পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কি সুবিধাবাদী? আমিও কি তাঁর মধ্যে একজনা? আল কুরআন মাজীদের আলোকে অধিকাংশ মানবচরিত্র (Majority opportunistic)

কুরআনে “অধিকাংশ মানুষ” সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?

সচেতনাতার জন্য বিস্তারিত জেনে নেই আমাদের রবের সংবাদ বুলেটিন থেকে:

মানবপ্রকৃতি ও মনস্তত্ত্বের এক নিখুঁত এবং অপরিবর্তনীয় চিত্র অঙ্কিত হয়েছে আল কুরআন মাজীদে। মানুষের জীবনের অন্যতম একটি নেতিবাচক দিক হলো ‘সুবিধাবাদ’ বা কেবল নিজের স্বার্থের অনুকূলে অবস্থান গ্রহণ করা। বর্তমান পৃথিবীতে চারপাশে তাকালে আমরা দেখতে পাই—অপরাধ, অন্যায়, লুটপাট, অত্যাচার এবং যুলম আজ অত্যন্ত সহনীয় ও স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রচলিত কোনো ইতিহাস বা বর্ণনার আশ্রয় না নিয়ে, কেবলমাত্র আল কুরআন মাজীদের আয়াতসমূহের পারস্পরিক গাঁথুনি, শব্দগত সামঞ্জস্য ও অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মাধ্যমে আমরা যদি মানবচরিত্রের এই দিকটির অনুধ্যান করি, তবে এর মূল কারণ ও মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। আল কুরআন মাজীদের আলোকে অধিকাংশ মানুষের সুবিধাবাদী হওয়ার মূল কারণ হলো— একমাত্র নাযিলকৃত অহী (Revelation) অনুসরণ না করা এবং তার পরিবর্তে ‘নগদ প্রাপ্তি’ বা দুনিয়াকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া।

বিস্তারিত পাঠ করতে ক্লিক করুন এখানে:

আরবদের সম্পর্কে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল তথা আয়াত কী বলেন দেখুন:

আরবরা (আলআ’রাবী) কুফরে ও কপটতায় খুবই কঠোর এবং আল্লাহ তাঁর রসূলের ওপর যা নাযিল করেছেন, সেটার সীমারেখাসমূহ না জানার ব্যাপারে তারা অধিক উপযুক্ত। আর আল্লাহ বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন, প্রজ্ঞাময়। -আল কুরআন, আয়াত ৯:৯৭

সুবিধাবাদের মূল শিকড়: ‘নগদ প্রাপ্তি’ বা দুনিয়ার মোহ:

অধিকাংশ মানুষ কেন সুবিধাবাদী আচরণ করে, তার অত্যন্ত নিখুঁত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ আল্লাহ রব্বুল আলামিন সূরা আল-কিয়ামাহ-তে স্পষ্ট করে দিয়েছেন: “কখনোই নয়, বরং তোমরা নগদ প্রাপ্তিকে (দুনিয়া) ভালোবাসো, এবং আখিরাতকে বর্জন করো।” (৭৫:২০-২১) এই আয়াতের শব্দগত বিন্যাস (নজম) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে দুনিয়ার জন্য ‘আল-আজিলাহ’ (الْعَاجِلَةَ) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ হলো— যা দ্রুত আসে, নগদ, বা তাৎক্ষণিক লাভ। মানুষ যখন নাযিলকৃত অহীর বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন তার দৃষ্টি কেবল এই ‘নগদ প্রাপ্তি’ বা তাৎক্ষণিক সুবিধার দিকেই আটকে থাকে। পরকালীন জবাবদিহিতার (আখিরাত) সুদূরপ্রসারী চিন্তার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক স্বার্থ উদ্ধারই তার জীবনের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। আর ঠিক এ কারণেই অন্যের অধিকার হরণ, যুলম ও লুটপাট তাদের কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সহনীয় মনে হয়। কারণ, অহীর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে মানুষের প্রবৃত্তিই তার ইলাহ বা রব হয়ে যায়। যুলম বা অন্যায়ের সাথে অহী বর্জনের সম্পর্ক আল কুরআন মাজীদে এভাবেই বর্ণিত হয়েছে: “আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তদানুযায়ী যারা ফয়সালা করে না, তারাই তো যালিম।” (৫:৪৫)

নগদ চাওয়ার পরিণাম:

আর আল্লাহ যদি মানুষের জন্য অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতেন, তাদের জন্য তাঁর কল্যাণকে ত্বরান্বিত (নগদে) করতে চাওয়ার মতো, তাহলে অবশ্যই তাদের জন্য তাদের নির্ধারিত সময় সম্পন্ন করে দেয়া হতো। সুতরাং যারা আমাদের সাক্ষাতের আশা করে না, আমরা তাদেরকে ছেড়ে দিই, তারা তাদের অবাধ্যতার মধ্যে উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে থাকে-আয়াত ১০:১১

আল কুরআনের দৃষ্টিতে ‘অধিকাংশ’ মানুষের প্রকৃতি Majority:

আল কুরআন মাজীদে যখনই পৃথিবীর ‘অধিকাংশ’ (আকসার) মানুষের প্রসঙ্গ এসেছে, প্রায়শই তা মানবচরিত্রের এই দুর্বলতা, দুনিয়ামুখী প্রবণতা ও সুবিধাবাদী মানসিকতাকে নির্দেশ করেছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন স্পষ্ট করেছেন যে, সংখ্যাগুরু হওয়া কখনোই সত্য বা সঠিক হওয়ার মানদণ্ড নয়। আল কুরআন মাজীদের বিভিন্ন সূরার আয়াতে এই অধিকাংশ মানুষের যে মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত করে অনুধ্যান করা যায়: 

➢ ঈমান ও বিশ্বাসের সংকট: আল কুরআন সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনে না (১২:১০৩, ১১:৪০, ১৩:১, ৪০:৫৯)। এমনকি যারা ঈমান আনে বলে দাবি করে, তাদের অধিকাংশও শিরক বা অংশীদারিত্বে লিপ্ত (১২:১০৬)। অনেকেই কুফরি করে বা অস্বীকার করে (১৬:৮৩, ১৭:৮৯)। 

➢ সত্য ও অহী বিমুখতা: সুবিধাবাদী মনস্তত্ত্বের কারণে অধিকাংশ মানুষ সত্যকে অপছন্দ করে (২৩:৭০, ৪৩:৭৮)। তারা আল কুরআনকে বিশ্বাস করে না, বরং কেবল অস্বীকারের জেদে একে প্রত্যাখ্যান করে এবং এই গ্রন্থ নিয়ে অযথা তর্কে লিপ্ত হয় (১১:১৭, ১৭:৮৯, ১৮:৫৪, ৭৬:২৭)। 

➢ বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধত্ব ও মোহ: এরা নিজেদের আকল বা কমনসেন্স ব্যবহার করে না এবং আল কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না। ফলে অধিকাংশ মানুষ অজ্ঞ, অনুমাননির্ভর এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে অক্ষম থেকে যায় (২৯:৬৩, ৫:১০৩, ৬:১১১, ১০:৫৫)। আল্লাহ রব্বুল আলামিন এদেরকে বধির, অন্ধ এবং এমনকি চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও অধিক পথভ্রষ্ট পশুর মতো হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (৭:১৭৯, ২৫:৪৪, ৮:২২)। এরা দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন এবং পরকাল সম্পর্কে চরম গাফেল বা অমনোযোগী (৩০:৭, ২১:২৪)।
 
 ➢ আচরণগত বিকৃতি ও অকৃতজ্ঞতা: অহী বর্জনের কারণে অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না (৪০:৬১, ৭:১৭)। তারা ফাসিক (সীমোলঙ্ঘনকারী) এবং মন্দ কাজ, অবৈধ উপার্জন ও নিকৃষ্ট কর্মে দ্রুত ধাবিত হয় (৫:৩২, ৫:৪৯, ৫:৬২, ৫:৬৬)। এমনকি তারা তাদের নিজেদের প্রবৃত্তির আগ্রহ দ্বারা অন্যদেরকেও বিপথে পরিচালিত করতে চায় (৬:১১৯)।

সুবিধাবাদের নিখুঁত কুরআনিক পরিভাষা: ‘আলা হারফ’ (على حرف)

সুবিধাবাদী মানসিকতাকে আল কুরআন মাজীদে অত্যন্ত চমৎকার ও রূপক একটি শব্দগুচ্ছ দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সূরা হজ্জে আল্লাহ রব্বুল আলামিন এই সুবিধাবাদীদের মনস্তত্ত্ব তুলে ধরেছেন: “মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ্‌র ইবাদাত করে ‘আলা হারফ’ (প্রান্তিক বা সুবিধাবাদী অবস্থানে থেকে); অতঃপর যদি তার কোনো কল্যাণ হয়, তবে সে এতে প্রশান্তি লাভ করে। আর যদি তার কোনো বিপর্যয় ঘটে, তবে সে পূর্বাবস্থায় (কুফরিতে) ফিরে যায়। সে হারায় দুনিয়া ও আখিরাত। এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি।” (২২:১১) এখানে ‘আলা হারফ’ (عَلَى حَرْفٍ) শব্দগুচ্ছটির অনুধ্যান অত্যন্ত জরুরি। ‘হারফ’ মানে হলো কিনারা বা প্রান্ত। একজন সুবিধাবাদী ব্যক্তি কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে অহীর কেন্দ্রে বা আনুগত্যের গভীরে প্রবেশ করে না, সে সীমানার কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকে। যদি দেখে ভেতরে দুনিয়াবী সুবিধা বা নগদ প্রাপ্তি আছে, তবে সে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত দাবি করে; আর যদি দেখে বিপদ, ত্যাগ বা পরীক্ষা (ফিতনা) আসছে, তবে মুহূর্তেই সে লাফ দিয়ে বাইরে চলে যায়। এটিই সুবিধাবাদের সর্বশ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক চিত্র।

মানব মনস্তত্ত্বের তিনটি স্তর:

সুবিধাবাদী মানুষের এই দ্বিমুখী আচরণ ও সম্পদের মোহের আরও গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায় সূরা মা‘আরিজ-এ। এখানে আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে তিনটি পরস্পর সংযুক্ত শব্দের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন: ➢ হালূয়া (هَلُوعًا): “নিশ্চয়ই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থিরচিত্ত রূপে।” (৭০:১৯) ➢ জাযূয়া (جَزُوعًا): “যখন তাকে বিপদ স্পর্শ করে, তখন সে হয় হা-হুতাশকারী।” (৭০:২০) ➢ মানূয়া (مَنُوعًا): “আর যখন কল্যাণ বা সম্পদ তাকে স্পর্শ করে, তখন সে হয় চরম কৃপণ।” (৭০:২১) এই তিনটি আয়াতের নজম (বিন্যাস) লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সুবিধাবাদী ব্যক্তির মূল সমস্যা হলো তার কেন্দ্রচ্যুতি ও সম্পদের প্রতি অতি-আকর্ষণ। সে সুসময়ে সম্পদ কুক্ষিগত করে বা লুটপাট করে (মানূয়া) আর দুঃসময়ে চরম হতাশ হয়ে পড়ে (জাযূয়া)। তার এই অস্থিরতাই (হালূয়া) তাকে ‘আলা হারফ’ বা সুবিধাবাদী অবস্থানে দাঁড় করিয়ে রাখে।

বিপরীতমুখী চিত্র: আমি কেন সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্ত হতে চাই?

সুবিধাবাদীদের এই চিত্রটি তুলে ধরার ঠিক পরেই আল কুরআন মাজীদ বিপরীতমুখী একটি চিত্র উপস্থাপন করেছে, যা অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যের (internally coherent) এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত। আল কুরআন মাজীদে এমন অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যা নির্দেশ করে যে— সত্যের অনুসারী, বিশ্বাসী এবং কৃতজ্ঞ মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে সবসময়ই ‘কম’ বা ‘অল্পসংখ্যক’। আর এই সংখ্যালঘুরাই আল্লাহ রব্বুল আলামিনের কাছে বিশেষ মর্যাদা বহন করে। কারা এই সুবিধাবাদী স্বভাব ও অন্যায়-লুটপাটের মানসিকতা থেকে মুক্ত? “তবে তারা ব্যতীত, যারা সালাত আদায়কারী। যারা তাদের সালাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে স্থায়ী।” (৭০:২২-২৩)

এখানে সুবিধাবাদের (অস্থিরতা) ঠিক বিপরীতার্থক (antonym) গুণ হিসেবে ‘দাইমুন’ (دَائِمُونَ) অর্থাৎ স্থায়িত্ব বা অবিচলতা শব্দটিকে আনা হয়েছে। আল কুরআন মাজীদের পাতায় পাতায় এই ‘অল্পসংখ্যক’ বা অবিচল সংখ্যালঘুদের গুণাবলি ছড়িয়ে আছে:
 
➢ ঈমান ও অনুধাবন: অল্পসংখ্যক মানুষই প্রকৃত ঈমান আনে এবং অহী গ্রহণ করে (৪:১৫৫, ১০:৮৩, ২:৮৮)। তারা অল্পই উপদেশ ও জ্ঞান গ্রহণ করে স্মরণ রাখে (৭:৩, ৪০:৫৮, ২:৮৭)। 

➢ ধৈর্য ও সাহায্য: বিপদে হা-হুতাশ করার বদলে খুব কম সংখ্যক মানুষই ধৈর্য ধারণ করে টিকে থাকে। আর আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সাহায্য এই অল্পসংখ্যক ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকে (২:২৪৯)। 

➢ কৃতজ্ঞতা ও পুরস্কার: সুবিধাবাদী অকৃতজ্ঞদের ভিড়ে অল্প কিছু লোকই রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং চিন্তাভাবনা করে (২৩:৭৮, ৬৭:২৩, ৭:১০)। এই অল্পসংখ্যক অবিচল মানুষরাই পরিশেষে জান্নাতের অধিকারী হবে (৫৬:১০-১৪)।

সুবিধাবাদীদের বৈশিষ্ট্য:

সুবিধাবাদীদের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তারা বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকে, কিন্তু বিপদ কেটে গেলে বা স্বার্থ উদ্ধার হয়ে গেলে এমন আচরণ করে যেন তারা কখনো আল্লাহকে ডাকেনি। সূরা ইউনুসে এই মনস্তত্ত্বটি দারুণভাবে বিধৃত হয়েছে: “আর যখন মানুষকে কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। অতঃপর আমি যখন তার কষ্ট দূর করে দিই, তখন সে এমনভাবে চলতে থাকে যেন তাকে যে কষ্ট স্পর্শ করেছিল, সে জন্য সে আমাকে ডাকেইনি!” (১০:১২, 10:11) একই চিত্র আমরা দেখি সমুদ্রের ঝড়ের বর্ণনায় (১৭:৬৭)। এই আয়াতগুলোতে সূক্ষ্ম একটি আধ্যাত্মিক (metaphysical) বিষয় লুকিয়ে আছে। সুবিধাবাদী মানুষ আল্লাহ রব্বুল আলামিনকে শর্তসাপেক্ষে রব মানে। তাদের আনুগত্য হলো অনেকটা ব্যবসায়িক লেনদেনের মতো (Transactional loyalty)। সালামুন আলা ইব্রাহীম-এর চরিত্রের দিকে তাকালে আমরা এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখতে পাই। ইব্রাহীম (সালামুন আলাইহে) আগুনের সামনে দাঁড়িয়েও আনুগত্যের ‘কিনারা’ (আলা হারফ) থেকে সরে যাননি। তিনি দুনিয়ার নগদ প্রাপ্তির আশায় নয়, বরং আখিরাত ও রবের সন্তুষ্টির জন্য শর্তহীন আনুগত্যের মূর্ত প্রতীক ছিলেন।

যৌক্তিকতা (Logical Completeness):

