বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম
সূরা আল আসর; আয়াত ১০৩:১-৩:
শপথ আসরের! নিশ্চয়ই মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।
তারা ব্যতিত যারা ঈমান এনেছে ও আমলে সলেহ করেছে আর পরস্পরকে সত্যের (হক্বের) বিষয়ে উপদেশ দেয় বা দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের বিষয়ে উপদেশ দেয় বা দিয়েছে।
🔗 সংখ্যাধিক্য (majority) বা প্রথা সত্যের (হক্বের) মাপকাঠি নয়!
--- ✨ ---
আজকে আমাদের জানার বিষয়- এই ’হক্ব’ -বিষয়টি কি?
আল কুরআন মাজীদের শব্দগত বিন্যাস ও এর অভ্যন্তরীণ কাঠামো বিশ্লেষণ করলে একটি মৌলিক ও চিরন্তন সত্য আমাদের সামনে উদভাসিত হয়। সেটি হলো—
‘আল-হক’ (الْحَقُّ) -বিষয়টি কেবল কোনো বিমূর্ত ধারণা বা মানুষের তৈরি যুক্তির নাম নয়, বরং এটি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ‘আল-কিতাব’ বা ওহীর সমার্থক।
হকের বিপরীতে যা কিছু বিরাজমান, আল কুরআন মাজীদ তাকে ‘বাতিল’ (الْبَاطِل) এবং ‘দ্বলাল’ (الضَّلَال) বা ভ্রষ্টতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সুরা আল আসর-এ (১০৩:১-৩) আল্লাহ সু.তা. শপথ করে বলেছেন যে, সকল মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, কেবল তারা ব্যতীত যারা চারটি গুণ অর্জন করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো-
“পরস্পরকে হকের (সত্যের) উপদেশ দেওয়া।” এখন প্রশ্ন হলো— এই ‘হক’ আসলে কী?
আল কুরআন মাজীদের আয়াতসমূহ দ্বারা এর উত্তর অন্বেষণ করলে আমরা ওহীর এক মহাসত্যের মুখোমুখি হই।
বিষয়টি আল কুরআন অনুধাবনে প্রমাণসমূহ শেয়ার করার চেষ্টা করছি, বিঈযনিল্লাহ!
১. ‘হক’ মানেই নাযিলকৃত ওহী (অনাযিলকৃত কিতাব বা কোনো মতবাদ সত্যের মাপকাঠী নয়):
সুরা মুহাম্মদের সাক্ষ্য আল্লাহ রব্বুল আলামিন ঈমানদার এবং সত্য অস্বীকারকারীদের পার্থক্যের মূল মানদণ্ড হিসেবে ‘হক’ অনুসরণকে নির্ধারণ করেছেন। সুরা মুহাম্মদে বিষয়টি গাণিতিকভাবে স্পষ্ট করা হয়েছে:
“যারা সত্য অস্বীকার করে তারা বাতিলের (অসারতার) অনুসরণ করে এবং যারা ইমান আনে তারা তাদের রব্বের পক্ষ থেকে আগত হকের (সত্যের) অনুসরণ করে।” (আয়াত ৪৭:৩)
এই আয়াতের ঠিক পূর্ববর্তী আয়াতে (৪৭:২) আল্লাহ সু.তা. ‘হক’ শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন:
“...এবং যারা ইমান আনে এবং আমলে সলেহ করে এবং যা মুহাম্মদ -এর ওপর নাযিল করা হয়েছে তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে—আর তা-ই তাঁদের রব্বের পক্ষ থেকে আগত ‘হক’ (সত্য)।”
অনুধ্যান: এখানে ‘নাযিলকৃত ওহী’ এবং ‘হক’ শব্দ দুটিকে সমার্থক করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ওহীর বাইরে যা কিছু আছে তা-ই ‘বাতিল’। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, ‘হক’ কোনো বায়বীয় বিষয় নয়, এটি সুনির্দিষ্ট কিতাব ও আয়াতের সমষ্টি।
➥ কেবল কুরআনই তা সত্যের দিকে (আল হক্ক) এবং সুদৃঢ় পথের দিকে পরিচালিত করে- দ্র: আয়াত ৪৬:২৯-৩২
২. হক বনাম বাতিল (অনাযিলকৃত কিতাব বা কোনো মতবাদ সম্পূর্ন বাতিল ঘোসণা:
কিতাবের শক্তিমত্তা ও বিন্যাস আল কুরআন মাজীদের বিন্যাস (নজম) অত্যন্ত চমৎকার। সুরা বনি ইসরাইলে হকের আগমনকে বাতিলের ধ্বংসের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে:
