বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।
সম্মানিত পাঠক! আল-কুরআন মাজীদ এমন এক ‘ফুরকান’ (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী), যা মানবজাতির ইবাদতের প্রতিটি সীমারেখা অকাট্যভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন: “আমি এই কিতাবে কোনো কিছুই বাদ রাখিনি।” (৬:৩৮)। অথচ আজ একদল লোক ওহীর অকাট্য দালিলিক প্রমাণ (বুরহান) ছাড়াই নানাবিধ ‘লাহওয়াল হাদীস’ বা অসার গল্পের ওপর ভিত্তি করে এমন সব দিন বা সময়ে সাওম পালনের প্রচার করছে, যা আল-কুরআনের কোথাও উল্লেখ নেই।
এবংবর্তমান সমাজে এক নিদারুণ ভ্রান্তি লক্ষ্য করা যায়। মানুষ ওহীর অকাট্য দলিল (বুরহান) ছাড়াই ইবাদতের নামে এমন সব প্রথা বা সাওম (যেমন আশুরা, আরাফা বা শাওয়ালের ছয় রোজা) পালন করছে, যা আল-কুরআন মাজীদের কোথাও অনুমোদিত নয়। তারা মনে করছে তারা ‘ভালো কাজ’ করছে, কিন্তু ওহীর দলিলবিহীন এই আমলগুলো মূলত আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করার শামিল।
একমাত্র আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের অনুসরনে একজন মুসলিম-মুমিনের জন্য ইবাদতের একমাত্র উৎস হলো ওহী (নাযিলকৃত একমাত্র আল্লাহর কিতাব-৬:১১৪-১১৫, ১৫:৯, ৫:৪৮)। ওহীর জ্ঞান অনুযায়ী সাওম কেবল রমাদান মাসেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আরও কিছু সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে আল্লাহ সাওমের বিধান দিয়েছেন। নিচে ওহীর প্রমাণের ভিত্তিতে আল-কুরআনে বর্ণিত সাওমের সকল প্রকারভেদ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
নিচের দিকে ১টি ভিডিও দ্র:
আল-কুরআনে বর্ণিত সিয়ামের পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান:
ওহীর কিতাব অনুযায়ী, একজন মুমিনের জন্য কেবল এই সিয়ামগুলোই স্বীকৃত, যার অকাট্য ‘বুরহান’ বা প্রমাণ আল-কুরআন মাজীদে আছে:
১. রমাদান মাসের ফরজ সিয়াম: প্রত্যেক সুস্থ মুমিনের ওপর বাধ্যতামূলক (২:১৮৩-১৮৫)।
২. হজ্জের বিকল্প সিয়াম: কুরবানিতে অক্ষম হলে হজ্জের সময় ৩টি এবং বাড়িতে ফেরার পর ৭টি—মোট ১০টি সিয়াম (২:১৯৬)।
৩. শপথ ভঙ্গের কাফফারা: শপথ ভঙ্গকারী যদি খাদ্য বা বস্ত্র দানে অক্ষম হয়, তবে ৩টি সিয়াম (৫:৮৯)।
৪. ভুলবশত হত্যার কাফফারা: রক্তপণ ও দাস মুক্তিতে অক্ষম হলে আল্লাহর কাছে তওবা হিসেবে টানা ২ মাস সিয়াম (৪:৯২)।
৫. যিহার-এর কাফফারা: স্ত্রীর সাথে অসংলগ্ন তুলনা করার পর তওবা হিসেবে টানা ২ মাস সিয়াম (৫৮:৪)।
৬. ইহরাম অবস্থায় শিকারের দণ্ড: পবিত্র অবস্থায় প্রাণী হত্যার বিনিময় হিসেবে ওহী-নির্ধারিত সমপরিমাণ সিয়াম (৫:৯৫)।
৭. মৌনব্রত বা বিশেষ সাওম: মারইয়াম (সালামুন আলাইহা) ও সালামুন আলা জাকারিয়া-এর সেই বিশেষ বিরত থাকা (১৯:১০, ১৯:২৬)।
আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের অনুসরনে এর বাইরে আরও কোনো ধরনের রোজা/সিয়াম?
