"দুনিয়ার জীবন তো খেল-তামাশা ও আমোদ-প্রমোদ ছাড়া আর কিছুই নয়।" -সূরা আল-আন'আম, ৬:৩২ (এ ধরনের বক্তব্য আরও এসেছে ২৯:৬৪ ও ৫৭:২০-এ)
অধিকাংশ কী সেটাই বেছে নিল? সমাজ-সংসারে তবে কি আমি সংখ্যালঘুদের একজন হয়েই রয়ে গেলাম? আমি-ই কী হেরে গেলাম?
▓▒ Why & what for?▒▓
সম্মানিত পাঠক! বর্তমান পৃথিবীতে আয়োজিত বড় বড় ক্রীড়া আসরগুলো কেবল কিছু শারীরিক কসরতের নাম নয়, বরং এগুলো এক গভীর আধ্যাত্মিক সংকটের আকর। আল-কুরআন মাজীদের ওহীর আলোতে অনুধাবন করলে দেখা যায়, এজাতীয় উন্মাদনার পরতে পরতে মিশে থাকে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি, শোষক বাণিজ্য এবং মানুষের চরিত্রহননের সুনিপুণ কারসাজি। যখন ওহীর চর্চার চেয়ে চিত্তবিনোদন মানুষের কাছে বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষের ‘রূহ’ বা আত্মা এক নিদারুণ শূন্যতায় নিমজ্জিত হয়।
আল-কুরআন মাজীদের ওহীর নির্দেশনার বাইরে বর্তমানে আমরা যে ক্রীড়া-উন্মাদনা বা ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপের মতো বিষয়ে জীবনের মহামূল্যবান সময় দিচ্ছি, তার একটি অত্যন্ত কঠোর ও বাস্তব চিত্র আল্লাহ সু.তা. সূরা আল-জুমুআহ-তে ফুটিয়ে তুলেছেন। যখন ওহীর চর্চা বা আল্লাহর স্মরণের চেয়ে মানুষের কাছে চিত্তবিনোদন বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষের ঈমানি ভিত্তি কতটা নড়বড়ে হয়ে পড়ে—তা নিম্নোক্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
➥ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল আমাদের রাতের নির্জনতায় ওহীর (কুরআনের) সংস্পর্শে থাকতে শিখিয়েছেন। অথচ আজ আমরা সেই রাতগুলো কাটাচ্ছি পর্দার আলো, বিনোদন আর অন্তহীন স্ক্রলিংয়ে। (দ্র: আয়াত ৭৩:১৬, ৭৩:২০, ১৭:৭৯)
■ ওহী ছেড়ে বিনোদনের দিকে পলায়ন/ ওহী বনাম বিনোদন ও বাণিজ্যের দ্বন্দ্ব :
আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের মানসিকতার একটি বাস্তব দুর্বলতা চিত্রায়িত করেছেন: “আর যখন তারা কোনো ব্যবসা অথবা ক্রীড়া-কৌতুক (লাহ্-ওয়ান) দেখে, তখন তারা তোমাকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় রেখে সেদিকেই ছুটে যায়। বলো— আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসা অপেক্ষা অনেক উত্তম; আর আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।” (৬২:১১)
তাত্ত্বিক অনুধাবন: এখানে লক্ষ্য করুন, আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সা.) যখন ওহীর জ্ঞান বা ইবাদতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্তরে মানুষকে আহ্বান করেন, তখন একদল মানুষ সামান্য ‘লাহ্-ও’ বা চিত্তবিনোদনের (বর্তমান প্রেক্ষাপটে খেলাধুলার উত্তেজনা) আকর্ষণে ওহীর মজলিস ছেড়ে পলায়ন করে। এই ‘ ছুটে যাওয়া’ বা ‘ইনফাদ্ব-দ্বূ’ (انفَضُّوا) শব্দটি নির্দেশ করে যে, তাদের অন্তরে ওহীর চেয়ে বিনোদনের গুরুত্ব বেশি।
ওহীর জ্ঞান আমাদের শেখায় যে, বিনোদনের ক্ষণস্থায়ী তৃপ্তির চেয়ে আল্লাহর দেওয়া স্থায়ী কল্যাণ বা ‘খাইর’ বহুগুণ শ্রেষ্ঠ।
■ সংখ্যাধিক্য কি সত্য ও সুন্দরের মাপকাঠি? Majority!
