মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের খলিফা বা প্রতিনিধি। কিন্তু এই প্রতিনিধিত্বের রূপরেখা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। আমরা যদি সমাজ, প্রকৃতি বা পৃথিবীর সামগ্রিক ব্যবস্থার দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাই যে—সবার মেধা, সম্পদ, ক্ষমতা বা দায়িত্ব এক রকম নয়। মানবজীবনের উদ্দেশ্য এবং খলিফা হিসেবে মানুষের ভূমিকা অনুধাবনের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন জাগতে পারে: কেন এই বৈষম্য বা মর্যাদার পার্থক্য? কেন আল্লাহ সু.তা. সবাইকে সমান সম্পদ বা ক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করলেন না?
আল কুরআন মাজীদ অত্যন্ত সুনিপুণ ও যৌক্তিক ধারায় এর উত্তর প্রদান করে। কোরআনের আয়াতগুলোর পারস্পরিক শব্দগত সামঞ্জস্যতা এবং এর অন্তর্নিহিত গাঁথুনি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই যে, এই পার্থক্য কোনো অবিচার নয়; বরং এটি এক সুগভীর ঐশী পরিকল্পনা এবং এক মহাজাগতিক ভারসাম্যের ভিত্তি।
মর্যাদার পার্থক্যের- স্তরভেদ (দারাজাত - درجات):
মানুষের খিলাফত এবং মর্যাদার পার্থক্যের বিষয়টি আল্লাহ রব্বুল আলামিন সূরা আল-আনআমের ১৬৫ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
"আর তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে খলিফা (خلائف - উত্তরাধিকারী বা স্থলাভিষিক্ত প্রতিনিধি) বানিয়েছেন এবং তোমাদের একজনকে অন্যের ওপর মর্যাদায় (درجات - দারাজাত বা স্তরসমূহে) উন্নীত করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, সে বিষয়ে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন..." (৬:১৬৫)
এই আয়াতের গভীর অনুধ্যান করলে দেখা যায়, আল্লাহ সু.তা. মানুষকে খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করার পাশাপাশি তাদের মধ্যে ‘দারাজাত’ বা মর্যাদার স্তরভেদ তৈরি করেছেন। কাউকে দিয়েছেন অঢেল সম্পদ, কাউকে প্রখর মেধা, কাউকে দিয়েছেন বিশাল ক্ষমতা, আবার কাউকে করেছেন প্রকৃতির বিশাল সম্পদের নিয়ন্ত্রক। কিন্তু কেন এই পার্থক্য? এই প্রশ্নের নিখুঁত উত্তর লুকিয়ে আছে আল কুরআন মাজীদের সূরা আয-যুখরুফ-এর ৩২ নম্বর আয়াতে।
মর্যাদার পার্থক্যের কারণ: ‘সুখরিয়্যা’ (سُخْرِيًّا) বা পারস্পরিক নির্ভরশীলতা:
(৬:১৬৫) আয়াতের ‘দারাজাত’ বা মর্যাদার স্তরভেদের ঐশী কারণ বা হিকমাহ আল্লাহ রব্বুল আলামিন (৪৩:৩২) আয়াতে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
"তারা কি তোমার রবের রহমত বণ্টন করে? আমিই পার্থিব জীবনে তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করেছি এবং তাদের একজনকে অন্যের ওপর মর্যাদায় (درجات - দারাজাত) উন্নীত করেছি; যাতে তারা একে অপরকে সেবায়/কাজে লাগাতে পারে (سُخْرِيًّا - সুখরিয়্যা)। আর তারা যা সঞ্চয় করে, তোমার রবের রহমত তার চেয়ে বহুগুণ উত্তম।" (৪৩:৩২)
এই দুটি আয়াতের (৬:১৬৫ এবং ৪৩:৩২) পারস্পরিক সংযোগ এক বিস্ময়কর আর্থ-সামাজিক ও প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম বা কাঠামোর চিত্র তুলে ধরে। এখানে ‘সুখরিয়্যা’ (سُخْرِيًّا) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হলো একে অপরের সেবায় নিয়োজিত হওয়া বা পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (mutual interdependence)।
