জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনিবার্য ‘বিরতি’ (Halt):
কিয়ামতের দিন হিসাব শুরু হওয়ার আগে এক বিশেষ মুহূর্ত আসবে যখন সকল মানুষকে থামিয়ে দেওয়া হবে। আল্লাহ সু.তা. ফেরেশতাদের নির্দেশ দেবেন: “এবং তাদের থামাও (ওয়াক্বিফূহুম), নিশ্চয়ই তারা জিজ্ঞাসিত হবে (ইন্নাহুম মাস-ঊলূন)।” (৩৭:২৪)
এই আয়াতের বিন্যাসটি লক্ষ্য করুন— ‘ওয়াক্বিফূহুম’ (তাদের দাঁড় করাও বা থামাও) এবং ‘মাস-ঊলূন’ (তারা জিজ্ঞাসিত হবে)। এটি এক প্রকার ‘অডিট’ বা হিসাব নিকাশের প্রারম্ভিক ঘোষণা। এখানে ওহীর সাথে সংযোগ হলো—দুনিয়াতে যারা আল্লাহর নির্দেশের সামনে থমকে দাঁড়ায়নি (ওহী মানেনি), সেদিন আল্লাহর নির্দেশে তাদের হিসাব দেওয়ার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে থামতে হবে।1. ওহীর কিতাব আল-কুরআন মাজীদ সম্পর্কে বিশেষ জিজ্ঞাসা (হিসাবের মূল মানদণ্ড):
2. কাঠগড়ায় সরাসরি আল কুরআনের আয়াত অগ্রাহ্যকারীদেরকে প্রশ্ন করা হবে আয়াত সম্পর্কে-
3. ওহীর আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যানের কারণ নিয়ে প্রশ্ন:
যারা ওহীর বিধান বা আল্লাহর নিদর্শনসমূহ নিয়ে অবজ্ঞা করেছে, আল্লাহ তাদের সরাসরি অভিযুক্ত করে প্রশ্ন করবেন। আল্লাহ বলেন:
যখন তারা আসবে, তখন আল্লাহ বলবেন-
তোমরা কি আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলেছিলে অথচ তোমরা তা জ্ঞানের (ইলম) দ্বারা আয়ত্ত করোনি? নাকি তোমরা কী করছিলে? (২৭:৮৪)
এই আয়াতের অভ্যন্তরীণ ইঙ্গিতটি অত্যন্ত শক্তিশালী। আল্লাহ প্রশ্ন করবেন—
ওহীর জ্ঞান বা ইলম পূর্ণাঙ্গভাবে হাসিল না করেই তোমরা কেন তা প্রত্যাখ্যান করেছিলে? অর্থাৎ, না জেনে বা না বুঝে আল্লাহর কালাম সম্পর্কে মন্তব্য করা বা তা অস্বীকার করা কিয়ামতের দিন এক ভয়ংকর প্রশ্নের কারণ হবে। ওহীর চর্চা বা অনুশীলনীতে না থাকার পরিণতিই হলো এই অপমানজনক জিজ্ঞাসা।
4. ওহীর বার্তার সত্যতা ও সতর্ককারী আগমন সংক্রান্ত প্রশ্ন:
5. নেয়ামত ও প্রাচুর্যের দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত প্রশ্ন:
প্রশ্ন করা হবে নিয়ামত, রিজিক, প্রাচুর্য ও সম্পদ সম্পর্কে। যেমন ভোগ বিলাসপূর্ণ জীবন ধারণ, গল্পগুজব, বিওবান-সম্পদশালীরা আল্লাহর আয়াতের প্রতি অহংকার, এবং আল্লাহর বানী নিয়ে চিন্তা ভাবনা না করার বিষয়ে। -১০২:১-৮-
দুনিয়াতে আল্লাহ মানুষকে যেসব নেয়ামত দান করেছেন—জীবন, সময়, মেধা, সম্পদ, স্বাস্থ্য, ক্ষমতা, জ্ঞান ও হিদায়াত—সেসবের ব্যবহার সম্পর্কে আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন:
“অতঃপর অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে নেয়ামতসমূহ (নাঈম) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (১০২:৮)
গভীর অনুধাবন:
আল কুরআনের আলোকে “নাঈম” কোনো একটি নির্দিষ্ট ভোগ্যবস্তু নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া সকল অনুগ্রহ, সামর্থ্য, সুযোগ ও উপকরণের সমষ্টিগত ধারণা। আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি ও পরীক্ষার জন্য স্থাপন করেছেন:
“অতঃপর তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন, যাতে তিনি দেখেন তোমরা কীভাবে কাজ কর।” (১০:১৪)
এবং
“তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন—কে কর্মে উত্তম।” (৬৭:২)
তাই মানুষের হাতে অর্পিত প্রতিটি নেয়ামত জবাবদিহির আওতাভুক্ত।
কুরআনের আলোকে ‘নাঈম’-এর প্রধান ক্ষেত্রসমূহ:
১. জীবন ও সময়: “তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন।” (৬৭:২)
