নারী-পুরুষের পোশাক (ড্রেসকোড) সম্পর্কে আল কুরআন কী বলে? #dress code-clothing, #garment #parda

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের বক্তব্য অনুযায়ী (৬৯:৪০-৪৩) "বড় জুব্বা পরতে হবে" বা "নবীগণ বড় জুব্বা পরতেন"—এ ধরনের বক্তব্য আল কুরআন মাজীদ  থেকে সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায় কি? তাহলে কোন ধরনের পোশাকের কথা উল্লেখ রয়েছে? এবং নারীদের ড্রেস কোড কেমন হতে পারে?-আয়াত অনুসন্ধানের চেষ্টায়-

সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, আল-কুরআনে "বড় জুব্বা", লম্বা আলখাল্লা, বা কোনো নির্দিষ্ট ধরনের ঢিলেঢালা গাউন-জাতীয় পোশাক পরিধানের সরাসরি উদাহরণ বা বাধ্যতামূলক নির্দেশ পাওয়া যায় না।

আল কুরআনে পোশাকের জন্য যে শব্দগুলো এসেছে, সেগুলো সাধারণত কার্যকারিতা (ঢাকা, সৌন্দর্য, সুরক্ষা) বোঝায়, নির্দিষ্ট ফ্যাশন বা কাটছাঁট নয়।

উদাহরণ:

■ লিবাসুততাকওয়া (لِبَاس) = তাকওয়ার পোশাক, বস্ত্র (৭:২৬)

■ সিয়াব (ثِيَاب) = কাপড়/পোশাক (৭৪:৪, ২৪:৫৮)

■ ছারাবিল (سَرَابِيل) = পরিধেয় বস্ত্র, সুরক্ষামূলক পোশাক (১৬:৮১)

■ কামিছ (قَمِيص)  = জামা/শার্ট/টিউনিক (সালামুৃন আলা ইউসুফের কাহিনিতে, ১২:১৮, ১২:২৫, ১২:৯৩)

■ জিলবাব (جَلَابِيب) = বাহ্যিক আবরণ বা চাদর (৩৩:৫৯)

এগুলোর কোনোটিই "বড় জুব্বা" বা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের পোশাক বোঝায় না।বিশেষ করে, কুরআনে قَمِيص (কামিছ) শব্দটি সালামুৃন আলা ইউসুফ-এর পোশাকের জন্য এসেছে, যা সাধারণত "জামা" বা "টিউনিক" অর্থে ব্যবহৃত হয়; কিন্তু এর দৈর্ঘ্য, ঢং বা আকৃতি কুরআন উল্লেখ করেনি। অতএব, কেবল কুরআনের ভিত্তিতে বলা যায়:

■ পোশাক থাকা উচিত।

■ তা লজ্জাস্থান আবৃত করবে।

■ শালীনতা ও মর্যাদা বজায় রাখবে।

■ প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষা দেবে।

কিন্তু "বড় জুব্বা পরতে হবে" বা "নবীগণ বড় জুব্বা পরতেন"—এ ধরনের বক্তব্য কুরআন থেকে সরাসরি প্রমাণ করা যায় না। এগুলো কুরআনের বাইরে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক বা মানুষ্য রচিত হাদিসভিত্তিক আলোচনার বিষয়।

আল কুরআনে -এ আল্লাহ বিভিন্ন ধরনের পরিধেয় বস্ত্রের কথা উল্লেখ করেছেন:

আরবি পাঠে "সারাবীল" শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ পরিধেয় বস্ত্র বা জামা-কাপড়। আয়াতে দুই ধরনের পরিধেয়ের কথা বলা হয়েছে:

1. গরম থেকে রক্ষাকারী পোশাক (সাধারণ বস্ত্র)।
2. সুরক্ষাদানকারী পোশাক (বর্ম বা প্রতিরক্ষামূলক পরিধান)।

সূরা নাহল; আয়াত ১৬:৮১
আর আল্লাহ তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এমন জিনিস যা তাঁর সৃষ্ট বস্তুর ছায়া দেয়; তিনি তোমাদের জন্য পাহাড়ে আশ্রয়ের স্থান করেছেন; এবং তিনি তোমাদের জন্য এমন পোশাক বানিয়েছেন যা তোমাদেরকে গরম থেকে রক্ষা করে, আর এমন সুরক্ষামূলক পরিধেয়ও দিয়েছেন যা তোমাদেরকে তোমাদের পারস্পরিক আঘাত-সংঘর্ষ থেকে রক্ষা করে। এভাবেই তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন, যাতে তোমরা আত্মসমর্পণ কর

এখানে লক্ষণীয়:

سَرَابِيلَ تَقِيكُمُ الْحَرَّ → "এমন পোশাক যা তোমাদেরকে গরম থেকে রক্ষা করে"। 

سَرَابِيلَ تَقِيكُم بَأْسَكُمْ → "…এবং এমন সুরক্ষামূলক পোশাক, যা বিপদ, আঘাত ও সংঘর্ষের সময় তোমাদের সুরক্ষা দেয়…"

