বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
আমাদের সত্যিকারের ‘রব’ কে? এই প্রশ্নটি মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে মৌলিক জিজ্ঞাসা। আল-কুরআন মাজীদ কেবল এই প্রশ্নের উত্তরই দেয় না, বরং মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন স্বয়ং নিজের পরিচয় ও গুণাবলী ওহীর মাধ্যমে অত্যন্ত নিপুণভাবে মানুষের সামনে উদ্ভাসিত করেছেন। আল-কুরআনের গভীর অনুধাবনে দেখা যায়, ‘রব’ শব্দটির প্রয়োগ কুরআনে ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনায় এসেছে—কখনো পরম স্রষ্টা অর্থে, আবার কখনো জাগতিক অভিভাবক অর্থে। তবে প্রকৃত রবের স্বরূপ যে অনন্য এবং সার্বভৌম, তা ওহীর স্পষ্ট সংবাদের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে চিনে নেওয়া সম্ভব।
প্রথমেই আমরা অতি সংক্ষেপে এক ঝলক জেনে নেই যিনি আমাদের প্রকৃত রব, তাঁর পরিচয় পর্বটি:
১. প্রকৃত রবের সত্তাগত ও কর্মগত পরিচয়:
আল-কুরআন মাজীদ আমাদের রবের পরিচয়কে প্রধানত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড় করিয়েছে:
➥বিশ্বজাহানের অধিপতি (রব্বুল আলামিন):
“সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বিশ্বজাহানের রব (رَبِّ الْعَالَمِينَ)।” (১:২)
তিনি কেবল স্রষ্টা নন, বরং মহাবিশ্বের প্রতিটি অণুর বিবর্তন ও লালন-পালনকারী।
➥অদ্বিতীয় ও অমুখাপেক্ষী (সূরা আল-ইখলাস):
“বলুন! তিনিই আল্লাহ, একক (আহাদ)। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী (সামাদ)। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। আর তাঁর সমকক্ষ কেউই নেই।” (১১২:১-৪)
➥ সৃজনশীলতা ও হিদায়াত:
“আপনার সুমহান রবের পবিত্রতা ঘোষণা করুন, যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং সুসামঞ্জস্য করেছেন (ফাসাওওয়া)। এবং যিনি সুনির্ধারিত পরিমাপ (তাকদীর) করেছেন এবং পথ প্রদর্শন করেছেন।” (৮৭:১-৩)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, রবের পরিচয় কেবল ‘স্রষ্টা’ হিসেবে নয়, বরং তিনি একাধারে:
- খালিক্ব (সৃষ্টিকর্তা): অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আনেন।
- মুসাওয়্যির (রূপকার): প্রতিটি সৃষ্টিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য ও রূপ দেন।
- হাদী (পথপ্রদর্শক): সৃষ্টির টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান (সহজাত প্রবৃত্তি ও ওহী) দান করেন।
৪. সার্বভৌমত্বের ঘোষণা: হুকুম ও আদেশ কেবল তাঁরই (৭:৫৪) প্রকৃত রব তিনিই, যাঁর আদেশ বা আইনের কাছে মাথা নত করা হয়।
“জেনে রেখো, সৃষ্টি তাঁরই এবং আদেশও (الْأَمْرُ - আল-আমর) তাঁরই; বরকতময় আল্লাহ, যিনি বিশ্বজাহানের রব।” (৭:৫৪)
গভীরতর সংযোগ (Link): এখানে ‘খালক্ব’ (সৃষ্টি) এবং ‘আমর’ (আদেশ)-কে পাশাপাশি আনা হয়েছে। অর্থাৎ, যিনি আমাদের শরীর ও মহাবিশ্ব তৈরি করেছেন, জীবন পরিচালনার বিধান বা ‘হক’ দেওয়ার অধিকারও কেবল তাঁরই। অন্য কারো কিতাব বা বিধানকে রবের বিধানের সমকক্ষ মনে করা মূলত তাঁর ‘রব’ হওয়ার অধিকারে হস্তক্ষেপ।
৫. স্বয়ং আল্লাহর কণ্ঠে নিজের পরিচয়: “ইন্নানি আনাল্লাহ”:
সালামুন আলা মুসা যখন তূর পাহাড়ে আগুনের সন্ধান করতে গিয়েছিলেন, তখন স্বয়ং রব্বুল আলামিন তাঁর সাথে যে ভাষায় কথোপকথন করেছিলেন, তা হলো রবের সবচেয়ে সরাসরি
আল্লাহর আত্ম-পরিচয়:
নিশ্চয়ই আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; সুতরাং আমারই ইবাদত করো এবং আমার স্মরণে সালাত কায়েম করো। (২০:১৪)
এই আয়াতে ‘ইলাহ’ (একমাত্র মান্য) এবং ‘রব’ (পরিচালক)-কে একীভূত করা হয়েছে। আমাদের রবই আমাদের একমাত্র একমাত্র মান্য, যার কোনো প্রতিনিধি বা মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই।
৬. দৃশ্যমান নিদর্শনে রবের প্রকাশ:
আল্লাহ তাঁর পরিচয় আমাদের চারপাশের প্রকৃতির পরিবর্তনের মাঝেও ছড়িয়ে রেখেছেন।
“নিশ্চয়ই আল্লাহই শস্যবীজ ও আঁটি বিদীর্ণকারী; তিনি মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন এবং
জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন। তিনিই তো তোমাদের রব (ذَٰلِكُمُ اللَّهُ)।” (৬:৯৫)
অনুধাবন: রাতকে দিনের ভেতর প্রবেশ করানো এবং দিনকে রাতের ভেতর (৩৫:১৩)
আবর্তিত করার মাধ্যমে আমাদের রব প্রতিদিন প্রমাণ দেন যে মহাজাগতিক চাবিকাঠি একমাত্র তাঁরই হাতে। এটি তাঁর প্রজ্ঞার এমন এক উজ্জ্বল নিদর্শন (বাইয়্যিনাহ), যা অনুধাবন করতে বিশাল গবেষণার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন কেবল সজাগ বিবেক।
৪. রূহের জগতের আদি সংবাদ: ‘আলাসতু বি-রাব্বিকুম’!
