জালেম ও জুলুমকারীর থেকে সুরক্ষার অনুধ্যান এবং আশ্রয়-সাহায্য কামনায় আবেদন: কুরআনি দুআ-দরখাস্ত-তাসবিহ (DUA: Jalim-Zulm)

আল কুরআন মাজীদ মানবজাতির জন্য এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যেখানে ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল সংকট উত্তরণের নিখুঁত দিকনির্দেশনা রয়েছে। পৃথিবীতে যখনই কোনো পরাক্রমশালী শাসক বা ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করে জুলুমের পথ বেছে নিয়েছে, তখনই আল্লাহ রব্বুল আলামিন মজলুম বা নিপীড়িতদের সুরক্ষার জন্য তাঁর নিজস্ব কৌশল ও বাণী অবতীর্ণ করেছেন। 

জুলুমের মনস্তত্ত্ব :

আল কুরআনে ‘জুলুম’ (ظُلْم) শব্দটি অত্যন্ত গভীর ও বিস্তৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ভাষাগতভাবে জুলুম অর্থ হলো ‘কোনো কিছুকে তার নিজস্ব ও সঠিক স্থান থেকে সরিয়ে অন্য স্থানে রাখা’ অথবা ‘অন্ধকার’ (জুলুমাত)। যে ব্যক্তি বা শাসক ন্যায়ের আলো থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে, সে মূলত নিজেকে এবং সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।

আল্লাহ সু.তা. আল কোরআনে স্পষ্ট করেছেন:

"আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার (জুলুমাত) থেকে বের করে আলোর (নূর) দিকে নিয়ে যান।" (২:২৫৭)

এই আয়াতের অনুধাবন থেকে বোঝা যায়, জালেম শাসক বা ব্যক্তির সৃষ্ট নিপীড়ন হলো একপ্রকার ‘অন্ধকার’ বা জুলুমাত। আর এই অন্ধকার থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো আল্লাহ রব্বুল আলামিনের ‘নূর’ বা আলোর আশ্রয় গ্রহণ করা। জুলুম (ظلم) শব্দের বিপরীতে আল কুরআনে ‘আদল’ (عدل - ন্যায়বিচার) এবং ‘ক্বিস্ত’ (قسط - ইনসাফ) শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। জালেম যখন আদল বা ইনসাফকে হত্যা করে, তখন মজলুমের জন্য আল্লাহর সরাসরি সাহায্য প্রার্থনা করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না।

জালেমের দম্ভ বনাম মজলুমের সমর্পণ: তুলনামূলক বিশ্লেষণ:

আল কুরআন মাজীদে জালেম শাসকের চূড়ান্ত প্রতিমূর্তি হিসেবে ‘ফিরাউন’-এর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ফিরাউনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল কোরআন ‘ইস্তিকবার’ (অহংকার) এবং ‘উত্তীর্ণ হওয়া বা সীমালঙ্ঘন করা’ (তাগুত/طغى) শব্দগুলো ব্যবহার করেছে। ফিরাউন বলেছিল, “আমিই তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ রব” (৭৯:২৪)।

এর বিপরীতে, যখনই কোনো নবী বা মুমিন এই ধরনের তাগুত বা জালেমের মুখোমুখি হয়েছেন, তাঁরা নিজেদের ক্ষমতা বা জনবলের ওপর ভরসা করেননি, বরং চরম সমর্পণ বা ‘তাওয়াক্কুল’-এর মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চেয়েছেন।

সালামুন আলা মূসা যখন ফিরাউনের জুলুমের ভয়ে শহর থেকে বের হয়ে গেলেন, তখন তাঁর মানসিক অবস্থা এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর নির্ভরশীলতার চিত্র আল কুরআনে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গ্রন্থিত হয়েছে:

"অতঃপর সে সেখান থেকে ভীত-সতর্ক অবস্থায় বের হয়ে পড়ল। সে বলল, 'হে আমার রব, আমাকে জালেম সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা করুন'।" (২৮:২১)

লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, এই আয়াতে মূসা (সালামুন আলাইহে) ফিরাউনের বিশাল সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অস্ত্র চাননি, বরং তিনি জালেমদের (ক্বাওমিজ-জ্বলিমিন) থেকে কেবল ‘নাজাত’ বা মুক্তি চেয়েছেন। এর ঠিক পরপরই আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁকে মাদিয়ানে নিরাপত্তা প্রদান করেন। এটি কুরআনের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যতার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত—যেখানে মজলুমের মুখের একটি শব্দ (রব্বি নাজ্জিনি) সরাসরি আল্লাহর আশ্রয়ের (নিরাপত্তা) সাথে যুক্ত হয়ে যায়।