“এবং বলুন— হক (সত্য) এসেছে এবং বাতিল (মিথ্যা) বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয়ই বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই বিষয়।” (১৭:৮১)
ঠিক এর পরের আয়াতেই (১৭:৮২) আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলছেন— “আমি কুরআন নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা (নিরাময়) ও রহমত।”
বিশ্লেষণ: ১৭:৮১ আয়াতে যে ‘হক’ আসার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, ১৭:৮২ আয়াতে তাকেই ‘আল কুরআন’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যতা প্রমাণ করে যে, হক মানেই হলো আল কুরআন মাজীদ। আল্লাহ সু.তা. আরও বলেন—
“বরং আমি হক (সত্য)-কে বাতিলের ওপর নিক্ষেপ করি, ফলে তা বাতিলকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ তা বিলুপ্ত হয়ে যায়।” (২১:১৮)
3. হক কেবল আপনার রব্বের পক্ষ থেকে (সংশয়মুক্ত ঘোষণা):
আল্লাহ রব্বুল আলামিন একাধিক স্থানে সরাসরি সম্বোধন করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, সত্যের উৎস কেবল তিনি নিজে। মানুষের তৈরি মতবাদ বা সংশয়পূর্ণ যুক্তির কোনো স্থান সেখানে নেই।
“হক (সত্য) আপনার রব্বের পক্ষ থেকে; সুতরাং আপনি কখনোই সংশয়বাদীদের (মুমতারিন) অন্তর্ভুক্ত হবেন না।” (২:১৪৭, ৩:৬০)
অনুধাবন: এখানে ‘মিন রব্বিকা’ (আপনার রব্বের পক্ষ থেকে) শব্দটি ব্যবহার করে আল্লাহ সু.তা. সত্যের মালিকানাকে একচ্ছত্রভাবে নিজের হাতে রেখেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, রব্বের পক্ষ থেকে যা আসে না, তাতে সংশয় থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু রব্বের পক্ষ থেকে আগত ‘হক’ (আল কুরআন) সকল প্রকার সন্দেহের ঊর্ধ্বে।
4. হকের ঘোষণা ও মানুষের স্বাধীনতা:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন এই হককে মানুষের সামনে উপস্থাপন করে তাঁদের দায়িত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছেন:
“এবং বলুন— এই ‘হক’ (সত্য) তোমাদের রব্বের পক্ষ থেকে; সুতরাং যার ইচ্ছা ইমান আনুক এবং যার ইচ্ছা সত্য অস্বীকার করুক।” (১৮:২৯)
এখানে ‘মির রব্বিকুম’ (তোমাদের রব্বের পক্ষ থেকে) শব্দটি নির্দেশ করে যে, এই সত্য কোনো জাগতিক নেতার বা কোনো পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া কথা নয়, বরং এটি স্বয়ং বিশ্বজগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত এক অমোঘ বিধান।
5. হকের উৎস এবং এর বিপরীতে ভ্রষ্টতা (Dalal):
আল কুরআন মাজীদের ভাষ্যমতে, ‘হক’ কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। মানুষের মনগড়া ধারণা বা খেয়াল-খুশি কখনোই হক হতে পারে না।
- রব্বের পক্ষ থেকেই হক: “হক (সত্য) আপনার রব্বের পক্ষ থেকে; সুতরাং আপনি সংশয়বাদীদের (মুমতারিন) অন্তর্ভুক্ত হবেন না।” (২:১৪৭, ৩:৬০, ১০:৯৪, ১৩:১)
- হকের বাইরে কেবলই ভ্রষ্টতা: “অতএব হকের (সত্যের) পর ভ্রষ্টতা (দ্বলাল) ছাড়া আর কী থাকে? সুতরাং তোমরা কোথায় ফিরে যাচ্ছ?” (১০:৩২)
