আয়াত ৬৮:১৮ তে উল্লেখিত ‘ওয়া লা ইয়াস্তাস্সনুন’ শব্দটির অর্থ ইনশা-আল্লাহ’ -না বলা কি না বা বূঝায় কি-না?-আয়াত অনুধ্যানে জানার চেষ্টায়

“ওয়া লা ইয়াস্তাস্সনুন” 

মর্মার্থ: তারা কোনো ব্যতিক্রম রাখেনি/ তারা আল্লাহর ইচ্ছার জন্য কোনো ‘ব্যতিক্রম’ বা ‘ফাঁক’ রাখেনি -সূরা আল ক্বালাম, আয়াত ৬৮:১৮ 

বাগানের মালিকরা যখন বলেছিল ‘অবশ্যই আমরা ফল আহরণ করবো’ (৬৮:১৭), তখন তারা আল্লাহর ইচ্ছার জন্য কোনো ‘ব্যতিক্রম’ বা ‘ফাঁক’ রাখেনি। একারণেই আল্লাহ বলেছেন— 

“ওয়া লা ইয়াস্তাস্সনুন” (তারা কোনো ব্যতিক্রম রাখেনি/ তারা আল্লাহর ইচ্ছার জন্য কোনো ‘ব্যতিক্রম’ বা ‘ফাঁক’ রাখেনি) -সূরা আল ক্বালাম, আয়াত ৬৮:১৮ 


ওয়া লা ইয়াস্তাস্সনুন: ওহীর অভিধানে ‘ব্যতিক্রম’ (ইনশা-আল্লাহ) না রাখার আধ্যাত্মিক ও ভাষাগত বিশ্লেষণ:

আল-কুরআন মাজীদের শব্দচয়ন অত্যন্ত নিখুঁত ও ব্যঞ্জনাধর্মী। সূরা আল-কালাম-এর ১৮ নম্বর আয়াতে বাগানের মালিকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে— “ওয়া লা ইয়াস্তাস্সনুন” (وَلَا  يَسْتَثْنُونَ)। প্রশ্নটি অত্যন্ত গভীর এবং তাত্ত্বিক।

ওহীর জ্ঞান অনুযায়ী,  ‘ওয়া লা ইয়াস্তাস্সনুন’ শব্দটির অর্থ ‘ইনশা-আল্লাহ’ না বলা কি না—তা আল-কুরআনের আয়াতের মাধ্যমেই (তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন) বিশ্লেষণ করা হলো।

‘ইস্তিসনা’ (Istithna) ও ‘ইনশা-আল্লাহ’-এর অভ্যন্তরীণ যোগসূত্র:

আরবী ভাষায় ‘ইস্তিসনা’ (استثناء) শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ব্যতিক্রম করা’ (To make an exception)। যখন কেউ বলে “আমি এটি আগামীকাল করবো”, তখন সেটি একটি নিরঙ্কুশ ঘোষণা। কিন্তু এর সাথে যখন বলা হয় “যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন (ইনশা-আল্লাহ)”, তখন সেই নিরঙ্কুশ ঘোষণার মধ্যে একটি ‘ব্যতিক্রম’ বা ‘শর্ত’ যুক্ত করা হয়। আল-কুরআন মাজীদ এই ‘ব্যতিক্রম’ করার পদ্ধতিটি অন্য আয়াতে স্পষ্ট করে দিয়েছে।

১. ওহীর সংজ্ঞা: 

ইনশা-আল্লাহ-ই হলো সেই ‘ব্যতিক্রম’ (১৮:২৩-২৪) আল্লাহ রব্বুল আলামিন সূরা আল-কাহফে নির্দেশ দিয়েছেন: “আর তুমি কোনো বিষয়ে বলো না— ‘আমি এটি আগামীকাল করবো’, আল্লাহ ইচ্ছা করলে (ইনশা-আল্লাহ) বলা ব্যতিরেকে।” (১৮:২৩-২৪)

যৌক্তিক বিশ্লেষণ: এখানে আল্লাহ ‘কাল কাজ করার’ দাবির সাথে ‘ইনশা-আল্লাহ’কে একটি শর্ত বা ব্যতিক্রম (Exception) হিসেবে জুড়ে দিয়েছেন। সুতরাং, ওহীর পরিভাষায় ভবিষ্যতের সংকল্পে আল্লাহর ইচ্ছাকে শামিল করাই হলো ‘ইস্তিসনা’ (ব্যতিক্রম করা)।

বাগানের মালিকরা যখন বলেছিল ‘অবশ্যই আমরা ফল আহরণ করবো’ (৬৮:১৭), তখন তারা আল্লাহর ইচ্ছার জন্য কোনো ‘ব্যতিক্রম’ বা ‘ফাঁক’ রাখেনি। একারণেই আল্লাহ বলেছেন— “ওয়া লা ইয়াস্তাস্সনুন” (তারা কোনো ব্যতিক্রম রাখেনি/ইনশা-আল্লাহ বলেনি)।

অহংকার বনাম ওহীর ব্যাকরণ (৬৮:১৭-১৮)

বাগানের মালিকদের ভুলটি কেবল শব্দগত ছিল না, বরং তা ছিল চেতনাগত। “যখন তারা কসম খেয়েছিল যে, প্রভাতেই তারা ফল আহরণ করবে এবং তারা কোনো ব্যতিক্রম রাখেনি (ওয়া লা ইয়াস্তাস্সনুন)।” (৬৮:১৭-১৮)