তোমরা তাঁর পরিবর্তে কিছু নামের ছাড়া ইবাদত করো না, যাদের নামকরণ তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা করেছ। আল্লাহ সে সম্পর্কে কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। নিশ্চয় বিধান কেবল আল্লাহর । তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা শুধুমাত্র তাঁকে ছাড়া ইবাদত করবে না। সেটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।-12:40
যারা ওহীর কিতাব ছেড়ে ‘লাহওয়াল হাদীস’ (অসার কথাবার্তা/গল্প) বা মানুষের রচিত কিতাব অনুসরণ করে অতিরিক্ত ইবাদত আবিষ্কার করে, তারা মূলত ওহীর পূর্ণাঙ্গতাকে অস্বীকার করে। ওহীর সংযোগ আমাদের শেখায় যে, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেননি তা ইবাদতের নামে পালন করা ‘আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ’ করার শামিল।
নিচে আল-কুরআনের আয়াতের আলোকে দলিলবিহীন ইবাদতের অসারতা এবং এর ভয়াবহ শাস্তির দালিলিক প্রমাণ তাদাব্বুল করার চেষ্টা করছি-বিইযনিল্লাহ!
ইবাদতের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কার?
ইবাদতের কোনো নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা আল্লাহ রব্বুল আলামিন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। আল্লাহ সু.তা. প্রশ্ন করেন:
➥ তাদের কি এমন কোনো অংশীদার (শরীক) আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান (শরিয়ত) দিয়েছে যার অনুমতি (ইযন) আল্লাহ দেননি? ফয়সালার ঘোষণা না থাকলে তাদের মধ্যে তো বিচার হয়ে যেত। নিশ্চয়ই জালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। -আয়াত ৪২:২১)
➥ এবং তিনি তাঁর কতৃর্ত্বের মধ্যে কাউকে অংশীদারিত্ব দেন না-আয়াত 18:26
গভীর অনুধাবন: ওহীর এই ‘লিঙ্ক’ বা সংযোগ আমাদের শেখায় যে, ইবাদতের নামে যা করা হচ্ছে তার জন্য যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ‘ইযন’ বা ওহীর অনুমতি না থাকে, তবে তা আল্লাহর সার্বভৌমত্বে অংশীদারিত্ব বা শিরকের পর্যায়ে পড়ে। এর পরিণাম হলো দুনিয়া ও পরকালে আল্লাহর লানত ও শাস্তি।
বুরহান বা প্রমাণবিহীন আমলের অসারতা:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষের দাবিকৃত প্রতিটি ইবাদতের বিপরীতে অকাট্য প্রমাণ বা ‘বুরহান’ তলব করেছেন:
বলো! তোমরা তোমাদের প্রমাণ (বুরহান) পেশ করো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (২:১১১, ২৭:৬৪)
ইবাদতের নামে যেসব দিনকে (আশুরা, আরাফা ইত্যাদি) বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ করে সাওম পালন করা হচ্ছে, সেগুলোর সপক্ষে ওহীর কোনো ‘বুরহান’ নেই। যারা ওহীর কিতাব ছেড়ে ‘লাহওয়াল হাদীস’ (অসার কথাবার্তা) বা মানুষের রচিত কিতাব অনুসরণ করে অতিরিক্ত ইবাদত আবিষ্কার করে, তারা মূলত ওহীর পূর্ণাঙ্গতাকে অস্বীকার করে।
আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ ও পরিনাম:
আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোনো কিছুকে ইবাদত বা সাওম হিসেবে সাব্যস্ত করাকে ওহী ‘মিথ্যা উদ্ভাবন’ বা ‘ইফতিরা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে:
বলো! আল্লাহ কি তোমাদের অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করছ? (১০:৫৯)
আরও কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে:
“তোমাদের জিহ্বা থেকে উদ্ভাবিত মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে বলো না— এটি হালাল আর ওটি হারাম; যাতে তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করতে পারো। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে, তারা সফলকাম হবে না।” (১৬:১১৬)
যারা মনে করে আল-কুরআনের বাইরের উৎস থেকে ইবাদত গ্রহণ করে তারা সফল হবে, ১৬:১১৬ আয়াত তাদের সেই আশাকে সমূলে বিনাশ করে দিয়েছে। সফলতার পরিবর্তে তাদের জন্য রয়েছে ‘অল্প ভোগ ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (১৬:১১৭)।
নিস্ফল প্রচেষ্টার খতিয়ান:
দলিলবিহীন ইবাদতকারীরা সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তিতে থাকে যে, তারা ভালো কাজ করছে। কিন্তু ওহীর মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের রায় হলো:
বলো! আমি কি তোমাদের ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারীদের সংবাদ দেবো? তারা সেই সব লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনে নিস্ফল হয়েছে, অথচ তারা মনে করছে যে তারা ভালো কাজই করছে। (১৮:১০৩-১০৪)
কারণ কী? কারণ তারা আল্লাহর ‘আয়াতসমূহ’ বা ওহীর অকাট্য দালিলিক প্রমাণ উপেক্ষা করেছে। ফলে: “তাদের আমলসমূহ নিস্ফল হয়ে গেছে। কিয়ামতের দিন আমি তাদের আমলের কোনো ওজন (মিজান) দেবো না।” (১৮:১০৫)
➥ আল্লাহর নাযিলকৃত অহীর সঙ্গে অন্য কিছুকে দ্বীনের উৎস হিসেবে যুক্ত করলে (শিরক করলে) সব আমল নষ্ট হয়ে যায়-বরবাদ হয়ে যায়!
