দলিল ও প্রমাণবিহীন ইবাদত কেন নিস্ফল-বাতিল? -আল-কুরআনের কঠোর সতর্কবার্তা | #Ibadat #without evidence and proof

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। 

দলিল ও প্রমাণবিহীন ইবাদতের ধারণা: আল-কুরআনের আলোকে এর গ্রহণযোগ্যতা, সীমাবদ্ধতা ও পরিণতি:

নিচে এমন কিছু আমলের তালিকা দেওয়া হলো, যেগুলো নাযিলকৃত অহীর (আল কুরআনের) সরাসরি নির্দেশ বা কুরআনভিত্তিক দলিলের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে  এসব আমল মূলত কথিত হাদিস, কথিত সুন্নাহ, ইসলামি ঐতিহ্য এবং ঐতিহাসিক বর্ণনার ভিত্তিতে প্রচলিত ও পালিত হয়ে আসছে। যেমন-

• শাওয়ালের ছয় রোজা (৬ সিয়াম) •আশুরার রোজা •আশুরা উপলক্ষে বিশেষ আমল •আরাফার  দিনের নফল রোজা (হজে না থাকা ব্যক্তির জন্য) •সোমবার  ও বৃহস্পতিবারের নফল রোজা  •আইয়ামে বীয (প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজা) •তারাবিহ নামাজের নির্দিষ্ট রাকাত (৮ বা ২০) •লাইলাতুল কদরের ২৭তম রাতকে নির্দিষ্ট করে পালন • মিলাদুন্নবী পালন •শবে বরাতের বিশেষ ইবাদত ও অনুষ্ঠান •আযানের নির্দিষ্ট শব্দাবলী •ইকামতের নির্দিষ্ট শব্দাবলী •নামাজের তাশাহহুদ, দরূদে ইবরাহিম ও সালাম ফেরানোর নির্দিষ্ট পদ্ধতি •বিতির নামাজের নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও কুনুত দোয়া • তাহাজ্জুদ নামাজের নির্দিষ্ট রাকাতসংখ্যা • চাশতের (দুহা) নামাজ •আওয়াবিন নামাজ • সালাতুত তাসবীহ •জানাজার নামাজের অনাযিলকৃত নির্দিষ্ট  দুআ ওপদ্ধতি •আকীকা •খৎনা (সুন্নত) •মিসওয়াককে বিশেষ সুন্নত হিসেবে নিয়মিত পালন •দাড়ির নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য সম্পর্কিত বিধান •উরস •কুলখানি •চল্লিশা •ফাতেহা/খতমে কুরআনের প্রচলিত অনুষ্ঠান •গিয়ারভী শরীফ •ঈসালে সওয়াবের কিছু প্রচলিত পদ্ধতি•কবর জিয়ারতের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন আঞ্চলিক রীতি ইত্যাদি।

এসব মনগড়া, প্রমাণহীন আমল মূলত  "লাহওয়াল হাদিস (৩১:৬-৭), কথিত সুন্নাহ,  ইসলামি ঐতিহ্য এবং ঐতিহাসিক বর্ণনার ভিত্তিতে প্রচলিত ও পালিত হয়ে আসছে।

আমরা জানার চেষ্টা করব—ইবাদতের নামে প্রচলিত এসব আমলের বিধান আল্লাহর নাযিলকৃত অহীর একমাত্র সর্বশেষ উৎস আল-কুরআনের আলোকে সত্যিই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুমোদিত ও দলিলভিত্তিক কি না, দ্বীনের সঙ্গে এগুলোর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, এবং ইবাদতের নামে এগুলো পালন করা বৈধ কি না।

