মহা নিদর্শন দর্শনে ‘ইসরা’ ও উর্ধ্বগমন: প্রচলিত ধারণার বিপরীতে আল কুরআন মাজীদের অকাট্য ওহীভিত্তিক সত্যের সন্ধান!
আল কুরআন মাজীদে বর্ণিত অলৌকিক ঘটনাবলী ও ওহীর প্রামাণ্যতা:
আল কুরআন মাজীদ কেবল তত্ত্বকথা নয়, বরং এটি রব্বুল আলামিনের অসীম ক্ষমতার জীবন্ত দর্পণ। আল্লাহ সু.তা. তাঁর মনোনীত নবী ও রাসূলগণের মাধ্যমে এমন সব নিদর্শন (আয়াত) প্রদর্শন করেছেন, যা মানবীয় যুক্তি ও প্রকৃতির সাধারণ নিয়মকে হার মানায়। আসহাবে কাহফের দীর্ঘ নিদ্রা থেকে শুরু করে সাগর দ্বিখণ্ডিত হওয়া কিংবা মৃতকে জীবিত করা—এই প্রতিটি ঘটনা আল কুরআনে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে। এই অলৌকিক ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে, আল্লাহ যখন কোনো নিদর্শনকে ‘শিক্ষা’ হিসেবে মনোনীত করেন, তখন তিনি তার প্রয়োজনীয় বিবরণ ওহীর মাধ্যমে সংরক্ষণ করেন।
যেমন- আসহাবে কাহফের বিস্ময়কর নিদর্শন (১৮:৯, (১৮:২৫), সালামুন আলা ইব্রাহীম-এর পাখি জীবিতকরণ (২:২৬০), সালামুন আলা ঈসা-এর অলৌকিক ক্ষমতা (৩:৪৯), সালামুন আলা মূসা-এর লাঠি ও সাগর বিভাজন (২৬:৬৩) -এভাবে আরও কত্তো কি আল্লাহর রাসুলের কাছে অহীকৃত একমাত্র আল কুরআন থেকে আমরা জানতে পারি ১০০% বিশুদ্ধভাবে:
এই প্রবন্ধের গৌরচন্দ্রিকা হিসেবে নিচে আল কুরআনে বর্ণিত সেই মহান নিদর্শনসমূহের যৌক্তিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগ তুলে ধরা হলো:
আল কুরআন মাজীদ সত্যের এক অতন্দ্র প্রহরী। নবী মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর জীবনে ঘটে যাওয়া অলৌকিক উর্ধ্বভ্রমণ বা নৈশ ভ্রমণ সম্পর্কে প্রচলিত বহু কাহিনীর ভিড়ে আল কুরআন অত্যন্ত সুসংহত, যৌক্তিক এবং আধ্যাত্মিক তথ্য প্রদান করে। এই আলোচনাটি কোনো প্রচলিত ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং আল কুরআনের আয়াতের পারস্পরিক বিন্যাস ও ‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছে- এবং অনুধ্যানে আপনাদের সাথে শেয়ার করছি- বিঈযনিল্লাহ!
আরাফ, চ্যানেলস এবং সিদরাতুল মুনতাহা (works as the communication hub of the universes) : দ্র: আয়াত ৭:৪৬, ৫৫:১৭-১৮
আল্লাহর রাসুল সালামুন আলা মুহাম্মদের ইসরা’ ও উর্ধ্বগমনের বিষয়:
পার্থিব সীমানা অতিক্রম ও পবিত্রতার সেতুবন্ধন:
আল কুরআন মাজীদে নৈশ ভ্রমণের বিষয়টিকে ‘ইসরা’ (নৈশ ভ্রমণ করানো) শব্দ দিয়ে শুরু করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেন:
“পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার পরিবেশকে আমি বরকতময় করেছি; যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহ (আয়াতিনা) দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (১৭:১)
গভীর অনুধ্যান: এই আয়াতের শব্দগত গাঁথুনি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ভ্রমণের শুরু ‘সুবহান’ (পবিত্রতা) শব্দ দিয়ে। এর অর্থ হলো এটি কোনো সাধারণ মানবিক যাত্রা নয়, বরং এক ঐশী পরিকল্পনা। ‘লি নুরিইয়াহু’ (যাতে আমি তাকে দেখাতে পারি) বাক্যটি এই যাত্রার মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দেয়—আর তা হলো আল্লাহর ‘আয়াত’ বা নিদর্শনের সরাসরি পর্যবেক্ষণ। এটি কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন নয়, বরং সৃষ্টির গভীর রহস্য উন্মোচনের এক ঐশী আয়োজন।
উর্ধ্বজগত ও সিদরাতুল মুনতাহা: চরম সান্নিধ্যের সীমানা:
সূরা আন-নাজমে আল্লাহ রব্বুল আলামিন নবী মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর সেই উর্ধ্বজগতের অভিজ্ঞতার এক অপার্থিব ও নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেছেন। এখানে শব্দগত সামঞ্জস্য ও বিন্যাস অত্যন্ত সূক্ষ্ম।
আল্লাহ সু.তা. বলেন:
“অতঃপর সে নিকটবর্তী হলো ও ঝুলে পড়ল। ফলে তাদের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহী করার তা ওহী করলেন। সে যা দেখেছে, তার অন্তর (ফুনয়াদ) তা অস্বীকার করেনি।” (৫৩:৮-১১)
এই উর্ধ্বগমনের চরম সীমা বা আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুল মুনতাহার নিকট। যার কাছেই অবস্থিত ‘জান্নাতুল মাওয়া’। যখন গাছটি (সিদরাহ) আচ্ছন্ন ছিল এমন কিছু দ্বারা যা তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।” (৫৩:১৩-১৬)
যৌক্তিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগ:
এখানে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ (প্রান্তীয় কুল গাছ) শব্দটি একটি আধ্যাত্মিক সীমানা নির্দেশ করে, যার ওপারে কোনো সৃষ্টির জ্ঞান পৌঁছাতে পারে না। আল কুরআন অনুযায়ী, জান্নাতুল মাওয়া (থাকার জান্নাত) সেই সিদরাহর নিকটবর্তী। এই বর্ণনাটি প্রমাণ করে যে, এই ভ্রমণটি ছিল সৃষ্টির চূড়ান্ত প্রান্ত পর্যন্ত এক আধ্যাত্মিক ও দৃশ্যমান আরোহণ।
দৃষ্টির স্থিরতা ও মহাসত্যের পর্যবেক্ষণ (আয়াতুল কুবরা):
অনেকে প্রশ্ন করেন, সেই উর্ধ্বভ্রমণ কি নিছক কল্পনা ছিল? আল কুরআন এর জবাবে ‘দৃষ্টি’ ও ‘হৃদয়’-এর সমন্বয় তুলে ধরেছে।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:
“তার দৃষ্টি বিভ্রম ঘটেনি এবং সে সীমালঙ্ঘনও করেনি। অবশ্যই সে তার পালনকর্তার মহা নিদর্শনসমূহ (আয়াতিল কুবরা) দেখেছিল।” (৫৩:১৭-১৮)
শব্দগত বিশ্লেষণ: এখানে ‘মা যাগ আল-বাসার’ (দৃষ্টি ফেরেনি) বাক্যটি অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, নবী (সালামুন আলাইহে) যা দেখেছিলেন তা কোনো স্বপ্ন বা অস্পষ্ট কল্পনা ছিল না, বরং তা ছিল এক জাগরুক প্রত্যক্ষ দর্শন। তিনি তাঁর রবের ‘আয়াতিল কুবরা’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শনসমূহ প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যার মধ্যে জান্নাত ও অদৃশ্য জগতের সত্যতা অন্তর্ভুক্ত।
রুইয়া (দর্শন): বিশ্বাসের এক মহা পরীক্ষা:
আল কুরআন মাজীদ এই উর্ধ্বভ্রমণ বা দর্শনকে মানুষের বিশ্বাসের জন্য একটি ‘ফিতনাহ’ বা পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আল্লাহ সু.তা. এরশাদ করেন:
“আমি যে দৃশ্য (রুইয়া) আপনাকে দেখিয়েছি, তা কেবল মানুষের পরীক্ষার জন্য ছিল...” (১৭:৬০)
ইমপ্লাইড এভিডেন্স (অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত): এখানে ‘রুইয়া’ শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নবী মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-কে যা দেখানো হয়েছিল, তা সাধারণ মানুষের চর্মচক্ষুর দেখার ঊর্ধ্বে ছিল। এটি ছিল একটি ঐশী দর্শন যা বিশ্বাসীদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং অবিশ্বাসীদের জন্য বিতর্কের জন্ম দেয়।
সাদৃশ্য ও বৈপরীত্য contrasting reference): সালামুন আলা মূসা বনাম সালামুন আলা মুহাম্মদ:
আল কুরআনের বিভিন্ন স্থানে অন্যান্য নবীদের আল্লাহকে দেখার বা কথা বলার ঘটনা রয়েছে। যেমন সালামুন আলা মূসা যখন আল্লাহকে দেখতে চেয়েছিলেন, তখন পাহাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলেন (৭:১৪৩)।
কিন্তু সালামুন আলা মুহাম্মদ -এর ক্ষেত্রে আল কুরআন সাক্ষ্য দেয়—
“তার দৃষ্টি বিভ্রম ঘটেনি” (৫৩:১৭)। অর্থাৎ তাঁকে এমন এক আধ্যাত্মিক সক্ষমতা ও স্থিরতা দেওয়া হয়েছিল যে, তিনি সিদরাতুল মুনতাহার সেই প্রচণ্ড তেজ ও মহান নিদর্শনসমূহ অবিচলভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছিলেন। এটিই আল কুরআনের দৃষ্টিতে তাঁর উর্ধ্বগমনের শ্রেষ্ঠত্ব।
অনূধ্যান: আল কুরআন মাজীদের এই আয়াতসমূহকে (১৭:১, ৫৩:১-১৮, ১৭:৬০) একত্রে মেলালে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে ওঠে:
১. এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ কুদরতি সফর (ইসরা), যার উদ্দেশ্য ছিল স্বচক্ষে নিদর্শন দেখা।
২. এই ভ্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল উর্ধ্বজগতের ‘সিদরাতুল মুনতাহা’, যেখানে জান্নাতুল মাওয়া অবস্থিত।
৩. এটি কোনো নিছক গল্প নয়, বরং ‘আয়াতিল কুবরা’ দর্শনের এক বাস্তব আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। ৪. এই ঘটনাটি মানবজাতির জন্য ঈমানের এক মহা পরীক্ষা হিসেবে নির্ধারিত।
নবী মুহাম্মদ (সা.) আকাশমন্ডলীর প্রতিটি স্তরে কী কী দেখেছেন বা কার সাথে কী কথা বলেছেন—সে বিষয়ে আল কুরআন বিস্তারিত মৌনতা অবলম্বন করে কেবল ‘আয়াতিল কুবরা’ (মহান নিদর্শনসমূহ) কথাটি বলেছে। আল কুরআনের এই সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী বর্ণনাটিই একজন মুমিনের জন্য সত্যের পরম মাপকাঠি।
নবী মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর উর্ধ্বগমন ও ঐশী নিদর্শন দর্শনের বিষয়টি আল কুরআন মাজীদের আরও গভীরে গিয়ে অনুধাবন করলে কিছু অনন্য এবং শক্তিশালী সংযোগ (links) পাওয়া যায়। প্রবন্ধের গভীরতা ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতা বৃদ্ধির জন্য নিম্নোক্ত পয়েন্টগুলো ও আয়াতসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে পেশ করা যেতে পারে:
১. ইব্রাহীম (সালামুন আলাইহে)-এর সাথে সাদৃশ্য:
‘মালাকুত’ বা রাজত্ব দর্শন আল কুরআন মাজীদে কেবল সালামুন আলা মুহাম্মদ-কেই নয়, বরং নবী সালামুন আলা ইব্রাহীম-কেও আকাশমণ্ডলীর রাজত্ব দেখানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, এটি আল্লাহর মনোনীত রাসুলদের জন্য একটি সুন্নাহ বা নিয়ম।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:
“আর এভাবেই আমি ইব্রাহীমকে আসমান ও যমীনের রাজত্ব (মালাকুত) দেখাতাম, যাতে সে দৃঢ় বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।” (৬:৭৫)
