বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।
➥ ইনশা-আল্লাহ! (ইন্ শা-য়াল্লা-হু!)
➥ ইন্ শা-য়াল্লা-হু আ-মিনীনা’
➥ আইঁ ইয়াশা-য়াল্লা-হু রব্বুল্ ‘আ-লামীন্
➥ বিইযনিল্লাহ! বিইযনি রব্বি!
▓▒দৈনন্দিন জীবনে এর প্রয়োগ-ব্যবহার▒▓
আল-কুরআন মাজীদ কেবল একটি তাত্ত্বিক ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং এটি মানুষের চিন্তা, সংকল্প এবং কর্মের প্রতিটি স্তরে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সার্বভৌমত্বকে গেঁথে দেওয়ার এক নিপুণ ব্যাকরণ। আমাদের প্রাত্যহিক কথাবার্তায় ‘ইনশা-আল্লাহ’ এবং ‘বিইযনিল্লাহ’ শব্দ দুটি কেবল আরবী পরিভাষা নয়, বরং এগুলো রব্বুল আলামিনের সাথে মুমিনের আধ্যাত্মিক ও যৌক্তিক সেতুবন্ধন।
আল-কুরআনের আয়াতসমূহের পারস্পরিক নজম (বিন্যাস) ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে শব্দ দুটির ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং গভীরতর অনুধ্যান আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টায়-বিঈযনিল্লাহ!
নিচের দিকে একটি ভিডিও সংযুক্ত:
ইনশা-আল্লাহ! (ইন্ শা-য়াল্লা-হু!) ও ‘ইন্ শা-য়াল্লা-হু আ-মিনীনা’ (إِن شَاءَ اللَّهُ آمِنِينَ) :
ভবিষ্যতের সংকল্প ও আল্লাহর ইচ্ছা ভবিষ্যতের যেকোনো পরিকল্পনা বা প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে ‘ইনশা-আল্লাহ’ বলা ওহীর একটি সরাসরি নির্দেশ। আল্লাহ রব্বুল আলামিন আল-কুরআন মাজীদে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই শিষ্টাচার শিখিয়েছেন:
“আর তুমি কখনো কোনো বিষয়ে বলো না যে—‘আমি এটি আগামীকাল করবো’, ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে’(ইনশা-আল্লাহ!) বলা ব্যতিরেকে।” (১৮:২৩-২৪)
কুরআনিক শিক্ষার বাস্তব ও ব্যবহারিক উদাহরণ:
১. সংকল্প ও বিনয়ের সমন্বয় (১৮:৬৯): সালামুন আলা মূসা যখন ওহীর জ্ঞান সন্ধানে এক মহাজ্ঞানীর (খিজির) অনুসরণ করতে চাইলেন, তখন তিনি তাঁর ধৈর্যের নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছিলেন: “আল্লাহ ইচ্ছা করলে (ইনশা-আল্লাহ!) আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।” (১৮:৬৯)।
এটি আমাদের শেখায় যে, নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস থাকলেও মুমিন তার ভবিষ্যৎ সংকল্পকে আল্লাহর ইচ্ছার (মাশিয়াহ) ওপর নির্ভরশীল রাখে।
২. সামাজিক ও পারিবারিক চুক্তিতে (২৮:২৭): সালামুন আলা শুয়াইব যখন তাঁর কন্যার বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁর উত্তম আচরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন: “আল্লাহ ইচ্ছা করলে (ইনশা-আল্লাহ) আপনি আমাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।” (২৮:২৭)।
৩. নিরাপদ গন্তব্যের ঘোষণা (১২:৯৯): সালামুন আলা ইউসুফ তাঁর পরিবারকে মিশরে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন: “তোমরা মিশরে প্রবেশ করো, আল্লাহ ইচ্ছা করলে (ইনশা-আল্লাহ) তোমরা সেখানে নিরাপদ থাকবে।” (১২:৯৯)।