নিচের দিকে ১টি ভিডিও রয়েছে-

সম্মানিত পাঠক! আল-কুরআন মাজীদ মানুষের ইবাদত ও আনুগত্যের জন্য এক অকাট্য মানদণ্ড। আল্লাহ রব্বুল আলামিন এই কিতাবকে ‘ফুরকান’ (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) হিসেবে নাযিল করেছেন। ইবাদত কেবল তা-ই, যা আল্লাহ সু.তা. ওহীর মাধ্যমে নির্দেশ করেছেন। কিন্তু বর্তমান সমাজে এক বিশাল অংশ ‘বাপ-দাদা’ বা পূর্বপুরুষদের প্রথার দোহাই দিয়ে এমন সব ইবাদত ও আমল চালু করেছে, যার কোনো নাযিলকৃত দলিল (সুলতান/বুরহান) নেই। ওহীর দৃষ্টিতে এজাতীয় আমল কেবল অসারই নয়, বরং তা কঠিন শাস্তির কারণ।

নিচে আল-কুরআনের অকাট্য আয়াতের আলোকে দলিলবিহীন ইবাদতের অসারতা এবং এর ভয়াবহ পরিণাম  অনুধাবনে শেয়ার করছি-বিঈযনিল্লাহ!

*•̩̩͙✩•̩̩͙*˚⁺‧͙⁺˚*•̩̩͙✩•̩̩͙*

ইবাদতের অপরিহার্য শর্ত: নাযিলকৃত অহীর প্রমাণিক দলিল (বুরহান ও সুলতান) থাকতে হবে: 

আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষের দাবিকৃত প্রতিটি ইবাদত বা বিশ্বাসের সপক্ষে ‘বুরহান’ (অকাট্য প্রমাণ) বা ‘সুলতান’ (কর্তৃত্বপূর্ণ দলিল) তলব করেছেন। তিনি ঘোষণা করেন:

বলো! তোমরা তোমাদের প্রমাণ (বুরহান) পেশ করো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” (২:১১১, ২৭:৬৪)

■ আয়াত ২২:৭১-৭২

আর তারা আল্লাহর পরিবর্তে এমনকিছুর ইবাদত করে, যে ব্যাপারে তিনি কোনো প্রমাণ (সুলতান) অবতীর্ণ করেননি এবং সেটার, যে ব্যাপারে তাদের কোনো জ্ঞানও নেই। আর জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই (২২:৭১)।

আর যখন ওদের সামনে আমাদের সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, যারা কুফর করে তুমি ওদের চেহারার মধ্যে অসন্তোষ দেখতে পাবে। যারা ওদের সামনে আমাদের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে ওরা তাদের উপর আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। বলো, তাহলে আমি কি তোমাদেরকে ওসবের চেয়েও নিকৃষ্ট কিছু জানাব? আগুন, যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন যারা কুফর করে। আর তা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল!-২২:৭২

বিশ্লেষণ: 

এখানে ‘বুরহান’ (بُرْهَان) শব্দটি এমন এক দলিলকে নির্দেশ করে যা স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং যার বিপরীতে কোনো যুক্তি টেকে না। ওহীর এই চ্যালেঞ্জ নির্দেশ করে যে—যদি আপনি দাবি করেন কোনো একটি কাজ (যেমন বিশেষ সিয়াম, বিশেষ সালাত বা প্রথা) ‘সওয়াব’ বা ‘ইবাদত’, তবে আপনাকে অবশ্যই আল-কুরআন মাজীদ থেকে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখাতে হবে।

একইভাবে আল্লাহ ‘সুলতান’ (سُلْطَان) শব্দের মাধ্যমে ইবাদতের রাজকীয় বৈধতা বা Authority দাবি করেছেন। আল্লাহ সু.তা. বলেন:

নাকি আমি তাদের ওপর এমন কোনো দলিল (সুলতান) নাযিল করেছি যা তাদের উদ্ভাবিত ইবাদতের সপক্ষে কথা বলে?” (৩০:৩৫)

অনুধাবন: ওহীর এই ‘নজম’ নির্দেশ করে যে, ইবাদতের নামে আপনি যা-ই করবেন, তার উৎস অবশ্যই আল-কুরআন মাজীদ হতে হবে। যদি ওহীর কোনো আয়াতে সেই কাজের ‘সুলতান’ বা অনুমোদন না থাকে, তবে তা আল্লাহর নিকট প্রত্যাখ্যাত।

*•̩̩͙̩̩͙͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙*

মনগড়া নাম ও প্রথা: ওহীর ‘ইযন’ বা অনুমতি:

মানুষ ইবাদতের নামে অনেক দিবস বা প্রথার এমন সব নাম দেয় যা আল্লাহ ও আল্লাহর রসূল (সা.) কখনো অনুমোদন করেননি। সালামুন আলা ইউসুফ-এর ভাষায় আল-কুরআন এই সত্যটি তুলে ধরেছে: 

“তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে কেবল এমন কতগুলো নামের (আসমা) ইবাদত করছ, যা তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদারা নামকরণ করেছ; এগুলোর সপক্ষে আল্লাহ কোনো দলিল (সুলতান) নাযিল করেননি।” (১২:৪০, ৫৩:২৩)

আধ্যাত্মিক অনুধাবন: আপনি কোনো কাজকে ‘ইবাদত’ বা ‘সওয়াব’ নাম দিলেই তা ইবাদত হয়ে যায় না। যতক্ষণ না ওহীর আয়াতে সেই নামের স্বীকৃতি পাওয়া যায়, ততক্ষণ তা কেবল মানুষের ‘ধারণা’ (জান্ন) ছাড়া আর কিছুই নয়। আর আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই ধারণা সত্যের (হক) মুকাবিলায় কোনো কাজে আসে না।” (৫৩:২৮)

যখন কোনো সমাজ ওহীর কিতাব ছেড়ে ‘লাহওয়াল হাদীস’ (অসার কথাবার্তা) বা মানুষের তৈরি কিতাবের অনুসারী হয়, তখন তারা ইবাদতের নতুন নতুন নাম ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করে। আল-কুরআনের ৫৩:২৩ আয়াতেও বলা হয়েছে যে, এই নামগুলো কেবল মানুষের ‘ধারণা’ (জান্ন) এবং কুপ্রবৃত্তির ফল। অথচ ইবাদতের জন্য প্রয়োজন আল্লাহর সরাসরি ‘ইযন’ বা অনুমতি (৪২:২১)।

নাযিলকৃত একমাত্র অহী (হক্ক) ছাড়া সব বাতিল: (১০:৩৬, ১৭:৮১, ৪৭:২-৩)

আর তাদের অধিকাংশই অনুমান ছাড়া অনুসরণ করে না। নিশ্চয় সত্যের বিপরীতে অনুমান কোনো ধরণের কাজে আসবে না। তারা যা করে সে সম্পর্কে নিশ্চয় আল্লাহ বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন-আয়াত ১০:৩৬

*•̩̩͙̩̩͙͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙*

বাপ-দাদার প্রথা -অন্ধ অনুসরণ বনাম ওহীর দলিল:

দলিলবিহীন ইবাদতের একটি বড় উৎস হলো ‘বাপ-দাদার ঐতিহ্য’। যখনই মানুষকে ওহীর দিকে আহ্বান করা হয়, তারা এই প্রাচীন প্রথাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাদের এই মানসিকতাকে এভাবে চিত্রায়িত করেছেন: “যখন তাদের বলা হয়—

আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তোমরা তার অনুসরণ করো; তারা বলে—বরং আমরা তা-ই অনুসরণ করবো যার ওপর আমরা আমাদের পিতাপিতামহদের (আ-বা-আনা) পেয়েছি।” (২:১৭০, ৫:১০৪)

আল্লাহ এর উত্তরে এক যৌক্তিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন: “যদিও তাদের পিতাপিতামহরা কিছুই জানতো না এবং তারা হেদায়েতপ্রাপ্তও ছিল না (তবুও কি তারা তাদের অনুসরণ করবে)?” (২:১৭০)। ওহীর চর্চা ছেড়ে যারা কেবল বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত প্রথাকে ধর্ম মনে করে, তারা মূলত ওহী থেকে বিচ্ছিন্ন।

*•̩̩͙̩̩͙͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙*

দলিলবিহীন ইবাদতের ভয়াবহ শাস্তি ও নিস্ফলতা:

যারা ওহীর দলিল ছাড়াই ‘ভালো কাজ’ মনে করে নানাবিধ প্রথা পালন করে, কিয়ামতের দিন তাদের অবস্থা হবে সবচেয়ে শোচনীয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