সম্মানিত পাঠক! মানুষের চিন্তাজগতে একটি বড় বিভ্রান্তি হলো- “যেহেতু অধিকাংশ মানুষ এটি করছে বা পছন্দ করছে, তাই এটিই হয়তো সত্য, সুন্দর ও সঠিক।”
খেলাধুলা, গ্ল্যামার ও উন্মাদনার পক্ষে যখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়, তখন দুর্বল ঈমানের মানুষরা মনে করে যে সংখ্যাধিক্যই সত্যের সনদ। কিন্তু আল-কুরআন মাজীদ আমাদের এই ধারণাকে সমূলে উপড়ে ফেলে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন ও বিজ্ঞানময় মানদণ্ড প্রদান করেছে। ওহীর জ্ঞান অনুযায়ী, সংখ্যাধিক্য (Majority) কখনো সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না।
■ সংখ্যাধিক্যের অন্ধ অনুকরণ: পথভ্রষ্টতার গ্যারান্টি:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন আল-কুরআন মাজীদে সংখ্যাধিক্য অনুসরণের পরিণতি সম্পর্কে এক অকাট্য নিয়ম বা মহাজাগতিক আইন সাব্যস্ত করেছেন:
আর যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের (আকছারা মান ফিল আরদ্বি) আনুগত্য করো, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা তো কেবল ধারণার (জন্ন) অনুসরণ করে এবং তারা কেবল অনুমানভিত্তিক কথা বলে। (৬:১১৬)
গভীর অনুধ্যান: এই আয়াতের শব্দগত বিন্যাস লক্ষ্য করুন। আল্লাহ রব্বুল আলামিন এখানে বলে দিয়েছেন যে, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের সিদ্ধান্ত বা পছন্দ ওহী-ভিত্তিক হয় না; বরং তা হয় ‘জন্ন’ (ظَنّ - ধারণা) এবং অনুমানভিত্তিক। অতএব, ফুটবল বা অন্য কোনো উন্মাদনায় বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের সমর্থন প্রমাণ করে না যে তা সত্য বা কল্যাণকর; বরং ওহীর ৬:১১৬ আয়াত অনুযায়ী তা একটি গণ-বিভ্রান্তির (Mass delusion) রূপ হতে পারে।
■ প্রচুর অপবিত্রতা বনাম পবিত্রতার সত্যতা:
সংখ্যাধিক্যের প্রাচুর্য অনেক সময় মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। কিন্তু ওহীর মানদণ্ডে পরিমাণ (Quantity) নয়, বরং মান (Quality) ও উপাদানই প্রধান। আল্লাহ সু.তা. বলেন:
“বলো, অপবিত্র/মন্দ (খবীছ) এবং পবিত্র/উত্তম (তায়্যিব) সমান নয়, যদিও মন্দ/ অপবিত্রের আধিক্য (কাছরাতুল খবীছ) তোমাকে চমৎকৃত/ মুগ্ধ করে। সুতরাং হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (৫:১০০)
এই আয়াতের ওহী-ভিত্তিক শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট। গ্যালারিতে কোটি কোটি মানুষের গর্জন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগ দেখে প্রতারিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যা ওহীর মানদণ্ডে ‘খবীছ’ বা অপবিত্র (অনর্থক সময় নষ্ট, নগ্নতা, জুয়া, অহংকার), তা কোটি কোটি মানুষ পছন্দ করলেও ওহীর কাছে তা বর্জনীয়।