উপর্যুক্ত আয়াতগুলোর তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের সুবিধাবাদী হওয়ার প্রধান কারণ হলো— নাযিলকৃত অহীর অবমূল্যায়ন এবং দুনিয়ার ‘নগদ প্রাপ্তির’ (আল-আজিলাহ) প্রতি মাত্রাতিরিক্ত মোহ। অহীর বিধান যখন সমাজ ও ব্যক্তিজীবন থেকে দূরে সরে যায়, তখন মানুষের প্রবৃত্তিই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, যার ফলে যুলম, অত্যাচার ও লুটপাট স্বাভাবিক রূপ ধারণ করে। সুবিধাবাদ বা ‘আলা হারফ’ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো অহীর কাছে নিঃশর্ত সমর্পণ এবং সালাত ও ধৈর্যের মাধ্যমে নিজের মনস্তত্ত্বকে ‘হালূয়া’ (অস্থিরতা) থেকে অবিচলতার (দাইমুন) স্তরে উন্নীত করা। যারা সুসময় ও দুঃসময়—উভয় অবস্থায় সমানভাবে আল্লাহমুখী থাকে, তারাই সেই সফল ‘সংখ্যালঘু’ বা প্রকৃত মুমিন; আর যারা কেবল দুনিয়ার নগদ লাভের আশায় যুক্ত থাকে, আল কুরআন মাজীদের ভাষায় তারাই প্রান্তিক, সুবিধাবাদী ও চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশের অন্তর্ভুক্ত।

তাহলে কি মানুষ স্বভাবতই সুবিধাবাদী?

কুরআন মানুষের ভেতরের দুর্বলতার কথাও বলে:

মানুষ তাড়াহুড়াপ্রবণ (নগদে সব পেতে চায়)

বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকে, কিন্তু নিরাপদ হলে ভুলে যায়

স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নীতিকে উপেক্ষা করতে পারে

এগুলো “সুবিধাবাদী” আচরণের সঙ্গে মিলে যায়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—

আমি কি তাদের একজন?

এই প্রশ্নটাই আসল।

নিজেকে নিয়ে এমন প্রশ্ন তোলা—এটা নিজেই প্রমাণ করে আমি অন্ধভাবে ভেসেযাচ্ছি নাতো?। আত্মসমালোচনা হলো ঈমানি সচেতনতার লক্ষণ।

কিছু আত্মজিজ্ঞাসা করতে পারি নিজকে:

আমি কি শুধু নিজের লাভের সময় নৈতিক থাকি?

অসুবিধা হলে কি আমি নীতির সঙ্গে আপস করি?

মানুষ দেখলে ভালো, একা হলে অন্যরকম?

যদি কোথাও সুবিধাবাদী প্রবণতা পাই—ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কুরআনের শিক্ষা হলো তাওবা, সংশোধন, এবং আত্মশুদ্ধি।

“অধিকাংশ” মানে কি সবাই?

না।

কুরআন “অধিকাংশ” বলেছে—মানে সব মানুষ নয়। সব যুগেই সত্যনিষ্ঠ, কৃতজ্ঞ, ধৈর্যশীল মানুষ আছে। লক্ষ্য হলো সেই সংখ্যালঘুদের দলে থাকা।

░ ▓▒কুরআনি দুআ-তাসবিহ▒▓ ░

সুবিধাবাদী মানসিকতা থেকে রক্ষা পেতে এবং ঈমান ও অহীর ওপর অবিচল থাকতে আমরা আল কুরআন মাজীদ থেকে নিম্নোক্ত দুআগুলো পাঠ করতে পারি: অবিচল থাকার দুআ:

  رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ 
রব্বানা- লা- তুযিগ্ কুলূবানা- বা‘দা ইয্ হাদাইতানা- অহাব্লানা- মিল্লাদুনকা রাহ্মাহ্; ইন্নাকা আন্তাল্ অহ্হা-ব। 
অর্থ: “হে আমাদের রব! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে বক্র করে দেবেন না এবং আপনার কাছ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনিই মহাদাতা।” (আল কুরআন ৩:৮) 

 ধৈর্য ও দৃঢ়তার দুআ:
  رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ 
রব্বানা- আফ্রিগ্ ‘আলাইনা- সাব্রওঁ অছাব্বিত্ আক্বদা-মানা- অন্সুর্না- ‘আলাল ক্বাওমিল কা-ফিরীন। 

অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দিন, আমাদের পা অবিচল রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের ওপর আমাদেরকে সাহায্য করুন।” (আল কুরআন ২:২৫০)
 
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ 
রব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্। 
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু—আল কুরআন ২:১২৭, ২:১২৮
  وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ 
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post