বিচারের দিনে কী কী প্রশ্ন করা হবে? #Questions on the Day of Judgment?

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনিবার্য ‘বিরতি’ (Halt):

কিয়ামতের দিন হিসাব শুরু হওয়ার আগে এক বিশেষ মুহূর্ত আসবে যখন সকল মানুষকে থামিয়ে দেওয়া হবে। আল্লাহ সু.তা. ফেরেশতাদের নির্দেশ দেবেন: “এবং তাদের থামাও (ওয়াক্বিফূহুম), নিশ্চয়ই তারা জিজ্ঞাসিত হবে (ইন্নাহুম মাস-ঊলূন)।” (৩৭:২৪)

এই আয়াতের বিন্যাসটি লক্ষ্য করুন— ‘ওয়াক্বিফূহুম’ (তাদের দাঁড় করাও বা থামাও) এবং ‘মাস-ঊলূন’ (তারা জিজ্ঞাসিত হবে)। এটি এক প্রকার ‘অডিট’ বা হিসাব নিকাশের প্রারম্ভিক ঘোষণা। এখানে ওহীর সাথে সংযোগ হলো—দুনিয়াতে যারা আল্লাহর নির্দেশের সামনে থমকে দাঁড়ায়নি (ওহী মানেনি), সেদিন আল্লাহর নির্দেশে তাদের হিসাব দেওয়ার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে থামতে হবে।


1. ওহীর কিতাব আল-কুরআন মাজীদ সম্পর্কে বিশেষ জিজ্ঞাসা (হিসাবের মূল মানদণ্ড):

কিয়ামতের দিন মানুষের জবাবদিহিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হবে আল্লাহর নাযিলকৃত ওহী—আল-কুরআন মাজীদ। মানুষের কাছে পৌঁছানো আল্লাহর হিদায়াত, জ্ঞান ও নির্দেশনার প্রতি তার অবস্থানই হবে হিসাবের একটি মৌলিক মানদণ্ড। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পূর্বেই সতর্ক করে বলেছেন—

অতএব তোমার প্রতি যা ওহী করা হয়েছে, তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো। নিশ্চয় তুমি সরল ও সুদৃঢ় পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছ। আর নিশ্চয় এই (কুরআন) তোমার ও তোমার জাতির জন্য এক মহাস্মারক; এবং অচিরেই তোমাদেরকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”-সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৪৩–৪৪ (২৫:৩০, ৫০:৪৫, ২৮:৮৫)

এখানে ‘যিকর’ শব্দটি আল-কুরআনের অন্যতম নাম। এর অর্থ স্মারক, উপদেশ, নসীহত, সম্মান ও মর্যাদার উৎস। লক্ষণীয় যে, কুরআনকে ‘যিকর’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরপরই আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-

“তোমাদেরকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে”। 

অর্থাৎ কিয়ামতের দিন মানুষের নিকট কেবল তার আমল নয়, তার কাছে পৌঁছানো ওহীর প্রতি তার আচরণ সম্পর্কেও জবাবদিহি চাওয়া হবে।

প্রশ্ন হতে পারে—তোমরা এই কিতাব কতটুকু পাঠ করেছিলে? এর অর্থ ও বার্তা কতটুকু অনুধাবন করার চেষ্টা করেছিলে? এর নির্দেশনা কতটুকু জীবনে বাস্তবায়ন করেছিলে? আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এই হিদায়াতের রশিকে কতটুকু দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছিলে? নাকি একে অবহেলা, বিস্মৃতি ও উপেক্ষার মধ্যে ফেলে রেখেছিলে?

আল-কুরআনের সাথে সংযোগহীনতাকে কুরআন নিজেই এক ধরনের ‘বিস্মৃতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আল্লাহ বলেন: 

এভাবেই আজ তুমি বিস্মৃত হবে, যেমন তুমি আমার আয়াতসমূহকে বিস্মৃত হয়েছিলে।” (সূরা ত্বা-হা ২০:১২৬)

অতএব, কুরআন শুধু তিলাওয়াতের কিতাব নয়; এটি এমন এক ঐশী আমানত, যার জ্ঞান, নির্দেশনা ও দাবির ব্যাপারে প্রত্যেক মানুষকে একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে জবাব দিতে হবে। মানুষের ঈমান, চিন্তা, চরিত্র ও কর্ম কতটুকু কুরআনের আলো দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল—সেটিও হবে সেই মহা জিজ্ঞাসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

2. কাঠগড়ায় সরাসরি আল কুরআনের আয়াত অগ্রাহ্যকারীদেরকে প্রশ্ন করা হবে আয়াত সম্পর্কে-

তোমাদের নিকট কি আমার আয়াত সমূহ পাঠ করে করা হতো না? আয়াত প্রমাণ -২৩:১০৫-১০৬, 39:71, 6:130, ২৩:৬৬, ৪৫:৩১, ৪৫:৮-১১

সূরা আল-মুমিনুন (২৩:১০৫): তোমাদের সামনে কি আমার আয়াতসমূহ (آيَاتِي) পঠিত হতো না? তখন তোমরা সেগুলোকে মিথ্যা বলতে"। (একই প্রসঙ্গে ২৩:৬৬ আয়াতেও বলা হয়েছে-

আমার আয়াতসমূহ তোমাদের কাছে শোনানো হতো, কিন্তু তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিতে, তারা বলবে- হে আমাদের রব! আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের ওপর বিজয়ী হয়েছে। আর আমরা ছিলাম এক ভ্রষ্ট  জনগোষ্ঠী (ক্বওমাদ-দল্লিন) -23:106)।

সূরা আয-যুমার (৩৯:৭১): জাহান্নামের রক্ষীরা কাফিরদের (আয়াত অস্বীকারকারী বা প্রত্যক্ষানকারী) জিজ্ঞেস করবে-

তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে রসূলগণ আসেনি, যারা তোমাদের কাছে তোমাদের রবের আয়াতসমূহ পড়ে শোনাতেন? এবং তোমাদেরকে তোমাদের এই দিনের সাক্ষাত সম্পর্কে সতর্ক করত? তারা বলবে, হ্যাঁ অবশ্যই। 

সূরা আল-জাসিয়াহ (৪৫:৩১): আর যারা কুফরি করেছে (তাদের বলা হবে), তোমাদের কাছে কি আমার আয়াতসমূহ (آيَاتِي) পাঠ করা হয়নি? কিন্তু তোমরা অহংকার করেছিলে। 
(একই সূরার ৪৫:৩৫ আয়াতে বলা হয়েছে, এটি এজন্য যে তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে উপহাস করেছিলে)।
যেন তারা ওযর দেখাতে না পারে:
অন্য আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, আল্লাহ কিতাব ও আয়াত নাযিল করে মানুষকে সতর্ক করেছেন, যেন কিয়ামতে কেউ বলতে না পারে— আমাদের কাছে কোনো আয়াত আসেনি:
➢ সূরা আল-কাসাস (২৮:৪৭): মানুষ যেন মুসিবতে পড়ে বলতে না পারে— হে আমাদের রব! আপনি কেন আমাদের কাছে কোনো রাসূল পাঠালেন না, তাহলে আমরা আপনার আয়াতসমূহের (آيَاتِكَ) অনুসরণ করতাম...। 

➢ সূরা ফাতির (৩৫:৩৭): 

আর তারা সেখানে আর্তনাদ করবে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে বের করুন, আমরা যা করতাম সেসব বাদ দিয়ে আমরা আমলে সলেহ করব। আমরা কি তোমাদেরকে এমন আয়ু দিইনি, তার মধ্যে যে শিক্ষা গ্রহণ করবে সে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে? এবং তোমাদের কাছে সতর্ককারীও (নাযির) এসেছিল। সুতরাং তোমরা স্বাদ গ্রহণ করো। আর জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই । 

➢ সূরা আল-আনআম (৬:২৭): 
জাহান্নামের কিনারায় দাঁড়িয়ে পাপীরা আফসোস করে বলবে— হায়! যদি আমাদের আবার দুনিয়ায় পাঠানো হতো, তবে আমরা আমাদের রবের আয়াতসমূহকে (بِآيَاتِ رَبِّنَا) মিথ্যা প্রতিপন্ন করতাম না।

➢ সূরা আশ-শু‘আরা ২৬:১০২:
হায়! যদি আমাদের একবার ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকত, তাহলে আমরা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম!

সূরা আস-সাজদাহ ৩২:১২
হে আমাদের রব! আমরা দেখেছি এবং শুনেছি; অতএব আমাদেরকে ফিরিয়ে দিন, আমরা সৎকর্ম করব; নিশ্চয়ই আমরা দৃঢ়বিশ্বাসী।

সূরা ইবরাহীম ১৪:৪৪
رَبَّنَا أَخِّرْنَا إِلَىٰ أَجَلٍ قَرِيبٍ نُجِبْ دَعْوَتَكَ وَنَتَّبِعِ الرُّسُلَ
হে আমাদের রব! আমাদেরকে অল্প সময়ের জন্য অবকাশ দিন; আমরা আপনার আহ্বানে সাড়া দেব এবং রাসূলদের অনুসরণ করব।

কিন্তু জবাব হবে:
তোমরা কি পূর্বে শপথ করে বলোনি যে, তোমাদের কোনো পতন/অবসান হবে না?

সূরা আল-মু’মিন ৪০:১০–১১

তারা বলবে:
رَبَّنَا أَمَتَّنَا اثْنَتَيْنِ وَأَحْيَيْتَنَا اثْنَتَيْنِ فَاعْتَرَفْنَا بِذُنُوبِنَا فَهَلْ إِلَىٰ خُرُوجٍ مِّن سَبِيلٍ

হে আমাদের রব! আপনি আমাদের দুবার মৃত্যু দিয়েছেন এবং দুবার জীবন দিয়েছেন। আমরা আমাদের পাপ স্বীকার করেছি। অতএব বের হওয়ার কোনো পথ কি আছে?