অর্থাৎ, সমাজে বা পৃথিবীতে যদি সবাই রাজা হতো, তবে প্রজা কে হতো? সবাই যদি কারখানার মালিক হতো, তবে উৎপাদন করত কে? সবাই যদি সম্পদশালী হতো, তবে কেউ কারো মুখাপেক্ষী হতো না, ফলে সমাজব্যবস্থা ও সভ্যতার চাকা স্থবির হয়ে যেত। আল্লাহ সু.তা. এই ‘দারাজাত’ বা পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন যেন মানুষ একে অপরের মেধা, শ্রম ও সম্পদের মুখাপেক্ষী হয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ে তোলে। এটি কোনো আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ নয়, বরং এটি হলো সেবা বিনিময়ের একটি অনুভূমিক (horizontal) নেটওয়ার্ক।
প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষেত্রে এর অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত (implied evidence):
এই ‘সুখরিয়্যা’ বা পারস্পরিক নির্ভরশীলতার নীতিটি কেবল মানুষের সমাজেই সীমাবদ্ধ নয়; খলিফা হিসেবে মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটি একটি ঐশী মানদণ্ড। আল্লাহ রব্বুল আলামিন প্রকৃতি, পাহাড়, নদী ও পশু-পাখিকে মানুষের অনুগত বা ‘তাশখির’ (تسخير) করে দিয়েছেন। মানুষ তার বুদ্ধি ও ক্ষমতার (উচ্চ দারাজাত) কারণে অন্যান্য প্রাণীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছে।
কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব কি যথেচ্ছ ব্যবহারের জন্য? না। বরং (৪৩:৩২) আয়াতের আলোকে বলা যায়, মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব হলো পরিবেশ ও প্রকৃতির সাথে এক পারস্পরিক সেবাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য। মানুষ যেমন গাছের অক্সিজেনের ওপর নির্ভরশীল, তেমনি উদ্ভিদজগতও মানুষের যত্ন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ওপর নির্ভরশীল। খলিফা হিসেবে মানুষ যখন এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্মান রক্ষা করে, তখনই সে প্রকৃত ‘মিযান’ বা ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
পরীক্ষা (ابتلاء) বনাম সঞ্চয় বা পুঞ্জিভূতকরণ (جمع):
(৬:১৬৫) আয়াতে আল্লাহ সু.তা. বলেছেন এই স্তরভেদ হলো একটি ‘পরীক্ষা’ (লিয়াবলুওয়াকুম)। আর (৪৩:৩২) আয়াতে একটি বিপরীতমুখী (contrasting) চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, "আর তারা যা সঞ্চয় বা পুঞ্জিভূত (يَجْمَعُونَ - ইয়াজমা‘উন) করে, তোমার রবের রহমত তার চেয়ে বহুগুণ উত্তম।"
অর্থাৎ, যার মর্যাদা বা সম্পদ বেশি, তার পরীক্ষাও তত বড়। পরীক্ষার মূল বিষয় হলো—মানুষ কি এই অতিরিক্ত সম্পদ ও ক্ষমতাকে কেবল নিজের ভোগবিলাস ও পুঞ্জিভূত করার (capitalism/hoarding) কাজে ব্যবহার করবে, নাকি ‘সুখরিয়্যা’ বা পারস্পরিক কল্যাণের মাধ্যমে রবের রহমত অন্বেষণ করবে? যখনই মানুষ রবের এই নীতি ভুলে গিয়ে সম্পদ কুক্ষিগত করে বা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে নিজস্ব আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, তখনই পৃথিবীতে ‘ফাসাদ’ বা বিপর্যয় নেমে আসে।
অহংকার চূর্ণ এবং ঐশী দায়বদ্ধতা:
উপর্যুক্ত আয়াতগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ মানবজীবনের উদ্দেশ্যকে এক চমৎকার যৌক্তিক পূর্ণতা দান করে। মর্যাদার এই পার্থক্য প্রমাণ করে যে, পৃথিবীতে কেউ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; বরং সবাই একে অপরের পরিপূরক। একজন ধনী ব্যক্তি যেমন তার শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল, তেমনি একজন রাষ্ট্রপ্রধান তার সাধারণ জনগণের ওপর নির্ভরশীল।
সুতরাং, সম্পদ, ক্ষমতা বা মেধার আধিক্য অহংকারের কোনো বিষয় নয়; বরং এটি হলো খিলাফতের একটি বড় আমানত। আল কুরআন মাজীদের এই অনুধ্যান আমাদেরকে শেখায় যে, আল্লাহ রব্বুল আলামিন যাকে যত উচ্চ মর্যাদায় (দারাজাত) আসীন করেছেন, সৃষ্টিজগতের প্রতি তার ‘লুক আফটার’ বা রক্ষণাবেক্ষণের দায়বদ্ধতাও ঠিক ততটাই বেশি। এই পরীক্ষার ময়দানে যে ব্যক্তি বা সমাজ সম্পদ পুঞ্জিভূত করার চেয়ে পারস্পরিক কল্যাণ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ব্রতী হয়, তারাই আল্লাহ সু.তা.-এর প্রকৃত খলিফার মর্যাদা লাভ করে।
মানব খিলাফত ও মহাজাগতিক ইবাদত: প্রকৃতির ঐশী অধিকার ও সংরক্ষণের গভীরতম অনুধ্যান:
মানবজীবনের উদ্দেশ্য এবং পৃথিবীতে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের ভূমিকার বিষয়টি আরও গভীর ও সুতীক্ষ্ণ হয়, যখন আমরা আল কুরআন মাজীদের অন্যান্য শক্তিশালী ও সমজাতীয় আয়াতগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করি। কুরআন আয়াতগুলোর অভ্যন্তরীণ বিন্যাস (নজম), পারস্পরিক গাঁথুনি এবং অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রকৃতি ও পরিবেশের দেখভাল করা মানুষের জন্য কেবল একটি ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং এটি সমগ্র মহাজাগতিক ইবাদত বা উপাসনা ব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
খলিফা হিসেবে মানুষ, অন্যান্য সৃষ্টির মর্যাদা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের সাথে সম্পর্কিত আল কুরআন মাজীদের আরও কিছু গভীরতম সংযোগ বা ‘লিঙ্ক’ নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
প্রকৃতির মহাজাগতিক তাসবিহ এবং খলিফার দায়বদ্ধতা:
এই মহাবিশ্ব হলো আল্লাহ রব্বুল আলামিনের একটি বিশাল মসজিদ বা উপাসনালয়-
পরিবেশ বা প্রকৃতি কোনো জড় বা মৃত বস্তু নয়; আল কুরআন মাজীদের অনুধ্যান আমাদের সামনে এক বিস্ময়কর জীবন্ত মহাবিশ্বের চিত্র তুলে ধরে। প্রকৃতি আল্লাহ রব্বুল আলামিনের ইবাদতে নিয়োজিত একটি সুশৃঙ্খল সত্তা। আল্লাহ সু.তা. ঘোষণা করেন:
"সপ্ত আসমান, জমিন এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে, সবই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে (يُسَبِّحُ - ইয়ুসাব্বিহু)। এমন কোনো বস্তু নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করে না, কিন্তু তোমরা তাদের পবিত্রতা ঘোষণা (تَسْبِيحَهُمْ - তাসবিহাহুম) অনুধাবন করতে পারো না..." (১৭:৪৪)
একই সুর ধ্বনিত হয়েছে সূরা আল-হাজ্জ-এ:
"তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে (يَسْجُدُ - ইয়াসজুদু) আসমানসমূহে ও জমিনে যারা আছে তারা; এবং সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্ররাজি, পর্বতমালা, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং মানুষের মধ্যে অনেকেই?..." (২২:১৮)