২. শ্রবণ, দৃষ্টি ও হৃদয়: “নিশ্চয়ই শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয়—এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (১৭:৩৬) এটি জবাবদিহির সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ঘোষণাগুলোর একটি।
৩. জ্ঞান ও মেধা: “আল্লাহ তোমাদেরকে মাতৃগর্ভ থেকে বের করেছেন, যখন তোমরা কিছুই জানতে না; এবং তিনি তোমাদের জন্য শ্রবণ, দৃষ্টি ও হৃদয় সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।” (১৬:৭৮)
৪. স্বাস্থ্য ও শারীরিক সামর্থ্য: “তিনি তোমাদের আকৃতি দিয়েছেন এবং তোমাদের আকৃতি সুন্দর করেছেন।” (৪০:৬৪)।
“আমি কি তাকে দুই চোখ, একটি জিহ্বা এবং দুই ঠোঁট দিইনি?” (৯০:৮–৯)
৫. সম্পদ, রিযিক ও পৃথিবীর উপকরণ:
“তিনিই পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।” (২:২৯)
হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে, তা থেকে আহার কর। (২:১৬৮)
“আল্লাহ তোমাদেরকে যে রিযিক দিয়েছেন, তা থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার কর।” (৫:৮৮)
“তিনি তোমাদেরকে জমিনে প্রতিনিধিত্বশীল করেছেন... যাতে তিনি পরীক্ষা করেন যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার ব্যাপারে।” (৬:১৬৫)
এখানে সম্পদ, ভোগ্যসামগ্রী, ক্ষমতা ও সামাজিক অবস্থান—সবকিছুকে পরীক্ষার উপকরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
৬. পৃথিবীর সুযোগ-সুবিধা ও নিয়ামত:
“তিনি আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে, সবকিছুকে তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন।” (৪৫:১৩)
৭. হিদায়াত, ওহী ও আল্লাহর বাণী:
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত পূর্ণ করলাম।” (৫:৩)
“নিশ্চয়ই এই (কুরআন) তোমার ও তোমার জাতির জন্য এক মহাস্মরণিকা; আর অচিরেই তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (৪৩:৪৪)
“অতএব যাদের কাছে রাসূল পাঠানো হয়েছিল, আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞাসা করব।” (৭:৬)
8. ওহীর জ্ঞান: সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত:
6. নেয়ামত ও ওহীর জ্ঞানের ‘শুকরিয়া’ সংক্রান্ত প্রশ্ন:
আমরা ইতিপূর্বে ১০২:৮ আয়াতের ‘নাঈম’ বা নেয়ামত সম্পর্কে জেনেছি। এর আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় নেয়ামত হলো আল-কুরআন। আল্লাহ সু.তা. প্রশ্ন করবেন—আমি তোমাদের যে কিতাব বা জিকির (তথা আল কুরআন) দিয়েছিলাম (৪৩:৪৪), তার শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা তোমরা কীভাবে আদায় করেছ? নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা হলো তার ‘অনুশীলন’ বা ‘চর্চা’। যারা ওহীর চর্চা ছেড়ে দিয়েছে, তারা আসলে এই পরম নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা (কুফরান) করেছে, যা বিচারের দিনে কঠিন প্রশ্নের কারণ হবে।
কুরআনের সামগ্রিক বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সকল পার্থিব নেয়ামতের চেয়েও বড় নেয়ামত হলো আল্লাহর হিদায়াত ও ওহী। কারণ সম্পদ, স্বাস্থ্য বা ক্ষমতা মানুষকে কেবল দুনিয়ার সুযোগ দেয়; কিন্তু ওহী তাকে সত্যের পথ দেখায়। সেজন্য কুরআন ঘোষণা করে:
“নিশ্চয়ই এই (জিকির তথা আল কুরআন) সম্পর্কে তোমাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে।” (৪৩:৪৪)
এবং
“যাদের কাছে রাসূল পাঠানো হয়েছিল, আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞাসা করব।” (৭:৬)
অতএব আল্লাহ প্রশ্ন করবেন—তোমার কাছে সত্য পৌঁছানোর পর তুমি তার প্রতি কী অবস্থান নিয়েছিলে? তুমি কি আল্লাহর আয়াত দ্বারা পথনির্দেশ গ্রহণ করেছিলে, নাকি তা উপেক্ষা করেছিলে?