সূরা গাফির (আল-মু’মিন) ৪০:৪৯-৫০:

وَقَالَ الَّذِينَ فِي النَّارِ لِخَزَنَةِ جَهَنَّمَ ادْعُوا رَبَّكُمْ يُخَفِّفْ عَنَّا يَوْمًا مِّنَ الْعَذَابِ
যারা জাহান্নামে থাকবে তারা জাহান্নামের প্রহরীদের বলবে-
তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো, যেন তিনি আমাদের থেকে এক দিনের জন্য শাস্তি কিছুটা লাঘব করেন। -সূরা গাফির ৪০:৪৯

এর পরের আয়াত ৪০:৫০-এ প্রহরীরা বলবে:

أَوَلَمْ تَكُ تَأْتِيكُمْ رُسُلُكُم بِالْبَيِّنَاتِ
তোমাদের কাছে কি তোমাদের রাসূলগণ সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আসেননি?

তারা বলবে: 
بَلَىٰ

“অবশ্যই এসেছিল।”

তখন বলা হবে:

فَادْعُوا

“তোমরাই ডাকো।”

3. ওহীর আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যানের কারণ নিয়ে প্রশ্ন:

যারা ওহীর বিধান বা আল্লাহর নিদর্শনসমূহ নিয়ে অবজ্ঞা করেছে, আল্লাহ তাদের সরাসরি অভিযুক্ত করে প্রশ্ন করবেন। আল্লাহ বলেন:

যখন তারা আসবে, তখন আল্লাহ বলবেন-

তোমরা কি আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলেছিলে অথচ তোমরা তা জ্ঞানের (ইলম) দ্বারা আয়ত্ত করোনি? নাকি তোমরা কী করছিলে? (২৭:৮৪)

এই আয়াতের অভ্যন্তরীণ ইঙ্গিতটি অত্যন্ত শক্তিশালী। আল্লাহ প্রশ্ন করবেন—

ওহীর জ্ঞান বা ইলম পূর্ণাঙ্গভাবে হাসিল না করেই তোমরা কেন তা প্রত্যাখ্যান করেছিলে? অর্থাৎ, না জেনে বা না বুঝে আল্লাহর কালাম সম্পর্কে মন্তব্য করা বা তা অস্বীকার করা কিয়ামতের দিন এক ভয়ংকর প্রশ্নের কারণ হবে। ওহীর চর্চা বা অনুশীলনীতে না থাকার পরিণতিই হলো এই অপমানজনক জিজ্ঞাসা।

4. ওহীর বার্তার সত্যতা ও সতর্ককারী আগমন সংক্রান্ত প্রশ্ন:

জাহান্নামীদের যখন সেখানে প্রবেশ করানো হবে, তখন তাদের প্রতি প্রথম প্রশ্নটি হবে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। আল্লাহ সু.তা. সেই প্রশ্নটি ফেরেশতাদের মাধ্যমে করাবেন:
তোমাদের কাছে কি কোনো সতর্ককারী (নাযীর) আসেনি?” (৬৭:৮, ৩৯:৭১)
হে জিন ও মানব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্য থেকে কি তোমাদের কাছে রসূলগণ আসেনি, যারা তোমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ বর্ণনা করতো এবং তোমাদের এই দিনের মুখোমুখি হওয়া সম্পর্কে সতর্ক করতো?” (৬:১৩০)

জাহান্নামের দায়িত্বে নিয়োজিত মালাইকাগণের সাথে জাহান্নামীদের যে সংলাপ হয়:

তোমাদের কাছে কি তোমাদের রাসূলগণ সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ আসেননি? তারা বলবে অবশ্যই! (৪০:৫০)

এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ রব্বুল আলামিন এটিই প্রমাণ করবেন যে, তিনি কাউকে পথপ্রদর্শন না করে বা ওহীর মাধ্যমে সতর্ক না করে শাস্তি দেন না (১৭:১৫)।

5. নেয়ামত ও প্রাচুর্যের দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত প্রশ্ন:

প্রশ্ন করা হবে নিয়ামত, রিজিক, প্রাচুর্য ও সম্পদ সম্পর্কে। যেমন ভোগ বিলাসপূর্ণ জীবন ধারণ, গল্পগুজব, বিওবান-সম্পদশালীরা আল্লাহর আয়াতের প্রতি অহংকার, এবং আল্লাহর বানী নিয়ে চিন্তা ভাবনা না করার বিষয়ে। -১০২:১-৮-

দুনিয়াতে আল্লাহ মানুষকে যেসব নেয়ামত দান করেছেন—জীবন, সময়, মেধা, সম্পদ, স্বাস্থ্য, ক্ষমতা, জ্ঞান ও হিদায়াত—সেসবের ব্যবহার সম্পর্কে আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন:

“অতঃপর অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে নেয়ামতসমূহ (নাঈম) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (১০২:৮)

গভীর অনুধাবন: 

আল কুরআনের আলোকে “নাঈম” কোনো একটি নির্দিষ্ট ভোগ্যবস্তু নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া সকল অনুগ্রহ, সামর্থ্য, সুযোগ ও উপকরণের সমষ্টিগত ধারণা। আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি ও পরীক্ষার জন্য স্থাপন করেছেন:

“অতঃপর তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন, যাতে তিনি দেখেন তোমরা কীভাবে কাজ কর।” (১০:১৪)

এবং

“তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন—কে কর্মে উত্তম।” (৬৭:২)

তাই মানুষের হাতে অর্পিত প্রতিটি নেয়ামত জবাবদিহির আওতাভুক্ত।

কুরআনের আলোকে ‘নাঈম’-এর প্রধান ক্ষেত্রসমূহ:

১. জীবন ও সময়: “তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন।” (৬৭:২)

২. শ্রবণ, দৃষ্টি ও হৃদয়: “নিশ্চয়ই শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয়—এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (১৭:৩৬) এটি জবাবদিহির সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ঘোষণাগুলোর একটি।

৩. জ্ঞান ও মেধা: “আল্লাহ তোমাদেরকে মাতৃগর্ভ থেকে বের করেছেন, যখন তোমরা কিছুই জানতে না; এবং তিনি তোমাদের জন্য শ্রবণ, দৃষ্টি ও হৃদয় সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।” (১৬:৭৮)

৪. স্বাস্থ্য ও শারীরিক সামর্থ্য: “তিনি তোমাদের আকৃতি দিয়েছেন এবং তোমাদের আকৃতি সুন্দর করেছেন।” (৪০:৬৪)। 

“আমি কি তাকে দুই চোখ, একটি জিহ্বা এবং দুই ঠোঁট দিইনি?” (৯০:৮–৯)

৫. সম্পদ, রিযিক ও পৃথিবীর উপকরণ:

“তিনিই পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।” (২:২৯)

হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে, তা থেকে আহার কর। (২:১৬৮)

“আল্লাহ তোমাদেরকে যে রিযিক দিয়েছেন, তা থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার কর।” (৫:৮৮)

“তিনি তোমাদেরকে জমিনে প্রতিনিধিত্বশীল করেছেন... যাতে তিনি পরীক্ষা করেন যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার ব্যাপারে।” (৬:১৬৫)

এখানে সম্পদ, ভোগ্যসামগ্রী, ক্ষমতা ও সামাজিক অবস্থান—সবকিছুকে পরীক্ষার উপকরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

৬. পৃথিবীর সুযোগ-সুবিধা ও নিয়ামত: 

“তিনি আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে, সবকিছুকে তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন।” (৪৫:১৩)

৭. হিদায়াত, ওহী ও আল্লাহর বাণী: 

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত পূর্ণ করলাম।” (৫:৩)

“নিশ্চয়ই এই (কুরআন) তোমার ও তোমার জাতির জন্য এক মহাস্মরণিকা; আর অচিরেই তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (৪৩:৪৪)

“অতএব যাদের কাছে রাসূল পাঠানো হয়েছিল, আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞাসা করব।” (৭:৬)

8. ওহীর জ্ঞান: সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত:

6. নেয়ামত ও ওহীর জ্ঞানের ‘শুকরিয়া’ সংক্রান্ত প্রশ্ন:

আমরা ইতিপূর্বে ১০২:৮ আয়াতের ‘নাঈম’ বা নেয়ামত সম্পর্কে জেনেছি। এর আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় নেয়ামত হলো আল-কুরআন। আল্লাহ সু.তা. প্রশ্ন করবেন—আমি তোমাদের যে কিতাব বা জিকির (তথা আল কুরআন) দিয়েছিলাম (৪৩:৪৪), তার শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা তোমরা কীভাবে আদায় করেছ? নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা হলো তার ‘অনুশীলন’ বা ‘চর্চা’। যারা ওহীর চর্চা ছেড়ে দিয়েছে, তারা আসলে এই পরম নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা (কুফরান) করেছে, যা বিচারের দিনে কঠিন প্রশ্নের কারণ হবে।

কুরআনের সামগ্রিক বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সকল পার্থিব নেয়ামতের চেয়েও বড় নেয়ামত হলো আল্লাহর হিদায়াত ও ওহী। কারণ সম্পদ, স্বাস্থ্য বা ক্ষমতা মানুষকে কেবল দুনিয়ার সুযোগ দেয়; কিন্তু ওহী তাকে সত্যের পথ দেখায়। সেজন্য কুরআন ঘোষণা করে:

“নিশ্চয়ই এই (জিকির তথা আল কুরআন) সম্পর্কে তোমাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে।” (৪৩:৪৪)

এবং

“যাদের কাছে রাসূল পাঠানো হয়েছিল, আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞাসা করব।” (৭:৬)

অতএব আল্লাহ প্রশ্ন করবেন—তোমার কাছে সত্য পৌঁছানোর পর তুমি তার প্রতি কী অবস্থান নিয়েছিলে? তুমি কি আল্লাহর আয়াত দ্বারা পথনির্দেশ গ্রহণ করেছিলে, নাকি তা উপেক্ষা করেছিলে?

