আমরা ভাইদের কখনো পরিত্যাগ করি না। কোন সে ভাই?

পত্রিকার নিউজটি এই রকম: 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি কখনো ভাইদের ‘পরিত্যাগ’ করেন না। একই সঙ্গে মানুষের জীবন রক্ষায় ‘প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’ বলেও দাবি করেছেন তিনি।

রোববার মৃত সাগরের তীরে দ্রুজ ও সার্কাসিয়ান সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এসব কথা বলেন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি তাদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার আশ্বাস দেন এবং বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান।

নেতানিয়াহু বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো জীবন রক্ষা করা। আমি এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ নিয়েই আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলছি।

এ সময় দ্রুজ ও সার্কাসিয়ান সম্প্রদায়কে ভাইয়ের মতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভাই কখনো ভাইকে পরিত্যাগ করে না।


তবে নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটির বিভিন্ন স্থানে চালানো হামলায় অন্তত ৫১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুজন চিকিৎসাকর্মীও রয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করে চিকিৎসাকর্মীদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা বাড়ছে।

বৈঠকের একপর্যায়ে নেতানিয়াহু আগেভাগেই অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের জন্য জরুরি ভিত্তিতে তাকে (নেতানিয়াহু) জেরুজালেমে ফিরতে হয়।

 ◇ ◆ ◇ ◆ ◇ ◆ ◇ 

আমার কাছে খবরটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—

“আমরা কখনো ভাইদের পরিত্যাগ করি না। মানুষের জীবন রক্ষায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” — ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu.

এ সময় তিনি দ্রুজ ও সার্কাসিয়ান সম্প্রদায়কে “ভাই” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “ভাই কখনো ভাইকে পরিত্যাগ করে না।”

এই বক্তব্য থেকেই আমার জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ, দ্রুজ ও সার্কাসিয়ানরা ইহুদি (Jewish) সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নয়; তবু ইসরাইল রাষ্ট্র কেন তাদের এত ঘনিষ্ঠ ও আপন হিসেবে বিবেচনা করে? কারা এই দ্রুজ ও সার্কাসিয়ান জনগোষ্ঠী? কী তাদের ইতিহাস, পরিচয় ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের পটভূমি?

মধ্যপ্রাচ্যে “দ্রুজ” (Druze) ও “সার্কাসিয়ান” (Circassian) — দুটিই ছোট কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জাতিগত/ধর্মীয় সম্প্রদায়। তারা আরব বিশ্বের মূলধারার জনগোষ্ঠী থেকে কিছুটা আলাদা পরিচয় বহন করে।

দ্রুজরা মূলত একটি ধর্মীয়-জাতিগত সম্প্রদায়, যারা ১১শ শতকে মিশরের ফাতেমীয় খেলাফতের সময় উদ্ভূত হয়। তাদের ধর্ম ইসলাম থেকে উৎসারিত হলেও এটি স্বতন্ত্র ও গোপনীয় বিশ্বাসব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

কোথায় বসবাস করে?

দ্রুজ জনগোষ্ঠী প্রধানত পাওয়া যায়:

  • Lebanon
  • Syria
  • Israel
  • কিছু সংখ্যায় Jordan

বিশেষ করে সিরিয়ার জাবাল আল-দ্রুজ (Druze Mountain) অঞ্চল তাদের ঐতিহাসিক কেন্দ্র।

ধর্মীয় পরিচয়

দ্রুজ ধর্ম:

  • ইসলামের শিয়া ইসমাইলি ধারার প্রভাব থেকে জন্ম নেয়
  • কিন্তু পরে আলাদা ধর্মে রূপ নেয়
  • পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে
  • ধর্মীয় গ্রন্থ ও আচার অনেকটাই গোপন
  • বাইরের কাউকে সহজে ধর্মান্তরিত করা হয় না

তাদের ধর্মীয় নেতা ও সাধারণ সদস্যদের মধ্যে জ্ঞানগত বিভাজন আছে:

  • “উক্কাল” — ধর্মজ্ঞানসম্পন্ন
  • “জুহহাল” — সাধারণ অনুসারী

ইতিহাসে ভূমিকা

দ্রুজরা দীর্ঘদিন পাহাড়ি অঞ্চলে আধা-স্বায়ত্তশাসিতভাবে বসবাস করেছে।
তারা প্রায়ই:

  • অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে
  • Great Syrian Revolt-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে
  • আধুনিক ইসরায়েলে দ্রুজদের একটি অংশ সেনাবাহিনীতে কাজ করে

সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য

  • আরবি ভাষাভাষী
  • নিজস্ব সামাজিক রীতি অত্যন্ত শক্তিশালী
  • আন্তঃবিবাহ সীমিত
  • সম্প্রদায়ভিত্তিক ঐক্য খুব দৃঢ়

সার্কাসিয়ানরা মূলত ককেশাস অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তাদের আদি বাসস্থান বর্তমান Russia-এর উত্তর ককেশাস অঞ্চলে।

কীভাবে তারা মধ্যপ্রাচ্যে এল?

