আল-কুরআনুল মাজীদ মানবজাতির জন্য এক শাশ্বত ও জীবনবিধান। ওহীর জ্ঞান ও মানুষের উদ্ভাবিত প্রথার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আল-কুরআনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ যখনই আল্লাহর নাযিলকৃত বিশুদ্ধ সত্যের আয়াত নিয়ে এসেছেন, তখনই একদল মানুষ তাঁদের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছে এই যুক্তিতে যে, “আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের যে পথে পেয়েছি, তা ছেড়ে অন্য কিছু গ্রহণ করতে পারি না।” কুরআনের পরিভাষায় এই মানসিকতাকেই ‘তাকলীদে আ'মা’ বা দলীলবিহীন অন্ধ অনুসরণ বলা হয়।
আর যখন তাদের সামনে আমাদের সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তারা বলে, এ এমন ব্যক্তি ছাড়া নয়, যে তোমাদেরকে তোমাদের পূর্বপুরুষরা যার উপাসনা করত তা থেকে বাধা দিতে চায়। এবং তারা বলে, এটা বানোয়াট মিথ্যা ছাড়া নয়। আর যারা সত্যকে অস্বীকার করেছিল যখন সেটা তাদের কাছে এসেছিল তারা বলে, নিশ্চয় এটা কেবল স্পষ্ট যাদু-আয়াত ৩৪:৪৩
বর্তমান যুগেও ইবাদতের নামে এমন বহু আমল প্রচলিত রয়েছে, যার পক্ষে আল্লাহর নাযিলকৃত ওহীর কোনো ‘সুলতান’ (প্রমাণ) বা সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায় না।
ওহীর দলিলে অপ্রমাণিত কিছু প্রচলিত আমল ও প্রথা:
বর্তমান সমাজে এমন কিছু আমলকে দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা আল-কুরআনের নাযিলকৃত আয়াতের সরাসরি কোনো নির্দেশনা বা দালিলিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এগুলো মূলত ‘লাহওয়াল হাদীস’ (৩১:৬–৭), ইসলামী ঐতিহ্য এবং ঐতিহাসিক বর্ণনার ভিত্তিতে পালিত হয়ে আসছে। উদাহরণস্বরূপ—
নফল সিয়াম: শাওয়ালের ছয় রোজা, আশুরার রোজা, আরাফার দিনের বিশেষ রোজা (হজে না থাকা ব্যক্তিদের জন্য), সোমবার ও বৃহস্পতিবারের নফল রোজা এবং আইয়ামে বীয (চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের) রোজা।
সালাত-সংক্রান্ত আমল: তারাবিহ সালাতের নির্দিষ্ট রাকাতসংখ্যা (৮ বা ২০), লাইলাতুল কদরের ২৭তম রাতকে নির্দিষ্ট করে উদযাপন, চাশতের (দুহা) সালাত, আওয়াবীন সালাত, সালাতুত তাসবীহ এবং জানাজার সালাতে নির্দিষ্ট, অনাযিলকৃত দুআ।
রীতি ও উৎসব: মিলাদুন্নবী পালন, শবে বরাত উপলক্ষে বিশেষ ইবাদত ও অনুষ্ঠান, আযানের প্রচলিত নির্দিষ্ট শব্দাবলী (ওহীবহির্ভূত) এবং ইকামতের প্রচলিত নির্দিষ্ট শব্দাবলী।
সামাজিক প্রথা: আকীকা, খৎনা, মিসওয়াককে নিয়মিত সুন্নাত হিসেবে পালন, দাড়ির দৈর্ঘ্য সম্পর্কিত নির্দিষ্ট বিধান, উরস, কুলখানি, চল্লিশা, খতমে কুরআনের অনুষ্ঠান, গিয়ারভী শরীফ এবং কবর জিয়ারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক রীতি।
পোশাক-পরিচ্ছদ: টাখনুর ওপর কাপড় পরিধানকে প্রায় বাধ্যতামূলক বা মুসলিম পরহেজগারির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা, মাথায় টুপি পরিধানকে সুন্নাত হিসেবে গণ্য করা, জুব্বা পরিধানকে বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখা, কিংবা প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও নারীদের জন্য হাতমোজা, পা-মোজা ও মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ ঢেকে শুধু চোখ খোলা রেখে চলাফেরাকে ধর্মীয়ভাবে অপরিহার্য মনে করা।
আমরা আল-কুরআনের আয়াতসমূহের আলোকে বোঝার চেষ্টা করব যে, আল্লাহর নাযিলকৃত ওহীর নির্দেশনা পরিহার করে কেবল ‘পিতৃপুরুষদের রীতি’র ভিত্তিতে এসব আমল পালন করা রবের দরবারে কতটা গ্রহণযোগ্য।
২. পিতৃপুরুষদের অনুসরণের অসারতা: আল-কুরআনের
