আল্লাহর ’রহমত’ চাইতে বা রহমতের জন্য আরজি পেশ/প্রার্থনা/অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে এবং ও রহমত প্রাপ্তির শর্ত- (Rahmat)

আল কোরআনের আয়াতসমূহের সামগ্রিক অনুধ্যান থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, ‘রহমত’ হলো আল্লাহ সু.তা.-এর সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। আল্লাহ রব্বুল আলামিন একদিকে যেমন তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন, তেমনি কোনো রূপ কর্মপ্রচেষ্টা ছাড়া বিনা পরিশ্রমে তা পাওয়ার ধারণাকেও বাতিল করেছেন। কোরআনিক কাঠামোর যৌক্তিক পূর্ণতা হলো—

আশা + শর্তপূরণ = রহমত

প্রকৃত আশা বনাম নিষ্ক্রিয়তা:

কেবলমাত্র আশা করে নিষ্ক্রিয় বসে থাকা হলো এক প্রকার ‘মিথ্যা সান্ত্বনা’ বা শয়তানের ধোঁকা (২৪:২১)। প্রকৃত আশা ও রহমতের প্রত্যাশীদের জন্য কোরআনে সুস্পষ্ট শর্ত দেওয়া হয়েছে। সেই প্রকৃত আশা বান্দাকে আল কুরআন অনুযায়ী ঈমান, তাকওয়া, ইহসান, ইনাবাহ (প্রত্যাবর্তন), সালাত, হিজরত (পাপ ও প্রতিকূলতা ত্যাগ করে আল্লাহর দিকে যাত্রা) এবং মুজাহাদার (অবিরাম প্রচেষ্টা) দিকে ধাবিত করে (২:২১৮, ৭:৫৬, ৭:১৫৬)। অর্থাৎ, রহমত কোনো নিষ্ক্রিয় বিষয় নয়; বরং এটি সক্রিয় কর্মপ্রচেষ্টার দাবিদার।

পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ও রহমতের নৈকট্য:

বান্দা যখন ভয় ও আশার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করে এবং একমাত্র নাযিলকৃত কিতাব হিসেবে আল কুরআন মাজীদের বিধানের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দেয় (৩৯:৫৪-৫৫), ঠিক তখনই আল্লাহর রহমত তার অত্যন্ত নিকটবর্তী হয়ে যায় (৭:৫৬)।

রহমতের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক শর্ত:

আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক শর্ত হলো—নিজে যখন রবের রহমতের কাঙ্গাল, তখন অপর সৃষ্টির প্রতিও অবশ্যই নম্র ও দয়াশীল আচরণ করতে হবে (১৭:২৮)।

তবে, জেনে রাখা ভালো: আমল ও প্রচেষ্টা বাতিল হওয়ার চূড়ান্ত কারণ (রহমত পাওয়ার ক্ষেত্রে)   (boundary condition):

নাযিলকৃত একমাত্র কিতাব তথা আল কুরআন মাজীদের বিধানের সাথে বা এর বাইরে অন্য কোনো মতবাদকে সমকক্ষ হিসেবে গ্রহণ করলে,এর আয়াতসমূহের বিষয়ে অস্বীকার করলে (গোপন করলে) কোনো কিছুকে শরিক বা যুক্ত করলে এবং আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সাথে কোনো কিছুকে শরিক বা যুক্ত করলে মানুষের জীবনের সকল সৎকর্ম, আমল ও মুজাহাদা সম্পূর্ণ বাতিল বা নিস্ফল বলে গণ্য হবে। কোরআনিক অনুধ্যানে এটি অত্যন্ত সুষ্পষ্ট: দেখুন আয়াত: ৩৯:৬৫, ৬:৮৮, ১৮:১০৩-১০৫

▓▒░রহমত চেয়ে দুআসমূহ░▒▓

আল-কোরআনে সরাসরি ‘রহমত’ (رَحْمَة), ‘রাহিমীন’ (رَاحِمِين), ‘ইরহাম’ (ارْحَمْ) ইত্যাদি শব্দযুক্ত কিছু দুআ নিচে উল্লেখ হলো:

1. কোরআনে বর্ণিত সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী রহমতের দুআ: (এটি সূরা মুমিনুনের শেষ আয়াত। আল্লাহ নিজেই এই দুআটি শিখিয়ে দিয়ে পড়তে বলেছেন)

 رَّبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ

রাব্বিগফির ওয়ারহাম ওয়া আনতা খাইরুর রা-হিমীন।

অর্থ: (বলো!) হে আমার রব! ক্ষমা করুন এবং রহম করুন, আর আপনিই তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সূরা আল-মুমিনুন: 23:118)

2. অন্তরকে বক্র না করা এবং রহমত কামনার দুআ:

(এটি সূরা আলে-ইমরানের একটি চমৎকার দুআ, যেখানে হেদায়েতের ওপর অবিচল থাকার পাশাপাশি আল্লাহর বিশেষ রহমত চাওয়া হয়েছে)

 رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
রাব্বানা- লা- তুযিগ কুলূবানা- বা‘দা ইয হাদাইতানা- ওয়া হাবলানা- মিল্লাদুনকা রাহমাহ; ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহা-ব।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের হেদায়েত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরসমূহ বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা। (সূরা আলে-ইমরান: 3:8)

3. মুশরিক সোসাইটি থেকে আশ্রয় চেয়ে রবের রহমতের সহিত আশ্রয় চাওয়ার আবেদন: সঠিক পথের জন্য আসহাবে কাহাফের দুআ:

 رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا
রাব্বানা- আ-তিনা- মিল্লাদুনকা রাহমাতাওঁ ওয়া হাইয়্যি’ লানা- মিন আমরিনা- রাশাদা-।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করে দিন। (সূরা আল-কাহফ: 18:10)

4. ক্ষমা ও রহমত চেয়ে দুআ: (আমাদের আদি পিতা সালামুন আলা আদম ও তাঁর স্ত্রী ভুল করার পর আল্লাহর রহমত ছাড়া যে মানুষের ধ্বংস অনিবার্য, এই দুআটিতে সেই চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে)

رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
রাব্বানা- যোয়ালামনা- আনফুসানা-, ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা- ওয়া তারহামনা- লানাকূনান্না মিনাল খা-সিরীন।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি রহম না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। (সূরা আল-আরাফ: 7:23)

إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

ইন্নাহূ হুঅত তাওঅ-বুর রাহীম্। অর্থ: নিশ্চয়ই তিনি, তিনিই তওবা কবুলকারী, দয়ালু- আল কুরআন ২:৩৭  

5. ঈমানদারদের ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনার দুআ:

(আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান আনার পর বান্দা নিজেকে আল্লাহর সবচেয়ে বড় দয়ালু সত্তার কাছে সঁপে দেয়)

رَبَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ
রাব্বানা- আ-মান্না- ফাগফির লানা- ওয়ারহামনা- ওয়া আনতা খাইরুর রা-হিমীন।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি, অতএব আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের প্রতি রহম করুন; আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সূরা আল-মুমিনুন: 23:109)

6. চরম সংকট ও কষ্টে আবেদন: (কষ্টের সময় সরাসরি কিছু না চেয়ে শুধু নিজের অসহায়ত্ব (সালামুন আলা আইয়ুব) ও আল্লাহর রহমতের গুণের কথা স্মরণ করার এক অপূর্ব তাদাব্বুর রয়েছে এখানে)

 أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ

আন্নী মাস্সানিয়্যাদ দুররু ওয়া আনতা আরহামুর রা-হিমীন
অর্থ: (হে আমার রব!) আমি তো দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি, আর আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সূরা আল-আম্বিয়া: 21:83)

7. সূরা বাকারার শেষ আয়াতের বিশেষ দুআ:

(জীবনের সকল ভুল-ত্রুটি থেকে মুক্তি এবং আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার এক পূর্ণাঙ্গ প্রার্থনা)