গভীর অনুধাবন: এখানে ‘হক’ এবং ‘দ্বলাল’ (ভ্রষ্টতা)-কে বিপরীতার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে, সত্যের কোনো তৃতীয় পথ নেই; হয় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত ‘হক’, নতুবা মানুষের তৈরি ‘ভ্রষ্টতা’ (১০:৩৬)। যারা ওহীর কিতাবকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে না, তারা অবধারিতভাবে ভ্রষ্টতার মধ্যে নিপতিত।
6. আল্লাহর ‘কালেমা’ বা বাণীর মাধ্যমে হক প্রতিষ্ঠা:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন কেবল হক ঘোষণা করেননি, বরং তিনি তাঁর ‘কালেমা’ বা বাণীর মাধ্যমে হককে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
“আল্লাহ তাঁর বাণীর (কালেমা) মাধ্যমে হককে হক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, যদিও অপরাধীরা তা অপছন্দ করে।” (১০:৮২, ৮:৭-৮)
এখানে ‘কালেমা’ হলো সেই ওহী যা কিতাব আকারে নাযিল হয়েছে। অর্থাৎ হক প্রতিষ্ঠিত হয় ওহীর অকাট্য দলিলে, কোনো অলীক কল্পনায় নয়। এর বিপরীতে মানুষের তৈরি চিন্তা বা মতবাদকে আল্লাহ ‘বাতিল’ ঘোষণা করে বলেন:
“বরং আমি হক (সত্য)-কে বাতিলের ওপর নিক্ষেপ করি, ফলে তা বাতিলকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ তা বিলুপ্ত হয়ে যায়।” (২১:১৮)
7. কেন হক কেবল রব্বের পক্ষ থেকে?
আল কুরআনের অভ্যন্তরীণ কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘হক’ কেন কেবল রব্বের পক্ষ থেকে হবে তার একটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে:
রব্ব হলেন স্রষ্টা: যেহেতু আল্লাহই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সত্যসহ (বিল হাক্কি) সৃষ্টি করেছেন (৬:৭৩), তাই সেই সৃষ্টির পরিচালনার বিধান বা ‘হক’ দেওয়ার একমাত্র অধিকারও তাঁর।
মানুষের সীমাবদ্ধতা: মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ এবং তারা ‘জন্’ বা ধারণার বশবর্তী (১০:৩৬)। পক্ষান্তরে রব্ব হলেন ‘আলীম’ (সর্বজ্ঞ) এবং তাঁর পক্ষ থেকে যা আসে তা ধ্রুব।
বাতিলের অনুপস্থিতি: আল্লাহ রব্বুল আলামিন ‘হক’ এবং তাঁর কালামকে এমনভাবে সুরক্ষিত করেছেন যে, তাতে কোনো ‘বাতিল’ প্রবেশ করতে পারে না (৪১:৪১-৪২)।
আল কুরআন মাজীদের উপরিউক্ত আয়াতসমূহ থেকে এটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, ‘হক’ বা সত্য কোনো সংজ্ঞাহীন বিষয় নয়। এটি সরাসরি আমাদের সত্য রবের পক্ষ থেকে আগত নাযিলকৃত ওহী বা কালাম। যারা রব্বের পক্ষ থেকে আগত এই হককে (আল কুরআন) আঁকড়ে ধরবে, তারাই কেবল ভ্রষ্টতা (১০:৩২) থেকে রক্ষা পাবে। হকের একমাত্র মালিক হলেন আল্লাহ রব্বুল আলামিন এবং সেই হকই মানুষের জন্য মুক্তির একমাত্র পথ।
8. কিতাব (ওহী ) ও হকের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক:
- সত্যসহ নাযিল: “আমি সত্যসহ (বিল হাক্কি) এটি নাযিল করেছি এবং এটি সত্যসহই নাযিল হয়েছে।” (১৭:১০৫)
- ফয়সালাকারী: “মানুষ ছিল এক উম্মাহভুক্ত... এবং তিনি তাঁদের সাথে সত্যসহ (বিল হাক্কি) কিতাব নাযিল করলেন, যাতে মানুষের মধ্যে সে বিষয়ে ফয়সালা করা যায় যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছিল।” (২:২১৩)
- সন্দেহাতীত: “এই কিতাবের অবতরণ জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা কি বলে যে— সে এটি নিজে রচনা করেছে? বরং তা আপনার রব্বের পক্ষ থেকে আগত হক (সত্য)।” (৩২:২-৩)
সুরা ফুসসিলাত-এ বলা হয়েছে যে, এই কিতাব এক মহাপরাক্রমশালী কিতাব (আযীয), যার সামনে
