কুরআনে ঈদ সম্পর্কে কি বলা হয়েছে? কি পেয়ে আমাদের আনন্দ করার কথা বলা হয়েছে?
প্রচলিত ঈদ শুভেচ্ছা বনাম আল কুরআনের ‘ঈদান’: রমাদান শেষে মুমিনের প্রকৃত করনীয় ও আনন্দের প্রকৃত উৎস কী?
আল কুরআন মাজীদ মানুষকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী মানদণ্ড (ফুরকান) হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। প্রচলিত ইতিহাসে বা লোকমুখে প্রচলিত অনেক সংজ্ঞাই আল কুরআনের মূল বাণীর সাথে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে ‘ঈদ’ এবং ‘আনন্দ’ শব্দ দুটিকে যেভাবে কেবল আনুষ্ঠানিক উৎসবে রূপান্তর করা হয়েছে, তার সাথে আল কুরআনের আধ্যাত্মিক ও যৌক্তিক কাঠামোর বিস্তর ব্যবধান রয়েছে।
এখানে লক্ষণীয় যে, সওম পালনের নির্দেশটি দেয়া হয়েছে আল কুরআন নাযিলের সম্মানে এবং হিদায়াত প্রাপ্তির শুকরিয়া হিসেবে। অর্থাৎ, এই মাসের প্রতিটি ইবাদত সরাসরি আল কুরআনের সাথে সম্পৃক্ত।
রমাদান শেষে করনীয়: তাকবির ও শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা):
প্রচলিত ঐতিহ্যে রমাদান শেষে এক বিশেষ উৎসবের আয়োজন করা হয়, যা ‘ঈদ’ নামে পরিচিত। কিন্তু আল কুরআন মাজীদের ২:১৮৫ নম্বর আয়াতের শেষাংশে রমাদানের সওম পূর্ণ করার পর অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট দুটি কাজের নির্দেশ দেয়া হয়েছে:
"...যাতে তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করো এবং তোমরা যেন আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ করো (লি-তুকাব্বিরুল্লাহা) এজন্য যে, তিনি তোমাদের হিদায়েত করেছেন। আর যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো (তাত্তাকুন/তাশকুরুন)।" (২:১৮৫)
এই আয়াতটি গভীর অনুধাবন করলে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হয়:
তাকবির (বড়ত্ব প্রকাশ): সওম শেষে মুমিনের কাজ হলো আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করা। কিসের জন্য? "এজন্য যে, তিনি তোমাদের হিদায়েত করেছেন।" অর্থাৎ, আল কুরআন নাযিলের মাধ্যমে যে হিদায়াত পাওয়া গেছে, তার জন্য আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করাই হলো প্রকৃত প্রাপ্তি।
শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা): এই হিদায়াত প্রাপ্তি এবং তা পালনের তৌফিক পাওয়ার জন্য অন্তরের গভীর থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
১. ‘ঈদ’ শব্দের প্রকৃত ব্যুৎপত্তি ও কুরআনি বিশ্লেষণ:
"ঈসা ইবনে মারইয়াম (সালামুন আলাইহে) বললেন: হে আল্লাহ! আমাদের রব! আমাদের জন্য আসমান থেকে একটি খাদ্যপূর্ণ দস্তরখান (মা-ইদাহ) নাজিল করুন, যা আমাদের জন্য অর্থাৎ আমাদের প্রথম ও শেষ সকলের জন্য একটি পুনরাবর্তনশীল নিদর্শন (
২. ‘মা-আদ’ ও ‘ঈদ’: ফিরে আসার চূড়ান্ত গন্তব্য:
"নিশ্চয়ই যিনি আপনার ওপর আল কুরআনকে অপরিহার্য করেছেন (ফারাদা-ফরজ), তিনি আপনাকে অবশ্যই আপনার ফিরে যাওয়ার স্থানে (
এখানে
৩. প্রকৃত আনন্দের উৎস: আল কুরআন নাযিল হওয়া-কিতাব প্রাপ্তিতে:
■ বলুন! এটি আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর দয়ায় (আল কুরআন); সুতরাং এতেই তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। এটি তারা যা সঞ্চয় করে তার চেয়ে উত্তম। (১০:৫৮)
যারা আল কুরআন লাভ করে এবং এর জ্ঞানে ঋদ্ধ হয়, তাদের আনন্দই হলো প্রকৃত আনন্দ:
➢ যাদের আমি কিতাব দিয়েছি, তারা আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তাতে আনন্দিত হয় (
➢ আর যখনই কোনো সূরা নাযিল করা হয়, তখন তাদের মধ্য থেকে কেউ বলে, তোমাদের মধ্যে কে সে, এটা যার ঈমানকে বৃদ্ধি করেছে? অনন্তর যারা ঈমান এনেছে, তখন এটা তাদের ঈমানকে বৃদ্ধি করেছে আর তারা আনন্দিত হয়-আয়াত ৯:১২৪
৪. আল কুরআনে আনন্দের বিভিন্ন পর্যায় ও পরিভাষা:
৫. আনন্দ ও প্রশান্তির মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি:
"যাকে আল্লাহ হিদায়াত দিতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্য প্রশস্ত (ইয়াশরাহ সাদরাহু) করে দেন।" (৬:১২৫)
"তুমি তাদের মুখমণ্ডলে আনন্দের উজ্জ্বলতা (
"জেনে রেখো, আল্লাহর জিকির (স্মরণ/কুরআন) দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত (
৬. প্রচলিত ‘ঈদ’ বনাম কুরআনের প্রকৃত আনন্দ: একটি সতর্কবাণী/ প্রকৃত আনন্দ: হিদায়াত প্রাপ্তি বনাম লৌকিক প্রথা:
আল কুরআন মাজীদের কোথাও শাহরু রমাদান (রমজান মাস) শেষে প্রচলিত অর্থে আনন্দ-উৎসব,
আমোদ-প্রমোদ বা মেলা করার কথা বলা হয়নি, কিংবা নিছক লৌকিক উৎসবের কথা বলা হয়নি। বরং আনন্দের মূল উৎস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে আল্লাহর ফজল ও রহমতকে (যা আল কুরআনেরই নামান্তর)। রমাদান হলো কুরআনের সাথে সংযোগ স্থাপন এবং আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার (তাকবির) মাস (২:১৮৫)।
সেদিন মুমিনগণ কাফিরদের (পার্থিব আমোদ-প্রমোদে মত্তদের) দেখে হাসবে (
সুন্নাতিল্লাহ অনুযায়ী কুরআনি সম্ভাষণ ও জিকির:
একজন আয়াতে বিশ্বাসী মুসলিম যখন আল কুরআনের প্রাপ্তিতে আনন্দিত হয়, তখন সুন্নাতিল্লাহ অনুযায়ী (এবং যে শব্দমালা আল্লাহর রাসূল নিজ মুখেও উচ্চারণ ও ব্যবহার করেছেন) একে অপরের সাথে শুভেচ্ছায় বলতে পারে:
❀ “ঈদাল্লি আওয়ালিনা ওয়া আখিরিনা ওয়া আয়াত!”
(অর্থ: আমাদের প্রথম ও শেষ সকলের জন্য এটি একটি পুনরাবর্তনশীল নিদর্শন ও আয়াত!—৫:১১৪)
এটি কেবল একটি শুভেচ্ছা নয়, বরং এটি আল্লাহর সেই নিদর্শনের স্বীকৃতি যা যুগে যুগে মানুষের কাছে ফিরে এসে সত্যের পথ দেখায়। আর এই আল কুরআনই হলো সেই বরকতময় উপদেশ বা জিকির:
❀ “যিকরুম মুবারাক”
আর এটি এক বরকতময় উপদেশ (যিকরুম মুবারাক), যা আমি নাযিল করেছি। (আয়াত ২১:৫০)
উপসংহার:
প্রাসঙ্গিক তাসবিহ ও প্রার্থনা (আল কুরআন হতে):
6. হিদায়াত ও রহমত প্রাপ্তির রব্বানি দোয়া:
رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا
রব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রহমাতাও ওয়া হাইয়্যি’ লানা মিন আমরিনা রশাদা।
হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত (দয়া) দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজসমূহ সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা (হিদায়াত/সঠিক পথ) করে দিন। (১৮:১০)