সুরক্ষার আধ্যাত্মিক (Metaphysical) সামঞ্জস্য ও অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত:

জালেমের জুলুম থেকে সুরক্ষার ক্ষেত্রে আল কোরআন কেবল বাহ্যিক পলায়ন বা প্রতিরক্ষার কথাই বলে না, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক বর্ম বা মেটাফিজিক্যাল প্রটেকশনের ইঙ্গিত দেয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ‘তাসবিহ’ বা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা।

সালামুন আলা ইউনুস যখন মাছের পেটে অন্ধকারে আটকা পড়লেন—যাকে কুরআনে ‘জুলুমাত’ (অন্ধকারসমূহ) বলা হয়েছে—তখন তিনি কোনো সাধারণ দুআ করেননি, বরং তিনি করেছিলেন ‘তাসবিহ’।
"অতঃপর সে অন্ধকার থেকে ডেকে বলেছিল- 
'আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয়ই আমি ছিলাম জালেমদের অন্তর্ভুক্ত'।" (২১:৮৭)

এই আয়াতের অনুধ্যান অত্যন্ত সূক্ষ্ম। ইউনুস (সালামুন আলাইহে) নিজেকে ‘জালেম’ বলে স্বীকার করে আল্লাহর পবিত্রতা (সুবহানাকা) ঘোষণা করেছেন। যখন কোনো ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করে চরম বিনয়ের সাথে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে, তখন পৃথিবীর কোনো জালেম শাসক বা ব্যক্তির তৈরি করা অন্ধকার তাকে আর আবদ্ধ রাখতে পারে না। এই আয়াতের ইমপ্লাইড এভিডেন্স বা অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত হলো—জালেমের জুলুম থেকে বাঁচতে হলে মজলুমকে সর্বাগ্রে নিজের আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর একত্বের (তাওহীদ) ওপর নিঃশর্ত সমর্পণ করতে হবে।

একইভাবে, সালামুন আলা ইব্রাহীম-কে যখন তৎকালীন জালেম শাসক নমরুদ আগুনে নিক্ষেপ করল, তখন আগুন তার স্বভাবজাত দাহ্য ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। আল্লাহ রব্বুল আলামিন নির্দেশ দিলেন:

"হে আগুন, তুমি ইব্রাহীমের ওপর শীতল ও নিরাপদ (বারদান ওয়া সালামা) হয়ে যাও।" (২১:৬৯)

এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর সাহায্য কেবল শত্রুকে ধ্বংস করার মাধ্যমেই আসে না, বরং তিনি চাইলে শত্রুর অস্ত্রের বা জুলুমের প্রকৃতিরই মেটাফিজিক্যাল পরিবর্তন ঘটিয়ে মজলুমকে সুরক্ষা দিতে পারেন।

আয়াতসমূহের পারস্পরিক সংযুক্তি:

আল কোরআনের সূরা নিসার ৭৫ নম্বর আয়াতে মুমিনদেরকে মজলুম নারী, পুরুষ ও শিশুদের রক্ষার্থে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। সেখানে মজলুমদের একটি চমৎকার দুআর উল্লেখ রয়েছে:

"হে আমাদের রব, এই জনপদ—যাহার অধিবাসীরা জালেম—তা থেকে আমাদেরকে বের করে নিন এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন অভিভাবক নির্ধারণ করে দিন, এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দিন।" (৪:৭৫)

এই আয়াতের সাথে যদি আমরা সূরা আল-আম্বিয়ার সাহায্যে ফিরাউনের ধ্বংসের আয়াতগুলোর ক্রস-রেফারেন্স বা তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি, তবে দেখব—মজলুম যখন সালাত ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চায়, আল্লাহ সু.তা. জালেমকে তার নিজস্ব অহংকারের ভেতরেই ডুবিয়ে মারেন। ফিরাউন পানিতে ডুবেছিল (১০:৯০), যা তার শক্তিরই একটি উৎস ছিল। অর্থাৎ, জালেমের শক্তির উৎসই তার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যখন মজলুম আল্লাহর কাছে সঠিক শব্দগুচ্ছে সাহায্য প্রার্থনা করে।