বা পেছন থেকে ‘বাতিল’ প্রবেশ করতে পারে না (৪১:৪১-৪২)। অর্থাৎ আল কুরআন মাজীদ এমন
এক হক যা সকল প্রকার বিকৃতি থেকে সুরক্ষিত।
9. হকের বিরুদ্ধে মানুষের ধারণা (‘জন্’)/ ধারণা (Conjecture) বনাম সত্যের সংঘাত:
আল কুরআন মাজীদ বারবার সতর্ক করেছে যে, মানুষ হকের পরিবর্তে নিজেদের ‘জন্’ (অপ্রমাণিত ধারণা) বা প্রবৃত্তির অনুসরণ করে।
- ধারণা বনাম হক (সত্য): “নিশ্চয়ই সত্যের (হকের) বিপরীতে ধারণা (জন্) কোনো কাজে আসে না।” (১০:৩৬)
একই সত্য সুরা আন-নাজম-এ পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে:
“তারা কেবল ধারণার এবং নিজেদের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে, অথচ তাদের রব্বের পক্ষ থেকে তাদের কাছে হিদায়াত এসে গেছে।” (৫৩:২৩)
“নিশ্চয়ই সত্যের (হকের) বিপরীতে ধারণা কোনো কাজে আসে না।” (৫৩:২৮)
- হকের প্রতি অনীহা: “আমি তোমাদের কাছে হক নিয়ে এসেছি, কিন্তু তোমাদের অধিকাংশই হক অপছন্দ করো।” (৪৩:৭৮)
- সন্দেহের অবকাশ নেই: “সুতরাং আপনি হকের (সত্যের) ব্যাপারে কোনো সন্দেহের মধ্যে থাকবেন না।” (১০:৯৪)
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: সুরা ফুসসিলাত-এ বলা হয়েছে যে, এই কিতাব এক মহাপরাক্রমশালী কিতাব (আযীয), যার সামনে বা পেছন থেকে ‘বাতিল’ প্রবেশ করতে পারে না (৪১:৪১-৪২)। এর অর্থ হলো, আল কুরআন মাজীদ এমন এক ‘হক’ যা সকল প্রকার বিকৃতি বা বাতিলের অনুপ্রবেশ থেকে সুরক্ষিত।
আল্লাহ সু.তা. আরও স্পষ্ট করেছেন যে, যারা অন্ধ অনুকরণ করে তারা মূলত হকের পথ থেকে বিচ্যুত: “তারা বলে— আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের এক আদর্শে পেয়েছি... অথচ আল্লাহই তো হক এবং তিনি মৃতকে জীবিত করেন।” (৪৩:২২, ২২:৬)
🔗 সংখ্যাধিক্য বা প্রথা সত্যের মাপকাঠি নয়:
মানুষ অনেক সময় মনে করে— যেহেতু অধিকাংশ মানুষ একটি নির্দিষ্ট মতবাদ বা দর্শনে বিশ্বাসী, তাই সেটিই হয়তো সত্য। আল কুরআন মাজীদ এই যুক্তিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে:
“যদি আপনি জমিনের অধিকাংশ মানুষের কথা মেনে চলেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে; তারা তো কেবল ধারণার (জন্) অনুসরণ করে এবং তারা কেবল অনুমানই (খার্স) করে থাকে।” (৬:১১৬)
বিশ্লেষণ: এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, সত্যের মানদণ্ড কোনো ভোট বা মানুষের তৈরি ঐকমত্য নয়। বরং সত্যের একমাত্র উৎস হলো আল্লাহর নাযিলকৃত ওহী। যারা ওহী ত্যাগ করে সংখ্যাধিক্যের পথে চলে, তারা মূলত ‘দ্বলাল’ বা ভ্রষ্টতার পথে চালিত হয়।
10. দাওয়াতের ভিত্তি হবে ‘হক’ (ওহী): খেয়াল-খুশি (আহওয়া) ও ওহীর পার্থক্য:
যেকোনো উপদেশ বা দাওয়াতের মূল ভিত্তি হতে হবে নাযিলকৃত হক। সুরা মায়েদাতে মুহাম্মদ (সা.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
“অতঃপর আপনি তাঁদের মধ্যে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সেই অনুযায়ী ফয়সালা করুন এবং আপনার কাছে যে ‘হক’ (সত্য) এসেছে তা ছেড়ে তাঁদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না।” (৫:৪৮)
শব্দগত গাঁথুনি: এখানে ‘ইলম’ (জ্ঞান/ওহী) এবং ‘আহওয়া’ (খেয়াল-খুশি)-কে বৈপরীত্যে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ওহীর বাইরে মানুষের তৈরি যেকোনো মতবাদ, তা যতই যুক্তিপূর্ণ মনে হোক না কেন, তা মূলত প্রবৃত্তি বা খেয়াল-খুশিরই রূপান্তর।
