এখানে মূলত কুরআনের ভেতরেই تَيَمَّمُوا (তাইয়াম্মামূ) শব্দটির ব্যবহার ও পারস্পরিক ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে। এ ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত হলো সূরা আল-বাকারা ২:২৬৭—কারণ একই মূলধাতু ي م م (يَمَّمَ) সেখানে এমন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা ৪:৪৩ ও ৫:৬-এর অর্থ বুঝতে সাহায্য করে।
تَيَمُّم — তায়াম্মুম: কুরআন নিজেই কী বুঝিয়ে দেয়?
১. “তায়াম্মুম” শব্দের মূল অর্থ কী?
সূরা আন-নিসা ৪:৪৩ এবং সূরা আল-মায়িদা ৫:৬—উভয় স্থানে আল্লাহ বলেন:
فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا
অর্থের দিক থেকে:
“তোমরা যদি পানি না পাও, তাহলে পবিত্র ভূমির দিকে তায়াম্মুম করো...”
এখানে فَتَيَمَّمُوا (ফাতায়াম্মামূ) শব্দটি এসেছে ي م م মূলধাতু থেকে। কুরআনিক শব্দতালিকায় এর মৌলিক অর্থ হিসেবে “কোনো কিছুর দিকে উদ্দেশ্য করা, লক্ষ্য করা, অভিমুখী হওয়া” দেখানো হয়েছে। ৪:৪৩ ও ৫:৬-এ একই ক্রিয়ার অর্থ তায়াম্মুমের বিধানের সঙ্গে এসেছে।
অর্থাৎ, তায়াম্মুমের মূল ধারণা শুধু “মাটি দিয়ে মাসেহ করা” নয়; বরং কোনো নির্দিষ্ট পবিত্র ভূমির দিকে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে গমন/অভিমুখী হওয়া।
২. কুরআনের আরেকটি আয়াত এই অর্থটি পরিষ্কার করে:
আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنفِقُونَ
“আর তোমরা নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করার জন্য তা উদ্দেশ্য করো না।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:২৬৭
এখানে লক্ষ্য করুন—تَيَمَّمُوا (তায়াম্মামূ) শব্দটি এসেছে, কিন্তু এখানে তায়াম্মুমের প্রচলিত ইবাদতগত অর্থে নয়। বরং এর অর্থ হলো:
“উদ্দেশ্য করো না / বেছে নিও না / লক্ষ্য করো না।”
অতএব, কুরআনের নিজের ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি:
تَيَمُّم = কোনো কিছুর দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে উদ্দেশ্য করা, লক্ষ্য করা বা অভিমুখী হওয়া।
৩. তাহলে ৪:৪৩ ও ৫:৬-এ “তায়াম্মুম” বলতে কী বোঝায়?
আল্লাহ বলেন:
فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا
অর্থাৎ:
“তোমরা যদি পানি না পাও, তখন পবিত্র ‘সাঈদ’-এর দিকে উদ্দেশ্য করো...”
এরপর আল্লাহ বলেন:
فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ مِنْهُ
“অতঃপর তা থেকে তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করো।”
— ৫:৬
সুতরাং আয়াতের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করলে বিষয়টি দাঁড়ায়:
পানি নেই → পবিত্র ভূমির দিকে উদ্দেশ্য → সেখান থেকে মুখ ও হাত মাসেহ।
অর্থাৎ তায়াম্মুম হলো পানির অনুপস্থিতি বা ব্যবহার-অসম্ভবতার ক্ষেত্রে আল্লাহ নির্ধারিত পবিত্র ভূমিকে উদ্দেশ্য করে পবিত্রতা অর্জনের বিকল্প ব্যবস্থা।
৪. “তায়াম্মুম” মানে কি শুধু “মাটি”?