প্রকৃত রব কে- সেই জ্ঞান আমাদের রূহের গহীনে জন্মগতভাবেই আল্লাহ সু.তা. গেঁথে দিয়েছেন। ওহী কেবল সেই স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে।
আদি অঙ্গীকার (মীষাক):
আল্লাহ রব্বুল আলামিন সকল মানুষের রূহের কাছ থেকে সাক্ষ্য নিয়েছিলেন:
“স্মরণ করো, যখন তোমার রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষ্য রেখে জিজ্ঞাসা করলেন—‘আমি কি তোমাদের রব নই (أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ)?’ তারা বলেছিল—‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি’।” (৭:১৭২)
অনুধাবন:
এই আদি অঙ্গীকার প্রমাণ করে যে, মানুষের ‘ফিতরাত’ বা প্রকৃতি কেবল সেই সত্তাকেই ‘রব’ হিসেবে চেনে, যিনি তাঁর জীবনের উৎস। জাগতিক কোনো প্রতিপালক এই আদি অঙ্গীকারের অংশ নন। সুতরাং, সার্বভৌম রব কেবল একজনই।
আল-কুরআন মাজীদের অকাট্য সংবাদ অনুযায়ী, আমাদের সত্যিকারের রব হলেন সেই মহান সত্তা, যাঁর কোনো তুলনা নেই (৪২:১১)। তিনি ‘আউয়াল’ (আদি), ‘আখির’ (অন্ত), ‘যাহির’ (প্রকাশ্য) এবং ‘বাতিন’ (গোপন) [৫৭:৩]। তিনি মানুষের ঘাড়ের শাহরগের চেয়েও নিকটবর্তী (৫০:১৬)। তিনি কেবল আরশের অধিপতি নন, বরং মানুষের প্রতিটি নিঃশ্বাস ও স্পন্দনের নিয়ন্ত্রক। সফলকাম তারাই, যারা ওহীর দর্পণে রবের এই মহিমা অনুধাবন করে ১৮:১১০
আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর ইবাদতে এবং তাঁর বিধানে অন্য কিছুকে যুক্ত (শিরক) করে না।
মহাজাগতিক ‘রব’ বনাম জাগতিক রূপকার: আল-কুরআনের আলোকে ‘রব’ শব্দের প্রয়োগ ও গূঢ় পার্থক্য বিশ্লেষণ:
আল-কুরআন মাজীদের ভাষাশৈলী অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং অর্থবহ। আরবী ‘রব’ (رَبّ) শব্দের মূল অর্থ হলো—যিনি কোনো কিছুকে লালন-পালন করেন, বিবর্তনের মাধ্যমে পূর্ণতা দান করেন এবং যার হাতে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকে। আল-কুরআনে এই শব্দটি যেমন মহান আল্লাহ সু.তা.-এর জন্য ‘রব্বুল আলামিন’ (বিশ্বজাহানের রব) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি রূপক বা আপেক্ষিক অর্থে পিতামাতা বা জাগতিক অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও এসেছে। এই দুই প্রয়োগের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে, তা আল-কুরআনের আয়াতের বিন্যাস ও প্রসঙ্গের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা সম্ভব।
আপেক্ষিক ‘রব’: লালন-পালন ও অভিভাবকত্বের সীমাবদ্ধ রূপ:
আল-কুরআন মাজীদের ভাষাতাত্ত্বিক নিপুণতায় ‘রব’ (رَبّ) এবং ‘তারবিয়াহ’ (تربية - লালন-পালন) একই মূলধাতু থেকে উৎসারিত। ওহীর গভীর অনুধাবনে দেখা যায়, যখন কোনো মানুষ বা জাগতিক সত্তার ক্ষেত্রে ‘রব’ বা রবুবিয়াতের ইঙ্গিত করা হয়, তা কেবল ‘তারবিয়াহ’ বা সাময়িক সেবা-যত্নের সীমাবদ্ধ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত এক প্রকারের ‘আপেক্ষিক রব’ বা ‘রূপক রব’।
১. পিতামাতার ক্ষেত্রে ‘তারবিয়াহ’ বা লালন-পালন:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন সন্তানদের শিখিয়েছেন পিতামাতার জন্য এভাবে প্রার্থনা করতে:
“বলুন! হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে তাঁরা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন (رَبَّيَانِي - রব্বায়ানী)।” (১৭:২৪)
অনুধাবন: এখানে ‘রব্বায়ানী’ শব্দটি লালন-পালন বা যত্নের অর্থে এসেছে। পিতামাতা সন্তানের অস্তিত্ব দান করেন না, বরং আল্লাহর দেওয়া জীবনকে সযত্নে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেন। এখানে ‘রব’ হওয়ার অর্থ হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরম রবের পক্ষ থেকে নিয়োজিত সেবাদানকারী হওয়া।
২. ফেরআউনের দাবি: ‘নুরব্বিকা’ বা প্রতিপালনের দোহাই:
সালামুন আলা মুসা যখন নবী হিসেবে ফেরআউনের দরবারে হকের দাওয়াত নিয়ে গেলেন, তখন ফেরআউন তাঁর দাওয়াতের সরাসরি কোনো যৌক্তিক জবাব না দিয়ে বরং তাঁর শৈশবের ‘উপকার’-এর কথা মনে করিয়ে দিয়ে তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে চেয়েছিল। সূরা আশ-শুয়ারাতে আল্লাহ সেই কথোপকথন বর্ণনা করেছেন:
“সে (ফেরআউন) বলল: আমি কি তোমাকে আমাদের মধ্যে লালন-পালন করিনি (أَلَمْ نُرَبِّكَ - আলাম নুরব্বিকা) যখন তুমি শিশু ছিলে? এবং তুমি তোমার জীবনের বহু বছর আমাদের মধ্যে কাটিয়েছিলে।” (২৬:১৮)
গভীর অনুধাবন:
এখানে ‘নুরব্বিকা’ (نُرَبِّكَ) শব্দটি লক্ষ্য করুন। এটি ‘রব’ (رَبّ) শব্দেরই একটি ক্রিয়াবাচক রূপ, যার অর্থ—‘আমি কি তোমাকে প্রতিপালন করিনি?’ ফেরআউন এখানে নিজেকে সালামুন আলা মুসা -এর জন্য একজন জাগতিক ‘রব’ বা পালনকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। তার যুক্তি ছিল—যেহেতু সে মুসাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং খাদ্য-পানীয় দিয়ে বড় করেছে, সেহেতু মুসার ওপর তার ‘রবুবিয়াত’ বা প্রতিপালনকারী হিসেবে এক প্রকার শ্রেষ্ঠত্ব ও কতৃত্ব রয়েছে।
তাত্ত্বিক নির্যাস:
ফেরআউনের এই দাবিটি ছিল কেবল বৈষয়িক এবং সংকীর্ণ। সে মনে করেছিল খাবার ও আশ্রয় দেওয়াই হলো ‘রব’ হওয়ার চূড়ান্ত মাপকাঠি। সে সচেতনভাবেই এটি এড়িয়ে গিয়েছিল যে, মুসা (সালামুন আলাইহে)-কে ফেরআউনের ঘরে লালন-পালন করার সেই পুরো প্রেক্ষাপটটি ছিল আসলে পরম রবের এক নিপুণ পরিকল্পনা বা তাকদীর (২৮:৮: “অতঃপর ফেরআউনের পরিবার তাকে কুড়িয়ে নিল, যেন সে তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়...”)। ওহীর এই বর্ণনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে—মানুষ বা জাগতিক কোনো সত্তা বড়জোর ‘তারবিয়াহ’ বা যত্নের কারিগর হতে পারে, কিন্তু সার্বভৌম ও মহাজাগতিক ‘রবুবিয়াতের’ মালিক কেবল আল্লাহ রব্বুল আলামিন।
৩. সালামুন আলা মুসা-এর আরও জবাব:
ফেরআউন যখন তার জাগতিক ‘রব’ হওয়ার দম্ভ থেকে প্রশ্ন করল— “বিশ্বজাহানের রব আবার কে? (২৬:২৩)”, তখন মুসা (সালামুন আলাইহে) তার ‘লালন-পালন’-এর অনুগ্রহকে তুচ্ছ করে দিয়ে মহাজাগতিক রবের পরিচয় দিলেন:
“মুসা বললেন: তিনি আসমান ও জমিনের এবং এই দুইয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর রব।” (২৬:২৪)
অনুধাবন: সালামুন আলা মুসা এটিই বুঝিয়ে দিলেন যে—যে ‘রব’ কেবল নিজের প্রাসাদের ভেতরে খাবার দিয়ে কাউকে বড় করে, সে কোনো ‘রব’ নয়। প্রকৃত রব তিনি, যাঁর লালন-পালন মহাকাশ থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রতিটি অণু-পরমাণু পর্যন্ত বিস্তৃত। ফেরআউন কেবল দেহের যত্ন নিয়েছিল, কিন্তু আত্মা ও মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণ একমাত্র পরম রবের হাতে।
ফেরআউনের ‘নুরব্বিকা’ থেকে ‘রব্বুকুমুল আ’লা’ পর্যন্ত:
‘রব্বুকুমুল আ’লা’ (আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ রব) এবং ‘নুরব্বিকা’ (আমরা কি তোমাকে লালন-পালন করিনি)—এই দুটি বক্তব্য আল-কুরআনের দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবং ভিন্ন উদ্দেশ্যে এসেছে। তবে এই দুটির মধ্যে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক ধারাবাহিকতা রয়েছে।
১. আয়াত ২৬:১৮ বনাম ৭৯:২৪: প্রেক্ষিত ও বক্তব্যের পার্থক্য:
◼ ব্যক্তিগত লালন-পালনের দাবি:
যখন সালামুন আলা মুসা নবী হিসেবে প্রথম ফেরআউনের দরবারে গেলেন, তখন ফেরআউন তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে বলেছিল—
সে (ফেরআউন) বলল- ‘আমরা কি তোমাকে আমাদের মধ্যেই লালন-পালন করিনি (نُرَبِّكَ—নুরব্বিকা), যখন তুমি শিশু ছিলে? (২৬:১৮)
এখানে ফেরআউন ‘রব’ হওয়ার একটি জাগতিক বা রূপক দাবি করেছে। তার এই দাবি মূলত ‘লালন-পালন’ (tarbiyah) বা উপকার করার মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
◼ সার্বভৌম প্রভুত্বের দাবি:
যখন সালামুন আলা মুসা তার সামনে রবের আয়াত ও মুজিযাসমূহ উপস্থাপন করলেন এবং ফেরআউন চরম হঠকারিতা প্রদর্শন করল, তখন সে নিজের কওমকে সমবেত করে দম্ভভরে ঘোষণা দিল—
“অতঃপর সে বলল, ‘আমিই তোমাদের সর্বোচ্চ রব (أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَىٰ—আনা রব্বুকুমুল আ'লা)।’” (৭৯:২৪)
এটি কেবল মুসা (সা.আ.)-এর প্রতি নয়; বরং সমগ্র জাতির ওপর তার একচ্ছত্র আধিপত্য ও সার্বভৌমত্বের প্রকাশ্য ঘোষণা।
২. মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন: ‘নুরব্বিকা’ থেকে ‘রব্বুকুমুল আ'লা’ পর্যন্ত:
ফেরআউনের এই দুই দাবির মধ্যে একটি সুস্পষ্ট যৌক্তিক ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়।
স্তর ১: দাতা বা লালনকর্তা হিসেবে অহংকার:
সে মুসাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাইল যে, তারই আশ্রয় ও আহারে মুসা বড় হয়েছেন। ফলে সে নিজেকে ‘দাতা’ (Provider) হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিল। আল-কুরআন আমাদের শিক্ষা দেয়, মানুষ যখন নিজেকে অভাবমুক্ত (মুস্তাগনী) মনে করে, তখনই সে সীমালঙ্ঘন ও অবাধ্যতায় লিপ্ত হয় (৯৬:৬–৭)।
স্তর ২: রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভুত্ব:
নিজের ক্ষমতা জাহির করতে সে বলেছিল—
“মিশরের রাজত্ব কি আমার নয়? আর এই নদীগুলো কি আমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় না?” (৪৩:৫১)
স্তর ৩: চূড়ান্ত খোদায়িত্বের দাবি:
যখন সে দেখল, মুসা (সা.আ.) এমন এক রবের কথা বলছেন, যার হুকুমের সামনে ফেরআউনের সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অর্থহীন, তখন সে নিজেকেই ‘সর্বোচ্চ রব’ বলে ঘোষণা করল। এটি মূলত আল্লাহর একচ্ছত্র সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রকাশ।
৩. সালামুন আলা মুসা -এর সুস্পষ্ট জবাব ও তাত্ত্বিক সমাধান:
ফেরআউনের ‘ব্যক্তিগত লালন-পালন’ এবং ‘জাতীয় প্রভুত্ব’—উভয় দাবিকেই সালামুন আলা মুসা একটি মাত্র উত্তরে নাকচ করে দেন।
ফেরআউন যখন প্রশ্ন করল, “বিশ্বজাহানের রব আবার কে?” (২৬:২৩), তখন মুসা (সা.আ.) তার খাদ্য দেওয়া বা রাজত্ব করার সংকীর্ণ ধারণাকে ভেঙে দিয়ে বললেন—
“তিনি আসমানসমূহ, জমিন এবং এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর রব।” (২৬:২৪)
সালামুন আলা মুসা বুঝিয়ে দিলেন, যে সত্তা আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেননি এবং সেগুলোর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণও রাখেন না, তিনি ‘আ'লা’ (সর্বোচ্চ) তো দূরের কথা, প্রকৃত অর্থেই ‘রব’ হওয়ার যোগ্য নন। ফেরআউন সর্বোচ্চ যা করতে পেরেছিল, তা হলো সাময়িকভাবে একজন মানুষের দেহের প্রয়োজন পূরণ; কিন্তু প্রকৃত রব তিনি, যিনি সৃষ্টি করেন, অস্তিত্ব দান করেন এবং প্রতিটি সৃষ্টিকে তার স্বভাব ও পথনির্দেশ প্রদান করেন (২০:৫০)।
