সালামুন আলা ইব্রাহিম: কুরআনি দুআসমূহ! Dua of Ibrahim (s.a.) Qunut-2

মিল্লাতে ইব্রাহিম বা সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর মিল্লাত বা আদর্শ অনুসরণ করার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হলো কুরআনে বর্ণিত তাঁর সেই কালজয়ী দুআগুলো অর্থসহ বুঝে তারতীলের সাথে তিলাওয়াত করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার চর্চা করা।

একজন মুসলিম হিসেবে সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর দুআগুলো মুখস্থ করা, তারতীলের সাথে তিলাওয়াত করা এবং দৈনন্দিন জীবনে আমল করা শুধু উত্তমই নয়, বরং ঈমানের দাবি। কারণ, সালামুন আলা ইব্রাহিম হলেন 'মিল্লাতে ইব্রাহিম' বা আমাদের জাতির পিতা এবং একত্ববাদের ইমাম। সালামুন আলা মুহাম্মদ-কেও আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর পথ অনুসরণ করতে।

সালামুন আলা ইব্রাহীম: দুুআসমূহ নিচের দিকে দ্র:

মিল্লাতে ইব্রাহিম অনুসরণের নির্দেশ: এবং আমাদের ‘মুসলিম’ নামকরণ:

আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, সালামুন আলা ইব্রাহিম মিল্লাত অনুসরণ করতে হবে। 

➤ তারপর আমরা তোমার কাছে ওহী করেছি যে, তুমি একনিষ্ঠ ইবরাহীমের আদর্শের অনুসরণ করো। আর সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। [সুরা আন-নাহল: ১২৩]

তিনিই সেই মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি আল্লাহর নির্দেশে আমাদের এই জাতির নাম ‘মুসলিম’ রেখেছিলেন। তাই তাঁর দুআ ও আদর্শ ধারণ করা আমাদের জন্য আবশ্যক।

➤  আয়াত 22:৭৮: 
তোমাদের পিতা ইবরাহীমের আদর্শ। সে তোমাদের নাম দিয়েছে মুসলিম, আগেও আর এখনও।

২. ‘কানেত’ (অনুগত) হওয়ার আবশ্যকতা ও কুরআনি দলিল:

আল-কুরআনের আয়াত অনুযায়ী সালামুন আলা ইব্রাহিম ছিলেন ‘কানেতীন’ বা অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর অনুসরণে আমাদেরকেও মুসলিম হিসেবে ‘কানেত’ হতে হবে।

দলিল (সূরা আন-নাহল, আয়াত ১২০):

নিশ্চয় ইব্রাহীম ছিলেন এক উম্মত (নেতা), আল্লাহর প্রতি অনুগত (কানেত), একনিষ্ঠ। আর তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।

(এখানে 'কানেতান' (قَانِتًا) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ হলো যিনি আল্লাহর প্রতি বিনয়ী, দীর্ঘ সময় ইবাদতে দণ্ডায়মান এবং সর্বাবস্থায় অনুগত থাকেন।)

খ. সকল মুসলিমদের 'কানেতীন' হওয়ার সরাসরি নির্দেশ:

আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের বা মুসলিমদের সরাসরি 'কানেতীন' (কানেতগণ) হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সফল মুমিনদের গুণাবলী হিসেবে এর উল্লেখ করেছেন।

দলিল-১ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৩৮): তোমরা সালাতসমূহ এবং মধ্যবর্তী সালাতের (আসরের) সংরক্ষণ করো এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে 'কানেতীন' (বিনীতভাবে অনুগত) হয়ে দাঁড়াও

দলিল-২ (সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৩৫):
আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা ও প্রতিদানপ্রাপ্ত নারী-পুরুষদের তালিকা দিতে গিয়ে বলেন:

... وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ ...
"...এবং অনুগত পুরুষ (আল-কানেতীন) ও অনুগত নারী (আল-কানেতাত)... (আল্লাহ এদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন)।"

দলিল-৩ (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ১৭): মুত্তাকীদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:

الصَّابِرِينَ وَالصَّادِقِينَ وَالْقَانِتِينَ وَالْمُنفِقِينَ وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ
"তারা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, অনুগত (আল-কানেতীন), ব্যয়কারী এবং শেষ রাতে ক্ষমাপ্রার্থনাকারী।"

