভীর ও তথ্যসমৃদ্ধ আয়াত নিচে ‘তাদাব্বুর’ ও ‘সাফল্যের মানদণ্ড’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলো:

    নফসের পরিশুদ্ধি: সৎ ও অসৎ কাজের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি:

    আল্লাহ তায়ালা মানুষের অন্তরের মধ্যেই ভালো ও মন্দের একটি প্রাথমিক ধারণা দিয়ে দিয়েছেন। এটি সৎ কাজের মূল চালিকাশক্তি।

    সুরা আশ-শামস (৯১:৭-১০): "শপথ প্রাণের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুসামঞ্জস্য করেছেন। অতঃপর তাকে তার অসৎ কাজ (ফুরজুরাহা) ও তার সৎ কাজ (তাকওয়াহা)-এর জ্ঞান দান করেছেন। সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে। আর সে-ই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষিত করবে।"

    তাদাব্বুর: এখানে একটি বিস্ময়কর সামঞ্জস্য হলো—মানুষের বাহ্যিক আমল তার অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধির প্রতিফলন। আমল সলেহ-র মাধ্যমে নফস পবিত্র হয়, আর অসৎ কাজের মাধ্যমে তা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।


    পৃথিবীর উত্তরাধিকার ও আমলে সলেহ:

    কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, পৃথিবীর প্রকৃত নেতৃত্ব বা উত্তরাধিকার কেবল তাদেরই প্রাপ্য যারা সৎ কর্মশীল।

    সুরা আল-আম্বিয়া (২১:১০৫): "আমি জাবুরে উপদেশের পর লিখে দিয়েছি যে, আমার ‘সলেহ’ (সৎকর্মপরায়ণ) বান্দারাই পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।

    এই আয়াতের সত্যতা আমরা দেখি সালামুন আলা দাউদ এবং সালামুন আলা সুলাইমান-এর জীবনে, যেখানে ক্ষমতা ও আমলে সলেহ-র এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, আমলে সলেহ কেবল ব্যক্তিগত মুক্তি নয়, বরং বিশ্ব পরিচালনার যোগ্যতা।


    বাক-সংযম ও উত্তম কথা: একটি বিশেষ আমলে সলেহ:

    অনেক সময় আমরা কেবল শারীরিক ইবাদতকে আমলে সলেহ মনে করি, কিন্তু কুরআন মুখের ভাষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।

    ➥ সুরা আল-বাকারাহ (২:৮৩): "...আর মানুষের সাথে উত্তম কথা বলো।"

    ➥ সুরা আল-ইসরা (১৭:৫৩): "আমার বান্দাদের বলো, তারা যেন এমন কথা বলে যা সর্বোত্তম। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করে।"

    সামঞ্জস্যতা: অসৎ কাজের একটি বড় অংশ হলো কটু কথা বা মন্দ বাক্য। এর বিপরীতে 'উত্তম কথা' বলাকে আল্লাহ তায়ালা আমলের সৌন্দর্যের মানদণ্ড বানিয়েছেন।


    ৪. ইনসাফ ও ন্যায়বিচার: শত্রুতার উর্ধ্বে আমল:

    ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের উর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচার করা ‘আমলে সলেহ’-এর সর্বোচ্চ স্তরগুলোর একটি।

    সুরা আল-মায়িদাহ (৫:৮): "কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের এমন উত্তেজিত না করে যে, তোমরা ন্যায়বিচার ত্যাগ করো। ন্যায়বিচার করো, এটাই ‘তাকওয়া’র নিকটতর।"

    তাদাব্বুর: সাধারণ মানুষ বন্ধুর সাথে ভালো ব্যবহার করে, কিন্তু শত্রুর সাথেও ন্যায়সংগত আচরণ করা হলো সেই ‘আমলে সলেহ’ যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে।


    ৫. ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করা (অসৎ কাজের প্রতিরোধ):

    পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করা মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব।

    সুরা আল-আ'রাফ (৭:৫৬): "পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের পর সেখানে ‘ফাসাদ’ (বিশৃঙ্খলা/অসৎ কাজ) সৃষ্টি করো না।"

    কুরআনি সামঞ্জস্যতা: আল্লাহ পৃথিবীটাকে সুশৃঙ্খল ও সৎ কাজের উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন। সেখানে জুলুম, সুদ, ব্যভিচার বা পরিবেশ দূষণ করা হলো সেই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাকে নষ্ট করা।


    ৬. অনর্থক কাজ বর্জন (Laghw বনাম Salehat):

    আমলে সলেহ-র একটি শর্ত হলো তা অর্থবহ হওয়া। মুমিনের জীবনে অনর্থক বা ফালতু কাজের কোনো স্থান নেই।

    সুরা আল-কাসাস (২৮:৫৫): "যখন তারা অনর্থক কথা (লাঘব) শুনতে পায়, তখন তা উপেক্ষা করে এবং বলে—আমাদের জন্য আমাদের আমল, তোমাদের জন্য তোমাদের আমল। তোমাদের প্রতি ‘সালামুন’ (শান্তি), আমরা মূর্খদের সাথে জড়াতে চাই না।"

    শিক্ষা: মূর্খতা ও অনর্থক কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখাও একটি বড় মাপের আমলে সলেহ।


    ৭. সৎ ও অসৎ কাজের পরিণতির দৃশ্যমান চিত্র:

    কুরআন মাজিদে জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা দিয়ে আমলের আবশ্যকতা বোঝানো হয়েছে।

    সুরা আস-সাজদাহ (৩২:১৯): "যারা ঈমান এনেছে ও ‘আমলে সলেহ’ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের কাজের পুরস্কারস্বরূপ জান্নাতুল মাওয়া (বসবাসের জান্নাত)।"

    বিপরীত চিত্র (৩২:২০): "আর যারা পাপাচার (অসৎ কাজ) করেছে, তাদের ঠিকানা হলো আগুন।"

    এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কাজের পরিণাম সম্পর্কে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়েছেন।


    নবীদের আদর্শে আমলে সলেহ:

    কুরআনে বর্ণিত নবীগণের জীবনই হলো আমলে সলেহ’র বাস্তব তাফসির।

    ❖ যেমন— সালামুন আলা ইবরাহিম আমাদের শিখিয়েছেন একনিষ্ঠতা ও ত্যাগ।

    সালামুন আলা ইউসুফ শিখিয়েছেন চারিত্রিক পবিত্রতা ও ক্ষমা।

    সালামুন আলা মুসা শিখিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

    সালামুন আলা ঈসা শিখিয়েছেন দয়া ও বিনয়।

    সালামুন আলা মুহাম্মাদ শিখিয়েছেন সকল গুণের পূর্ণতা ও 'খুলুকুন আজিম' বা মহান চরিত্র।

    আমলে সলেহ কবুলের শর্তসমূহ:

    কুরআন নিজেই নিজের ব্যাখ্যা দেয়। আমলে সলেহ কখন গ্রহণযোগ্য হয় তা সুরা আল-কাহফ-এ বর্ণিত হয়েছে।

    সুরা আল-কাহফ (১৮:১১০): "যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন 'আমলে সলেহ' করে এবং তার রবের ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না করে।"

    এখানে সৎ কাজের সাথে দুটি শর্ত যুক্ত: ১. তা কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হওয়া (সলেহ), ২. ইখলাস বা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া (নিষ্কলুষতা)।

    ‘সালেহীন’-দের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য কুরআনী দুআ-তাসবিহ:

    ৪০ বৎসরে উপনীত হলে- [ আর আমরা মানুষকে অসযি়ত করছেি তার বাবা-মায়রে সাথে উত্তম আচরণ করত।ে তার মা তাকে কষ্ট করে র্গভে ধারণ করছেলি এবং তাকে কষ্ট করে প্রসব করছেলি। আর তার র্গভধারণ এবং তার দুগ্ধত্যাগ ত্রশি মাস। অবশষেে যখন সে তার শক্ত-িসার্মথ্যে পৌঁছল এবং চল্লশি বছরে উপনীত হলো, সে বলল!]
    رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي ۖ إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ

    রব্বি আওযি’নী- আন্ আশ্কুরা নি’মাতাকাল্লাতী- আন্‘আম্তা ‘আলাইয়্যা অ‘আলা-ওয়া-লিদাইয়্যা অআন্ ‘আমালা ছোয়া-লিহান র্তাদ্বোয়া-হু অআছ্লিহ্ লী ফী র্যুরিয়্যাতী; ইন্নী তুব্তু ইলাইকা অইন্নী মিনাল্ মুস্লি­মীন্। 
      
    অর্থ:  হে আমার রব!  আপনি আমাকে আপনার সে নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের যোগ্যতা দিন, যে নিয়ামত আপনি আমার প্রতি ও আমার পিতামাতার প্রতি দিয়েছেন এবং আমলে সলেহ করার, যা আপনি পছন্দ করেন। আর আপনি আমার জন্য আমার প্রজ¤œকে পরিশুদ্ধ করুন। নিশ্চয়ই আমি আপনার কাছে তাওবা করলাম। আর নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। [ওরাই তারা, যাদের থেকে আমরা সেটার সর্বোত্তমটা (ধযংধহ) গ্রহণ করব, যা তারা করেছে আর তাদের দোষগুলোকে (ংধরুধঃ) জান্নাতের অধিবাসীদের মধ্যে আমরা আড়াল করব। তাদের যা প্রতিশ্রুতি দেয়া হতো তা সত্য প্রতিশ্রুতি]-আল কুরআন ৪৬:১৫-১৬ 

    প্রাত্যহিক জীবনের আমলে সলেহ ও আত্মরক্ষার দুআ:

    নিজেকে সংশোধন করা এবং পরিবারের জন্য সৎ কাজের দোয়া করাও একটি আমলে সলেহ।

    রাব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিইয়াতিনা কুররাতা আইয়ুনিও ওয়াজআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।

    (رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا)
    অর্থ: হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ (নেতা) স্বরূপ করুন। (সুরা আল-ফুরকান: ৭৪)।

    রাব্বি আওজি'নি আন আশকুরা নি'মাতাকাল্লাতি আন'আমতা 'আলাইয়া ওয়া 'আলা ওয়ালিদাইয়্যা ওয়া আন আ'মালা সলেহান তারদ্বাহু...

    (رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ)
    হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন যাতে আমি আপনার সেই নেয়ামতের শোকর করতে পারি যা আপনি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছেন এবং যাতে আমি এমন 'আমলে সলেহ' করতে পারি যা আপনি পছন্দ করেন। (সুরা আন-নামল: ১৯)।

    সালেহীনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রধান দুআ:

    “রাব্বি হাব লি হুকমাঁও ওয়া আলহিকনি বিস সলিহিন।”

    (হে আমার রব! আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে নেককারদের/সালেহীনদের অন্তর্ভুক্ত করুন।) (২৬:৮৩)

    সংশোধন ও যোগ্য হওয়ার আর্তি (ইউনুস সালামুন আলাইহে-এর তাসবিহ):

    “লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যলিমিন।”

    (আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র মহান; নিশ্চয়ই আমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।) (২১:৮৭)

    আমলে সলেহ করার শক্তি অর্জনে কুরআনি দুআ/পবিত্র ও উত্তম জীবন (হায়াতান তায়্যিবাহ)-এর তৌফিক:

    সৎ পথে চলা এবং অসৎ কাজ থেকে বেঁচে থাকার জন্য কুরআনে অত্যন্ত সুন্দর কিছু দুআ শেখানো হয়েছে।

    রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান নার।

    (رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ)
    অর্থ: হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের দোজখের আগুন থেকে রক্ষা করুন। (সুরা আল-বাকারাহ: ২০১)।

    রাব্বিজ আলনি মুকিমাস সালাতি ওয়া মিন জুররিয়াতি, রাব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দুআ।

    (رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ)
    অর্থ: হে আমার পালনকর্তা! আমাকে সালাত কায়েমকারী করুন এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের দুআ কবুল করুন। (সুরা ইবরাহিম: ৪০)।

    সঠিক পথে অটল থাকার ও রহমতের দুআ (বিপথগামিতা থেকে রক্ষার প্রার্থনা)

    যাবতীয় অসৎ কাজ থেকে বেঁচে থেকে আমলে সলেহ-র ওপর অবিচল থাকার জন্য কুরআনি দুআ:

    রাব্বানা লা তুজিগ কুলুবানা বা'দা ইজ হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাতান, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব।

    (رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ)
    অর্থ: হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনে প্রবৃত্ত করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা। (সুরা আলে-ইমরান: ৮)।

    রাব্বানা ইন্নানা আমান্না ফাগফির লানা জুনুবানা ওয়া কিনা আজাবান নার।

    (رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ)
    অর্থ: হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা ঈমান এনেছি, অতএব আমাদের গুনাহসমূহ (অসৎ কাজসমূহ) ক্ষমা করুন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন। (সুরা আলে-ইমরান: ১৬)।

    ক্ষমা ও সংশোধনের তাসবিহ:

    “রাব্বানাগফির লানা যুনুবানা ওয়া ইসরাফানা ফী আমরিনা।”

    (হে আমাদের রব! আমাদের পাপসমূহ এবং আমাদের কাজের সীমালঙ্ঘনগুলো ক্ষমা করুন।) (৩:১৪৭)

    নেককার বা সালেহিনদের সাথে মিলিত হওয়ার প্রার্থনা:

    “রাব্বি হাব লি হুকমাঁও ওয়া আলহিকনি বিস সলিহিন।”

    (হে আমার রব! আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত করুন।) (২৬:৮৩)

    বিপথগামিতা থেকে বাঁচার ও নেক আমলের তৌফিক চাওয়ার দুআ:

    “রাব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রাহমাতাও ওয়া হাইয়্যি লানা মিন আমরিনা রাশাদা।”

    (হে আমাদের রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজগুলোকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন।) (১৮:১০)

    মৃত্যুর সময় সালেহীনদের সান্নিধ্য চাওয়ার দুআ:

    “তাওয়াফফানি মুসলিমাঁও ওয়া আলহিকনি বিস সলিহিন।”

    (আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দিন এবং আমাকে সালেহীন বা সৎকর্মশীলদের সাথে মিলিত করুন।) (১২:১০১)

    তাকওয়ার পথে অবিচল থাকার তাসবিহ:

    “হাসবিয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লাহু, আলাইহি তাওয়াক্কালতু ওয়া হুয়া রাব্বুল আরশিল আযিম।”

    (আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁরই ওপর ভরসা করেছি এবং তিনি মহান আরশের রব।) (৯:১২৯)

    ক্ষমা ও সংশোধনের তাসবিহ:

    “রাব্বানা আমান্না ফাগফির লানা ওয়ারহামনা ওয়া আনতা খাইরুর রাহিমিন।”

    (হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি, অতএব আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের ওপর দয়া করুন; আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।) (২৩:১০৯)

    সঠিক কর্মপন্থা ও আত্মশুদ্ধির দুআ

    নিজেকে যাবতীয় অসৎ কাজ থেকে রক্ষা করে আমলে সলেহ-তে মগ্ন রাখার জন্য কুরআনি দুআ:

    রাব্বানা আতমিম লানা নূরানা ওয়াগফির লানা, ইন্নাকা আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।

    (رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ)
    হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পূর্ণ করে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (সুরা আত-তাহরিম: ৮)।

    রাব্বি নাজ্জিনি মিনাল ক্বাওমিজ জোয়ালিমিন।

    (رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ)
    হে আমার পালনকর্তা! আমাকে জালেম সম্প্রদায়ের (অসৎ কর্মশীলদের) হাত থেকে রক্ষা করুন। (সুরা আল-কাসাস: ২১)।

    এই দুআটি সালামুন আলা মুসা করেছিলেন যখন তিনি জালেমদের হাত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর সাহায্য চেয়েছিলেন।

    মন্দ কর্মের কাফফারা ও ক্ষমা লাভের প্রার্থনা:

    “রাব্বানাগফির লানা যুনুবানা ওয়া কাফফির আন্না সাইয়্যিআতিনা ওয়া তাওয়াফফানা মাআল আবরার।”

    (হে আমাদের রব! আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদের মন্দ কাজগুলো (সাইয়্যিআত) মুছে দিন এবং নেককারদের সাথে আমাদের মৃত্যু দান করুন।) (৩:১৯৩)

    সংশোধনের ও উত্তম পরিণতির তাসবিহ:

    “আউযু বিল্লাহি আন আকুনা মিনাল জাহিলিন।”

    (আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই যেন আমি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হই।) (২:৬৭)

    কৃপণতা (যা আমলে সালেহ-এর অন্তরায়) থেকে মুক্তির আর্তি:

    “...ওয়া মাই ইউকা শুহ্হা নাফসিহি ফাউলাইকা হুমুল মুফলিহুন।”

    (যাদেরকে অন্তরের কৃপণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।) (৫৯:৯)

    উত্তম জীবন ও নেক আমলের তৌফিক চাওয়ার দুআ:

    “রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান নার।”

    (হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।) (২:২০১)

    আল্লাহর পথে ব্যয় করার দৃঢ়তা কামনায় তাসবিহ:

    “হাসবুুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল।”

    (আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।) (৩:১৭৩)

    সত্যের সাথে প্রবেশ ও প্রস্থানের দুআ:

    “রাব্বি আদখিলনি মুদখালা সিদকিঁও ওয়া আখরিজনি মুখরাজা সিদকিঁও ওয়াজআল লি মিল্লাদুনকা সুলতানান নাসিরা।”

    (হে আমার রব! আমাকে প্রবেশ করান সত্যের (সিদক) সাথে এবং আমাকে বের করুন সত্যের (সিদক) সাথে; আর আপনার পক্ষ থেকে আমাকে সাহায্যকারী শক্তি দান করুন।) (১৭:৮০)

    ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সত্যের সুখ্যাতি থাকার দুআ (ইব্রাহিম সালামুন আলাইহে-এর দুআ):

    “ওয়াজআল লি লিসানা সিদকিন ফিল আখিরিন।”

    (এবং পরবর্তীদের মধ্যে আমার জন্য সত্যের সুখ্যাতি অব্যাহত রাখুন।) (২৬:৮৪)

    সাদেকীনদের সাথে জান্নাতে থাকার আশা ও প্রার্থনা:

    “...ফাউলাইকা মাআল্লাযিনা আনআমাল্লাহু আলাইহিম মিনান নাবিয়্যিনা ওয়াস সিদ্দিকিনা ওয়াশ শুহাদাই ওয়াস সলিহিন; ওয়া হাসুনা উলাইকা রাফিকা।”

    (তারা তাদের সঙ্গী হবে যাদের ওপর আল্লাহ নেয়ামত দিয়েছেন—নবীগণ, সত্যবাদীগণ (সিদ্দিকীন), শহীদগণ ও সৎকর্মশীলগণ (সালেহিন); আর তারা কতই না উত্তম সঙ্গী!) (৪:৬৯)

    দান কবুল হওয়ার দুআ: সত্য গ্রহণের এবং আমল কবুলের দুআ:

    رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

    উচ্চারণ: রব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।

    অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু। (২:১২৭, ২:১২৮)

    আল্লাহর মহিমা ও রাসূলগণের প্রতি শান্তির তাসবিহ:

    سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ ۝ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ ۝ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

    উচ্চারণ: সুবহা-না রব্বিকা রব্বিল ‘ইযযাতি ‘আম্মা- ইয়াসিফূন। অসালা-মুন ‘আলাল মুরসালীন। অলহামদু লিল্লা-হি রব্বিল ‘আ-লামীন!

    অর্থ: আপনার রব, যিনি সকল সম্মানের অধিকারী, তিনি তারা যা আরোপ করে তা থেকে পবিত্র। এবং রাসুলগণের প্রতি শান্তি (সালাম)। আর সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। (৩৭:১৮০-১৮২)

    Post a Comment (0)
    Previous Post Next Post