উপর্যুক্ত বিশ্লেষণ থেকে এই যৌক্তিক পূর্ণতায় পৌঁছানো যায় যে, জালেম শাসক বা ব্যক্তির জুলুম কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। আল কোরআনের ভাষ্যমতে, জুলুম হলো অন্ধকারের সমতুল্য, আর আল্লাহর সাহায্য হলো আলো। মজলুম ব্যক্তি যখন চরম অসহায়ত্বে সালাত, ধৈর্য ও নির্দিষ্ট কুরআনি দুআ-তাসবিহের মাধ্যমে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সাথে তার আত্মিক সংযোগ স্থাপন করে, তখন আল্লাহর ‘নূর’ সেই জুলুমের অন্ধকারকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এই সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন নিষ্কলুষ ঈমান, তাওয়াক্কুল এবং তাসবিহের মাধ্যমে আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা।

▓▒░আশ্রয় প্রার্থনা░▒▓ 

নিজকে নিজ জুলম বা অন্ধকার (জুলুমাত) থেকে বের হয়ে আলোর (নূর) দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য রবের কাছে ধর্না দেয়া-আবেদন-দরখাস্ত পেশ- (দ্র: ২:২৫৭):

এবং

জালেমের জুলুম থেকে সুরক্ষায় আশ্রয় প্রার্থনা:

নিম্নে আল কুরআন মাজীদে বর্ণিত এমন কিছু সুনির্দিষ্ট দুআ ও তাসবিহ উল্লেখ করা হলো, যা নবী-রাসূলগণ এবং মুমিনগণ জালেমের হাত থেকে মুক্তির জন্য ব্যবহার করেছেন:

1. সালামুন আলা মূসা-এর পলায়নকালীন দুআ (জালেমদের থেকে মুক্তির জন্য):

رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
রব্বি নাজ্জিনী মিনাল ক্বাওমিজ-জ্বলিমীন।

অর্থ: হে আমার রব, আমাকে জালেম সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা করুন (২৮:২১)

2. সালামুন আলা ইউনুস-এর তাসবিহ (সর্বপ্রকার বিপত্তি ও অন্ধকার থেকে মুক্তির জন্য):

لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
লা-ইলা-হা ইল্লা- আংতা সুবহা-নাকা ইন্নী কুংতু মিনাজ-জ্বলিমীন।

অর্থ: আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয়ই আমি ছিলাম জালেমদের (সীম লঙ্ঘনকারীদের) অন্তর্ভুক্ত। (২১:৮৭)

رَبَّنَا ظَلَمْنَآ أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ ٱلْخَـٰسِرِينَ

রব্বানা-জোয়ালাম্না- আন্ফুসানা- অইল্লাম্ তার্গ্ফিলানা-অর্তাহাম্না-লানাকূনান্না মিনাল্ খা-সিরীন্।  ইন্নাহূ হুঅত তাওঅ-বুর রাহীম্।   

অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নিজেদের উপর জুলুম করেছি। আর যদি না আপনি আমাদের জন্য ক্ষমা করেন এবং আমাদের অনুগ্রহ করেন, নিশ্চয়ই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব-আল কুরআন ৭:২৩

إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

ইন্নাহূ হুঅত তাওঅ-বুর রাহীম্। অর্থ: নিশ্চয়ই তিনি, তিনিই তওবা কবুলকারী, দয়ালু- আল কুরআন ২:৩৭  

3. দুর্বল ও মজলুমদের আর্তনাদের দুআ (জালেমদের জনপদ থেকে উদ্ধার ও অভিভাবকত্ব লাভের জন্য)/ বাড়াবাড়িকারী সমাজ থেকে হিজরত বা মুক্তির দুআ:

সূরা নিসায় আল্লাহ সেই সব দুর্বল নারী, পুরুষ ও শিশুদের চিত্র তুলে ধরেছেন, যাদের ওপর সমাজ চরম বাড়াবাড়ি করছিল। তাদের আর্তনাদ আল্লাহ দুআ হিসেবে কুরআনে গেঁথে দিয়েছেন:

 رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَٰذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا

রব্বানা আখরিজনা মিন হাযিহিল ক্বারইয়াতিয যালিমি আহলুহা, ওয়াজ‘আল লানা মিল লাদুনকা ওয়ালিয়্যাও ওয়াজ‘আল লানা মিল লাদুনকা নাসীরা।

হে আমাদের রব! আমাদেরকে এই জনপদ থেকে বের করুন, যার অধিবাসীরা জালিম। আর আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন অভিভাবক নির্ধারণ করে দিন এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দিন। (৪:৭৫)

4. অসৎ সঙ্গ ত্যাগ এবং জালিম ও জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার কুরআনি দোয়া: 

কুরআনের সতর্কতা: আর সেই জনপদসমূহ, আমরা তাদের ধ্বংস করেছি, যখন তারা জুলুম করেছিল-18:59 (18:56-59, 32:22)

অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করতে, জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে বাঁচতে এবং নিজেকে জাহান্নামীদের সাথী হওয়া থেকে রক্ষা করতে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ৩টি অত্যন্ত কার্যকরী দোয়া নিচে দেওয়া হলো:

জালিম জনগোষ্ঠীর সাথী না হওয়ার দোয়া: জান্নাতি ও জাহান্নামীদের কথোপকথনের এক পর্যায়ে এই দোয়াটির কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
রব্বানা- লা- তাজ‘আলনা- মা‘আল ক্বাওমিয যলিমীন।
অর্থ: "হে আমাদের রব! আমাদেরকে জালিম (অত্যাচারী) সম্প্রদায়ের সাথী করবেন না।"
(সূরা আল-আরাফ, আয়াত: 7:47)

২. নিজেকে জালিমদের দলভুক্ত না করার দোয়া: সালামুন আলা মূসা তাঁর রবের কাছে নিজের এবং তাঁর ভাইয়ের জন্য এই দোয়া করেছিলেন।

وَلَا تَجۡعَلۡنِي مَعَ ٱلۡقَوۡمِ ٱلظَّـٰلِمِينَ
ওয়া লা- তাজ‘আলনী মা‘আল ক্বাওমিয যলিমীন। অর্থ: "এবং আমাকে জালিম (অত্যাচারী) সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।" (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: 7:150)

৩. জাহান্নামীদের সাথী না হওয়ার নিশ্চিত দোয়া

পৃথিবীতে যখন আল্লাহর আযাব বা শাস্তি নেমে আসে, তখন সেই শাস্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালার শেখানো দুআ:

 رَّبِّ إِمَّا تُرِيَنِّي مَا يُوعَدُونَ ۚ رَبِّ فَلَا تَجْعَلْنِي فِي الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
রব্বি ইম্মা- তুরিয়ান্নী মা- ইয়ূ‘আদূন। রব্বি ফালা- তাজ‘আলনী ফিল ক্বাওমিয যলিমীন।

অর্থ: "হে আমার রব! তাদেরকে যে শাস্তির ভয় দেখানো হচ্ছে, তা যদি আপনি আমাকে দেখানই; তবে হে আমার রব! আপনি আমাকে জালিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।" (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত: 23:93-94)

4. জালিমের আগ্রাসন ও ফিতনা থেকে মুক্তির দুআ: তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর চূড়ান্ত নির্ভরতার দুআ (জালেমদের ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য):

رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ ۝ وَنَجِّنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
রব্বানা- লা- তাজ‘আলনা- ফিতনাতাল লিলক্বাওমিজ-জ্বলিমীন। ওয়া নাজ্জিনা- বিরহমতিকা মিনাল ক্বাওমিল কা-ফিরীন।

অর্থ: হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে জালেম সম্প্রদায়ের জন্য ফিতনার (নির্যাতনের) পাত্র বানাবেন না। এবং আপনার অনুগ্রহে আমাদেরকে কাফির সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা করুন (১০:৮৫-৮৬)

 رَّبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ  رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

রব্বানা-‘আলাইকা তাওয়াক্কাল্না-অইলাইকা আনাব্না-অইলাইকাল্ মাছী-র। রব্বানা- লা- তাজ্ব ‘আল্না- ফিতœাতাল্ লিল্লাযীনা কাফারূ অর্গ্ফিলানা-রব্বানা -ইন্নাকা আংতাল ‘আযীযুল্ হাকীম্।  

অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা আপনার উপরই ভরসা করি এবং আপনার দিকে আমরা মুখ ফেরাই আর আপনার কাছেই প্রত্যাবর্তনস্থল। হে আমাদের রব! যারা কুফর করেছে আমাদেরকে তাদের জন্য ফিতনা বানাবেন না। আর আমাদেরকে ক্ষমা করুন। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই  পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়- আল কুরআন ৬০:৪, ৬০:৫

6. বাড়াবাড়ি ও ত্রুটি থেকে ক্ষমার দুআ (মস্তবড় বিপদেও স্থীর/দৃঢ় থাকার সাহায্য কামনায়):

 رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

রব্বানাগফির লানা যুনূবানা ওয়া ইসরফানা ফী আমরিনা ওয়া ছাব্বিত আক্বদামানা ওয়ানসুরনা ‘আলাল ক্বাওমিল কাফিরীন।

হে আমাদের রব! আমাদের পাপসমূহ এবং আমাদের কাজের মধ্যকার বাড়াবাড়িগুলো (ইসরফ) ক্ষমা করে দিন, আমাদের পা সুদৃঢ় রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন। (৩:১৪৭)

একইভাবে, ইউনুস (সালামুন আলাইহে) যখন সাময়িকভাবে অধৈর্য হয়ে তাঁর জাতির প্রতি রাগ করে চলে গিয়েছিলেন, তখন তিনি মাছের পেটে বসে উপলব্ধি করেন যে, এটি তাঁর নিজের ওপর একটি জুলুম বা বাড়াবাড়ি ছিল। এই অনুধাবন থেকে তিনি যে তাসবিহ পাঠ করেছিলেন, তা বিপদে পড়া যেকোনো মানুষের জন্য নিজের নফসের ওপর করা বাড়াবাড়ি থেকে মুক্তির এক শাশ্বত আশ্রয়।

কাফির জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাহায্য কামনায়:

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ ۖ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا ۚ أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

রব্বানা- লা-তুআ-খিয্না- ইন্নাসী- না-আও আখ্ত্বোয়ানা-, রব্বানা- অলা-তাহ্মিল্ ‘আলাইনা- ইছরান কামা-হামাল্তাহূ ‘আলাল্লাযীনা মিন্ ক্বাব্লিনা-, রব্বানা- অলা-তুহাম্মিল্না- মা-লা-ত্বোয়া-ক্বাতা লানা-বিহ্; অ’ফু ‘আন্না-অর্গ্ফি লানা- র্অহাম্না- আংতা মাওলা-না- ফান্ছুরনা- ‘আলাল্ ক্বাওমিল্ কা-ফিরীন্।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি, আপনি আমাদের ধরবেন না। হে আমাদের রব! আর আপনি আমাদের ওপর তেমন ভার অর্পণ করবেন না, যেমন আমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের ওপর তা অর্পণ করেছিলেন। হে আমাদের রব! আর আপনি আমাদেরকে এমনকিছু অর্পণ করবেন না, যেটার সামর্থ্য আমাদের নেই। আর আপনি আমাদের মাফ করুন এবং আপনি আমাদের ক্ষমা করুন আর আপনি আমাদের অনুগ্রহ করুন। আপনিই আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আপনি আমাদেরকে কাফির জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাহায্য করুন- আল কুরআন ২:২৮৬ 

بِإِذْنِ ٱللَّهِ ۗ وَٱللَّهُ مَعَ ٱلصَّـٰبِرِينَ

رَبَّنَآ أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَٱنصُرْنَا عَلَى ٱلْقَوْمِ ٱلْكَٰفِرِينَ

বিঈযনিল্লাহ্… ওয়াল্লাহু মা‘আস-সাবিরীন

রব্বানা- আফ্রিগ্ ‘আলাইনা-ছোয়াব্রাওঁ অছাব্বিত্ আক্ব-মানা-অর্ন্ছুনা-‘আলাল্ ক্বাওমিল্ কা-ফিরীন্।    

অর্থ: আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। 

হে আমাদের রব! আপনি আমাদের ওপর ধৈর্য্য প্রবাহিত করুন! এবং আমাদের পা দৃঢ় রাখুন! আর কাফির জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন!-আল কুরআন ২:২:২৪৯+২:২৫০

জালেমের জুলুম থেকে সুরক্ষায় /জালিমের কর্ম ও বাড়াবাড়ি থেকে ব্যক্তি-নিরাপত্তার দুআ:

ফিরাউনের স্ত্রীর (আসিয়া) দুআটি কুরআনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে তিনি কেবল জালিম ব্যক্তির থেকেই নয়, বরং তার ‘عمل’ (অপকর্ম ও বাড়াবাড়ি) থেকেও আল্লাহর কাছে বিচ্ছিন্নতা ও আশ্রয় চেয়েছেন।

رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

রব্বিবনি লী ‘ইনদাকা বাইতান ফিল জান্নাতি ওয়া নাজ্জিনী মিন ফির‘আউনা ওয়া ‘আমালিহী ওয়া নাজ্জিনী মিনাল ক্বাওমিয যালিমীন।

হে আমার রব! আপনার কাছে জান্নাতে আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফিরাউন ও তার কর্ম (বাড়াবাড়ি) থেকে রক্ষা করুন, আর আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে নাজাত দিন (৬৬:১১)

পরিবার পরিজনসহ আশ্রয় প্রার্থনা:

رَبِّ نَجِّنِى وَأَهْلِى مِمَّا يَعْمَلُونَ

রব্বি নাজ্জ্বিনী অআহ্লী মিম্মা-ইয়া’মালূন্ ।   

অর্থ: হে আমার রব! তারা যা করছে তা থেকে আমাকে এবং আমার পরিবার-পরিজন/অনুসারীদের রক্ষা করুন- আল কুরআন ২৬:১৬৯ 

জালিমের চক্রান্ত ও বাড়াবাড়ি থেকে চূড়ান্ত সুরক্ষার ঐশী ঢাল (Tawfid /তাফউইদ):

যখন জালিমের ‘তুগইয়ান’ চরম আকার ধারণ করে এবং চারদিক থেকে ষড়যন্ত্র (মকর / مكر) ঘিরে ধরে, তখন মুমিনের চূড়ান্ত হাতিয়ার হলো নিজের সমস্ত বিষয় আল্লাহর কাছে সমর্পণ (তাফউইদ) করা। ফিরাউনের দরবারে একজন ঈমানদার ব্যক্তি (যিনি ঈমান গোপন রেখেছিলেন) ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন। এটি সূরা মুমিনের (গাফির) এক অবিস্মরণীয় আয়াত:

وَأُفَوِّضُ أَمْرِي إِلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ

অউফাও ওয়িদ্বু আ¤্রীয় ইলা ইল্লালাহু; ইন্নাল্লাহা বাছীরুম বিল ইবাদ। 

আমি আমার সকল বিষয় আল্লাহর কাছে সমর্পণ (তাফউইদ) করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দাদের প্রতি সম্যক দৃষ্টি রাখেন। (সূরা গাফির: ৪০:৪৪)

অনুধ্যান: যখন মুমিন তার নিজের পক্ষের সমস্ত বাড়াবাড়ি ত্যাগ করে শূন্য হাতে নিজেকে রবের ফয়সালার ওপর ছেড়ে দেয় (তাফউইদ), তখন রব নিজেই জালিমের ষড়যন্ত্র ও সীমালঙ্ঘন থেকে তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেন।

নূর হেদায়েত চাওয়ার দোয়া

رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

উচ্চারণ: রব্বানা আতিম্ম লানা নূরানা ওয়াগফির লানা; ইন্নাকা আলা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বাদী-র।

অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পূর্ণ করুন। আর আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।

আল-কুরআন: আত তাহরীম, আয়াত ৬৬:৮

সালামুন আলা নূহ-এর দুআ (জালেমদের থেকে মুক্তির পর আল্লাহর শুকরিয়া ও সুরক্ষা):

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي نَجَّانَا مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

আলহামদু লিল্লা-হিল্লাযী নাজ্জা-না- মিনাল ক্বাওমিজ-জ্বলিমীন।

অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে জালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকে উদ্ধার করেছেন। (২৩:২৮)

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ  وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ  إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ 

ব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্  অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।   

অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন।  এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু-আল কুরআন ২:১২৭, ২:১২৮ 

سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ ۝ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ ۝ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ 
সুবহানা রব্বিকা রব্বিল ইজ্জতি ‘আম্মা ইয়াসিফূন ۝ ওয়া সালামুন আলাল মুরসালীন ۝ ওয়াল হামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন।

অর্থ: আপনার রব মহিমাময়; তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে তিনি পবিত্র। রাসূলগণের উপর সালামুন আলা। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের। (৩৭:১৮০–১৮২)

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post