এবং এখানে “আল্লাহ যা নাযিল করেছেন” এবং “হক” শব্দ দুটিকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ ওহীর বাইরে অন্য কোনো কিছুর দাওয়াত দেওয়া বা অন্য কোনো মানদণ্ডে বিচার করা মূলত হককে বর্জন করার শামিল।
11. মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক সামঞ্জস্যতা:
হক কেবল কিতাবেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টিজগত হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
- সৃষ্টির উদ্দেশ্য: “আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং এ দুয়ের মধ্যবর্তী কোনো কিছুই অনর্থক (বাতিল) সৃষ্টি করিনি।” (৩৮:২৭)
- প্রতিষ্ঠিত সত্য: “আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সত্যসহ (বিল হাক্কি) সৃষ্টি করেছেন।” (২৯:৪৪, ৪৪:৩৯)
যৌক্তিক পূর্ণতা: সৃষ্টিজগত যেহেতু হকের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাই মানুষের জীবন পরিচালনার বিধানটিও ‘হক’ (ওহী) হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই কিতাব (কুরআন) অনুসরণ করা মানেই হলো মহাজাগতিক সেই শৃঙ্খলার সাথে নিজেকে একীভূত করা।
12. কিতাব ও হকের সমান্তরাল অবস্থান:
আল কুরআন মাজীদের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ সু.তা. ‘কিতাব’ নাযিল করার সাথে ‘হক’ শব্দটিকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, কিতাবই হলো হকের ধারক ও বাহক।
“আল্লাহই সেই সত্তা, যিনি সত্যসহ (বিল হাক্কি) কিতাব ও ইনসাফের মানদণ্ড (মিযান) নাযিল করেছেন।” (৪২:১৭)
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, ‘কিতাব’ এবং ‘বিল হাক্কি’ (সত্যসহ) শব্দ দুটিকে একত্রে আনা হয়েছে। এটি কোনো আকস্মিক বিন্যাস নয়। সুরা বাকারার এই আয়াতটি বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে:
“তা এই কারণে যে, আল্লাহ সত্যসহ (বিল হাক্কি) কিতাব নাযিল করেছেন; আর যারা এই কিতাব সম্পর্কে মতভেদ সৃষ্টি করেছে, তারা সত্য থেকে অনেক দূরে বিবাদে লিপ্ত রয়েছে।” (২:১৭৬)
অনুধ্যান: এখানে ‘কিতাব’ এবং ‘হক’কে এমনভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে যে, কিতাব নাযিল হওয়াই হলো হকের পৃথিবীতে আসা। যারা কিতাব থেকে বিমুখ হয়, তারা প্রকারান্তরে হক থেকেই বিমুখ হয়।
বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ সু.তা. কিতাব নাযিলের উদ্দেশ্যই বলেছেন ‘হক’ প্রতিষ্ঠা করা।
ফয়সালাকারী হিসেবে হক: “মানুষ ছিল এক উম্মাহভুক্ত... এবং তিনি তাঁদের সাথে সত্যসহ (বিল হাক্কি) কিতাব নাযিল করলেন, যাতে মানুষের মধ্যে সে বিষয়ে ফয়সালা করা যায় যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছিল।” (২:২১৩)
সন্দেহাতীত কিতাব: “এই কিতাবের অবতরণ জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা কি বলে যে— সে এটি নিজে রচনা করেছে? বরং তা আপনার রব্বের পক্ষ থেকে আগত হক (সত্য)।” (৩২:২-৩)
সুরা হাজ্জ-এ আল্লাহ রব্বুল আলামিন হকের স্বরূপ আরও গভীরভাবে উন্মোচন করেছেন:
“তা এ জন্য যে, আল্লাহই হক (সত্য) এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে তা-ই বাতিল (মিথ্যা)।” (২২:৬২, ৩১:৩০)
“নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্যসহ (বিল হাক্কি) কিতাব নাযিল করেছি মানুষের জন্য; অতঃপর যে হেদায়েত প্রাপ্ত হয় সে তার নিজের কল্যাণেই তা হয়।” (৩৯:৪১)
আভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যতা: আল কুরআনের হকের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই (লা রাইবা ফিহি)। বিপরীতভাবে, বাতিল বা মানুষের তৈরি ব্যবস্থা সন্দেহে ঘেরা। আল্লাহ রব্বুল আলামিন সতর্ক করেছেন:
13. সুরা আসর এবং হকের উপদেশ: দাওয়াতের ভিত্তি হবে ‘হক’ (ওহী):
সুরা আসরে যে সফলতার শর্ত দেওয়া হয়েছে, সেখানে ‘হক’ এর গুরুত্ব অপরিসীম:
ওয়া তাওছা বিল হাক্ক ওয়া তাওছা বিসসবর! “...এবং তারা একে অপরকে হকের (সত্যের) উপদেশ দেয় এবং একে অপরকে ধৈর্যের উপদেশ দেয়।” (১০৩:৩)
সুতরাং তুমি কুরআনের মাধ্যমে তাকে উপদেশ দাও, যে আমার সতর্কবার্তাকে ভয় করে। -আয়াত ৫০:৪৫
গভীর অনুধ্যান: এখানে ‘হকের উপদেশ’ দেওয়ার অর্থ হলো নাযিলকৃত ওহীর কিতাব অনুযায়ী একে অপরকে পরিচালনা করা। মানুষ নিজের বিবেক বা যুক্তি থেকে যে উপদেশ দেয়, তা ভ্রমাত্মক হতে পারে। কিন্তু যখন কেউ ‘বিল হাক্কি’ বা কিতাবের রেফারেন্স দিয়ে উপদেশ দেয়, তখন সেটি আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া হকের বাস্তবায়ন হয়। আল কুরআন মাজীদ এই ‘হক’কে একটি মানদণ্ড হিসেবে স্থাপন করেছে যার মাধ্যমে মানুষ ক্ষতি (খুসরান) থেকে বাঁচতে পারে।
14. মানুষের প্রতি হকের চূড়ান্ত ডাক:
সুরা ইউনুসে আল্লাহ রব্বুল আলামিন সমগ্র মানবজাতিকে সম্বোধন করে হকের স্বরূপ বুঝিয়ে দিয়েছেন:
“বলুন— হে মানুষ! তোমাদের রব্বের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে ‘হক’ (সত্য) এসে গেছে; সুতরাং যে হিদায়াত প্রাপ্ত হয় সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা হয়।” (১০:১০৮)
একই সুরার অন্য আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর রাসূলকে আশ্বস্ত করে বলছেন:
“...নিশ্চয়ই আপনার রব্বের পক্ষ থেকে আপনার কাছে ‘হক’ (সত্য) এসে গেছে।” (১০:৯৪)
অনাযিলকৃত মতবাদের কোনো ঐশী প্রমাণ (Sultan) নেই
মানুষ যেসকল মতবাদ বা বিধান তৈরি করে, আল কুরআন সেগুলোকে ‘নিছক নাম’ বলে অভিহিত করেছে, যার কোনো ঐশী ভিত্তি নেই:
“তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কেবল কতগুলো নামের (আসমা) ইবাদত করো, যা তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষেরা সাব্যস্ত করেছ; যে বিষয়ে আল্লাহ কোনো প্রমাণ (সুলতান) নাযিল করেননি।” (১২:৪০)
যৌক্তিক পূর্ণতা: সত্যের জন্য ‘সুলতান’ বা অকাট্য প্রমাণের প্রয়োজন হয়। আল কুরআন মাজীদ সেই অকাট্য প্রমাণ, আর অনাযিলকৃত সকল কিতাব বা মতবাদ কেবল মানুষের কল্পনাপ্রসূত নামকরণ মাত্র।
15. সত্য রবের পক্ষ থেকে, মানদণ্ডও তাঁর পক্ষ থেকে:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন কিতাব নাযিল করার সাথে সাথে ‘মিযান’ বা মানদণ্ডও নাযিল করেছেন, যাতে সত্য-মিথ্যা পরখ করা যায়:
“আল্লাহই সেই সত্তা, যিনি সত্যসহ (বিল হাক্কি) কিতাব ও ইনসাফের মানদণ্ড (মিযান) নাযিল করেছেন।” (৪২:১৭)
