প্রতি রাতের ‘মিনি ডেথ’ বা ঘুম: ওহীর বয়ানে মৃত্যুর প্রাক-প্রস্তুতি! ও অহীর চর্চায় দরখাস্ত: #death #sleep #nafs #ruh

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
কুরআন ঘুমকে মৃত্যুর সঙ্গে গভীরভাবে তুলনীয় একটি অবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছে; ঘুমের সময় আল্লাহ নফস গ্রহণ করেন এবং যাদের মৃত্যু নির্ধারিত হয়নি তাদের আবার ফিরিয়ে দেন।
প্রতি রাতে যখন আমরা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখের পাতা বুজে আনি, তখন আমরা আসলে কোথায় যাই? আমাদের চারপাশের চেনা জগতটা হঠাৎ কোথায় হারিয়ে যায়? আমরা যাকে ‘ঘুম’ বলে হালকাভাবে উড়িয়ে দিই, আল-কুরআন মাজীদের সংবাদের আলোকে তা আসলে কোনো সাধারণ দৈহিক বিশ্রাম নয়; বরং তা হলো চূড়ান্ত মৃত্যুর এক দৈনন্দিন মহড়া বা ‘মিনি ডেথ’।

পরম করুণাময় আল্লাহ রব্বুল আলামিন প্রতি রাতে আমাদের সত্তাকে আমাদের দেহ থেকে পরিগ্রহণ (তাওয়াফ্ফা) করেন। ওহীর এই চিরন্তন মনোবিজ্ঞান আধুনিক বিজ্ঞান ও মানুষের লোকজ ধারণার চেয়ে বহুগুণে গভীর ও বিস্ময়কর।

আসুন! প্রতিদিনের এই অবশ হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটিকে আল-কুরআন মাজীদের দুটি আয়াতের আয়নায় অনুধাবন করার চেষ্টা করি। আল্লাহ সু.তা. সূরা আল-আনআমে ইরশাদ করেন:

“এবং তিনিই, যিনি রাতে তোমাদের মৃত্যু দেন (يَتَوَفَّاكُم - ইয়াতাওয়াফফাকুম) এবং দিনে তোমরা যা অর্জন করো সেটা জানেন। এরপর তিনি তাতে তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করেন, যেন নির্ধারিত সময় পূর্ণ হয়। এরপর তাঁর দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর  তিনি তোমাদেরকে সে সম্পর্কে অবহিত করবেন যা তোমরা করতে।” (৬:৬০)

অনুরূপভাবে সূরা আয-যুমারে এই আধ্যাত্মিক মেকানিজমটি আরও নিখুঁতভাবে স্পষ্ট করা হয়েছে:

“আল্লাহ প্রাণসমূহের (নফস) কালসম্পন্ন করেন (يَتَوَفَّى - ইয়াতাওফফা) সেটার মৃত্যুর সময় এবং তারও, যে মরে নাই তার ঘুমের মধ্যে। তারপর তিনি সেটা রেখে দেন যার ওপর মৃত্যুর সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে এবং অন্যগুলোকে নির্দিষ্ট একটি মেয়াদ পর্যন্ত পাঠিয়ে দেন। নিশ্চয়ই সেটার মধ্যে এমন কওমের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে, যারা চিন্তা-গবেষণা করে (يَتَفَكَّرُونَ - ইয়াতাফাক্কারুন)।” (৩৯:৪২)

এখানে লক্ষ্য করার মতো তিনটি বিষয় আছে:

  • مَوْتِهَا — মৃত্যুর সময়
  • مَنَامِهَا — ঘুমের সময়
  • يُرْسِلُ — ফিরিয়ে দেন/ছেড়ে দেন

অর্থাৎ কুরআন নিজেই মৃত্যু এবং ঘুম—দুই অবস্থার ক্ষেত্রে “তাওয়াফ্ফি” (يَتَوَفَّى)-এর কথা পাশাপাশি বলছে।

তাই “ঘুম হলো মৃত্যুর ছোট সংস্করণ” বা “mini death”—এটি ব্যাখ্যামূলকভাবে বলা যেতে পারে; কিন্তু কুরআনের নিজের ভাষা হলো: ঘুমের সময়ও আল্লাহ নফস গ্রহণ করেন, তারপর নির্ধারিত মৃত্যু না হলে তাকে ফিরিয়ে দেন।

তাহলে এবার আমরা আমাদের রবের এই চিরায়ত আহ্বানে সাড়া দেওয়ার চেষ্টায়, ওহীর আয়াত অনুধাবনে ‘ইয়াতাফাক্কারুন’ বা গভীর চিন্তাভাবনার এই মিছিলে সামান্য হলেও শামিল হতে পারি কি-না? ঘুম থেকে জেগে ওঠার প্রতিটি সকাল যে আমাদের জন্য এক একটি নতুন ‘লাইফ বোনাস’, তা কি আমরা উপলব্ধি করতে পারছি? এই আলোচনার সমাপনীতে আমরা জানবো—প্রতি রাতে ঘুমোতে যাওয়ার প্রাক্কালে কোন কোন ঐশী বার্তার দালিলিক দরখাস্ত আমরা আমাদের রবের দরবারে পেশ করতে পারি, বিঈযনিল্লাহ!