সুতরাং, একজন মুসলিম হিসেবে নিজেকে দাবি করতে হলে এবং সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর মিল্লাতের ওপর অটল থাকতে আমাদের অবশ্যই 'কানেতীন'-এর অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।

৩. সালামুন আলা ইব্রাহিম’ এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ:

একজন 'কানেত' (অনুগত) বান্দা হওয়ার জন্য সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর দোয়াগুলো আমাদের জন্য সিলেবাস-স্বরূপ। আল্লাহ তায়ালা সূরা আস-সাফফাত-এ তাঁকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, তিনি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাঁর আদর্শ রেখে দিয়েছেন।

 দলিল (সূরা আস-সাফফাত, ১০৮-১০৯):

আর আমি তার (ইব্রাহীমের) জন্য পরবর্তীদের মাঝে এ বিষয় রেখে দিয়েছি যে— ইব্রাহীমের প্রতি সালাম (শান্তি) বর্ষিত হোক।

অনুধাবন: পরবর্তী প্রজন্মের (আমাদের) মাঝে তাঁর স্মরণ রেখে দেয়ার অর্থই হলো, আমরা যেন তাঁর পথ অনুসরণ করি এবং তাঁর ওপর শান্তি বর্ষণের সাথে সাথে তাঁর মাকামে পৌঁছানোর চেষ্টা করি।

৪. সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর আদর্শ থেকে বিমুখ হওয়া বোকামি:

যিনি সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর তরীকা বা আদর্শ মানেন না, আল্লাহ তাকে ‘নির্বোধ’ বা নিজেকে যে বোকা বানায় বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই তাঁর দুআগুলো শেখা বুদ্ধিমান মুমিনের কাজ।

সুরা আল-বাকারা, আয়াত 14:130
কে ইব্রাহিমের মিল্লাতি  থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে ছাড়া যে নিজেকে বোকা বানিয়েছে? নিশ্চয়ই আমি তাকে দুনিয়াতে মনোনীত করেছি এবং আখিরাতেও তিনি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।

৫. নবী সালামুন আলা মুহাম্মদ এবং আমাদের জন্য অনুসরণের নির্দেশ:

স্বয়ং শেষ নবী (সা.)-কে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর মিল্লাত বা পথ অনুসরণ করার জন্য। আমাদেরকে আবার আল্লাহর রাসুলের অনুসরন করতে বলা হয়েছে-আয়াত ৪:৫৯, ৪৭:৩৩, ৫:৯২ তাই এই নির্দেশ আমাদের ওপরও বর্তায়।

অতঃপর (হে মুহাম্মদ!) আমি আপনার প্রতি ওহী প্রেরণ করলাম এই মর্মে যে, আপনি একনিষ্ঠ ইব্রাহিমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করুন। এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না-16:123

উত্তম আদর্শ (উসওয়াতুন হাসানা) হিসেবে গ্রহণ: 

➤ অবশ্যই তোমাদের জন্য ইবরাহীম এবং তার সাথে যারা, তাদের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ (উসওয়াতুন হাসানাহ) (60:4)

অনুধাবন: সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর সমগ্র জীবন এবং আল্লাহর কাছে তাঁর প্রার্থনার ধরণ আমাদের জন্য ‘উত্তম আদর্শ’। এই আদর্শ বাস্তবায়নে তাঁর দুআগুলো মুখস্থ ও আমল করা জরুরি।

মানবজাতীর ইমাম হিসেবে ঘোষণা:

আর স্মরণ করো! যখন ইব্রাহিমকে তাঁর পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে (কালিমাত) পরীক্ষা করলেন, অতঃপর তিনি সেগুলো পূর্ণ করলেন। তখন আল্লাহ বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মানবজাতির জন্য ইমাম (নেতা) বানাব।’..." [সুরা আল-বাকারা: ১২৪]

যেহেতু আল্লাহ তাঁকে মানবজাতির ইমাম বা নেতা বানিয়েছেন, তাই তাঁর শেখানো দুআ এবং আমলগুলো অনুসরণ করা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সালামুন আলা ইব্রাহীম একাত্ববাদের প্রতীক ও যাকে দুনিয়া ও আখেরাতেই কল্যাণ দেয়া হয়েছে:

নিশ্চয় ইবরাহীমই ছিল এক উম্মত, আল্লাহর প্রতি অনুগত, নিষ্ঠাবান। আর সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না; তাঁর অনুগ্রহসমূহের প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি তাকে নির্বাচন করেছিলেন এবং তাকে পথ দেখিয়েছেন সুদৃঢ় পথের দিকে। আর আমরা তাকে দুনিয়ার মধ্যে কল্যাণ দান করেছি এবং সে তো আখিরাতের মধ্যে অবশ্যই সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। আয়াত ১৬:১২০-১২২

▓▒░দুআসমূহ:░▒▓

সালামুন আলা ইব্রাহীমের মুখে উচ্চারিত দুআসমূহ:

আল-কুরআনে সালামুন আলা  ইব্রাহিম-এর অনেকগুলো চমৎকার দুআ বর্ণিত হয়েছে, যা তিনি বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আল্লাহর কাছে করেছিলেন। 

১. আমল কবুল ও মুসলিম হিসেবে অটল থাকার দুআ:

কাবা ঘর নির্মাণের সময় সালামুন আলা  ইব্রাহিম ও সালামুন আলা ইসমাইল-এই দুআটি করেছিলেন।

رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ ۞ رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

রব্বানা- অজ্ব্‘আল্না- মুস্লি­মাইনি লাকা অমিন্ যুর্রিয়্যাতিনা- উম্মাতাম্ মুস্লি­মাতাল্লাকা অআরিনা-মানা-সিকানা-অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-র্বু রাহীম্। রব্বানা-অব্‘আছ্ ফীহিম রাসূলাম্ মিন্হুম্ ইয়াত্লূ ‘আলাইহিম্ আ-ইয়া-তিকা অইয়ূ‘আল্লিমুহুমুল্ কিতা-বা অল্ হিক্মাতা অইয়ুযাক্কী হিম্; ইন্নাকা আংতাল্ ‘আযীযুল্ হাকীম্।    

অর্থ: হে আমাদের রব! আর আমাদের উভয়কে আপনার জন্য মুসলিম এবং আমাদের বংশধারা থেকে আপনার জন্য একটি মুসলিম উম্মত বানান, আর আমাদেরকে আমাদের ইবাদতের নিয়মাবলী/ পদ্ধতি জানিয়ে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করে গ্রহন করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই  তওবা কবুলকারী, একমাত্র দয়ালু।  হে আমাদের রব! আর আপনি তাদের মাঝে তাদের মধ্য থেকে এমন একজন রসূল প্রেরণ করুন, যে তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও প্রজ্ঞা শেখাবে আর তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়- আল কুরআন ২:১২৮, ২:১২৯

২. সৎ ও সলেহীন সন্তান লাভের দুআ:

বার্ধক্য বয়সে নেক সন্তানের আশায় তিনি এই দুআ করেছিলেন।

সুরা আস-সাফফাত: ১০০

رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ

উচ্চারণ: রব্বি হাব লি মিনাস সালিহীন।  অর্থ:  হে আমার রব! আমাকে সালিহীন সন্তান দান করুন।


৩. সালাত ও বংশধরদের জন্য ও মা-বাবার ক্ষমার দুআ:

সুরা ইব্রাহিম: ৪০-৪১

رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ - رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ

উচ্চারণ: রব্বিজ‘আলনী মুক্বীমাস সালাতি ওয়া মিন জুররিয়্যাতী, রব্বানা ওয়া তাক্বাব্বাল দু‘আ। রব্বানাগ ফিরলী ওয়ালি ওয়ালিদাইয়্যা ওয়া লিল মু’মিনিনা ইয়াওমা ইয়াক্বুমুল হিসাব।

অর্থ: হে আমার রব! আমাকে সালাত কায়েমকারী করুন এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের রব! আমার দুআ কবুল করুন। হে আমাদের রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে ক্ষমা করুন, যেদিন হিসাব কায়েম হবে।

৪. প্রজ্ঞা, সুখ্যাতি ও জান্নাতের জন্য দুআ:

সুরা আশ-শুআরা: ৮৩-৮৫

رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ - وَاجْعَل لِّي لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِينَ - وَاجْعَلْنِي مِن وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ

রব্বি হাব লি হুকমাওঁ ওয়া আলহিক্বনী বিস সালিহীন। ওজ‘আল লি লিসানা সিদক্বিন ফিল আখিরীন। ওজ‘আলনী মিঁও ওয়ারাসাতি জান্নাতিন নাঈম।

অর্থ: হে আমার রব! আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের সাথে মিলিত করুন। এবং আমাকে পরবর্তীদের মাঝে সত্যভাষী (সুনামের অধিকারী) করুন। এবং আমাকে নিআমতপূর্ণ জান্নাতের উত্তরাধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।


৫. দেশ ও শহরের নিরাপত্তা এবং জীবিকার দুআ

সুরা আল-বাকারা: ১২৬

رَبِّ اجْعَلْ هَٰذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ مَنْ آمَنَ مِنْهُم بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ

রব্বিজ‘আল হাজা বালাদান আমিনাওঁ ওয়ারজুক্ব আহলাহু মিনাস সামারাতি মান আমানা মিনহুম বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখির।

অর্থ: হে আমার রব! এ স্থানকে আপনি নিরাপদ নগরী করুন এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও কেয়ামতে বিশ্বাস করে, তাদেরকে ফলের দ্বারা রিজিক দান করুন।

৬. আল্লাহর ওপর ভরসা ও কাফেরদের ফেতনা থেকে বাঁচার দুআ:

সুরা আল-মুমতাহিনা: ৪-৫

رَّبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ - رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

রব্বানা ‘আলাইকা তাওয়াক্কালনা ওয়া ইলাইকা আনাবনা ওয়া ইলাইকাল মাসীর। রব্বানা লা তাজ‘আলনা ফিতনাকাল লিল্লাজিনা কাফারু ওয়াগফির লানা রব্বানা, ইন্নাকা আনতাল আযীযুল হাকীম।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা আপনারই ওপর ভরসা করেছি, আপনারই দিকে মুখ করেছি এবং আপনারই নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তন। হে আমাদেররব! আপনি আমাদের কাফেরদের জন্য পরীক্ষার পাত্র করবেন না। হে আমাদের রব! আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।


৭. মূর্তি পূজা থেকে নিরাপদ থাকার দুআ:

সুরা ইব্রাহিম: 14:35

رَبِّ اجْعَلْ هَٰذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ

রব্বিজ‘আল হাজাল বালাদা আমিনাওঁ ওয়াজনুবনী ওয়া বানিয়্যা আন না‘বুদাল আসনাম।

অর্থ: হে আমার রব! এই শহরকে নিরাপদ করুন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন।

৮. কিয়ামতের দিন লাঞ্ছনা থেকে মুক্তির দুআ:

সুরা আশ-শুআরায় বর্ণিত আগের দুআটির ( ক্রমিক নং ৪) ধারাবাহিকতায় তিনি পরকালের অপমানের হাত থেকে বাঁচার জন্য এই আকুতি জানিয়েছিলেন।

সুরা আশ-শুআরা: ৮৭-৮৯

وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ - يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ - إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ

ওয়া লা তুখযিনী ইয়াওমা ইউব‘আছূন। ইয়াওমা লা ইয়ানফা‘উ মালুঁও ওয়া লা বানূন। ইল্লা মান আতাল্লাহা বিক্বালবিন সালিম।

অর্থ: এবং (পুনরুত্থান দিবসে) যেদিন সকলকে জীবিত করে উঠানো হবে, সেদিন আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না। যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না; কিন্তু যে সুস্থ (পাপমুক্ত) অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে (সে মুক্তি পাবে)।


৯. পরিবারকে রেখে আসার সময় দুআ

সুরা ইব্রাহিম: ৩৭

رَّبَّنَا إِنِّي أَسْكَنتُ مِن ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِندَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُم مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ

উচ্চারণ: রব্বানা ইন্নী আসকানতু মিন জুররিয়্যাতী বিওয়াদিন গইরি যী যার‘ইন ‘ইনদা বাইতিকাল মুহাররম; রব্বানা লিইয়ুক্বীমুস সালাতা ফাজ‘আল আফয়িদাতাম মিনান নাসি তাহওয়ী ইলাইহিম ওয়ারযুক্বহুম মিনাস ছামারাতি লা‘আল্লাহুম ইয়াশকুরুন।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের একাংশকে আপনার পবিত্র ঘরের নিকট এক চাষাবাদহীন উপত্যকায় পুনর্বাসিত করলাম। হে আমাদের রব! যাতে তারা সালাত কায়েম করে। অতএব আপনি কিছু মানুষের অন্তরকে তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং তাদেরকে ফলাদি দ্বারা রিজিক দান করুন, হয়তো তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।


১০. একনিষ্ঠ তাওহীদের ঘোষণা ও দুআ:

সুরা আল-আনআম: ৭৯

إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا ۖ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ

ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাত্বরস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানীফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন।

অর্থ: আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফেরালাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।


১১. পিতার মাগফিরাত কামনার দুআ (বিশেষ দ্রষ্টব্যসহ)

সুরা আশ-শুআরা: ৮৬

وَاغْفِرْ لِأَبِي إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّينَ

ওয়াগফির লি আবী, ইন্নাহু কানা মিনাদ দাললীন।

অর্থ: এবং আমার পিতাকে ক্ষমা করুন, নিঃসন্দেহে তিনি পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত।

(দ্রষ্টব্য: এই দুআটি  সালামুন আলা ইব্রাহিম করেছিলেন তাঁর পিতাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কারণে। কিন্তু যখন স্পষ্ট হলো পিতা ঈমান আনবে না, তিনি সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তাই কাফের অবস্থায় মৃত কারো জন্য এই দুআ করা জায়েজ নয়।)


১২. আল্লাহর কাছে জ্ঞান ও হেদায়েতের আবদার

তিনি নক্ষত্রপুঞ্জ দেখে আল্লাহর পরিচয় খুঁজতে গিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহ যদি হেদায়েত না দেন তবে তিনি পথভ্রষ্ট হয়ে যাবেন। এটিও এক প্রকার বিনয়ের দুআ।

সুরা আল-আনআম: ৭৭ (অংশবিশেষ)

لَئِن لَّمْ يَهْدِنِي رَبِّي لَأَكُونَنَّ مِنَ الْقَوْمِ الضَّالِّينَ

লা ইল্লাম ইয়াহ্দিনী রব্বী লা-আকূনান্না মিনাল ক্বাওমিদ দাললীন।

অর্থ: আমার পালনকর্তা যদি আমাকে পথপ্রদর্শন না করেন, তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।

১৩. আল্লাহর সর্বজ্ঞানের স্বীকৃতি ও মনের আকুতি:

সুরা ইব্রাহিম: 14:38

رَبَّنَا إِنَّكَ تَعْلَمُ مَا نُخْفِي وَمَا نُعْلِنُ ۗ وَمَا يَخْفَىٰ عَلَى اللَّهِ مِن شَيْءٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ

রব্বানা ইন্নাকা তা‘লামু মা নুখফী ওয়ামা নু‘লিন; ওয়ামা ইয়াখফা ‘আলাল্লাহি মিন শাইয়িন ফিল আরদি ওয়া লা ফিস সামা।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা যা গোপন করি এবং যা প্রকাশ করি, নিশ্চয় আপনি তা জানেন। আর আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না।


১৪. অন্তরের প্রশান্তির জন্য দুআ

আল্লাহ মৃতকে কীভাবে জীবিত করবেন, তা স্বচক্ষে দেখে অন্তরের প্রশান্তি লাভের জন্য তিনি এই আবদারটি করেছিলেন।

সুরা আল-বাকারা: ২৬০

رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَىٰ

রব্বি আরিনী কাইফা তুহ্য়িল মাওতা।

অর্থ: হে আমার রব! আমাকে দেখান, আপনি কীভাবে মৃতকে জীবিত করেন।

(আল্লাহ তখন জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি বিশ্বাস করো না?" তিনি উত্তরে বললেন, "অবশ্যই বিশ্বাস করি, কিন্তু আমার অন্তরের প্রশান্তির জন্য দেখতে চাইলাম।")


১৫. জীবনের সবকিছু আল্লাহর নামে উৎসর্গ (দোয়ায়ে ইস্তিফতাহ):