গভীরতর অনুধ্যান: এখানে ‘কসম খাওয়া’ (আক্বসামূ) শব্দটি নির্দেশ করে যে, তারা নিজেদের সক্ষমতার ওপর এতটাই অন্ধবিশ্বাসী ছিল যে, রব্বুল আলামিনের ইচ্ছাকে (মাশিয়াহ) তারা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনি। ওহীর নজম অনুযায়ী, ‘ইস্তিসনা’ বা ‘ইনশা-আল্লাহ’ বলা হলো নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে মেনে নেওয়া। তারা যেহেতু আল্লাহর ইচ্ছাকে তাদের পরিকল্পনায় ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে রাখেনি, তাই তারা ওহীর সীমা লঙ্ঘন করেছিল।

ক্রস-রেফারেন্স ও সমজাতীয় শব্দ (Linkage):

আল-কুরআনের অন্য এক স্থানে ‘ব্যতিক্রম’ (ইস্তিসনা)-এর গুরুত্ব এভাবে এসেছে:

“আল্লাহর রহমত থেকে তো কেবল পথভ্রষ্টরাই নিরাশ হয়।” (১৫:৫৬)। এখানে ‘ইল্লা’ (ব্যতীত/Except) শব্দটি যেমন একটি দলকে ব্যতিক্রম করে, তেমনি ‘ইনশা-আল্লাহ’ কথাটি মানুষের পরিকল্পনাকে আল্লাহর ফয়সালার সাপেক্ষে ‘ব্যতিক্রম’ করে দেয়। যারা ‘ইনশা-আল্লাহ’ বলে না, তারা মূলত নিজেদের আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে এবং ওহীর ‘মিজান’ (ভারসাম্য) নষ্ট করে।

বিপরীতমুখী চিত্র: যারা ‘ইনশা-আল্লাহ’ বলেছিলেন:

সালামুন আলা মূসা এবং সালামুন আলা ইসমাইল-এর উদাহরণে আমরা দেখি, তাঁরা বড় সংকল্পের সাথে সর্বদা ‘ইস্তিসনা’ বা ব্যতিক্রম যুক্ত করেছিলেন। “সে বলল— আল্লাহ ইচ্ছা করলে (ইনশা-আল্লাহ) আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।”

(৩৭:১০২, ১৮:৬৯)। তাঁরা তাঁদের সংকল্পের সাথে আল্লাহর ইচ্ছাকে যুক্ত করেছিলেন বলেই তাঁদের আমল সফল হয়েছিল। আর বাগানের মালিকরা ‘ব্যতিক্রম’ (ইনশা-আল্লাহ) রাখেনি বলেই তাদের ওপর ‘ত্বায়িফ’ বা মহাজাগতিক দুর্যোগ নেমে এসেছিল (৬৮:১৯)।

অনুধাবনে যৌক্তিক পূর্ণতা ও উপসংহার:

আল-কুরআনের সামগ্রিক বিশ্লেষণ থেকে এটি প্রমাণিত হয় যে: 

১. ওয়া লা ইয়াস্তাস্সনুন—বলতে সরাসরি আল্লাহর ইচ্ছাকে (ইনশা-আল্লাহ) পরিকল্পনায় শামিল না করাকেই বোঝানো হয়েছে। 

২. ওহীর পরিভাষায় ‘ইনশা-আল্লাহ’ হলো মানুষের কর্মপরিকল্পনার একটি ‘সেফটি ভালভ’ বা ব্যতিক্রম। 

৩. এটি না বলা মানে হলো নিজের নফস বা সামর্থ্যকে আল্লাহর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া, যার পরিণতি হলো বিনাশ।

সুতরাং, ওহীর এই সূক্ষ্ম ব্যাকরণ আমাদের শিখিয়েছে যে, মানুষের প্রতিটি ‘কসম’ বা ‘সংকল্প’ ততক্ষণ অপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ, যতক্ষণ না তার সাথে আল্লাহর ইচ্ছার (ইনশা-আল্লাহ) ‘ব্যতিক্রম’ বা সংযোগ রক্ষিত হয়।

আল্লাহর ইচ্ছা ও সার্বভৌমত্ব প্রকাশে আল-কুরআনের প্রাসঙ্গিক আয়াতসমূহ: আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের তাঁর ইচ্ছার অনুগামী রাখুন:

✧ আয়াত ১৮:২৩-২৪:

 وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَٰلِكَ غَدًا ۝ إِلَّا أَنيَشَاءَ اللَّهُ

(উচ্চারণ: ওয়া লা তাকূলাল লি-শাইয়িন ইন্নী ফা‘ইলুন যালিকা গাদান। ইল্লা আই-ইয়াশা-আল্লাহু)

— “আর তুমি কোনো বিষয়ে বলো না যে— ‘আমি এটি আগামীকাল করবো’, ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে’ (ইনশা-আল্লাহ) বলা ব্যতিরেকে।”

✧ আয়াত ৬৮:১৮: وَلَا يَسْتَثْنُونَ (ওয়া লা ইয়াস্তাস্সনুন) — “এবং তারা কোনো ব্যতিক্রম রাখেনি (ইনশা-আল্লাহ বলেনি)।”

✧ আয়াত ৮১:২৯:

 وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

(উচ্চারণ: ওয়া মা তাশা’ঊনা ইল্লা আই-ইয়াশা-আল্লাহু রব্বুল ‘আলামীন)

— “তোমরা ইচ্ছা করতে পারো না, যদি জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা না করেন।”

সুবহানা রব্বিকা রব্বিল ‘ইযযাতি ‘আম্মা ইয়াসিফুন। ওয়া সালামুন ‘আলাল মুরসালীন। ওয়াল হামদু লিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন। (৩৭:১৮০-১৮২)

সাদাকাল্লাহু ওয়া রাসূলুহ (৩৩:২২)

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post