দ্র: আয়াত ৩৯:৬৫, ৬:৮৮, ৩:১৫১, ৪:৪৮
➥ সিয়ামের ‘নির্দিষ্টতা’ বনাম যিকরের ‘অধিকতর’ ব্যাপ্তি:
পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, আল্লাহ সিয়ামের ক্ষেত্রে ‘আইয়ামাম মা’দুদাত’ (নির্দিষ্ট অল্প কয়েক দিন—২:১৮৪) শব্দ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ওহীর অনুশীলনী বা যিকরের ক্ষেত্রে তিনি ‘কাসিরান’ (অধিকতর) শব্দ ব্যবহার করেছেন।
গভীর অনুধাবন: ওহীর এই ‘মিজান’ বা ভারসাম্য নির্দেশ করে যে—অধিক সিয়াম পালন করার চেয়ে ওহীর নূরে নিজেকে অধিক সিক্ত রাখা এবং কুরআন স্টাডি করা আল্লাহর নিকট অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ওহীর জ্ঞান ছাড়া আমল হলো প্রাণহীন দেহের মতো। যারা ওহীর চর্চা বাদ দিয়ে কেবল প্রথাগত আমল (যেমন মনগড়া সিয়াম) বাড়াতে চায়, তারা মূলত ১৮:১০৪-১০৫ আয়াতের সেই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
দ্র: আয়াতসমূহ: ২:১২১, ৭৩:৪-৭, ৭৩:২০, ৩৩:৩৫, ৩৩:৪১, ৬২:১০, ৮:৪৫
এসব আল্লাহর আয়াত, যা আমরা আপনার কাছে সত্যসহ পাঠ করছি। অতএব আল্লাহ ও তাঁর আয়াতসমূহের পরে তারা আর কোন হাদিসে (বাণীতে) ঈমান আনবে? -সূরা আল-জাসিয়া ৪৫:৬ (77:50, 7:185)
সাওম ও হেদায়েত কামনায় আল-কুরআনের প্রাসঙ্গিক দুআসমূহ:
■ রব্বানা লা তুআখিযনা ইন নাসিনা আও আখতা’না।
হে আমাদের রব! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদের পাকড়াও করবেন না। ২:২৮৬:
■ রব্বানা লা তুজিগ কুলুবানা বা‘দা ইজ হাদায়তানা।
হে আমাদের রব! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে বিচ্যুত করবেন না। ৩:৮
■ সুবহানা রব্বিকা রব্বিল ‘ইযযাতি ‘আম্মা ইয়াসিফুন। ওয়া সালামুন ‘আলাল মুরসালীন। ওয়াল হামদু লিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন। (৩৭:১৮০-১৮২)
এই চ্যানেলে প্রকাশিত অডিও ও ভিডিওসমূহ মূলত ইউটিউব কিংবা অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহকৃত বা ধার করা উপকরণ। এগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই কন্টেন্টের মাধ্যমে আপনাদের মাঝে শেয়ার করা হচ্ছে।