গভীর অনুধ্যান: মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর উর্ধ্বগমনের উদ্দেশ্যও ছিল একই— ‘যাতে সে দৃঢ় বিশ্বাসী হতে পারে’ এবং ‘যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শন দেখাতে পারি’ (১৭:১)।
এই ‘মালাকুত’ এবং ‘আয়াতিল কুবরা’ (৫৩:১৮) একই আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার দুটি ভিন্ন পর্যায়। এটি প্রমাণ করে যে, এই সফরটি ছিল পরম সত্যকে স্বচক্ষে দেখার মাধ্যমে ঈমানকে ‘আইনুল ইয়াকীন’ বা চাক্ষুষ নিশ্চিত বিশ্বাসে রূপান্তর করা।
২. ‘আল-উফুকুল মুবীন’ বা সুস্পষ্ট দিগন্তের সংযোগ:
সূরা আন-নাজমে উর্ধ্বগমনের যে বর্ণনা রয়েছে, তার একটি শক্তিশালী সমর্থক আয়াত সূরা আত-তাকওয়ীর-এ বিদ্যমান। এই দুটি সূরার বর্ণনা পারস্পরিকভাবে সত্যের সাক্ষ্য দেয়।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:
“নিশ্চয়ই সে তাকে (জিবরাঈলকে অথবা ঐশী জ্যোতিকে) সুস্পষ্ট দিগন্তে (আল-উফুকিল মুবীন) দেখেছিল।” (৮১:২৩)
যৌক্তিক কাঠামো: সূরা আন-নাজমে বলা হয়েছে “সে ছিল উচ্চ দিগন্তে” (৫৩:৭)। এই ‘উফুক’ বা দিগন্ত হলো সেই সংযোগস্থল যেখানে পার্থিব জগত ও অপার্থিব জগত মিলিত হয়। আল কুরআনের এই শব্দগত সামঞ্জস্য প্রমাণ করে যে, মুহাম্মদ (সা.) সৃষ্টির এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন যেখানে সাধারণ মানুষের জ্ঞান ও দৃষ্টি পৌঁছাতে পারে না।
৩. ‘সুলতান’ বা বিশেষ শক্তির মাধ্যমে আকাশমন্ডলী অতিক্রম সাধারণভাবে আসমান ও যমীনের সীমানা অতিক্রম করা অসম্ভব, যদি না আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ শক্তি বা ‘সুলতান’ দেওয়া হয়।
আল্লাহ সু.তা. চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন:
“হে জিন ও মানবকুল! আসমান ও যমীনের সীমানা যদি তোমরা অতিক্রম করতে পারো, তবে করো; কিন্তু তোমরা তা পারবে না ‘সুলতান’ (বিশেষ শক্তি/কর্তৃত্ব) ব্যতীত।” (৫৫:৩৩)
ইমপ্লাইড এভিডেন্স (অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত):
নবী মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর উর্ধ্বগমন সম্ভব হয়েছিল কারণ আল্লাহ তাঁকে সেই ‘সুলতান’ বা বিশেষ ঐশী কর্তৃত্ব দান করেছিলেন। এটি কোনো যান্ত্রিক যাত্রা ছিল না, বরং এটি ছিল মহান আল্লাহর সরাসরি মেহমানদারী, যা সৃষ্টির সকল আইনকে ম্লান করে দিয়েছিল।
৪. ‘বারাকাহ’ বা বরকতময় পরিবেশের তাৎপর্য:
ইসরা ও উর্ধ্বগমনের আয়াতে (১৭:১) ‘বারাকনা হাওলাহু’ (যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি) বলা হয়েছে। আল কুরআন মাজীদে ‘বারাকাহ’ শব্দটি এমন স্থানের জন্য ব্যবহৃত হয় যেখানে আল্লাহর রহমত সরাসরি অবতীর্ণ হয়।
ক্রস-রেফারেন্স: আল্লাহ সু.তা. মূসা (সালামুন আলাইহে)-এর ক্ষেত্রেও আগুনের শিখার চারপাশকে বরকতময় বলেছিলেন:
“বরকতময় তিনি যিনি এই আগুনের মধ্যে আছেন এবং যারা এর চারপাশে আছে।” (২৭:৮)
অনুধাবন: মূসা (সালামুন আলাইহে) যমীনে থেকে আল্লাহর নূরের তাজাল্লি দেখেছিলেন, কিন্তু মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-কে সেই ‘বরকতময়’ জগতের কেন্দ্রবিন্দুতে অর্থাৎ ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এটি মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনন্য এবং সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতীক।
৫. ‘মা ওহা’ (যা ওহী করা হয়েছে): অপ্রকাশিত ওহীর রহস্য সূরা আন-নাজমে একটি চমৎকার রহস্যময় বাক্য রয়েছে:
“অতঃপর তিনি তাঁর বান্দার প্রতি ওহী করলেন, যা ওহী করার ছিল (মা ওহা)।” (৫৩:১০)
এখানে ‘মা’ (যা কিছু) শব্দটি অনির্দিষ্ট। আল কুরআনের এই শৈল্পিক প্রকাশভঙ্গি (ambiguity) ইঙ্গিত দেয় যে, উর্ধ্বগমনের সময় আল্লাহ তাঁর রাসূলের হৃদয়ে এমন কিছু বিশেষ জ্ঞান বা ওহী ঢেলে দিয়েছিলেন যা কেবল স্রষ্টা এবং সৃষ্টির সেই শ্রেষ্ঠ মিলনের মাঝেই সীমাবদ্ধ। এটি সেই মহান সফরের ‘মেটাফিজিক্যাল’ বা আধ্যাত্মিক পূর্ণতা।
৬. বিপরীতমুখী চিত্র: কাফিরদের মিথ্যা দাবি বনাম রাসুলের সত্য দর্শনকাফিররা যখন আল্লাহর নিদর্শন দেখতে চেয়েছিল (১৭:৯৩), তখন আল্লাহ তাদের আকাশ থেকে কিতাব নামিয়ে আনতে বলেছিলেন। কিন্তু তাদের সেই দাবি ছিল স্পর্ধামূলক।
বিপরীতে, আল্লাহর রাসূল কোনো দাবি করেননি, বরং আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় তাঁকে নিয়ে গেছেন। আল্লাহ বলেন:
“তারা কি আপনার সাথে বিতর্ক করছে, সে যা দেখেছে সে সম্পর্কে?” (৫৩:১২)
এখানে ‘বিতর্ক’ শব্দটি প্রমাণ করে যে, এটি একটি দৃশ্যমান বিষয় ছিল যা কাফিরদের যুক্তিতে ধরত না। কিন্তু আল কুরআন একে ‘লা ইয়াকযিব’ (অস্বীকার করেনি) বলে ঘোষণা দিয়ে বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে।
আল কুরআন মাজীদের এই গভীরতর লিঙ্কগুলো থেকে আমরা পাই:
- ঐতিহাসিক ধারা: এটি কেবল মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর একক ঘটনা নয়, বরং ইব্রাহীম (সালামুন আলাইহে)-এর ধারারই এক পূর্ণতা।