এই গভীর বিষয়টি হৃদয় দিয়ে তাফাক্কুর করতে হলে আমাদের প্রথমেই জানতে হবে—একজন মানুষের আসল অস্তিত্বের গঠনটি ঠিক কেমন? কুরআনি মনোবিজ্ঞান যেখানে এক চূড়ান্ত আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে রেখেছে, আধুনিক বিজ্ঞান আজও সেখানে মরীচিকা তাড়িত হয়ে উদাসীন। ওহীর সেই  ‘বয়ান’ অনুযায়ী মানুষের অস্তিত্ব মূলত ৩টি স্তরে বা  ‘থ্রি-ডি’ কাঠামোয় বিন্যস্ত:

১. জড়দেহ বা বসর (Biological Body/Hardware): আমাদের দৃশ্যমান রক্তমাংসের শরীর, যা মাটি থেকে উৎপন্ন এবং মাটিতেই বিলীনযোগ্য।

২. রূহ (Divine Energy/Power): আল্লাহর তরফ থেকে আসা পবিত্র প্রাণশক্তি বা মহাজাগতিক কমান্ড, যা কেবল এই জড়দেহ নামক হার্ডওয়্যারটিকে ‘অন’ বা সচল রাখে (১৭:৮৫)।

৩. নফস (Consciousness/Software): আমাদের নিজস্ব অনন্য সত্তা; আমাদের ‘আমি’, আমাদের ইচ্ছা ও ব্যক্তিত্বের সেই সফটওয়্যার—যাকে পরীক্ষা করার জন্য এই পৃথিবীতে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পাঠানো হয়েছে।

আমাদের চারপাশে মৃত্যু একটি অতি পরিচিত দৃশ্য। স্বজন হারানোর বেদনায় আমরা প্রায়ই বলি—‘লোকটির রূহ কবজ করা হয়েছে’ অথবা ‘আল্লাহ তাঁর রূহকে শান্তি দিন’। কিন্তু আল-কুরআন মাজীদের অকাট্য আয়াতসমূহ গভীর অনুধ্যান করলে এক বিস্ময়কর সত্য উন্মোচিত হয় যা আমাদের প্রচলিত বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। ওহীর জ্ঞান অনুযায়ী, রূহ কখনো মারা যায় না, রূহের কোনো জান্নাত বা জাহান্নাম নেই এবং মৃত্যুর ফেরেশতা রূহ কবজ করেন না। আল-কুরআনের বিজ্ঞান অনুযায়ী মানুষের অস্তিত্ব মূলত তিনটি স্তরে বিভক্ত: বসর বা জড়দেহ (Hardware), রূহ বা ঐশী শক্তি (Power) এবং নফস বা নিজস্ব সত্তা (Software)।

১. রূহ (الرُّوحُ): আল্লাহর একটি বিশেষ ‘কমান্ড’ বা নির্দেশ লোকেরা যখন রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল, তখন আল্লাহ সু.তা. সূরা আল-ইসরা-তে এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিয়েছেন:

“আর তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে; বলুন! রূহ আমার রবের একটি আদেশ (مِنْ أَمْرِ رَبِّي - মিন আমরি রাব্বী); আর তোমাদেরকে জ্ঞান থেকে অতি সামান্যই দেওয়া হয়েছে।” (১৭:৮৫)

গভীর অনুধাবন: আল-কুরআন রূহকে কোনো স্বাধীন সত্তা বা মানুষের নিজস্ব কোনো অংশ হিসেবে বর্ণনা করেনি। রূহ হলো আল্লাহর একটি ‘আমর’ বা ‘হুকুম’। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক শতভাগ আল্লাহর নূর এনার্জি (Divine Energy)। আল-কুরআনে যখনই রূহের কথা এসেছে, আল্লাহ একে নিজের দিকে সম্পৃক্ত করে বলেছেন—‘রূহী’ (আমার রূহ) বা ‘রূহানা’ (আমাদের রূহ)।

অতঃপর তিনি তাকে (আদমকে) সুঠাম করেছেন এবং তাতে নিজের রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছেন...” (৩২:৯)

রূহের নিজস্ব কোনো খিদে, রাগ, লোভ বা পাপ করার ক্ষমতা নেই। রূহ কখনো চুরি বা ব্যভিচার করে না। যেহেতু রূহ পাপ করে না, তাই রূহের কোনো বিচার হবে না। মৃত্যু হলে এই ‘পাওয়ার’ বা ‘এনার্জি’ তার মূল উৎসে অর্থাৎ আল্লাহর কাছে ফিরে যায়।

২. নফস (النَّفْسُ): মানুষের প্রকৃত ‘আমি’ বা চেতনা মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘নফস’। সহজ ভাষায় নফস হলো আপনার কনশাসনেস বা চেতনা, আমার ইগো এবংআমার সেই ‘আমি’ যা সিদ্ধান্ত নেয়। ভালো এবং মন্দের জ্ঞান রূহকে নয়, বরং নফসকে দেওয়া হয়েছে।

কসম নফসের এবং যিনি তা সুষম করেছেন। অতঃপর তিনি তাকে অবহিত করেছেন তার পাপসমূহ (ফুজুরাহ) এবং তার তাকওয়া সম্পর্কে।” (৯১:৭-৮)

অনুধাবন: আল্লাহ নফসকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করেছেন যেখানে ‘ফ্রি উইল’ বা স্বাধীন ইচ্ছা দেওয়া হয়েছে। এই নফসই হলো সেই পরীক্ষার্থী যাকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। সুতরাং বিচার রূহের নয়, বরং এই নফসের হবে।

৩. মৃত্যু কার হয়? রূহের না কি নফসের?

আমাদের সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো ‘রূহ মারা যায়’। কিন্তু আল-কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা:

“প্রতিটি নফস মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে (كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ)।” -(২১:৩৫, ৩:১৮৫)

এখানে আল্লাহ একবারও বলেননি যে ‘রূহ’ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। মৃত্যু মূলত নফসের হয়। ফেরেশতারা মৃত্যুর সময় রূহ নয়, বরং নফসকে কবজ বা পরিগ্রহণ করেন।

“আল্লাহই নফসসমূহ হরণ করেন (اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنفُسَ) তাদের মৃত্যুর সময় এবং যারা মরেনি তাদের নিদ্রার সময়...” (৩৯:৪২)

অনুধাবন: ঘুম হলো একটি ‘মিনি ডেথ’। ঘুমের সময় আমাদের নফস বা চেতনাকে শরীর থেকে ডিসকানেক্ট করে নেওয়া হয়, কিন্তু রূহ বা জীবনশক্তি তখনও কানেক্টেড থাকে বলেই আমাদের হার্টবিট ও শ্বাসক্রিয়া সচল থাকে। চূড়ান্ত মৃত্যুর সময় এই নফসকে চিরস্থায়ীভাবে আটকে রাখা হয়। রূহ চলে যায় আল্লাহর কাছে, শরীর মাটিতে আর নফস যায় ‘বারযাখ’ নামক এক ডাইমেনশনে।

৪. বারযাখ: নফসের সংরক্ষিত ক্লাউড স্টোরেজ (২৩:১০০):

নফসের সারা জীবনের স্মৃতি ও আমল যেখানে সংরক্ষিত থাকে, আল-কুরআন তাকে ‘বারযাখ’ বা অদৃশ্য অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

“...যেন আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম। কখনোই নয়... তাদের সামনে থাকবে বারযাখ (بَرْزَخٌ) পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।” (২৩:১০০)

হাশরের ময়দানে আল্লাহ রূহকে নয়, বরং নফসকেই ডেকে বলবেন নিজের আমলনামা পাঠ করতে:

“পাঠ করো তোমার কিতাব; আজ তুমি নিজেই (বিনাফসিকা) তোমার হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে যথেষ্ট।” (১৭:১৪)

জান্নাতবাসীদের সম্বোধনের ক্ষেত্রেও আল্লাহ নফস শব্দটিই ব্যবহার করেছেন:

“হে প্রশান্ত নফস (يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ)! ফিরে এসো তোমার রবের প্রতি সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে।” (৮৯:২৭-২৮)

৫. বাস্তব উদাহরণ ও আধ্যাত্মিক সংযোগ (analogies):

কম্পিউটার উপমা: শরীর হলো কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার, রূহ হলো ইলেকট্রিসিটি বা বিদ্যুৎ এবং নফস হলো অপারেটিং সিস্টেম বা সফটওয়্যার। কম্পিউটার ক্রাশ করলে বিদ্যুৎ গ্রিডে ফিরে যায়, হার্ডওয়্যার ডাস্টবিনে যায়, কিন্তু সফটওয়্যারের ডাটা ক্লাউডে (বারযাখ) সেভ থাকে।

গাড়ির উপমা: শরীর হলো গাড়ির বডি, রূহ হলো পেট্রোল বা জ্বালানি এবং নফস হলো ড্রাইভার। যদি মাতাল ড্রাইভার গাড়ি এক্সিডেন্ট করে, তবে পুলিশ পেট্রোল বা গাড়ির বডিকে নয়, বরং ড্রাইভার বা নফসকে গ্রেপ্তার করবে।

মহাকাশচারীর উপমা: নফস হলো মহাকাশচারী, শরীর (বসর) হলো স্পেসসুট এবং রূহ হলো সুটের লাইফ সাপোর্ট ব্যাটারি। মিশন শেষ হলে সুট খুলে রাখা হয়, কিন্তু মহাকাশচারী বা নফস ফিরে যায় তার আসল ঠিকানায় জবাবদিহিতার জন্য।

অনুধাবন:

আল-কুরআন মাজীদের এই বৈজ্ঞানিক ও মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, আমরা কেবল একখণ্ড রক্ত-মাংসের দেহ নই। আমাদের আসল পরিচয় আমাদের নফস। রূহ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি আমানত যা আমাদের শরীরকে সচল রাখে মাত্র। সুতরাং মানুষের গালগল্প বা লোকজ বিশ্বাসের অন্ধ অনুসরণ বন্ধ করে আমাদের ফোকাস করা উচিত নফসকে পরিশুদ্ধ ও প্রশান্ত করার কাজে। কারণ কিয়ামতের দিন আপনার নফস বা সত্তাই আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে। ওহীর ‘ফুরকান’ দিয়ে নিজের বিবেককে জাগ্রত করাই প্রকৃত সফলতা।

তবে-

৫৮:২২ আয়াতের ‘রূহ’ (রূহ): মুমিনের অন্তরে নূরের শক্তির বিশেষ সমর্থন:

আল-কুরআনের মনোবিজ্ঞানে আমরা দেখেছি যে, মানুষের অস্তিত্ব মূলত তিনটি স্তরে বিভক্ত—জড়দেহ, রূহ (প্রাণশক্তি) এবং নফস (চেতনা)। 

কিন্তু  উত্থাপিত সূরা আল-মুজাদিলার ২২ নম্বর আয়াতটি এই আলোচনায় এক নতুন এবং অত্যন্ত শক্তিশালী মাত্রা যোগ করে। এখানে আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় বান্দাদের একটি বিশেষ পুরস্কারের কথা বলেছেন-তা হলো তাঁর পক্ষ থেকে আসা এক অনন্য ‘রূহ’। এই ‘রূহ’ সাধারণ  জীবনদায়ী শক্তির চেয়ে আলাদা; এটি মূলত মুমিনের ‘নফস’-কে শক্তিশালী করার এক ঐশী নূর বা মহাজাগতিক গাইড।

“তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন” পদ্ধতিতে ৫৮:২২ আয়াতের ‘রূহ’-এর স্বরূপ এবং নফস-রূহ-বসর কাঠামোর সাথে এর সমন্বয় অনুধাবনে বিশ্লেষণ করা চেষ্টা করি-

১. ৫৮:২২ আয়াতের ‘রূহ’: সাধারণ প্রাণশক্তি না কি বিশেষ সমর্থন?আয়াতটিতে বলা হয়েছে:

“...এরাই তারা, যাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং যাদের তিনি তাঁর পক্ষ থেকে ‘রূহ’ দিয়ে শক্তিশালী করেছেন (وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ - ওয়া আইয়্যাদাহুম বি-রূহিন মিনহু)।” (৫৮:২২)

গভীর অনুধাবন: সাধারণত প্রতিটি জীবিত মানুষের মধ্যেই আল্লাহর ‘আমর’ বা নির্দেশ হিসেবে রূহ বিদ্যমান থাকে যা শরীরকে সচল রাখে (১৭:৮৫)। কিন্তু ৫৮:২২ আয়াতে ‘রূহ’ শব্দটি একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে ‘আইয়্যাদাহুম’ (তাদের শক্তিশালী করেছেন) শব্দটি নির্দেশ করে যে, এটি মুমিনের নফস বা চেতনার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি অতিরিক্ত আধ্যাত্মিক শক্তি বা ডিভাইন সাপোর্ট।

২. ওহী এবং রূহ-এর গূঢ় সংযোগ: মুমিনের পাওয়ার সোর্স:

আল-কুরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ ওহী বা নাযিলকৃত কিতাবকেও ‘রূহ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন:

“এভাবেই আমি তোমার প্রতি আমার নির্দেশ থেকে ‘রূহ’ (রূহান মিন আমরিনা) ওহী করেছি...” (৪২:৫২)

অনুধাবন: ৫৮:২২ আয়াতে যে ‘রূহ’ দিয়ে মুমিনকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে, তা মূলত ওহীর নূর বা ঐশী প্রজ্ঞা। যখন একজন মুমিন তার নফসকে (চেতনাকে) আল্লাহর ওহীর সাথে একীভূত করে ফেলে, তখন আল্লাহ তার নফসের ওপর সেই ওহীর নূর বা ‘রূহ’ অবতীর্ণ করেন। এটি তাকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করার এক অজেয় শক্তি দান করে।

৩. রূহুল কুদুস ও মুমিনের অন্তরের স্থৈর্য (১৬:১০২):

আল্লাহ রব্বুল আলামিন ওহীকে ‘রূহুল কুদুস’ বা পবিত্র রূহের মাধ্যমে নাযিল করেছেন একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে:

বলুন! একে (ওহীকে) আপনার রবের পক্ষ থেকে সত্যসহ ‘রূহুল কুদুস’ অবতীর্ণ করেছেন—যেন তা মুমিনদের সুদৃঢ় করে (لِيُثَبِّتَ الَّذِينَ آمَنُوا) এবং এটি হিদায়াত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদ।” (১৬:১০২)

সমন্বিত বিশ্লেষণ: ৫৮:২২ আয়াতের ‘রূহ’ এবং ১৬:১০২ আয়াতের ‘রূহুল কুদুস’-এর কাজের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। উভয় রূহ মুমিনের নফসকে ‘সুদৃঢ়’ বা ‘শক্তিশালী’ করে।

সুতরাং, ৫৮:২২ আয়াতে যে রূহ থেকে মুমিন শক্তি পায়, তা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সেই বিশেষ হিদায়াত ও নূর যা তার ঈমানকে পাহাড়ের মতো অটল করে দেয়।

৪. নফস-রূহ-বসর মডেলে ৫৮:২২-এর অবস্থান:

যদি আমরা পূর্বের কম্পিউটার উপমাটি আবার ব্যবহার করি:

  - বডি (Hardware): আমাদের রক্তমাংসের শরীর।

  - রূহ (General Electricity): যা আমাদেরকে জীবিত রাখে (১৭:৮৫)। এটি মুসলিম, কাফের সবার মধ্যেই আছে।

  - নফস (Software/User): আমাদের সেই ‘আমি’ যে সিদ্ধান্ত নেয়।

  - ৫৮:২২-এর রূহ (Special High-Speed Connection/Anti-Virus): এটি হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক বিশেষ নূর বা পাওয়ার, যা কেবল মুমিনের ‘নফস’ বা সফটওয়্যারকে শয়তানি হ্যাকিং (৪৩:৩৬) থেকে রক্ষা করে এবং সত্যের পথে দ্রুত গতিতে চলতে শক্তি জোগায়।

৫. নফস ও ৫৮:২২ এর রূহের মিথস্ক্রিয়া:

যখন মানুষের ‘নফস’ আল্লাহর যিকরে মগ্ন হয়, তখন সে ৫৮:২২ আয়াতের সেই ‘রূহানি’ সমর্থনের যোগ্য হয়। এই বিশেষ রূহের স্পর্শে নফস তার অস্থিরতা কাটিয়ে ‘নফসুল মুতমাইন্নাহ’ বা প্রশান্ত আত্মায় রূপান্তরিত হয়। যারা এই ঐশী সমর্থন পায়, তারা দুনিয়ার কোনো ভয় বা শোকের কাছে নতি স্বীকার করে না।

অনুধাবনে সারাংশ: 

সূরা আল-মুজাদিলার ২২ নম্বর আয়াতে বর্ণিত ‘রূহ’ হলো মুমিনের অন্তরে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক বিশেষ নূরানি ব্যাটারি বা আধ্যাত্মিক ঢাল। এটি সাধারণ প্রাণশক্তি নয়, বরং এটি নফসের জন্য এক বিশেষ সুরক্ষা। যারা আল্লাহর জন্য হিতাকাঙ্ক্ষী হয় এবং ওহীর সাথে নিজেদের যুক্ত করে (রাব্বানিয়্যূন-৩:৭৯), আল্লাহ তাদের নফসকে এই বিশেষ ‘রূহ’ দিয়ে শক্তিশালী করেন। সফলকাম তারাই, যারা ওহীর এই রূহের সাথে নিজেদের নফসকে সংযুক্ত করে কিয়ামতের দিন রবের সামনে ‘কলবুন সালীম’ নিয়ে উপস্থিত হতে পারবে।

▓▒░দুআ-তাসবিহ░▒▓

সংশ্লিষ্ট কুরআনি দুআ-তাসবিহ:

নিজ নফসের ওপর যুলুম স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা: (আল্লাহ রব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে শিখিয়ে দেয়া- আমাদের আদি পিতা-মাতার তাওবা-ইস্তেগফার-দুআ) 

رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَالْخَاسِرِينَ 

রাব্বানা যালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনালানাকুনান্না মিনাল খাসিরিন 

অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নিজেদের নফসের ওপর যুলুম করেছি; যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবো। (৭:২৩)

إِنَّهُ هُوَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ

ইন্নাহূ হুঅত তাওঅ-বুর রাহীম্।   অর্থ: নিশ্চয়ই তিনি, তিনিই তওবা কবুলকারী, দয়ালু- আল কুরআন ২:৩৭

সালামুন আলা মুসা-এর ক্ষমা প্রার্থনার দুআ:

 رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي... إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

ক্বলা রব্বি ইন্নী যালামতু নাফসী ফাগফিরলী; ফাগাফারা লাহূ, ইন্নাহূ হুয়াল গাফূরুর রাহীম।

অর্থ: হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমি আমার নফসের (নিজের) ওপর যুলুম করেছি, অতএব আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।” (অতঃপর তিনি তাঁকে ক্ষমা করলেন।) নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা আল-ক্বসাস (২৮:১৬)

আমি ধোয়া তুলসিপাতা নই তাই পূর্ন সমর্পিত: নফসকে মন্দ কাজ থেকে পবিত্র করার প্রার্থনা:

আল্লাহর রহমত ছাড়া নফসকে মন্দ থেকে রক্ষা করা অসম্ভব—ইউসুফ (সালামুন আলাইহে)-এর এই আরজি প্রতিটি মুমিনের জন্য পাথেয়।

وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي ۚ إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ۚ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
উচ্চারণ: ওয়া মা উবাররিউ নাফসী; ইন্নান নাফসা লা আম্মারাতুম বিস-সূই ইল্লা মা রহিমা রাব্বী; ইন্না রাব্বী গাফুরুর রাহীম।

অর্থ: আমি আমার নফসকে নির্দোষ মনে করি না; নিশ্চয়ই নফস মন্দ কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে, কেবল সে ছাড়া যার ওপর আমার রব দয়া করেন। নিশ্চয়ই আমার রব পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা ইউসুফ (১২:৫৩)

لَّآ أَمْلِكُ لِنَفْسِى نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَآءَ ٱللَّهُ 
লা- আ¤িø­কু লিনাফ্সী নাফ্‘আঁও অলা-দ্বোর্য়ারান্ ইল্লা-মা-শা-য়াল্লা-হ।    
অর্থ:  (বলো!) আমি আমার নিজের জন্য না কোনো উপকারের ক্ষমতা রাখি আর না কোনো ক্ষতির, আল্লাহ যতটুকু চান ততটুকু ছাড়া- আল কুরআন ৭:১৮৮, ১০:৪৯।


রূহ, অহী, হিদায়াত, আল্লাহর স্মরণ, তাযকিয়া (আত্মশুদ্ধি) ও জীবন্ত অন্তরের সাথে সম্পর্কিত অনেক দুআ ও যিকির রয়েছে, যেগুলো রূহের বিকাশ ও আল্লাহমুখী জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত:

لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন।

অর্থ: আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র! নিশ্চয়ই আমি যালিমদের (নিজের নফসের ওপর যুলুমকারীদের) অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। সূরা আল-আম্বিয়া (২১:৮৭) 
لَا إِلَـهَ إِلَّا اللَّهُ
আন্নাহূ লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু।  অর্থ: তিনি, আল্লাহ ছাড়া ইলাহ নেই- আল কুরআন ৩৭:৩৫ ।
لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
লা- ইলা-হা ইল্লা-হুঅল্ ‘আযীযুল্ হাকীম্।  অর্থ: (আল্লাহই সাক্ষ্য দেন যে, তিনি, তিনি ব্যতিত ইলাহ নেই আর মালাকগণ এবং ন্যায়নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানীগণও) তিনি ব্যতিত ইলাহ নেই। পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়-আল কুরআন ৩:১৮, ৩:৬ 

রূহের নূর পূর্ণতা পাওয়ার প্রার্থনা:

رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

উচ্চারণ: রাব্বানা আতমিম লানা নূরানা ওয়াগফির লানা, ইন্নাকা আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পূর্ণতা দান করুন এবং আমাদের ক্ষমা করুন; নিশ্চয়ই আপনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। -সূরা আত-তাহরীম (৬৬:৮)

রূহানি শক্তি ও নফসের স্থৈর্য কামনায় শ্রেষ্ঠ কুরআনি দুআ:

 رَبَّنَا لَا تُزِغْقُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ 

রাব্বানা লা তুযিগ ক্বুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাতান, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব

অর্থ: হে আমাদের রব! হিদায়াত দান করার পর আমাদের অন্তরকে (নফসকে) সত্যলঙ্ঘনকারী (বিচ্যুত) করবেন না এবং আপনার নিকট থেকে আমাদের রহমত দান করুন; নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা। (৩:৮)

যেহেতু বলা হয়েছে- 
ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তাঁর প্রকৃত ভয়। আর তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না। (আয়াত ৩:১০২)

তাই মুসলিমদের মধ্যে অর্ন্তভুক্তির জন্য দরখাস্ত এভাবে- (তবে ঈমান বিষয়ে দ্র: আয়াত ৪:১৩৬, ২:১৩৬, ৩:৮৪, ২:২৮৫)

فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
ফা-ত্বিরস্ সামা-ওয়া-তি অল্ আর্দ্বি আংতা অলিয়্যী ফিদ্দুনইয়া-অল্ আ-খিরতি, তাঅফ্ফানী মু¯িøমাওঁ  অ আল্হিক্বুনী বিচ্ছোয়া-লিহীন্।  
 
অর্থ: হে মহাকাশ ও পৃথিবীর ¯্রষ্টা! দুনিয়ার মধ্যে ও আখিরাতে আপনিই আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের (সংশোধনকারীদের) সাথে মিলিত করুন-আল কুরআন ১২:১০১
إِنَّا إِلَى رَبِّنَا مُنقَلِبُونَ
آمَنَّا بِآيَاتِ رَبِّنَا لَمَّا جَاءَتْنَا ۚ رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ

ইন্না- ইলা-রব্বিনা- মুন্ক্বালিবূন্। আ-মান্না- বিআ-ইয়া-তি রব্বিনা-লাম্মা-জ্বা - য়াতœা-; রব্বানা-আফ্রিগ্ ‘আলাইনা- ছব্রাওঁ অতাওয়াফ্ফানা-মু¯িøমীন্।  

অর্থ: নিশ্চয়ই আমারা আমাদের ররের দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। আমরা আমাদের রবের আয়াতগুলোর প্রতি ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব! আপনি আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দিন এবং আমাদেরকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দান করুন- আল কুরআন ৭:১২৫-৭:১২

رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
রব্বানা- অজ্ব্ ্‘আল্না- মু¯িøমাইনি লাকা অমিন্ র্যুরিয়্যাতিনা- উম্মাতাম্ মু¯িøমাতাল্লাকা অআরিনা-মানা-সিকানা-অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-র্বু রাহীম্।    
 
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের উভয়কে আপনার জন্য মুসলিম এবং আমাদের বংশধারা থেকে আপনার জন্য একটি মুসলিম উম্মত বানান, আর আমাদেরকে আমাদের ইবাদতের নিয়মাবলী/পদ্ধতি জানিয়ে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করে গ্রহন করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই  তওবা কবুলকারী, একমাত্র দয়ালু-আল কুরআন ২:১২৮ 
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
ইন্না-লিল্লা-হি অইন্না- ইলাইহি রা-জ্বি‘ঊন্। 

অর্থ: (তাদের, যখন বিপদ তাদের আক্রান্ত করে, তারা বলে-) নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য আর নিশ্চয়ই আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী- আল কুরআন ২:১৫৬ (মৃত্যু যন্ত্রণাকেও মুছিবত বা বিপদ বলা হয়েছে-৫:১০৬)

দুআ আসহাবে কাহফের যুবকদের ঘুম: 
رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا
রব্বানা আতিনা মিল্লাদুঙ্কা রাহমাতান, ওয়া হাইয়ি’ লানা মিন আমরিনা রাশাদা।

হে আমাদের রব! আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি রহমত দান করুন এবং আমাদের এ কাজের জন্য সঠিক পথ ও উত্তম ব্যবস্থা করে দিন।  -আয়াত ১৮:১০ 

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রব্বানা- আ-তিনা-ফিদ্ দুন্ইয়া-হাসানাতাওঁ অফিল্ আ-খিরাতি হাসানাতাওঁ অক্বিনা-‘আযা-বান্না-র।  

মর্মার্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়ার মধ্যে কল্যাণ ও আখিরাতের মধ্যে কল্যাণ দান করুন। এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন- আল কুরআন ২:২০১
  

পুণ্যবানদের (আবরার) সাথে মৃত্যু কামনার দুআ:

এটি উলুল আলবাব বা বোধসম্পন্ন মানুষের প্রার্থনা, যা সূরা আলে ইমরানে বর্ণিত হয়েছে।

رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَاوَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ

উচ্চারণ: রব্বানা ফাগফির লানা যুনুবানা ওয়া কাফফির আন্না সাইয়্যিআতিনা ওয়া তাওয়াফফানা মা’আল আবরার।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের গুনাহসমূহ (যুনুব) ক্ষমা করুন এবং আমাদের মন্দ কাজগুলো (সায়্যিআত) আমাদের থেকে মোচন করে দিন এবং আমাদের মৃত্যু দান করুন পুণ্যবানদের (আবরার) সাথে।” সূরা আল ইমরান (৩:১৯৩) 