অনুধ্যান: ‘ইনশা-আল্লাহ’ ব্যবহারের মূল সময় হলো ভবিষ্যতের কোনো কাজের ইচ্ছা প্রকাশ বা ওয়াদা করার মুহূর্ত। এটি মানুষের অহংকার চূর্ণ করে এবং সময়ের ওপর আল্লাহর একচ্ছত্র আধিপত্য স্বীকার করে নেয়।
‘ইন্ শা-য়াল্লা-হু আ-মিনীনা’-দৈনন্দিন জীবনে এর ব্যবহারিক ক্ষেত্র:
আল-কুরআনের নজম ও প্রায়োগিক উদাহরণ অনুযায়ী আমরা নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে এটি ব্যবহার করতে পারি:
‘ইন্ শা-য়াল্লা-হু আ-মিনীনা’: যোগ্যতার ঐশ্বরিক স্বীকৃতি
সাধারণত ‘ইনশা-আল্লাহ’ শব্দটি ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয় (১৮:২৩)। কিন্তু যখন এর সাথে ‘আ-মিনীনা’ (নিরাপদে/বিশ্বস্ত অবস্থায়) শব্দটি যুক্ত হয়, তখন এটি একটি বিশেষ অবস্থার নির্দেশ দেয়। আল্লাহ সু.তা. বলেন:
“অবশ্যই আল্লাহ তাঁর রসূলের স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছেন; আল্লাহ ইচ্ছা করলে (তোমরা যোগ্য বিবেচিত হলে) তোমরা অবশ্যই মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে (ইন্ শা-য়াল্লা-হু আ-মিনীনা)...।” (৪৮:২৭)
গভীর অনুধ্যান:
এই আয়াতে ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে’ কথাটি কোনো অনিশ্চয়তা নয়, বরং একটি ‘শর্তযুক্ত নিশ্চয়তা’। আল্লাহ মুমিনদের অন্তরের অবস্থা (sincerity) জানতেন (৪৮:১৮), তাই তিনি তাদের সেই পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের জন্য ‘যোগ্য’ মনে করেছেন। অর্থাৎ, এই শব্দটি তখন ব্যবহৃত হয় যখন আমরা কোনো বড় লক্ষ্য অর্জনে নিজেদের প্রস্তুত করি এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের সেই লক্ষ্যের জন্য ‘উপযুক্ত’ হিসেবে কবুল করেন।
প্রায়োগ:
১. নতুন কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে বা শহরে প্রবেশের সময়:
সালামুন আলা ইউসুফ যখন তাঁর পিতা-মাতাকে মিশরে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তখন তিনি ওহীর এই বিশেষ ভঙ্গিতেই বলেছিলেন:
“তোমরা মিশরে প্রবেশ করো, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমরা সেখানে নিরাপদ থাকবে (ইন্ শা-য়াল্লা-হু আ-মিনীনা)।” (১২:৯৯)
প্রয়োগ: যখন আমরা নতুন কোনো বাড়িতে উঠি, নতুন কোনো শহরে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেই বা কোনো দেশে ভ্রমণে যাই, তখন কেবল ‘ইনশা-আল্লাহ’ না বলে ‘ইন্ শা-য়াল্লা-হু আ-মিনীনা’ বলা উচিত। এর মাধ্যমে আমরা স্বীকার করি যে, আমাদের এই অবস্থান কেবল আল্লাহর ইচ্ছায় এবং তাঁর দেওয়া নিরাপত্তায় ‘সফল ও যোগ্য’ হবে।
২. কোনো বড় মিশন বা সংকট থেকে উত্তরণের সংকল্পে (৪৮:২৭):
যখন কোনো সমাজ বা ব্যক্তি দীর্ঘদিনের কোনো প্রতিকূলতা পার হয়ে একটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায়, তখন এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
প্রয়োগ: কোনো ব্যবসায়িক প্রজেক্ট শুরু করার সময় বা কোনো বড় অপারেশন বা সামাজিক সংস্কারের কাজে হাত দেওয়ার সময় আমরা বলতে পারি— “আমরা এই লক্ষ্যে পৌঁছাবো, ইন্ শা-য়াল্লা-হু আ-মিনীনা।” অর্থাৎ, আল্লাহ আমাদের যোগ্য মনে করলে আমরা সেখানে নিরাপদে ও সফলভাবে পৌঁছাবো।
৩. মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি অর্জনের কামনায়:
‘আমিনীন’ শব্দটি কেবল শারীরিক নিরাপত্তা নয়, বরং অন্তরের ভয়হীনতাকে (security from fear) প্রকাশ করে।
প্রয়োগ: যখন কেউ অস্থিরতায় ভোগে বা কোনো বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, তখন নিজেকে সান্ত্বনা দিতে বা অন্যকে সাহস দিতে এই শব্দটি প্রয়োগ করা যায়—
“সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে এবং আমরা শান্তিতে থাকবো, ইন্ শা-য়াল্লা-হু আ-মিনীনা।”
যৌক্তিক পূর্ণতা (ইন্ শা-য়াল্লা-হু আ-মিনীনা):
আল-কুরআনের এই সুগভীর দালিলিক পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে:
১. ইনশা-আল্লাহ: এটি আল্লাহর সার্বভৌম ইচ্ছার স্বীকৃতি।
২. আ-মিনীনা: এটি সেই বিশেষ অবস্থা যা কেবল আল্লাহর প্রতি অনুগত ও তাঁর কাছে ‘যোগ্য’ বিবেচিত বান্দাদের দেওয়া হয়।
ব্যবহারিক সংক্ষেপ:
আমরা যখন কোনো কাজের পরিকল্পনা করি যা আমাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুখ বা নিরাপত্তা বয়ে আনবে, তখন ‘ইন্ শা-য়াল্লা-হু আ-মিনীনা’ বলা ওহীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রায়োগিক ভাষা। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের অহংকার বিসর্জন দিয়ে রব্বুল আলামিনের ‘নিরাপত্তা বলয়’ (Sakinah) কামনা করি।
যৌক্তিক সামঞ্জস্য: আ-মিনীনা ‘নিরাপত্তা’র লিঙ্ক:
আল-কুরআনের একটি শক্তিশালী ক্রস-রেফারেন্স হলো সূরা আল-হিজর-এর ৪৬ নম্বর আয়াত, যেখানে জান্নাতীদের বলা হবে:
“তোমরা তাতে (জান্নাতে) প্রবেশ করো শান্তিতে ও নিরাপদে (আ-মিনীনা)।” (১৫:৪৬)
তাত্ত্বিক সংযোগ:
দুনিয়াতে যারা আল্লাহর ওহীর প্রতিটি কাজে নিজেদের ‘যোগ্য’ প্রমাণ করতে পেরেছে, পরকালেও তাদের জন্য ‘আ-মিনীনা’ শব্দটিই ব্যবহৃত হবে। সুতরাং, দৈনন্দিন জীবনে এই শব্দটি বলা মানে হলো—নিজের প্রতিটি ছোট কাজকে পরকালীন সেই ‘নিরাপদ প্রবেশের’ মহড়ার সাথে যুক্ত করা।
যারা ‘নিরাপদ’ (আমিনীন) হতে পারেনি (বিপরীতমুখী চিত্র):
আল-কুরআন আমাদের ‘সবাইয়ীন’ বা সাবার অধিবাসীদের চিত্র দেখায়, যারা আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করেনি। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তাদের নিরাপত্তা কেড়ে নিয়েছিলেন (৩৪:১৫-১৮)। তারা ‘ইনশা-আল্লাহ’ বা আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করেনি বলে তাদের যাত্রা ‘নিরাপদ’ (আমিনীন) হয়নি। এটি নির্দেশ করে যে, ওহীর সংযোগ ছাড়া কোনো নিরাপত্তাই স্থায়ী নয়।
আইঁ ইয়াশা-য়াল্লা-হু রব্বুল্ ‘আ-লামীন্ (৮১:২৮-২৯)
ইচ্ছার স্বাধীনতা বনাম ঐশ্বরিক অনুমোদন:
এই আয়াতটির প্রকৃত তাত্ত্বিক সৌন্দর্য বুঝতে হলে এর পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে এর সংযোগ (Link) অনুধাবন করা জরুরি:
১. আত্মশুদ্ধি ও সঠিক পথে ফেরার সংকল্পে:
২. কোনো জটিল জীবনধর্মী সিদ্ধান্তে:
৩. অহংকার বিমোচন ও বিনয় প্রকাশে:
মানুষের আত্মনির্ভরতার বিভ্রম (বিপরীতমুখী চিত্র):
"ইন-শা আল্লাহ" বলতে ভুলে গেলে:
বিইযনিল্লাহ (বিইযনি রব্বি):