না। এখানে দুটি শব্দ আলাদা করে দেখা জরুরি:
تَيَمَّمُوا — তায়াম্মামূ
= উদ্দেশ্য করো, অভিমুখী হও, লক্ষ্য করো।
صَعِيدًا طَيِّبًا — সাঈদান ত্বাইয়্যিবান
= পবিত্র/পরিচ্ছন্ন ভূমি।
অতএব, তায়াম্মুম শব্দটির নিজের অর্থ “মাটি” নয়। বরং তায়াম্মুমের ক্ষেত্রে কোন জিনিসের দিকে উদ্দেশ্য করতে হবে, সেটি পরের শব্দ দ্বারা বলা হয়েছে—صَعِيدًا طَيِّبًا।
৫. ৫:৬-এর শেষাংশ তায়াম্মুমের উদ্দেশ্যও জানিয়ে দেয়:
আল্লাহ তায়াম্মুমের বিধান দেওয়ার পর বলেন:
مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ وَلَٰكِن يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ
“আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা/কষ্ট আরোপ করতে চান না; বরং তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান।”
— সূরা আল-মায়িদা, ৫:৬
এখানে কুরআন নিজেই তায়াম্মুমের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করেছে:
কষ্ট সৃষ্টি করা নয় → পবিত্রতা অর্জন করানো।
অর্থাৎ তায়াম্মুম কোনো “পানি না থাকলে সালাত সংযোগ বাদ” দেওয়ার ব্যবস্থা নয়; বরং পানি না পাওয়া বা সংশ্লিষ্ট অক্ষমতার পরিস্থিতিতেও আল্লাহ পবিত্রতার পথ খোলা রেখেছেন।
৬. কুরআন-বিল-কুরআন পদ্ধতিতে সারসংক্ষেপ:
কুরআনের ভেতরের তিনটি ব্যবহার পাশাপাশি রাখলে:
২:২৬৭
وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ“নিকৃষ্ট জিনিসকে উদ্দেশ্য করো না।”
৪:৪৩
فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا“পবিত্র ভূমিকে উদ্দেশ্য করো।”
৫:৬
فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا“পবিত্র ভূমিকে উদ্দেশ্য করো।”
এখানে কুরআনের ব্যবহারের মাধ্যমে একটি মৌলিক অর্থ পরিষ্কার হয়:
تَيَمُّم-এর মূল ভাব হলো—কোনো নির্দিষ্ট কিছুকে উদ্দেশ্য করা, তার দিকে অভিমুখী হওয়া বা তা লক্ষ্য করা।
আর ৪:৪৩ ও ৫:৬-এ সেই উদ্দেশ্যকৃত বিষয় হলো “صَعِيدًا طَيِّبًا”—পবিত্র ভূমি।
এরপর মুখ ও হাত মাসেহ করার মাধ্যমে সেই তায়াম্মুমের ব্যবহারিক রূপ সম্পন্ন হয়।
তাই সহজ ভাষায়:
তায়াম্মুম = পানির পরিবর্তে পবিত্র ভূমিকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহর নির্ধারিত পদ্ধতিতে পবিত্রতা অর্জন করা।
এবং কুরআনের ভাষাগত ব্যবহারে এর কেন্দ্রীয় ধারণা হলো:
“উদ্দেশ্য করা / লক্ষ্য করা / অভিমুখী হওয়া।”
এটি কেবল শব্দের অভিধানগত অর্থ নয়; ২:২৬৭-এর একই কুরআনিক মূলধাতুর ব্যবহার ৪:৪৩ ও ৫:৬-এর অর্থ বুঝতে সরাসরি সহায়তা করে।
কুরআনের আয়াতের শুধু সরাসরি বক্তব্য অনুসরণ করলে বিষয়টি এভাবে বোঝা যায়। আর একটি সংশোধনও জরুরি: “তায়াম্মুম = পানির পরিবর্তে পবিত্র ভূমিকে উদ্দেশ্য করা”—এটি শব্দের অর্থ ও আয়াতের বিধানকে একত্র করে বলা। কুরআন তায়াম্মুমের ব্যবহারিক পদ্ধতিটি পরের অংশে নিজেই বলে দিয়েছে।
কুরআনে কীভাবে করতে বলা হয়েছে?
সূরা আন-নিসা ৪:৪৩:
فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ مِنْهُ
“অতঃপর পানি না পেলে, পবিত্র ভূমিকে তায়াম্মুম করো; তারপর তা থেকে তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করো।”
সূরা আল-মায়িদা ৫:৬-এও একই নির্দেশ এসেছে:
فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًافَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ مِنْهُ
অর্থাৎ কুরআনে সরাসরি যে ধাপগুলো পাওয়া যায়:
১. পানি না পাওয়া →
২. صَعِيدًا طَيِّبًا (সাঈদান ত্বাইয়্যিবান)-কে তায়াম্মুম করা →
৩. তা থেকে মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করা।
এখানে “তায়াম্মুম” শব্দের মূল অর্থ “উদ্দেশ্য/লক্ষ্য করা” হলেও, আয়াতে এটি একটি নির্দিষ্ট পবিত্রতা অর্জনের বিধান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
কিন্তু “সাঈদান ত্বাইয়্যিবান” বলতে কী?
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কুরআন صَعِيدًا طَيِّبًا শব্দটি ব্যবহার করেছে; এর অর্থের মধ্যে পৃথিবীর/ভূমির পৃষ্ঠ বা মাটি-জাত উপাদান বোঝানো হয়। কিন্তু কুরআন ৪:৪৩ বা ৫:৬-এ “কীভাবে হাত মাটিতে মারতে হবে, কতবার, কতটুকু হাত মাসেহ করতে হবে”—এসব বিস্তারিত বলেনি।
তাই শুধু কুরআন-বিল-কুরআন পদ্ধতিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায়:
পানি না থাকলে صَعِيدًا طَيِّبًا গ্রহণ করে তার মাধ্যমে মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন:
তাই আগের বাক্যটিকে আমি আরও নির্ভুলভাবে এভাবে লিখব:
তায়াম্মুম হলো—পানি না পাওয়া গেলে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী صَعِيدًا طَيِّبًا-এর মাধ্যমে মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করে পবিত্রতা অর্জন করা।
এটি ৪:৪৩ ও ৫:৬-এর সরাসরি বক্তব্যের কাছাকাছি, এবং এতে অনুবাদের মধ্যে অতিরিক্ত অর্থ ঢুকে যায় না।
