বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।
১. আমলে সলেহ বা সৎ কাজের সংজ্ঞা ও ভিত্তি:
আল কুরআনের দৃষ্টিতে আমলে সালেহ-এর সংক্ষিপ্ত ও তাত্ত্বিক সংজ্ঞা -এ রকমটি অনুধাবনে আসে-
আমলে সলেহ- বিষয়টি কেন এত গুরুত্বপূর্ন?
জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষনেও সলেহীন কর্ম করার আকুতি:
➥ আর যারা ঈমান আনে এবং আমলে সলেহ করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতুল মাওয়া-৩২:১৯
➥ আর যে মুমিন অবস্থায় তাঁর কাছে আসবে সে অবশ্যই সংশোধনের কাজ করেছে। তাহলে ওরাই, যাদের জন্য সুউচ্চ মর্যাদাসমূহ। জান্নাতুন আদন ...আর সেটাই তাদের পুরস্কার, যারা পরিশুদ্ধ হয়-২০:৭৫-৭৬, ৯:৬০, ৯:১০৩, ৯১:৯, ৯২:১৮) (সংশোধনের কাজ ২০:৭০-৭৬)
➥ নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে ও যারা ইহুদি হয়েছে আর সাবেয়ীরা ও নাসারারা -যারা আল্লাহর ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ করেছে, তাহলে তাদের জন্য কোন ভয় নাই আর না তারা চিন্তিত হবে-৫:৬৯ (২:৬২)
আমলে সলেহ ও 'হায়াতুন তায়্যিবাহ' (পবিত্র জীবন):
আল-কুরআনে বর্ণিত সৎ কাজের (আমলে সলেহ) তালিকা:
শুধুমাত্র আল-কুরআনের ভাষা ও প্রসঙ্গ থেকে “আমলে সালেহ” (العمل الصالح) বা সৎকর্মের উপাদানসমূহ সংগ্রহ করা, অর্থাৎ পরবর্তী ফিকহ, তাফসীর বা প্রচলিত তালিকার পরিবর্তে কুরআন নিজে যেসব কাজকে নেকী, তাকওয়া, ইহসান, বির্র, ফালাহ, বা মুমিনের গুণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে সেগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
A. ঈমান ও বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা (মৌলিক ভিত্তি): আমলে সলেহ-
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, পরকাল, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ এবং নবী-রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। যেমনটি আল্লাহ বলেন— "সালামুন আলা নূহ, সালামুন আলা ইবরাহিম, সালামুন আলা মুসা ও হারুন এবং সালামুন আলা মুহাম্মাদ—তাঁরা সকলেই এই সত্যের প্রচারক ছিলেন।"■ আল্লাহর প্রতি ঈমান (২:১৭৭)
■ আখিরাতে ঈমান (২:১৭৭)
■ ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান (২:১৭৭)
■ কিতাবসমূহে ঈমান (২:১৭৭)
■ নবীদের প্রতি ঈমান (২:১৭৭)
■ আল্লাহর উপর ভরসা করা (৩:১৫৯, ৬৫:৩)
■ আল্লাহকে অধিক স্মরণ করা (৩৩:৪১)
■ আল্লাহর প্রতি আন্তরিক তওবা (৬৬:৮)
■ আল্লাহকে ভয় করা/তাকওয়া অবলম্বন (২:১৭৭, ৩:১০২)
■ আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করা (২:২০৭)
B. ইবাদত: আমলে সলেহ-
■ আল কুরআন আঁকড়ে ধরা ও অনুসরণ করা (৭:১৭০, ৭:৩)■ সালাত প্রতিষ্ঠা করা (২:১৭৭, ২৩:১-২,৭:১৭০)
■ সালাত-সংযোগে একাগ্র থাকা (২৩:২)
■ যাকাত প্রদান করা (২:১৭৭, ২৩:৪)
■ সিয়াম পালন করা (২:১৮৩)
■ হজ্জ সম্পাদন করা-উমরাহ পূর্ণ করা (২:১৯৬)
■ রাতের কিছু অংশ ইবাদতে কাটানো -২৫:৬৪ (২৫:৬৩-৭৭)
■ দোয়া করা (৪০:৬০, ২৫:৭৭)
C. আর্তমানবতার সেবা ও দানশীলতা: সম্পদ ও অর্থনৈতিক ন্যায় (আমলে সলেহ):
■ এতিমদের সাহায্য (২:১৭৭)
■ অভাবগ্রস্তদের সাহায্য (২:১৭৭)
■ পথিককে সাহায্য (২:১৭৭)
■ সাহায্যপ্রার্থীকে দান (২:১৭৭)
■ দাসমুক্তির জন্য ব্যয় (২:১৭৭, ৯০:১৩)
■ গোপনে ও প্রকাশ্যে দান (২:২৭৪)
■ আল্লাহর পথে ব্যয় (২:২৬১)
■ রিবা পরিহার (২:২৭৫-২৭৬)
■ ন্যায়সঙ্গত ব্যবসা (৪:২৯)
■ ওজন ও মাপ ঠিক রাখা (৬:১৫২, ১৭:৩৫)
■ সম্পদ অপচয় না করা (১৭:২৬-২৭)
■ সাদাকা যখন ‘ইসলাহ’ বা সংশোধনের মাধ্যম:
D. পরিবার ও আত্মীয়তা (আমলে সলেহ):
■ পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ (১৭:২৩)■ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা (৪:১, ১৩:২১)
■ স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ (৪:১৯)
■ পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করার চেষ্টা (৬৬:৬)
■ সন্তানদের হত্যা না করা (১৭:৩১)
E. সামাজিক ও মানবিক আচরণ (আমলে সলেহ):
■ চারিত্রিক দৃঢ়তা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা: (২:১৭৭, ১৭:৩৪)■ মানুষের মধ্যে মীমাংসা করা (৪৯:৯-১০)
■ সৎকাজের আদেশ (৩:১০৪)
■ অসৎকাজ থেকে নিষেধ (৩:১০৪)
■ নিপীড়িতদের সাহায্য (৪:৭৫)
■ প্রতিবেশী ও সঙ্গীর প্রতি সদ্ব্যবহার (৪:৩৬)
■
F. চরিত্র ও নৈতিকতা (আমলে সলেহ):
■ সত্যবাদিতা (৯:১১৯, ৩৩:৩৫)■ ধৈর্য ধারণ (২:১৭৭, ৩:২০০)
■ কৃতজ্ঞতা (১৪:৭)