‘ইনশা-আল্লাহ’ যেখানে সংকল্পের সাথে যুক্ত, ‘বিইযনিল্লাহ’ (আল্লাহর অনুমতিক্রমে) সেখানে কর্মের সক্ষমতা ও বাস্তবায়নের সাথে যুক্ত। ‘ইযন’ (اذن) শব্দের অর্থ হলো অনুমতি বা আইনি কর্তৃত্ব।
1. কর্মে প্রবৃত্ত হওয়ার পূর্বের সক্ষমতা (বিইযনিল্লাহ!):
সালামুন আলা ঈসা যখন অলৌকিক কাজগুলো করার ঘোষণা দিচ্ছিলেন- তখন তিনি প্রতিটি কাজের পূর্বেই ‘বিইযনিল্লাহ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন: “আমি মৃতকে জীবিত করবো আল্লাহর অনুমতিক্রমে (বিইযনিল্লাহ!)।” (৩:৪৯)।
অনুধাবন: এখানে সালামুন আলা ঈসা কাজগুলো করার আগে ঘোষণা দিচ্ছেন। এর আধ্যাত্মিক অর্থ হলো—মানুষের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই; বরং প্রতিটি কোষের নড়াচড়া ও প্রতিটি বৈজ্ঞানিক কারণের কার্যকারিতা আল্লাহর ‘ইযন’ বা অনুমতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং, প্রাত্যহিক জীবনে কোনো জটিল কাজ বা চিকিৎসার শুরুতে ‘বিইযনিল্লাহ’ বলা মানে হলো—সেই কাজের ‘কার্যকারিতা’ আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া।
2. সাফল্য ও শ্রেষ্ঠত্বের চাবিকাঠি (বিইযনিল্লাহ!):
মানুষ যখন কোনো প্রতিযোগিতায় বা ভালো কাজে অগ্রগামী হয়, তখন ওহী একে আল্লাহর অনুমতির ফল হিসেবে বর্ণনা করে: “এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর অনুমতিক্রমে (বিইযনিল্লাহ!) নেক কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২)।
3. সাফল্য ও বিজয়ের বর্ণনায় (বিইযনি রব্বিহি/ বিইযনি রব্বিহা):
ক্ষুদ্র কোনো দল যখন বৃহৎ দলের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে, তখন ওহী আমাদের শেখায় এটি আল্লাহর অনুমতির ফল। তালুত ও জালুতের লড়াইয়ের বর্ণনায় আল্লাহ বলেন:
কত ছোট দল বড় দলের ওপর জয়লাভ করেছে আল্লাহর অনুমতিক্রমে (বিইযনিল্লাহ!)। (২:২৪৯)।
আমরা যখন কোনো কাজে জয়ী হই, তখন ‘আমি পেরেছি’ না বলে বলা উচিত—এটি ‘বিইযনিল্লাহ’ বা আল্লাহর অনুমতিক্রমে সম্ভব হয়েছে।
4. উৎপাদন ও ফলপ্রসু হওয়ার ক্ষেত্রে: প্রকৃতিতে যা কিছু ঘটে, তার পেছনেও আল্লাহর অনুমতি সক্রিয়। আল্লাহ বলেন: “পবিত্র ভূমির ফসল তার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে (বিইযনি রব্বিহি) উৎপন্ন হয়।” (৭:৫৮)। এমনকি ওহীর উপমা দিয়ে আল্লাহ বলেন, একটি উত্তম কালেমা বা বৃক্ষ তার ফল দান করে— “তার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে (বিইযনি রব্বিহা)।” (১৪:২৫)।
5. বিপদ থেকে সুরক্ষায় (বিইযনিল্লাহ!): ক্ষতিকর কোনো শক্তি মানুষের অনিষ্ট করতে পারে না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আল্লাহ বলেন-
“তারা আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে (বিইযনিল্লাহ!) তা দ্বারা কারো অনিষ্ট করতে পারে না। (২:১০২)।
6. আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে (বিইযনিল্লাহ!):
মানুষ যখন কোনো ভালো কাজে অগ্রগামী হতে চায়, তখন সেই সফলতার চাবিকাঠি হিসেবে ‘বিইযনিল্লাহ’ ব্যবহৃত হয়:
“অতঃপর তাদের মধ্যে কেউ নিজের প্রতি অবিচারকারী, কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী এবং কেউ আল্লাহর অনুমতিক্রমে (বিইযনিল্লাহ!) নেক কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২)