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ ۖ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا ۚ أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
রব্বানা লা তু’আখিযনা ইন নাসিনা আও আখতা’না। রব্বানা ওয়া লা তাহমিল ‘আলাইনা ইসরান কামা হামালতাহু ‘আলাল্লাযিনা মিন কাবলিনা।
রব্বানা ওয়া লা তুহাম্মিলনা মা লা তাকাতা লানা বিহি। ওয়া’ফু ‘আন্না, ওয়াগফির লানা, ওয়ারহামনা। আন্তা মাওলানা, ফানসুরনা ‘আলাল কাওমিল কাফিরীন। 

অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি, আপনি আমাদের ধরবেন না। হে আমাদের রব! আর আপনি আমাদের ওপর তেমন ভার অর্পণ করবেন না, যেমন আমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের ওপর তা অর্পণ করেছিলেন। হে আমাদের রব! আর আপনি আমাদেরকে এমনকিছু অর্পণ করবেন না, যেটার সামর্থ্য আমাদের নেই। আর আপনি আমাদের মাফ করুন এবং আপনি আমাদের ক্ষমা করুন আর আপনি আমাদের অনুগ্রহ করুন। আপনিই আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আপনি আমাদেরকে কাফির জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাহায্য করুন- আল কুরআন ২:২৮৬ 

8. নিজের ও ভাইয়ের জন্য রহমতের অর্ন্ত্রভুক্তির জন্য দুআ:

(সালামুন আলা মূসা যখন তার ভাই সালামুন আলা হারুন-এর প্রতি একটু কঠোর হয়েছিলেন, তখন বাস্তবতা বুঝতে পেরে নিজের ও ভাইয়ের জন্য একত্রে আল্লাহর রহমতের চাদরে আশ্রয় চেয়েছিলেন)

رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ ۖ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
রাব্বিগফির লী ওয়া লিআখী ওয়া আদখিলনা- ফী রাহমাতিক; ওয়া আনতা আরহামুর রা-হিমীন।
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে আপনার রহমতের (দয়ার) অন্তর্ভুক্ত করুন। আর আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সূরা আল-আরাফ: ১৫১)

9. অজানা বিষয়ে চাইতে গিয়ে ভুলের জন্য ক্ষমা ও রহমত চেয়ে দরখাস্ত: 

(নিজের সন্তান চোখের সামনে বন্যায় ডুবে যাচ্ছে, এমন অবস্থায় নূহ আ. আল্লাহর কাছে ছেলের জন্য আবেদন করে ফেলেছিলেন। পরে বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত চেয়ে যে আকুতি করেছিলেন)

رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ ۖ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ

রব্বি ইন্নী আ‘ঊযু বিকা আন আস্’আলাকা মা লাইসা লী বিহি ‘ইলম। ওয়া ইল্লা তাগফির লী ওয়া তারহামনী আকুন মিনাল খাসিরীন।

অর্থ: হে আমার রব! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি আপনার কাছে এমন বিষয় চাওয়া থেকে, যে বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান নেই। আর যদি না আপনি আমাকে ক্ষমা করেন এবং দয়া করেন, আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব- আল কুরআন 11:47  

10. শোকর আদায় করতে সমর্থ্য চেয়ে-সংশোধনকারী-রহমতের মধ্যে অর্ন্তভুক্তির জন্য আবেদন:

(পিপীলিকার কথা শুনে সালামুন আলা সুলাইমান হেসে উঠেছিলেন এবং আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করেছিলেন। এত রাজত্ব ও ক্ষমতার পরও তিনি জানতেন, আল্লাহর রহমত ছাড়া সলেহীন বান্দাদের কাতারে শামিল হওয়া সম্ভব নয়)

رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّالِحِينَ

রব্বি আওযি‘নী আন আশকুরা নি‘মাতাকা আল্লাতী আন‘আমতা ‘আলাইয়া ওয়া ‘আলা ওয়ালিদাইয়া, ওয়া আন আ‘মালা সালিহান তারদাহু, ওয়া আদখিলনী বিরাহমাতিকা ফি ‘ইবাদিকাস সালিহীন। 

অর্থ: হে আমার রব! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন যে, আমি আপনার সে নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, যে নিয়ামত আপনি দান করেছেন, আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি এবং এটাও যে আমি আমলে সলেহ করি যা আপনি পছন্দ করেন। এবং আপনি আমাকে আপনার অনুগ্রহ দ্বারা আপনার সৎকর্মপরায়ণ (স-লিহীন) বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন- আল কুরআন ২৭:১৯

11. জালিমদের হাত থেকে রক্ষা পেতে মুমিনদের দুআ: (ফেরাউনের জুলুমের শিকার হয়ে সালামুন আলা মূসা-এর সঙ্গীরা আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে জালিমদের থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন)

عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ  وَنَجِّنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

আলা-ল্লাহি তাওয়াক্কালনা। রব্বানা- লা- তাজ‘আলনা- ফিতনাতাল লিলক্বাওমিজ-জ্বলিমীন। ওয়া নাজ্জিনা- বিরহমতিকা মিনাল ক্বাওমিল কা-ফিরীন।

অর্থ: আমরা আল্লাহর উপরই নির্ভর করলাম। হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে জালেম সম্প্রদায়ের জন্য ফিতনার (নির্যাতনের) পাত্র বানাবেন না। এবং আপনার অনুগ্রহে আমাদেরকে কাফির সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা করুন (১০:৮৫-৮৬)

12. আল্লাহর অভিভাবকত্ব স্মরণ করে দুআ/

আল্লাহর ক্রোধ থেকে বাঁচতে ও নিরাপত্তা পেতে দুআ:

আল্লাহর সু.তা. এর ক্রোধ থেকে বাঁচতে এবং ক্ষমা পেতে সালামুন আলা মুসা এই দুআটি পাঠ করেছিলেন। যেখানে তিনি আল্লাহকে অভিভাবক মেনে রহমত চেয়েছেন।

 رَبِّ لَوۡ شِئۡتَ اَہۡلَکۡتَہُمۡ مِّنۡ قَبۡلُ وَ اِیَّایَ ؕ اَتُہۡلِکُنَا بِمَا فَعَلَ السُّفَہَآءُ مِنَّا ۚ اِنۡ ہِیَ اِلَّا فِتۡنَتُکَ ؕ تُضِلُّ بِہَا مَنۡ تَشَآءُ وَ تَہۡدِیۡ مَنۡ تَشَآءُ ؕ اَنۡتَ وَلِیُّنَا فَاغۡفِرۡ لَنَا وَ ارۡحَمۡنَا وَ اَنۡتَ خَیۡرُ الۡغٰفِرِیۡنَ وَ اکۡتُبۡ لَنَا فِیۡ ہٰذِہِ الدُّنۡیَا حَسَنَۃً وَّ فِی الۡاٰخِرَۃِ اِنَّا ہُدۡنَاۤ اِلَیۡکَ

রব্বি লাও শি’তা আহ্লাক্তাহুম্ মিন্ ক্বব্লু-অ ইয়্যা-ইয়া; আতুহ্লিকুনা- বিমা-ফা‘আলাস্ সুফাহা-য়ু মিন্না-; ইন্ হিয়া ইল্লা- ফিত্নাতুক্; তুদ্ধিল্লু বিহা- মান্ তাশা-য়ু অ তাহ্দী মান্ তাশা-য়ু; আংতা অলিয়্যুনা- ফাগ্ফির লানা- অরহাম্না- অ আংতা খাইরুল্ গ-ফিরীন্। অক্তুব্ লানা- ফী হা-যিহিদ্ দুন্ইয়া- হাসানাতাঁও অফিল্ আ-খিরাতি ইন্না- হুদ্না- ইলাইক্।