অতএব, সূরা নাহল ১৬:৮১-এ কুরআন শুধু শালীনতার জন্য নয়, বরং আবহাওয়া ও শারীরিক সুরক্ষার জন্যও পোশাকের উপযোগিতা উল্লেখ করেছে  সেটা হতে পারে মোটা কাপড়ের কিংবা বা পাতলা)। এটি কুরআনে পোশাকের ব্যবহারিক উদ্দেশ্যগুলোর একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

আল-কুরআনে এমন কয়েকটি উদাহরণ পাওয়া যায় যেখানে মানুষ পোশাক পরিহিত ছিল বা পোশাক পরিধানের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। যদি শুধুমাত্র কুরআনের বর্ণনা বিবেচনা করি, তাহলে উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলো হলো:

১. সালামুন আলা আদম ও তাঁর স্ত্রী:

আদম ও তাঁর স্ত্রী জান্নাতে ছিলেন। নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ার পর তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশ হয়ে যায়, তখন তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের ঢাকতে শুরু করেন।

অতঃপর যখন তারা গাছটির স্বাদ গ্রহণ করল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে গেল এবং তারা জান্নাতের পাতা নিজেদের উপর জোড়া দিতে লাগল...” (7:22)

এ থেকে বোঝা যায়, এর আগে তারা এমন অবস্থায় ছিলেন যাতে লজ্জাস্থান প্রকাশিত ছিল না; অর্থাৎ আচ্ছাদন বা পোশাকসদৃশ ব্যবস্থা ছিল।

২. আল্লাহ মানুষের জন্য পোশাক নাযিল করেছেন:

কুরআনে সরাসরি বলা হয়েছে:

হে আদমসন্তান! আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং সৌন্দর্যও বর্ধন করে...” (7:26)

এটি  সবাইকে সম্মোধন করে সাধারণভাবে মানবজাতির পোশাক ব্যবহারের কথা বলে।

৩. সালামুন আলা ইউসুফ-এর জামা:

কুরআনে বহুবার সালামুন আলা ইউসুফ-এর কামিস (শার্ট/জামা)-এর উল্লেখ এসেছে।

■ ভাইয়েরা তাঁর জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে পিতার কাছে আনে (সূরা ইউসুফ ১২:১৮)।

■ পেছন দিক থেকে জামা ছিঁড়ে যাওয়া সত্যতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ হয় (১২:২৫–২৮)।

■ পরে তাঁর জামা সালামুন আলা ইয়াকুব-এর মুখে দিলে দৃষ্টি ফিরে আসে (১২:৯৩–৯৬)।

এগুলো স্পষ্ট প্রমাণ যে সালামুন আলা ইউসুফ পোশাক পরিধান করতেন।

৪. জান্নাতবাসীদের পোশাক: জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:

“তারা সূক্ষ্ম ও পুরু রেশমের সবুজ পোশাক পরিধান করবে...” (18:31)

এছাড়া সূরা আল-ইনসান ৭৬:২১-এও তাদের পোশাকের উল্লেখ আছে।

৫. তালুতের সৈন্যবাহিনী ও যুদ্ধের পোশাক:

যদিও সরাসরি পোশাকের বর্ণনা নেই, যুদ্ধ, বর্ম ও সুরক্ষা-সামগ্রীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন সালামুন আলা দাউদ সম্পর্কে: 

“আমি তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছি...” (21:80)

বর্মও এক ধরনের পরিধেয় বস্তু (এখনকার সেনাবাহীনিও বিশেষ মোটা কাপড় তাদের ইউনিফর্ম হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন)।

সারসংক্ষেপ: শুধুমাত্র কুরআন থেকে দেখা যায় যে:

1. সালামুন আলা আদম ও তাঁর স্ত্রীর আচ্ছাদন/ঢাকার বিষয় ছিল।
2. মানবজাতির জন্য পোশাক আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে উল্লেখিত।
3. সালামুন আলা ইউসুফ-এর জামার একাধিক ঘটনা আছে।
4. জান্নাতবাসীরা পোশাক পরিধান করবে।
5. সালামুন আলা দাউদ-এর বর্ম পরিধানের উল্লেখ আছে।

অতএব, কুরআনের ভেতরেই পোশাক পরিহিত মানুষের একাধিক উদাহরণ স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, বিশেষ করে সালামুন আলা ইউসুফ-এর জামার ঘটনা সবচেয়ে সরাসরি উদাহরণ।

─ ✦ ─ ❖ ─ ✦ ─

পোশাকে নারীদের জন্য আলাদা কী বলা আছে:

শুধু কুরআনের ভিত্তিতে বললে, নারী ও পুরুষের জন্য পোশাকের কিছু নির্দেশনায় পার্থক্য আছে, তবে কুরআন কোনো নির্দিষ্ট পোশাকের ডিজাইন, রং, বা সংস্কৃতি-নির্দিষ্ট পোশাক (যেমন বোরকা, আবায়া, শাড়ি, জুব্বা, পাঞ্জাবি) বাধ্যতামূলক করেনি।

আল কুরআনে:

■ পুরুষদের বলা হয়েছে দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং পবিত্রতা রক্ষা করতে (২৪:৩০)।