১৯শ শতকে Russian-circassian war চলাকালে রুশ সাম্রাজ্য সার্কাসিয়ানদের ব্যাপকভাবে উৎখাত করে।

এ ঘটনাকে অনেক ইতিহাসবিদ “Circassian Genocide” হিসেবেও উল্লেখ করেন।

ফলে লক্ষাধিক সার্কাসিয়ান পালিয়ে যায়:

  • Ottoman Empire-এ
  • পরে বর্তমান:
    • Turkey
    • Jordan
    • Syria
    • Israel-এ বসতি গড়ে

পরিচয় ও সংস্কৃতি

সার্কাসিয়ানরা:

  • মুসলিম (বেশিরভাগ সুন্নি)
  • কিন্তু জাতিগতভাবে আরব নয়
  • নিজস্ব ভাষা আছে (adyghe/circassian)
  • যোদ্ধা সংস্কৃতি ও অশ্বারোহী ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত

অটোমান সাম্রাজ্যে ভূমিকা

অটোমানরা সার্কাসিয়ানদের:

  • দক্ষ সৈনিক
  • সীমান্ত রক্ষী
  • রাজকীয় নিরাপত্তারক্ষী
    হিসেবে ব্যবহার করত।

জর্ডানে তারা রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাজধানী আম্মানে প্রথম দিকের পুনর্বাসিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সার্কাসিয়ানরা ছিল।

সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য

  • ঐতিহ্যবাহী নৃত্য বিখ্যাত
  • সম্মান ও আতিথেয়তাভিত্তিক সামাজিক রীতি
  • বংশগত পরিচয় সংরক্ষণে সচেতন

এই দুই সম্প্রদায়ই মধ্যপ্রাচ্যের বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এবং সংখ্যায় ছোট হলেও রাজনীতি, সামরিক ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে তাদের প্রভাব উল্লেখযোগ্য।

➖➖➖➖➖➖➖

সার্কাসিয়ান (Circassian)-দের সাথে ইসরাইলের কোন গভীর সম্পর্ক রয়েছে কি?

হ্যাঁ, Israel-এ সার্কাসিয়ানদের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ ও বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। তবে এটি “গোপন” বা “অস্বাভাবিক” ধরনের সম্পর্ক নয়; বরং ঐতিহাসিক, সামরিক ও সামাজিক সমঝোতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক।

ইসরাইলে সার্কাসিয়ানরা কারা?

ইসরাইলে সার্কাসিয়ানদের সংখ্যা খুবই কম — আনুমানিক কয়েক হাজার। তারা মূলত দুটি গ্রামে বসবাস করে:

  • Kfar Kama
  • Rehaniya

তারা ১৯শ শতকে অটোমান আমলে ককেশাস থেকে এসে বসতি স্থাপন করে।


কেন ইসরাইলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো বলে ধরা হয়?

১. বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা

ইসরাইলে সার্কাসিয়ান পুরুষদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা (conscription) রয়েছে — ঠিক অনেক ইহুদি নাগরিকের মতো।

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ:

  • অধিকাংশ আরব মুসলিম নাগরিককে বাধ্যতামূলক সেনাসেবায় নেওয়া হয় না
  • কিন্তু সার্কাসিয়ান ও দ্রুজদের নেওয়া হয়

ফলে সার্কাসিয়ানরা:

  • Israel Defense Forces-এ কাজ করে
  • নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা খাতেও অংশ নেয়

এ কারণে রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ।


২. “বিশ্বস্ত সংখ্যালঘু” নীতি

ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের পর কিছু অ-ইহুদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক তৈরি করে।
দ্রুজ ও সার্কাসিয়ানরা সেই গোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে।

কারণ:

  • তারা সংখ্যায় ছোট
  • আরব জাতীয়তাবাদের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম ছিল না
  • নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় রক্ষা করতে চাইত

ফলে রাষ্ট্র তাদের:

  • সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসন
  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
  • সম্প্রদায়িক অধিকার
    দিতে তুলনামূলকভাবে আগ্রহী ছিল।

৩. সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ

ইসরাইলে সার্কাসিয়ানরা:

  • নিজস্ব ভাষা শেখায়
  • ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও নৃত্য বজায় রাখে
  • ককেশীয় পরিচয় রক্ষা করে

উদাহরণ হিসেবে Circassian Heritage Center উল্লেখযোগ্য।


তারা কি ইসরাইলপন্থী?

বিষয়টি পুরোপুরি একরৈখিক নয়।

অনেক সার্কাসিয়ান:

  • ইসরাইলি নাগরিক পরিচয়কে গ্রহণ করে
  • সেনাবাহিনীতে কাজ করে
  • রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করে

কিন্তু একই সঙ্গে:

  • তারা মুসলিম পরিচয়ও বহন করে
  • ফিলিস্তিনি প্রশ্ন নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে
  • সব সার্কাসিয়ান একই রাজনৈতিক অবস্থানে নয়

অর্থাৎ “ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র” বলাটা আংশিক সত্য, কিন্তু পুরো সম্প্রদায়কে একভাবে দেখা ঠিক নয়।


একটি ঐতিহাসিক দিক

অটোমান যুগ থেকে সার্কাসিয়ানদের প্রায়ই সীমান্ত রক্ষী বা সামরিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বসতি দেওয়া হতো।
তাদের সংগঠিত ও সামরিক দক্ষ সম্প্রদায় হিসেবে দেখা হতো।

ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পরও সেই ঐতিহাসিক ধারা কিছুটা অব্যাহত থাকে:

  • রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা তৈরি হয়
  • বিনিময়ে তারা স্থিতিশীল নাগরিক মর্যাদা পায়

দ্রুজদের সঙ্গে তুলনা

ইসরাইলে দ্রুজদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক সার্কাসিয়ানদের চেয়েও গভীর ও বড় আকারের।
দ্রুজদের:

  • আলাদা সামরিক ইউনিট ছিল
  • রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্ব বেশি
  • জনসংখ্যাও বেশি

সার্কাসিয়ানরা তুলনামূলকভাবে ছোট কিন্তু সম্মানিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post