অর্থ: হে আমার রব! আপনি যদি চাইতেন, তবে পূর্বেই তাদেরকে ও আমাকে ধ্বংস করতে পারতেন। আমাদের মধ্য থেকে নির্বোধরা যা করেছে সে কারণে কি আপনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন? নিশ্চয়ই সেটা কেবল আপনার পরীক্ষা। সেটা দিয়ে যাকে চান আপনি পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান আপনি হেদায়েত করেন। আপনিই আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। আর আপনিই তো সর্বোত্তম ক্ষমাকারী। আর পৃথিবীতে এবং আখেরাতে আমাদের জন্য কল্যাণ লিখে দিন। নিশ্চয়ই আমরা আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তন করেছি। (সূরা আল-আরাফ, ৭:১৫৫-১৫৬)

13. আরশ বহনকারী মালাকদের দুআ (সংশোধনকারীদের জন্য):

(এটি আরশ বহনকারী ফেরেশতারা মুমিনদের জন্য আল্লাহর কাছে এই দুআ করেন। এখানে আল্লাহর রহমতের বিশালতার কথা বলা হয়েছে।)

رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ   رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدتَّهُمْ وَمَن صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ    وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ ۚ وَمَن تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ ۚ وَذَ‌ٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

রব্বানা ওয়াসি‘তা কুল্লা শাই’ইন রহমাতাও ওয়া ‘ইলমা। ফাগফির লিল্লাযীনা তাবু ওয়াত্তাবা‘উ সাবীলাকা, ওয়া কিহিম ‘আযাবাল জাহীম।
রব্বানা ওয়া আদখিলহুম জান্নাতি ‘আদনিল্লাতী ওয়া‘আত্তাহুম, ওয়া মান সালাহা মিন আবা’ইহিম ওয়া আজওয়াজিহিম ওয়া জুররিয়্যাতিহিম।
ইন্নাকা আনতাল ‘আজীজুল হাকীম।

অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি অনুগ্রহে ও জ্ঞানে সবকিছুকে ব্যাপ্ত করেছেন। অতএব, যারা তাওবা করে ও আপনার পথ অনুসরণ করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আর আপনি তাদেরকে রক্ষা করুন, জাহিমের শাস্তির।  হে আমাদের রব! আপনি তাদেরকে জান্নাতু আদনে প্রবেশ করান, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাদেরকে দিয়েছেন, আর তাকেও যে তাদের পিতামাতা ও তাদের দাম্পত্যসাথী এবং তাদের বংশধর এর মধ্যে সৎকর্ম করে।  নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এবং আপনি তাদেরকে ক্ষতি হতে রক্ষা করুন। আর সেদিন আপনি যাকে ক্ষতি হতে রক্ষা করবেন, তাহলে তো তাকে আপনি অনুগ্রহ করলেন। আর সেটাই মহাসাফল্য -আল কুরআন ৪০:৭-৮

14. ভাইদের ক্ষমা করার সময় বলা বাক্য:

(এটি সরাসরি আল্লাহর কাছে দুআ নয়, বরং সালামুন আলা ইউসুফ তাঁর চরম অপরাধী ভাইদের ক্ষমা করে দেওয়ার সময় আল্লাহর রহমতের গুণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন)

لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ۖ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
লা- তাসরীবা আলাইকুমুল ইয়াওম; ইয়াগফিরুল্লা-হু লাকুম, ওয়া হুয়া আরহামুর রা-হিমীন।
অর্থ: আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন, আর তিনি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সূরা ইউসুফ: ৯২)

15. সন্তানকে আল্লাহর হেফাজতে দিতে ভরসার বাক্য:

(বড় ভাইদের কাছে ছোট আদরের ছেলেকে পাঠানোর সময় সালামুন আলা ইয়াকুব চরম উৎকণ্ঠার মধ্যেও কেবল আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করেছিলেন। এটি বিপদে ভরসা করার একটি শক্তিশালী জিকির বা দুআ।)

فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ

ফাল্লা-হু খাইরুন হা-ফিযাওঁ ওয়া হুয়া আরহামুর রা-হিমীন।
অর্থ: তবে আল্লাহই উত্তম রক্ষক এবং তিনিই দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।(সূরা ইউসুফ: 12:64)

16. অনুতপ্ত দুআ:

(মূসা আ. যখন তুর পাহাড়ে ছিলেন, তখন বনী ইসরাঈল বাছুর পূজা করে শির্কে লিপ্ত হয়। পরে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর রহমত ছাড়া ধ্বংস অনিবার্য জেনে তারা এই আর্তি জানিয়েছিল।)

لَئِن لَّمْ يَرْحَمْنَا رَبُّنَا وَيَغْفِرْ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

লা-ইল্লাম ইয়ারহামনা- রাব্বুনা- ওয়া ইয়াগফির লানা- লানাকূনান্না মিনাল খা-সিরীন।
অর্থ: আমাদের রব যদি আমাদের প্রতি রহম না করেন এবং আমাদের ক্ষমা না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।" (সূরা আল-আরাফ: 7:149)

17. পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুমিনদের জন্য দুআ (রাঊফুর রাহীম)

(আগের মুমিন ভাইদের জন্য এবং নিজেদের অন্তরকে পরিষ্কার রাখার জন্য এই দুআটি কোরআনে শেখানো হয়েছে, যার শেষে আল্লাহর রহমতের গুণ উল্লেখ করে প্রার্থনা করা হয়েছে।)

 رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
রাব্বানাগফির লানা- ওয়া লিইখওয়া-নিনাল্লাযীনা সাবাক্বূনা- বিলঈমা-নি ওয়া লা- তাজ‘আল ফী কুলূবিনা- গিল্লাল লিল্লাযীনা আ-মানূ রাব্বানা- ইন্নাকা রাঊফুর রাহীম।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং আমাদের আগে যারা ঈমান এনেছে তাদের ক্ষমা করুন। আর মুমিনদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আল-হাশর: 59:10)

18. আল্লাহর কাছে তওবা কবুল ও রহমত চেয়ে দুআ:

(কাবা ঘর নির্মাণের মতো এত বড় একটি নেক কাজ করার পরও তারা নিজেদের কাজের অহংকার না করে আল্লাহর কাছে তওবা কবুল ও রহমত চেয়েছেন। এটি তাদাব্বুরের এক বিরাট শিক্ষা যে, নেক আমল করার পরও আল্লাহর রহমত চাইতে হয়।)

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ  وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ  إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ 

ব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্  অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।   

অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন।  এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু-আল কুরআন ২:১২৭, ২:১২৮ 

19. নফস বা প্রবৃত্তি থেকে বাঁচতে রহমত স্মরণ:

(আজিজ বা বাদশার স্ত্রী ঘটনা থেকে বেঁচে আসার পর নিজের পবিত্রতা দাবি না করে সালামুন আলা ইউসুফ স্বীকার করেছিলেন যে, কেবল আল্লাহর রহমত থাকলেই মানুষের মন খারাপ কাজ থেকে বাঁচতে পারে।)

وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي ۚ إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ۚ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ

অমা- উবার্রিয়ু নাফ্সী ইন্নান্ নাফ্সা লাআম্মা-রতুম্ বিস্সূ-য়ি ইল্লা-মা-রহিমা রব্বী; ইন্না রব্বী গফূর্রু রহীম্-

অর্থ: আর আমি আমার নিজেকে নির্দোষ মনে করি না। নিশ্চয়ই মন্দের বিষয়ে মন অবশ্যই প্ররোচিত করে, আমার রব যতটুকু দয়া করেন তা ব্যতিত। নিশ্চয়ই আমার রব ক্ষমাশীল, দয়ালু- আল কুরআন ১২:৫৩

20. অপবাদ ও মিথ্যা থেকে বাঁচতে শেখানো দুআ

(কাফিরদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও অপবাদের মুখে আল্লাহর রাসুলকে-কে তাঁর ‘রাহমান’ বা দয়াময় নামের ওসিলায় সাহায্য চাইতে বলেছেন)

