আমি কী পথভ্রষ্ট? -কী বলেন আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল? Who is actually misguided?

আমার এক প্রিয় সহকর্মী—যিনি উচ্চশিক্ষিত এবং দুনিয়াবী পদমর্যাদায়ও যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত—তাঁকে (আয়াত ৭:৩ এবং ৫০:৪৫-এর আলোকে) একমাত্র আল-কুরআন অনুসরণ এবং এর নির্দেশনা অনুযায়ী ইবাদত-বন্দেগি করার আহ্বান জানালে তিনি আমাকে বলেন, আমি নাকি পথভ্রষ্ট হয়ে গেছি এবং আমাকে নতুন করে কালিমা পড়তে হবে—ইত্যাদি।

এ কথা শুনে আমি বিচলিত না হয়ে বরং আশ্বস্ত হয়েছি। কারণ, এর উত্তর আমার রব এবং তাঁর রাসূল (সা.)-এর মাধ্যমে কুরআনেই পূর্বেই দিয়ে রেখেছেন:

বলুন! সাক্ষ্য হিসেবে কোন জিনিস সবচেয়ে বড়? বলুন, আল্লাহ। তিনি আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী। আর আমার প্রতি এই কুরআন ওহি করা হয়েছে, যাতে এর দ্বারা আমি তোমাদেরকে এবং যার কাছেই এটি পৌঁছবে, তাকে সতর্ক করতে পারি।" -সূরা আল-আন'আম ৬:১৯ (আরও দেখুন: ৬:৫০, ৭:২০৩, ১০:১৫, ৩৩:২, ৪৬:৯)

এসব আয়াতে আল্লাহর রাসূল (সা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে তিনি শুধুমাত্র তাঁর প্রতি নাযিলকৃত ওহির কিতাব আল কুরআনই অনুসরণ করেন

তাহলে প্রশ্ন হলো, আল্লাহর রাসূল (সা.) যদি কেবল নাযিলকৃত ওহি—অর্থাৎ আল-কুরআন—অনুসরণ করে থাকেন, তবে তিনি কি (মা'আযাল্লাহ) পথভ্রষ্ট ছিলেন?

এ ঘটনা আমাদের ভাবতে শেখায় যে, যখন মানুষের রচিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা বা মতবাদ আল্লাহর সুস্পষ্ট বাণীর ওপর প্রাধান্য পায়, তখন মানুষ অজান্তেই কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণার বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করে বসতে পারে। তাই প্রত্যেক বিশ্বাস ও আমলকে আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবের আলোকে যাচাই করা অপরিহার্য।

নিচের দিকে ভিডিও রয়েছে:

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। 

সম্মানিত পাঠক! মানুষের তৈরি সংজ্ঞায় ‘পথভ্রষ্টতা’ বা ‘দালাল’ (ضلال) শব্দটির অর্থ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর কিতাবে হেদায়েত ও পথভ্রষ্টতার এক অকাট্য এবং চিরন্তন মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যখন কোনো মানুষ আল্লাহর নাযিলকৃত ওহীর পরিবর্তে অন্য কোনো কিতাব, প্রথা বা মানুষের তৈরি মতাদর্শকে দ্বীনের ভিত্তি বানায়, তখন ওহীর দৃষ্টিতে সে-ই প্রকৃত পথভ্রষ্ট।

একমাত্র নাযিলকৃত ওহীর কিতাব তথা আল কুরআনই অনুসরণ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে: অন্য কারো কিছু নয়:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন যে, অনুসরণের ক্ষেত্রটি কেবল ওহীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে: “তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ করো এবং তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো অভিভাবকের (আউলিয়া) অনুসরণ করো না। তোমরা খুব সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করো।” (৭:৩)

অনুধাবন:  এই আয়াতে ‘মা উনযিলা ইলাইকুম’ (যা তোমাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে) শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আল্লাহ সু.তা. ‘একমাত্র’ উৎস হিসেবে ওহীকে নির্ধারণ করেছেন। যখন কেউ ওহীর সমান্তরালে অন্য কোনো ‘হাদিস’ বা ‘আউলিয়া’র (মনুষ্য রচিত নির্দেশিকা) কথা বলে, তখন সে ৭:৩ আয়াতের সরাসরি বিরুদ্ধাচরণ করে। ওহীর দৃষ্টিতে এটিই হলো বিচ্যুতি বা দালালের সূচনা।

একমাত্র আল কুরআন অনুসরন করলে No Tension:

আয়াত ২:৩৮

আমরা বললাম, তোমরা সবাই সেখান থেকে নেমে যাও। এরপর যখন তোমাদের কাছে আমার থেকে কোনো নির্দেশনা (হুদা) আসবে, এরপর যারা আমার নির্দেশনা (হুদা) অনুসরণ করবে, তখন তাদের ওপর কোনো ভয় নেই আর তারা দুঃখিত হবে না। (2:38)

(বর্তমান মানবজাতির জন্য আল-কুরআনই আল্লাহপ্রদত্ত চূড়ান্ত ও সংরক্ষিত হিদায়াতের কিতাব: দ্র: আয়াত ২:১৮৫, ১৭:৯, ২:২, ২৭:১-২, ৪১:৪৪, ১০:৫৭)

একমাত্র হুদা তথা আল কুরআনের বাইরে সব পথভ্রষ্টতা: 

বর্তমান মানবজাতির জন্য আল-কুরআনই আল্লাহপ্রদত্ত চূড়ান্ত ও সংরক্ষিত হিদায়াতের কিতাব: দ্র: আয়াত ২:১৮৫, ১৭:৯, ২:২, ২৭:১-২, ৪১:৪৪, ১০:৫৭

আল-কুরআনের ভাষায় হিদায়াতের বিপরীত হলো ‘দালালাহ’ (ভ্রষ্টতা)। যারা আল্লাহর হিদায়াত পরিত্যাগ করে অন্য পথ গ্রহণ করে, তারা ভ্রষ্টতায় পতিত হয়। (২:১৬, , ১৭:১৫, ২:১৭৫; ৭:৩০)

একমাত্র সত্য (হক) তথা আল কুরআনের বাইরে সব পথভ্রষ্টতা

আল্লাহ রব্বুল আলামিন সত্য (হক) ও পথভ্রষ্টতার (দালাল) মাঝে কোনো তৃতীয় পথ রাখেননি: আল-কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ 'হক' (ধ্রুব সত্য) (২:১৪৭; ৩২:৩; ৩৫:৩১, 3:60, 3:62, 47:2, 42:24, 10:94)

“অতঃপর সত্যের (হক) পর পথভ্রষ্টতা (দালাল) ছাড়া আর কী থাকে? সুতরাং তোমরা কোথায় ফিরে যাচ্ছ?” -১০:৩২ (47:2)

আয়াত-সংযোগ: ওহীর দর্পণে আল-কুরআন হলো ‘হক’ বা ধ্রুব সত্য। ১০:৩২ আয়াতের লজিক অনুযায়ী, যদি কেউ ওহীর এই সত্য থেকে এক চুলও বিচ্যুত হয়ে অন্য কোনো উৎসের দিকেধাবিত হয়, তবে সে অবধারিতভাবে পথভ্রষ্টতার (দালাল) বলয়ে প্রবেশ করে। এখানে ‘অন্যহাদিস’ বা ‘বাপ-দাদার প্রথা’ হক-এর অন্তর্ভুক্ত নয়।

একমাত্র ওহী বিমুখতার পরকালীন অন্ধত্ব  ও পথভ্রষ্টতা:

হেদায়াত অনুসরণকারী এবং ওহী বিমুখদের পরিণতি ওহীর নজম-এ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে:

“অতঃপর যদি আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কোনো হেদায়াত আসে, তবে যে আমার হেদায়াত অনুসরণ করবে সে পথভ্রষ্ট (ইয়াযিল্লু) হবে না এবং দুর্ভোগেও পড়বে না। আর যে আমার স্মরণ (যিকর/ওহী) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে এক সংকীর্ণ জীবন এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় উঠাবো।” (২০:১২৩-১২৪)

গভীর অনুধ্যান: ২০:১২৪ আয়াতে ‘যিকর’ শব্দটি আল-কুরআনের সমার্থক (১৫:৯)। ওহীর চর্চা বাদ দিয়ে যারা অন্য কিতাবের চর্চা করে, তারা মূলত আল্লাহর ‘যিকর’ থেকে বিমুখ। এর পরিণাম হলো দুনিয়াতে মানসিক ও আধ্যাত্মিক সংকীর্ণতা এবং পরকালে ওহীর আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে অন্ধ হয়ে থাকা।

লেটেস্ট ভার্সন হিসাবে সালামুন আলা মুহাম্মদের (সা:) উপর নাযিলকৃত একমাত্র অহীর কিতাব (আল কুরআন) -এর বাইরে দ্বীনের নামে সব অনাযিলকৃত কিতাব/মতামত/ মতাদর্শ বাতিল ঘোসণা করা হয়েছে এবং ওসব কাফিররা অনুসরন করে থাকে:

 দ্র: আয়াত ৪৭:২-৩, ১৭:৮০-৮১, ৫:৪৮, ৬:১১৪-১১৫ 

সরল পথ (সিরাত) বনাম বহুমুখী ভ্রষ্টতা:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর পথকে ‘একবচন’ (সিরাত) এবং অন্য পথগুলোকে ‘বহুবচন’ (সুবুল) হিসেবে উল্লেখ করেছেন: 

“আর এটিই আমার সরল পথ; সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করোএবং অন্যান্য পথের (সুবুল) অনুসরণ করো না; তবে তা তোমাদের আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।” -৬:১৫৩ (6:114-115)

যৌক্তিক পূর্ণতা: আল-কুরআন হলো সেই একটি সরল পথ। হাদীসের নামে অসংখ্য মতভেদ,দল-উপদল এবং বিপরীতধর্মী বর্ণনাসমূহ হলো সেই ‘সুবুল’ বা বহুমুখী পথ, যা মানুষকে ওহীর মূল কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যারা ওহীর ওপর অটল থাকতে বলে তারা ৬:১৫৩ আয়াত অনুযায়ী সরল পথে আছে, আর যারা অন্য কিতাব যোগ করে তারা বিচ্ছিন্ন।

ওহীর হেদায়াত তথা আল কুরআনের বাইরের সবই নিজ  প্রবৃত্তি/ খেয়াল-খুশির অনুসরন বলে আল কুরআন ঘোসণা করেছে:

যারা ওহীর অকাট্য প্রমাণের পরিবর্তে অন্য কিতাব বা মতবাদের দোহাই দেয়, আল্লাহ তাদের ‘প্রবৃত্তি’র অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন: 

“অতঃপর তারা যদি তোমার ডাকে সাড়া নাদেয়, তবে জেনে রেখো—তারা তো কেবল নিজেদের প্রবৃত্তির (হাওয়া-আহুম) অনুসরণ করে। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো হেদায়াত (ওহী) ছাড়াই যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট (আদ্বাল্লু) আর কে?” (২৮:৫০)

আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ: এখানে ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়াত’ বলতে সরাসরি নাযিলকৃত ওহীকে বোঝানো হয়েছে (আল কুরআনকে হুদা তথা হিদায়েতের একমাত্র কিতাব বলা হয়েছে দ্র: 2:185, 17:9, 2:2, 27:1-2, 41:44, 10:57)। ২৮:৫০ আয়াত প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কিতাব ছাড়া অন্য যেকোনো সূত্রের অনুসরণ মূলত ‘প্রবৃত্তি’র পূজা। আর এই প্রবৃত্তি অনুসরণকারীকেই আল্লাহ ‘সবচেয়ে বড় পথভ্রষ্ট’ বলে ঘোষণা করেছেন।

অন্যকোন হাদিস হোক আর যা-ই হোক নাযিলকৃত অহীর বাইরে গেলেই কাফির-জালিম-ফাসিক: (আইনি সার্বভৌমত্ব):

যারা ওহীর বিধান ত্যাগ করে মানুষের তৈরি বিধান বা বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে ফয়সালা

দেয়, ওহী তাদের তিনটি কঠিন অভিধায় ভূষিত করেছে: 

১. কাফির: যারা ওহী অনুযায়ী ফয়সালা করে না (৫:৪৪)। 

২. জালিম: যারা ওহীর বিধান লঙ্ঘন করে অন্য প্রথা চালু করে (৫:৪৫)।

৩. ফাসিক: যারা ওহীর আনুগত্যের সীমা থেকে বেরিয়ে যায় (৫:৪৭)।

সুতরাং, আপনাকে যারা ‘পথভ্রষ্ট’ বলছেন, তারা মূলত ওহীর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদেরই সেই চিত্র দেখছেন। কারণ ওহীর জ্ঞান অনুযায়ী, আল্লাহর কিতাবকে পরিত্যক্ত (২৫:৩০) করে অন্য কোনো সূত্রের অনুসরণ করাই হলো চরম ‘দালাল’ বা পথভ্রষ্টতা।

‘হাদীস’ শব্দের বিপরীতে ওহীর শ্রেষ্ঠত্ব : কুরআনই একমাত্র হাদীস:

মানুষ যখন ওহী বহির্ভূত ‘হাদীস’ বা বর্ণনার দোহাই দিয়ে আপনাকে পথভ্রষ্ট বলে, তখন ওহীর এই অকাট্য প্রশ্নটি তাদের সামনে একটি মহাজাগতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়ায়:

“এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি আপনার কাছে সত্যসহ তেলাওয়াত করছি। অতঃপর আল্লাহ এবংতাঁর আয়াতের পর তারা আর কোন ‘হাদীসে’ (বর্ণনায়) ঈমান আনবে?” (৪৫:৬)

যৌক্তিক পূর্ণতা: এই আয়াতের নজম বা বিন্যাস নির্দেশ করে যে, আল্লাহ ও তাঁর ওহীর পর অন্য কোনো ‘হাদীস’ বা মানুষের তৈরি কিতাবকে বিশ্বাসের ভিত্তি বানানো ওহী বিমুখতা।

আল্লাহ নিজেই তাঁর কালামকে বলেছেন ‘আহসানাল হাদীস’ (أَحْسَنَ الْحَدِيثِ) বা শ্রেষ্ঠ বাণী (৩৯:২৩)। সুতরাং, শ্রেষ্ঠ বাণী ছেড়ে নিম্নমানের বর্ণনার দিকে যাওয়া ওহীর দৃষ্টিতে একটি প্রকাশ্য চ্যুতি।

আল-কুরআনকে ‘পরিত্যক্ত’ করার আইনি অভিযোগ:

কিয়ামতের দিন সালামুন আলা মুহাম্মাদ (সালামুন আলাইহে) কি তাঁর উম্মতের সপক্ষে কথা বলবেন? ওহী এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে:

“আর রসূল বলবে— ‘হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার কওম এই কুরআনকে ‘মাহজূরা’ (পরিত্যক্ত/বর্জনীয়) হিসেবে গ্রহণ করেছিল।’” (২৫:৩০)

অনুধ্যান: যারা কুরআনকে আলমারিতে সাজিয়ে রেখে অন্য কিতাবের অনুশীলনীতে মগ্ন থাকে, তারা এই ‘মাহজূরা’ বা বর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত। ওহীর এই ‘লিঙ্ক’ প্রমাণ করে যে, হাদীসের নামে অন্য কিতাবকে প্রাধান্য দিয়ে ওহী বর্জন করাই হলো সেই কাজ যার বিরুদ্ধে স্বয়ং রসূল (সালামুন আলাইহে) আল্লাহর কাছে নালিশ করবেন। এটিই পথভ্রষ্টতার চূড়ান্ত দলিল।

একটিমাত্র কিতাব আল কুরআন আমাদের জন্য: 

আল্লাহর নাযিলকৃত হিদায়াতকে কেন একমাত্র পথ বলা হয়েছে, তার মেটাফিজিক্যাল কারণ এখানে বর্ণিত:

আলিফ লাম র। একটি কিতাব, আমরা তা তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যেন তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকারসমূহ থেকে আলোর দিকে বের করে আনো, পরাক্রমশালী প্রশংসিতের পথের দিকে-14:1 (2:20

“অবশ্যই তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নূর (আলো) এবং একটি স্পষ্ট কিতাব এসেছে। যার মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথে (সুবুলাস সালাম) পরিচালিত করেন যারা তাঁর সন্তুষ্টি অনুসরণ করে এবং তিনি তাদের অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান।” -৫:১৫-১৬ (14:1)

এখানে নূর (আলো) হলো ‘একবচন’ আর অন্ধকার হলো ‘বহুবচন’। ওহীর বাইরে মানুষের তৈরি হাজারো মতবাদ ও কিতাব হলো সেই ‘অন্ধকার’। একটি আলো যেমন অন্ধকার দূর করতে যথেষ্ট, আল-কুরআনের নূরও তেমনি জীবনের সকল সমস্যার সমাধানে এককভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। অন্য কিতাবকে ওহীর সমকক্ষ করা মানে হলো আলোর পাশে অন্ধকারের দীপশিখা  জ্বালানোর বৃথা চেষ্টা।

মনগড়া  ইবাদত ‘সুলতান’ বা দলিলের অভাব: যার কোনো দলিল নাই:

মানুষ হাদীসের নামে অনেক এমন পরিভাষা ও আমল তৈরি করেছে যার কোনো ভিত্তি ওহীতে নেই। সালামুন আলা ইউসুফ (সালামুন আলাইহে)-এর ওহী-নির্দেশিত বক্তব্যটি এখানে প্রাসঙ্গিক:

“তোমরা তাঁকে ছেড়ে কেবল এমন কতগুলো নামের (আসমা) ইবাদত করছ, যা তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষেরা নামকরণ করেছ; এগুলোর সপক্ষে আল্লাহ কোনো দলিল (সুলতান) নাযিল করেননি।” (১২:৪০)

আধ্যাত্মিক সারমর্ম: দীনের নামে যেসব কথা বা কিতাবের সপক্ষে আল্লাহর কোনো ‘সুলতান’ বা ওহীর প্রমাণ নেই, তা অনুসরণ করা মানে হলো মরীচিকার পেছনে দৌড়ানো। ওহীর জ্ঞান আমাদের শেখায় যে, দলিলহীন আনুগত্যই পথভ্রষ্টতার মূল প্রবেশদ্বার।

আল-কুরআনের সমান্তরাল, সমকক্ষ বা এর বিরোধী কোনো দ্বীনি কিতাব (ধর্মীয় কর্তৃত্ব), মতবাদ বা কর্তৃত্ব অনুসরণ কুরআন সমর্থন করে কি?

সম্মানিত পাঠক! আল-কুরআন মাজীদ কেবল একটি পাঠ্যবই নয়, বরং এটি জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ রব্বুল আলামিন কর্তৃক নির্ধারিত একমাত্র ‘ফুরকান’ বা সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত মানদণ্ড। ওহীর এই মহাসমুদ্রে অবগাহন করলে আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহ সু.তা. এই কিতাবকে এমন এক সার্বভৌমত্ব দান করেছেন যার সমান্তরালে অন্য কোনো কিতাব, মানুষের তৈরি বর্ণনা বা কোনো ধর্মীয় কর্তৃত্বের অবস্থান অসম্ভব। যারা ওহীর পাশাপাশি অন্য কোনো উৎসকে ‘দীন’ বা হেদায়াতের মানদণ্ড বানায়, তারা মূলত আল-কুরআনের সেই অজেয় শ্রেষ্ঠত্বকেই অস্বীকার করে।

ওহীর সার্বভৌমত্ব ও বিচারিক মানদণ্ড:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন যারা ওহীর বাইরে ফয়সালা বা হেদায়াত তালাশ করে, তাদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন: “তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিচারক (হাকাম) তালাশ করবো, অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত কিতাব (কিতাবাম মুফাস্সালান) নাযিল করেছেন?”(৬:১১৪)

তাত্ত্বিক অনুধাবন: এখানে ‘হাকাম’ (বিচারক/ফয়সালাকারী) এবং ‘মুফাস্সালান’ (বিস্তারিত) শব্দ দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদি আল-কুরআন মাজীদ বিস্তারিত হয়, তবে তাকে বুঝতে বা ব্যাখ্যা করতে ওহী-বহির্ভূত অন্য কোনো কিতাবের মুখাপেক্ষী হওয়া মানে হলো আল্লাহর ‘বিস্তারিত’ হওয়ার দাবিকে পরোক্ষভাবে অস্বীকার করা। ওহীর জ্ঞান অনুযায়ী, আল্লাহর কিতাবই হলো চূড়ান্ত আইনি ও আধ্যাত্মিক সুপ্রিমেসি।

তাহাদ্দী বা অনন্যতার চ্যালেঞ্জ:

আল-কুরআন মাজীদ তার সত্যতা প্রমাণের জন্য মানবজাতি ও জিনজাতিকে এক অকাট্য চ্যালেঞ্জ দিয়েছে, যা প্রমাণ করে যে এর সমকক্ষ কিছু হওয়া অসম্ভব: “বলো, যদি মানুষ ও জিন এই কুরআনের অনুরূপ আনার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ আনতে পারবে না; যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়।” (১৭:৮৮)

অন্যত্র আল্লাহ বলেন: “আর আমি আমার বান্দার ওপর যা নাযিল করেছি তা নিয়ে যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে, তবে তোমরা তার মতো একটি সূরা (সূরাতুম মিন মিছলিহী) নিয়ে এসো।” (২:২৩)

অনুধাবন: এই ‘তাহাদ্দী’ বা চ্যালেঞ্জ কেবল ভাষাগত অলঙ্কার নয়, বরং এটি ‘কর্তৃত্বের’ চ্যালেঞ্জ। যদি কেউ দাবি করে যে অন্য কোনো কিতাব বা বর্ণনা (হাদীস) ওহীর সমতুল্য বা ওহী বুঝতে অপরিহার্য, তবে সে মূলত আল-কুরআনের এই অনন্যতাকে (Uniqueness) খাটো করছে। ওহীর সমান্তরালে কোনো বর্ণনা দাঁড় করানো মানেই হলো সেই চ্যালেঞ্জের বিপরীতে মানুষের তৈরি কিছুকে স্থান দেওয়া।

আল্লাহর আয়াতের পর কোন ‘হাদীসে’ বিশ্বাস? 

আল্লাহ রব্বুল আলামিন একটি অত্যন্ত গূঢ় ও তাত্ত্বিক প্রশ্ন করেছেন যা সকল সমান্তরাল উৎসের পথ রুদ্ধ করে দেয়: “এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি তোমার কাছে সত্যসহ তেলাওয়াত করছি। অতঃপর আল্লাহ এবং তাঁর আয়াতের পর তারা আর কোন হাদীসে (বর্ণনায়) ঈমান আনবে?” (৪৫:৬)

আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ: এখানে ‘হাদীস’ শব্দটি মানুষের তৈরি বর্ণনার বিপরীতে ব্যবহৃত হয়েছে। ওহীর নজম অনুযায়ী, আল্লাহর কালাম আসার পর আর কোনো বর্ণনার ভিত্তি থাকে না। যারা ‘হাদীসের’ নামে ওহীর সাথে সাংঘর্ষিক বা ওহীর অতিরিক্ত কোনো বিধান প্রবর্তন করে, তারা ৪৫:৬ আয়াতের সরাসরি অবাধ্যতা করছে।

বাপ-দাদার প্রথা বনাম নাযিলকৃত দলিল:

মানুষ কেন ওহীর সমান্তরালে অন্য কিতাব আঁকড়ে ধরে? ওহী এর মনস্তাত্ত্বিক কারণ বর্ণনা করেছে— তা হলো ‘ঐতিহ্য’ বা পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ। আল্লাহ বলেন: “তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ করো এবং তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো অভিভাবকের (আউলিয়া) অনুসরণ করো না।” (৭:৩)

সালামুন আলা ইউসুফ বলেছিলেন: “তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে কেবল  কতগুলো নামের (আসমা) ইবাদত করছ... এগুলোর সপক্ষে আল্লাহ কোনো দলিল (সুলতান) নাযিল করেননি।” (১২:৪০)। ওহীর দলিল (সুলতান) বিহীন যেকোনো কিতাব বা মতবাদ ওহীর দৃষ্টিতে কেবল ‘কল্পিত নাম’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

নিখুঁত পূর্ণতা ও কোনো বিচ্যুতি নেই:

আল-কুরআন মাজীদের পূর্ণাঙ্গতা সম্পর্কে রব্বুল আলামিন সার্টিফিকেট দিয়েছেন: “আমি এই কিতাবে কোনো কিছুই বাদ রাখিনি (মা ফাররাতনা ফিল কিতাবি মিন শাইয়িন)।” (৬:৩৮)

যৌক্তিক সংযোগ: যদি কোনো কিছুই বাদ না থাকে, তবে দীনের কোনো অংশ বা বিধানের জন্য ওহীর বাইরের কোনো কিতাবের দিকে হাত বাড়ানো কেন? এটি প্রমাণ করে যে, ওহীই স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর বাইরে যা কিছু হেদায়াত বা ধর্মের নামে প্রচলিত, তা মূলত ‘লাহওয়াল হাদীস’ (অসার কথাবার্তা), যা আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে (৩১:৬)।

আল-কুরআনের সামগ্রিক দালিলিক পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে এটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে:

১. ওহীর কিতাবটি ‘মুফাস্সাল’ বা বিস্তারিত (৬:১১৪)। 

২. এর কোনো সমকক্ষ বা সমান্তরাল উৎস হওয়া অসম্ভব এবং এটিই এর চিরন্তন চ্যালেঞ্জ (১৭:৮৮)। 

৩. ওহীর পাশাপাশি অন্য কোনো কিতাব বা মানুষের বাণীকে হেদায়েতের উৎস বানানো ওহী বিমুখতা (৪৫:৬)।

৪. আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কিতাব বর্জন করে মানুষের তৈরি বর্ণনার অনুসারী হওয়া ‘পথভ্রষ্টতা’ (দালাল) এর নামান্তর (২৮:৫০)।

সুতরাং, ওহীর চর্চা বা আল-কুরআনের সাথে সার্বক্ষণিক সংযোগে থাকাই হলো ঈমানের দাবি।যারা ওহীর আয়নার সামনে নিজেদের আত্মসমর্পণ করেছে, তাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট (২৯:৫১)।

সম্মানিত উপস্থিতি! আল-কুরআন মাজীদের এই সকল সুগভীর দালিলিক পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে আমরা একটি অখণ্ড ও অকাট্য সিদ্ধান্তে উপনীত হই: হিদায়াত এবং পথভ্রষ্টতার একমাত্র মানদণ্ড হলো নাযিলকৃত ওহীর সাথে মানুষের সম্পর্ক।

সুতরাং, আপনাকে যারা কুরআন অনুসরণের কারণে ‘পথভ্রষ্ট’ বলছে, তারা মূলত ওহীর আয়নার সামনে নিজেদেরই সেই করুণ চিত্র দেখছে যা আল-কুরআন চিত্রায়িত করেছে। ওহীর চর্চা বা আল-কুরআনের সাথে সার্বক্ষণিক সংযোগে থাকাই হলো ‘সিরাতাল মুস্তাকীম’ বা সরল পথ। যারা একমাত্র ওহীর ‘বুরহান’-এর ওপর অটল থাকে, কিয়ামতের দিন তারাই হবে সফল এবং নূরের অধিকারী।

 ওহীর সত্য ও হিদায়াতের ওপর অটল থাকা ও সত্যের সাক্ষ্য কামনায় প্রাসঙ্গিক দুআসমূহ:

  رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ

“হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি যা আপনি নাযিল করেছেন এবং আমরা রসূলের (সালামুন আলাইহে) আনুগত্য করেছি; সুতরাং আমাদের সাক্ষ্যদানকারীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুন।” ৩:৫৩

 حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ

— “আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; আমি তাঁরই ওপর ভরসা করেছি।” -9:129

الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلَاوَتِهِأُولَٰئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ — 

“যাদের আমি কিতাব দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে তেলাওয়াত করে; তারাই ওটার প্রতি ঈমান রাখে।” -2:121

 رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْآمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا ۚ رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا 

(রব্বানা ইন্নানা সামি’না মুনাদ ইয়াই ইয়ুনাদী লিল ঈমানি আন আমেনূ বিরাব্বিকুম ফা আমান্না...)

হে আমাদের রব! আমরা একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের দিকে আহ্বান করতে শুনেছি যে, তোমরা 

তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনো; অতঃপর আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব! আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন।” -3:193

হেদায়াত ও সত্যের ওপর অটল থাকার জন্য প্রাসঙ্গিক দুআসমূহ:

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের তাঁর নূরের সাথে সংযুক্ত রাখুন:

 رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ 

(রব্বানা লা তুযিগ ক্বুলূবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাবলানা মিল্লাদুনকা রহমাহ; ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্হাব) — “হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে বিচ্যুত করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।”-3:8

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدَانَا لِهَٰذَا وَمَا كُنَّا لِنَهْتَدِيَلَوْلَا أَنْ هَدَانَا اللَّهُ 

(আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী হাদানা লি-হাযা, ওয়ামা কুন্না লিনাহ্তাদিয়া লাওলা আন হাদানি-আল্লাহ) — “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের এ পথের হেদায়াত দিয়েছেন; আল্লাহ হেদায়াত না দিলে আমরা পথ পেতাম না।”

 سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ ۝ وَسَلَامٌعَلَى الْمُرْسَلِينَ ۝ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ۝ 

পবিত্রতা আপনার প্রতিপালকের, যিনি সকল সম্মানের অধিকারী; রসূলগণের ওপর সালাম বর্ষিত হোক। এবং সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের রব আল্লাহরই জন্য।” ৩৭:১৮০-১৮২

সাদাকাল্লাহু ওয়া রাসূলুহ (৩৩:২২)


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post