৪. ওহীর শিক্ষা: সার্বভৌমত্ব বনাম সাময়িক অভিভাবকত্ব:
এই আয়াতগুলোর গভীর অনুধ্যান থেকে স্পষ্ট হয় যে, মানুষ যখন আল্লাহপ্রদত্ত সাময়িক ক্ষমতা বা অভিভাবকত্ব—যেমন পিতামাতা, শাসক বা অভিভাবকের দায়িত্ব—নিজের অন্তর্নিহিত বা মৌলিক অধিকার বলে মনে করতে শুরু করে, তখনই সে ফেরআউনের ‘আনা রব্বুকুম’ মানসিকতার দিকে ধাবিত হয়।
আল-কুরআন এই বিভ্রান্তি দূর করেছে ৩১:১৫ ও ৭:১৭২ আয়াতের মাধ্যমে।
▶ ৩১:১৫: জাগতিক অভিভাবকের আনুগত্য করো, যতক্ষণ তারা শিরকের নির্দেশ না দেয়।▶ ৭:১৭২: স্মরণ রেখো, রূহের জগতে তোমরা একমাত্র আল্লাহকেই নিজেদের রব হিসেবে স্বীকার করেছিলে।
৪. পিতামাতা ও ফেরআউনের লালন-পালন: শব্দগত সাদৃশ্য:
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আল্লাহ রব্বুল আলামিন পিতামাতার ক্ষেত্রেও একই ক্রিয়ামূল ব্যবহার করেছেন:
“...রাব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানী সাগীরা (رَبَّيَانِي - রব্বায়ানী)।” (১৭:২৪)
অনুধাবন: পিতামাতা সন্তানকে লালন-পালন করেন (রব্বায়ানী), ফেরআউনও মুসা (সা.আ.)-কে লালন-পালন করার দাবি করেছিল (নুরব্বিকা)। এই দুই ক্ষেত্রেই ‘রব’ ধাতুটি ব্যবহৃত হয়েছে লালন-পালন বা যত্নের অর্থে। কিন্তু ওহীর গভীর অনুধাবন হলো—এই সমস্ত জাগতিক প্রতিপালকগণ (পিতামাতা বা অভিভাবক) আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়োজিত একেকজন ‘কেয়ারটেকার’ মাত্র। রবের মূল সত্তা এবং সার্বভৌমত্ব কেবল আল্লাহরই জন্য নির্দিষ্ট (১:২)।
ওহীর মাধ্যমে ‘রব’-এর সংজ্ঞায়ন ও হিদায়াত:
সালামুন আলা মুসা যখন ফেরআউনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন ফেরআউন তাঁর কাছে রবের পরিচয় জানতে চেয়েছিল। মুসা (সা.আ.) রবের যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, তা ৭:১৭২ এবং ১২:১০১ আয়াতেরই একটি সমন্বিত রূপ:
“তিনি বললেন: আমাদের রব তিনিই, যিনি প্রতিটি সৃষ্টিকে তার আকৃতি দান করেছেন, অতঃপরপথ প্রদর্শন (হিদায়াত) করেছেন।” (২০:৫০)
অনুধাবন: পিতামাতা বা রাজা আকৃতি দান করতে পারেন না এবং আত্মার হিদায়াতও দিতে পারেন না। সুতরাং, ২০:৫০ এবং ১২:১০১ আয়াতের ‘ফাত্বির’ ও ‘হাদী’ (পথপ্রদর্শক) গুণাবলীই হলো সেই ফিল্টার যা দিয়ে আমরা আপেক্ষিক রব এবং পরম রবের পার্থক্য বুঝতে পারি।
◼ জাগতিক মালিক বা বাদশাহর ক্ষেত্রে ‘রব’!
সালামুন আলা ইউসুফ জেলের সঙ্গীদেরস্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছিলেন:
“তোমাদের একজন তার ‘রব’ বা মালিককে (رَبَّهُ) মদ্যপান করাবে...” (১২:৪১) এবং তিনি মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বলেছিলেন: “তোমার রবের (মালিকের) কাছে আমার কথা বলো (اذْكُرْنِي عِندَ رَبِّكَ)।” (১২:৪২)
অনুধাবনে যৌক্তিক বিশ্লেষণ: এখানে ‘রব’ শব্দটি সামাজিক বা প্রশাসনিক বা জাগতিক কর্তৃত্বের রূপক’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রাচীন আরবী ভাষায় এবং কুরআনের বিশেষ নজমে (বিন্যাস) এটি দ্বারা এমন মালিককে বোঝানো হয়েছে যার ওপর মানুষের জীবিকা বা জাগতিক নিরাপত্তা সাময়িকভাবে নির্ভরশীল থাকে। কিন্তু এই ‘রব’ বা মালিক নিজে অবিনশ্বর নন এবং সৃষ্টির ওপর তাঁর কোনো মৌলিক ক্ষমতা নেই।
রবের প্রকৃত সংজ্ঞা: সালামুন আলা ইউসুফ-এর জবানীর রেকর্ড-এ যা আছে:
সালামুন আলা ইউসুফ একই মুখে জাগতিক প্রধানকে ‘রব’ বললেও (তৎকালীন ভাষা অনুযায়ী), প্রকৃত রবের সাথে তার পার্থক্যটি ১২:১০১ আয়াতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
➥ ফাত্বির (Originator): তিনি যখন রবের প্রশংসা করেন, তখন বলেন:
“হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা (فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ - ফাতিরাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি)! আপনিই দুনিয়া ও আখিরাতে আমার অভিভাবক (ওয়ালী)।” (১২:১০১)
গভীর অনুধ্যান: লক্ষ্য করুন, ইউসুফ (সা.আ.) একই মুখে জাগতিক প্রধানকে ‘রব’ বললেও (সামাজিক অর্থে), আল্লাহর ক্ষেত্রে ‘ফাত্বির’ (যিনি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব দান করেছেন) শব্দটি ব্যবহার করে পার্থক্যটি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। জাগতিক রব কেবল লালন-পালন করতে পারেন, কিন্তু আকাশ ও পৃথিবীর অস্তিত্ব দান করা বা মৃত্যু পরবর্তী জীবনের অভিভাবকত্ব (ওয়ালী) করার ক্ষমতা কেবল আল্লাহ রব্বুল আলামিনের। এটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত রব কেবল লালনকর্তাই নন, বরং তিনি মহাজাগতিক স্থপতি বা ফাত্বির।
এখানে ‘ফাত্বির’ শব্দটি হলো সেই ফিল্টার যা দিয়ে জাগতিক রব এবং পরম রবকে আলাদা করা যায়। কোনো পিতামাতা বা রাজা আকাশ ও পৃথিবীর অস্তিত্ব দাতা হতে পারেন না এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের ‘ওয়ালী’ বা অভিভাবক হতে পারেন না। প্রকৃত রব হলেন তিনিই, যিনি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব দান করেন।
২. সত্যিকারের রব এর পরিচয় তার সিফাতে:
বিপরীত দিকে, যখন মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন নিজেকে ‘রব’ বলেন, তখন তা তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়:
■ সৃজনশীলতা (খালিক্ব): জাগতিক কোনো ‘রব’ (পিতামাতা বা রাজা) শূন্য থেকে কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। কিন্তু প্রকৃত রব তিনিই যিনি অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্বে আনেন।
“জেনে রেখো, সৃষ্টি তাঁরই (الْخَلْقُ - আল-খালক্ব)... বরকতময় আল্লাহ, যিনি বিশ্বজাহানের রব।” (৭:৫৪)
■ আদেশ বা হুকুম (আমর): জাগতিক অভিভাবকের আদেশ সীমাবদ্ধ, কিন্তু আল্লাহর আদেশ মহাজাগতিক ও অকাট্য।
“...এবং আদেশও (الْأَمْرُ - আল-আমর) কেবল তাঁরই।” (৭:৫৪)
■ পরিমাপ নির্ধারণ (তাকদীর): পিতামাতা সন্তানের যত্ন নিতে পারেন, কিন্তু সন্তানের ভাগ্য বা দৈহিক বিন্যাস ঠিক করতে পারেন না। কিন্তু আল্লাহ বলেন:
“যিনি সৃষ্টি করেছেন ও সুসামঞ্জস্য করেছেন এবং যিনি সুনির্ধারিত পরিমাপ করেছেন ও পথপ্রদর্শন করেছেন।” (৮৭:২-৩)
৩. সুক্ষ্ম পার্থক্যের চাবিকাঠি: মুসা ও ফেরআউনের সংলাপ:
পার্থিব ‘রব’ এবং সত্যিকারের ‘রব’-এর মধ্যকার পার্থক্যটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে সালামুন আলা মুসা এবং ফেরআউনের সংলাপে। ফেরআউন যখন দম্ভভরে নিজেকে ‘রব্বুকুমুল আ’লা’ (তোমাদের সর্বোচ্চ রব - ৭৯:২৪) দাবি করেছিল, তখন সে মূলত ‘কর্তৃত্ব’ ও ‘প্রতিপালন’-এর চরম সীমার দাবি করেছিল।
সালামুন আলা মুসা তার এই ভ্রান্ত ধারণার জবাব দিয়েছিলেন এভাবে:
ফেরআউন বলল: বিশ্বজাহানের রব আবার কে? (২৬:২৩) মুসা বললেন: তিনি আসমান ও জমিনের এবং এই দুইয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর রব (رَّبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ)।” (২৬:২৪)
যৌক্তিক পূর্ণতা: সালামুন আলা মুসা ফেরআউনকে বুঝিয়ে দিলেন যে, যে রব কেবল একটি জনপদের মানুষের দেখভাল করে বা নিজেকে মালিক দাবি করে, সে প্রকৃত রব হতে পারে না। প্রকৃত রব তিনিই যার রাজত্ব মহাকাশ থেকে শুরু করে পৃথিবীর গভীর তলদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। জাগতিক রব মৃত্যুর অধীন (৩৫:১৩), কিন্তু মহাজাগতিক রব ‘হাইয়্যুল কাইয়্যুম’ বা চিরঞ্জীব (২:২৫৫)।
রূহানি অঙ্গীকার ও জাগতিক দায়িত্বের ভারসাম্য:
রবের পরিচয় নিয়ে যেন কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়, সে জন্য আল-কুরআন আগেভাগেই বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছে। জাগতিক অভিভাবকগণ সম্মানের পাত্র, কিন্তু তাঁরা ‘শরীফ’ বা ইবাদতের অংশীদার নন। সফলকাম তারাই, যারা ওহীর এই নিখুঁত মানদণ্ডে নিজেদের জীবন পরিচালনা করে এবং রূহের সেই আদি অঙ্গীকারের ওপর অবিচল থাকে।
আল-কুরআন মাজীদ আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে ‘হক’ বা সত্যকে এমনভাবে বিন্যস্ত করেছে যেন আমরা কোনোভাবেই পরম রবের পরিচয়ের সাথে জাগতিক লালনকর্তাদের গুলিয়ে না ফেলি। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য ও ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ওহীর সংবাদ আমাদের দুই স্তরের সুরক্ষা দেয়:
১. রূহের জগতের আদি স্মৃতি ও সতর্কবাণী:
আমরা যেন কিয়ামতের দিন অজুহাত দিয়ে না বলি যে, আমাদের পিতৃপুরুষরা শিরক করেছিল তাই আমরাও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছি—সে জন্য আল্লাহ রব্বুল আলামিন জন্মের আগেই আমাদের রূহের কাছ থেকে সাক্ষ্য নিয়েছেন। আল্লাহ বলেন:
“...আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেছিল: হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি (৭:১৭২)। যেন তোমরা কিয়ামতের দিন না বলো যে, আমরা এ বিষয়ে উদাসীন ছিলাম। অথবা না বলো যে, আমাদের পিতৃপুরুষরাই তো আগে শিরক করেছিল আর আমরা তো তাদের পরবর্তী বংশধর...” (৭:১৭৩)
গভীর অনুধাবন: ওহীর এই সংবাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রূহানিভাবে আমরা কেবল এক রবের কাছেই দায়বদ্ধ। জাগতিক কোনো ‘রব’ বা অভিভাবক এই আদি পরিচয়ের সমকক্ষ হতে পারে না।
২. পিতামাতার প্রতি ইহসান বনাম রবের সার্বভৌমত্ব:
পিতামাতা আমাদের শৈশবে লালন-পালন করেন (তারবিয়াহ), যা এক প্রকারের রূপক রব-সুলভ কাজ। আল্লাহ তাঁদের প্রতি সর্বোচ্চ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন (৩১:১৪)। কিন্তু এই কৃতজ্ঞতা যেন ‘শিরক’ বা পরম রবের কতৃত্বে অংশীদারিত্বে রূপ না নেয়, সে জন্য আল্লাহ এক চূড়ান্ত সীমারেখা টেনে দিয়েছেন:
“আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক (যুক্ত) করতে পীড়াপীড়ি করে যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তুমি তাদের আনুগত্য করো না (فَلَا تُطِعْهُمَا); তবে দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে (মারূফ) বসবাস করো...” (৩১:১৫)
অনুধাবন: আল্লাহ সু.তা. এখানে এক অপূর্ব ভারসাম্য বা ব্যালান্স রক্ষা করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন—যিনি লালন-পালন করেন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকো, কিন্তু ইবাদত ও চূড়ান্ত কতৃত্বের আসনে কেবল সেই ‘আসল রব’ বা মহাজাগতিক স্রষ্টাকেই রাখো। ৭:১৭২ আয়াতের সেই আদি ‘বলা’ এবং ৩১:১৫ আয়াতের এই ‘সীমানা’ মূলত একই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে যে—সৃষ্টি যার, চূড়ান্ত হুকুম ও রবুবিয়াতও কেবল তাঁরই (৭:৫৪)।