■ নারীদেরও একই কথা বলা হয়েছে, এবং তাদের শোভা-সৌন্দর্য প্রদর্শনে সংযমের অতিরিক্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (২৪:৩১)।

■ নারীদের জন্য খিমার শব্দ এসেছে, যা তাদের বক্ষদেশ ঢাকার জন্য ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে (২৪:৩১)।

■ নারীদের জন্য জিলবাব শব্দ এসেছে, যা একটি বাহ্যিক আবরণ বা চাদরসদৃশ পোশাক হিসেবে উল্লেখিত (৩৩:৫৯)।

➥ সাধারণ নীতি: আল কুরআন মাজীদ-এ পোশাকের মৌলিক উদ্দেশ্য বলা হয়েছে:

"লজ্জাস্থান আবৃত করা এবং শোভা বৃদ্ধি করা।" (7:26)

কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী যে বিষয়গুলো স্পষ্ট:

1. নারী-পুরুষ উভয়েরই শালীনতা বজায় রাখতে হবে।

2. উভয়েরই লজ্জাস্থান আবৃত করতে হবে।

3. নারীদের ক্ষেত্রে শোভা-সৌন্দর্য প্রদর্শনে অতিরিক্ত সংযমের নির্দেশ রয়েছে।

4. নারীদের জন্য বক্ষদেশ আবৃত রাখার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে (২৪:৩১)।

5. বাইরে গেলে একটি বাহ্যিক আবরণ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে (৩৩:৫৯)।

যা আল কুরআন স্পষ্টভাবে বলে না

কুরআন সরাসরি বলে না:

■ চুল অবশ্যই ঢাকতে হবে কি না।
■ মুখ ঢাকতে হবে কি না।
■ হাত বা পা কতটুকু খোলা রাখা যাবে।
■ মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীর ঢাকতে হবে কি না।

কেবল কুরআনের পাঠ থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, শালীন পোশাক, লজ্জাস্থান ও বক্ষদেশ আবৃত করা এবং সৌন্দর্য প্রদর্শনে সংযমের নির্দেশ রয়েছে; কিন্তু শরীরের প্রতিটি অংশের জন্য বিস্তারিত "ড্রেস কোড" কুরআন নিজে নির্দিষ্ট করে দেয় না।

তবে-

আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের জবানীতে বলেন-

আর অবশ্যই আমরা এই কুরআনের মধ্যে মানুষের জন্য প্রত্যেকটি বিষয়ে উদাহরণ (মেছাল) উপস্থাপন করেছি, যেন তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। আরবি কুরআন, নয় বক্রতাপূর্ণ। যেন তারা তাকওয়া অবলম্বন করে- আয়াত ৩৯:২৭-২৮ (১৮:৫৪)

নারীদের ক্ষেত্রে লেবাসুততাকওয়ার একটি উদাহরন আল কুরআন থেকেই নিতে বলা হয়েছে (১৯:১৬)-

বিশে^র সকল নারীদের রোল মডেল হিসাবে আল্লাহ রব্বুল আলামিন উল্লেখ করেছেনন সালামুন আলা মারিয়ামকে (আয়াত ৩:৪২-৪৩)। তাই তাকওয়ার পোশাক কেমন হতে পারে—তার একটি দৃষ্টান্ত আমরা কিতাবুল্লাহ ভিত্তিক তাঁর জীবনের আলোকে অনুধাবন করতে পারি।

যেমন আয়াত ১৯:২৭-২৯ ক’খানি অনুধাবন করি তাহলে দেখতে পাই তিনি যখন তাঁর কমিউনিটি বা তার এলাকার বাড়ীঘরে ফেরত এলেন লোকেরা সালামুন আলা মারিয়ামকে ঠিকঠাক মতোই তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে আসার পর তারা তাঁকে লক্ষ্য করে কথা বলে এবং তাঁর ।  চিনতে পারলেন, পরিচয় ধরে ফেলে এবং তিনি কার কোন  পিতামাতার মেয়ে কার বোন ইত্যাদি। [যেমনটি বলা হয়েছে আয়াত ৪৯:১৩-তে -যেন তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো] এতে বোঝা যায় মুখমন্ডল অনাবৃত না থাকলে লোকেরা এত ভালোভাবেই তাঁকে চিনতে পারল কিভাবে? (যদিও এখানে স্পষ্টভাবে মুখমণ্ডল খোলা ছিল বা ঢাকা ছিল—কোনোটাই নির্দিষ্ট করে বলে না। চিনতে পারা” শুধু মুখ দেখার উপরই নির্ভরশীল নয় (কণ্ঠস্বর, চলাফেরা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক পরিচিতি ইত্যাদিও হতে পারে)  সুতরাং একমাত্র নাযিলকৃত বিধান আল কুরআনের আলোকে পথ চলা…

এই গরমেও নারীদের হাত মোজা পা মোজা? 

দেখুন আপনার রব আপনাকে কী বলেন-

আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান এবং তিনি তোমাদের জন্য কঠোরতা চান না-আয়াত ২:১৮৫

-তাইতো তিনি রহমানুর রহীম! মুত্তাকীদের এভাবেই ভালোবাসেন!

আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন!

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post