- দৃষ্টির সত্যতা: স্বপ্ন বা কাল্পনিক নয়, বরং ‘দৃষ্টি’ (বাসার) এবং ‘হৃদয়’ (ফুয়াদ)-এর এক অপূর্ব সমন্বয়।
- আধ্যাত্মিক সীমানা: সিদরাতুল মুনতাহা ও জান্নাতুল মাওয়া’র অবস্থান নিশ্চিত করার মাধ্যমে অদৃশ্য জগতকে আমাদের সামনে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।
- পবিত্রতা: সম্পূর্ণ সফরের শুরু ও শেষ আল্লাহর ‘সুবহান’ (পবিত্রতা) ও ‘হামদ’ (প্রশংসা)-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত।
আল কুরআন মাজীদের এই অকাট্য দলিলসমূহ এটিই প্রমাণ করে যে, মুহাম্মদ (সা.)-এর উর্ধ্বগমন কোনো অলীক কাহিনী নয়, বরং এটি সৃষ্টির মহাবিন্যাসে স্রষ্টা ও শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির এক মহামিলন। এর মাধ্যমে মুমিনদের জন্য ‘গাইয়িব’ বা অদৃশ্যের ওপর ঈমান আনা সহজতর হয়েছে এবং এটি কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে মুমিনদের জন্য এক পরম আশার আলো হিসেবে কাজ করে।
আরও একটু অনুসন্ধিৎসু অনুধাবন:
সুরা আল-মাআরিজ (৭০ নম্বর সুরা) এবং আল কুরআন মাজীদের অন্যান্য কিছু আয়াতের মধ্যে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উর্ধ্বগমনের এক গভীরতম ও শক্তিশালী ‘ইমপ্লাইড এভিডেন্স’ বা অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। অনুসন্ধানে আরও অত্যন্ত চমৎকার তথ্য মিলে- কারণ সুরা আল-মাআরিজের নাম এবং এর বিষয়বস্তু উর্ধ্বগমনের (ascension) যৌক্তিক ও কারিগরি কাঠামোটি আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয়।
নিচে আল কুরআনের আলোকে এর গভীরতর সংযোগ বিশ্লেষণ করা হলো:
১. ‘যিল মাআরিজ’ (উর্ধ্বগমনের সোপানসমূহের মালিক):
মহাজাগতিক পথরেখা সুরা আল-মাআরিজের শুরুতেই আল্লাহ রব্বুল আলামিন নিজের একটি বিশেষ গুণবাচক নাম উল্লেখ করেছেন:
“তা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে, যিনি উর্ধ্বগমনের সোপানসমূহের অধিকারী (যিল মাআরিজ)।” (৭০:৩)
গভীর অনুধ্যান: ‘মাআরিজ’ (مَعَارِج) শব্দটি ‘মি’রাজ’ শব্দের বহুবচন, যার অর্থ হলো আরোহণের সিঁড়ি বা পথ। আল্লাহ রব্বুল আলামিন যখন নিজেকে ‘যিল মাআরিজ’ বলছেন, তখন এটি নিশ্চিত হয় যে সৃষ্টির ভেতরে উর্ধ্বলোকে গমনের নির্দিষ্ট পথ বা ‘পোর্টাল’ বিদ্যমান। এটি নবী মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর উর্ধ্বগমনের জন্য একটি মহাজাগতিক ও কারিগরি ভিত্তি (metaphysical infrastructure) প্রদান করে। অর্থাৎ, আল্লাহ চাইলে তাঁর মনোনীত বান্দাকে সেই বিশেষ পথ বা সোপান দিয়ে তাঁর সান্নিধ্যে নিয়ে যেতে পারেন।
২. ‘আর-রূহ’ ও ফেরেশতাদের উর্ধ্বগমন:
সময়ের আপেক্ষিকতা পরের আয়াতেই (৭০:৪) উর্ধ্বগমনের গতি ও সময় সম্পর্কে একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে:
“ফেরেশতারা এবং রূহ তাঁর দিকে উর্ধ্বগামী হয় এমন এক দিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।” (৭০:৪)
যৌক্তিক সংযোগ: এখানে ‘আর-রূহ’ (জিবরাঈল অথবা বিশেষ নূরানী সত্তা) এবং ফেরেশতাদের উর্ধ্বগমনের কথা বলা হয়েছে। আমরা জানি, মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর ইসরা ও উর্ধ্বগমনে ‘রূহ’ বা জিবরাঈলের বিশেষ ভূমিকা ছিল (৫৩:৫)। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে উর্ধ্বজগত ও যমীনের মধ্যে যাতায়াতের এমন কিছু পথ রয়েছে যা অতিক্রম করতে সাধারণ হিসেবে হাজার হাজার বছর লাগে, কিন্তু আল্লাহর কুদরতে তা মুহূর্তে সম্ভব। এটি উর্ধ্বগমনের সময়গত রহস্যকে কুরআনের আয়াত দ্বারাই ব্যাখ্যা করে।
৩. ‘তাবাক্বান আন তাবাক্ব’: স্তর থেকে স্তরে আরোহণ:
সুরা আল-ইনশিক্বাক্ব-এ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ইঙ্গিত রয়েছে যা সরাসরি উর্ধ্বগমনের অভিজ্ঞতার দিকে নির্দেশ করে:
“তোমরা অবশ্যই এক স্তর থেকে অন্য স্তরে (তাবাক্বান আন তাবাক্ব) আরোহণ করবে।” (৮৪:১৯)
শব্দগত বিশ্লেষণ: এখানে ‘লা-তারকাবুন’ (لَتَرْكَبُنَّ) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা ‘রুকুবা’ বা সওয়ার হওয়া থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো তোমরা অবশ্যই এক ধাপ বা এক স্তর থেকে অন্য স্তরে আরোহণ বা ভ্রমণ করবে। যদিও এটি সাধারণ মানুষের পরকালীন পর্যায়কেও বোঝায়, কিন্তু নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ক্ষেত্রে এটি ছিল উর্ধ্বগমনের সময় আসমানসমূহের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করার একটি বাস্তব চিত্র। এটি প্রমান করে যে মহাকাশে ভ্রমণের স্তরবিন্যাস বা ‘ডাইমেনশন’ রয়েছে।
৪. ‘আকাশের দরজা’ ও উর্ধ্বগমনের সম্ভাবনা:
আল কুরআন মাজীদে বিভিন্ন স্থানে ‘আকাশের দরজা’ (আবওয়াবাস সামা) খোলার কথা বলা হয়েছে। সূরা আল-হিজর-এ আল্লাহ বলছেন:
“যদি আমি তাদের জন্য আকাশের কোনো দরজাও খুলে দেই এবং তারা তাতে আরোহণ করতে থাকে (ইয়াজুরূন)...” (১৫:১৪)