■ ক্ষমা করা (২৪:২২, ৪২:৪০)
■ রাগ সংবরণ করা এবং মানুষকে ক্ষমা করা (৩:১৩৪)
■ বিনয়ী হওয়া (২৫:৬৩)
■ ইহসান (উত্তম আচরণ) (১৬:৯০)
■ অহংকার না করা (১৭:৩৭, ৩১:১৮)
■ নম্রভাবে চলাফেরা (২৫:৬৩)
■ উত্তম কথা বলা (২:৮৩, ১৭:৫৩)
■ অশ্লীলতা পরিহার (২৩:৫-৭, ২৪:৩০-৩১, ১৬:৯০)
■ মন্দকাজ (মুনকার) ও বাড়াবাড়ি না করা- ১৬:৯০
■ গীবত না করা (৪৯:১২)
■ উপহাস না করা (৪৯:১১)
■ অপবাদ না দেওয়া (২৪:২৩)
■ কু-ধারণা পরিহার (৪৯:১২)
■ হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকা (৫৯:১০)
■ ৯:১১৯ আয়াতের প্রেক্ষাপট ও সাদেকীনদের সাহচর্য: (৯:১১৯)
G. আত্মসংযম ও পবিত্রতা (আমলে সলেহ):
■ লজ্জাস্থানের হেফাজত (২৩:৫-৭)■ পবিত্রতা অর্জন (২:২২২)
■ দৃষ্টি সংযত রাখা (২৪:৩০-৩১)
■ প্রবৃত্তির অনুসরণ না করা (৭৯:৪০-৪১)
■ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা (৯১:৯)
H. কষ্ট ও পরীক্ষার সময় (আমলে সলেহ):
■ দারিদ্র্যে ধৈর্য (২:১৭৭)■ রোগে ধৈর্য (২:১৭৭)
■ বিপদে ধৈর্য (২:১৭৭)
■ সংগ্রামের সময় অবিচল থাকা (৩:২০০)
■ আল্লাহর উপর নির্ভর করা (৬৫:৩)
I. মুমিনদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য- (আমলে সলেহ):
■ অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা (২৩:৩)■ আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা (২৩:৮)
■ সালাতসমূহ সংরক্ষণ (২৩:৯)
■ রাতের বেলা ইবাদত করা (কুরআন স্টাডি) (২৫:৬৪, ৭৩:১-৯)
■ অপব্যয় না করা এবং কৃপণতাও না করা (২৫:৬৭)
■ মিথ্যা সাক্ষ্যে অংশ না নেওয়া (২৫:৭২)
■ জ্ঞানহীনতার মুখোমুখি হলে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ (২৫:৭২-৭৩)
■ ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করা (অসৎ কাজের প্রতিরোধ) পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করা মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব: পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের পর সেখানে ‘ফাসাদ’ (বিশৃঙ্খলা/অসৎ কাজ) সৃষ্টি করো না। (৭:৫৬):কুরআনি সামঞ্জস্যতা: আল্লাহ পৃথিবীটাকে সুশৃঙ্খল ও সৎ কাজের উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন। সেখানে জুলুম, রিবা, ব্যভিচার বা পরিবেশ দূষণ করা হলো সেই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাকে নষ্ট করা।
২. সার্বজনীন নৈতিক বিধিমালা (সৎ কাজের at a glance তালিকা):
বাক-সংযম ও উত্তম কথা: একটি বিশেষ আমলে সলেহ:
সামাজিক জীবনের ভারসাম্য ও আদব:
বর্জনীয় অসৎ কাজ (সুরা আল-হুজুরাত: ১১-১২):
■ অতিমাত্রায় ধারণা বা সন্দেহ করা (নিশ্চয় কিছু ধারণা গুনাহ)।
■ একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান বা গোয়েন্দাগিরি করা।
■ গিবত করা (নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমান অপরাধ)।
আমলে সালেহ-এর পরিধি: আল কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী কর্মের প্রকারভেদ:
“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে,
“মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই; সুতরাং তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে
“...তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক কর (وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ)...” (আয়াত ৮:১)
নেকীর সারসংক্ষেপ (আমলে সলেহ):
কুরআনের সামগ্রিক অনুধাবনে, আমলে সালেহ কোনো একক আচার নয়; বরং ঈমান + ইবাদত + ন্যায় + মানবসেবা + উত্তম চরিত্র + আল্লাহ সচেতনতা: -এই সমগ্র জীবনব্যবস্থার বাস্তব রূপ। “যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে” বাক্যাংশটি কুরআনে প্রায় ৫০ বারেরও বেশি এসেছে, যা দেখায় যে আমলে সালেহ হলো কুরআনিক জীবনদর্শনের কার্যকর প্রকাশ।
আল কুরআনের আয়নায় ‘সালেহীন’-এর পরিচয়:
আল কুরআন মাজীদে ‘সালেহীন’ বা সৎকর্মশীল হওয়া কোনো বংশগত বা গোষ্ঠীগত পরিচয় নয়, বরং এটি কতগুলো সুনির্দিষ্ট গুণের সমষ্টি।
৩:১১৩-১১৪ আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা সত্যনিষ্ঠ ছিল, তাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে ‘সালেহীন’-এর একটি জীবন্ত সংজ্ঞা দিয়েছেন।
১. সালেহীনদের সাতটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য (৩:১১৩-১১৪ এর বিশ্লেষণ):
আয়াত দুটির শব্দগত বিন্যাস লক্ষ্য করলে আমরা সালেহীনদের নিম্নোক্ত পরিচয় পাই:
■ উম্মাতুন কায়িমাহ (أُمَّةٌ قَائِمَةٌ): তারা সত্যের ওপর অবিচল এবং ন্যায়নিষ্ঠ একটি দল। (৩:১১৩)
■ ইয়াতলুনা আয়াতিল্লাহ (يَتْلُونَ آيَاتِ اللَّهِ): তারা নিশিরাতে আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে বা পাঠ করে। (৩:১১৩)
■ ওয়াহুম ইয়াসজুদুন (وَهُمْ يَسْجُدُونَ): তারা বিনম্রতায় সেজদাবনত হয় বা সালাত কায়েম করে। (৩:১১৩)
■ ইউ’মিনুনা বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখির (يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ): তারা আল্লাহ এবং পরকালের ওপর সুদৃঢ় বিশ্বাস রাখে। (৩:১১৪)
■ ইয়ামুরুনা বিল মা’রুফ (يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ): তারা সৎকাজের আদেশ দেয়। (৩:১১৪)
■ ইয়ানহাওনা আনিল মুনকার (يَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ): তারা মন্দ ও গর্হিত কাজ থেকে নিষেধ করে। (৩:১১৪)
ইউসারীউনা ফিল খাইরাত (يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ): তারা কল্যাণকর কাজে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে বা দ্রুত ধাবিত হয়। (৩:১১৪)
এই সাতটি গুণের বর্ণনা শেষ করার পরপরই আল্লাহ রব্বুল আলামিন চূড়ান্ত সিলমোহর দিয়ে বলছেন:
“...ওয়া উলাইকা মিনাস সলিহীন” (অর্থাৎ— এরাই হলো তারা, যারা সালেহীন বা সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত)। (৩:১১৪)
২. ‘ইউসারীউনা ফিল খাইরাত’ ও ‘আমলে সালেহ’-এর গভীর সংযোগ:
আয়াতের একটি চমৎকার শব্দ হলো ‘ইউসারীউনা’ (يسارعون)। এর অর্থ কেবল কাজ করা নয়, বরং কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী হওয়া। আল কুরআনের দর্শনে একজন ‘সালেহ’ ব্যক্তি কেবল সুযোগ এলে ভালো কাজ করেন না, বরং তিনি ভালো কাজ করার সুযোগ খুঁজে বেড়ান।
এই ‘খাইরাত’ বা কল্যাণকর কাজের মধ্যেই ইতিপূর্বে আলোচিত ‘সাদাকা’, ‘আদল’ ও ‘ইহসান’ নিহিত। অর্থাৎ, সালেহীনরা হলেন তাঁরাই যাঁরা অলসভাবে বসে না থেকে সমাজ ও আত্মার সংশোধনে (ইসলাহ) ক্ষিপ্রতার সাথে আত্মনিয়োগ করেন।
৩. ‘সালেহীন’ ও ‘মুনকার’-এর বৈপরীত্য:
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, সালেহীন হওয়ার জন্য কেবল নিজে ভালো হওয়া যথেষ্ট নয়, বরং ‘নাহি আনিল মুনকার’ বা মন্দ কাজ থেকে বাধা দেওয়ার সক্রিয় ভূমিকা থাকতে হবে। ৪১:৪৬ আয়াতে আমরা যে ‘আসা-আ’ (মন্দ কাজ) দেখেছিলাম, সেই মন্দকে রুখে দাঁড়ানোই হলো ‘সালেহীন’-দের অন্যতম প্রধান কাজ।
৪. অনুধাবন: আহলে কিতাব বনাম সালেহীন:
আয়াত ১১৩ শুরু হয়েছে এই বলে— “লাইসু সাওয়া-আ” (তারা সবাই সমান নয়)। এর মাধ্যমে আল্লাহ সু.তা. স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মে বা গোষ্ঠীতে জন্ম নিলেই কেউ ‘সালেহীন’ হয় না। বরং যে ব্যক্তি উপরোক্ত গুণাবলি অর্জন করবে, সে যে গোষ্ঠীরই হোক না কেন, আল কুরআনের মানদণ্ডে সে-ই হবে ‘সালেহ’। এটি একটি চিরন্তন এবং সর্বজনীন সংজ্ঞা।
সালেহীন’ ও ‘মুসলেহীন’: আল কুরআনের রূপরেখা:
আল কুরআনের পরিভাষায় ‘সালেহ’ হওয়া হলো নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর দেওয়া ছাঁচে যোগ্য করে তোলা, আর ‘মুসলেহ’ হওয়া হলো সেই যোগ্যতার ভিত্তিতে সমাজ ও পরিবেশকে সংশোধন করা।
মুসলেহীন (সংশোধনকারী)-এর সংজ্ঞা ও মূল ভিত্তি:
সূরা আল-আ’রাফের ১৭০ নম্বর আয়াতটি ‘মুসলেহীন’ হওয়ার একটি গাণিতিক সূত্র প্রদান করে:
“আর যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে; নিশ্চয়ই আমি সংস্কারকদের (মুসলেহীন) প্রতিদান নষ্ট করি না।” (৭:১৭০)
বিশ্লেষণ: এই আয়াতের নজম (বিন্যাস) অনুযায়ী, মুসলেহ বা সংশোধনকারী হওয়ার জন্য দুটি কাজ অনিবার্য:
তামাস্সুক বিল কিতাব: আল কুরআনের বিধানকে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা।
ইক্বামাতুস সালাত: আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল সমাজ কাঠামো গঠন করা।
অর্থাৎ, আল কুরআনের দৃষ্টিতে সংশোধনকারী বা ‘মুসলেহ’ কেবল তিনি নন যিনি মুখে উপদেশের কথা বলেন, বরং তিনি—যিনি কিতাব ও সালাতের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করেন।
আল কুরআনে উদাহরন হিসেবে ‘সালেহীন’-দের গৌরবোজ্জ্বল তালিকা:
আল্লাহ সু.তা. বিভিন্ন নবী ও রাসূলের নামের শেষে ‘সালেহীন’ বিশেষণটি যুক্ত করে তাঁদের কর্মতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দিয়েছেন:
সালামুন আলা ইব্রাহিম: আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি নিজের নফসকে নির্বোধ বানিয়েছে সে ছাড়া ইব্রাহিমের আদর্শ থেকে কে বিমুখ হতে পারে? আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং পরকালেও সে অবশ্যই সালেহীন (সৎকর্মশীলদের) অন্তর্ভুক্ত।” (২:১৩০)
অনুধাবন: এখানে ‘সালেহ’ হওয়াকে আল্লাহর ‘মনোনীত’ হওয়ার ফল হিসেবে দেখানো হয়েছে।
যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা ও ইলিয়াস (সালামুন আলাইহিম): “আর যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা এবং ইলিয়াস—তারা প্রত্যেকেই ছিল সালেহীন (সৎকর্মশীলদের) অন্তর্ভুক্ত।” (৬:৮৫)
বিশেষ উল্লেখ: সালামুন আলা ঈসা সম্পর্কে ৩:৪৬ আয়াতে বলা হয়েছে তিনি শৈশবে ও পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলবেন এবং তিনি হবেন সালেহীন-দের একজন। ইয়াহইয়া (সালামুন আলাইহে) সম্পর্কে ৩:৩৯ আয়াতে বলা হয়েছে তিনি হবেন একজন নবী এবং সালেহীন-দের অন্তর্ভুক্ত।
ইসহাক ও ইয়াকুব (সালামুন আলাইহিম): “আমি তাকে দান করলাম ইসহাক এবং পুরস্কার স্বরূপ ইয়াকুব; এবং তাদের প্রত্যেককেই আমি সালেহীন (সৎকর্মশীল) বানিয়েছিলাম।” (২১:৭২)
ইমপ্লাইড এভিডেন্স: বংশপরম্পরায় ‘সালেহ’ হওয়া আল্লাহর একটি বিশেষ রহমত।
লুত (সালামুন আলাইহে): “আমি তাকে (লুতকে) বিচারবুদ্ধি ও জ্ঞান দান করেছিলাম... এবং তাকে আমার রহমতে দাখিল করেছিলাম; নিশ্চয়ই সে ছিল সালেহীন-দের অন্তর্ভুক্ত।” (২১:৭৪-৭৫)
সালামুন আলা ইউনুস: “অতঃপর তার রব তাকে মনোনীত করলেন এবং তাকে সালেহীন (সৎকর্মশীলদের) অন্তর্ভুক্ত করলেন।” (৬৮:৫০)
প্রেক্ষাপট: মাছের পেটে থাকা অবস্থায় তাসবিহ ও তওবার মাধ্যমে তিনি যখন নিজেকে সংশোধন করলেন, আল্লাহ তাঁকে ‘সালেহীন’ উপাধি দিলেন।
৩. ‘সালেহীন’ ও ‘মুসলেহীন’-এর পারস্পরিক সংযোগ:
আল কুরআনের আয়াতসমূহ একত্রিত করলে দেখা যায়, ‘সালেহীন’ হওয়ার পর্যায়টি ব্যক্তির গুণগত পূর্ণতা নির্দেশ করে, আর ‘মুসলেহীন’ হওয়া সেই গুণের সামাজিক বহিঃপ্রকাশ।
নবীগণ ছিলেন ‘সালেহীন’ (ব্যক্তিগতভাবে যোগ্য ও পবিত্র), তাই তাঁরা হতে পেরেছিলেন ‘মুসলেহীন’ (জাতির সংশোধনকারী)।
“আমি আমার সাধ্যমতো কেবল সংশোধন (ইসলাহ) করতে চাই।” (১১:৮৮)
আল কুরআনের সামগ্রিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী:
১. সালেহীন হলেন তারা যাদের নফস বা আত্মা আল্লাহর কিতাবের আলোকে পরিশোধিত এবং যারা আল্লাহর রহমতের যোগ্য হিসেবে প্রমাণিত (যেমনটি নবীগণের তালিকায় দেখা যায়)।
২. মুসলেহীন হলেন তারা যারা কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে সমাজের বিশৃঙ্খলা (ফাসাদ) দূর করে শান্তি ও সংশোধন আনয়ন করেন (৭:১৭০)।
৩. নবীগণের এই দীর্ঘ তালিকা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ‘সালেহ’ হওয়া কেবল একটি উপাধি নয়, বরং এটি ইলম (জ্ঞান), হিকমাহ (প্রজ্ঞা) এবং ত্যাগের এক সমন্বিত ফলাফল।
অনর্থক কাজ বর্জন (Laghw বনাম Salehat):
আমলে সালেহ-এর বিপরীত ব্যঞ্জনা:
আল কুরআন মাজীদ একটি সুসংগত জীবনবিধান, যেখানে প্রতিটি শব্দের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ ধারণা বিদ্যমান। আল কুরআনের পরিভাষায় ‘আমলে সালেহ’ (عمل صالح) বা সৎকর্ম কেবল প্রথাগত কোনো ভালো কাজ নয়, বরং এটি এমন এক কর্ম যা সংশোধনমূলক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং যা ফিতরাত বা প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শব্দতান্ত্রিক বিশ্লেষণ এবং আয়াতের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস (নজম) পর্যালোচনা করলে আমলে সালেহ-এর বিপরীত হিসেবে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট শব্দ ও ধারণাকে পাওয়া যায়। নিচে কেবল আল কুরআনের আয়াতের আলোকে এর একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।
১. সরাসরি শব্দতান্ত্রিক বিপরীত: ‘আমালুন গাইরু সালেহ’ (عمل غير صالح):
আল কুরআন মাজীদে ‘সালেহ’ শব্দের সরাসরি নেতিবাচক রূপ হিসেবে ‘গাইরু সালেহ’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি এমন এক কর্ম যা উদ্দেশ্য এবং পদ্ধতিতে ত্রুটিপূর্ণ।
নূহ (সালামুন আলাইহে)-এর পুত্রের প্রসঙ্গে আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন:
“তিনি (আল্লাহ) বললেন, হে নূহ! সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়, কারণ সে ‘আমালুন গাইরু সালেহ’ (সৎকর্ম নয় এমন কাজ) বা অসৎকর্মপরায়ণ।” (১১:৪৬)
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, ব্যক্তির পরিচয়কে তার কর্মের সাথে একীভূত করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ‘সালেহ’ বা সংশোধনমূলক কর্মের বিপরীত হলো এমন কাজ যা ধ্বংসাত্মক বা যা মূল লক্ষ্যের সাথে অসংগতিপূর্ণ। আমলে সালেহ যেখানে মানুষকে আল্লাহর সান্নিধ্যে উন্নীত করে, ‘আমালুন গাইরু সালেহ’ সেখানে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
২. কাঠামোগত বিপরীত শব্দ: ‘আস-সাইয়্যিআহ’ (السَّيِّئَة)
আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আমলে সালেহ-এর বৈপরীত্য বোঝাতে ‘আস-সাইয়্যিআহ’ বা মন্দ কাজ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দগতভাবে ‘সালেহ’ হলো যা কল্যাণকর ও সুসংগত, আর ‘সাইয়্যিআহ’ হলো যা ক্ষতিকর, কদর্য এবং যা মানুষের মনে ও সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে।
আল্লাহ সু.তা. ইরশাদ করেন:
“যে ব্যক্তি মন্দ কাজ (সাইয়্যিআহ) করবে, তাকে তার অনুরূপ প্রতিফলই দেওয়া হবে; আর যে মুমিন হয়ে সৎকর্ম (সালেহ) করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে...” (৪০:৪০)
এখানে ‘সালেহ’ এবং ‘সাইয়্যিআহ’-কে একে অপরের বিপরীত মেরুতে স্থাপন করা হয়েছে। অনুধাবন করলে দেখা যায়, ‘সালেহ’ কর্মের বিন্যাস হলো গঠনমূলক (Constructive), আর ‘সাইয়্যিআহ’ হলো বিচ্যুতিমূলক (Deviating)। আল কুরআনের অন্য আয়াতে সৎকর্মের মাধ্যমে মন্দ কর্মকে দূরীভূত করার কথা বলা হয়েছে, যা প্রমাণ করে এই দুটি পরস্পরবিরোধী শক্তি:
“নিশ্চয়ই নেক আমলসমূহ (হাসানাত) মন্দ আমলসমূহকে (সাইয়্যিআত) মিটিয়ে দেয়।” (১১:১১৪)
৩. অস্তিত্বগত ও সামাজিক বিপরীত: ‘আল-ফাসাদ’ (الفَسَاد):
‘সালেহ’ শব্দের মূল ধাতু (S-L-H) থেকে উদ্ভূত ‘ইসলাহ’ (اصلاح) যার অর্থ সংশোধন করা বা মেরামত করা। আল কুরআনের নাযিলকৃত বিন্যাসে ‘ইসলাহ’ বা ‘সালেহ’ কর্মের সবচেয়ে শক্তিশালী বিপরীত শব্দ হলো ‘ফাসাদ’ (বিপর্যয় বা বিশৃঙ্খলা)।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন নির্দেশ দিচ্ছেন:
“পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের (ইসলাহ) পর সেখানে বিপর্যয় (ফাসাদ) সৃষ্টি করো না।” (৭:৫৬)
এই আয়াতের শব্দগত গাঁথুনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এখানে ‘সালেহ’ বা ‘ইসলাহ’-এর বিপরীত হিসেবে ‘ফাসাদ’-কে আনা হয়েছে। অর্থাৎ, যে কর্মটি সমাজ, প্রকৃতি বা আত্মার ভারসাম্য নষ্ট করে, আল কুরআনের দৃষ্টিতে তা-ই আমলে সালেহ-এর বিপরীত। আমলে সালেহ হলো সেই কর্ম যা জগতকে তার আদি ও বিশুদ্ধ অবস্থায় ধরে রাখার চেষ্টা করে, আর ফাসাদ হলো সেই কর্ম যা তাকে কলুষিত করে।
৪. গভীর অনুধ্যান: ‘দলিলা’ এবং ‘ইমপ্লাইড এভিডেন্স’:
আল কুরআনে বহু স্থানে মুমিনদের বর্ণনায় বলা হয়েছে: “আল্লাযিনা আমানু ওয়া আমিলুস সলিহাত” (যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে)। এর ঠিক বিপরীত চিত্র হিসেবে কাফিরদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে:
“আর যারা কুফরি করে... তাদের কর্মসমূহ (আমালুহুম) মরুভূমির মরীচিকার ন্যায়।” (২৪:৩৯)
এখানে আমলে সালেহ-এর বিপরীত হিসেবে কেবল ‘অসৎকর্ম’ নয়, বরং ‘নিষ্ফল কর্ম’-কেও ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, ঈমানবিহীন বা সঠিক লক্ষ্যহীন কর্ম যা দৃশ্যত ভালো মনে হলেও তা ‘সালেহ’ নয়, বরং তা ‘হাবাউম মানসূরা’ বা ধূলিকণার মতো উড়ে যাওয়া কর্ম (২৫:২৩)। সুতরাং, আমলে সালেহ-এর বিপরীত হলো এমন কাজ যা চূড়ান্ত বিচারে কোনো স্থায়িত্ব বা ফল দান করে না।
৫. বৈপরীত্যের আধ্যাত্মিক সংযোগ:
আল কুরআন মাজীদে ‘সালেহ’ এবং ‘যুলুম’ (অবিচার/অন্ধকার)-এর মধ্যেও একটি তুলনামূলক সংযোগ দেখানো হয়েছে। ‘সালেহ’ মানে হলো কোনো জিনিসকে তার সঠিক স্থানে স্থাপন করা, আর ‘যুলুম’ হলো কোনো কিছুকে তার ভুল স্থানে রাখা।
আল্লাহ সু.তা. বলেন:
“আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম (সলিহাত) করেছে... আর যারা যুলুম করেছে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (১৪:২২-২৩-এর ভাবার্থ ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী)
এই সূক্ষ্ম বিন্যাস থেকে বোঝা যায় যে, আমলে সালেহ-এর বিপরীত কর্ম ব্যক্তিকে অন্ধকার বা ‘যুলুমাত’-এর দিকে ঠেলে দেয়, যা ঈমানের আলোর বিপরীত।
‘সালেহ’ বনাম ‘আসা-আ’: সরাসরি বৈপরীত্যের কাঠামো:
সূরা ফুসসিলাত-এ আল্লাহ সু.তা. ইরশাদ করেন:
“ম্মান আমিলা সলিহান ফালিনাফসিহি, ওয়া মান আসা-আ ফাআলাইহা...”
“যে ব্যক্তি সৎকর্ম (সালেহ) করে, সে তার নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে; আর যে মন্দ কাজ (আসা-আ) করে, তার বোঝা তার ওপরই বর্তাবে।” (৪১:৪৬)
বিশ্লেষণ:
এখানে ‘সালেহ’ (صالح) এবং ‘আসা-আ’ (أَسَاءَ) শব্দ দুটিকে একে অপরের বিপরীতে সমান্তরালভাবে রাখা হয়েছে।
সালেহ (صالح): এর মূল অর্থ হলো সংশোধন করা, যোগ্য হওয়া বা ভারসাম্য রক্ষা করা।
আসা-আ (أَسَاءَ): এটি ‘সু’ (سُوء) মূলধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ হলো মন্দ করা, ক্ষতি করা বা কোনো কিছুকে কদর্য রূপ দেওয়া।
এই আয়াতের কাঠামো থেকে স্পষ্ট যে, আমলে সালেহ-এর বিপরীত কাজ হলো এমন কর্ম যা ব্যক্তির নিজের সত্তাকে ‘কলুষিত’ করে এবং ফিতরাত বা প্রকৃতির সৌন্দর্য নষ্ট করে।
২. ‘সালেহ’ ও ‘সাইয়্যিআহ’ (সালেহ বনাম মন্দ): অভ্যন্তরীণ সংযোগ:
আল কুরআন মাজীদ যখন একই বাক্যে ভালো ও মন্দের মিশ্রণ বোঝাতে চায়, তখনও এই বৈপরীত্যটি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সূরা আত-তাওবাহ-তে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:
“তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে; তারা একটি নেক আমল (আমালান সলিহান) এবং অপর একটি মন্দ আমলকে (আখারা সাইয়্যিআন) মিশ্রিত করে ফেলেছে।” (৯:১০২)
এখানে ‘সালেহ’-এর বিপরীত বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ‘সাইয়্যিআন’ (سَيِّئًا)। অর্থাৎ, যা সালেহ নয়, তা-ই হলো ‘সাইয়্যি’ বা মন্দ। এই আয়াতটি ৪১:৪৬ আয়াতের ব্যাখ্যাকে আরও শক্তিশালী করে। সালেহ হলো যা সংশোধনকারী, আর সাইয়্যি বা আসা-আ হলো যা বিচ্যুতি সৃষ্টিকারী।
৩. অনুধাবন: ফিতরাতের ভারসাম্য ও বিকৃতি:
আল কুরআনের শব্দ বিন্যাস অনুসারে ‘সালেহ’ এবং ‘আসা-আ’ (বা সু) কেবল পুরস্কার বা শাস্তির বিষয় নয়, বরং এটি অস্তিত্বের ভারসাম্য।
সালেহ হলো এমন কাজ যা মানুষের রুহ বা আত্মাকে তার মূল উৎসের সাথে সংযুক্ত রাখে।
আসা-আ হলো সেই কাজ যা মানুষের বিবেক ও আত্মাকে সঙ্কুচিত করে।
সূরা আন-নামল-এ সালেহ এবং আসা-আ-এর এই পরিবর্তনশীলতা বা ট্রান্সফরমেশন তুলে ধরা হয়েছে:
“তবে যে ব্যক্তি যুলুম করার পর মন্দের (সু) পরিবর্তে ভালো (হুসন) দ্বারা তা পরিবর্তন করে ফেলে (তবে আমি ক্ষমাশীল)।” (২৭:১১)
এখানে যদিও সরাসরি সালেহ শব্দটি আসেনি, কিন্তু যুলুম এবং মন্দ (সু)-এর বিপরীত হিসেবে ‘হুসন’ বা উত্তমকে আনা হয়েছে, যা আমলে সালেহ-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৪. আল কুরআন মাজীদের ৪১:৪৬ আয়াতের ঠিক অনুরূপ একটি বর্ণনা সূরা আল-জাসিয়াতে এসেছে, যা বিষয়টিকে আরও সুনিশ্চিত করে:
“যে সৎকর্ম (সালেহ) করে সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং যে মন্দ (আসা-আ) করে তা তার ওপরই বর্তাবে। অতঃপর তোমরা তোমাদের রবের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।” (৪৫:১৫)
এই আয়াত দুটির (৪১:৪৬ এবং ৪৫:১৫) হুবহু মিল প্রমাণ করে যে, আল কুরআনের ডিকশনারিতে আমলে সালেহ-এর কারিগরি বা টেকনিক্যাল বিপরীত শব্দ হলো ‘আল-ইসা-আহ’ বা মন্দ কাজ।
৫. সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক সংযোগ:
আল কুরআনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মানুষ যখন ‘আসা-আ’ বা মন্দ কাজ করে, তখন সে আসলে নিজের ওপরই যুলুম করে। এর বিপরীতে ‘সালেহ’ কর্ম হলো সেই ‘আদল’ বা ন্যায়বিচার যা সে নিজের আত্মার প্রতি করে। কুরআনী বিন্যাসে ‘সালেহ’ শব্দের শেষে যে শান্তি ও জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার বিপরীতে ‘আসা-আ’ বা মন্দ কাজের জন্য রাখা হয়েছে লাঞ্ছনা।
সূরা আর-রুম-এ আল্লাহ রব্বুল আলামিন মন্দ কাজের পরিণাম বর্ণনা করেছেন:
“অতঃপর যারা মন্দ কাজ (আসা-উস সু-আ) করেছিল তাদের পরিণাম হয়েছে মন্দ...” (৩০:১০)
এখানে ‘আসা-উ’ (মন্দ করা) এবং ‘সু-আ’ (মন্দ পরিণাম) শব্দ দুটির যুগলবন্দি প্রমাণ করে যে, মন্দ কাজ নিজেই নিজের জন্য একটি কারাগার।
‘আমলে সালেহ’ ও ‘সাইয়্যিআহ’-এর সুনির্দিষ্ট তালিকা (১৬:৯০):
আল কুরআন মাজীদে একটি আয়াতে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গভাবে ‘সালেহ’ এবং এর বিপরীত কর্মের তালিকা দেওয়া হয়েছে:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন আদল (ন্যায়বিচার), ইহসান (উত্তম আচরণ) ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের; আর তিনি নিষেধ করছেন ফাহশা (অশ্লীলতা), মুনকার (মন্দ কাজ) ও বাগী (সীমালঙ্ঘন/বিদ্রোহ) থেকে।” (১৬:৯০)
এই আয়াতে ‘সালেহ’ কর্মের কাঠামোর বিপরীতে তিনটি নির্দিষ্ট ‘সাইয়্যি’ বা মন্দ কর্মের কথা বলা হয়েছে:
ফাহশা (الفحشاء): যৌন অশ্লীলতা বা চারিত্রিক কলুষতা।
মুনকার (المنكر): যা বিবেক ও বুদ্ধি দ্বারা প্রত্যাখ্যাত, সামাজিক অনাচার।
বাগী (البغي): অন্যের অধিকার হরণ করা বা সীমার বাইরে গিয়ে বিশৃঙ্খলা করা।
‘আসা-আ’ (মন্দ কাজ) এর প্রায়োগিক উদাহরণ:
সূরা বনী ইসরাঈলে আল্লাহ সু.তা. কর্মের দায়ভার স্পষ্ট করতে গিয়ে ‘সালেহ’ এবং ‘আসা-আ’-এর বিপরীতমুখী ব্যবহার দেখিয়েছেন:
“যদি তোমরা ভালো করো (আহসানতুম), তবে নিজেদের জন্যই ভালো করবে; আর যদি তোমরা মন্দ করো (আসা-তুম), তবে তাও তোমাদের নিজেদের জন্যই।” (১৭:৭)
এখানে ‘আসা-তুম’ বা মন্দ কাজের উদাহরণ হিসেবে পরবর্তী আয়াতগুলোতে মা-বাবার অবাধ্যতা (১৭:২৩), অপচয় (১৭:২৬), সন্তান হত্যা (১৭:৩১), যিনা (১৭:৩২) এবং ওজনে কম দেওয়া (১৭:৩৫)-কে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোই হলো আল কুরআনের সংজ্ঞায় ‘ইসা-আহ’ বা মন্দ কর্মের তালিকা।
উপমার মাধ্যমে বৈপরীত্যের চিত্র (১৪:২৪-২৬)
আল কুরআন মাজীদ ‘সালেহ’ এবং ‘সাইয়্যি’ কর্মের প্রভাব বোঝাতে দুটি বৃক্ষের উপমা দিয়েছে:
কালিমাতান তায়্যিবাহ (পবিত্র বাক্য/সৎকর্ম): একটি মজবুত বৃক্ষ, যার মূল গভীরে এবং শাখা আকাশে বিস্তৃত, যা সর্বদা ফল দেয়। (১৪:২৪-২৫)
কালিমাতান খাবিসাহ (অপবিত্র বাক্য/অসৎকর্ম): এর বিপরীত হলো একটি নিকৃষ্ট গাছ, যা ভূমি থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে এবং যার কোনো স্থায়িত্ব নেই। (১৪:২৬)
এখানে ‘সালেহ’ মানে হলো স্থায়িত্ব ও উৎপাদনশীলতা, আর এর বিপরীত (খাবিসাহ/সাইয়্যিআহ) মানে হলো অস্থিরতা ও নিষ্ফলতা।
সামাজিক ও চারিত্রিক মানদণ্ডে বৈপরীত্য (সূরা আল-মাঊন):
সূরা আল-মাঊন-এ সরাসরি কিছু ‘অসৎ কর্মের’ তালিকা দেওয়া হয়েছে যা ‘সালেহ’ গুণের বিপরীত:
■ এতিমকে ধমক দেওয়া (১০৭:২)।
■ মিসকিনকে অন্নদানে উৎসাহিত না করা (১০৭:৩)।
■ সালাতে উদাসীন থাকা ও লোক দেখানো কাজ করা (১০৭:৫-৬)।
■ নিত্যপ্রয়োজনীয় সাহায্য দানে বিরত থাকা (১০৭:৭)।
এই কর্মগুলোই হলো সেই ‘সাইয়্যিআহ’ বা ‘মন্দ আমল’ যা একজন ব্যক্তির ইবাদতকে ধ্বংস করে দেয়।
শব্দতান্ত্রিক সংক্ষেপ: একটি
তুলনামূলক ছক
|
আমলে সালেহ (সৎকর্ম) |
বিপরীত: ইসা-আহ / সাইয়্যিআহ
(মন্দ কর্ম) |
কুরআনিক রেফারেন্স |
|
আদল ও ইহসান (ন্যায় ও দয়া) |
যুলুম ও বাগী (অবিচার ও বিদ্রোহ) |
১৬:৯০, ৪২:৪০ |
|
ইসলাহ (সংশোধন) |
ফাসাদ (বিপর্যয়/বিশৃঙ্খলা) |
৭:৫৬, ২:১১ |
|
শুকর (কৃতজ্ঞতা) |
কুফর (অকৃতজ্ঞতা/অস্বীকৃতি) |
৩১:১২ |
|
তাকওয়া (সতর্কতা/খোদাভীতি) |
ফুজুর (পাপাচার/উচ্ছৃঙ্খলতা) |
৯১:৮ |
|
সিদক (সত্যবাদিতা) |
কিযব (মিথ্যাচার) |
৩৯:৩৩ |
আল-কুরআনের জ্ঞানসমুদ্র অসীম। 'আমলে সলেহ' (সৎ কাজ) এবং তার বিপরীত 'অসৎ কাজ' সম্পর্কে আরও গভীরতর এবং সূক্ষ্মতর কিছু আয়াত রয়েছে- 'তাদাব্বুর' পদ্ধতির মাধ্যমে বিষয়ের পূর্ণাঙ্গতা দান করে। নিম্নে নতুন তথ্যাদিসহ আলোচনা করা হলো:
১. কার্যাবলীর ঊর্ধ্বগমন ও শক্তির উৎস:
২. সৎ ও অসৎ কাজের উপমা: পবিত্র বৃক্ষ বনাম অপবিত্র বৃক্ষ:
৩. 'আল-আকাবাহ' বা শ্রমসাধ্য পথ (সুরা আল-বালাদ):
৪. মানুষের অবক্ষয় বনাম সৎ কাজের সুরক্ষা (সুরা আত-তীন)
৫. লোকদেখানো ইবাদত ও ক্ষুদ্র সাহায্য (সুরা আল-মাউন):
৬. মন্দকে ভালো দ্বারা প্রতিহত করার কৌশল:
৭. তাওবার মাধ্যমে অসৎ কাজকে সৎ কাজে রূপান্তর:
নফসের পরিশুদ্ধি: সৎ ও অসৎ কাজের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি:
পৃথিবীর উত্তরাধিকার ও আমলে সলেহ:
বাক-সংযম ও উত্তম কথা: একটি বিশেষ আমলে সলেহ:
৪. ইনসাফ ও ন্যায়বিচার: শত্রুতার উর্ধ্বে আমল:
৫. ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করা (অসৎ কাজের প্রতিরোধ):
৬. অনর্থক কাজ বর্জন (Laghw বনাম Salehat):
৭. সৎ ও অসৎ কাজের পরিণতির দৃশ্যমান চিত্র:
আমলে সলেহ কবুলের শর্তসমূহ:
‘সালেহীন’-দের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য কুরআনী দুআ-তাসবিহ:
রব্বি আওযি’নী- আন্ আশ্কুরা নি’মাতাকাল্লাতী- আন্‘আম্তা ‘আলাইয়্যা অ‘আলা-ওয়া-লিদাইয়্যা অআন্ ‘আমালা ছোয়া-লিহান র্তাদ্বোয়া-হু অআছ্লিহ্ লী ফী র্যুরিয়্যাতী; ইন্নী তুব্তু ইলাইকা অইন্নী মিনাল্ মুস্লিমীন্।
প্রাত্যহিক জীবনের আমলে সলেহ ও আত্মরক্ষার দুআ:
সালেহীনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রধান দুআ:
“রাব্বি হাব লি হুকমাঁও ওয়া আলহিকনি বিস সলিহিন।”
(হে আমার রব! আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে নেককারদের/সালেহীনদের অন্তর্ভুক্ত করুন।) (২৬:৮৩)
সংশোধন ও যোগ্য হওয়ার আর্তি (ইউনুস সালামুন আলাইহে-এর তাসবিহ):
“লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যলিমিন।”
(আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র মহান; নিশ্চয়ই আমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।) (২১:৮৭)
আমলে সলেহ করার শক্তি অর্জনে কুরআনি দুআ/ পবিত্র ও উত্তম জীবন (হায়াতান তায়্যিবাহ)-এর তৌফিক:
সঠিক পথে অটল থাকার ও রহমতের দুআ ( বিপথগামিতা থেকে রক্ষার
প্রার্থনা)
ক্ষমা ও সংশোধনের তাসবিহ:
“রাব্বানাগফির লানা যুনুবানা ওয়া ইসরাফানা ফী আমরিনা।”
(হে আমাদের রব! আমাদের পাপসমূহ এবং আমাদের কাজের সীমালঙ্ঘনগুলো ক্ষমা করুন।) (৩:১৪৭)
নেককার বা সালেহিনদের সাথে মিলিত হওয়ার প্রার্থনা:
“রাব্বি হাব লি হুকমাঁও ওয়া আলহিকনি বিস সলিহিন।”
(হে আমার রব! আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত করুন।) (২৬:৮৩)
বিপথগামিতা থেকে বাঁচার ও নেক আমলের তৌফিক চাওয়ার দুআ:
“রাব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রাহমাতাও ওয়া হাইয়্যি লানা মিন আমরিনা রাশাদা।”
(হে আমাদের রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজগুলোকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন।) (১৮:১০)
মৃত্যুর সময় সালেহীনদের সান্নিধ্য চাওয়ার দুআ:
“তাওয়াফফানি মুসলিমাঁও ওয়া আলহিকনি বিস সলিহিন।”
(আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দিন এবং আমাকে সালেহীন বা সৎকর্মশীলদের সাথে মিলিত করুন।) (১২:১০১)
তাকওয়ার পথে অবিচল থাকার তাসবিহ:
“হাসবিয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লাহু, আলাইহি তাওয়াক্কালতু ওয়া হুয়া রাব্বুল আরশিল আযিম।”
(আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁরই ওপর ভরসা করেছি এবং তিনি মহান আরশের রব।) (৯:১২৯)
ক্ষমা ও সংশোধনের তাসবিহ:
“রাব্বানা আমান্না ফাগফির লানা ওয়ারহামনা ওয়া আনতা খাইরুর রাহিমিন।”
(হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি, অতএব আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের ওপর দয়া করুন; আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।) (২৩:১০৯)
সঠিক কর্মপন্থা ও আত্মশুদ্ধির দুআ
মন্দ কর্মের কাফফারা ও ক্ষমা লাভের প্রার্থনা:
“রাব্বানাগফির লানা যুনুবানা ওয়া কাফফির আন্না সাইয়্যিআতিনা ওয়া তাওয়াফফানা মাআল আবরার।”
(হে আমাদের রব! আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদের মন্দ কাজগুলো (সাইয়্যিআত) মুছে দিন এবং নেককারদের সাথে আমাদের মৃত্যু দান করুন।) (৩:১৯৩)
সংশোধনের ও উত্তম পরিণতির তাসবিহ:
“আউযু বিল্লাহি আন আকুনা মিনাল জাহিলিন।”
(আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই যেন আমি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হই।) (২:৬৭)
কৃপণতা (যা আমলে সালেহ-এর অন্তরায়) থেকে মুক্তির আর্তি:
“...ওয়া মাই ইউকা শুহ্হা নাফসিহি ফাউলাইকা হুমুল মুফলিহুন।”
(যাদেরকে অন্তরের কৃপণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।) (৫৯:৯)
উত্তম জীবন ও নেক আমলের তৌফিক চাওয়ার দুআ:
“রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান নার।”
(হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।) (২:২০১)
আল্লাহর পথে ব্যয় করার দৃঢ়তা কামনায় তাসবিহ:
“হাসবুুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল।”
(আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।) (৩:১৭৩)
সত্যের সাথে প্রবেশ ও প্রস্থানের দুআ:
“রাব্বি আদখিলনি মুদখালা সিদকিঁও ওয়া আখরিজনি মুখরাজা সিদকিঁও ওয়াজআল লি মিল্লাদুনকা সুলতানান নাসিরা।”
(হে আমার রব! আমাকে প্রবেশ করান সত্যের (সিদক) সাথে এবং আমাকে বের করুন সত্যের (সিদক) সাথে; আর আপনার পক্ষ থেকে আমাকে সাহায্যকারী শক্তি দান করুন।) (১৭:৮০)
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সত্যের সুখ্যাতি থাকার দুআ (ইব্রাহিম সালামুন আলাইহে-এর দুআ):
“ওয়াজআল লি লিসানা সিদকিন ফিল আখিরিন।”
(এবং পরবর্তীদের মধ্যে আমার জন্য সত্যের সুখ্যাতি অব্যাহত রাখুন।) (২৬:৮৪)
সাদেকীনদের সাথে জান্নাতে থাকার আশা ও প্রার্থনা:
“...ফাউলাইকা মাআল্লাযিনা আনআমাল্লাহু আলাইহিম মিনান নাবিয়্যিনা ওয়াস সিদ্দিকিনা ওয়াশ শুহাদাই ওয়াস সলিহিন; ওয়া হাসুনা উলাইকা রাফিকা।”
(তারা তাদের সঙ্গী হবে যাদের ওপর আল্লাহ নেয়ামত দিয়েছেন—নবীগণ, সত্যবাদীগণ (সিদ্দিকীন), শহীদগণ ও সৎকর্মশীলগণ (সালেহিন); আর তারা কতই না উত্তম সঙ্গী!) (৪:৬৯)
দান কবুল হওয়ার দুআ: সত্য গ্রহণের এবং আমল কবুলের দুআ:
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
উচ্চারণ: রব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু। (২:১২৭, ২:১২৮)
আল্লাহর মহিমা ও রাসূলগণের প্রতি শান্তির তাসবিহ:
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
উচ্চারণ: সুবহা-না রব্বিকা রব্বিল ‘ইযযাতি ‘আম্মা- ইয়াসিফূন। অসালা-মুন ‘আলাল মুরসালীন। অলহামদু লিল্লা-হি রব্বিল ‘আ-লামীন!
অর্থ: আপনার রব, যিনি সকল সম্মানের অধিকারী, তিনি তারা যা আরোপ করে তা থেকে পবিত্র। এবং রাসুলগণের প্রতি শান্তি (সালাম)। আর সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। (৩৭:১৮০-১৮২)
