মানুষের দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ ও অভাবের সময় পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ: অভাবী, প্রতিবন্ধী, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি ইসলামের দায়িত্ব এবং অবহেলার পরিণতি!
ইসলাম শুধু আনুষ্ঠানিকতায় নামাজ, রোজা, হজ বা যাকাতের ধর্ম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলামে আল্লাহর হক আদায়ের পাশাপাশি বান্দার হক আদায়কেও অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন প্রকৃত মুমিন কেবল ইবাদতগুজার হলেই যথেষ্ট নয়; বরং সমাজের অসহায়, অভাবী, এতিম, প্রতিবন্ধী, মুসাফির ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোও তার ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কুরআনুল কারীমে বহু স্থানে আল্লাহ তাআলা মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে, অভাবীদের সাহায্য করতে এবং সমাজের দুর্বল মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে যারা এসব দায়িত্ব অবহেলা করে, তাদের জন্য কঠোর সতর্কবাণীও উচ্চারণ করেছেন।
১৩০ বছর বয়সি মায়ের একমাত্র অবলম্বন শতবর্ষী মেয়ে
১. সৎকাজে একে অপরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন,
"তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো; আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।"
(সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:২)
এই আয়াত ইসলামী সমাজব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থের সেবা করা, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, প্রতিবন্ধীকে সহায়তা করা, বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো—সবই "সৎকর্মে সহযোগিতা"-এর অন্তর্ভুক্ত।
২. প্রকৃত ধার্মিকতার পরিচয়
আল্লাহ বলেন,
"সৎকর্ম কেবল এই নয় যে, তোমরা পূর্ব বা পশ্চিম দিকে মুখ ফিরাবে; বরং প্রকৃত ধার্মিক সে, যে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতা, কিতাব ও নবীদের প্রতি ঈমান আনে এবং আল্লাহর ভালোবাসায় সম্পদ ব্যয় করে আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী এবং দাসমুক্তির জন্য..."
(সূরা আল-বাকারাহ, ২:১৭৭)
এই আয়াত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কেবল বাহ্যিক ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং অভাবী মানুষের জন্য নিজের সম্পদ ব্যয় করাই প্রকৃত নেকির অন্যতম পরিচয়।
৩. সমাজের দুর্বল মানুষের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন,
"আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করো না। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী, মুসাফির এবং তোমাদের অধিকারভুক্তদের প্রতি সদাচরণ করো।"
(সূরা আন-নিসা, ৪:৩৬)
এই আয়াতে একটি আদর্শ ইসলামী সমাজের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এখানে সমাজের প্রায় সব দুর্বল ও প্রয়োজনমন্দ মানুষের অধিকার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আজকের পৃথিবীতে এর মধ্যে প্রতিবন্ধী, বয়স্ক, রোগী, পথশিশু, আশ্রয়হীন, শরণার্থী এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও অন্তর্ভুক্ত।
৪. দরিদ্র মানুষের সম্পদের অধিকার
আল্লাহ বলেন,
"তাদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের নির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে।"
(সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:১৯)
আরও বলেন,
"এবং তাদের সম্পদে ছিল ভিক্ষুক ও বঞ্চিতের হক।"
(সূরা আল-মাআরিজ, ৭০:২৪–২৫)
অর্থাৎ গরিবের সাহায্য করা দয়া বা অনুগ্রহ নয়; বরং আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদে তাদেরও একটি অধিকার রয়েছে।
৫. দুর্ভিক্ষ ও সংকটকালে মানুষের পাশে দাঁড়ানো
আল্লাহ বলেন,
"কঠিন পথ কী, তুমি কি জানো? ... দুর্ভিক্ষের দিনে খাদ্য দান করা—নিকটাত্মীয় এতিমকে অথবা ধূলিধূসর দরিদ্রকে।"
(সূরা আল-বালাদ, ৯০:১২–১৬)
যখন সমাজে দুর্ভিক্ষ, বন্যা, মহামারী, যুদ্ধ বা অন্য কোনো দুর্যোগ আসে, তখন মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।
৬. এতিম ও দরিদ্রকে অবহেলার নিন্দা
আল্লাহ বলেন,
"তুমি কি তাকে দেখেছ, যে দ্বীনকে মিথ্যা বলে? সে-ই এতিমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দিতে উৎসাহিত করে না।"
(সূরা আল-মাউন, ১০৭:১–৩)
অর্থাৎ দরিদ্র মানুষের প্রতি উদাসীনতা ঈমানের দুর্বলতার লক্ষণ।
৭. জাহান্নামিদের স্বীকারোক্তি: আমরা মুসল্লিও ছিলাম না, অভাবীকেও খাদ্য দিতাম না:
আল্লাহ তাআলা জাহান্নামবাসীদের বক্তব্য তুলে ধরে বলেন,
"তোমাদেরকে কী জিনিস সাকার (জাহান্নামে) নিয়ে এসেছে?"
তারা বলবে,
"আমরা মুসল্লিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না।
এবং আমরা অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দিতাম না।
আমরা অসার আলোচনায় লিপ্তদের সঙ্গে লিপ্ত থাকতাম।
এবং আমরা প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করতাম।
অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু এসে গেল।"
(সূরা আল-মুদ্দাসসির, ৭৪:৪২–৪৭)
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, জাহান্নামিরা শুধু নামাজ না পড়ার কথা বলেনি; তারা এটিও স্বীকার করেছে যে তারা অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দিত না। অর্থাৎ মানুষের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব অবহেলাও জাহান্নামের কারণগুলোর একটি।
৮. সম্পদ জমিয়ে রাখা নয়, মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা
আল্লাহ বলেন,
"তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজেদেরকে নিজেদের হাতেই ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না; আর সৎকর্ম করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।"
(সূরা আল-বাকারাহ, ২:১৯৫)
৯. আত্মীয়, দরিদ্র ও মুসাফিরের অধিকার
আল্লাহ বলেন,
"আত্মীয়কে তার প্রাপ্য দাও, অভাবগ্রস্তকে দাও এবং মুসাফিরকেও দাও।"
(সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৬)
এটি দান নয়; বরং তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের নির্দেশ।
প্রতিবন্ধী, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি:
যদিও কুরআনে প্রতিটি ক্ষেত্রে "প্রতিবন্ধী" শব্দটি আলাদা করে ব্যবহৃত হয়নি, তবে ইসলামের ন্যায়বিচার, দয়া, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা অনুযায়ী প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ, অসুস্থ, কর্মক্ষমতাহীন এবং সমাজের সব দুর্বল মানুষ বিশেষ যত্ন ও সহযোগিতার অধিকারী।
তাদেরকে অবহেলা করা নয়; বরং সম্মান, সহানুভূতি ও সহযোগিতা করা একজন মুমিনের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
মানুষের দুঃখ-কষ্ট, অভাবী, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্পর্কে কুরআনের আরও আয়াত
১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অভাবীদের খাদ্যদান
"আর তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে। (তারা বলে,) আমরা তো কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের খাদ্য দিই; আমরা তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।"
— সূরা আল-ইনসান (৭৬:৮–৯)
এই আয়াতে নিঃস্বার্থ মানবসেবাকে ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
২. প্রিয় সম্পদ ব্যয় না করলে প্রকৃত নেকি অর্জিত হয় না
"তোমরা কখনো প্রকৃত নেকি অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় করো। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।"
— সূরা আলে ইমরান (৩:৯২)
৩. সম্পদ ব্যয়ের প্রকৃত ক্ষেত্র
"তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে, তারা কী ব্যয় করবে। বলুন, তোমরা যে সম্পদই ব্যয় করো তা হবে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরের জন্য..."
— সূরা আল-বাকারাহ (২:২১৫)
৪. দরিদ্রদের প্রতি অবহেলার নিন্দা
"কখনো নয়! বরং তোমরা এতিমকে সম্মান করো না, এবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দেওয়ার জন্য একে অপরকে উৎসাহিত করো না।"
— সূরা আল-ফাজর (৮৯:১৭–১৮)
এই আয়াতে সমাজের সম্মিলিত দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।
৫. আত্মীয়, মিসকিন ও মুসাফিরের অধিকার
"আত্মীয়কে তার প্রাপ্য দাও, অভাবগ্রস্তকে দাও এবং মুসাফিরকেও দাও। অপব্যয় করো না।"
— সূরা আল-ইসরা (১৭:২৬)
৬. দান গোপনে বা প্রকাশ্যে
"যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান করো তবে তা ভালো; আর যদি গোপনে অভাবীদের দাও তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।"
— সূরা আল-বাকারাহ (২:২৭১)
৭. অভাবীদের জন্য নিয়মিত ব্যয়
"যারা সুখে ও দুঃখে ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।"
— সূরা আলে ইমরান (৩:১৩৪)
৮. দানশীল নারী-পুরুষের পুরস্কার
"দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী এবং যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেয়, তাদের জন্য তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান।"
— সূরা আল-হাদীদ (৫৭:১৮)
৯. সম্পদ যেন শুধু ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে
"...যাতে সম্পদ তোমাদের ধনীদের মধ্যেই কেবল আবর্তিত না হয়।"
— সূরা আল-হাশর (৫৯:৭)
এই আয়াত ইসলামের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের অন্যতম ভিত্তি।
১০. অভাবগ্রস্তদের অগ্রাধিকার
"সদকা তো সেই সব দরিদ্র মুহাজিরদের জন্য, যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে..."
— সূরা আল-হাশর (৫৯:৮)
১১. অভাবী হলেও অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া
"তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যদেরকে নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়।"
— সূরা আল-হাশর (৫৯:৯)
এটি ইসলামে আত্মত্যাগ ও মানবিকতার এক অনন্য শিক্ষা।
১২. অভাবীদের অধিকার আদায়
"তাদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের নির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে।"
— সূরা আয-যারিয়াত (৫১:১৯)
১৩. একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি
"তাদের সম্পদে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতের নির্ধারিত অধিকার রয়েছে।"
— সূরা আল-মাআরিজ (৭০:২৪–২৫)
১৪. অভাবীকে খাদ্য না দেওয়া জাহান্নামের কারণ
"তারা বলবে, আমরা মুসল্লিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না; এবং আমরা অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দিতাম না।"
— সূরা আল-মুদ্দাসসির (৭৪:৪৩–৪৪)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব অবহেলা করা জাহান্নামের অন্যতম কারণ।
১৫. ধর্ম অস্বীকারকারীর পরিচয়
"সে-ই তো, যে এতিমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দিতে উৎসাহিত করে না।"
— সূরা আল-মাউন (১০৭:১–৩)
এখানে এতিম ও দরিদ্রের প্রতি নির্মমতাকে দ্বীন অস্বীকারকারীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৬. দুর্ভিক্ষে খাদ্যদান
"দুর্ভিক্ষের দিনে খাদ্য দান করা—নিকটাত্মীয় এতিমকে অথবা ধূলিধূসর দরিদ্রকে।"
— সূরা আল-বালাদ (৯০:১৪–১৬)
"দ্বীনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে কে বা কারা? কী করলে দ্বীনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়?" — কুরআনের আলোকে
কুরআনে "দ্বীনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা" (يُكَذِّبُ بِالدِّينِ / yukadhdhibu bid-dīn) বলতে শুধু মুখে আল্লাহ, আখিরাত বা বিচার দিবসকে অস্বীকার করাকেই বোঝানো হয়নি; বরং দ্বীনের মৌলিক শিক্ষা ও দাবিকে অস্বীকার করে এমন আচরণ করাকেও বোঝানো হয়েছে। বিশেষ করে মানুষের অধিকার, এতিম-মিসকিনের প্রতি দায়িত্ব ও সামাজিক ন্যায়বিচার অস্বীকার করাকে কুরআন অত্যন্ত কঠোরভাবে নিন্দা করেছে।
১. দ্বীনকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী কে?
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তুমি কি তাকে দেখেছ, যে প্রতিদান দিবসকে মিথ্যা বলে?"
"সে-ই তো এতিমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়।"
"এবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দিতে উৎসাহিত করে না।"সূরা আল-মাউন (১০৭:১–৩)
এই আয়াতে আল্লাহ "দ্বীনকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী" ব্যক্তির দুটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন:
১. এতিমের প্রতি কঠোরতা ও অবহেলা করা।
২. অভাবী ও দরিদ্রকে সাহায্য করতে উৎসাহিত না করা।
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আখিরাতের জবাবদিহিতায় বিশ্বাসের দাবি করে, কিন্তু বাস্তবে মানুষের প্রতি দয়া, সহমর্মিতা ও দায়িত্ব পালন করে না—তার আচরণ দ্বীনের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
২. শুধু নামাজ পড়লেই কি দ্বীনের সত্যায়ন হয়?
কুরআন দেখিয়েছে, বাহ্যিক ইবাদতের সঙ্গে মানুষের অধিকার রক্ষা না থাকলে তা দ্বীনের পূর্ণতা নয়।
আল্লাহ বলেন:
"অতএব দুর্ভোগ সেই সব নামাজির জন্য, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন। যারা লোক দেখানো কাজ করে এবং সামান্য সাহায্য করতেও বিরত থাকে।"
সূরা আল-মাউন (১০৭:৪–৭)
এখানে বোঝানো হয়েছে—যারা ইবাদতের দাবি করে কিন্তু মানুষের উপকার থেকে বিরত থাকে, তাদের ইবাদতের মধ্যে ত্রুটি রয়েছে।
৩. জাহান্নামীরা কী স্বীকার করবে?
আল্লাহ বলেন:
"তোমাদেরকে কী সাকারে (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করেছে?"
তারা বলবে:
"আমরা নামাজ আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না।"
"এবং আমরা অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দিতাম না।"
"এবং আমরা মিথ্যা আলোচনাকারীদের সঙ্গে মিথ্যা আলোচনায় লিপ্ত থাকতাম।"
"এবং আমরা প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করতাম।"সূরা আল-মুদ্দাসসির (৭৪:৪২–৪৬)
এই আয়াতে জাহান্নামের কারণগুলোর মধ্যে দুটি বিষয় বিশেষভাবে এসেছে:
আল্লাহর ইবাদতে অবহেলা করা।মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন না করা।
৪. এতিম ও দরিদ্রের অধিকার অস্বীকার করা দ্বীনের বিরুদ্ধে কেন?
কারণ দ্বীন শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের নাম নয়; দ্বীন মানুষের মধ্যে ন্যায়, দয়া ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়।
আল্লাহ বলেন:
"না, বরং তোমরা এতিমকে সম্মান করো না। আর তোমরা মিসকিনকে খাদ্য দেওয়ার জন্য একে অপরকে উৎসাহিত করো না।"
সূরা আল-ফাজর (৮৯:১৭–১৮)
৫. সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সাহায্য না করা
আল্লাহ বলেন:
"সে কখনো কঠিন পথ অতিক্রম করেনি। আর তুমি কি জানো কঠিন পথ কী? তা হলো—দাসমুক্ত করা, অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে খাদ্য দান করা, নিকটাত্মীয় এতিমকে অথবা ধূলিধূসর অভাবীকে।"
সূরা আল-বালাদ (৯০:১১–১৬)
৬. দ্বীনকে সত্য প্রমাণ করার পথ কী?
কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী:
আল্লাহর ইবাদত করা।
মানুষের অধিকার আদায় করা।
এতিম, মিসকিন ও অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো।
সম্পদ থেকে প্রয়োজনমতো ব্যয় করা।
ন্যায় ও দয়া প্রতিষ্ঠা করা।
আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়কে দান করার নির্দেশ দেন..."
সূরা আন-নাহল (১৬:৯০)
আয়াত ৯৩:৬-১১
তিনি কি তোমাকে ইয়াতিম পাননি? তারপর আশ্রয় দিয়েছেন।এবং তিনি তোমাকে পেয়েছেন পথ অনবহিতরূপে তারপর পথনির্দেশনা দিয়েছেন। আর তিনি তোমাকে নিঃস্ব পেয়েছেন। তারপর অভাবমুক্ত করেছেন। যেহেতু ইয়াতিম, তাই তুমি কঠোরতা দেখিও না। আর যাচনাকারী, তাই তুমি রূঢ় ব্যবহার কোরো না। আর এরপর তুমি তোমার রবের নিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করো।
উপসংহার
কুরআনের আলোকে দ্বীনকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী শুধু সে নয়, যে মুখে আখিরাত অস্বীকার করে; বরং সে ব্যক্তিও দ্বীনের দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে, যে আল্লাহর বিধান জেনেও এতিমকে অবহেলা করে, অভাবীকে সাহায্য করে না, মানুষের কষ্টে উদাসীন থাকে এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করে না।
সূরা আল-মাউন আমাদের শেখায়—যে দ্বীন মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি মানুষের প্রতি দয়া ও দায়িত্বশীল হতে শেখায়। তাই মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানো দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব প্রকাশ।
কুরআনের আলোকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, অভাবীকে সাহায্য করা, প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার আদায় করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা।
অন্যদিকে, যারা নামাজ-রোজার মতো ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার উপেক্ষা করে, অভাবীদের প্রতি উদাসীন থাকে এবং তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে না, তাদের জন্য কুরআনে কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে। সূরা আল-মুদ্দাসসিরে জাহান্নামিদের নিজের মুখেই স্বীকারোক্তি এসেছে যে, তারা মুসল্লি ছিলাম না এবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্যও দিত না। আবার সূরা আল-মাউনে এতিমকে তাড়িয়ে দেওয়া ও দরিদ্রকে খাদ্য দিতে উৎসাহ না দেওয়াকে দ্বীন অস্বীকারকারীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অতএব, একজন প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় কেবল মসজিদে নয়; বরং সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও প্রকাশ পায়। যে হাত নামাজে আল্লাহর সামনে ওঠে, সেই হাতই যেন ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেয়, অসহায়কে আশ্রয় দেয়, প্রতিবন্ধীকে সহায়তা করে এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের চোখের অশ্রু মুছে দেয়—এটাই কুরআনের শিক্ষা এবং ইসলামের মানবিক সৌন্দর্য।