ইমপ্লাইড এভিডেন্স: এই আয়াতটি পরোক্ষভাবে প্রমাণ করে যে আকাশে আরোহণ করা (উর্ধ্বগমন) অসম্ভব কিছু নয়, যদি আল্লাহ সেই দরজা বা পথ খুলে দেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর ক্ষেত্রে আল্লাহ রব্বুল আলামিন সেই দরজা ও পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন বলেই তিনি ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ (৫৩:১৪) পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলেন।
৫. নূরের জগতে প্রবেশ: ‘আর-রূহ’ ও ‘সিদরাহ’-এর সংযোগ:
সুরা আল-মাআরিজে যে ‘আর-রূহ’ (৭০:৪)-এর উর্ধ্বগমনের কথা বলা হয়েছে, সুরা আন-নাজমে সেই একই সত্তার শক্তির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে (৫৩:৫-৬)।
পারস্পরিক সংযোগ:
- সুরা আল-মাআরিজ আমাদের জানাচ্ছে: আরোহণের সিঁড়ি (মাআরিজ) আছে এবং সেখানে রূহ আরোহণ করে।
- সুরা আন-নাজম আমাদের জানাচ্ছে: মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে) সেই শক্তির অধিকারী রূহের সাথে উর্ধ্বলোকে আরোহণ করে ‘সিদরাহ’ পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন।
এই দুটি সূরার সমন্বয় এটিই প্রমাণ করে যে মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর সেই সফর ছিল আল্লাহর ‘যিল মাআরিজ’ গুণের এক বাস্তব প্রয়োগ।
যৌক্তিকতা:
সুরা আল-মাআরিজ এবং সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর বিশ্লেষণ শেষে আমরা এই চূড়ান্ত সত্যে উপনীত হতে পারি:
১. বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক পথ: আকাশমন্ডলী কেবল একটি শূন্যস্থান নয়, বরং এটি ‘সোপান’ বা পথের (Ma'arij) সমষ্টি।
২. সময়ের বিবর্তন: যে দূরত্ব অতিক্রম করতে মানুষের হাজার হাজার বছর লাগে, আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্যে তা এক রাতের অংশবিশেষে সম্ভব।
৩. বাস্তব অভিজ্ঞতা: ‘লা-তারকাবুন তাবাক্বান আন তাবাক্ব’ (৮৪:১৯) আয়াতটি নবী (সালামুন আলাইহে)-এর স্তরভিত্তিক ভ্রমণের এক অকাট্য সংকেত।
সুতরাং, নবী মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর উর্ধ্বগমন কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আল কুরআনে বর্ণিত মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক নিয়মেরই এক পরাকাষ্ঠা। আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় বান্দাকে সেই ‘মাআরিজ’ বা সিঁড়ি দিয়ে তাঁর মহিমা প্রদর্শনের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন, যা সুরা আল-মাআরিজের নামকরণের মাধ্যমেই অমর হয়ে আছে।
প্রচলিত গল্পকাহিনীর কী হবে?
সত্যের সীমানা ও অতিরঞ্জনের পরিণাম: আল কুরআন মাজীদের আলোকে দ্বীনের অতিরঞ্জন (ঘুলুয়ু) ও অলিীক কাহিনীর বিশ্লেষণ এবং এগুলো কেন অপরাধও?
আল কুরআন মাজীদ আল্লাহ রব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এক অটল সত্য (আল-হাক্ব)।
এটি এমন এক কিতাব যেখানে কোনো মিথ্যার প্রবেশাধিকার নেই (৪১:৪২)। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উর্ধ্বগমন সম্পর্কে আল কুরআন যে বর্ণনা দিয়েছে, তা অত্যন্ত গম্ভীর, আধ্যাত্মিক এবং শিক্ষণীয়। কিন্তু প্রচলিত ইতিহাসে অনেক সময় এমন কিছু বিবরণ যুক্ত করা হয় (যেমন ৫০ ওয়াক্ত সালাত নিয়ে দরাদরি করা), যা আল কুরআন মাজীদের কোনো আয়াতের সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আল কুরআনের আলোকেই আমরা এখন বিশ্লেষণ করব যে, দ্বীনের বিষয়ে এমন অতিরঞ্জন বা অলিীক কাহিনী রচনার পরিণাম কী।
১. না জেনে কোনো বিষয়ে কথা বলার নিষেধাজ্ঞা:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন আল কুরআন মাজীদে অত্যন্ত কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তার পেছনে না ছুটতে।
আল্লাহ সু.তা. এরশাদ করেন:
“যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পোড়ো না; নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এদের প্রত্যেকের কাছেই সে সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (১৭:৩৬)
গভীর অনুধ্যান: এই আয়াতটি তথাকথিত অতিরঞ্জিত গল্পকারদের জন্য একটি সতর্কবাণী।
আল্লাহ সু.তা. যখন ইসরা ও উর্ধ্বগমন সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু ‘নিদর্শন’ (আয়াতিনা) দেখানোর কথা বলেছেন, সেখানে নিজের পক্ষ থেকে গল্প বা ঘটনা যোগ করা এই আয়াতের স্পষ্ট লঙ্ঘন। কোনো ওহী বা সরাসরি ঐশী প্রমাণ ছাড়া রাসূলের (সালামুন আলাইহে) ওপর কোনো উক্তি বা ঘটনা আরোপ করা হলে কিয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে।
২. দ্বীনের বিষয়ে অতিরঞ্জন বা ‘ঘুলুয়ু’:
পূর্ববর্তী অনেক সম্প্রদায় তাদের নবীদের ভালোবাসতে গিয়ে অতিরঞ্জিত কাহিনী তৈরি করেছিল, যা তাদের পথভ্রষ্টতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আল কুরআন একে ‘ঘুলুয়ু’ (অতিরঞ্জন) বলে অভিহিত করেছে।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:
“বলুন: হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীনের বিষয়ে অন্যায়ভাবে অতিরঞ্জন (লা তাগলু) করো না এবং এমন সম্প্রদায়ের খেয়ালখুশির অনুসরণ করো না যারা ইতিপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে।” (৫:৭৭)
যৌক্তিক কাঠামো: যখন কেউ বলে যে নবী (সালামুন আলাইহে) আল্লাহর সাথে বারংবার দরাদরি করে ৫০ ওয়াক্ত সালাত থেকে ৫ ওয়াক্তে এনেছেন, তখন তারা পরোক্ষভাবে আল্লাহর নির্ধারিত বিধান (ক্বাদর) এবং তাঁর পূর্বজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এটি দ্বীনের মধ্যে এমন এক অতিরঞ্জন যা মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে খেয়ালখুশির দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন সালাতের যে বিধান দিয়েছেন, তা তাঁর প্রজ্ঞা ও হিকমতের ওপর ভিত্তি করেই দিয়েছেন (৪:১০৩)।
৩. আল্লাহর নামে মিথ্যা আরোপের ভয়াবহতা:
যেসব কাহিনীতে আল্লাহ সু.তা. এবং তাঁর রাসূলের (সালামুন আলাইহে) মধ্যে এমন কথোপকথন দেখানো হয় যা আল কুরআনে নেই, তা ‘আল্লাহর নামে মিথ্যা বলা’র শামিল হতে পারে।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন সতর্ক করেছেন:
“তার চেয়ে বড় জালেম আর কে, যে আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে কিংবা তাঁর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে? নিশ্চয়ই জালেমরা সফলকাম হয় না।”-৬:২১ (১৮:৫৭)
ইমপ্লাইড এভিডেন্স: আল কুরআন অনুযায়ী, ওহী ব্যতীত রাসূল (সালামুন আলাইহে) নিজের পক্ষ থেকে দ্বীনের কোনো কথা বলতেন না (৫৩:৩-৪)। সুতরাং, যে কথা ওহীতে নেই, তা দ্বীনের অংশ হিসেবে প্রচার করা মানে হলো আল্লাহর দ্বীনকে অসম্পূর্ণ মনে করা, অথচ আল্লাহ রব্বুল আলামিন দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ বলে ঘোষণা করেছেন (৫:৩)।
৪. রাসূলের (সালামুন আলাইহে) নিজের ক্ষমতা ও ওহীর সীমাবদ্ধতা:
আল্লাহর সাথে দরাদরি করার মতো কাহিনীগুলো রাসূলের (সা.) চরম আনুগত্য ও বন্দেগীর সাথে সাংঘর্ষিক। স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সম্পর্কে আল কুরআন বলে:
“যদি সে (নবী) আমার নামে কোনো কথা রচনা করত, তবে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম এবং তার ঘাড়ের রগ কেটে দিতাম।” (৬৯:৪৪-৪৬)
বিশ্লেষণ: এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে, তার বাইরে কোনো কিছু সংযোজন করার সাধ্য স্বয়ং রাসূলের (সা.) নেই। ৫০ ওয়াক্ত সালাতের যে কাহিনী প্রচলিত, সেখানে রাসূলের (সা.) মানবীয় সত্তাকে অতিরঞ্জিত করে আল্লাহর সিদ্ধান্তের পরিবর্তনকারী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যা কুরআনী বর্ণনার সম্পূর্ণ বিপরীত।
৫. অনুমানের অনুসরণ বনাম নিশ্চিত জ্ঞান:
অধিকাংশ মানুষ সত্যের পরিবর্তে জনশ্রুতি বা অনুমানের অনুসরণ করে, যা আল কুরআনে নিন্দিত হয়েছে।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:
“আর যদি আপনি যমীনের অধিকাংশ মানুষের কথা মান্য করেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। তারা তো কেবল ধারণার (যন্ন) অনুসরণ করে এবং তারা কেবল মিথ্যা ও অলিীক কল্পনা করে।” (৬:১১৬)
যৌক্তিক সংযোগ: ৫০ ওয়াক্ত থেকে ৫ ওয়াক্তের কাহিনীটি একটি ‘যন্ন’ বা ধারণা মাত্র, কারণ এর কোনো ভিত্তি আল কুরআন মাজীদে নেই। সত্য কেবল সেটুকুই যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে আমাদের জন্য সংরক্ষণ করেছেন। আল কুরআন বলছে— “আমি কিতাবে কোনো কিছু বাদ দেইনি” (৬:৩৮)। যদি সালাতের সংখ্যার পরিবর্তন উর্ধ্বগমনের মূল বিষয় হতো, তবে আল্লাহ অবশ্যই তা উল্লেখ করতেন।
অহীর নূর বনাম ধারণার অন্ধকার: আল কুরআন মাজীদের পর্যাপ্ততা ও ‘যন্ন’ পরিহারের অপরিহার্যতা:
আল কুরআন মাজীদ কেবল একটি জীবনবিধান নয়, বরং এটি সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী ‘আল-ফুরক্বান’। মানুষের স্বভাবজাত একটি প্রবণতা হলো কোনো সত্যের সাথে নিজের কল্পনাপ্রসূত গল্প বা অতিরঞ্জন যোগ করা। কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে এমন কাজকে আল কুরআন ‘যন্ন’ (ধারণা বা অনুমান) হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তা থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। ৪৬:৯ আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সালামুন আলাইহে)-এর বিনম্র ঘোষণা এবং ৫৩:২৮ আয়াতের অকাট্য যুক্তি প্রমাণ করে যে, কেবল ওহীর জ্ঞানই আমাদের জন্য যথেষ্ট। নিচে আল কুরআন মাজীদের আয়াতের আলোকে এই সত্যের গভীরতর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি, বিঈযনিল্লাহ!
১. আল কুরআন কি আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়? (আউয়ালুল কুরআন):
অনেকে মনে করেন, আল কুরআনের বর্ণনার বাইরেও আরও অনেক গল্পের প্রয়োজন রয়েছে ঈমানকে মজবুত করার জন্য। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামিন স্বয়ং এই প্রশ্নটির নিরসন করেছেন।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেন:
“তাদের জন্য কি এটি যথেষ্ট (আ-ওয়ালাম ইয়াকফিহুম) নয় যে, আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি, যা তাদের কাছে পাঠ করা হয়? এতে অবশ্যই মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য রহমত ও উপদেশ রয়েছে।” (২৯:৫১)
গভীর অনুধ্যান: এই আয়াতে ‘আ-ওয়ালাম ইয়াকফিহুম’ (এটি কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয়?)—এই প্রশ্নবোধক বাক্যটি একটি আধ্যাত্মিক চপেটাঘাত। যারা ওহীর বাইরে অতিরঞ্জিত কাহিনীর খোঁজ করে, তারা পরোক্ষভাবে আল্লাহর কিতাবকে ‘অপর্যাপ্ত’ মনে করছে। আল কুরআন মাজীদ নিজেই নিজেকে ‘যথেষ্ট’ বলে ঘোষণা করেছে, যা মুমিনের জন্য চূড়ান্ত সনদ।
২. আল্লাহর আয়াতের পর আর কোন কথায় বিশ্বাস?
আল্লাহ সু.তা. আল কুরআনের আয়াতসমূহকে ‘সত্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং এর বাইরে অন্য কোনো উৎসকে দ্বীনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:
“এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি আপনার কাছে যথাযথভাবে আবৃত্তি করি। অতএব, আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর তারা আর কোন কথায় (হাদীস) বিশ্বাস করবে?” (৪৫:৬)
শব্দগত বিশ্লেষণ: এখানে ‘বাইয়াদিল্লাহি ওয়া আয়াতিহী’ (আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর) এবং ‘আইয়্যি হাদীসিন’ (কোন কথা/সংবাদ) শব্দ দুটি লক্ষ্যণীয়। এটি একটি স্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে দেয় যে—পরকালীন জগত, ইসরা বা উর্ধ্বগমনের মতো অদৃশ্য (গায়েব) বিষয়ের ক্ষেত্রে কেবল আল্লাহর আয়াতই একমাত্র প্রামাণ্য দলিল। এর বাইরে মানুষের তৈরি করা কোনো মুখরোচক ‘হাদীস’ বা সংবাদ বিশ্বাসের ভিত্তি হতে পারে না।
৩. যন্ন (ধারণা) বনাম হক (সত্য): এক বিপরীতমুখী বিশ্লেষণ:
আল কুরআন মাজীদ সত্যের বিপরীতে ‘যন্ন’ (অনুমান বা ধারণা) শব্দটি ব্যবহার করে এর অসারতা প্রমাণ করেছে। মানুষ যখন নবীগণের জীবনীতে অলীক গল্প যোগ করে, তখন তারা মূলত ‘যন্ন’-এর অনুসরণ করে।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:
“আর তাদের অধিকাংশ কেবল ধারণার (যন্ন) অনুসরণ করে। নিশ্চয়ই ধারণা (যন্ন) সত্যের (হাক্ক) মোকাবিলায় কোনো কাজেই আসে না। তারা যা করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত।” (১০:৩৬)
যখন কেউ উর্ধ্বগমন নিয়ে এমন গল্প বলে যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেননি, তখন তা ‘যন্ন’ বা অনুমানের পর্যায়ভুক্ত হয়। আল কুরআন অনুসারে, সত্য (হাক্ক) হলো তাই যা আল্লাহ নাযিল করেছেন। আর ‘যন্ন’ হলো মানুষের কল্পনা। এই দুটির মধ্যে কোনো সমঝোতা হতে পারে না।
৪. রাসূলের (সালামুন আলাইহে) দায়িত্ব: কেবল ওহীর অনুসরণ:
নবী মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে) নিজে কখনো ধারণার বশবর্তী হয়ে কিছু বলেননি। তিনি ছিলেন ওহীর একনিষ্ঠ অনুসারী।
আল্লাহ সু.তা. তাঁকে বলতে নির্দেশ দিয়েছেন:
“বলুন! আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি আমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে ওহী করা হয়। এটি তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে এক উজ্জ্বল জ্যোতি (বাসাইর), হেদায়েত ও রহমত সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা ঈমান আনে।” (৭:২০৩)
অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত: এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, রাসূল (সা.)-এর প্রকৃত পরিচয় তাঁর ‘মুত্তাবিউল ওহী’ (ওহীর অনুসারী) হওয়ার মাঝে। ৫০ ওয়াক্ত সালাত বা নবীদের সাথে কথোপকথনের মতো বিষয়গুলো যদি ওহীর অংশ হতো, তবে তা অবশ্যই ‘বাসাইর’ বা উজ্জ্বল জ্যোতি হিসেবে আল কুরআনে লিপিবদ্ধ থাকত। যেহেতু তা নেই, তাই এগুলোকে ওহীর মর্যাদা দেওয়া প্রকারান্তরে রাসূলের মূল দায়িত্বের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।
৫. সত্যকে গোপন করা ও অতিরিক্ত যোগ করার পরিণাম:
দ্বীনের মধ্যে আল্লাহর না জানানো বিষয়কে প্রবেশ করানো এক ধরনের জালিয়াতি। আল্লাহ রব্বুল আলামিন দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা করেছেন (৫:৩)। এরপর কোনো কিছু যোগ করার অর্থ হলো আল্লাহর ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ করা।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:
“তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো আর কিছু অংশকে অস্বীকার করো? তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা এবং কিয়ামতের দিন তারা কঠোরতম শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে।” (২:৮৫)
অনুধাবন: আল কুরআনের যতটুকু পছন্দ হলো তা গ্রহণ করা আর বাকিটা অতিরঞ্জিত গল্প দিয়ে পূর্ণ করা কিতাবের অবমাননা। আমাদের জন্য নিরাপত্তা রয়েছে কেবল সেটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায়, যা আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন।
যৌক্তিক পূর্ণতা ও সমাপ্তি:
আল কুরআন মাজীদের ৪৫:৬ এবং ২৯:৫১ আয়াত দুটি আমাদের জন্য একটি ‘সীমারেখা’ (boundary)। এই রেখার বাইরে পা রাখা মানেই হলো বিভ্রান্তি ও ‘ঘুলুয়ু’ বা অতিরঞ্জনে লিপ্ত হওয়া।
১. পর্যাপ্ততা: আল্লাহ তাঁর কিতাবকে আমাদের জন্য হেদায়েতের জন্য যথেষ্ট করেছেন।
২. সতর্কতা: যে তথ্য আল্লাহ দেননি, তা নিয়ে কৌতূহলী হওয়া বা গল্প ফাঁদা ‘যন্ন’-এর অন্তর্ভুক্ত যা বর্জনীয়।
৩. আনুগত্য: রাসূল মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর
প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা হলো তাঁর ওপর নাযিলকৃত ওহীকে (আল কুরআন) আঁকড়ে ধরা।
সুতরাং, নবী (সালামুন আলাইহে)-এর উর্ধ্বগমন হোক কিংবা জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনা—আমাদের ঈমান কেবল সেটুকুর ওপরই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত যা আল কুরআন মাজীদের শব্দে ও আয়াতে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। এর বাইরের সবকিছুই অপ্রয়োজনীয় এবং সত্য বিচ্যুত হওয়ার মাধ্যম।
إِنَّ هَٰذَا لَهُوَ حَقُّ ٱلْيَقِينِ - فَسَبِّحْ بِٱسْمِ رَبِّكَ ٱلْعَظِيمِ
(ইন্না হাযা লাহুয়া হাক্কুল ইয়াকীন - ফাসাব্বিহ বিসমি রব্বিকাল আজিম)
“নিশ্চয়ই এটি ধ্রুব সত্য (হাক্কুল ইয়াকীন)। অতএব, আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামের পবিত্রতা ঘোষণা করুন।” (৫৬:৯৫-৯৬)
এই মর্মে আল কুরআনের আয়াতই আমাদের জন্য চূড়ান্ত দলিল। আল্লাহর কালামের বাইরে কোনো ধারণা বা অনুমানের স্থান মুমিনের হৃদয়ে হতে পারে না। ওহীর ওপর নির্ভরতাই প্রকৃত হেদায়েত।
এই মহান ঐশী ভ্রমণের প্রেক্ষাপটে আমরা আল কুরআন থেকে নিম্নোক্ত তাসবিহ-দুআসমূহ করতে পারি:
رَبَّنَآ ءَامَنَّا بِمَآ أَنزَلْتَ وَٱتَّبَعْنَا ٱلرَّولَ فَٱكْتُبْنَا مَعَٱلشَّٰهِدِينَ
রব্বানা আমান্না বিমা আনযালতা ওয়াত্তাবায়নাল রাসূল ফাকতুবনা মা-আশ শাহিদান
হে আমাদের পালনকর্তা! আপনি যা নাযিল করেছেন আমরা তার ওপর ঈমান এনেছি এবং আমরা রাসূলের আনুগত্য করছি; অতএব আমাদের সাক্ষ্যদানকারীদের তালিকাভুক্ত করুন।” (৩:৫৩)
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَآ إِن نَّسِينَآ أَوْ أَخْطَأْنَا
(রব্বানা লা তুয়াখিজনা ইন নাসিনা আও আখত্বানা)
হে আমাদের পালনকর্তা! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদের ধরবেন না। (২:২৮৬)
قُلِ ٱللَّهُمَّ فَاطِرَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ عَٰلِمَ ٱلْغَيْبِوَٱلشَّهَٰدَةِ أَنتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِى مَا كَانُوا۟فِيهِ يَخْتَلِفُونَ
(ফাতিরাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি আলিমাল গাইবি ওয়াশ শাহাদাতি আন্তা তাহকুমু বাইনা ইবাদিক ফি মা কানু ফিহি ইয়াখতালিফুন)
“বলুন: হে আল্লাহ! আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, অদৃশ্য ও দৃশ্যমান জগতের পরিজ্ঞাতা! আপনার বান্দাদের মধ্যে যে বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে, আপনিই তার ফয়সালা করবেন।” (৩৯:৪৬)
رَبَّنَآ إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًۭا يُنَادِى لِلْإِيمَٰنِ أَنْ ءَامِنُوا۟بِرَبِّكُمْ فَـَٔامَنَّا
(রব্বানা ইন্নানা সামিনা মুনাদিয়ান ইয়ুনাদী লিল-ঈমানি আন আমিনু বি-রব্বিকুম ফাতামান্না)
“হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা এক আহ্বানকারীকে (রাসূলকে) শুনতে পেয়েছি যে ঈমানের দিকে
আহ্বান জানাচ্ছিল যে—তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আনো; তাই আমরা ঈমান এনেছি।” (৩:১৯৩)
سُبْحَٰنَ رَبِّ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ رَبِّ ٱلْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ
(সুবহানা রব্বিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি রব্বিল আরশি আম্মা ইয়াসিফুন)
আসমান ও যমীনের পালনকর্তা এবং আরশের অধিপতি অতি পবিত্র সেইসব বিষয় থেকে, যা তারা বর্ণনা করে।” (৪৩:৮২)
سُبْحَٰنَ ٱلَّذِى بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ كُلِّ شَىْءٍۢ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
(সুবহানাল্লাযী বিয়াদিহী মালাকুতু কুল্লি শাইয়িন ওয়া ইলাইহি তুরজাউন)
“পবিত্র তিনি, যাঁর হাতে প্রত্যেক বিষয়ের সার্বভৌম ক্ষমতা (মালাকুত) এবং তাঁরই দিকে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” (৩৬:৮৩)
سُبْحَٰنَ ٱلَّذِىٓ أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِۦ لَيْلًۭا
সুবহানাল্লাযী আসরা বি-আবদিহী লায়লা)
“পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন।” (১৭:১)
رَّبِّ زِدْنِى عِلْمًۭا
(রব্বি যিদনী ইলমা): হে আমার পালনকর্তা! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।” (২০:১১৪)
سُبْحَٰنَ ٱلَّذِى بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ كُلِّ شَىْءٍۢ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
(সুবহানাল্লাযী বিয়াদিহী মালাকুতু কুল্লি শাইয়িন ওয়া ইলাইহি তুরজাউন)
“পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যাঁর হাতে প্রত্যেক বিষয়ের সার্বভৌম ক্ষমতা এবং যাঁর দিকে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” (৩৬:৮৩)
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
উচ্চারণ: রব্বানা লা তুযিগ ক্বুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রহমাহ, ইন্নাকা আন্তাল ওয়াহ্হাব।
হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে সত্যলঙ্ঘনে প্রবৃত্ত করবেন না (বক্র করে দেবেন না) এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন; নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা।” (৩:৮)
Reference: Figure collected from the Al Quran - The Scientific Tafsir of Zakaria Kamal