এখানে ‘অগ্রগামী হওয়া’ একটি চলমান প্রক্রিয়া। ওহীর এই ‘লিঙ্ক’ আমাদের শেখায় যে, সৎকাজে টিকে থাকা এবং তাতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা কেবল ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়, বরং তা প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর অনুমতির (বিইযনিল্লাহ!) ওপর নির্ভরশীল।
7. অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা (বিইযনিল্লাহ!): কোনো কারণ বা শত্রু মানুষের অনিষ্ট করতে পারে না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আল্লাহ বলেন: “আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে (বিইযনিল্লাহ!) কোনো বিপদই আপতিত হয় না।” (৬৪:১১)।
অনুধ্যান: ‘বিইযনিল্লাহ’ ব্যবহারের ক্ষেত্র হলো—যেকোনো কঠিন কাজে প্রবৃত্ত হওয়ার প্রাক্কালে, রোগমুক্তির শুরুতে বা কোনো অসাধ্য সাধনের আত্মবিশ্বাস অর্জনে। এটি মূলত কার্যকারণের প্রকৃত মালিকের প্রতি আত্মসমর্পণ।
যৌক্তিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতা: মাশিয়াহ ও ইযন-এর সংযোগ ওহীর গভীরে ডুব দিলে আমরা এই দুই শব্দের একটি চূড়ান্ত ‘যৌক্তিক কাঠামো’ খুঁজে পাই:
✦ মাশিয়াহ (ইনশা-আল্লাহ) = ঘটনার অস্তিত্ব (Existence of the Event): কোনো কিছু ঘটা বা না ঘটা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। এটি সময়ের (Time) ওপর আল্লাহর নিয়ন্ত্রণকে প্রকাশ করে।
✦ ইযন (বিইযনিল্লাহ) = কর্মের সক্ষমতা ও বৈধতা (Power & Authorization): ঘটনা ঘটার সিদ্ধান্ত হলেও তা সম্পন্ন করার জন্য যে ‘শক্তি’ বা ‘আইনি অনুমতি’ প্রয়োজন, তা-ই হলো ইযন। এটি সক্ষমতার (Capacity) ওপর আল্লাহর নিয়ন্ত্রণকে প্রকাশ করে।
পার্থক্য ও ব্যবহারিক ‘লিঙ্ক’:
- আপনি যখন কাউকে বলেন, “কাল দেখা হবে, ইনশা-আল্লাহ!”—তখন আপনি কালকের ‘সময়টি’ আল্লাহর হাতে সঁপে দেন।
- কিন্তু যখন আপনি কোনো জটিল অপারেশন বা কঠিন পরীক্ষায় অংশ নেন, তখন বলবেন— “আমি সফল হবো, বিইযনিল্লাহ!”—তখন আপনি সেই কাজ করার ‘সক্ষমতা’ আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নেন।
বিপরীতমুখী চিত্র: বিচ্ছিন্নতার অন্ধকার:
আল-কুরআন মাজীদ একটি বাগানের মালিকদের উদাহরণ দিয়ে ‘ইনশা-আল্লাহ’ না বলার পরিনাম বর্ণনা করেছে: “যখন তারা কসম খেয়েছিল যে, প্রভাতেই তারা ফল আহরণ করবে এবং তারা ‘ইনশা-আল্লাহ!’ বলেনি (ওয়া লা ইয়াস্তাস্সনুন)।” (৬৮:১৭-১৮)। এর ফলে তাদের ওপর এক মহাজাগতিক দুর্যোগ নেমে আসে। এটি ওহীর এক সূক্ষ্ম সংকেত যে, আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতি থেকে বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা কেবল ব্যর্থতাই বয়ে আনে।
বিপরীতমুখী চিত্র: ‘ইযন’ বিহীন প্রচেষ্টার অসারতা:
আল-কুরআন মাজীদ আমাদের দেখায় যে, আল্লাহর অনুমতি (ইযন) ছাড়া কোনো জাগতিক কারণই কাজ করে না। যাদু বা ক্ষতিকারক বিদ্যার প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
“তারা তা দ্বারা কারো কোনো অনিষ্ট করতে পারতো না আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে (বিইযনিল্লাহ)।” (২:১০২)