সুরা আল-আনআম: ১৬২-১৬৩

إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ - لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ

ইন্না সালাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহ্য়ায়া ওয়া মামাতী লিল্লাহে রব্বিল আলামীন। লা-শারীকা লাহু ওয়া বিজালিকা উমিরতু ওয়া আনা আউয়ালুল মুসলিমীন।

অর্থ: নিশ্চয় আমার সালাত, আমার নুসুখ, আমার জীবন এবং আমার মরণ বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি এ বিষয়েই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী)।


১৬. হিজরতের সময় (বের হওয়ার সময়) আল্লাহর ওপর আস্থার দুআ: যখন তিনি নিজ কওম ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর পথে হিজরত করছিলেন, তখন এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন যা পরোক্ষভাবে হেদায়েতের দুআ।

সুরা আস-সাফফাত: ৯৯

إِنِّي ذَاهِبٌ إِلَىٰ رَبِّي سَيَهْدِينِ

ইন্নী জাহিবুন ইলা রব্বী সাইয়াহদীন।

অর্থ: আমি আমার রবের দিকে চললাম, তিনি অবশ্যই আমাকে পথপ্রদর্শন করবেন।


১৭. সন্তান লাভের পর কৃতজ্ঞতার দুআ:

সালামুন আলা ইসমাইল ও ইসহাক-কে লাভ করার পর তিনি মহান আল্লাহর দরবারে এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। এটি 'শুকরিয়া' আদায়ের একটি দুআ।

সুরা ইব্রাহিম: ৩৯

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبَ لِي عَلَى الْكِبَرِ إِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ ۚ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ

আলহামদুলিল্লাহিল্লাজী ওহহাবালী ‘আলাল কিবারি ইসমাঈলা ওয়া ইসহাক্ব; ইন্না রব্বী লা-সামী‘উদ্দু‘আ।

অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর! যিনি আমাকে বার্ধক্যে ইসমাইল ও ইসহাককে দান করেছেন। নিশ্চয় আমার পালনকর্তা দুআ শ্রবণ করেন।


১৮. পিতার কাছ থেকে বিদায় নেওয়া ও হেদায়েতের দুআ:

পিতা যখন তাঁকে পাথর মেরে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন, তখন তিনি অত্যন্ত ভদ্রতার সাথে বিদায় নেন এবং আল্লাহর কাছে দুআ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সুরা মারইয়াম: ৪৭-৪৮

 سَلَامٌ عَلَيْكَ ۖ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي ۖ إِنَّهُ كَانَ وَمَا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ وَأَدْعُو رَبِّي عَسَىٰ أَلَّا أَكُونَ بِدُعَاءِ رَبِّي شَقِيًّا

উচ্চারণ: সালামুন ‘আলাইক, সা-আস্তাগফিরু লাকা রব্বী, ইন্নাহু কানা বী হাফিয়্যা। ওয়া আ‘তাযিলুকুম ওয়ামা তাদ‘ঊনা মিন দুনিল্লাহি ওয়া আদ‘ঊ রব্বী, ‘আসা আল্লা আকূনা বি-দু‘আয়ি রব্বী শাক্বিয়্যা।

অর্থ: সে বলল, সালাম তোমার প্রতি। অবশ্যই আমি তোমার জন্য আমার রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয় তিনি হলেন আমার প্রতি যত্নবান। এবং আমি তোমাদেরকে এবং সেসবকে ছেড়ে যাচ্ছি, আল্লাহর পরিবর্তে যার উপাসনা তোমরা করো। আর আমি আমার রবকেই ডাকব। আশা করি যে, আমার রবকে ডেকে আমি বিফল হব না।


১৯. আল্লাহর পরিচয় ও অসুস্থতা থেকে মুক্তির বিশ্বাস (শেফার আয়াত):

সুরা আশ-শুআরায় মূল দুআ করার আগে তিনি আল্লাহর গুনাগুন বর্ণনা করেছিলেন। এর মধ্যে একটি আয়াত (৮০ নং) রোগমুক্তির জন্য বহুল পঠিত।

সুরা আশ-শুআরা: ৭৮-৮২

الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ - وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ - وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ - وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ - وَالَّذِي أَطْمَعُ أَن يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ

আল্লাজী খলাক্বানী ফাহুয়া ইয়াহদীন। ওয়াল্লাজী হুয়া ইউত্ব‘ইমুনী ওয়া ইয়াসক্বীন। ওয়া ইজা মারিদতু ফাহুয়া ইয়াশফীন। ওয়াল্লাজী ইউমীতুনী সুম্মা ইউহ্য়ীন। ওয়াল্লাজী আতমা‘উ আঁ ইয়াগফিরা লী খত্বী-আতী ইয়াওমাদ্দ্বীন।

অর্থ: যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনিই আমাকে পথপ্রদর্শন করেন। যিনি আমাকে আহার ও পানীয় দান করেন। এবং যখন আমি রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন। যিনি আমার মৃত্যু ঘটাবেন, অতঃপর পুনরায় জীবিত করবেন। এবং যার কাছে আমি আশা করি যে, বিচারের দিন তিনি আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেবেন।


২০. স্রষ্টার প্রতি একনিষ্ঠতার চূড়ান্ত ঘোষণা: 

নিজের সম্প্রদায়ের মূর্তি পূজার অসারতা তুলে ধরে তিনি আল্লাহর প্রতি তাঁর অটল বিশ্বাসের কথা এভাবে ঘোষণা করেন।

সুরা আয-যুখরুফ: ২৬-২৭

إِنَّنِي بَرَاءٌ مِّمَّا تَعْبُدُونَ - إِلَّا الَّذِي فَطَرَني فَإِنَّهُ سَيَهْدِينِ

ইন্নানী বারাউম মিম্মা তা‘বুদুন। ইল্লাল্লাজী ফাত্বরনী ফা-ইন্নাহু সাইয়াহদীন।

অর্থ: তোমরা যাদের পূজা করো, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে (সম্পর্ক আছে) তাঁর সাথে, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন; অতএব নিশ্চয় তিনি আমাকে সৎপথ প্রদর্শন করবেন।


তবে কুরআনে তাঁর এমন কিছু ‘ঈমানী ঘোষণা’, ‘যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক’ এবং ‘দাওয়াতী সম্ভাষণ’ রয়েছে, যা দুআর মতোই অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আমাদের ঈমান ও আকিদা শুদ্ধ করার জন্য খুব জরুরি। এগুলোকে ‘তাওহীদের ঘোষণা’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

নিচে এমন আরও ৪টি বিশেষ অংশ দেওয়া হলো:

২১. নমরুদের সামনে আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরা:

যখন তৎকালীন প্রতাপশালী বাদশাহ নমরুদ সালামুন আলা  ইব্রাহিম-এর সাথে আল্লাহ সম্পর্কে তর্কে লিপ্ত হয়, তখন তিনি সাহসিকতার সাথে আল্লাহর পরিচয় দিয়েছিলেন। এটি ঈমানি জোর বৃদ্ধির জন্য একটি শক্তিশালী উক্তি।

সুরা আল-বাকারা: ২৫৮ (অংশবিশেষ)

رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ

রব্বিয়াল্লাজী ইউহ্য়ি ওয়া ইউমীত।

অর্থ: আমার পালনকর্তা তিনি, যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান।

(যখন নমরুদ দাবি করল সেও তা করতে পারে, তখন ইব্রাহিম (আ.) বলেছিলেন: "আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি পশ্চিম দিক থেকে উদিত করো।" তখন সে নিরুত্তর হয়ে গিয়েছিল।)


২২. নশ্বর উপাস্যের প্রতি অনাসক্তি প্রকাশ (লা-উহিব্বুল আফিলিন):

আল্লাহর পরিচয় খুঁজতে গিয়ে তিনি নক্ষত্র, চাঁদ ও সূর্যের অস্ত যাওয়া দেখে যে ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন, তা শিরক বর্জনের জন্য একটি শ্রেষ্ঠ বাক্য।

সুরা আল-আনআম: ৭৬

لَا أُحِبُّ الْآفِلِينَ

উচ্চারণ: লা-উহিব্বুল আফিলীন।

অর্থ: আমি অস্তগামী বা ডুবে যাওয়া বস্তুকে (উপাস্য হিসেবে) পছন্দ করি না।


২৩. পিতার হেদায়েতের জন্য করুণ আকুতি:

সুরা মারইয়ামে তিনি তাঁর পিতাকে ‘হে আমার পিতা’ (ইয়া আবাতি) বলে বারবার সম্বোধন করেছেন। যদিও এগুলো সরাসরি দুআ নয়, কিন্তু প্রতিটি বাক্যে পিতার পরকাল নিয়ে তাঁর গভীর শঙ্কা ও ভালোবাসার আকুতি ফুটে উঠেছে।

সুরা মারইয়াম: ১৯:৪২, ৪৪ ও ৪৫

يَا أَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لَا يَسْمَعُ وَلَا يُبْصِرُ وَلَا يُغْنِي عَنكَ شَيْئًا - يَا أَبَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطَانَ - يَا أَبَتِ إِنِّي أَخَافُ أَن يَمَسَّكَ عَذَابٌ مِّنَ الرَّحْمَنِ

উচ্চারণ:
ইয়া আবাতি, লিমা তা‘বুদু মা লা ইয়াসমা‘উ ওয়া লা ইউবসিরু ওয়া লা ইউগনী ‘আনকা শাইয়্যা।
ইয়া আবাতি, লা তা‘বুদিশ শাইত্বান।
ইয়া আবাতি, ইন্নী আখাফু আইঁ ইয়ামাসসাকা ‘আজাবুম মিনার রহমান।

অর্থ:  হে আমার পিতা! কেন আপনি এমন বস্তুর ইবাদত করেন, যা শোনে না, দেখে না এবং আপনার কোনো উপকারে আসে না?
হে আমার পিতা! আপনি শয়তানের ইবাদত করবেন না।
হে আমার পিতা! আমি আশঙ্কা করছি যে, দয়াময় আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনাকে আজাব স্পর্শ করবে।


২৪. মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সত্যের সাক্ষ্যদান

যখন তাঁর কওম জিজ্ঞেস করল, কে মূর্তিগুলো ভেঙেছে? তখন তিনি কৌশলে উত্তর দেওয়ার আগে আল্লাহর রুবুবিয়াতের (প্রভুত্বের) সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

সুরা আল-আনবিয়া: ৫৬

بَل رَّبُّكُمْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الَّذِي فَطَرَهُنَّ وَأَنَا عَلَىٰ ذَٰلِكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ

বাল রব্বুকুম রব্বুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদিল্লাজী ফাত্বারহুন্না, ওয়া আনা ‘আলা যালিকুম মিনাশ শাহিদীন।

অর্থ: বরং তোমাদের পালনকর্তা তো তিনিই, যিনি আসমান ও জমিনের পালনকর্তা, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন; এবং আমি এ বিষয়ে অন্যতম সাক্ষী।

▓▒░শর্ত প্রযোজ্য░▒▓

মুশরেক-মুনাফেক-কাফের ও ফাসেকদের জন্য কোনো ক্ষমা প্রার্থনা নাই মৃতুর পরেও না: আয়াত ৯:১১৩-১১৪, ৯:৮০, ৯:৮৪-৮৫

তবে-

আর ইবরাহীমের তার পিতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা একটি প্রতিশ্রুতির অন্তর্ভুক্ত ছাড়া ছিল না, যে প্রতিশ্রুতি সে কেবল তাকেই দিয়েছিল। এরপর যখন তার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার থেকে দায়মুক্ত হয়ে গেল। নিশ্চয় ইবরাহীম অবশ্যই কোমলপ্রাণ, সহনশীল-আয়াত ৯:১১৪


সমাপ্তি:

আল-কুরআনে সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর জীবনের বাঁকে বাঁকে উচ্চারিত প্রায় প্রতিটি প্রার্থনামূলক বাক্য, মুনাজাত এবং ঈমানী ঘোষণা আমরা এই ৪টি পর্বের মাধ্যমে আলোচনা করেছি। এই আয়াতগুলো একজন মুমিনের জীবনের পাথেয়।

দুআয়ে কুনুত: পাঠ করতে ও জানতে এখানে ক্লিক করুন

https://dua24careandshare.blogspot.com/2025/11/qunut.html

সালামুন আলা ইব্রাহীম: দুুআসমূহ 

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post