■ আল-কুরআনের দর্পণে ‘অধিকাংশ মানুষের’ চিত্র:
আল-কুরআন মাজীদে ‘আকছারান-নাস’ (أَكْثَرَ النَّاسِ - অধিকাংশ মানুষ) শব্দটি যেখানেই এসেছে, সেখানে তাদের নেতিবাচক গুণাবলীই প্রকাশিত হয়েছে। ওহীর এই ‘নজম’ ও ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
১. অধিকাংশ মানুষ সত্য জানে না: “কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না (লা ইয়া’লামূন)।” (৭:১৮৭, ১২:২১, ৩০:৩০)
২. অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনে না: “আর অধিকাংশ মানুষই ঈমান আনয়নকারী নয়, যদিও তুমি তা তীব্রভাবে আকাঙ্ক্ষা করো।” (১২:১০৩)
৩. অধিকাংশ মানুষ অকৃতজ্ঞ: “কিন্তু অধিকাংশ মানুষ শুকরিয়া আদায় করে না (লা ইয়াশ কুরূন)।” (২:২৪৩, ১২:৩৮)
৪. অধিকাংশ মানুষ ওহী বিমুখ: “কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এই কুরআনকে অস্বীকার করা ছাড়া ক্ষান্ত হলো না।” (১৭:৮৯)
ওহীর এই সুসংগত প্রকাশ প্রমাণ করে যে, সত্যের প্রকাশ সর্বদা একটি বিশেষ ও সচেতন দলের মাধ্যমে ঘটে, অন্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে নয়।
■ বিপরীতমুখী চিত্র: ‘ক্বালীল’ বা স্বল্প সংখ্যক সত্যনিষ্ঠ বান্দা:
সংখ্যাধিক্যের বিপরীতে ওহী যাদের প্রশংসা করেছে, তারা সংখ্যায় সর্বদা কম। আল-কুরআনের ভাষায় এদের বলা হয় ‘ক্বালীল’ (قَلِيلٌ - অল্প সংখ্যক)।
ধন্যবাদ জ্ঞাপনকারী অল্প: “আর আমার বান্দাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই শুকরগুজার (ক্বালীমিন ‘ইবাদিয়াশ শাকুর)।” (৩৪:১৩)
ঈমানদারদের স্বল্পতা: “তবে তারা ব্যতীত যারা ঈমান এনেছে ও নেক আমল করেছে; আর তারা সংখ্যায় খুবই কম (ওয়া ক্বালী মা হুম)।” (৩৮:২৪)
জান্নাতী অগ্রগামীদের স্বল্পতা: “পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে একটি বড় দল, আর পরবর্তীদের মধ্য থেকে অল্প কিছু (ক্বালী মিনাল আখিরীন)।” (৫৬:১৩-১৪)
আধ্যাত্মিক অনুধ্যান: যারা ওহীর চর্চা বা অনুশীলনীতে থাকে, তারা কখনোই সংখ্যার শক্তিতে বলীয়ান হতে চায় না; তারা বলীয়ান হয় ওহীর ‘বুরহান’ বা অকাট্য প্রমাণের শক্তিতে (২:১১১)।
আল-কুরআনের সামগ্রিক দালিলিক পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয় যে:
১. সত্য ও সুন্দরের মাপকাঠি কোনো ভোটাভুটি বা জনমত নয়, বরং ওহীর নাযিলকৃত আইন ও নীতি (৬:১১৪)।
২. অধিকাংশ মানুষ যখন কোনো ফিতনা বা আমোদ-প্রমোদে মত্ত হয়, ওহীর নীতি অনুযায়ী তা পথভ্রষ্টতার ইঙ্গিত দেয় (৬:১১৬)।
৩. পরিমাণের চেয়ে উপাদানের পবিত্রতা (তায়্যিব) পরম সত্য (৫:১০০)।
