আর আমরা অবশ্যই তোমাকে দিয়েছি সাতটি পুনরাবৃত্ত বিষয় (সাব‘আন মিনাল-মাসানী) এবং মহান কুরআন। -সূরা আল হিজর ১৫:৮৭
সাব‘আন মিনাল-মাসানী: আল কুরআনের অভ্যন্তরীণ বুনন ও সাতটি পুনরাবৃত্ত সত্যের স্বরূপ অন্বেষণ-
আল কুরআন মাজীদ এমন এক বিস্ময়কর গ্রন্থ যা তার প্রতিটি রহস্যের চাবিকাঠি নিজের মধ্যেই ধারণ করে। সূরা আল হিজর-এর ৮৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন এক অনন্য নেয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন:
আর আমরা অবশ্যই তোমাকে দিয়েছি সাতটি পুনরাবৃত্ত বিষয় (সাব‘আন মিনাল-মাসানী) এবং মহান কুরআন। -সূরা আল হিজর ১৫:৮৭
এই আয়াতে ‘সাব‘আন মিনাল-মাসানী’ এবং ‘আল কুরআনাল আজীম’-কে ‘ওয়া’ (এবং) অব্যয় দ্বারা যুক্ত করা হয়েছে। ভাষাতাত্ত্বিক ও কুরআনিক বিন্যাস অনুযায়ী, এই ‘এবং’ নির্দেশ করে যে, ‘সাতটি মাসানী’ কুরআনেরই অংশ হওয়া সত্ত্বেও এর একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষ মর্যাদা রয়েছে—যা পুরো কুরআনের মূল কাঠামো বা ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
‘মাসানী’ শব্দের কুরআনিক সংজ্ঞা ও প্রয়োগ:
অনেকে ‘মাসানী’ বলতে কেবল একটি নির্দিষ্ট সূরার আয়াত সংখ্যাকে সীমাবদ্ধ করতে চাইলেও, আল কুরআন নিজেই এই শব্দের একটি বৃহত্তর ও গভীরতর সংজ্ঞা প্রদান করেছে। সূরা আয-যুমার-এ ইরশাদ হয়েছে:
“আল্লাহ নাযিল করেছেন সর্বোত্তম হাদীস -এক কিতাব, যা পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ (মুতাশাবিহান) এবং যা ‘মাসানী’ (বারবার ফিরে আসা বা জোড়ায় জোড়ায় উপস্থাপিত)।” (৩৯:২৩)
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, সম্পূর্ণ কুরআনকেই ‘মাসানী’ বলা হয়েছে। ‘মাসানী’ শব্দটি ‘সানা’ মূলধাতু থেকে আগত, যার অর্থ—কোনো কিছুকে ভাঁজ করা, দ্বিগুণ করা বা বারবার ফিরিয়ে আনা। অর্থাৎ, আল কুরআন এমন এক কিতাব যেখানে সত্যকে বারবার বিভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়েছে, একটি আয়াত অন্যটির ভাঁজ খুলে দেয় এবং একটি বিষয় অন্যটির পরিপূরক হিসেবে জোড়ায় জোড়ায় আবির্ভূত হয়।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, পুরো কুরআন যদি ‘মাসানী’ হয়, তবে এই বিশাল ভাণ্ডার থেকে সেই ‘সাতটি’ (সাব‘আন) বিশেষ বিষয় কী, যা আল্লাহ রব্বুল আলামিন আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন?