আল-কুরআন মাজীদের পরিভাষায় ‘আবরার’ (الْأَبْرَار) হলো সেই সব পুণ্যবান ব্যক্তি, যাদের ‘নফস’ (চেতনা) চূড়ান্ত পরিশুদ্ধি অর্জন করেছে এবং যারা রবের প্রতিটি হুকুমের প্রতি একনিষ্ঠ অনুগত। আবরারদের সাথে মৃত্যু বরণ করা এবং তাঁদের কাতারে শামিল হওয়া প্রতিটি মুমিনের শ্রেষ্ঠ রূহানি আকাঙ্ক্ষা।

তাত্ত্বিক অনুধাবন ও নফস-রূহ সমন্বয়:

মানুষের অস্তিত্বের ‘থ্রি-ডি’ কাঠামোর সাথে এই দুআটির এক অসাধারণ সামঞ্জস্য রয়েছে:

১. ‘তাওয়াফফা’ ও নফসের গন্তব্য: এই দুআতেও ‘তাওয়াফফানা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি যে, রূহ (ঐশী শক্তি) সরাসরি রবের কাছে ফিরে যায়, কিন্তু ‘নফস’ বা মানুষের এই ‘আমি’-কে পরিগ্রহণ (Tawaffa) করা হয়। মুমিন এখানে প্রার্থনা করছে যেন তার এই সত্তা বা নফসকে যখন জগত থেকে তুলে নেওয়া হবে, তখন যেন তার অবস্থান ‘আবরার’ বা পুণ্যবানদের রেকর্ডের সাথে হয়। 

২. আবরারদের আমলনামা ও ইল্লিয়্যিন (Cloud Storage): সূরা আল-মুতাফফিফীনে আল্লাহ আবরারদের পরিচয় ও তাঁদের আমলনামা সংরক্ষণের জায়গা সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন:

“কখনোই নয়! নিশ্চয়ই পুণ্যবানদের (আবরার) আমলনামা ‘ইল্লিয়্যিন’-এ রয়েছে।” (৮৩:১৮) এই ‘ইল্লিয়্যিন’ হলো সেই উচ্চতর ডাইমেনশন বা সার্ভার, যেখানে পবিত্র নফসদের ডাটা বা আমল সংরক্ষিত থাকে। ৩:১৯৩ আয়াতে আমরা মূলত সেই ‘ইল্লিয়্যিন’ বা আবরারদের ডাটাবেজে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আরজি জানাই।

৩. যুনুব ও সায়্যিআত মোচন: আবরারদের কাতারে শামিল হওয়ার পূর্বশর্ত হলো নফসের ওপর জমে থাকা ‘যুনুব’ (গুনাহের দায়) এবং ‘সায়্যিআত’ (মন্দ কাজের প্রভাব) পরিষ্কার করা। এই দুআটি মূলত নফসের সেই ‘ক্লিনিং প্রসেস’ বা পরিশুদ্ধির এক অনন্য ফর্মুলা।

আবরারদের প্রতি রবের বিশেষ সংবাদ (৭৬:৫):

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আবরারদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক অভাবনীয় নিশ্চয়তা দিয়েছেন:

“নিশ্চয়ই পুণ্যবানরা (আবরার) পান করবে এমন পানপাত্র থেকে, যাতে কপূরের মিশ্রণ থাকবে।” (সূরা আল-ইনসান ৭৬:৫)

সারকথা: আবরার হওয়া মানে হলো নফসকে এমন এক স্তরে নিয়ে যাওয়া যেখানে সে কেবল ভালোকেই পছন্দ করে। তাই ৩:১৯৩ আয়াতের মাধ্যমে আমরা সর্বদা রবের কাছে এই তৌফিক চাই যেন আমাদের ‘সফটওয়্যার’ বা নফসটি আবরারদের মতো প্রোগ্রামড হয়।

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَاۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّ الرَّحِيمُ

রাব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।

অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু। (আল কুরআন ২:১২৭, ২:১২৮)

রবের সার্বভৌমত্বের তাসবিহ:

 سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ۝ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ ۝ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ 

সুবহা-না রব্বিকা রব্বিল ‘ইযযাতি ‘আম্মা- ইয়াসিফূন। অসালা-মুন ‘আলাল মুরসালীন।

আপনার রব, যিনি সকল সম্মানের অধিকারী, তিনি তারা যা আরোপ করে তা থেকে পবিত্র। এবং রাসুলগণের প্রতি শান্তি (সালাম)। আর সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। (৩৭:১৮০-১৮২)

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post