১৮:১১০ আয়াতের অকাট্য সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই পার্থিব অভিভাবকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা যেন কোনোভাবেই আল্লাহর সার্বভৌম ‘রব’ হওয়ার অধিকারে অংশীদারিত্ব (শিরক) না ঘটায়।
৪. পার্থক্য সারসংক্ষেপ (তাত্ত্বিক বিন্যাস):
|
| বৈশিষ্ট্য |
জাগতিক রব (পিতামাতা/মালিক)
| সত্যিকারের
রব (আল্লাহ) | |
|
|উৎস
| তিনি নিজেই
সৃষ্ট এবং মুখাপেক্ষী।
| তিনি অমুখাপেক্ষী (সামাদ)। |
|
|কর্তৃত্ব
| কেবল সেবা ও শাসনের
ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। | সৃষ্টি এবং আদেশ—উভয়ই
তাঁর। |
|
| স্থায়িত্ব
| নশ্বর এবং ধ্বংসশীল (৫৫:২৬)। | চিরস্থায়ী ও অবিনশ্বর (৫৫:২৭)। |
|
| ক্ষমতা |
মানুষের ঘাড়ের শাহরগের খবরও জানেন না। | মানুষের শাহরগের চেয়েও নিকটবর্তী (৫০:১৬) |
আরও কুরআনি দলিল ও নিগূঢ় সংযোগসমূহ:
মালিকানা বনাম কতৃত্বের সীমা:
আল-কুরআনে জাগতিক মালিকানা এবং পরম মালিকানার পার্থক্য ফুটিয়ে তুলতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
“...তোমরা যাঁদেরকে তাঁর পরিবর্তে ডাকো, তাঁরা তো খর্জুরের আঁটির ওপরও কোনো ইখতিয়ার রাখে না (مَا يَمْلِكُونَ مِنْ قِطْمِيرٍ)।” (৩৫:১৩)
গভীর অনুধ্যান: পিতামাতা বা জাগতিক কোনো রাজা-বাদশাহকে মানুষ অনেক সময় ‘রব’ বা পালনকর্তা হিসেবে সম্মান করে, কিন্তু তাঁদের ক্ষমতা এতোটাই সীমিত যে তাঁরা একটি খেজুরের আঁটির খোসার সমপরিমাণ সম্পদেরও স্বাধীন মালিক নন। এর বিপরীতে পরম ‘রব’ হলেন তিনি, যাঁর হাতে আসমান ও জমিনের চাবিকাঠি রয়েছে (৩৯:৩৮)। জাগতিক ‘রব’-এর ক্ষমতা ধার করা বা অস্থায়ী, আর পরম ‘রব’-এর ক্ষমতা স্বয়ংসম্পূর্ণ ও চিরন্তন।
হিদায়াতের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা: (২৮:৫৬) বনাম মানুষের সীমাবদ্ধতা:
পিতামাতা বা কোনো শিক্ষক হয়তো মানুষকে ভালো শিক্ষা দিতে পারেন, কিন্তু কাউকে হিদায়াত বা সঠিক পথ দেওয়ার ক্ষমতা কোনো মানুষের (জাগতিক ‘রব’-এর) নেই।
“নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হিদায়াত দিতে পারবেন না, তবে আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করেন...” (২৮:৫৬)
অনুধাবন: এই আয়াতটি আপেক্ষিক এবং পরম ‘রব’-এর মধ্যকার বিভাজরেখাকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে টেনে দেয়। পিতামাতা সন্তানের শারীরিক ‘তারবিয়াহ’ বা লালন-পালন করতে পারেন (১৭:২৪), কিন্তু সন্তানের রূহ বা অন্তরে হিদায়াত প্রবেশ করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের নেই। অন্তরের হিদায়াত কেবল একমাত্র পরম ‘রব’-এর এখতিয়ার। এটি প্রমাণ করে যে, জাগতিক ‘রব’-এর ভূমিকা কেবল বাহ্যিক ও সাময়িক।
প্রকৃত মালিকানা: (২৩:৮৪-৮৯) ও (ফাতিড় ৩৬:৩৩-৩৫) এর অনুধ্যান:
মানুষ যখন কোনো জাগতিক মালিক বা প্রভুর (রব) অধীনে কাজ করে, তখন সে ভুলে যায় যে মূল মালিক কে। আল্লাহ সু.তা. মানুষকে চ্যালেঞ্জ করে প্রশ্ন করেছেন:
“বলুন! যদি তোমরা জানো, তবে বলো—জমিন এবং তাতে যা কিছু আছে তা কার? তারা বলবে: আল্লাহর।বলুন! তবে কি তোমরা অনুধাবন করবে না? (৮৪)... বলুন: সাত আসমান ও মহিমান্বিত আরশের রব কে? তারা বলবে: আল্লাহর।” (২৩:৮৪-৮৬)
অনুধাবন: এই আয়াতগুলো আমাদের চেতনাকে জাগিয়ে তোলে। পিতামাতা বা রাজা-বাদশাহ যতই নিজেদের ‘মালিক’ বা ‘রব’ দাবি করুক না কেন (যেমন ফেরআউন করেছিল), শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণার মূল মালিক স্বীকার করতে হয় একমাত্র আল্লাহকে। জাগতিক ‘রব’-এর মালিকানাও আসলে আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত মাত্র।
জীবন ও মৃত্যুর নিরঙ্কুশ ইখতিয়ার:
পিতামাতা বা অভিভাবক সন্তানকে লালন-পালন করেন (তারবিয়াহ), কিন্তু জীবন বা মৃত্যুর ফয়সালা করার ক্ষমতা তাঁদের নেই।
“তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান এবং তাঁরই দিকে তোমরা ফিরে যাবে।” (১০:৫৬)
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: যেহেতু ‘রব’ শব্দের অর্থ হলো যিনি জীবন থেকে মৃত্যু এবং মৃত্যু থেকে পূর্ণতায় বিকশিত করেন, সেহেতু যার হাতে জীবন ও মৃত্যুর চাবিকাঠি নেই, সে কখনো পরম ‘রব’ হতে পারে না। জাগতিক ‘রব’-গণ নিজেরাও মৃত্যুর অধীন, সুতরাং তাঁরা কেবলই পরম ‘রব’-এর করুণার ওপর নির্ভরশীল এক একটি সৃষ্টি।
অনুধাবন: আল-কুরআনের এই সুগভীর ক্রস-রেফারেন্সসমূহ (৩৫:১৩, ২৮:৫৬, ২৩:৮৪, ১০:৫৬) আমাদের সামনে পুরো চিত্রটি একদম স্পষ্ট করে দেয়:
- পিতামাতা বা জাগতিক অভিভাবক হলেন ‘তারবিয়াহ’-এর সীমিত ও রূপক অর্থে ‘রব’, যাঁদের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ, নশ্বর এবং হিদায়াত বা জীবন-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে নয়। - আল্লাহ সু.তা. হলেন মহাজাগতিক ও পরম ‘রব’, যিনি মালিকানার (২৩:৮৪), হিদায়াতের (২৮:৫৬) এবং জীবন-মৃত্যুর (১০:৫৬) একমাত্র নিরঙ্কুশ অধিপতি।
এই সুক্ষ্ম পার্থক্য অনুধাবন করার মাধ্যমেই মানুষের তাওহীদ বা একত্ববাদের বিশ্বাস পূর্ণতা লাভ করে। ১৮:১_১০ আয়াতের চেতনা অনুযায়ী, জাগতিক কোনো ‘রব’-এর প্রতি সম্মান যেন কক্ষণো পরম ‘রব’-এর ইবাদত বা বিধানকে ছাড়িয়ে না যায়।
জাগতিক পিতামাতা, অভিভাবক বা অন্যকিছু: প্রকৃত রব!