অনুধ্যান: এই ‘মিযান’ হলো নাযিলকৃত ওহী। যদি অনাযিলকৃত কোনো মতবাদ সত্যের মাপকাঠি হতো, তবে আল্লাহ রব্বুল আলামিন কিতাব ও মিযান নাযিল করার আবশ্যকতা অনুভব করতেন না। নাযিলকৃত কিতাবই হলো সেই নিক্তি, যার পাল্লায় পৃথিবীর সকল মতবাদকে বিচার করতে হবে; বিপরীতটি নয়।
সারসংগত সমাপ্তি:
আল কুরআন মাজীদের আয়াতসমূহ বিশ্লেষণ করলে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয় যে, ‘আল-হক’ হলো আল্লাহর নাযিলকৃত ওহীর কিতাব। এটি মানুষের ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশি (আহওয়া) বা অপ্রমাণিত ধারণার বিপরীত। সত্য বা হক কেবল তা-ই যা রব্বুল আলামিন আকাশ থেকে নাযিল করেছেন (২:১৭৬)। হকের দাওয়াত দেওয়া মানেই হলো ওহীর বিধানের দাওয়াত দেওয়া। সুরা আসরে যে হকের উপদেশের কথা বলা হয়েছে, তা মূলত আল্লাহর নাযিলকৃত চিরন্তন বিধানেরই নামান্তর। যারা এই হককে আঁকড়ে ধরে তারাই সফল, আর যারা হকের বিপরীতে ভ্রষ্টতা অনুসরণ করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত।
░ ▓▒░ কুরআনিক দুআ-তাসবীহ░▒▓ ░
হকের ওপর দৃঢ়-অবিচল থাকার দুআ:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
রব্বানা লা তুযিগ ক্বুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাবলানা মিল্লাদুনকা রহমাতান, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব
অর্থ: হে আমাদের রব্ব! আমাদের হেদায়েত দানের পর আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনে প্রবৃত্ত করবেন না এবং আপনার নিকট থেকে আমাদের রহমত দান করুন; নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা। (৩:৮)
হকের সাক্ষী হওয়ার দুআ:
رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ
রব্বানা আমান্না বিমা আনযালতা ওয়াত্তাবা’নার রসুলা ফাকতুবনা মা’আশ শাহিদিন
অর্থ: হে আমাদের রব্ব! আপনি যা নাযিল করেছেন তার ওপর আমরা ইমান এনেছি এবং আমরা রাসূলের অনুসরণ করেছি; অতএব আমাদের সাক্ষ্যদাতাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নিন। (৩:৫৩)
হকের সাথে ফয়সালার দুআ:
: رَبَّنَا افْتَحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ قَوْمِنَابِالْحَقِّ وَأَنتَ خَيْرُ الْفَاتِحِينَ
রব্বানাফতাহ বাইনানা ওয়া বাইনা ক্বাওমিনা বিল হাক্কি ওয়া আনতা খাইরুল ফাতিহিন
অর্থ: হে আমাদের রব্ব! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে হক বা সত্যের সাথে ফয়সালা করে দিন; আর আপনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী। (৭:৮৯)
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
রব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুররাহীম্।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু। (আল কুরআন
২:১২৭, ২:১২৮)
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلَامٌ عَلَى
الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
সুবহানা রব্বিকা রব্বিল ইজ্জাতি আম্মা ইয়াসিফুন, ওয়া সালামুন আলাল মুরসালিন, ওয়াল হামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন
অর্থ: আপনার রব্ব, যিনি সম্মানের অধিকারী—তারা যা আরোপ করে তা থেকে তিনি পবিত্র। এবং সালাম বর্ষিত হোক রাসূলগণের প্রতি। আর সকল প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। (৩৭:১৮০-১৮২)