 رَبِّ احْكُم بِالْحَقِّ ۗ وَرَبُّنَا الرَّحْمَٰنُ الْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ

রাব্বিহকুম বিলহাক্ব; ওয়া রাব্বুনার রাহমা-নুল মুসতা‘আ-নু আলা- মা- তাসিফূন।
অর্থ:  হে আমার রব! আপনি ন্যায়ের সাথে ফয়সালা করে দিন। আর তোমরা যা বলছ, সে বিষয়ে আমাদের রব পরম দয়ালুর (রাহমান-এর) কাছেই সাহায্য চাওয়া হয়।" (সূরা আল-আম্বিয়া: 21:112)

21. পিতা-মাতার জন্য রহমত কামনার দুআ:

(শৈশবে বাবা-মা যেমন রহমত বা দয়া দিয়ে আমাদের বড় করেছেন, আল্লাহর কাছে তাদের জন্য সেই রহমতই ভিক্ষা চাওয়া হয়েছে এখানে)

 رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

রাব্বির হামহুমা- কামা- রাব্বাইয়্যানী সাগী-রা-।

অর্থ: হে আমার রব! তাদের উভয়ের প্রতি আপনি রহম করুন, যেমন শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন। (সূরা বনী ইসরাঈল/ আল-ইসরা: 17:24)

22. ঈমান এনে ও ভরসা করা:

هُوَ الرَّحْمَٰنُ آمَنَّا بِهِ وَعَلَيْهِ تَوَكَّلْنَا

হুওয়াররাহমান আমান্নাবিহী ওয়া আলাইহে তাওয়াক্কালনা

অর্থ: বলুন! তিনিই পরম দয়ালু; আমরা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাঁর ওপরই ভরসা করি। সূরা আল-মুলক ৬৭:২৯

(এখানে “রহমান” (রহমত থেকে উদ্ভূত) এসেছে)

23. রহমতের বড়াই নিজের নয়:

 هَٰذَا رَحْمَةٌ مِّن رَّبِّي

হাযা রাহমাতুম্মিন মির রব্বি!
অর্থ: (যুলকারনাইন বললেন) এটি আমার রবের পক্ষ থেকে এক রহমত। সূরা আল-কাহফ ১৮:৯৮

(যদিও পূর্ণ দুআ নয়, কিন্তু “রহমত” শব্দসহ আল্লাহর অনুগ্রহের স্বীকৃতি)

তাদাব্বুরের শিক্ষণীয় দিক:

কোরআনে নবীদের এই দুআগুলো গভীরভাবে লক্ষ্য করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়— পরিস্থিতি যত ভয়ানকই হোক না কেন (সালামুন আলা নূহ -এর সন্তানের মৃত্যু, সালামুন আলা মূসা -এর সামনে জালিম ফেরাউন, সালামুন আলা ইউসুফ এর সাথে ভাইদের বিশ্বাসঘাতকতা), নবীরা কখনোই হতাশ হননি। তারা জানতেন, আল্লাহর ‘রহমত’ দুনিয়ার সমস্ত বিপদ, রাগ এবং হতাশার চেয়েও বিশাল। তাই তারা সবসময় পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেয়েও আল্লাহর ‘রহমত’ লাভকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

কোরআনের এই দুআগুলো খেয়াল করলে দেখবেন, নবীরা বা মুমিনরা যখনই বিপদে পড়েছেন বা ক্ষমা চেয়েছেন, তারা আল্লাহর ‘রহমত’ বা দয়াকে সবচেয়ে বেশি মাধ্যম বানিয়েছেন। কারণ আমাদের ইবাদত দিয়ে নয়, বরং কেবল আল্লাহর ‘রহমত’ পেলেই আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে নাজাত পেতে পারি। দুআগুলো পড়ার সময় এই অসহায়ত্ব ও আল্লাহর বিশাল দয়ার কথা অন্তরে অনুভব করাটাই হলো প্রকৃত তাদাব্বুর।