আর যে ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“তার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, কিন্তু সে সেগুলো উপেক্ষা করেছিল।” (২০:১২৬)
অতএব সূরা আত-তাকাসুর (১০২:৮)-এর “নাঈম” শব্দের সর্বোচ্চ ও গভীরতম স্তরে রয়েছে ওহী, হিদায়াত এবং সত্যের জ্ঞান। কারণ অন্যান্য সব নেয়ামতের সঠিক ব্যবহার নির্ভর করে মানুষ ওহীর আলো গ্রহণ করেছে কি না তার উপর। তাই কিয়ামতের দিনের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন হবে—আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান, হিদায়াত ও সুযোগকে মানুষ কী কাজে ব্যবহার করেছিল।
7. প্রশ্ন করা হবে সম্পদ ও মিথ্যা উদ্ভাবন সম্পর্কে:
আল্লাহ নিজেই নিজের শপথ করে বললেন যে, তাদেরকে অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে। সূরা নাহল: ১৬:৫৬ (2:79, 16:116)
8. কান, চোখ ও হৃদয় (ইন্দ্রিয়সমূহের গূঢ় জবাবদিহিতা):
9. অঙ্গীকার ও চুক্তির বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে প্রশ্ন:
মানুষ দুনিয়াতে একে অপরের সাথে এবং আল্লাহর সাথে যেসব অঙ্গীকার (আহদ) বা চুক্তি করে, সে বিষয়ে আল্লাহ রব্বুল আলামিন সরাসরি প্রশ্ন করবেন। আল্লাহ বলেন:
“আর তোমরা অঙ্গীকার (আহদ) পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে (ইন্নাল ‘আহদা কানা মাস-ঊলা)।” (১৭:৩৪)
অন্যত্র উহুদ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওহীর বর্ণনায় এসেছে:
অবশ্যই আল্লাহর সাথে তাদের অঙ্গীকার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। (৩৩:১৫)
এখানে ‘আহদ’ বা অঙ্গীকার শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক। এটি যেমন মানুষের সাথে মানুষের লেনদেনের চুক্তিকে বুঝায়, তেমনি সৃষ্টির আদি লগ্নে আল্লাহর সাথে কৃত ‘আলাসতু বি-রাব্বিকুম’ (৭:১৭২) চুক্তির বাস্তবায়নের বিষয়েও ইঙ্গিত দেয়। ওহীর নির্দেশিত এই ন্যায়নিষ্ঠতা রক্ষা করা হয়েছে কি না, তা হবে জিজ্ঞাসার কেন্দ্রবিন্দু।
10. আমল বা কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে:
অনুধাবন: তবে কুরআনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আমল সম্পর্কে প্রশ্নও শেষ পর্যন্ত ওহী ও আল্লাহর নির্দেশনার আলোকে করা হবে—অর্থাৎ শুধু "কি করেছ?" নয়, বরং "আল্লাহর আয়াত ও রাসূলের দাওয়াত পাওয়ার পর কী করেছ?" সেটিই মূল বিচার্য বিষয়।
11. আত্ম-জিজ্ঞাসাবাদ: যখন আমলনামাই হবে প্রশ্নকর্তা:
12. সার্বজনীন জিজ্ঞাসাবাদ: সবাইকে হিসাব দিতে হবে- কোনো ব্যক্তিই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন কিয়ামতের দিনের বিচারিক প্রক্রিয়াকে এতটাই ব্যাপক করেছেন যে, কোনো মানুষই সেই জিজ্ঞাসাবাদ থেকে রেহাই পাবে না। আল্লাহ সু.তা. তাঁর নিজের সত্তার কসম খেয়ে বলছেন:
এই আয়াতের ‘আজমাঈন’ (সকলে) শব্দটি নির্দেশ করে যে—শাসক-শাসিত, ধনী-দরিদ্র, এমনকি যারা নিজেদেরকে খুব ধার্মিক মনে করতো, তারা প্রত্যেকেই তাদের প্রতিটি কাজের যৌক্তিকতা ও ওহী-ভিত্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। এটি কেবল একটি সাধারণ প্রশ্ন নয়, বরং ওহীর দর্পণে আমলনামার চুলচেরা বিশ্লেষণ।
(যদিও কুরআনের অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে, “সেদিন কোনো মানুষ বা জিনকে তার পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে না” (৫৫:৩৯),
এই জবাবদিহির গভীরতা আরও স্পষ্ট হয় যখন আল্লাহ বলেন—
“পড়ো তোমার আমলনামা! আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।” (সূরা আল-ইসরা ১৭:১৪)
এখানে মানুষকে তার নিজের জীবন-রেকর্ডের মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে। কোনো অস্বীকার, কোনো গোপনতা কিংবা কোনো অজুহাত তখন কার্যকর হবে না। ওহীর মানদণ্ডে লিপিবদ্ধ কর্মসমূহের আলোকে মানুষ নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। এটি এমন এক আত্ম-জবাবদিহির মুহূর্ত, যেখানে মানুষের অস্তিত্ব, বিশ্বাস, চিন্তা ও কর্ম—সবকিছুই তার সামনে উন্মোচিত হয়ে যাবে।