দলিল:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর কিতাবে বারবার উল্লেখ করেছেন যে, দলিলবিহীন পিতৃপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ মানুষের হিদায়াতের পথে প্রধান বাধা।
নবীগণের দাওয়াত ও পিতৃপুরুষদের দোহাই:
সালামুন আলা সালিহ-এর জাতি বলেছিল: "তুমি কি আমাদের সেইসবের ইবাদত করা থেকে বিরত রাখতে চাও যাদের ইবাদত আমাদের পিতৃপুরুষরা করত?" (১১:৬২)। সালামুন আলা মুসা ও সালামুন আলা হারুন-কেও একই কথা বলা হয়েছিল (১০:৭৮)। এমনকি সালামুন আলা নূহ-এর জাতিও বলেছিল যে তারা পূর্বপুরুষদের মধ্যে এমন সত্যের কথা শোনেনি (২৩:২৪)।
দলিলবিহীন নাম ও ইবাদত:
সালামুন আলা ইউসুফ স্পষ্টভাবে বলেছেন: "তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের ইবাদত কর, সেগুলো কেবল কিছু নাম, যা তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষরা রেখেছ। আল্লাহ এ বিষয়ে কোনো দলিল (সুলতান) নাযিল করেননি।" (১২:৪০)। সূরা আন-নাজমেও একই কথা বলা হয়েছে (৫৩:২৩)। অর্থাৎ, ওহীর অনুমোদনহীন যেকোনো ধর্মীয় কাজ কেবল একটি অন্তঃসারশূন্য ‘নাম’ মাত্র।
জ্ঞানহীন অনুসরণের নিষেধাজ্ঞা:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন একটি মৌলিক মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন: "যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান (ওহী-ভিত্তিক প্রমাণ) নেই, তার অনুসরণ করো না।" (১৭:৩৬)। কারণ সত্যের একমাত্র মানদণ্ড হলো আল্লাহর নাযিলকৃত হুজ্জাত বা প্রমাণ। আল্লাহ বলেন: "চূড়ান্ত প্রমাণ (হুজ্জাতুল বালিগাহ) তো আল্লাহরই।" (৬:১৪৯)।
৩. অন্ধ অনুসরণের স্বরূপ ও আল্লাহর সতর্কবাণী:
আল্লাহ সু.তা. আল-কুরআন মাজীদে সেই সব লোকদের হঠকারিতা তুলে ধরেছেন যারা ওহীর চেয়ে পূর্বপুরুষদের প্রথাকে বেশি প্রাধান্য দেয়।
বিবেকহীন আনুগত্যের সমালোচনা:
যখন তাদের বলা হয় আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অনুসরণ করো, তারা বলে— "আমরা বরং সেটার অনুসরণ করি যার ওপর আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি।" আল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন: "যদি এমন হয়, তাদের পূর্বপুরুষরা কিছুই বুঝত না এবং তারা সঠিক পথে চলত না, তবুও কি!" (২:১৭০)।
ওহীর পরিবর্তে ঐতিহ্যের অন্ধবিশ্বাস:
ওহী এবং রাসূলের হকের দিকে আসার আহ্বানের জবাবে যখন কেউ বলে— "আমাদের জন্য যথেষ্ট তাই যার ওপর আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের পেয়েছি", তখন আল্লাহ তাদের হিদায়াতহীনতাকে স্পষ্ট করে দেন। এমনকি শয়তান যদি তাদের আগুনের দিকে ডাকে, তবুও তারা তাদের পিতৃপুরুষদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চায় (৩১:২১)।
ভুল আমলকে আল্লাহর নামে চালানো:
অনেক সময় মানুষ দলিলবিহীন প্রথা বা অশ্লীল কাজকে আল্লাহর নির্দেশ বলে দাবি করে এই যুক্তিতে যে—তাদের পিতৃপুরুষরা এটি করত। আল্লাহ বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেন না।" ৭:২৮ (২৯:৪৫)।
৪. ‘তাকলীদে আ'মা’ বা অন্ধ অনুসরণের আধ্যাত্মিক বিপর্যয়:
আল-কুরআন মাজীদের নজম বা বিন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘পিতৃপুরুষদের অনুসরণ’ বিষয়টি কেবল মূর্তিপূজার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সালামুন আলা ইব্রাহিম যখন তাঁর পিতাকে মূর্তির অসারতা বোঝালেন, উত্তর ছিল— "আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের এভাবেই করতে দেখেছি।" (২১:৫২-৫৩, ২৬:৭০-৭৪)। অর্থাৎ, ওহীর অকাট্য প্রমাণের বিপরীতে ‘ঐতিহ্য’ বা ‘পূর্বপুরুষদের দেখা’কে সত্যের মানদণ্ড বানানোই হলো শয়তানি ধোঁকা।
সারসংক্ষেপ
এই আয়াতগুলো একত্রে পড়লে কয়েকটি নীতি স্পষ্ট হয়:
➥ আল্লাহর নাযিলকৃত ওহীর বিপরীতে পিতৃপুরুষদের অনুসরণ গ্রহণযোগ্য নয়।➥ সত্যের মানদণ্ড হলো আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব ও রাসূলদের দাওয়াত, বংশগত প্রথা নয়।
➥ কুরআন বারবার প্রশ্ন করেছে: যদি পিতৃপুরুষরা অজ্ঞ, পথভ্রষ্ট বা হিদায়াতহীন হয়ে থাকে, তবুও কি তাদের অনুসরণ করা হবে? (২:১৭০, ৫:১০৪, ৩১:২১)
➥ এটি কেবল একটি জাতির সমস্যা ছিল না; সালামুন আলা মুসা, সালামুন আলা সালিহ, সালামুন আলা ইব্রাহীমসহ বিভিন্ন নবীর জাতি একই যুক্তি ব্যবহার করেছিল (১০:৭৮, ১১:৬২, ২১:৫৩, ২৬:৭৪, ৪৩:২২–২৪)।
কেবল কুরআন অনুধাবনের দৃষ্টিতে, এই আয়াতগুলো একটি ধারাবাহিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে: আল্লাহর নাযিলকৃত নির্দেশই চূড়ান্ত মানদণ্ড; কোনো বিশ্বাস বা প্রথা শুধু পিতৃপুরুষদের থেকে এসেছে বলে তা সত্য প্রমাণিত হয় না।
কুরআনের ভাষায়, সত্য যাচাইয়ের মানদণ্ড তিনটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত:
1. আল্লাহ কী নাযিল করেছেন।3. জ্ঞান ও বিবেচনার ভিত্তিতে তা গ্রহণ করা হচ্ছে কি না, নাকি কেবল পূর্বপুরুষ বা সমাজকে অনুসরণ করা হচ্ছে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, "পিতৃপুরুষদের অনুসরণ" কুরআনে একটি বৃহত্তর বিষয়ের অংশ—তাকলীদে আ'মা (অন্ধ অনুসরণ)-এর সমালোচনা, যেখানে মানুষ দলিলের পরিবর্তে বংশ, সমাজ বা প্রচলিত রীতিকে সত্যের মানদণ্ড বানিয়ে ফেলে।
যৌক্তিক পূর্ণতা ও উপসংহার:
আল্লাহর নাযিলকৃত ওহী (আল-কুরআন মাজীদ) বাদ দিয়ে পিতৃপুরুষদের রেখে যাওয়া প্রথা বা অনাযিলকৃত বর্ণনার ভিত্তিতে ইবাদত করা মূলত ওহীর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করার শামিল। যখন মানুষ দলিল ছাড়াই কোনো আমলকে দ্বীন হিসেবে পালিত করে, সে প্রকারান্তরে আল্লাহর আইন প্রণেতা হওয়ার অধিকারে অন্যদের অংশীদার করে। আল-কুরআন আমাদের বারবার শিক্ষা দেয় যে, সত্যের মানদণ্ড বংশ, সমাজ বা প্রচলিত রীতি নয়; বরং একমাত্র সত্য হলো ওহী। সফলকাম তারাই যারা সকল প্রকার অন্ধ অনুসরণ (তাকলীদে আ'মা) ত্যাগ করে একনিষ্ঠভাবে রবের কিতাবকে আঁকড়ে ধরে এবং ১৮:২৭ আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী কেবল তাঁর কিতাবকেই অনুসরণীয় বিধান হিসেবে গ্রহণ করে।
প্রাসঙ্গিক কুরআনি দুআ-তাসবিহ:
ওহীর আনুগত্য ও ঈমানের সাক্ষ্য:
رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ
(রাব্বানা আমান্না বিমা আনযালতা ওয়াত্তাবায়নাল রাসূল ফাকতুবনা মা’আশ শাহীদিন)
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি যা নাযিল করেছেন তার ওপর আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা রাসূলের অনুসরণ করেছি; অতএব আমাদের সাক্ষ্যদাতাদের তালিকাভুক্ত করুন। (৩:৫৩)
হৃদয়কে ওহীর সত্যের ওপর স্থির রাখার আরজি:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
(রাব্বানা লা তুযিগ ক্বুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাতান, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব)
অর্থ: হে আমাদের রব! হিদায়াত দান করার পর আমাদের অন্তরকে সত্যলঙ্ঘনকারী (বিচ্যুত) করবেন না এবং আপনার নিকট থেকে আমাদের রহমত দান করুন; নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা। (৩:৮)
রবের মহান পবিত্রতা ও সত্যের ঘোষণা:
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّ الرَّحِيمُ
রাব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু-আল কুরআন ২:১২৭, ২:১২৮
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعִزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
সুবহা-না রব্বিকা রব্বিল ‘ইযযাতি ‘আম্মা- ইয়াসিফূন। অসালা-মুন ‘আলাল মুরসালীন। অলহামদু লিল্লা-হি রব্বিল ‘আ-লামীন!