আর যে ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার সম্পর্কে বলা হয়েছে:

“তার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, কিন্তু সে সেগুলো উপেক্ষা করেছিল।” (২০:১২৬)

অতএব সূরা আত-তাকাসুর (১০২:৮)-এর “নাঈম” শব্দের সর্বোচ্চ ও গভীরতম স্তরে রয়েছে ওহী, হিদায়াত এবং সত্যের জ্ঞান। কারণ অন্যান্য সব নেয়ামতের সঠিক ব্যবহার নির্ভর করে মানুষ ওহীর আলো গ্রহণ করেছে কি না তার উপর। তাই কিয়ামতের দিনের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন হবে—আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান, হিদায়াত ও সুযোগকে মানুষ কী কাজে ব্যবহার করেছিল।

7. প্রশ্ন করা হবে সম্পদ ও মিথ্যা উদ্ভাবন সম্পর্কে:

আল্লাহ নিজেই নিজের শপথ করে বললেন যে, তাদেরকে অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে। সূরা নাহল: ১৬:৫৬ (2:79, 16:116)

8. কান, চোখ ও হৃদয় (ইন্দ্রিয়সমূহের গূঢ় জবাবদিহিতা):

মানুষকে আল্লাহ যে শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা দিয়েছিলেন, তার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

“নিশ্চয়ই কান (সামা‘আ), চোখ (বাসারা) এবং হৃদয় (ফুয়াদ)—এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে (কানা আনহু মাস-ঊলা)।” -১৭:৩৬ (41:20-23, 16:116))

এই জিজ্ঞাসার তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো—মানুষ কি ওহীর বাণী শোনার জন্য তার কান ব্যবহার করেছিল? সে কি আল্লাহর নিদর্শনসমূহ দেখার জন্য তার চোখকে সজাগ রেখেছিল? এবং তার হৃদয় কি ওহীর ‘রূহ’ বা নূরকে ধারণ করেছিল? এই তিনটি ইন্দ্রিয় হলো ওহীর সংযোগের প্রবেশদ্বার। এগুলো যদি ওহী অনুশীলনে ব্যবহৃত না হয়ে প্রবৃত্তির অনুসরণে ব্যবহৃত হয়, তবে ১৭:৩৬ আয়াত অনুযায়ী প্রতিটি স্নায়ু সেদিন আল্লাহর সামনে জওয়াবদিহি করতে বাধ্য হবে।

এর সমান্তরাল আয়াত হিসেবে আমরা সূরা আত-তাকাসুর-কে দেখতে পারি:

“অতঃপর অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে নেয়ামত (নাঈম) সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।” (১০২:৮)
এখানে ‘নাঈম’ বা নেয়ামতের অন্তর্ভুক্ত হলো ওহীর জ্ঞান, জীবন, সময় এবং সুস্থতা। এই নেয়ামতগুলো মানুষ আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া পথে ব্যয় করেছে নাকি প্রবৃত্তির অনুসরণে—সেটিই হবে জিজ্ঞাসার বিষয়।

9. অঙ্গীকার ও চুক্তির বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে প্রশ্ন:

মানুষ দুনিয়াতে একে অপরের সাথে এবং আল্লাহর সাথে যেসব অঙ্গীকার (আহদ) বা চুক্তি করে, সে বিষয়ে আল্লাহ রব্বুল আলামিন সরাসরি প্রশ্ন করবেন। আল্লাহ বলেন:

“আর তোমরা অঙ্গীকার (আহদ) পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে (ইন্নাল ‘আহদা কানা মাস-ঊলা)।” (১৭:৩৪)

অন্যত্র উহুদ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওহীর বর্ণনায় এসেছে:

অবশ্যই আল্লাহর সাথে তাদের অঙ্গীকার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। (৩৩:১৫)

এখানে ‘আহদ’ বা অঙ্গীকার শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক। এটি যেমন মানুষের সাথে মানুষের লেনদেনের চুক্তিকে বুঝায়, তেমনি সৃষ্টির আদি লগ্নে আল্লাহর সাথে কৃত ‘আলাসতু বি-রাব্বিকুম’ (৭:১৭২) চুক্তির বাস্তবায়নের বিষয়েও ইঙ্গিত দেয়। ওহীর নির্দেশিত এই ন্যায়নিষ্ঠতা রক্ষা করা হয়েছে কি না, তা হবে জিজ্ঞাসার কেন্দ্রবিন্দু।

10. আমল বা কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে:

তোমরা পৃথিবীতে কী কী কাজ (আমল) করেছিলে? তোমাদের আমলনামায় যা লিপিবদ্ধ আছে, তা কি সত্য নয়? তোমরা যে কাজগুলো করেছিলে, সেগুলোর জবাব কী? আয়াত ১৫:৯২-৯৩, ১৬:৯৩, ৪৫:২৯, ৩৬:৬৫, ৯৯:৭-৮

আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কর্মের বিষয়েও পূর্ণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

আর অবশ্যই তোমাদেরকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে (লা-তুসআলুন্না) যা তোমরা করতে (আমল  করতে) -১৬:৯

অনুধাবন: তবে কুরআনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আমল সম্পর্কে প্রশ্নও শেষ পর্যন্ত ওহী ও আল্লাহর নির্দেশনার আলোকে করা হবে—অর্থাৎ শুধু "কি করেছ?" নয়, বরং "আল্লাহর আয়াত ও রাসূলের দাওয়াত পাওয়ার পর কী করেছ?" সেটিই মূল বিচার্য বিষয়।

11. আত্ম-জিজ্ঞাসাবাদ: যখন আমলনামাই হবে প্রশ্নকর্তা:

বিচার দিবসে আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষের সামনে এমন এক কিতাব (আমলনামা) পেশ করবেন, যা কোনো কিছুই বাদ দেয়নি। সেখানে বাহ্যিক কোনো প্রশ্নকারীর চেয়েও বড় প্রশ্ন হবে সেই কিতাবটি নিজে। আল্লাহ সু.তা. বলবেন:

“পড়ো তোমার কিতাব (আমলনামা)! আজ তোমার নিজের হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।” (১৭:১৪)

এই আয়াতের সূক্ষ্ম দিক হলো—মানুষের প্রতিটি কাজ ওহীর সেই ‘রক্ষণাবেক্ষণকারী’ ফেরেস্তাদের মাধ্যমে রেকর্ড করা হয়েছে। ১০:৬১ আয়াতের সেই ‘চাক্ষুষ সাক্ষী’ বা ‘প্রত্যক্ষদর্শী’ আল্লাহ আজ মানুষের নিজের বিবেককেই বিচারকের আসনে বসিয়ে দেবেন। এটি এক প্রকার ‘অস্তিত্বগত প্রশ্ন’, যেখানে মানুষ নিজের কৃতকর্মের দর্পণে নিজেই নিজেকে অপরাধী বা সফল হিসেবে দেখতে পাবে।

12. সার্বজনীন জিজ্ঞাসাবাদ: সবাইকে হিসাব দিতে হবে- কোনো ব্যক্তিই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়:

অতএব, তোমার রবের শপথ! অবশ্যই আমরা তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসা করব; সে সম্পর্কে তারা যা করত (লা- নাসআলান্নাহুম আজমাঈন)- আয়াত ১৫:৯২-৯৩

অধিকন্তু মানুষ তার নিজের সম্পর্কে চক্ষুষ্মান (বাসীরাহ)। আর যদিও সে তার অজুহাত উপস্থাপন করে-৭৫:১৪-১৫

আল্লাহ রব্বুল আলামিন কিয়ামতের দিনের বিচারিক প্রক্রিয়াকে এতটাই ব্যাপক করেছেন যে, কোনো মানুষই সেই জিজ্ঞাসাবাদ থেকে রেহাই পাবে না। আল্লাহ সু.তা. তাঁর নিজের সত্তার কসম খেয়ে বলছেন:

এই আয়াতের ‘আজমাঈন’ (সকলে) শব্দটি নির্দেশ করে যে—শাসক-শাসিত, ধনী-দরিদ্র, এমনকি যারা নিজেদেরকে খুব ধার্মিক মনে করতো, তারা প্রত্যেকেই তাদের প্রতিটি কাজের যৌক্তিকতা ও ওহী-ভিত্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। এটি কেবল একটি সাধারণ প্রশ্ন নয়, বরং ওহীর দর্পণে আমলনামার চুলচেরা বিশ্লেষণ।

 (যদিও কুরআনের অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে, “সেদিন কোনো মানুষ বা জিনকে তার পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে না” (৫৫:৩৯),

এই জবাবদিহির গভীরতা আরও স্পষ্ট হয় যখন আল্লাহ বলেন—

“পড়ো তোমার আমলনামা! আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।” (সূরা আল-ইসরা ১৭:১৪)

এখানে মানুষকে তার নিজের জীবন-রেকর্ডের মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে। কোনো অস্বীকার, কোনো গোপনতা কিংবা কোনো অজুহাত তখন কার্যকর হবে না। ওহীর মানদণ্ডে লিপিবদ্ধ কর্মসমূহের আলোকে মানুষ নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। এটি এমন এক আত্ম-জবাবদিহির মুহূর্ত, যেখানে মানুষের অস্তিত্ব, বিশ্বাস, চিন্তা ও কর্ম—সবকিছুই তার সামনে উন্মোচিত হয়ে যাবে।

অতএব, কিয়ামতের প্রশ্ন কেবল বড় বড় অপরাধ বা উল্লেখযোগ্য কাজকে ঘিরে নয়; বরং মানুষের জীবনের প্রতিটি সচেতন কর্ম, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি নৈতিক অবস্থানের সঙ্গেই জড়িত। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে—যে অণু পরিমাণ সৎকর্ম বা অসৎকর্ম করবে, সে তা প্রত্যক্ষ করবে (৯৯:৭–৮)।

13. রসূলগণের প্রতি উম্মতদের আচরণ সংক্রান্ত প্রশ্ন:

আল্লাহ সু.তা. কেবল সাধারণ মানুষকে নয়, বরং রসূলগণকেও তাঁদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সমবেত অবস্থায় প্রশ্ন করবেন। আল্লাহ বলেন:

“যেদিন আল্লাহ রসূলগণকে সমবেত করবেন এবং বলবেন—তোমাদের কী উত্তর দেওয়া হয়েছিল (মাযা উজিবতুম)? তাঁরা বলবেন—আমরা তো কিছুই জানি না, নিশ্চয় আপনিই গায়বের সকল বিষয়ে পরিজ্ঞাত।” (৫:১০৯) এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় অনুধাবনযোগ্য: রসূলগণ (সালামুন আলাল মুরসালিন) তাঁদের বিনয় ও আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধায় এমন উত্তর দেবেন। কিন্তু এই প্রশ্নের মাধ্যমে মূলত উম্মতদের সেই সব বিচ্যুতিকে সামনে আনা হবে, যা তারা রসূলগণের আনীত ওহীর বিপরীতে নিজেদের মনগড়া মতাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিল।


14. রসূলগণের দাওয়াত ও মানুষের সাড়া সংক্রান্ত প্রশ্ন:

কিয়ামতের দিন আল্লাহ রব্বুল আলামিন কেবল সাধারণ মানুষকে নয়, বরং যাদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছিল এবং যারা ওহী নিয়ে এসেছিলেন—উভয় পক্ষকেই প্রশ্ন করবেন। আল্লাহ সু.তা. বলেন:

অতঃপর যাদের কাছে রসূল পাঠানো হয়েছিল আমি অবশ্যই তাদের প্রশ্ন করবো এবং আমি অবশ্যই রসূলগণকেও প্রশ্ন করবো। (৭:৬)
এই আয়াতের একটি বিস্তারিত রূপ আমরা পাই সূরা আল-কাসাস-এ, যেখানে নির্দিষ্ট প্রশ্নের শব্দমালা উদ্ধৃত করা হয়েছে:
“সেদিন তিনি তাদের ডেকে বলবেন—তোমরা রসূলগণকে কী উত্তর দিয়েছিলে?” (২৮:৬৫)

[যারা বর্তমানে রাসুলকে রেখে যাওয়া কিতাব "কুরআনকে বুঝে বুঝে পড়ে না, বুজে না, সে মুলত কুরআন প্রত্যাখ্যান করলো এবং সে রাসুলকে ও প্রত্যাখ্যান করে রাসূলগণকে না জবাবই দিয়ে দিলো।সূরা ক্বাছাছ: 28:65

অর্থাৎ, ওহীর বার্তা শোনার পর মানুষের প্রতিক্রিয়া ও আচরণ কী ছিল—সেটিই হবে বিচারের মূল ভিত্তি। আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন, ওহীর সেই ‘রূহ’ বা নূর যখন তাদের কাছে পৌঁছেছিল, তখন তারা কি তার আনুগত্য করেছিল নাকি তাকে অস্বীকার করেছিল?

15. রসূলগণের সাক্ষ্য ও উম্মতদের প্রতি প্রশ্ন:

কিয়ামতের দিন কেবল সাধারণ মানুষের জবানবন্দি নেওয়া হবে না, বরং প্রতিটি জাতির রসূলকে উপস্থিত করা হবে তাদের বিরুদ্ধে ‘সাক্ষী’ হিসেবে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন এই গম্ভীর দৃশ্যটি বর্ণনা করেছেন:

অতঃপর তখন কেমন হবে, যখন আমি প্রত্যেক জাতি থেকে একজন সাক্ষী (শাহীদ) উপস্থিত করবো এবং তোমাকে (হে মুহাম্মদ!) তাদের ওপর সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করবো?” (৪:৪১) এই আয়াতের অভ্যন্তরীণ ইঙ্গিত হলো—আল্লাহ রসূলগণকে জিজ্ঞাসা করবেন, তোমরা কি আমার বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলে? এবং উম্মতদের জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমাদের কাছে যখন ওহীর নূর নিয়ে সাক্ষী উপস্থিত হয়েছিল, তখন তোমরা কেন তা গ্রহণ করোনি? এটি একটি বিচারিক প্রশ্নোত্তর (Cross-examination) যেখানে রসূলগণের ওহী-ই হবে সত্য ও মিথ্যার মানদণ্ড।

16. ওহীর জ্ঞান গোপন করা বা বিকৃত করা সংক্রান্ত প্রশ্ন:

যারা কিতাবের জ্ঞান রাখা সত্ত্বেও তা মানুষের কাছে গোপন করেছে বা বৈষয়িক স্বার্থে বিকৃত করেছে, তাদের প্রতি আল্লাহর বিচার হবে অত্যন্ত কঠোর। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

“নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর নাযিল করা কিতাবের অংশ গোপন করে এবং বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করে... কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না (লা ইউকাল্লিমুহুমুল্লাহ)।” (২:১৭৪) এখানে ‘কথা না বলা’ বা ‘প্রশ্ন না করা’ এক প্রকার চরম অবজ্ঞা ও শাস্তি। অর্থাৎ ওহীর সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তারা আল্লাহর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার যোগ্যতাই হারিয়ে ফেলবে। এটি ওহী বিমুখতার একটি নেতিবাচক বিচারিক পরিণতি।

17. আদি অঙ্গীকার (মিছাক) সংক্রান্ত মৌন প্রশ্ন:

সৃষ্টির আদি অঙ্গীকার: আমি কি তোমাদের রব নই? (আলাসতু বি-রাব্বিকুম) হবে সকল প্রশ্নের মূল ভিত্তি (৭:১৭২)।
বিচারের দিন আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষকে তার সৃষ্টির সূচনালগ্নে দেওয়া সেই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন:
“যখন তোমার প্রতিপালক আদমের সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী করে বললেন—আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই (আলাসতু বি-রাব্বিকুম)? তারা বলেছিল—অবশ্যই (বালা)।” (৭:১৭২)
আল্লাহ এরপর এর কারণ বর্ণনা করেছেন—যেন তোমরা কিয়ামতের দিন এটি না বলো যে, আমরা এ বিষয়ে জানতাম না। (৭:১৭৩)। সুতরাং, কিয়ামতের দিনের মূল প্রশ্নটি হবে এই আদি অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন নিয়ে। মানুষের বিবেক বা ফিতরাত-কে যে ওহীর সাথে সংযুক্ত করা হয়েছিল, সেই সংযোগ সে কেন বিচ্ছিন্ন করল—এটিই হবে আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসার কেন্দ্রবিন্দু।

18. মিথ্যা উদ্ভাবন ও উদ্ভাবিত মতাদর্শ সম্পর্কে প্রশ্ন:

মানুষ দুনিয়াতে আল্লাহর নামে বা ধর্মের নামে অনেক মিথ্যা উদ্ভাবন (ইফতিরা) করে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন সেই উদ্ভাবিত মিথ্যা সম্পর্কে শপথ করে বলছেন:
“আল্লাহর শপথ! তোমরা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করতে সে বিষয়ে অবশ্যই তোমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে (লা-তুসআলুন্না)।” (১৬:৫৬)

আর কিয়ামতের দিন তাদেরকে অবশ্যই সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, তারা যা মিথ্যা রচনা করত-29:13 এখানে ‘ইফতিরা’ (মিথ্যা উদ্ভাবন) শব্দটি ওহীর বিপরীত শক্তি হিসেবে কাজ করে। ওহীর বিশুদ্ধতা ত্যাগ করে মানুষ যেসব মনগড়া কাহিনী বা প্রথাকে ধর্মের রূপ দিয়েছিল, সেই প্রতিটি উদ্ভাবন সম্পর্কে সেদিন কঠোরভাবে জেরা করা হবে।

19. ওহীর শিক্ষা বিকৃতি করা হয়েছে কিনা, তা নিয়ে রসূলগণের উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ হবে (৫:১১৬)
আল্লাহ রব্বুল আলামিন কিয়ামতের দিন কেবল উম্মতদের নয়, স্বয়ং রাসূলগণকেও বিশেষ বিষয়ে প্রশ্ন করবেন। সালামুন আলা ইসা (সালামুন আলাইহে)-কে করা প্রশ্নটি আল-কুরআনে এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে:
“যখন আল্লাহ বলবেন—হে মারইয়াম-তনয় ইসা! তুমি কি মানুষকে বলেছিলে যে, আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার মাতাকে দুই উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করো?” (৫:১১৬)
এই আয়াতের অভ্যন্তরীণ ইঙ্গিত হলো—আল্লাহ মানুষকে ওহীর যে বিশুদ্ধ শিক্ষা দিয়েছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্ম কীভাবে বিকৃত করেছে, তার বিচার হবে। যদি একজন মহান রসূলকে তাঁর প্রচারিত দাওয়াতের বিষয়ে এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য ওহীর প্রতিটি আয়াতের অনুসরণ নিয়ে কতটা গম্ভীর প্রশ্ন অপেক্ষা করছে, তা সহজেই অনুমেয়।


20. নিরপরাধের রক্ত ও সামাজিক ন্যায়বিচার সংক্রান্ত প্রশ্ন:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন সামাজিক অপরাধের বিচারও অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে করবেন। বিশেষ করে যারা দুর্বল ও মুখহীন, তাদের পক্ষ হয়ে আল্লাহ প্রশ্ন করবেন:
“যখন জীবন্ত সমাহিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে—কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” (৮১:৮-৯)
এই আয়াতের অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত হলো, বিচার দিবসে জালিমকে নয়, বরং মজলুমকে আগে প্রশ্ন করা হবে তার অধিকার সম্পর্কে। এটি আল্লাহর পরম ন্যায়বিচারের একটি আধ্যাত্মিক সংযোগ।

21. সামাজিক দায়বদ্ধতা ও অন্যের ক্ষুধার্ত থাকা নিয়ে প্রশ্ন:

কিয়ামতের দিন মানুষের জবাবদিহি কেবল তার ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সমাজ ও মানুষের প্রতি তার দায়িত্ববোধ সম্পর্কেও প্রশ্ন করা হবে। আল-কুরআনে জাহান্নামীদের পরিণতি বর্ণনা করতে গিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংলাপ তুলে ধরা হয়েছে:

কিসে তোমাদেরকে সাকারের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছে? তারা বলবে, আমরা মুসল্লিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। এবং আমরা মিসকিনদের খাওয়াতাম না। এবং আমরা অহেতুক সমালোচনাকারীদের সঙ্গে অহেতুক সমালোচনা করতাম। আর আমরা কর্মফল দিন সম্পর্কে মিথ্যারোপ করতাম। (সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৪২–৪৪)

এই প্রশ্ন ও উত্তরের বিন্যাস গভীরভাবে লক্ষণীয়। এখানে জাহান্নামীদের অপরাধ হিসেবে প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব—সালাত পরিত্যাগ; এরপর উল্লেখ করা হয়েছে মানুষের প্রতি দায়িত্ব—অভাবগ্রস্তকে খাদ্য না দেওয়া। অর্থাৎ ইসলামে আধ্যাত্মিক দায়িত্ব ও সামাজিক দায়িত্ব পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং উভয়ই ঈমান ও নৈতিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই সত্যকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে অন্য একটি আয়াতে:

নিশ্চয় সে মহান আল্লাহর ওপর ঈমান আনেনি এবং সে অভাবগ্রস্তকে আহার দানে উৎসাহিত করত না।” (সূরা আল-হাক্কাহ ৬৯:৩৩–৩৪)

এখানে “লা ইয়াহুদ্দু ‘আলা তা‘আমিল মিসকীন” (অভাবগ্রস্তকে আহার দানে উৎসাহিত করত না) বাক্যাংশটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আল্লাহ কেবল এই প্রশ্ন করবেন না যে, তুমি নিজে কতটুকু দান করেছিলে; বরং এটিও জিজ্ঞাসা করবেন যে, তুমি কি সমাজে দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোনো ভূমিকা রেখেছিলে? তুমি কি মানুষকে তাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলে? তুমি কি ক্ষুধার্ত, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলেছিলে?

এভাবে কুরআন সামাজিক উদাসীনতাকেও একটি গুরুতর নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ মানুষের দায়িত্ব শুধু নিজে অন্যায় না করা নয়; বরং সামর্থ্য অনুযায়ী কল্যাণকে উৎসাহিত করা এবং অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কিয়ামতের দিন তাই মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি তার সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবিক সংবেদনশীলতা এবং বঞ্চিত মানুষের প্রতি তার অবস্থান সম্পর্কেও জবাবদিহি করতে হবে।

22. বিভ্রান্তকারী উপাস্য ও অনুসারীদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ:

যারা ওহীর বিধান ত্যাগ করে অন্য শ ক্তি বা সত্তার উপাসনা করেছিল, আল্লাহ তাদের এবং তাদের তথাকথিত উপাস্যদের মুখোমুখি করে প্রশ্ন করবেন। সূরা আল-ফুরকানে বর্ণিত হয়েছে: “সেদিন তিনি তাদের এবং তারা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করতো তাদের একত্র করবেন এবং বলবেন—তোমরা কি আমার এই বান্দাদের পথভ্রষ্ট করেছিলে, নাকি তারা নিজেরাই পথ হারিয়েছিল?” (২৫:১৭) এর উত্তরে সেই উপাস্যরা (বা ফেরেশতা/সৎ ব্যক্তিরা) বলবে: “তারা বলবে—আপনি পবিত্র! আপনার পরিবর্তে আমরা অন্য কাউকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করা আমাদের জন্য শোভন ছিল না; বরং আপনিই তাদের ও তাদের পিতৃপুরুষদের ভোগ-বিলাস দিয়েছিলেন, ফলে তারা ওহীর স্মরণ (জিকির) ভুলে গিয়েছিল।” (২৫:১৮) এখানে ‘নাসুজ জিকরা’ (স্মরণ বা ওহী ভুলে যাওয়া) শব্দসমষ্টি নির্দেশ করে যে, ওহী থেকে বিচ্ছিন্নতাই মানুষকে ভুল উপাস্য গ্রহণের দিকে ঠেলে দেয়।

23. আল্লাহর ‘শরীক’ ও মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা নিয়ে প্রশ্ন:

যারা দুনিয়াতে আল্লাহর বিধানের সমান্তরাল অন্য কোনো শক্তি, ব্যক্তি বা মতাদর্শকে স্থান দিয়েছিল, আল্লাহ তাদের কঠিন জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করবেন: “যেদিন তিনি তাদের ডেকে বলবেন—তোমরা যাদের আমার শরীক মনে করতে, তারা আজ কোথায়?” (২৮:৬২, ২৮:৭৪) এই প্রশ্নের মাধ্যমে আল্লাহ সু.তা. মানুষের মনগড়া বিশ্বাসের (ইফতিরা) অসারতা প্রমাণ করবেন। এর সমান্তরাল চিত্র পাওয়া যায় সূরা আশ-শু‘আরা-তে: “তাদের বলা হবে—তোমরা যাদের ইবাদত করতে তারা কোথায়? তারা কি তোমাদের সাহায্য করতে পারে অথবা তারা কি নিজেরা আত্মরক্ষা করতে সক্ষম?”

(২৬:৯২-৯৩) এখানে ওহীর সংযোগ হলো—মানুষ ওহী ত্যাগ করে যাদের ‘রক্ষণাবেক্ষণকারী’ ভেবেছিল, ওহীর সেই ওহীর মালিকের সামনে তারা সেদিন সম্পূর্ণ একা ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে।
এই জিজ্ঞাসার নজম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আল্লাহ সু.তা. মানুষকে তার ভুল বিশ্বাসের অসারতা হাতে-কলমে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য এই প্রশ্ন করবেন। মানুষ যাদের সাহায্যকারী ভেবেছিল, সেদিন তাদের অনুপস্থিতিই হবে বড় শাস্তি।


24. সত্যবাদীদের সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন: এক আধ্যাত্মিক সূক্ষ্মতা:

বিচারের দিন কেবল পাপিষ্ঠদেরই প্রশ্ন করা হবে না, বরং যারা দুনিয়াতে সত্যের পথে ছিল, তাদেরও এক বিশেষ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:
যাতে তিনি সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারেন (লি ইয়াস-আলাস সাদিক্বীনা আন সিদক্বিহিম)।” (৩৩:৮) এই আয়াতের অভ্যন্তরীণ ইঙ্গিত হলো—ওহীর চর্চায় যারা নিয়োজিত ছিল, তাদের নিয়ত বা উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা কী ছিল? তারা কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সত্য বলেছিল নাকি লোক দেখানোর জন্য? এই ‘সিদক’ বা সত্যবাদিতার উৎস যে ওহী, সেই ওহীর প্রতি তাদের নিষ্ঠা কতটুকু ছিল—সেটিই হবে জিজ্ঞাসার মূল বিষয়।

25. নেতা ও অনুসারীদের মধ্যকার পারস্পরিক দোষারোপ ও আল্লাহর জেরা:

বিচারের দিন মানুষ তার ভুল অনুসরণের জন্য অন্যদের দোষারোপ করবে। সেই চিত্র আল্লাহ এঁকেছেন এভাবে:

“যখন তারা জাহান্নামে পরস্পর বিতর্কে (ইয়াতাহাজ্জুনা) লিপ্ত হবে, তখন দুর্বলেরা (যুয়াফা) অহংকারীদের (আস্তাকবারু) বলবে—আমরা তো তোমাদেরই অনুসারী ছিলাম; এখন কি তোমরা আমাদের থেকে জাহান্নামের আগুনের কিছু অংশ দূর করতে পারবে?” (৪০:৪৭, ১৪:২১) তখন আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাদের উভয়ের প্রতি প্রশ্ন করবেন যে, কেন তারা আল্লাহর ওহী থাকা সত্ত্বেও নিজেদের বিচার-বুদ্ধি বন্ধ করে অন্ধ আনুগত্য করেছিল? এই ‘বিতর্ক’ মূলত ওহীহীন অনুসরণের অনিবার্য পরিণতি। আল্লাহ প্রশ্ন করবেন—ওহীর জ্ঞান আসার পর কেন তোমরা ওহীর পরিবর্তে মানুষের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করেছিলে?


26. শয়তান ও তার অনুসারীদের মধ্যকার ‘মৌন প্রশ্ন’:

বিচারের দিন শয়তান যখন তার অনুসারীদের সামনে এক দীর্ঘ বক্তব্য দেবে (১৪:২২), তখন সেখানে একটি সূক্ষ্ম বিচারিক প্রশ্ন লুকিয়ে থাকবে। শয়তান বলবে—

“আল্লাহ তোমাদের সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর আমি তোমাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম... আমার তো তোমাদের ওপর কোনো আধিপত্য ছিল না, আমি তো কেবল তোমাদের ডেকেছিলাম আর তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে।” এখানে ইমপ্লাইড এভিডেন্স (অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত) হলো—আল্লাহ মানুষের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করবেন যে, ওহীর সত্য ডাক ছেড়ে শয়তানের দুর্বল প্ররোচনায় তোমরা কেন সাড়া দিলে? তোমাদের কাছে কি কোনো স্পষ্ট দলিল বা বুরহান (১৭:৩৬, 2:111, 27:64) ছিল?


27. নেতৃত্ব ও আনুগত্যের ভিত্তি সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক প্রশ্ন:

বিচারের দিন মানুষ তার ভ্রান্ত অনুসরণের জন্য অজুহাত পেশ করতে চাইবে। আল্লাহ সেই ‘অজুহাত’ বা ‘তাকলীদ’ (অন্ধ অনুসরণ) সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন। সূরা আস-সাফফাতে এই দৃশ্যটি অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে বর্ণিত হয়েছে: “তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। অনুসারীরা বলবে—তোমরা তো আমাদের কাছে দক্ষিণ দিক থেকে (প্রবল প্রতাপে) আসতে। নেতারা বলবে—বরং তোমরা নিজেরাই তো মুমিন ছিলে না।” (৩৭:২৭-২৯) এখানে সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হলো—আল্লাহ প্রশ্ন করবেন, ওহীর ‘হাবলুল্লাহ’ বা রশি (৩:১০৩) থাকতে কেন তোমরা বিভ্রান্ত নেতাদের রশি ধরেছিলে? যারা ওহী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, তাদের অনুসরণ কেন তোমাদের কাছে ওহীর বাণীর চেয়ে বড় মনে হয়েছিল? ওহী বিমুখ নেতৃত্বের পেছনে ছোটা কোনোক্রমেই নাজাতের উসিলা হবে না।


28. আত্ম-সাক্ষ্য ও অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন (Baseerah):

বিচার দিবসের অন্যতম বিস্ময়কর দিক হলো, আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষকে তার নিজের বিরুদ্ধেই সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করাবেন। সেখানে কোনো বাহ্যিক প্রশ্নের চেয়েও বড় হবে মানুষের অভ্যন্তরীণ সত্যের উন্মোচন। আল্লাহ সু.তা. বলেন:

“বরং মানুষ তার নিজের সম্পর্কে সম্যক অবগত (বাসীরাহ), যদিও সে তার অজুহাতগুলো পেশ করে।” (৭৫:১৪-১৫) এই আয়াতের অনুধ্যানে পাওয়া যায় যে, আল্লাহ সেদিন মানুষকে এমন এক আধ্যাত্মিক আয়নার সামনে দাঁড় করাবেন যেখানে তার প্রতিটি কাজের পেছনে থাকা ‘আসল নিয়ত’ বা উদ্দেশ্য প্রকাশিত হয়ে পড়বে। ওহীর নির্দেশিত ‘ইখলাস’ বা নিষ্ঠা ছিল কি না, নাকি কেবল লোকদেখানো ইবাদত ছিল—সেটিই হবে মৌন জিজ্ঞাসার বিষয়। আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন: “তোমরা তোমাদের অন্তরে যা আছে তা প্রকাশ করো কিংবা গোপন করো, আল্লাহ তোমাদের থেকে তার হিসাব গ্রহণ করবেন।” (২:২৮৪)


29. সময়ের নেয়ামত ও সুযোগের সদ্ব্যবহার সংক্রান্ত প্রশ্ন:

কিয়ামতের দিন জাহান্নামীরা যখন চিৎকার করে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসার সুযোগ চাইবে, তখন রব্বুল আলামিন তাদের একটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও অকাট্য প্রশ্ন করবেন:

“আমি কি তোমাদেরকে এতো দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে, তখন কেউ উপদেশ গ্রহণ করতে চাইলে উপদেশ গ্রহণ করতে পারত? আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারী এসেছিল।” (৩৫:৩৭)
অনুধ্যানমূলক বিশ্লেষণ:
এই জিজ্ঞাসার নজম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আল্লাহ প্রশ্ন করবেন— ওহীর বাণী অনুধাবন করার জন্য যে ‘সময়’ এবং ‘সুযোগ’ দেওয়া হয়েছিল, তা কেন অপচয় করা হলো? এখানে ‘নাযীর’ বা সতর্ককারী হিসেবে ওহীর কিতাব এবং রসূলগণের দাওয়াত মানুষের ওপর দলিল হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। এটি সময়ের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দেওয়ার একটি দালিলিক নির্দেশ।

এখানে ‘সতর্ককারী’ (নাজীর) এবং ‘উপদেশ গ্রহণের সময়’—এই দুটি শব্দ পরস্পর যুক্ত। অর্থাৎ, মানুষের অপরাধ কেবল পাপ করা নয়, বরং পর্যাপ্ত সুযোগ ও পথপ্রদর্শক থাকা সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া। কুরআনের অন্য আয়াতে জাহান্নামীদের এই ফিরে আসার ইচ্ছাকে ‘মিথ্যাচার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে (৬:২৮), কারণ তাদের অভ্যন্তরীণ গঠন বা মজ্জাগত প্রবৃত্তি পরিবর্তিত হয়নি।


30. জ্ঞানের প্রয়োগ ও নিজের ওপর ওহীর বাস্তবায়ন সম্পর্কে প্রশ্ন:

যারা অন্যদের ভালো কথা বলতো কিন্তু নিজে ওহীর বিধান অনুসরণ করতো না, তাদের প্রতি আল্লাহর একটি তাত্ত্বিক ও বিদ্রুপাত্মক প্রশ্ন আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:

“তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও আর নিজেদের ভুলে যাও? অথচ তোমরা কিতাব তেলাওয়াত করো। তবে কি তোমরা অনুধাবন করো না?” (২:৪৪) এই প্রশ্নটি মূলত কিয়ামতের দিনের সেই ভয়াবহ হিসাবেরই অংশ, যেখানে ওহীর জ্ঞানের বাহক ও অনুশীলনকারীদের কর্মকাণ্ডের বৈপরীত্য (Contrast) নিয়ে জেরা করা হবে। ওহীর চর্চা বা অনুশীলনী যদি কেবল অন্যের জন্য হয় এবং নিজের জীবনে তার প্রতিফলন না থাকে, তবে ২:৪৪ আয়াত অনুযায়ী সেই ‘জ্ঞান’ সেদিন মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে।


31. সম্পদের উৎস ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা সংক্রান্ত প্রশ্ন:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষকে যে রিজিক দিয়েছেন, তা ব্যয়ের ক্ষেত্রে ওহীর নির্দেশ মানা হয়েছে কি না—সেটি হবে জিজ্ঞাসার অন্যতম বিষয়। আল্লাহ সু.তা. প্রশ্ন করবেন সেই সব নেয়ামত সম্পর্কে যা মানুষকে দেওয়া হয়েছিল (১০২:৮)। এর একটি প্রয়োগিক দিক হলো: “তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে—তারা কী ব্যয় করবে? বলো—যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত (আল-‘আফওয়া)।” (২:২১৯) কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রশ্ন করবেন—তোমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে সম্পদ ছিল, তা কি তুমি আল্লাহর নির্দেশিত পথে (অভাবগ্রস্ত ও আত্মীয়দের মাঝে) ব্যয় করেছিলে নাকি তা কুক্ষিগত করে রেখেছিলে? ওহীর এই ‘ইনফাক’ বা ব্যয়ের দর্শন পালন করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে কঠিন জেরা হবে।


32. মিজান বা মানদণ্ড (দাঁড়িপাল্লা) : ওহী-ভিত্তিক কর্মের ওজন: ‘মিজান’ ও ‘হক’ (সত্য)-এর সমার্থকতা: সৃষ্টির আদি ভারসাম্য (মিজান) ও ওহীর সংযোগ:

আমরা জানি বিচারের দিন আমল ওজন করা হবে। কিন্তু ওহীর গভীরতর অনুধ্যানে দেখা যায়, এই ‘ওজন’ বা ‘মিজান’ মূলত আল-কুরআন নিজেই। “আল্লাহই সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছেন এবং মিজান (দাঁড়িপাল্লা) নাযিল করেছেন।” (৪২:১৭) “সেদিন আমল ওজন করা হবে সত্যের (হক) ভিত্তিতে।” (৭:৮) যৌক্তিক পূর্ণতা: ৪২:১৭ আয়াতে কিতাব ও মিজানকে একসাথে উল্লেখ করার অর্থ হলো—বিচারের দিন আপনাকে যে প্রশ্ন করা হবে, তার ‘স্কেল’ বা মাপকাঠি হবে ওহীর সেই সত্য। আপনার আমল যদি ওহীর সত্যের (হক) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবেই তা ওজনে ভারী হবে। নতুবা তা হবে ধূলিকণার মতো মূল্যহীন (১৮:১০৫)। এখানে ওজন করা হবে মূলত এটি যে—মানুষের আমলগুলো ওহীর সেই ‘হাক্ক’ বা সত্যের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ওহীর জ্ঞান ছাড়া যে আমল করা হয়েছে, তার কোনো ওজন আল্লাহর কাছে থাকবে না (১৮:১০৫)।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির সময় একটি ভারসাম্য (মিজান) স্থাপন করেছেন (৫৫:৭)। কিয়ামতের দিন এই মিজান বা দাঁড়িপাল্লা হবে মানুষের কাজের ওজনের মানদণ্ড। আল্লাহ বলেন: “সেদিন ওজন (আল-ওয়াযনু) হবে সত্যের (হাক্ক) ভিত্তিতে।” (৭:৮)

এখানে ‘হাক্ক’ বা সত্য হলো ওহী। ওহীর জ্ঞানের ভিত্তিতে মানুষের আমল যতটুকু ভারী হবে, ততটুকুই তার ওজন হবে। যার আমল ওহী-হীন বা ওহী-বিমুখ, তার পাল্লা সেদিন হালকা হয়ে যাবে (১০১:৮-৯)। সুতরাং, জিকির বা ওহীর চর্চা কেবল সওয়াব নয়, এটি কিয়ামতের সেই মহাতরাজুতে ওজনের একমাত্র ‘ঘনত্ব’ বা ‘ম্যাটার’।

‘ফাসল’ (বিভেদ) ও ওহীর মানদণ্ড (ফুরকান):

বিচারের দিনকে আল্লাহ বলেছেন ‘ইয়াওমুল ফাসল’ বা ফয়সালার দিন (৭৭:১৩)। এই ফয়সালা বা বিভাজন কীভাবে হবে? এর লিঙ্ক রয়েছে আল-কুরআনের অন্য এক নামে— ‘ফুরকান’ (যা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী)। “কতই না বরকতময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ‘ফুরকান’ নাযিল করেছেন যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে।” (২৫:১) যৌক্তিক পূর্ণতা: কিয়ামতের দিন আল্লাহ কোনো নতুন আইন দিয়ে বিচার করবেন না। ওহীর যে ‘ফুরকান’ বা পার্থক্যকারী মানদণ্ড দুনিয়াতে দেওয়া হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই মানুষকে দুই দলে (জান্নাতী ও জাহান্নামী) বিভক্ত করা হবে। যারা ওহীর ফুরকান মেনে নিজের জীবনকে সত্য ও মিথ্যা থেকে আলাদা করেছে, তাদের ‘ইয়াওমুল ফাসল’-এর বিচার হবে সহজ।

33. ‘কিতাব’ যখন জীবন্ত বক্তা: ‘বয়ান’ (প্রকাশ) ও আমলনামার কথা বলা ও ওহীর রেকর্ড:

আমরা মনে করি কিতাব বা আমলনামা কেবল একটি স্থির নথি। কিন্তু আল-কুরআনের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বলে, এই কিতাব সেদিন মানুষের সাথে কথোপকথন করবে। আল্লাহ বলেন:

“এটি আমার কিতাব, যা তোমাদের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলবে (ইয়ান্তিকু বিল হাক্ক)।” (৪৫:২৯)

আধ্যাত্মিক অনুধ্যান: দুনিয়াতে আল্লাহ মানুষকে ‘বয়ান’ বা মনের ভাব প্রকাশের শক্তি দিয়েছেন (৫৫:৪)। কিয়ামতের দিন সেই একই ‘বয়ান’ শক্তি মানুষের আমলনামাকে দেওয়া হবে। মানুষ যখন আল্লাহর প্রশ্নের মুখে নিজের দোষ অস্বীকার করবে, তখন ওহীর সত্যতায় লিপিবদ্ধ সেই আমলনামাটি জীবন্ত হয়ে মানুষের বিরুদ্ধে যুক্তি (Logic) দিয়ে কথা বলবে। এটিই হলো ‘বুরহান’ বা চূড়ান্ত প্রমাণের আধ্যাত্মিক সংযোগ।

এই আয়াতের সাথে ১০:৬১ আয়াতের (প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া) এক গভীর সংযোগ রয়েছে। আল্লাহ যখন প্রশ্ন করবেন, তখন আমলনামা কেবল তথ্য দেবে না, বরং ওহীর সত্যতার মানদণ্ডে মানুষের প্রতিটি কাজের ‘বয়ান’ বা ব্যাখ্যা প্রদান করবে। এটিই হলো বিচারের দিনের ‘স্বয়ংক্রিয় বিচারিক জবানবন্দি’।


34. দালিলিক প্রমাণ বা ‘বুরহান’ উপস্থাপনের দাবি: ও ওহী-ভিত্তিহীনতার বিচারিক সমাপ্তি:

বিচারের দিন আল্লাহ মানুষকে তাদের কর্মকাণ্ডের সপক্ষে প্রমাণ হাজির করতে বলবেন। এটি এক প্রকার বিচারিক চ্যালেঞ্জ। আল্লাহ বলেন:

“বলো, তোমরা তোমাদের প্রমাণ (বুরহান) পেশ করো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।”-২৮:৭৫, ২৭:৬৪, 2:111 )
গভীর অনুধ্যান: এখানে ‘বুরহান’ শব্দটি ওহীর সমার্থক। এই ‘বুরহান’ বা অকাট্য প্রমাণের মূল উৎস হলো ওহী।আল্লাহ প্রশ্ন করবেন— ওহীর যে অকাট্য প্রমাণ (বুরহান) আমি তোমাদের দিয়েছিলাম, তার বাইরে তোমরা যে কাজগুলো করেছ তার সপক্ষে তোমাদের কাছে ‘বুরহান’ বা দালিলিক ভিত্তি কী? এই প্রশ্নের মুখে প্রতিটি ওহী-বিমুখ মানুষ সম্পূর্ণ নিরুত্তর হয়ে যাবে, কারণ ওহীর বাইরে সত্যের কোনো অস্তিত্ব নেই।

যার কাছে ওহীর দলিল নেই, সে সেদিনকোনো উত্তর দিতে পারবে না। ওহীর সাথে সংযোগ না থাকলে মানুষের প্রতিটি কাজ ‘বাতিল’ বলে গণ্য হবে এবং সে কোনো দালিলিক ভিত্তি খুঁজে পাবে না।


35. ‘রূহ’-এর প্রত্যাবর্তন ও ওহীর সংযোগের সমাপ্তি:

মানুষের ভেতরে যে রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়েছিল (১৫:২৯), কিয়ামতের দিন সেই রূহকে তার উৎসের কাছে ফিরে যেতে হবে। “যেদিন ‘রূহ’ ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে...” (৭৮:৩৮) “রূহ ও ফেরেশতাগণ তাঁর (আল্লাহর) দিকে আরোহণ করে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।” (৭০:৪) আধ্যাত্মিক পূর্ণতা: সৃষ্টির শুরুতে ওহীর রূহ (কুরআন) এবং মানুষের রূহ (আত্মা) একসাথে যাত্রা শুরু করেছিল। কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রশ্ন করবেন—রূহানি এই সফরে তোমাদের সাথে ওহীর ‘রূহ’-এর সম্পর্ক কেমন ছিল? যারা ওহী থেকে বিচ্ছিন্ন (৭:১৭৫) ছিল, তাদের রূহ সেদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সক্ষমতা হারাবে। এটিই হলো ওহীর সাথে মানুষের সম্পর্কের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক সমাপ্তি।


36. আল-কুরআন পরিত্যাগের বিষয়ে রাসূল (সা.)-এর অভিযোগ:

বিচারের দিন সবচেয়ে প্রকম্পিত করার মতো একটি দৃশ্য হলো যখন স্বয়ং রাসূল (সালামুন আলাইহে) তাঁর উম্মতদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে একটি বিশেষ বিষয়ে নালিশ করবেন। আল্লাহ রব্বুল আলামিন সেই মুহূর্তটি বর্ণনা করেছেন:

“আর রসূল বলবেন- হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যক্ত (মাহজুরা) হিসেবে গ্রহণ করেছিল।” (২৫:৩০)
এই আয়াতের গভীর অনুধ্যানে পাওয়া যায় যে, এটি একটি ‘বিপরীতমুখী জিজ্ঞাসাবাদ’। যখন আল্লাহর রসূল এই নালিশ করবেন, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের প্রতি অবধারিত প্রশ্ন হবে—কেন তোমরা ওহীর এই রশিকে (৩:১০৩) ছেড়ে দিয়েছিলে? কেন তোমরা ওহীর চর্চা ও অনুশীলনী বাদ দিয়ে অন্য মতাদর্শকে প্রাধান্য দিয়েছিলে? ‘মাহজুরা’ শব্দটি নির্দেশ করে যে, মানুষ কুরআনকে কেবল সাজিয়ে রেখেছিল কিন্তু তার শিক্ষাকে জীবন থেকে নির্বাসিত করেছিল।

37. অপরাধের স্বীকৃতি ও ‘আকল’ বা বিবেকের অকার্যকারিতা:

জাহান্নামীরা কেন সেখানে গেল—এই প্রশ্নের উত্তরে তারা নিজেরাই নিজেদের বিচারক হয়ে দাঁড়াবে। আল কুরআন মাজীদে বর্ণিত এই সংলাপটি মানুষের জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যর্থতাকে তুলে ধরে:
“তারা বলবে, আমরা যদি শুনতাম অথবা বুদ্ধি (আকল) প্রয়োগ করতাম, তবে আমরা প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী হতাম না।” (৬৭:১০)
পারস্পরিক সংযোগ: আল কুরআন মাজীদে ‘সামআ’ (শোনা) এবং ‘আকল’ (বিবেচনা করা) শব্দ দুটি প্রায়ই পাশাপাশি আসে। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, জাহান্নামে যাওয়ার মূল কারণ তথ্যগত অভাব নয়, বরং তথ্যের যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উপলব্ধির অভাব। তারা সত্যের বাণী কানে আসার পরও তা হৃদয়ে স্থান দেয়নি। এই স্বীকৃতির পরপরই কুরআনের ভাষ্য হলো— “তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করল।” (৬৭:১১)

38. নেককারদের হিসাব ও প্রশান্তি:

জিজ্ঞাসাবাদ সবার জন্য সমান হবে না। যাদের সাথে ওহীর সংযোগ ছিল, তাদের হিসাব হবে সহজ। আল্লাহ বলেন: “অতঃপর যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, অচিরেই তার হিসাব নেওয়া হবে সহজভাবে (হিসাবান ইয়াসীরা)।” (৮৪:৭-৮) এই ‘সহজ হিসাব’ হলো ওহীর সেই বরকত, যা মুমিনকে দুনিয়াতে সংশোধন হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল। এর বিপরীতে যারা ওহী থেকে বিচ্যুত (৭:১৭৫), তাদের হিসাব হবে অত্যন্ত জটিল ও কঠিন।

39. বিপরীতমুখী চিত্র: পাপিষ্ঠদের নিরুত্তর অবস্থা:

একদিকে যখন মুমিনদের সাথে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে দয়া ও ইনসাফ করা হবে, অন্যদিকে পাপিষ্ঠদের অবস্থা হবে ভিন্ন। আল্লাহ বলেন:

“পাপিষ্ঠদের তাদের অপরাধ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে না (ওয়া লা ইউস-আলু আন যুনুবিহিমুল মুজরিমুন)।” -২৮:৭৮, (৫৫:৩৯)
এই আয়াতের একটি সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা হলো—এমন এক সময় আসবে যখন তাদের অপরাধ এতই স্পষ্ট থাকবে যে মৌখিক জিজ্ঞাসার প্রয়োজন হবে না; বরং তাদের চেহারা এবং আমলনামাই তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। এটি মূলত অবজ্ঞা ও শাস্তির একটি পর্যায়।


40. মহাবিচার দিবসের অমোঘ প্রশ্নপত্র: ওহীর দর্পণে জীবন ও কর্মের বিচার:

সম্মানিত পাঠক! আল-কুরআন মাজীদের সুগভীর দালিলিক পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে আমরা একটি অখণ্ড ও সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হই। আল-কুরআনের এই অকাট্য প্রমাণসমূহ থেকে এটি স্পষ্ট যে—বিচারের দিন আল্লাহ রব্বুল আলামিনের প্রতিটি প্রশ্ন মূলত ওহীর সাথে মানুষের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই আবর্তিত হবে। প্রতিটি জিজ্ঞাসা হবে মানুষের ‘সচেতনতা’, ‘চিন্তাশক্তি’ ও ‘ওহীর আনুগত্য’-কে কেন্দ্র করে।
নিম্নে আল-কুরআনের আলোকে সেই বিচার দিবসের প্রশ্নমালার একটি সুসংহত ও তাত্ত্বিক বিন্যাস উপস্থাপিত হলো: ১. ওহী—মহাবিচারের মূল মানদণ্ড ও সিলেবাস কিয়ামতের দিন ওহীর জ্ঞানই হবে বিচারের মূল বিষয়বস্তু বা সিলেবাস (৪৩:৪৪)। সেদিন আল্লাহ রব্বুল আলামিন সর্বজনীন ও অনিবার্যভাবে জিজ্ঞাসা করবেন (১৫:৯২)—

✦ ওহীর ‘মিযান’ বা সত্যের দর্পণে তুমি তোমার জীবনকে
মেপেছিলে কি না? (৪২:১৭)

✦ ওহীর ‘ফুরকান’ বা সত্য-মিথ্যার মানদণ্ডে নিজেকে সঠিক দলে রাখতে পেরেছিলে কি না? (২৫:১)

✦ ওহীর ‘মিযান’ বা শাশ্বত ভারসাম্যে তোমার চরিত্র ও সমাজকে সাজিয়েছিলে কি না? (৫৫:৭-৯)

✦ মানুষের প্রতিটি কাজ সেদিন ওহীর সেই অকাট্য সত্য বা ‘হক’-এর মানদণ্ডে ওজন করা হবে (৭:৮)। ২. ওহীর শক্তি ও প্রমাণের প্রয়োগ মানুষকে কথা বলার ও দলিল পেশ করার যে সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার উৎস ও প্রয়োগ সম্পর্কে প্রশ্ন হবে—

✦ ওহীর ‘বুরহান’ বা দলিল তোমার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে কার্যকর ছিল কি না? (২৮:৭৫)

✦ আল্লাহপ্রদত্ত ‘বয়ান’ বা প্রকাশের শক্তিকে তুমি কি ওহীর সত্য প্রচারে ব্যবহার করেছিলে নাকি মিথ্যার প্রসারে? (৫৫:৪, ৪৫:২৯)

✦ নিজের কাজের সপক্ষে ওহী-ভিত্তিক কোনো অকাট্য দলিল (বুরহান) আছে কি না, তা পেশ করতে বলা হবে (২৮:৭৫)।

✦ আল্লাহর বিধানের বাইরে যদি কোনো কিছু উদ্ভাবন করা হয়ে থাকে, তবে তার সপক্ষে কসম খেয়ে জেরা করা হবে (১৬:৫৬, ২৯:১৩)। ৩. ওহী বিমুখতা ও অবহেলার কঠোর জবাবদিহি আল-কুরআনের জ্ঞান অর্জন না করা বা তা গোপন করার কোনো ওজর সেদিন গৃহীত হবে না—

✦ আল-কুরআন মাজীদকে গুরুত্বহীন বা পরিত্যক্ত করা বিচারের দিনে সবচেয়ে বড় অভিযোগের কারণ হবে (২৫:৩০)।

✦ ওহীর জ্ঞান অর্জন না করে কেবল অন্ধভাবে তা অস্বীকার করাকে বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে (২৭:৮৪)।

✦ ওহীর জ্ঞান গোপনকারীদের কোনো ওজর-আপত্তি আল্লাহ সু.তা. সেদিন শ্রবণ করবেন না (২:১৭৪)।

✦ ওহীর জ্ঞান অনুধাবন করার জন্য যে ‘সময়’ বা আয়ু দেওয়া হয়েছিল, তার হিসাব তলব করা হবে (৩৫:৩৭)।

✦ মানুষের নিজের ‘বিবেক’ (Conscience) সেদিন আল্লাহর সামনে নিজের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সাক্ষী হবে (৭৫:১৪)। ৪. স্বাধীনতা ও আনুগত্যের পরীক্ষা শয়তানের প্ররোচনা আর ওহীর নূরের মধ্যে মানুষকে তার ‘ইচ্ছার স্বাধীনতা’র (Freedom of Choice) জন্য জবাবদিহি করতে হবে (১৪:২২)।

✦ ওহীর জ্ঞান অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালিত না করার সুনির্দিষ্ট কারণ সেদিন তলব করা হবে (২:৪৪)।

✦ অন্ধ আনুগত্য এবং ওহীহীন নেতৃত্বের অনুসরণ কোনো ওজর হিসেবে কবুল হবে না (৪০:৪৭)।

✦ প্রতিটি জাতির রাসূল তাঁদের নিকট প্রেরিত ওহী-ভিত্তিক আচরণের ওপর মানুষের বিরুদ্ধে বা পক্ষে সাক্ষী দেবেন (৪:৪১)।

✦ আল্লাহর সমান্তরাল খাড়া করা মিথ্যা উপাস্য ও মতবাদসমূহের অসারতা নিয়ে কঠিন জেরা করা হবে (২৮:৬২)। ৫. রূহানি সংযোগ ও জাগতিক দায়বদ্ধতা:
✦ সর্বোপরি প্রশ্ন হবে—তোমার ‘রূহ’ কি ওহীর
‘রূহের’ সাথে সংযুক্ত হয়ে রব্বুল আলামিনের দরবারে ফিরে এসেছে? (৭০:৪)

✦ বঞ্চিত ও অসহায় মানুষের প্রতি নির্লিপ্ততা ঈমানের অনুপস্থিতি হিসেবে বিচার করা হবে (৬৯:৩৩-৩৪)।

✦ আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নেয়ামত, মুহূর্ত এবং রিজিক ব্যবহারের যৌক্তিকতা ওহীর মানদণ্ডে বিচার করা হবে (১০২:৮, ২:২১৯)।

✦ বিচারের দিন হিসাবের স্বচ্ছতার জন্য মানুষের প্রতিটি গতিপথ সেদিন থামিয়ে দেওয়া হবে (৩৭:২৪)।

✦ সত্যবাদীদের অন্তরের নিষ্ঠাও ওহীর সূক্ষ্ম মানদণ্ডে যাচাই করা হবে (৩৩:৮)। সুতরাং, ওহীর চর্চা বা আল-কুরআন মাজীদের সাথে সার্বক্ষণিক সংযোগে থাকা মানে হলো কিয়ামতের সেই মহাবিচারালয়ের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর আগেভাগেই নিজের জীবনে জীবন্ত করে রাখা। যে ব্যক্তি ওহীর আয়নায় নিজেকে চিনে নেয় এবং ওহীর ‘মিযান’-এ নিজেকে মেপে নেয়, কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে আল্লাহর প্রশ্নের মুখে তার কোনো ভয় বা লাঞ্ছনা থাকবে না।


সূক্ষ্ম ও আধ্যাত্মিক সংযোগ: (Metaphysical Connection):

আল-কুরআনের আয়াতসমূহ পারস্পরিক সংযুক্ত করলে দেখা যায় যে, কিয়ামতের দিনের প্রতিটি প্রশ্নই মূলত ‘ইলম’ (জ্ঞান) এবং ‘আমাল’ (কাজ)-এর মধ্যকার দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে হবে।

আল্লাহ প্রশ্ন করবেন—তোমাকে ওহী বা কিতাব দেওয়া হয়েছিল (৪৩:৪৪), কিন্তু তোমার কাজের (আমাল) সাথে কি ওহীর সেই জ্ঞানের কোনো মিল ছিল? এই অমিলটুকুই হলো জাহান্নামীদের বিপদের মূল কারণ।
সুতরাং, ওহীর চর্চা বা আল-কুরআনের সাথে সার্বক্ষণিক সংযোগে থাকা মানে হলো—বিচারের দিনের সেই চূড়ান্ত অডিটের জন্য প্রতিটি দলিল ও প্রমাণ আগাম গুছিয়ে রাখা। —বিচারের দিনের সেই জটিল প্রশ্নগুলোর বিপরীতে নিজের ঈমানি ‘রূহ’ বা অস্তিত্বকে অটুট রাখা। ওহীর চর্চা বা আল-কুরআনের সাথে সার্বক্ষণিক সংযোগে থাকা মানে কেবল কিছু আয়াত মুখস্থ করা নয়, বরং কিয়ামতের সেই মহাবিচারের জন্য নিজের রূহানি ও তাত্ত্বিক অস্তিত্বকে প্রস্তুত রাখা। যে ব্যক্তি ওহীর আয়নায় নিজেকে প্রতিদিন সংশোধন করে নেয়, কিয়ামতের সেই কঠিন প্রশ্নের সামনে তার আমলনামা ‘সহজ হিসাবের’ সুসংবাদ নিয়ে আসবে।


41. অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে নিষেধ করা হয়েছে, কিন্তু কেন?

এই আয়াতে ওহী বা আয়াত নাযিল হওয়ার সময় অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ নাযিলকৃত বিধানের প্রতিটি বিষয়ের দায় মানুষের ওপর চলে আসে।

"...আর কুরআন নাযিল হওয়ার সময়ে যদি তোমরা সেসব বিষয়ে প্রশ্ন করো, তবে তা তোমাদের কাছে প্রকাশ করা হবে (যা তোমাদের জন্য কষ্টকর হবে)..." সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: 5:101, (17:82)।

🎬 Video Credit: মূল নির্মাতা (Original Creator)।

ℹ️ শ্রোতাদের অবগতির জন্য:
এই চ্যানেলে প্রকাশিত অডিও ও ভিডিওসমূহ মূলত ইউটিউব কিংবা অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহকৃত বা ধার করা উপকরণ। এগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই কন্টেন্টের মাধ্যমে আপনাদের মাঝে শেয়ার করা হচ্ছে।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post