অতএব, কিয়ামতের প্রশ্ন কেবল বড় বড় অপরাধ বা উল্লেখযোগ্য কাজকে ঘিরে নয়; বরং মানুষের জীবনের প্রতিটি সচেতন কর্ম, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি নৈতিক অবস্থানের সঙ্গেই জড়িত। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে—যে অণু পরিমাণ সৎকর্ম বা অসৎকর্ম করবে, সে তা প্রত্যক্ষ করবে (৯৯:৭–৮)।
13. রসূলগণের প্রতি উম্মতদের আচরণ সংক্রান্ত প্রশ্ন:
14. রসূলগণের দাওয়াত ও মানুষের সাড়া সংক্রান্ত প্রশ্ন:
কিয়ামতের দিন আল্লাহ রব্বুল আলামিন কেবল সাধারণ মানুষকে নয়, বরং যাদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছিল এবং যারা ওহী নিয়ে এসেছিলেন—উভয় পক্ষকেই প্রশ্ন করবেন। আল্লাহ সু.তা. বলেন:
অতঃপর যাদের কাছে রসূল পাঠানো হয়েছিল আমি অবশ্যই তাদের প্রশ্ন করবো এবং আমি অবশ্যই রসূলগণকেও প্রশ্ন করবো। (৭:৬)
এই আয়াতের একটি বিস্তারিত রূপ আমরা পাই সূরা আল-কাসাস-এ, যেখানে নির্দিষ্ট প্রশ্নের শব্দমালা উদ্ধৃত করা হয়েছে:
“সেদিন তিনি তাদের ডেকে বলবেন—তোমরা রসূলগণকে কী উত্তর দিয়েছিলে?” (২৮:৬৫)
[যারা বর্তমানে রাসুলকে রেখে যাওয়া কিতাব "কুরআনকে বুঝে বুঝে পড়ে না, বুজে না, সে মুলত কুরআন প্রত্যাখ্যান করলো এবং সে রাসুলকে ও প্রত্যাখ্যান করে রাসূলগণকে না জবাবই দিয়ে দিলো।সূরা ক্বাছাছ: 28:65
অর্থাৎ, ওহীর বার্তা শোনার পর মানুষের প্রতিক্রিয়া ও আচরণ কী ছিল—সেটিই হবে বিচারের মূল ভিত্তি। আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন, ওহীর সেই ‘রূহ’ বা নূর যখন তাদের কাছে পৌঁছেছিল, তখন তারা কি তার আনুগত্য করেছিল নাকি তাকে অস্বীকার করেছিল?
15. রসূলগণের সাক্ষ্য ও উম্মতদের প্রতি প্রশ্ন:
কিয়ামতের দিন কেবল সাধারণ মানুষের জবানবন্দি নেওয়া হবে না, বরং প্রতিটি জাতির রসূলকে উপস্থিত করা হবে তাদের বিরুদ্ধে ‘সাক্ষী’ হিসেবে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন এই গম্ভীর দৃশ্যটি বর্ণনা করেছেন:
“অতঃপর তখন কেমন হবে, যখন আমি প্রত্যেক জাতি থেকে একজন সাক্ষী (শাহীদ) উপস্থিত করবো এবং তোমাকে (হে মুহাম্মদ!) তাদের ওপর সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করবো?” (৪:৪১)
এই আয়াতের অভ্যন্তরীণ ইঙ্গিত হলো—আল্লাহ রসূলগণকে জিজ্ঞাসা করবেন, তোমরা কি আমার
বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলে? এবং উম্মতদের জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমাদের কাছে যখন ওহীর নূর নিয়ে সাক্ষী উপস্থিত হয়েছিল, তখন তোমরা কেন তা গ্রহণ করোনি? এটি একটি বিচারিক প্রশ্নোত্তর (Cross-examination) যেখানে রসূলগণের ওহী-ই হবে সত্য ও মিথ্যার মানদণ্ড।
16. ওহীর জ্ঞান গোপন করা বা বিকৃত করা সংক্রান্ত প্রশ্ন:
যারা কিতাবের জ্ঞান রাখা সত্ত্বেও তা মানুষের কাছে গোপন করেছে বা বৈষয়িক স্বার্থে বিকৃত করেছে, তাদের প্রতি আল্লাহর বিচার হবে অত্যন্ত কঠোর। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:17. আদি অঙ্গীকার (মিছাক) সংক্রান্ত মৌন প্রশ্ন:
18. মিথ্যা উদ্ভাবন ও উদ্ভাবিত মতাদর্শ সম্পর্কে প্রশ্ন:
মানুষ দুনিয়াতে আল্লাহর নামে বা ধর্মের নামে অনেক মিথ্যা উদ্ভাবন (ইফতিরা) করে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন সেই উদ্ভাবিত মিথ্যা সম্পর্কে শপথ করে বলছেন:20. নিরপরাধের রক্ত ও সামাজিক ন্যায়বিচার সংক্রান্ত প্রশ্ন:
কিয়ামতের দিন মানুষের জবাবদিহি কেবল তার ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সমাজ ও মানুষের প্রতি তার দায়িত্ববোধ সম্পর্কেও প্রশ্ন করা হবে। আল-কুরআনে জাহান্নামীদের পরিণতি বর্ণনা করতে গিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংলাপ তুলে ধরা হয়েছে:
কিসে তোমাদেরকে সাকারের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছে? তারা বলবে, আমরা মুসল্লিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। এবং আমরা মিসকিনদের খাওয়াতাম না। এবং আমরা অহেতুক সমালোচনাকারীদের সঙ্গে অহেতুক সমালোচনা করতাম। আর আমরা কর্মফল দিন সম্পর্কে মিথ্যারোপ করতাম। (সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৪২–৪৪)
এই প্রশ্ন ও উত্তরের বিন্যাস গভীরভাবে লক্ষণীয়। এখানে জাহান্নামীদের অপরাধ হিসেবে প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব—সালাত পরিত্যাগ; এরপর উল্লেখ করা হয়েছে মানুষের প্রতি দায়িত্ব—অভাবগ্রস্তকে খাদ্য না দেওয়া। অর্থাৎ ইসলামে আধ্যাত্মিক দায়িত্ব ও সামাজিক দায়িত্ব পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং উভয়ই ঈমান ও নৈতিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই সত্যকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে অন্য একটি আয়াতে:
“নিশ্চয় সে মহান আল্লাহর ওপর ঈমান আনেনি এবং সে অভাবগ্রস্তকে আহার দানে উৎসাহিত করত না।” (সূরা আল-হাক্কাহ ৬৯:৩৩–৩৪)
এখানে “লা ইয়াহুদ্দু ‘আলা তা‘আমিল মিসকীন” (অভাবগ্রস্তকে আহার দানে উৎসাহিত করত না) বাক্যাংশটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আল্লাহ কেবল এই প্রশ্ন করবেন না যে, তুমি নিজে কতটুকু দান করেছিলে; বরং এটিও জিজ্ঞাসা করবেন যে, তুমি কি সমাজে দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোনো ভূমিকা রেখেছিলে? তুমি কি মানুষকে তাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলে? তুমি কি ক্ষুধার্ত, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলেছিলে?
এভাবে কুরআন সামাজিক উদাসীনতাকেও একটি গুরুতর নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ মানুষের দায়িত্ব শুধু নিজে অন্যায় না করা নয়; বরং সামর্থ্য অনুযায়ী কল্যাণকে উৎসাহিত করা এবং অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কিয়ামতের দিন তাই মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি তার সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবিক সংবেদনশীলতা এবং বঞ্চিত মানুষের প্রতি তার অবস্থান সম্পর্কেও জবাবদিহি করতে হবে।
22. বিভ্রান্তকারী উপাস্য ও অনুসারীদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ:
যারা ওহীর বিধান ত্যাগ করে অন্য শ ক্তি বা সত্তার উপাসনা করেছিল, আল্লাহ তাদের এবং তাদের তথাকথিত উপাস্যদের মুখোমুখি করে প্রশ্ন করবেন। সূরা আল-ফুরকানে বর্ণিত হয়েছে: “সেদিন তিনি তাদের এবং তারা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করতো তাদের একত্র করবেন এবং বলবেন—তোমরা কি আমার এই বান্দাদের পথভ্রষ্ট করেছিলে, নাকি তারা নিজেরাই পথ হারিয়েছিল?” (২৫:১৭)
এর উত্তরে সেই উপাস্যরা (বা ফেরেশতা/সৎ ব্যক্তিরা) বলবে: “তারা বলবে—আপনি পবিত্র!
আপনার পরিবর্তে আমরা অন্য কাউকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করা আমাদের জন্য শোভন ছিল
না; বরং আপনিই তাদের ও তাদের পিতৃপুরুষদের ভোগ-বিলাস দিয়েছিলেন, ফলে তারা ওহীর
স্মরণ (জিকির) ভুলে গিয়েছিল।” (২৫:১৮)
এখানে ‘নাসুজ জিকরা’ (স্মরণ বা ওহী ভুলে যাওয়া) শব্দসমষ্টি নির্দেশ করে যে, ওহী থেকে বিচ্ছিন্নতাই মানুষকে ভুল উপাস্য গ্রহণের দিকে ঠেলে দেয়।
23. আল্লাহর ‘শরীক’ ও মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা নিয়ে প্রশ্ন:
যারা দুনিয়াতে আল্লাহর বিধানের সমান্তরাল অন্য কোনো শক্তি, ব্যক্তি বা মতাদর্শকে স্থান দিয়েছিল, আল্লাহ তাদের কঠিন জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করবেন: “যেদিন তিনি তাদের ডেকে বলবেন—তোমরা যাদের আমার শরীক মনে করতে, তারা আজ কোথায়?” (২৮:৬২, ২৮:৭৪) এই প্রশ্নের মাধ্যমে আল্লাহ সু.তা. মানুষের মনগড়া বিশ্বাসের (ইফতিরা) অসারতা প্রমাণ করবেন। এর সমান্তরাল চিত্র পাওয়া যায় সূরা আশ-শু‘আরা-তে: “তাদের বলা হবে—তোমরা যাদের ইবাদত করতে তারা কোথায়? তারা কি তোমাদের সাহায্য করতে পারে অথবা তারা কি নিজেরা আত্মরক্ষা করতে সক্ষম?”24. সত্যবাদীদের সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন: এক আধ্যাত্মিক সূক্ষ্মতা:
25. নেতা ও অনুসারীদের মধ্যকার পারস্পরিক দোষারোপ ও আল্লাহর জেরা:
26. শয়তান ও তার অনুসারীদের মধ্যকার ‘মৌন প্রশ্ন’:
বিচারের দিন শয়তান যখন তার অনুসারীদের সামনে এক দীর্ঘ বক্তব্য দেবে (১৪:২২), তখন সেখানে একটি সূক্ষ্ম বিচারিক প্রশ্ন লুকিয়ে থাকবে। শয়তান বলবে—27. নেতৃত্ব ও আনুগত্যের ভিত্তি সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক প্রশ্ন:
বিচারের দিন মানুষ তার ভ্রান্ত অনুসরণের জন্য অজুহাত পেশ করতে চাইবে। আল্লাহ সেই ‘অজুহাত’ বা ‘তাকলীদ’ (অন্ধ অনুসরণ) সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন। সূরা আস-সাফফাতে এই দৃশ্যটি অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে বর্ণিত হয়েছে: “তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। অনুসারীরা বলবে—তোমরা তো আমাদের কাছে দক্ষিণ দিক থেকে (প্রবল প্রতাপে) আসতে। নেতারা বলবে—বরং তোমরা নিজেরাই তো মুমিন ছিলে না।” (৩৭:২৭-২৯) এখানে সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হলো—আল্লাহ প্রশ্ন করবেন, ওহীর ‘হাবলুল্লাহ’ বা রশি (৩:১০৩) থাকতে কেন তোমরা বিভ্রান্ত নেতাদের রশি ধরেছিলে? যারা ওহী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, তাদের অনুসরণ কেন তোমাদের কাছে ওহীর বাণীর চেয়ে বড় মনে হয়েছিল? ওহী বিমুখ নেতৃত্বের পেছনে ছোটা কোনোক্রমেই নাজাতের উসিলা হবে না।28. আত্ম-সাক্ষ্য ও অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন (Baseerah):
29. সময়ের নেয়ামত ও সুযোগের সদ্ব্যবহার সংক্রান্ত প্রশ্ন:
কিয়ামতের দিন জাহান্নামীরা যখন চিৎকার করে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসার সুযোগ চাইবে, তখন রব্বুল আলামিন তাদের একটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও অকাট্য প্রশ্ন করবেন:30. জ্ঞানের প্রয়োগ ও নিজের ওপর ওহীর বাস্তবায়ন সম্পর্কে প্রশ্ন:
যারা অন্যদের ভালো কথা বলতো কিন্তু নিজে ওহীর বিধান অনুসরণ করতো না, তাদের প্রতি আল্লাহর একটি তাত্ত্বিক ও বিদ্রুপাত্মক প্রশ্ন আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:31. সম্পদের উৎস ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা সংক্রান্ত প্রশ্ন:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষকে যে রিজিক দিয়েছেন, তা ব্যয়ের ক্ষেত্রে ওহীর নির্দেশ মানা হয়েছে কি না—সেটি হবে জিজ্ঞাসার অন্যতম বিষয়। আল্লাহ সু.তা. প্রশ্ন করবেন সেই সব নেয়ামত সম্পর্কে যা মানুষকে দেওয়া হয়েছিল (১০২:৮)। এর একটি প্রয়োগিক দিক হলো: “তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে—তারা কী ব্যয় করবে? বলো—যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত (আল-‘আফওয়া)।” (২:২১৯) কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রশ্ন করবেন—তোমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে সম্পদ ছিল, তা কি তুমি আল্লাহর নির্দেশিত পথে (অভাবগ্রস্ত ও আত্মীয়দের মাঝে) ব্যয় করেছিলে নাকি তা কুক্ষিগত করে রেখেছিলে? ওহীর এই ‘ইনফাক’ বা ব্যয়ের দর্শন পালন করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে কঠিন জেরা হবে।32. মিজান বা মানদণ্ড (দাঁড়িপাল্লা) : ওহী-ভিত্তিক কর্মের ওজন: ‘মিজান’ ও ‘হক’ (সত্য)-এর সমার্থকতা: সৃষ্টির আদি ভারসাম্য (মিজান) ও ওহীর সংযোগ:
আমরা জানি বিচারের দিন আমল ওজন করা হবে। কিন্তু ওহীর গভীরতর অনুধ্যানে দেখা যায়, এই ‘ওজন’ বা ‘মিজান’ মূলত আল-কুরআন নিজেই। “আল্লাহই সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছেন এবং মিজান (দাঁড়িপাল্লা) নাযিল করেছেন।” (৪২:১৭) “সেদিন আমল ওজন করা হবে সত্যের (হক) ভিত্তিতে।” (৭:৮) যৌক্তিক পূর্ণতা: ৪২:১৭ আয়াতে কিতাব ও মিজানকে একসাথে উল্লেখ করার অর্থ হলো—বিচারের দিন আপনাকে যে প্রশ্ন করা হবে, তার ‘স্কেল’ বা মাপকাঠি হবে ওহীর সেই সত্য। আপনার আমল যদি ওহীর সত্যের (হক) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবেই তা ওজনে ভারী হবে। নতুবা তা হবে ধূলিকণার মতো মূল্যহীন (১৮:১০৫)। এখানে ওজন করা হবে মূলত এটি যে—মানুষের আমলগুলো ওহীর সেই ‘হাক্ক’ বা সত্যের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ওহীর জ্ঞান ছাড়া যে আমল করা হয়েছে, তার কোনো ওজন আল্লাহর কাছে থাকবে না (১৮:১০৫)।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির সময় একটি ভারসাম্য (মিজান) স্থাপন করেছেন (৫৫:৭)। কিয়ামতের দিন এই মিজান বা দাঁড়িপাল্লা হবে মানুষের কাজের ওজনের মানদণ্ড। আল্লাহ বলেন: “সেদিন ওজন (আল-ওয়াযনু) হবে সত্যের (হাক্ক) ভিত্তিতে।” (৭:৮)
এখানে ‘হাক্ক’ বা সত্য হলো ওহী। ওহীর জ্ঞানের ভিত্তিতে মানুষের আমল যতটুকু ভারী হবে, ততটুকুই তার ওজন হবে। যার আমল ওহী-হীন বা ওহী-বিমুখ, তার পাল্লা সেদিন হালকা হয়ে যাবে (১০১:৮-৯)। সুতরাং, জিকির বা ওহীর চর্চা কেবল সওয়াব নয়, এটি কিয়ামতের সেই মহাতরাজুতে ওজনের একমাত্র ‘ঘনত্ব’ বা ‘ম্যাটার’।
‘ফাসল’ (বিভেদ) ও ওহীর মানদণ্ড (ফুরকান):
বিচারের দিনকে আল্লাহ বলেছেন ‘ইয়াওমুল ফাসল’ বা ফয়সালার দিন (৭৭:১৩)। এই ফয়সালা বা বিভাজন কীভাবে হবে? এর লিঙ্ক রয়েছে আল-কুরআনের অন্য এক নামে— ‘ফুরকান’ (যা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী)। “কতই না বরকতময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ‘ফুরকান’ নাযিল করেছেন যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে।” (২৫:১) যৌক্তিক পূর্ণতা: কিয়ামতের দিন আল্লাহ কোনো নতুন আইন দিয়ে বিচার করবেন না। ওহীর যে ‘ফুরকান’ বা পার্থক্যকারী মানদণ্ড দুনিয়াতে দেওয়া হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই মানুষকে দুই দলে (জান্নাতী ও জাহান্নামী) বিভক্ত করা হবে। যারা ওহীর ফুরকান মেনে নিজের জীবনকে সত্য ও মিথ্যা থেকে আলাদা করেছে, তাদের ‘ইয়াওমুল ফাসল’-এর বিচার হবে সহজ।
33. ‘কিতাব’ যখন জীবন্ত বক্তা: ‘বয়ান’ (প্রকাশ) ও আমলনামার কথা বলা ও ওহীর রেকর্ড:
আমরা মনে করি কিতাব বা আমলনামা কেবল একটি স্থির নথি। কিন্তু আল-কুরআনের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বলে, এই কিতাব সেদিন মানুষের সাথে কথোপকথন করবে। আল্লাহ বলেন:
“এটি আমার কিতাব, যা তোমাদের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলবে (ইয়ান্তিকু বিল হাক্ক)।” (৪৫:২৯)
আধ্যাত্মিক অনুধ্যান: দুনিয়াতে আল্লাহ মানুষকে ‘বয়ান’ বা মনের ভাব প্রকাশের শক্তি দিয়েছেন (৫৫:৪)। কিয়ামতের দিন সেই একই ‘বয়ান’ শক্তি মানুষের আমলনামাকে দেওয়া হবে। মানুষ যখন আল্লাহর প্রশ্নের মুখে নিজের দোষ অস্বীকার করবে, তখন ওহীর সত্যতায় লিপিবদ্ধ সেই আমলনামাটি জীবন্ত হয়ে মানুষের বিরুদ্ধে যুক্তি (Logic) দিয়ে কথা বলবে। এটিই হলো ‘বুরহান’ বা চূড়ান্ত প্রমাণের আধ্যাত্মিক সংযোগ।
এই আয়াতের সাথে ১০:৬১ আয়াতের (প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া) এক গভীর সংযোগ রয়েছে। আল্লাহ যখন প্রশ্ন করবেন, তখন আমলনামা কেবল তথ্য দেবে না, বরং ওহীর সত্যতার মানদণ্ডে মানুষের প্রতিটি কাজের ‘বয়ান’ বা ব্যাখ্যা প্রদান করবে। এটিই হলো বিচারের দিনের ‘স্বয়ংক্রিয় বিচারিক জবানবন্দি’।
34. দালিলিক প্রমাণ বা ‘বুরহান’ উপস্থাপনের দাবি: ও ওহী-ভিত্তিহীনতার বিচারিক সমাপ্তি:
বিচারের দিন আল্লাহ মানুষকে তাদের কর্মকাণ্ডের সপক্ষে প্রমাণ হাজির করতে বলবেন। এটি এক প্রকার বিচারিক চ্যালেঞ্জ। আল্লাহ বলেন:35. ‘রূহ’-এর প্রত্যাবর্তন ও ওহীর সংযোগের সমাপ্তি:
মানুষের ভেতরে যে রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়েছিল (১৫:২৯), কিয়ামতের দিন সেই রূহকে তার উৎসের কাছে ফিরে যেতে হবে। “যেদিন ‘রূহ’ ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে...” (৭৮:৩৮) “রূহ ও ফেরেশতাগণ তাঁর (আল্লাহর) দিকে আরোহণ করে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।” (৭০:৪) আধ্যাত্মিক পূর্ণতা: সৃষ্টির শুরুতে ওহীর রূহ (কুরআন) এবং মানুষের রূহ (আত্মা) একসাথে যাত্রা শুরু করেছিল। কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রশ্ন করবেন—রূহানি এই সফরে তোমাদের সাথে ওহীর ‘রূহ’-এর সম্পর্ক কেমন ছিল? যারা ওহী থেকে বিচ্ছিন্ন (৭:১৭৫) ছিল, তাদের রূহ সেদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সক্ষমতা হারাবে। এটিই হলো ওহীর সাথে মানুষের সম্পর্কের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক সমাপ্তি।36. আল-কুরআন পরিত্যাগের বিষয়ে রাসূল (সা.)-এর অভিযোগ:
বিচারের দিন সবচেয়ে প্রকম্পিত করার মতো একটি দৃশ্য হলো যখন স্বয়ং রাসূল (সালামুন আলাইহে) তাঁর উম্মতদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে একটি বিশেষ বিষয়ে নালিশ করবেন। আল্লাহ রব্বুল আলামিন সেই মুহূর্তটি বর্ণনা করেছেন:37. অপরাধের স্বীকৃতি ও ‘আকল’ বা বিবেকের অকার্যকারিতা:
38. নেককারদের হিসাব ও প্রশান্তি:
জিজ্ঞাসাবাদ সবার জন্য সমান হবে না। যাদের সাথে ওহীর সংযোগ ছিল, তাদের হিসাব হবে সহজ। আল্লাহ বলেন: “অতঃপর যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, অচিরেই তার হিসাব নেওয়া হবে সহজভাবে (হিসাবান ইয়াসীরা)।” (৮৪:৭-৮) এই ‘সহজ হিসাব’ হলো ওহীর সেই বরকত, যা মুমিনকে দুনিয়াতে সংশোধন হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল। এর বিপরীতে যারা ওহী থেকে বিচ্যুত (৭:১৭৫), তাদের হিসাব হবে অত্যন্ত জটিল ও কঠিন।
39. বিপরীতমুখী চিত্র: পাপিষ্ঠদের নিরুত্তর অবস্থা:
একদিকে যখন মুমিনদের সাথে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে দয়া ও ইনসাফ করা হবে, অন্যদিকে পাপিষ্ঠদের অবস্থা হবে ভিন্ন। আল্লাহ বলেন:40. মহাবিচার দিবসের অমোঘ প্রশ্নপত্র: ওহীর দর্পণে জীবন ও কর্মের বিচার:
সম্মানিত পাঠক! আল-কুরআন মাজীদের সুগভীর দালিলিক পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে আমরা একটি অখণ্ড ও সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হই। আল-কুরআনের এই অকাট্য প্রমাণসমূহ থেকে এটি স্পষ্ট যে—বিচারের দিন আল্লাহ রব্বুল আলামিনের প্রতিটি প্রশ্ন মূলত ওহীর সাথে মানুষের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই আবর্তিত হবে। প্রতিটি জিজ্ঞাসা হবে মানুষের ‘সচেতনতা’, ‘চিন্তাশক্তি’ ও ‘ওহীর আনুগত্য’-কে কেন্দ্র করে।সূক্ষ্ম ও আধ্যাত্মিক সংযোগ: (Metaphysical Connection):
আল-কুরআনের আয়াতসমূহ পারস্পরিক সংযুক্ত করলে দেখা যায় যে, কিয়ামতের দিনের প্রতিটি প্রশ্নই মূলত ‘ইলম’ (জ্ঞান) এবং ‘আমাল’ (কাজ)-এর মধ্যকার দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে হবে।41. অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে নিষেধ করা হয়েছে, কিন্তু কেন?
এই আয়াতে ওহী বা আয়াত নাযিল হওয়ার সময় অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ নাযিলকৃত বিধানের প্রতিটি বিষয়ের দায় মানুষের ওপর চলে আসে।
"...আর কুরআন নাযিল হওয়ার সময়ে যদি তোমরা সেসব বিষয়ে প্রশ্ন করো, তবে তা তোমাদের কাছে প্রকাশ করা হবে (যা তোমাদের জন্য কষ্টকর হবে)..." সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: 5:101, (17:82)।
এই চ্যানেলে প্রকাশিত অডিও ও ভিডিওসমূহ মূলত ইউটিউব কিংবা অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহকৃত বা ধার করা উপকরণ। এগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই কন্টেন্টের মাধ্যমে আপনাদের মাঝে শেয়ার করা হচ্ছে।