আধ্যাত্মিক সারমর্ম:
শত্রু আপনার ক্ষতি করতে চাইলেও পারবে না যদি ‘বিইযনিল্লাহ’ বা আল্লাহর অনুমতি না থাকে। আবার ঔষধ আপনাকে সুস্থ করতে পারবে না যদি সেখানে আল্লাহর অনুমতি (ইযন) না থাকে। সুতরাং, দৈনন্দিন জীবনে যে কোনো ঔষধ সেবনের আগে বা কোনো পরীক্ষার আগে ‘বিইযনিল্লাহ’ বলা মানে হলো—বস্তুর অভ্যন্তরীণ গুণাগুণকে সক্রিয় করার জন্য স্রষ্টার অনুমতি প্রার্থনা করা।
যৌক্তিক পূর্ণতা ও উপসংহার: আল-কুরআনের সামগ্রিক নজম বিশ্লেষণ করলে এটি প্রতীয়মান হয় যে:
১. ইনশা-আল্লাহ!: এটি ব্যবহারের সময় হলো—ভবিষ্যতের যেকোনো ওয়াদা বা পরিকল্পনার শুরুতে (১৮:২৩)।
২. বিইযনিল্লাহ!: এটি ব্যবহারের ক্ষেত্র হলো—সফলতা কামনা, আরোগ্য লাভ বা কোনো সক্ষমতা প্রকাশের মুহূর্তে (৩:৪৯)।
এই দুটি শব্দের মাধ্যমে ওহীর সংযোগ আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায় একটি জীবন্ত ইবাদতে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে মানুষের অহংকার (তাকাব্বুর) সমূলে বিনাশ হয় এবং সে একজন প্রকৃত ‘মুসলিম’ (আত্মসমর্পণকারী) হিসেবে গড়ে ওঠে।
আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতি কামনায় আল-কুরআনের প্রাসঙ্গিক দুআ-তাসবিহ-যিকির:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের তাঁর নূরের ছায়াতলে রাখুন:
وَ مَا تَشَاءُوْنَ اِلَّا اَنْ یَّشَاءَ اللّٰهُ رَبُّ الْعٰلَمِیْنَ
(উচ্চারণ: ওয়া মা তাশা’ঊনা ইল্লা আই-ইয়াশা-আল্লাহু রব্বুল আলামীন)। — "তোমরা ইচ্ছা করতে পারো না, যদি জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা না করেন।" ৮১:২৯:
لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِن شَاءَ اللَّهُ آمِنِينَ
(লা-তাদখুলুন্নাল মাসজিদাল হারামা ইনশা-আল্লাহু আমিনীনা)। — "আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমরা অবশ্যই মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে।" ৪৮:২৭:
رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَارَشَدًا
(রব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রাহমাতান ওয়া হায়্যি’ লানা মিন আমরিনা রাশাদা)। — "হে আমাদের রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন এবং আমাদের কাজগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করার ব্যবস্থা (রশদা) করে দিন। ১৮:১০
فَهَزَمُوهُم بِإِذْنِ اللَّهِ
(ফাহাযামূহুম বিইযনিল্লাহ)। —"অতঃপর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তারা তাদের পরাজিত করলো। ২:২৫১:
সাদাকাল্লাহু ওয়া রাসূলুহ (৩৩:২২)
সুবহানা রব্বিকা রব্বিল ‘ইযযাতি ‘আম্মা ইয়াসিফুন। ওয়া সালামুন ‘আলাল মুরসালীন। ওয়াল হামদু লিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন। (৩৭:১৮০-১৮২)
Video
এই চ্যানেলে প্রকাশিত অডিও ও ভিডিওসমূহ মূলত ইউটিউব কিংবা অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহকৃত বা ধার করা উপকরণ। এগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই কন্টেন্টের মাধ্যমে আপনাদের মাঝে শেয়ার করা হচ্ছে।