সাতটি পুনরাবৃত্ত স্তম্ভ: আল কুরআনের অভ্যন্তরীণ ‘নজম’ বা বিন্যাস কুরআন মাজীদের সামগ্রিক আলোচনা ও শব্দগত গাঁথুনি নিয়ে গভীর অনুধাবন করলে দেখা যায়, এই কিতাবটি সাতটি মৌলিক বিষয়ের ওপর আবর্তিত, যা পুরো কুরআনে বারবার ‘মাসানী’ বা পুনরাবৃত্ত পদ্ধতিতে ফিরে এসেছে। এই সাতটি বিষয়ই হলো কুরআনের মূল নির্যাস:
১. তাওহীদ বা রবের একত্ববাদ: স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্কের মূল ভিত্তি। (যেমন: ১:২, ১১২:১-৪) ২. রিসালাত বা ঐশী বার্তা: মানবজাতির জন্য প্রদর্শিত পথ ও রসূলগণের (সালামুন আলাল মুরসালিন) মিশন। (যেমন: ২:২১৩, ৩৩:৪০)
৩. আখিরাত বা পরকাল: জীবনের উদ্দেশ্য ও চূড়ান্ত জবাবদিহিতার অনিবার্য বাস্তবতা। (যেমন: ৩:১৮৫, ৫৬:১-৬)
৪. ইবাদত ও দাসত্ব: রবের প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য এবং সালাত ও ধৈর্যের বিধান। (যেমন: ২:৪৩, ৫১:৫৬)
৫. আল-কাসাস বা ঐতিহাসিক শিক্ষা: সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্দ্বে জাতিসমূহের উত্থান-পতনের পুনরাবৃত্ত ইতিহাস। (যেমন: ১১:১২০, ২৮:৩)
৬.আল-হুকম বা জীবনবিধান: ন্যায়বিচার, নৈতিকতা ও মানুষের পারস্পরিক অধিকারের নীতিমালা। (যেমন: ৪:৫৮, ৫:৮)
৭. আল-আমসাল বা উপমা ও নিদর্শন: মহাকাশ, প্রকৃতি ও মানুষের সৃষ্টিতত্ত্বের মধ্য দিয়ে রবের পরিচয়। (যেমন: ৩০:২০-২৭, ৩৯:২৭)
এই সাতটি বিষয়ই হলো সেই ‘সাব‘আন মিনাল-মাসানী’, যা কুরআনের প্রতিটি সূরা ও পারায় বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বারবার পুনরাবৃত্ত হয়ে মুমিনের চেতনাকে শাণিত করে।
শব্দগত সামঞ্জস্য ও অভ্যন্তরীণ কাঠামো বিশ্লেষণ:
১৫:৮৭ আয়াতের বিন্যাস অনুযায়ী, এই ‘সাতটি বিষয়’ হলো ‘ভিত্তি’ এবং ‘মহান কুরআন’ হলো তার ‘বিস্তার’। এটি ঠিক সেই সুতোর মতো যা একটি বিশাল মালার প্রতিটি মুক্তাকে গেঁথে রাখে।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন যখনই কোনো বিধান দেন (মাসানী), তখনই তার সাথে একটি বিপরীত বা পরিপূরক চিত্র তুলে ধরেন। যেমন, মুমিনের বর্ণনার সাথে কাফিরের বর্ণনা, জান্নাতের বর্ণনার সাথে জাহান্নামের সতর্কবার্তা। এই ‘জোড়ায় জোড়ায়’ উপস্থাপনের পদ্ধতিই হলো ‘মাসানী’র বহিঃপ্রকাশ।
সূরা আল হিজরের ৮৭ নম্বর আয়াতের পরে ৯১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন ওইসব লোকদের নিন্দা করেছেন যারা কুরআনকে ‘বিচ্ছিন্ন খণ্ড-বিখণ্ড’ (ইজীন) করে ফেলেছিল। এর বিপরীতে ‘মাসানী’ হলো সেই শক্তি যা কুরআনকে একটি অবিচ্ছেদ্য এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামো দান করে।
অনুধাবন: কেন এই জ্ঞান আয়ত্ত করা জরুরি?