বলো! আমি কি তোমাদের ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারীদের (আল-আখসারীনা আ’মালা) সংবাদ দেবো? তারা সেই সব লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনে নিস্ফল হয়েছে, অথচ তারা মনে করছে যে তারা ভালো কাজই (সুন্আ) করছে।” (১৮:১০৩-১০৪)

কারণ কী? কারণ তারা ওহীর ‘আয়াতসমূহ’ এবং আল্লাহর নির্ধারিত বিধান উপেক্ষা করেছে। ফলে: “তাদের আমলসমূহ নিস্ফল হয়ে গেছে (ফাহাবিত্বাত আ’মালুহুম)। কিয়ামতের দিন আমি তাদের আমলের কোনো ওজন (মিজান) দেবো না।” (১৮:১০৫)

*•̩̩͙̩̩͙͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙*

ইবাদতের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কার? আল্লাহর আইন প্রণয়নে অংশীদারিত্বের শিরক:

ওহীর বিধান ছাড়া কোনো নতুন ইবাদত উদ্ভাবন করা আল্লাহর সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের শামিল এবং  কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। আল্লাহ সু.তা. কঠিন ভাষায় সতর্ক করেছেন: 

তাদের কি এমন কোনো অংশীদার (শরীক) আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান (শরিয়ত) দিয়েছে যার অনুমতি (ইযন) আল্লাহ দেননি? ফয়সালার ঘোষণা না থাকলে তাদের মধ্যে তো বিচার হয়ে যেত। নিশ্চয়ই জালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। -আয়াত ৪২:২১)

এবং তিনি তাঁর কতৃর্ত্বের মধ্যে কাউকে অংশীদারিত্ব দেন না-আয়াত 18:26

‘হুকুম’ বা বিধানদাতার নিরঙ্কুশ একত্ব:

দলিলবিহীন ইবাদত কেন বর্জনীয়, তার সবচেয়ে শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো ‘হুকুম’ বা আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা।

“বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই (ইনীল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ); তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না। এটিই সঠিক দ্বীন।” (১২:৪০)

এই আয়াতের সাথে ৬:১১৪ আয়াতের সংযোগ লক্ষ্য করুন:

— “তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিচারক (হাকাম) তালাশ করবো, অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত কিতাব নাযিল করেছেন?” (৬:১১৪ )

অনুধ্যান: যদি বিধানদাতা কেবল একজনই হন, তবে ইবাদতের পদ্ধতিও কেবল তাঁর কাছ থেকেই আসতে হবে। যারা বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে ওহী-বহির্ভূত আমল করে, তারা মূলত আল্লাহর সমান্তরাল অন্য কাউকে ‘হাকাম’ বা বিধানদাতা হিসেবে গ্রহণ করেছে, যা তৌহিদের মূল চেতনার পরিপন্থী।

নিজ হাতে কিতাব লেখা ও আল্লাহর নামে চালিয়ে দেওয়া:

বাপ-দাদার প্রথা বা মানুষের রচিত তথাকথিত কিতাবকে যারা ইবাদতের মূল উৎস বানায়, ওহী তাদের ভয়াবহ পরিণাম বর্ণনা করেছে:

“সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে এবং সামান্য মূল্যের বিনিময়ে বলে— এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাদের হাত যা লিখেছে তার জন্য তাদের দুর্ভোগ এবং তারা যা উপার্জন করে তার জন্যও তাদের দুর্ভোগ।” (২:৭৯)

তাত্ত্বিক সংযোগ: এই আয়াতটি সরাসরি সেই সব ‘লাহওয়াল হাদীস’ বা মানুষের তৈরি বিধানের দিকে ইঙ্গিত করে যা ওহীর সমান্তরালভাবে সমাজে প্রচলিত। যারা ওহীর দলিল ছাড়াই ইবাদত উদ্ভাবন করে, তারা মূলত ২:৭৯ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। এটি প্রমাণ করে যে, ইবাদত অবশ্যই ওহীর ‘বুরহান’ (প্রমাণ) ভিত্তিক হতে হবে, মানুষের রচিত বর্ণনার ভিত্তিতে নয়।

আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ ও পরিনাম:

আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোনো কিছুকে ইবাদত বা সাওম হিসেবে সাব্যস্ত করাকে ওহী ‘মিথ্যা উদ্ভাবন’ বা ‘ইফতিরা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে:

বলো! আল্লাহ কি তোমাদের অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করছ? (১০:৫৯)

আরও কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে:

“তোমাদের জিহ্বা থেকে উদ্ভাবিত মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে বলো না— এটি হালাল আর ওটি হারাম; যাতে তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করতে পারো। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে, তারা সফলকাম হবে না।” (১৬:১১৬)

যারা মনে করে আল-কুরআনের বাইরের উৎস থেকে ইবাদত গ্রহণ করে তারা সফল হবে, ১৬:১১৬ আয়াত তাদের সেই আশাকে সমূলে বিনাশ করে দিয়েছে। সফলতার পরিবর্তে তাদের জন্য রয়েছে ‘অল্প ভোগ ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (১৬:১১৭)।

একমাত্র পথ (সাবীল) বনাম বহুমুখী ভ্রষ্টতা:

আল্লাহর দেওয়া বিধান একটি সোজা পথের মতো, আর দলিলবিহীন ইবাদতগুলো হলো অসংখ্য শাখা-পথ।

“আর এটিই আমার সোজা পথ (সিরাতী মুস্তাক্বীমা), সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করো এবং অন্যান্য পথের (সুবুল) অনুসরণ করো না; তবে তা তোমাদের আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।” (৬:১৫৩)

ওহীর এই ‘লিঙ্ক’ আমাদের শেখায় যে, ইবাদতের নামে যখনই আপনি ওহীর নির্দিষ্ট দলিলের বাইরে নতুন কোনো প্রথা (রোজা, নামাজ বা উৎসব) যোগ করবেন, তখনই আপনি ৬:১৫৩ আয়াতের সেই ‘বিভ্রান্তিকর পথের’ (সুবুল) অনুসারী হয়ে যাবেন। ওহীর সীমানা (হুদূদ) অতিক্রম করাই হলো পথভ্রষ্ট হওয়ার মূল কারণ।

আমল বাতিল হওয়ার আইনি ঘোষণা:

অনেকে মনে করে অনেক বেশি আমল করলেই তা নাজাতের উসিলা হবে। কিন্তু ওহীর শর্ত হলো আনুগত্য।

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রসূলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের আমলসমূহ নিস্ফল (লা-তুবতিলূ আ’মালাকুম) করো না।” (৪৭:৩৩)

আধ্যাত্মিক অনুধ্যান: আমল কখন বাতিল বা ‘বত্বিল’ হয়? যখন তা ১৮:১০৫ অনুযায়ী আল্লাহর আয়াতের (বুরহান) ওপর ভিত্তি করে হয় না। আনুগত্যের অর্থই হলো ওহীর বিধান অনুসরণ করা। রসূল (সা.) কেবল ওহী প্রচারের নির্দেশপ্রাপ্ত ছিলেন (৫:৬৭)। সুতরাং, ওহী ছাড়া অন্য কিছুর অনুসরণ করা মূলত আমলকে নিস্ফল করারই নামান্তর।

*•̩̩͙̩̩͙͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙*

দলিলবিহীন আমলের ভয়াবহ পরিণাম: ধূলিকণা ও নিস্ফলতা

যারা ওহীর ‘বুরহান’ ছাড়াই ভালো কাজ বা ইবাদত মনে করে শ্রম ব্যয় করে, কিয়ামতের দিন তাদের আমলনামা সম্পর্কে আল্লাহ রব্বুল আলামিন এক চূড়ান্ত সত্য প্রকাশ করেছেন:

১. ধূলিকণা সদৃশ আমল: “আমি তাদের কৃতকর্মের দিকে মনোনিবেশ করবো, অতঃপর তা বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় (হাবাআম মানছুরা) পরিণত করবো।” (২৫:২৩) — কারণ সেই আমলের পেছনে ওহীর দলিল ছিল না।

২. ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারী: “বলো, আমি কি তোমাদের ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারীদের সংবাদ দেবো? তারা সেই সব লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনে নিস্ফল হয়েছে, অথচ তারা মনে করছে যে তারা ভালো কাজই করছে।” (১৮:১০৩-১০৪)

৩. ওজনহীন আমল: “সুতরাং তাদের আমলসমূহ নিস্ফল হয়ে গেছে। কিয়ামতের দিন আমি তাদের আমলের কোনো ওজন (মিজান) দেবো না।” (১৮:১০৫)

*•̩̩͙̩̩͙͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙*

আল্লাহর নাযিলকৃত অহীর সঙ্গে অন্য কিছুকে দ্বীনের উৎস হিসেবে যুক্ত করলে (শিরক করলে) সব আমল নষ্ট হয়ে যায়-বরবাদ হয়ে যায়! 

দ্র: আয়াত ৩৯:৬৫, ৬:৮৮, ৩:১৫১, ৪:৪৮

*•̩̩͙̩̩͙͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙*

আল-কুরআনের এই সামগ্রিক দালিলিক পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে এটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে: 

১. আল-কুরআন মাজীদে যে ইবাদতের ‘বুরহান’ বা ‘সুলতান’ নেই, তা বাতিল (২:১১১)। 

২. বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে ওহী বহির্ভূত কোনো আমল করা হেদায়েতের পরিপন্থী (২:১৭০)। 

৩. ইবাদতের নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করা আল্লাহর আইন প্রণয়নের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ বা শিরকের শামিল (৪২:২১)। 

৪. দলিলবিহীন আমল যত ‘ভালো’ মনে করেই করা হোক না কেন, তা ১৮:১০৫ অনুযায়ী নিস্ফল ও ওজনে শূন্য হবে।

সুতরাং, ওহীর চর্চা বা আল-কুরআনের সাথে সার্বক্ষণিক সংযোগে থাকা মানে হলো—যেখানে আল্লাহ ও আল্লাহর রসূল  ওহীর মাধ্যমে থেমে যেতে বলেছেন সেখানে থেমে যাওয়া এবং যা তিনি নির্দেশ করেননি তা থেকে দূরে থাকা।

*•̩̩͙̩̩͙͙⁺˚*•̩̩͙̩̩͙*

হক ও বাতিলের পার্থক্যের জন্য আল-কুরআনের প্রাসঙ্গিক দুআসমূহ

৩:৮: رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا 

— “হে আমাদের রব!  সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে বিচ্যুত করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন।”

৭:২৩: رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَالَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ 

— হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি; আপনি যদি আমাদের ক্ষমা ও দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

৬:১৬২: قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّالْعَالَمِينَ 

— “বলো, নিশ্চয় আমার সালাত, আমার ইবাদত (ত্যাগের আমল), আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।”

✧ ৬:১১৪: أَفَغَيْرَ اللَّهِ أَبْتَغِي حَكَمًا وَهُوَ الَّذِي أَنزَلَ إِلَيْكُمُ الْكِتَابَ مُفَصَّلًا

— “তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিচারক (হাকাম) তালাশ করবো, অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত কিতাব নাযিল করেছেন?”

  رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا

— “হে আমাদের রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন এবং আমাদের কাজগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করার ব্যবস্থা (রশদা) করে দিন। ১৮:১০:

সুবহানা রব্বিকা রব্বিল ‘ইযযাতি ‘আম্মা ইয়াসিফুন। ওয়া সালামুন ‘আলাল মুরসালীন। ওয়ালহামদু লিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন। (৩৭:১৮০-১৮২)

🎬 Video Credit: মূল নির্মাতা (Original Creator)।

ℹ️ শ্রোতাদের অবগতির জন্য:
এই চ্যানেলে প্রকাশিত অডিও ও ভিডিওসমূহ মূলত ইউটিউব কিংবা অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহকৃত বা ধার করা উপকরণ। এগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই কন্টেন্টের মাধ্যমে আপনাদের মাঝে শেয়ার করা হচ্ছে।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post