প্রকৃত রবের পরিচয় যে কেবল ‘লালন-পালন’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আসমান ও জমিনের সৃষ্টির (ফাত্বির) সাথে যুক্ত—তার এক অকাট্য প্রমাণ মেলে সালামুন আলা ইব্রাহিম ও সালামুন আলা ইউসুফ-এর উচ্চারিত ঐশী ভাষ্যে।
১. সালামুন আলা ইব্রাহিম -এর রূঢ় বাস্তবতা ও সত্যের উন্মোচন:
সালামুন আলা ইব্রাহিম যখন রবের সন্ধানে ছিলেন, তখন তিনি একে একে নক্ষত্র, চাঁদ ও সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু যখন দেখলেন এই মহাজাগতিক শক্তিগুলোও উদিত ও অস্তমিত হয় (অর্থাৎ পরিবর্তনশীল), তখন তিনি তাঁর রূহের সেই আদি জ্ঞানের (৭:১৭২) ভিত্তিতে প্রকৃত রবের পরিচয় ঘোষণা করলেন:
(ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযি ফাত্বারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা হানীফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকীন)
“আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখ সেই সত্তার দিকে ফেরালাম যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন (فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ - ফাত্বারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা) এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (৬:৭৯)
২. সালামুন আলা ইউসুফ-এর সাথে অভিন্ন দালিলিক সংযোগ:
সালামুন আলা ইউসুফ-এর কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দুআটিও ইব্রাহিম (সালামুন আলাইহে)-এর এই ঘোষণার হুবহু প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেছিলেন:
“হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা (فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ - ফাতিরাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি)! আপনিই দুনিয়া ও আখিরাতে আমার অভিভাবক।” (১২:১০১)
অনুধাবন: এখানে লক্ষ্য করুন, উভয় নবীই রবের পরিচয় দিতে গিয়ে ‘ফাত্বির’ বা ‘ফাত্বারা’ (আদি স্রষ্টা) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সালামুন আলা ইউসুফ যদিও সমকালীন পরিভাষায় জাগতিক মালিককে ‘রব’ বলেছিলেন, কিন্তু যখনই তিনি প্রকৃত ও পরম রবের কথা বলেছেন, তখন তিনি তাঁর পিতামহ সালামুন আলা ইব্রাহিম -এর সেই একই মানদণ্ড ব্যবহার করেছেন।
সারকথা: চাঁদ, সূর্য বা জাগতিক কোনো রাজা-বাদশাহ, পিতা-মাতা—কেউই আসমান ও জমিনের অস্তিত্ব দাতা হতে পারে না। প্রকৃত রব তিনিই, যিনি অনস্তিত্ব থেকে মহাবিশ্বকে অস্তিত্বে এনেছেন। ইউসুফ ও ইব্রাহিম (সালামুন আলাল মুরসালিন)-এর এই অভিন্ন বাণী প্রমাণ করে যে, ওহীর দৃষ্টিতে ‘রব’ মানেই হলো মহাজাগতিক স্থপতি। সুতরাং, জাগতিক লালনকর্তাদের প্রতি সম্মান থাকলেও ইবাদত ও চূড়ান্ত কতৃত্বের মুখ কেবল সেই ‘ফাত্বির’-এর দিকেই ফেরানো মুমিনের একমাত্র দায়িত্ব (১৮:১১০)।
▓▒░ প্রশ্নত্তোর:░▒▓
ইতোমধ্যেইা জনৈক উৎসুক ভাইয়ের পক্ষ থেকে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে যে-
পিতামাতা, রাজাবাদশা, অভিভাবকত্ব প্রদান কারী দের ক্ষেত্রে "রব" শব্দ টি রূপক বা আপেক্ষিক হিসাবে ব্যবহারিত হয়েছে তার কোন প্রমাণ কোরআন থেকে দিতে পারবেন?
অনুধাবনে উত্তর:
নিচে আল-কুরআনের আয়াত থেকে এর প্রামাণিক দলিল উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি-বিঈযনিল্লাহ!
১. পিতামাতার ক্ষেত্রে ‘রব’ শব্দের আপেক্ষিক ব্যবহার (১৭:২৪):
পিতামাতা সন্তানের অস্তিত্বের আদি উৎস নন, বরং তারা আল্লাহর দেওয়া জীবনকে লালন-পালনের মাধ্যম মাত্র। আল-কুরআনে তাঁদের এই ভূমিকাকে ‘রব’ শব্দটির একটি বিশেষ রূপ (verb form) দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে:
“আর তাঁদের জন্য দয়া ও বিনম্রতার ডানা নত করে দাও এবং বলো: হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তাঁরা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন (رَبَّيَانِي - রব্বায়ানী)।” (১৭:২৪)
অনুধাবনে প্রমাণ ও বিশ্লেষণ: এখানে ‘রব্বায়ানী’ শব্দটি ‘রব’ (র-বা-বা) মূলধাতু থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো ‘যিনি আমাকে প্রতিপালন করেছেন’। লক্ষ্য করুন, আয়াতে আল্লাহকে সম্বোধন করা হয়েছে ‘রব’ হিসেবে (সার্বভৌম), আর পিতামাতার কাজকে বলা হয়েছে ‘রব্বায়ানী’ (আপেক্ষিক প্রতিপালন)। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, পিতামাতা কেবল শৈশবের সাময়িক যত্নের অর্থে ‘রব’ বা প্রতিপালক, কিন্তু চূড়ান্ত মালিকানা ও সার্বভৌমত্বের রব একমাত্র আল্লাহ।
২. রাজা বা মালিকের ক্ষেত্রে ‘রব’ শব্দের প্রয়োগ (সূরা ইউসুফ ১২:৪১, ৪২, ৫০):
আল-কুরআন মাজীদের সূরা ইউসুফে ‘রব’ শব্দটি জাগতিক মালিক বা বাদশাহর ক্ষেত্রে একাধিকবার ব্যবহৃত হয়েছে। এটি তৎকালীন সামাজিক ও ভাষাগত প্রেক্ষাপটে ‘মালিক’ বা ‘কর্তা’ অর্থে ব্যবহৃত হতো।
■ ১২:৪১ আয়াতে: সালামুন আলা ইউসুফ জেলের সঙ্গীদের স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বলেন:
“তোমাদের একজন তার ‘রব’ বা মালিককে (رَبَّهُ - রব্বাহু) মদ্যপান করাবে...”
■ ১২:৪২ আয়াতে: তিনি মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বললেন:
তোমার ‘রব’ বা মালিকের (رَبِّكَ - রব্বিকা) কাছে আমার কথা বলো।
■ ১২:৫০ আয়াতে: বাদশাহ যখন তাঁকে ডাকলেন, ইউসুফ (সা.আ.) দূতের মাধ্যমে বললেন:
“তোমার ‘রব’ বা মালিকের (رَبِّكَ - রব্বিকা) কাছে ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞাসা করো...”
অনুধাবনে প্রমাণ ও বিশ্লেষণ: এই আয়াতগুলোতে ‘রব’ শব্দটি বাদশাহ বা জেলের মনিবের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। সালামুন আলা ইউসুফ নিজে একজন নবী হয়েও মানুষের ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যা প্রমাণ করে যে জাগতিক অভিভাবক বা কর্তৃত্বশালীদের ক্ষেত্রে ‘রব’ শব্দটি একটি সীমিত ও আপেক্ষিক অর্থে (Master/ provider অর্থে) ব্যবহার করা বৈধ। তবে এটি কখনোই আল্লাহর ‘রব্বুল আলামিন’ পরিচয়ের সমকক্ষ নয়। তিনি আবার আয়াত ১২:১০১ আয়াতে প্রকৃত রবের পরিচয় তুলে ধরেছেন।
৩. ফেরআউনের দাবি বনাম রবের পার্থক্য (২৬:১৮):
ফেরআউন যখন সালামুন আলা মুসা -কে তাঁর উপকারের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল, তখন সে ‘রব’ শব্দের একটি ক্রিয়াবাচক রূপ ব্যবহার করেছিল:
“সে (ফেরআউন) বলল: আমি কি তোমাকে আমাদের মধ্যে প্রতিপালন করিনি (نُرَبِّكَ - নুরব্বিকা) যখন তুমি শিশু ছিলে?” (২৬:১৮)
অনুধাবনে প্রমাণ ও বিশ্লেষণ: এখানে ফেরআউন নিজেকে মুসার জন্য একজন ‘পালনকর্তা’ (রব) হিসেবে দাবি করেছিল কেবল খাবার ও আশ্রয় দেওয়ার যুক্তিতে। কিন্তু আল-কুরআন দেখিয়েছে যে, এই প্রতিপালন ছিল কেবল বাহ্যিক ও সাময়িক। যখন সালামুন আলা মুসা-কে রবের পরিচয় দিতে বলা হলো, তিনি ১২:১০১ এবং ২৬:২৪ আয়াতের মানদণ্ডে আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টাকেই ‘প্রকৃত রব’ হিসেবে উপস্থাপন করলেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মানুষের ‘রবুবিয়াত’ কেবল সেবা বা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
৪. কেন এগুলো রূপক বা আপেক্ষিক?
আল-কুরআনের আয়াতসমূহ (২:১২৭, ৭:৫৪, ৮৭:১-৩) অনুযায়ী প্রকৃত রব হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত লাগে যা কোনো মানুষের মধ্যে নেই:
১. সৃজনশীলতা, রিযিক ও জীবন-মৃত্যুর মালিকানা (৩০:৪০)/ জীবন-মৃত্যু ও দিন-রাত্রির পরিবর্তন (২৩:৮০): মানুষ অস্তিত্ব দান করতে পারে না, এসব মানুষ করতে পারে না, কোন নবী-রাসুলরাও করতে পারে না। ক্ষেত্র বিশেষে কেবল পরিচর্যা করতে পারে।
২. হুকুম (সার্বভৌম আদেশ): মানুষের আদেশ পরিবর্তনশীল ও নশ্বর, কিন্তু রবের আদেশ মহাজাগতিক।
৩. তাকদীর (পরিমাপ নির্ধারণ) ও হিদায়াত (৮৭:১-৩): পিতামাতা বা রাজা কারো শারীরিক গঠন বা ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।
মহাজাগতিক চ্যালেঞ্জ ও নবীগণের যুক্তি (২:২৫৮, ২৬:২৮):
সালামুন আলা ইব্রাহিম যখন তৎকালীন রাজাকে রবের দাওয়াত দিয়েছিলেন, তখন রাজা নিজেকে জীবন ও মৃত্যুর মালিক দাবি করেছিল। ইব্রাহিম (সালামুন আলাইহে) তার এই জাগতিক ‘রব’ হওয়ার দম্ভকে এক মহাজাগতিক যুক্তিতে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন:
“ইব্রাহিম বললেন: নিশ্চয়ই আমার রব সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে উদিত করো তো! অতঃপর সেই কাফেরটি হতভম্ব হয়ে গেল।” (২:২৫৮)
অনুরূপভাবে, সালামুন আলা মুসা ফেরআউনের ‘আপেক্ষিক রব’ হওয়ার দাবিকে নাকচ করতে গিয়ে রবের মহাজাগতিক ক্ষমতার সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন:
“মুসা বললেন- তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের এবং এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর রব, যদি তোমরা বুঝতে পারতে!” (২৬:২৮)
সুতরাং, যখনই আল-কুরআনে কোনো মানুষের জন্য ‘রব’ বা প্রতিপালন শব্দটি এসেছে, তা কেবল সেবা (Service) ও সাময়িক অভিভাবকত্ব (Authority) প্রকাশের জন্য রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। জীবন-মৃত্যুর মালিকানা, রিযিক দাতা হওয়া এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রক হওয়ার যে গুণাবলী, তা থেকে জাগতিক সকল অভিভাবক মুক্ত। প্রকৃত রব কেবল আল্লাহ রব্বুল আলামিন, যাঁর আদেশ বা ‘আমর’ (৭:৫৪) সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে কার্যকর।
▓▒দুআ-তাসবিহ▒▓
ইউসুফ (সা.আ.)-এর সেই প্রার্থনা:
فَاطِرَ السَّمَاوَاتِوَالْأَرْضِ أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًاوَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
(ফাতিরাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি আনতা ওয়ালিয়্যি ফিদ দুনইয়া ওয়াল আখিরাহ; তাওয়াফফানি মুসলিমাও ওয়া আলহিক্বনি বিস সালিহীন)
অর্থ: হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা! আপনিই ইহকাল ও পরকালে আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দান করুন এবং নেককারদের অন্তর্ভুক্ত করুন। (১২:১০১)
রূহের অঙ্গীকারের ওপর অবিচল থাকার আরজি:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُובَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَالْوَهَّابُ
(রাব্বানা লা তুযিগ ক্বুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাতান, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব)
অর্থ: হে আমাদের রব! হিদায়াত দান করার পর আমাদের অন্তরকে সত্যলঙ্ঘনকারী করবেন না এবং আপনার নিকট থেকে আমাদের রহমত দান করুন; নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা। (৩:৮)
পরম রবের একত্বের স্বীকৃতি (সালামুন আলা ইব্রাহিম):
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَلِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ حَنِيفًا ۖ وَمَا أَنَا مِنَالْمُشْرِكِينَ
(ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযি ফাত্বারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা হানীফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকীন)
অর্থ: আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখ সেই সত্তার দিকে ফেরালাম যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। (সূরা আল-আন’আম ৬:৭৯)
রবের একত্বের স্বীকৃতি ও ক্ষমা প্রার্থনা (সালামুন আলা ইউনুস):
لَّا إِلَٰهَإِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
(লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন)
অর্থ: আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র! নিশ্চয়ই আমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। (২১:৮৭)
পিতামাতার প্রতি অনুগ্রহ ও লালন-পালনের শোকরিয়ায়:
رَّبِّ ارْحَمْهُمَاكَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
(রাব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানী সাগীরা)
অর্থ: হে আমার রব! আমার পিতামাতার প্রতি দয়া করুন যেভাবে তাঁরা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন। (১৭:২৪)
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَ
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু। (আল কুরআন ২:১২৭, ২:১২৮)
রবের মহান পবিত্রতা ও সার্বভৌমত্বের ঘোষণা :
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّالْعִزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُلِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
সুবহা-না রব্বিকা রব্বিল ‘ইযযাতি ‘আম্মা- ইয়াসিফূন। অসালা-মুন ‘আলাল মুরসালীন। অলহামদু লিল্লা-হি রব্বিল ‘আ-লামীন!
অর্থ: আপনার রব, যিনি সকল সম্মানের অধিকারী, তিনি তারা যা আরোপ করে তা থেকে পবিত্র। এবং রাসুলগণের প্রতি শান্তি (সালাম)। আর সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। (৩৭:১৮০-১৮২)