সুতরাং, বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষ ফুটবল টুর্নামেন্ট বা অন্যান্য অনর্থক উম্মাদনায় ভেসে যাচ্ছে বলেই তা দ্বীন বা সত্যের দৃষ্টিতে ‘সুন্দর’ হতে পারে না। ওহীর সংযোগে থাকা সচেতন মুমিন স্রোতে গা ভাসায় না, বরং সে সেই ‘ক্বালীল’ বা অল্প সংখ্যক সত্যনিষ্ঠদের দলে শামিল হতে সচেষ্ট থাকে, যাদের প্রশংসায় আল-কুরআন মুখরিত।
নিউজ-নাবা:
■ পার্থিব জীবনের স্বরূপ: ‘লা’ইব’ ও ‘লাহউ’ এর মনস্তত্ত্ব:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন আল-কুরআন মাজীদে পার্থিব জীবনের একটি স্তরভিত্তিক সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তিনি বলেন:
“জেনে রেখো, পার্থিব জীবন কেবল খেল-তামাশা (লা’ইব), চিত্তবিনোদন (লাহউ), জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব-অহংকার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।” (৫৭:২০)
এই আয়াতে শব্দগত বিন্যাসটি অত্যন্ত সুক্ষ্ম। এখানে প্রথম দুটি শব্দ হলো ‘লা’ইব’ (لَعِبٌ - খেলাধুলা) এবং ‘লাহউ’ (لَهْوٌ - চিত্তবিনোদন)। ওহীর পরিভাষায় ‘লা’ইব’ হলো এমন কাজ যার কোনো গঠনমূলক লক্ষ্য নেই, আর ‘লাহউ’ হলো এমন বিষয় যা মানুষকে তার প্রকৃত দায়িত্ব ও অবশ্যকরণীয় কাজ থেকে বিমুখ করে রাখে। ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে যে উম্মাদনা, তা মানুষকে এক ঘোর বা ঘোরের (intoxication) মধ্যে উম্মাদনায় নিমজ্জিত করে, যা তাকে রব্বুল আলামিনের স্মরণ ও মহাজাগতিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়।
■ অশ্লীলতার প্রসার ও চরিত্রহননের আয়োজন:
বর্তমানের খেলাধুলার উম্মাদনার সাথে গ্যালারি থেকে পর্দা পর্যন্ত যে ধরণের পোশাক ও আচরণের প্রচার করা হয়, তা সরাসরি ওহী-ঘোষিত ‘ফাহিশাহ’ বা অশ্লীলতার অন্তর্ভুক্ত। এর সাথে যুক্ত থাকে অবৈধ বাণিজ্যের নানাবিধ রূপ—যা মানুষের নৈতিক সত্তাকে ধ্বংস করে তাকে কেবল একটি জৈবিক ভোগবাদী পণ্যে রূপান্তর করে।
■ এসব অহেতুক কাজ-কর্মে একজন মুমিন রত থাকতে পারে কি?
বৈশ্বিক ইভেন্টগুলোর প্রচারণা ও তার পেছনে মানুষের যে সময় ব্যয় হয়, তা আল-কুরআনের বর্ণিত ‘অনর্থক কর্ম ’-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আল্লাহ সু.তা. বলেন:
“আর যারা অনর্থক কথা ও কাজ (লাগো) থেকে বিমুখ থাকে।” (২৩:৩)
■ যে বা যারা গাফেল (অমনোযোগী):
মানুষের জন্য তাদের হিসাব নিকটবর্তী হয়ে গেছে, অথচ তারা উদাসীনতার মধ্যে, বিমুখ। তারা সেটা শুনেছে ব্যতিরেকে তাদের কাছে তাদের রবের পক্ষ থেকে নতুন কোনো উপদেশ আসেনি। অথচ তারা খেলায় মেতে আছে; তাদের অন্তরগুলো অমনোযোগী অবস্থায়.... -আয়াত ২১:১-৩
■ সৃষ্টির উদ্দেশ্য বনাম নিরর্থক আমোদ:
■ ব্যয় ও অপচয়: শয়তানের ভ্রাতৃত্বের হাতছানি নয়তো?
■ যেখানে গোল আর স্কোর নিয়েই প্রতিযোগিতার নেশা ও আত্মবিস্মৃতি:
■ সাপোর্ট-অনুসরণ আর ভালোবাসা কতটুকু?
■ ক্রীড়া-কৌতুকে মত্তদের পরিচয় (সামিদূন):
যারা জীবনের মূল লক্ষ্য ভুলে দিন-রাত বিনোদন ও খেলাধুলা নিয়ে পড়ে থাকে, আল-কুরআন তাদের তিনটি সুনির্দিষ্ট পরিচয় তুলে ধরেছে:
১. দ্বীনকে খেল-তামাশা হিসেবে গ্রহণকারী:
“আর তাদের বর্জন করো, যারা তাদের জীবনবিধানকে (দ্বীন) খেল-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুক (লাহ্-ওয়ান ওয়া লা’ইবান) হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং পার্থিব জীবন যাদেরকে প্রতারিত করে রেখেছে।” (৬:৭০)
২. সত্যবিমুখ ও উপহাসকারী:
“আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যারা ‘লাহওয়াল হাদীস’ (অসার আমোদ-প্রমোদ) ক্রয় করে, যাতে জ্ঞানহীনভাবে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে; তারাই ওটাকে উপহাসের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে।” (৩১:৬)
৩. নিদ্রিত ও গাফেল রূহ:
আল্লাহ সু.তা. ঐ সব লোকের কথা বলেছেন, যারা ওহীর বাণী পড়ার সময় বা শোনার সময় তা গুরুত্ব না দিয়ে আমোদ-প্রমোদ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আল্লাহ বলেন:
“তবে কি তোমরা এই বাণীতে (কুরআনে) বিস্ময় বোধ করছ? এবং তোমরা হাসছ, কাঁদছ না? অথচ তোমরা আমোদ-প্রমোদে (সামিদূন) মত্ত আছো?” (৫৩:৫৯-৬১) এখানে ‘সামিদূন’ (سَامِدُونَ) শব্দের অর্থ হলো উদাসীন এবং নিরর্থক খেলাধুলায় নিমগ্ন ব্যক্তি।
■ বিনোদনে মত্ত ব্যক্তিদের শোচনীয় পরিণতি:
যারা ওহীর সংযোগ ছেড়ে খেলাধুলা ও জাগতিক প্রতিযোগিতার পিছে জীবন বিলিয়ে দেয়, তাদের জন্য আল-কুরআন তিনটি স্তরে পরিণতির ঘোষণা দিয়েছে:
➥ আমলসমূহের নিস্ফলতা: তারা মনে করে তারা অনেক বড় বড় কাজ করছে, কিন্তু ওহীর মানদণ্ডহীন এসকল প্রচেষ্টা কিয়ামতের দিন ধূলিকণার মতো উড়ে যাবে (১৮:১০৪-১০৫)।
➥ বিস্মৃতি ও লানত: আল্লাহ বলেন, “আজ আমি তাদের ভুলে যাব (বর্জন করবো), যেমন তারা এই দিনের সাক্ষাতের কথা ভুলে গিয়েছিল এবং তারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করতো।” (৭:৫১)
➥ সংকীর্ণ জীবন ও অন্ধত্ব: যারা ওহীর জিকির ছেড়ে দিয়ে বিনোদনের ঘোরে থাকে, দুনিয়াতে তাদের মনে শান্তি থাকবে না (মা’ঈশাতান ধাংকা) এবং কিয়ামতের দিন তারা অন্ধ অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে (২০:১২৪)।
■ চিন্তা ও অনুধাবনের অক্ষমতা:
উম্মাদনার আতিশয্যে মানুষ যখন তার বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে কেবল ভিড়ের বা দলের অনুগামী হয়, ওহী তাকে পশুর স্তরের সাথে তুলনা করেছে:
“তাদের অন্তর আছে কিন্তু তারা তা দিয়ে অনুধাবন করে না; তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও অধিক পথভ্রষ্ট।” (৭:১৭৯)
গ্যালারিতে বা পর্দার সামনে বসে থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষের ‘যৌথ উন্মাদনা’ অনেক সময় সত্যকে দেখার চোখ বন্ধ করে দেয়। ওহীর সংযোগে থাকা ব্যক্তি ভিড়ের অংশ না হয়ে নিজের ‘বিবেক’ (ফুয়াদ) ব্যবহার করে প্রতিটি সেকেন্ডের মূল্য অনুধাবন করে।
■ প্রিয় বস্তুর ভুল অগ্রাধিকার (অনুকরনের উম্মাদনায় জার্সি বা পতাকা/ চুলের স্টাইল):
যদি বিনোদন বা প্রিয় খেলোয়াড় বা দলের প্রতি ভালোবাসা আল্লাহর নির্দেশিত পথের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, তবে ওহীর আল্টিমেটাম হলো:
বলো! তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা... তোমাদের আত্মীয়-স্বজন... এবং তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যা বন্ধ হওয়ার ভয় করো এবং তোমাদের প্রিয় ঘরবাড়ি—আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর পথে সংগ্রামের চেয়ে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত (৯:২৪)
আধ্যাত্মিক অনুধ্যান: এখানে ‘প্রিয় বস্তু’র তালিকায় বর্তমানের ‘বিনোদন’ বা ‘গর্বের প্রতীক’ (দলের জার্সি বা পতাকা) ইমপ্লাইড বা অন্তর্নিহিতভাবে যুক্ত। যদি এই আসক্তিগুলো ওহীর অনুশীলনীতে বাধা দেয়, তবে তা ধ্বংসের কারণ হতে পারে।
■ ট্রফি প্রাপ্তি (ফাউজ):
টুর্নামেন্ট শেষে একটি ট্রফি জেতাকে ‘বিশাল জয়’ বলা হয়, কিন্তু ওহী জয়ের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে অন্যভাবে:
“পার্থিব জীবন তো কেবল প্রবঞ্চনার সামগ্রী। অতঃপর যাকে আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই হবে প্রকৃত সফল (ফাউজ)।” (৩:১৮৫)
৯০ মিনিটের একটি খেলার জয়-পরাজয় যেখানে মানুষের রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, সেখানে অনন্তকালের এই ‘ফাউজ’ বা মহা-সাফল্য নিয়ে মানুষের নির্লিপ্ততা এক চরম বৈপরীত্য।
■ চেক এন্ড ব্যালেন্স:
আল-কুরআন মাজীদের আয়াতসমূহ পারস্পরিক সংযুক্ত করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, বিনোদন বা খেলাধুলা ততক্ষণই গ্রহণযোগ্য যতক্ষণ তা মানুষকে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য (তাকওয়া ও আল্লাহর স্মরণ) থেকে বিচ্যুত করে না। কিন্তু যখন তা উম্মাদনায় রূপ নেয়, বিপুল সময়ের অপচয় ঘটায় এবং অনর্থক গর্ব-অহংকারের (৫৭:২০) জন্ম দেয়, তখন তা ওহীর মানদণ্ডে ‘ক্ষতিগ্রস্তদের’ আমল হিসেবে গণ্য হতে পারে।
প্রকৃত সফলতা কেবল ওহীর সংযোগ অনুশীলনীতে এবং ‘লাগো’ বা অনর্থক কাজ বর্জনের মধ্যেই নিহিত। জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটি সুযোগ, যা কেবল খেলার জন্য নয়, বরং ‘এক অক্ষয় বাণিজ্যের’ (৩৫:২৯) প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য দেওয়া হয়েছে।
আল-কুরআন মাজীদের এই সুগভীর নজম বা বিন্যাস আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মানুষ যখন ওহীর ‘রূহ’ বা প্রাণশক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন সে তুচ্ছ একটি বলের পেছনে বা ১১ জন মানুষের দৌড়ানোর পেছনে নিজের জীবনের মহামূল্যবান সময় ও আবেগ বিলিয়ে দেয়। ওহীর চর্চা আমাদের শেখায় যে, আমরা এই পৃথিবীতে দর্শক হতে আসিনি, বরং আমরা এসেছি আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে ইনসাফ কায়েম করতে। জীবনের এই ম্যাচটি একবারই খেলা যায়, যেখানে কোনো ‘অতিরিক্ত সময়’ বা ‘রি-প্লে’ (return) পাওয়ার সুযোগ নেই (২৩:৯৯-১০০)।
অনুধাবন:
আল-কুরআনের এই সুগভীর নজম বা বিন্যাস বিশ্লেষণ করলে এটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, বিনোদন বা খেলাধুলা কেবল তখনই আজাব বা ধ্বংসের কারণ হয়, যখন তা ৬২:১১ আয়াত অনুযায়ী আল্লাহর স্মরণ ও ওহীর সংযোগ থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যারা ওহীকে বর্জন করে বিনোদনকে জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি বানিয়েছে, আল-কুরআন তাদের ‘প্রতারিত’ ও ‘অস্বীকারকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
জীবন কোনো স্টেডিয়ামের গ্যালারি নয়, বরং এটি একটি রণাঙ্গন যেখানে প্রতি সেকেন্ডের হিসাব দিতে হবে। যারা ৯:২৪ আয়াত অনুযায়ী ওহীর চেয়ে নিজের প্রিয় শখ বা বিনোদনকে বেশি ভালোবাসে, তাদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য।
■ সময় ও সংকল্পের সুরক্ষায় প্রাসঙ্গিক কুরআনি দুআসমূহ/সত্যের ওপর অবিচল থাকা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের ফিতনা থেকে মুক্তির প্রাসঙ্গিক কুরআনি দুআসমূহ:
আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের অন্তরকে নিরর্থক কাজ থেকে রক্ষা করে তাঁর নূরে সিক্ত রাখুন:
✧ দুআ-১ (অন্তরকে সত্যে সুদৃঢ় রাখার আরজি):
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَإِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
উচ্চারণ: রব্বানা লা তুযিগ ক্বুলূবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাবলানা মিল্লাদুনকা রহমাহ; ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্হাব। (৩:৮)
✧ দুআ-২ (নিষ্ফল আমল থেকে মুক্তি ও সঠিক পথের প্রার্থনা):
رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَافِتْنَةً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَالْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
উচ্চারণ: রব্বানা লা তাজ’আলনা ফিতনাতাল লিল্লাযীনা কাফারূ ওয়াগফির লানা রব্বানা; ইন্নাকা আনতাল ‘আযীযুল হাকীম। (৬০:৫)
✧ দুআ-৩ (পার্থিব মোহের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির অগ্রাধিকার):
رَبَّنَا آتِنَا مِنلَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا
উচ্চারণ: রব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রহমাতান ওয়া হাইয়্যি’ লানা মিন আমরিনা রাশাদা। (১৮:১০)
✧ দুআ-৪ (শয়তানি প্ররোচনা থেকে আশ্রয়):
رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِالشَّيَاطِينِ وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونِ
উচ্চারণ: রব্বি আউযুবিকা মিন হামাযাতিশ শায়াত্বীন; ওয়া আউযুবিকা রব্বি আই ইয়াহ্দুরূন। (২৩:৯৭-৯৮)
দুআ-৬ (হেদায়াতের নূরের প্রার্থনা):
رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
উচ্চারণ: রব্বানা আতমিম লানা নূরানা ওয়াগফির লানা; ইন্নাকা ‘আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।
অর্থ: “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পূর্ণ করে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন; নিশ্চয়ই আপনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (৬৬:৮)
(সৃষ্টির রহস্য অনুধাবন ও নিরর্থকতা থেকে মুক্তি):
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: রব্বানা মা খালাক্বতা হাযা বাত্বিলা; সুবহানাকা ফাক্বিনা আযাবান নার।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এসব নিরর্থক সৃষ্টি করেননি; আপনি অতি পবিত্র, সুতরাং আপনি আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। (৩:১৯১)
পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে সুরক্ষা:
رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ
উচ্চারণ: রব্বানা ফাগফির লানা যুনুবানা ওয়া কাফ্ফির আন্না সাইয়িআতিনা ওয়া তাওয়াফ্ফানা মা‘আল আবরার। (৩:১৯৩)
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদের মন্দ কাজগুলো মুছে দিন এবং নেককারদের সাথে আমাদের মৃত্যু দিন।
(পার্থিব জীবনের মোহ থেকে মুক্তি ও কল্যাণের প্রার্থনা):
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ; ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ; ওয়া ক্বিনা আযাবান নার।
অর্থ: “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।” (২:২০১)
সাদাকাল্লাহু ওয়া রাসূলুহ (৩৩:২২)