জেনে রাখা ভালো: আমল ও প্রচেষ্টা বাতিল হওয়ার চূড়ান্ত কারণ (রহমত পাওয়ার ক্ষেত্রে)   (Boundary Condition):

নাযিলকৃত একমাত্র কিতাব তথা আল কুরআন মাজীদের বিধানের সাথে বা এর বাইরে অন্য কোনো মতবাদকে সমকক্ষ হিসেবে গ্রহণ করলে এবং আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সাথে কোনো কিছুকে শরিক বা যুক্ত করলে মানুষের জীবনের সকল সৎকর্ম, আমল ও মুজাহাদা সম্পূর্ণ বাতিল বা নিস্ফল বলে গণ্য হবে। কোরআনিক অনুধ্যানে এটি অত্যন্ত সুষ্পষ্ট:

১. রবের সাথে কোনো কিছু যুক্ত (শিরক) করলে আমল বাতিল হয়ে যায়:
আল্লাহ সু.তা. আল কুরআনে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন যে, শিরক হলো এমন একটি অপরাধ যা অতীতের সমস্ত সৎকর্মকে ধ্বংস করে দেয়।

"নিশ্চিতরূপে আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি এই ওহী করা হয়েছে যে, যদি আপনি আল্লাহর সাথে শরিক করেন, তবে অবশ্যই আপনার সমস্ত আমল বাতিল হয়ে যাবে এবং আপনি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।" (৩৯:৬৫)

আল কোরআনে ১৮ জন নবী-রাসূলের (সালামুন আলাইহিম) নাম একত্রে উল্লেখ করার পর আল্লাহ রব্বুল আলামিন স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই চূড়ান্ত নিয়মের ক্ষেত্রে নবীরাও ব্যতিক্রম নন:

"এটি আল্লাহর হিদায়াত... আর যদি তারা শিরক করত, তবে তারা যা আমল করত তা অবশ্যই বাতিল হয়ে যেত।" (৬:৮৮)

২. নাযিলকৃত কিতাবের আয়াতের সাথে কুফর বা অন্য কিছুর অনুসরণ করলে প্রচেষ্টা পণ্ড হয়:

আল কুরআন মাজীদের সুস্পষ্ট আয়াতকে পাশ কাটিয়ে বা এর সাথে অন্য কোনো উৎসকে দ্বীনের মানদণ্ড হিসেবে যুক্ত করলে পার্থিব জীবনের সকল প্রচেষ্টা বৃথা হয়ে যায়, যদিও মানুষ বিভ্রান্তিবশত নিজেকে সৎকর্মশীল মনে করে।

"বলুন, আমি কি তোমাদেরকে তাদের সংবাদ দেব, যারা কর্মের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? তারা হলো সেসব লোক, পার্থিব জীবনে যাদের সমস্ত প্রচেষ্টা পণ্ড হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে করে যে, তারা অতি সৎকর্ম করছে! এরাই তারা, যারা তাদের রবের আয়াতসমূহ এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতের বিষয়কে অস্বীকার করেছে। ফলে তাদের সমস্ত আমল বাতিল হয়ে গেছে..." (১৮:১০৩-১০৫)

"আর যারা আমার আয়াতসমূহকে এবং আখিরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করে, তাদের আমলসমূহ বাতিল হয়ে যায়।" (৭:১৪৭)

সারসংক্ষেপ:
সুতরাং, আল্লাহর রহমত পাওয়ার পূর্বশর্ত যেমন ঈমান ও মুজাহাদা, তেমনি সেই রহমত ও আমলকে টিকিয়ে রাখার চূড়ান্ত শর্ত হলো—নিজের বিশ্বাস ও কর্মকে রবের সাথে শিরক থেকে এবং নাযিলকৃত কিতাব আল কুরআনের বিধানকে যেকোনো বাহ্যিক মিশ্রণ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র রাখা। অন্যথায়, রহমতের আশায় করা সকল সাধনাই বাতিল বলে গণ্য হবে।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post