এই আয়াতদ্বয়ের সাথে খিলাফতের (২:৩০, ৬:১৬৫) আয়াতের সংযোগ অত্যন্ত শক্তিশালী। খলিফা হিসেবে মানুষকে যে পৃথিবীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেই পৃথিবীর প্রতিটি বৃক্ষ, পাহাড়, নদী এবং প্রাণী আল্লাহ সু.তা.-এর তাসবিহ ও সিজদায় রত। অর্থাৎ, এই মহাবিশ্ব হলো আল্লাহ রব্বুল আলামিনের একটি বিশাল মসজিদ বা উপাসনালয়। একজন খলিফার দায়িত্ব হলো এই মহাজাগতিক মসজিদের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলার দেখভাল করা। মানুষ যখন নিজের লোভের বশবর্তী হয়ে অযৌক্তিকভাবে বনভূমি উজাড় করে, পাহাড় কাটে বা নদী দূষিত করে, তখন সে মূলত আল্লাহ সু.তা.-এর সিজদাকারীদেরকে (সাজিদীন) হত্যা করে এবং তাসবিহ পাঠকারী সত্তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এটি খলিফার চরম অবাধ্যতা।
‘ফাসাদ ফিল আরদ’ বনাম শস্য ও প্রজনন ধ্বংসের চূড়ান্ত সতর্কবার্তা:
মানুষ যখন খিলাফতের উদ্দেশ্য ভুলে যায়, তখন তার আচার-আচরণ প্রকৃতির জন্য কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে, তার একটি ভয়ংকর ও বাস্তব চিত্র (contrasting picture) আল্লাহ সু.তা. সূরা আল-বাকারায় তুলে ধরেছেন:
"আর মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছে, পার্থিব জীবন সম্পর্কে যার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে এবং তার অন্তরে যা আছে সে বিষয়ে সে আল্লাহকে সাক্ষী রাখে; অথচ সে হলো চরম কলহকারী। আর যখন সে প্রস্থান করে (বা ক্ষমতা লাভ করে), তখন সে পৃথিবীতে ছুটে বেড়ায় ফাসাদ (فساد - বিপর্যয়) সৃষ্টির জন্য এবং শস্য (হুরছ - حَرْثَ) ও প্রজনন (নাসল - نَّسْلَ) ধ্বংস করার জন্য। আর আল্লাহ ফাসাদ ভালোবাসেন না।" (২:২০৪-২০৫)
এখানে ‘হুরছ’ (حَرْثَ - কৃষিকাজ, শস্য, উদ্ভিদজগত বা প্রাকৃতিক পরিবেশ) এবং ‘নাসল’ (نَّسْلَ - বংশ, প্রজনন, প্রাণীজগতের ধারাবাহিকতা বা জীববৈচিত্র্য) শব্দ দুটির ব্যবহার অত্যন্ত ইঙ্গিতবহ। বর্তমান বিশ্বে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, রাসায়নিক দূষণ এবং বন ধ্বংসের ফলে যে কৃষিভূমি ও জীববৈচিত্র্য (Biodiversity) ধ্বংস হচ্ছে, আল কুরআন মাজীদ একে খলিফার দায়িত্বের চরম লঙ্ঘন বা ‘ফাসাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আল্লাহ সু.তা. স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি এই ফাসাদ বা পরিবেশগত ধ্বংসলীলা পছন্দ করেন না।
মহাজাগতিক ‘মিযান’ বা ভারসাম্য রক্ষায় ঐশী সীমারেখা:
প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে খলিফার দায়িত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও দার্শনিক দলিলটি পাওয়া যায় সূরা আর-রহমানে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
"আর আসমান—তিনি তাকে সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন ভারসাম্য (مِيزَانَ - মিযান)। যাতে তোমরা ভারসাম্যের সীমালঙ্ঘন না করো (أَلَّا تَطْغَوْا فِي الْمِيزَانِ)। আর তোমরা ন্যায়ের সাথে ওজন প্রতিষ্ঠিত রাখো এবং ভারসাম্য বা ওজনে কম দিয়ো না (وَلَا تُخْسِرُوا الْمِيزَانَ)। আর জমিন—তিনি তা স্থাপন করেছেন সৃষ্টিকূলের (লিল আনাম - لِلْأَنَامِ) জন্য।" (৫৫:৭-১০)
এখানে ‘মিযান’ (مِيزَانَ) শব্দটি পরপর তিনবার ব্যবহৃত হয়ে একটি ঐশী ছন্দ (নজম) তৈরি করেছে। এই মিযান কেবল দাঁড়িপাল্লার ওজন নয়; এটি হলো মহাজাগতিক ইকোসিস্টেম, কার্বন-অক্সিজেন চক্র, আবহাওয়া এবং জীবজগতের প্রাকৃতিক ভারসাম্য। আল্লাহ সু.তা. এই ভারসাম্য সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন "আল্লা তাতগাও ফিল মিযান"—তোমরা পরিবেশ বা প্রকৃতির এই ভারসাম্যে সীমালঙ্ঘন কোরো না।
সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য হলো ১০ নম্বর আয়াতটি—"আর জমিন, তিনি তা স্থাপন করেছেন ‘আনাম’-এর জন্য।" এখানে ‘আনাম’ (أَنَامِ) বলতে কেবল মানুষ নয়, বরং পৃথিবীর সমস্ত জীব ও প্রাণীকূলকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, এই পৃথিবী কেবল মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি সমস্ত প্রাণীর আবাসস্থল। খলিফা হিসেবে মানুষের দায়িত্ব হলো অন্য সকল ‘উম্মাহ’ বা প্রাণীকূলের এই অধিকার (লুক আফটার) নিশ্চিত করা।
‘তাসখির’ (বশ্যতা) বনাম মানুষের অকৃতজ্ঞতা (কাফফার):
আল্লাহ সু.তা. মানুষকে খলিফা হিসেবে যে অপরিসীম ক্ষমতা দিয়েছেন, তার একটি বিপরীতমুখী ও সতর্কতামূলক চিত্র পাওয়া যায় সূরা ইবরাহীমে:
"তিনিই আল্লাহ, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন... আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত (سَخَّرَ - সাখখারা) করেছেন নৌযানকে... তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন নদ-নদীকে। আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চাঁদকে... আর তিনি তোমাদের দিয়েছেন তোমরা তাঁর কাছে যা কিছু চেয়েছ তার সবকিছু থেকে। যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামত গণনা করো, তবে তা গুণে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয়ই মানুষ অতিশয় জালিম (ظَلُومٌ - সীমালঙ্ঘনকারী), অতিশয় অকৃতজ্ঞ (كَفَّارٌ - নিয়ামত অস্বীকারকারী)।" (১৪:৩২-৩৪)
এই আয়াতগুলোর সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক (metaphysical) সামঞ্জস্য হলো—প্রকৃতির এই বিশাল শক্তি (সূর্য, চাঁদ, সাগর, নদী) মানুষের ক্ষমতার কাছে নতিস্বীকার করেনি, বরং আল্লাহ রব্বুল আলামিন নিজ অনুগ্রহে এগুলোকে মানুষের জন্য ‘তাসখির’ (নিয়োজিত বা অনুগত) করে দিয়েছেন, যেন মানুষ খিলাফতের দায়িত্ব পালন করতে পারে। কিন্তু যখন মানুষ এই অনুগ্রহের কদর করে না, নদীকে দূষিত করে, সাগরের ভারসাম্য নষ্ট করে, তখন আল্লাহ সু.তা. তাকে "যালূমুন কাফফার" (ظَلُومٌ كَفَّارٌ) বা চরম জালিম ও অকৃতজ্ঞ বলে আখ্যায়িত করেন।
খিলাফতের মহাজাগতিক নেটওয়ার্ক:
উপর্যুক্ত কোরআনিক আয়াতসমূহের গভীর অনুধ্যান আমাদেরকে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত করে যে, মানবজীবনের উদ্দেশ্য এবং খিলাফত কোনো বিচ্ছিন্ন ধারণা নয়; বরং এটি সমগ্র মহাবিশ্বের সাথে এক নিবিড় ঐশী নেটওয়ার্কের অংশ।
মানুষ এমন এক পৃথিবীতে বাস করে, যার প্রতিটি অণু-পরমাণু আল্লাহ রব্বুল আলামিনের তাসবিহ পাঠ করছে (১৭:৪৪)। এই পৃথিবীতে আল্লাহ সু.তা. একটি সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক ভারসাম্য বা ‘মিযান’ (৫৫:৭) স্থাপন করেছেন এবং প্রকৃতিকে মানুষের অনুগত (১৪:৩২) করেছেন। খলিফা হিসেবে মানুষের জীবনের পরম পরীক্ষা (ابتلاء) হলো—সে কি তার উচ্চতর মর্যাদা (দারাজাত) ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে এই তাসবিহরত প্রকৃতিকে সংরক্ষণ (ইসলাহ) করবে, নাকি নিজের লালসার বশবর্তী হয়ে পৃথিবীতে শস্য ও প্রজনন ধ্বংসকারী (২:২০৫) ফাসাদ সৃষ্টি করবে?