কুরআনের আয়াতসমূহ কেবল পাঠের জন্য নয়, বরং তা ‘জ্ঞানে আয়ত্ত’ করার জন্য। সূরা আন-নামল-এ আল্লাহ রব্বুল আলামিন এক ভয়াবহ প্রশ্নের অবতারণা করেছেন:
“...তোমরা কি আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলেছিলে অথচ তোমরা সেগুলো জ্ঞানে আয়ত্ত (ইহাতা) করতে পারোনি? না কি তোমরা অন্য কিছু করছিলে?” (২৭:৮৪)
এখানে ‘জ্ঞানে আয়ত্ত’ করার অর্থ হলো কুরআনের এই পুনরাবৃত্ত বিষয়গুলোর (মাসানী) মধ্যকার অভ্যন্তরীণ যোগসূত্র এবং যৌক্তিক সামঞ্জস্য বুঝতে পারা। যখন একজন পাঠক বুঝতে পারেন যে, একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের পুনরাবৃত্তি কেন বারবার হচ্ছে, তখন তার কাছে কুরআনের আধ্যাত্মিক ও যৌক্তিক কাঠামোটি সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বৈপরীত্য ও সামঞ্জস্যের বিশ্লেষণ:
মানুষের তৈরি কোনো দর্শনে যখন কোনো বিষয় বারবার বলা হয়, তা একঘেয়েমি তৈরি করে।
কিন্তু আল কুরআন মাজীদের ‘মাসানী’ বৈশিষ্ট্যটি এমন যে, প্রতিটি পুনরাবৃত্তি একটি নতুন মাত্রা (Dimension) যোগ করে।
- এক স্থানে ‘সবর’ বা ধৈর্যের আলোচনা যেখানে ব্যক্তিগত দৃঢ়তার কথা বলে, অন্য স্থানে সেই একই ‘সবর’ (মাসানী হিসেবে ফিরে এসে) সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রেক্ষাপটে আলোচিত হয়।
- এক স্থানে ‘সালাত’ যেখানে রবের সাথে সংযোগের কথা বলে, অন্য স্থানে তা অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপিত হয় (২৯:৪৫)।
পরিশেষে, ১৫:৮৭ আয়াতে বর্ণিত ‘সাব‘আন মিনাল-মাসানী’ হলো আল কুরআনের সেই সাতটি স্বর্ণসূত্র যা পুরো কিতাবের বিশাল ভাণ্ডারকে একটি সুসংহত রূপ দান করেছে। এটি কেবল সংখ্যা নয়, বরং এটি রবের এক বিশেষ ‘শিক্ষা পদ্ধতি’, যা মানুষকে বারবার সত্যের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনে। যে ব্যক্তি এই সাতটি মৌলিক স্তম্ভের পুনরাবৃত্ত সৌন্দর্য অনুধাবন করতে পারে, তার কাছে ‘মহান কুরআন’ এক জীবন্ত ও মহাজাগতিক পথপ্রদর্শক হিসেবে ধরা দেয়।
মহাজাগতিক ও ঐশী বিন্যাসে ‘সাত’ এর আধ্যাত্মিক সংহতি: আল কুরআনের আয়নার একটি বিশ্লেষণ:
আল কুরআন মাজীদের অভ্যন্তরীণ গঠনশৈলী লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ‘সাত’ (Sab’a) সংখ্যাটি কেবল একটি গাণিতিক সংখ্যা নয়, বরং এটি রবের সৃষ্টিজগত এবং তাঁর নাযিলকৃত বিধানের এক সুগভীর ও সামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামোর প্রতিফলন। ১৫:৮৭ আয়াতে বর্ণিত ‘সাব‘আন মিনাল-মাসানী’ (সাতটি পুনরাবৃত্ত বিষয়) এর প্রকৃত রহস্য অনুধাবনের জন্য আল কুরআনের অন্যান্য আয়াতে ‘সাত’ সংখ্যার ব্যবহার এবং সেগুলোর আধ্যাত্মিক ও যৌক্তিক পারম্পর্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
নিচে আল কুরআনের আয়াতের আলোকে ‘সাত’ সংখ্যার প্রামাণিক সমন্বয় ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।
আল কুরআন মাজীদ এমন এক কিতাব যার পরতে পরতে রবের প্রজ্ঞা ছড়িয়ে আছে। ১৫:৮৭ আয়াতে যে ‘সাতটি পুনরাবৃত্ত বিষয়’-এর কথা বলা হয়েছে, তার সাথে সৃষ্টিজগতের অন্যান্য ‘সাত’ এর একটি সুনিপুণ ও পারস্পরিক সংযোগ (Reciprocal connection) রয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন আকাশ, পৃথিবী, সময় এবং সুরক্ষার প্রতিটি স্তরে এই ‘সাত’ সংখ্যাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।
মহাজাগতিক স্থাপত্যে ‘সাত’ (The Cosmic Architecture):
আল কুরআন মাজীদের বহু স্থানে সাত আসমানের উল্লেখ রয়েছে, যা মহাবিশ্বের একটি স্তরভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল বিন্যাসকে নির্দেশ করে।
➥ তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন এবং তাকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করলেন।” (২:২৯)
➥ আমি তোমাদের ওপর সৃষ্টি করেছি সাতটি সুদৃঢ় পথ (সাব‘আ তরাইক্ব) এবং আমি সৃষ্টিজগত সম্পর্কে উদাসীন নই।” (২৩:১৭)
এই আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয় যে, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতের সুরক্ষায় আল্লাহ রব্বুল আলামিন ‘সাত’ এর একটি কাঠামো ব্যবহার করেছেন। ১৫:৮৭ আয়াতে বর্ণিত ‘সাতটি মাসানী’ বা পুনরাবৃত্ত বিষয়গুলো হলো এই মহাজাগতিক সাত আসমানের আধ্যাত্মিক প্রতিফলন—যা মানুষের আত্মাকে ঊর্ধ্বজগতে আরোহণের পথ (Paths) দেখায়।
জ্ঞানের সীমাহীনতা ও ‘সাত সমুদ্র’ (Infinite Knowledge):
রবের বাণীর গভীরতা বোঝাতেও কুরআন ‘সাত’ সংখ্যাটিকে ব্যবহার করেছে, যা নির্দেশ করে যে ‘সাত’ দ্বারা এখানে এক ধরণের ‘পূর্ণতা’ বা ‘অসীমতা’ বোঝানো হয়েছে।
➥“আর পৃথিবীতে যত গাছ আছে তা যদি কলম হয় এবং সমুদ্রের সাথে আরও সাতটি সমুদ্র (সাব‘আতু আবহুর) যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও আল্লাহর বাণী শেষ হবে না।”(৩১:২৭)
এই আয়াতের সাথে ১৫:৮৭ আয়াতের ‘সাব‘আন মিনাল-মাসানী’ (সাতটি পুনরাবৃত্ত বিষয়)-কে যুক্ত করলে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তা হলো—এই সাতটি মূলনীতি বা বিষয় এমন এক গভীর জ্ঞানসমুদ্রের চাবিকাঠি, যা বারবার পুনরাবৃত্ত হওয়া সত্ত্বেও এর আবেদন এবং অর্থ কখনো ফুরিয়ে যায় না।
জীবন ও জীবিকার চক্রে ‘সাত’ (Biological and Provisionary Cycles):
সালামুন আলা ইউসুফ-এর ঘটনার মাধ্যমে আল কুরআন জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে ‘সাত’ এর একটি গাণিতিক ও বাস্তবধর্মী চিত্র তুলে ধরেছে।
“রাজা বলল: আমি স্বপ্নে দেখলাম সাতটি হৃষ্টপুষ্ট গাভী, যাদের খেয়ে ফেলছে সাতটি জীর্ণ গাভী; এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অন্যগুলো শুষ্ক।” (১২:৪৩)
“তিনি (ইউসুফ) বললেন: তোমরা সাত বছর (সাব‘আ সিনীন) একনাগাড়ে চাষাবাদ করবে...” (১২:৪৭)
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যে খাদ্যচক্র, সেখানেও ‘সাত’ একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। ঠিক একইভাবে, মানুষের আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ‘সাতটি পুনরাবৃত্ত বিষয়’ বা ‘সাব‘আন মিনাল-মাসানী’ হলো সেই আধ্যাত্মিক খাদ্য যা চিরকাল মানুষকে পথ দেখাবে।
পুরস্কার ও শাস্তির ভারসাম্যে ‘সাত’ (Reward and Warning):
কুরআন মাজীদে দান ও অনুগ্রহের উপমা এবং অবাধ্যদের পরিণতির বর্ণনায় বিপরীতমুখী চিত্র (Contrasting image) হিসেবেও ‘সাত’ এসেছে।
➥ যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা হলো একটি শস্যবীজ, যা থেকে সাতটি শীষ (সাব‘আ সানাবিল) উৎপন্ন হয় এবং প্রতিটি শীষে থাকে ১০০ দানা। (২:২৬১)
➥ নিশ্চয়ই জাহান্নাম তাদের সবার প্রতিশ্রুত স্থান। তার সাতটি দরজা (সাব‘আতু আবওয়াব) রয়েছে এবং প্রতিটি দরজার জন্য পৃথক পৃথক দল রয়েছে। (১৫:৪৪-৪৫)
এখানে একটি গুরত্বপূর্ণ ‘নজম’ বা বিন্যাস লক্ষ্য করুন: সূরা আল হিজর-এর ৪৪ নম্বর আয়াতে জাহান্নামের ‘সাতটি দরজা’র কথা বলা হয়েছে এবং একই সূরার ৮৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন ‘সাতটি পুনরাবৃত্ত বিষয়’ (সাব‘আন মিনাল-মাসানী) দান করার কথা বলেছেন। এটি একটি সুষ্পষ্ট আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত যে—রবের দেওয়া এই সাতটি মূলনীতি বা আয়াতসমূহ হলো সেই রক্ষাকবচ যা মানুষকে জাহান্নামের সাতটি দরজা থেকে রক্ষা করার সক্ষমতা রাখে। এটিই হলো আল কুরআনের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যতা।
সমাপ্তি ও যৌক্তিক সারসংক্ষেপ:
আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে ‘সাত’ এর এই বহুমুখী ব্যবহার—সাত আসমান (২:২৯), সাতটি পথ (২৩:১৭), সাতটি সমুদ্র (৩১:২৭), সাতটি শীষ (২:২৬১) এবং সাতটি বছর (১২:৪৭)—প্রমাণ করে যে, ‘সাত’ হলো একটি ঐশী কোড বা ভিত্তি।
এই প্রামাণিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে ১৫:৮৭ আয়াতের ‘সাব‘আন মিনাল-মাসানী’-কে যখন আমরা অনুধাবন করি, তখন এটি আর কেবল একটি সংখ্যা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে:
- আসমানের ন্যায় সুদৃঢ়: যা মুমিনের ঈমানকে সুরক্ষা দেয়।
- সমুদ্রের ন্যায় গভীর: যার জ্ঞান কখনো শেষ হয় না।
- শস্যবীজের ন্যায় বারকতময়: যা থেকে অসংখ্য নেক আমল উৎপন্ন হয়।
- জাহান্নামের দরজার বিপরীতে ঢাল: যা মানুষকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে।
সুতরাং, ‘সাব‘আন মিনাল-মাসানী’ হলো কুরআনের সেই সাতটি মৌলিক সত্যের বিন্যাস, যা মহাবিশ্বের সাত আসমানের মতোই ধ্রুব এবং যা বারবার ফিরে আসার (মাসানী) মাধ্যমে মানুষকে তার রবের দিকে প্রত্যাবর্তনের (লামুনকালিবুন) কথা মনে করিয়ে দেয়।
আল কুরআনের প্রাসঙ্গিক তাসবি-দোয়া:
“বলুন, কে এই সাত আসমান (রাব্বুস সামাওয়াতিস সাব‘ই) ও মহান আরশের রব?” (২৩:৮৬)
■ “পবিত্রতা সেই সত্তার, যাঁর হাতের মুঠোয় সার্বভৌমত্ব এবং তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।” (৬৭:১)
■“রব্বানা আতিনা ফিদ-দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান-নার।”
(হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন।) (২:২০১)
■ এই গভীর রহস্য ও জ্ঞান অনুধাবনের জন্য আমরা রবের শেখানো ভাষায় প্রার্থনা করি:
“সুবহানাকা লা ইলমা লানা ইল্লা মা আল্লামতানা, ইন্নাকা আনতাল আলীমুল হাকীম।”
(পবিত্রতা আপনারই! আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই।নিশ্চয়ই আপনি মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।) (২:৩২)
“রব্বি যিদনি ইলমা।” (হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।) (২০:১১৪)
“রব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা’দা ইয হাদায়তানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্হাব।”
(হে আমাদের রব! আমাদের হেদায়েত দান করার পর আমাদের অন্তরসমূহকে সত্যবিচ্যুত করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন; নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা।) (৩:৮)
আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের তাঁর কিতাবের এই পুনরাবৃত্ত সৌন্দর্য ও সাতটি মৌলিক স্তম্ভের প্রকৃত মর্ম অনুধাবন করার তাওফিক দান করুন।