যে ব্যক্তি আল কুরআন মাজীদের এই ঐশী দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবন করতে পারে, সে গাছের একটি পাতাও অকারণে ছিঁড়তে ভয় পায়। কারণ সে জানে, সে কেবল একটি পাতা ছিঁড়ছে না; বরং আল্লাহ রব্বুল আলামিনের তাসবিহ পাঠকারী একটি সত্তার তাসবিহ থামিয়ে দিচ্ছে এবং খলিফা হিসেবে তার নিজের ঐশী আমানতের চরম বরখেলাপ করছে। আর এই আমানত ও জবাবদিহিতার ভয়ই মানুষকে প্রকৃত ‘আবদ’ (দাস) ও সফল ‘খলিফা’-তে রূপান্তরিত করে।
❖ ❖ ❖ ❖
প্রাসঙ্গিক কোরআনিক দুআ ও তাসবিহসমূহ:
আমরা যেন ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হই এবং প্রকৃতির এই বিশাল আমানতের প্রতি সুবিচার করতে পারি, সেজন্য আল কুরআন মাজীদ আমাদেরকে যে দুআ ও তাসবিহ শিখিয়েছে:
ফাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার জন্য দুআ:
رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
রব্বানা- লা- তাজ‘আলনা- মা‘আল ক্বওমিজ জ-লিমীন।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে জালিম সম্প্রদায়ের সঙ্গী করবেন না। (৭:৪৭)সৃষ্টির উদ্দেশ্য অনুধাবন এবং তাসবিহ-এর মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা:
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রব্বানা- মা- খলাক্বতা হা-যা- বা-ত্বিলান সুবহা-নাকা ফাক্বিনা- ‘আযা-বান না-র।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি এসব উদ্দেশ্যহীনভাবে (বাতিলরূপে) সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র মহান। সুতরাং আপনি আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। (৩:১৯১)আমাদেরকে প্রদত্ত সম্পদ, মেধা ও মর্যাদার জন্য অহংকারমুক্ত থেকে যেন রবের সঠিক প্রতিনিধিত্ব করতে পারি, সেজন্য আল কুরআন মাজীদের শিক্ষণীয় দুআসমূহ:
প্রদত্ত সম্পদ ও ক্ষমতার ওপর অহংকারমুক্ত থাকার তাসবিহ:
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ
সুবহা-নাল্লাযী সাখখারা লানা- হা-যা- ওয়ামা- কুন্না- লাহূ মুক্বরিনীন। ওয়া ইন্না- ইলা- রব্বিনা- লামুংক্বলিবূন।অর্থ: পবিত্র মহান তিনি, যিনি একে আমাদের অনুগত করে দিয়েছেন, অথচ আমরা একে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আর নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রবের দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী। (৪৩:১৩-১৪)
দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দুআ:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রব্বানা- আ-তিনা- ফিদ্ দুন্ইয়া- হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল্ আ-খিরতি হাসানাতাওঁ ওয়াক্বিনা- ‘আযা-বান না-র।অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। (২:২০১)
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
রব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু-আল কুরআন ২:১২৭, ২:১২৮
وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের।